১৫১. কংগ্রেস ও পাকিস্তান প্রস্তাবের পর হক ও সুভাষের কর্পোরেশন দখল
হকশাহেব সংশোধিত আইনে ১৯৪০-এর ২৮ মার্চ কর্পোরেশনের ভোট হল। কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত সুভাষচন্দ্র বাংলার ‘সাসপেন্ডেড’ কংগ্রেসের সঙ্গে হিন্দু মহাসভার এক চুক্তি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সুভাষচন্দ্র ও শ্যামাপ্রসাদ একসঙ্গে কাজকর্ম শুরু করলেন, তিল-তিল করে ছ-জনের কমিটিও হল। কিন্তু ভোটের আগে সব ভেস্তে গেল। সরকারি প্রদেশ কংগ্রেস বা অ্যাড হকরা হিন্দু মহাসভার সঙ্গে ভোটচুক্তি করায় সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক কংগ্রেস বিরোধী ও দুর্নীতিপরায়ণ বলে ছাপার অক্ষরে ও মুখের কথায় অকথ্য নিন্দে করতে লাগল। শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাওয়ায় তারা এই বোঝাবুঝির চেষ্টাকে ‘ন-দিনের খেল’ বলতে শুরু করল। কলকাতার মাঠঘাটে পার্কপথে দুই কংগ্রেসের দাঙ্গা হাঙ্গামা প্রায় নিত্যকার ব্যাপার হয়ে উঠল। শহরের হিন্দুরা পড়ল জাঁতাকলে—দুই হিন্দু দলের মারামারিতে। যা-হোক, হিন্দু মহাসভার সঙ্গে ভোটের জোট ফেঁসে যাওয়ায় সুভাষচন্দ্র প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মুসলিম লিগের সঙ্গে জোট করে ফেললেন। তিনি সর্বত্র বক্তৃতা দিতে লাগলেন যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের বিখ্যাত ‘বাংলা প্যাক্টের’ (১৯২৪) মতই, ‘বোস-লিগ প্যাক্ট বাংলার সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নতুন চেহারা দেবে।’
‘এই প্যাক্ট সারা ভারতের হিন্দু-মুসলমানের সংঘাতের অবসান ঘটাবে।’’দুই সম্প্রদায় একসঙ্গে কাজ করার একটি মঞ্চ পেল, ঠিক যখন কংগ্রেস আর সেই মিলনমঞ্চ হিশেবে বাতিল হয়ে গেছে।’
হিন্দু মহাসভার সঙ্গে ভোটের চুক্তিটা হয়ে গেলে সুভাষচন্দ্র কী ব্যাখ্যা দিতেন? সেটাও কি হত বোস-মহাসভা প্যাক্ট? সেটাও কি হত হিন্দুদের মধ্যে দ্বন্দ্বসংঘাতের অবসান ঘটানোর জন্য ওই বেঙ্গল প্যাক্টেরই সমতুল্য?
হকশাহেব সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একটা সর্বদলীয় সম্মিলন ডাকলেন। সম্মিলন শুরু হতেই হিন্দু মহাসভা থেকে আপত্তি করা হল—এ সম্মিলনে কংগ্রেসকে কেন ডাকা হল?
এই সব আইনে হিন্দু-মুসলমান সব গরিব বা আধা-গরিব গ্রামীণ মানুষের উপকার। জমিদার-মহাজনদের লুটপাটে বাংলার কৃষি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে মহাজনি নিয়ন্ত্রণে, মজা খাল খননে, ইউনিয়ন বোর্ডের ডিসপেনসারি বাড়ানোয় গ্রামের সব মানুষেরই উপকার বাংলায় মুসলমান কৃষক বেশি বলে, মুসলিমদের সংখ্যাগত উপকার বেশি। নতুন-নতুন পদ তৈরি করে সাম্প্রদায়িক অনুপাত রক্ষা করে আধা-শহুরে মুসলিম ম্যাট্রিকুলেট, আন্ডার ম্যাট্রিক, গ্র্যাজুয়েট ও আন্ডার গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির সংস্থান-এ-সবও তো পুরনো অবিচারের সংশোধন। এমন একটা মুসলিম জাগরণ তো সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয় খুব স্বাভাবিক গতিতে। ইসলাম ধর্মের আচার-আচরণ সংখ্যায় অনেক বেশি ও দৈনন্দিন। সেগুলি ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে পালনও করা যায়। যেখানে কিছু মুসলিম-বসতি আছে সেখানেই, মাটির হলেও, একটা মসজিদ থাকে—নইলে সুন্নত, শাদি, দাফন কী করে হবে? মসজিদ আছে, মুসলিম-বসতি আছে, মোল্লা-কাজি আছে, ইসলামি সরকার আছে, মুসলমান অফিসারও আছে, ক্ষমতা একা জমিদারবাবুর না। এমন একটা অবস্থায় পিররাও এসে জোটে, কিছু ইসলামি কাণ্ডকারখানা দেখায়, কিছু দিজহুরি তাড়ায়, কোরাণ নাম করে কিছু বলে। হিন্দুদের গুরুর শেষ নেই, ইসলামের পিরের শেষ নেই।
এমন একটা ইসলামি প্রদেশ তো তৈরি হচ্ছিল ৩৭ সাল থেকে ৪১ সালের মধ্যেই, ফজলুল হকশাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্বে ও নেতৃত্বে। মুসলিম লিগের বাংলা শাখার সভাপতিও হক শাহেব।
কিন্তু এই পুরো সময়টা জুড়ে হকশাহেব এমন ইসলামি বন্যা তৈরি করতে-করতেই ইসলাম-দ্বেষী হিন্দু মহাসভা, এক-এক প্রদেশে এক-এক রকমের সাম্প্রদায়িকতার ধ্বজাধারী কংগ্রেস, ন্যাশন্যালিস্ট নামের গোঁড়া হিন্দু সংগঠন, গান্ধী সেবাসমিতির মত প্রতিষ্ঠান—এঁদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা কী উপায়ে তৈরি করতেন ও তাঁরাই-বা হকশাহেবকে ভরসা করতেন কী করে? কেনই-বা করতেন বিশ্বাস? হকশাহেব তো কথা না-রাখার জন্য বিখ্যাত ও কুখ্যাত।
হয়তো-বা সেই কাররেই হিন্দু বাঙালিরা হকশাহেবকে ভরসা করতেন। একরকমের শেষ ভরসা। এই হিন্দু বাঙালিদের ‘ভদ্রলোক’ বা ‘বাবু’ বলা হয়ে থাকে। হকশাহেবের ওপর নির্ভরতার শিকড় ছিল আরো গভীরে, মাটির অন্তত কিছুটা ভিতরে, গ্রাম-গ্রামান্তরে চাষিদের মধ্যেও, যারা আচম্বিতে জেনে ফেলছে তাদের হিন্দু-পরিচয়ের প্রাধান্য ও সংকট।
ধর্মান্ধগত্য থেকে জাতিবোধ, জাতিরক্ষণ আর আত্মরক্ষা একার্থক হয়ে যাওয়া, আত্মরক্ষার বাধ্যতা থেকে চণ্ড রিরংসা তৈরি করে তোলা, সেই রিরংসার তৃপ্তি এক তীব্র তুঙ্গ শঙ্কুন ক্ষমতায় পৌঁছে। একমাত্র তেমন ক্ষমতার বসেই বিধর্মী পরিচয়ের কাউকে খুন করে ফেলাটাও নৈতিক মর্যাদা পেয়ে যায়। এটা নিশ্চয়ই দঙ্গল পাকিয়ে একটা স্বপরিচয় লাভের জটিল, গভীর, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলেই ঘটে।
কিন্তু মানুষের চেতনার গভীরতা তো সুইমিং পুলের স্বচ্ছ জলরাশির মত মাপা নয়, তেমন দৃশ্যও নয়। বরং সে গভীরতা স্তরে-স্তরে আলাদা, ক্ষণে-ক্ষণে ডুবে যেতে হয়, ভেসে থাকতে হয়, জলের অদৃশ্য তলদেশ হয়ে ওঠে পাহাড়ের খাড়াই।
গভীরতার গভীরতা থেকে চেতনা ও বিশ্বাসের উত্থান ওই রিরংসার নেশার মতই উঠে আসে। হকশাহেবকে নির্ভর করা যায় না—এই রটনাই তাঁকে হিন্দুদের কাছেও গ্রহণযোগ্য রেখেছে। হকশাহেবের পার্টিও একটা নয়। লিগও তাঁর, কেপিপিও তাঁর, কংগ্রেসের দরজা তো তাঁর জন্য হাট করে রাখা, এমনকী হিন্দু মহাসভার ওপরও তাঁর দখল। দরকার বুঝলে, তিনি দুপুরের ঘুম দিয়ে উঠেই একটা নতুন পার্টি খাড়া করতে পারেন। তাহলে হিন্দুদের ভরসা তিনি হবেন না কেন—হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোকের বা চাষির?
এমন ভরসার অর্থনীতিও আছে একটা
হকশাহেব ভোটে জিতলেন—বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ ও চাষির ভাত ডালের ব্যবস্থার কথা তুলে। এটা দুটো কথা না। এটা একটাই কথা—জমিদারি যদি না থাকে, তাহলে চাষির ডালভাতের অভাব হবে কেন। চাষি যে বেঁচে আছে সেটা ধরে নিতে হয়। জমির বন্দবস্ত থেকে জমিদারকে যদি বাদ দেয়া হয়, তাহলেই চাষি মৃতসঞ্জীবনীর স্বাদ পাবে। ঋণের বোঝা নেই, ভাগের দায় নেই, আবোয়াবের অনিশ্চয়তা নেই, মালিক নেই—এর বাইরে কোথাও চাষির মুক্তি নেই। সেই মুক্তি দিতেই ফজলুল হক-এর হেফাজতি।
এর পাশাপাশি লিগের ইসলামি দায়িত্ববোধের স্লোগ্যান, কথায়-কথায় নবী আর কোরানের কথা, হিন্দুদের জাত তুলে গাল দেয়া—ভেসে গেল। লিগ ভয় দেখাচ্ছিল কেয়ামতের দিনের কথা বলে। কেয়ামত তো অনেক অনেক কাল পরের ব্যাপার, খেতির মালিকানা তো দিন কয়েক বা মাসখানেকের ব্যাপার। মাসখানেক পরে কেয়ামতের কথা ভাবলে কী আর এমন দেরি হবে?
আইনসভা শুরু তো হয়েছিল একশটা জয়ঢাকের আওয়াজে। মাত্র ৮-৯ বছর আগে বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্টের যে সংশোধন কংগ্রেস-লিগ মেম্বাররা তুলে নিতে বাধ্য করেছিল, সেই সংশোধনে এখন কংগ্রেস-লিগ বারদশেক ঢোঁক গিলে, আর, বারবিশেক বিষম খেয়ে, হেঁচকি তুলতে-তুলতে রাজি হল। রাজি না-হয়ে উপায় ছিল না। কারণ, কৃষক প্রজা পার্টির সমাবেশগুলো ক্রমেই বড় হচ্ছিল আর ফজলুল হকশাহেব চাষি-জনতার নামে নবাব-জমিদার নাজিমুদ্দিনকে কীর্তনখোলার অঢেল গভীরে পুঁতে দিয়েছেন।
নিষ্পত্তি হয়েই গেছে, এখন শুধু সার্টিফিকেটটুকু চাই। কাউন্সিল থেকে সংশোধন এল আইনসভায়। সে-সংশোধনে কিছু তো আর বাকি থাকল না—রায়তি জমি রায়ত বিক্রি করতেও পারবে। কারো অদুমতি দরকার নেই, জমিদায়েরও না। কেনাবেচার জন্য জমিদার কোনো সেলামি পাবে না। দখলি চাষির জমি দখলি চাষিরই থাকবে। সকলেই বলে হ্যাঁ, কিন্তু আইন আর পাশ হয় না। কেন যে হয় না, তাও কেউ জানেও না, বলেও না। একটা আইন নিয়ে যদি এত দিন ধরে এত কথা হয়, তাহলে কথার আঁকশি তো বেরবেই। কোনো মেম্বার বললেন, এই-যে জমিদার-জোতদার-রায়ত-দখলি রায়ত-আন্ডার রায়ত ভাগাভাগি এটা বাংলা প্রদেশের সর্বত্র এক নয়। বরিন্দ থেকে দিনাজপুর—পুব রংপুর-ডুয়ার্সে খাশজমি চুকানিদার নিয়েছে সরকার থেকে। সেখানে দর চুকানিদার-নিম চুকানিদার হয়ে জমিচাষ করে আধিয়ার। সে-আধিয়ারকে কি দখলি চাষি বলা যায়? না, বলা যায় না। কারণ আজ সে যে-জমিতে হাল দিয়েছে, চার মাস পরে জোতদার তাকে আর-এক জমিতে পাঠাবে।
তাহলে একটা সংশোধন হোক—একদাগে বার বছর চাষ দিলে তাকে দখলি চাষি ধরা হবে।
তার চাইতে এই সংশোধনটা ভাল হত না—বার বছরের কম মেয়াদে কোনো জমিতে আধিয়ার লাগানো চলবে না?
এ কি একটা সংশোধন? চাষ করা কি সরকারি চাকরি—প্রথমে টেম্পরারি ১২ বছর, ১২ বছর পর পার্মানেন্ট, পার্মানেন্টের পর পেনশন। এসব গোলমালে যাওয়ার দরকার কী? দেড়শ বছরের একটা ব্যবস্থা বদলাতে হলে, সব দিক দেখেশুনে ভেবেচিন্তে করতে হবে। দাও বিল পাঠিয়ে সিলেক্ট কমিটিতে।
হল সিলেক্ট কমিটি। তারা তাদের সময় নিয়ে রিপোর্ট দিল যে এ-ব্যাপারে একটা কমিশন বসানো দরকার। কমিশন নিয়োগ করতে লাটশাহেবের অনুমতি দরকার। ফাইল গেল লাটশাহেবের কাছে। গেল তো গেলই—স্রোতে যেমন ভেসে যায়। ফেরৎ আর আসে না। সমুদ্র যেমন ফিরিয়ে দেয়। শেষে কোনো একসময় হকশাহেব একজন প্রাক্তন বিচারপতি চাইলেন হাইকোর্টের কাছে। যাকে চেয়েছিলেন তাকে পাওয়া গেল না। তখন আর-একজনকে চাইলেন। তাকেও পাওয়া গেল না। চাওয়া—না-পাওয়া—আবার চাওয়া—আবার না-পাওয়া, আবার….এই সব হতে-হতে কয়েকমাস কেটে যায়। দু-একজনের খেয়াল থাকে, বেশির ভাগেরই থাকে না। শেষে এক শাহেব পাওয়া গেল—ফ্ল্যাউড কমিশন। সেই শাহেব খুব খাটাখাটনি করে রিপোর্ট দাখিল করলেন পাঁচ খণ্ডে। তাঁর কাছে যত লোক ও দল তাদের মত জানিয়েছেন সে সব থাকল রিপোর্টে। সঙ্গে তাঁর অনেক সুপারিশ। বাংলার ভূমিব্যবস্থা নিয়ে এই প্রথম বিশাল কাজ আইনসভায় পেশ করাও গেল না।
