১১০. সুভাষের জয়-পরাজয়–নতুন রণাঙ্গন
এটা জানাই ছিল যে ২৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি-নির্বাচনের ফল জানা যাবে। বিপিসিসি দপ্তরে দুপুর থেকেই একে একে অনেকে আসতে শুরু করেন। সকলেই যে কংগ্রেসি তা নয়, কংগ্রেসের নেতাদের কেউ-কেউ ছিলেন, কেউ-কেউ জিলা থেকেও এসে গেছেন। আবার, এমন কী প্রজা পার্টি, মুসলিম লিগ ও মুসলিম চেম্বারেরও কেউ-কেউ এসেছেন। গলাবন্ধ আর গোল টুপিতে একজন ঢুকতেই কিরণ শঙ্কর রায় তাঁকে দু-হাত তুলে ডাকেন, ‘আরে আসুন, আসুন মিস্টার তলোয়ারকর। আপনি কি এই খবর জানতেই এলেন না কী, সিন্ধু থেকে। তা হলে, এলাহাবাদে নেমে গেলেই তো সবার আগে খবর পেতেন।’
ততক্ষণে তলোয়ারকর কিরণশঙ্করের কাছাকাছি এসে গেছেন। কিরণশঙ্কর কাউকে নিচু গলায় বললেন, ‘একটা চেয়ার দাও’। একজন উঠে চেয়ারটা ঠেলে সরিয়ে তলোয়ারকরকে আসন দিলেন। তলোয়ারকর নমস্কার করে সবার দিকে মুখটা ঘুরিয়ে করিণশঙ্করের মুখে ফিরে এসে বলেন, ‘কিরণবাবু আমি একটা সিন্ধি মারচেন্ট আর আমাকে আপনি শেখাচ্ছেন দেহাতে গিয়ে মাল দেখতে। আমার বাবার সবচেয়ে বড়বোন, আর স্বামী, কী ডাকেন আপনারা যেন?’
‘পিসেমশায়—’
‘হাঁ হাঁ পিসামশায়—আমরা ডাকি জেটা। আমাদের এই জেটা আমাদের সবাইকে ব্যবসার মূল নীতি শিখিয়েছিলেন।’
‘তিনি কি আপনাদের বাড়িতেই থাকতেন? ঘরদামাদ?’
‘হাতের একটা ভঙ্গিতে সেটা নাকচ করে তলোয়ারকর বলে ওঠেন, ‘ছোড়েন তো। আরে কোনো সিন্ধি নিজের বাড়িতে কাউকে থাকতে দেয় না। সব সিন্ধি অন্যের ঘাড়ে বসে খায়-ঘুমোয়। না। উনি, ভাল বিজনেসম্যান তো—মার্কেট সেন্স ছিল চুম্বকের মত। বিপদে পড়লেই ওঁর বুদ্ধি নিতে ছুটতো হত। বুদ্ধি শেষপর্যন্ত দিতেন কিন্তু তার জন্য দর দিতে হত। এটাই ছিল ওঁর প্রথম শিক্ষা, সিন্ধি যদি হতে চাও, দাম ছাড়া হাঁচবেও না।’
‘সে না-হয় বুঝলাম। কিন্তু আপনি শুধু হাঁচার জন্য এত দূর এলেন? খরচা হয়ে গেল পোষাবে তো?’
‘সেটাই তো ছিল ওঁর পরের মন্ত্র। লাভের হিশেব কখনো লাভের জায়গায় না-দাঁড়িয়ে করবে না। আপনাদের জমিদারবাবুদের হিশেব আর তরিকা তো আলাদা। কেউ এসে বলল, বাবু, কিছু সোনা চুরি করে এনেছি, আপনি নেবেন? আপনারা চোখ না খুলে জবাব দেবেন—বেটা, আমার ঘুম ভাঙালি, দুপুরের? বিকেলে আসিস। টাকা নিয়ে যাস। জানব সুভাষবাবুর ভোটের কী হল? তার জন্য কলকাতা না-এসে এলাহাবাদ নামব কেন? আমি তো সিন্ধি। বাঙালিবাবু না।’
‘ভোটটা তো কংগ্রেসের। তো কংগ্রেসের হেড-অফিসে যাবেন না? এই শেখালেন, আপনার পিসেমশায়?’
তলোয়ারকর খুব হাসলেন। তারপর বললেন, ‘সেটাই তো জেটা-র শেষ মন্ত্র। সওদা চিনতে ভুল করিস না। আমার সওদা তো সুভাষবাবু। আপনি দেখাচ্ছেন কংগ্রেস?’
হঠাৎ যোগেন, সামসুল আমেদ, মেদিনীপুরের যতীন, দু-তিনটি ছাপা কাগজ নিয়ে হৈ-হৈ করতে-করতে ঢুকল, বোঝা গেল কোথাও একটা জিত হয়েছে। তারপরই ওরা কেউ হাতের কাগজটা মেলে ধরেছে, বড়-বড় কাল অক্ষরে শুধু লেখা—’সুভাষ ইলেকটেড কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট, বাংলাতেও বেরিয়েছে একই টেলিগ্রাম, ‘সুভাষ রাষ্ট্রপতি’।
ততক্ষণে ওরা টেবিলের কাছে পৌঁছে গেছে, ওদের হাত থেকে কাগজগুলোও চলে গেছে। ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ নতুন হেডিং করেছে, ‘ওল্ড অর্ডার কনটিনিউজ ইন কংগ্রেস।’
কংগ্রেস আর ওল্ড বলতেই তো গান্ধীজিকে মনে হয়। সে কী? ভুলটা কার? তখন কেউ একজন জোরে-জোরে পড়ে—সুভাষই ছিলেন, সুভাষই থাকলেন, প্রেসিডেন্ট।
‘সেটা সোজা লিখলেই হয়, এত ঘুরিয়ে লেখার কী হল?’
বাইরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায়, বেশ জোরে ব্রেক কষে আর হর্ন দিয়ে। দুই হাত ভর্তি সন্দেশের প্যাকেট বুকের কাছে ধরে ছোট ইস্পাহানি হৈ-হৈ করে ঢোকে, ‘মোহনবাগানকে তোড়কে মহামেডান স্পোর্টিং ছিন লিয়া ট্রিপল ক্রাউন’, বলতে-বলতে সে সন্দেশের প্যাকেটগুলো টেবিলের ওপর রেখে খুলে দেয়। ‘আরে, তুমি কি ভীম নাগ পুরোটা তুলে এনেছ?’
সন্দেশে তখন সবারই মুখ ভর্তি। অনেকে অনেকটা একসঙ্গে মুখে নিয়েছে, তাদের গাল ফোলা। দু-একজনের ঠোঁটের কোণ দিয়ে সন্দেশের ছানা বেরিয়ে এসেছে। সন্দেশের রকমও বিচিত্র। কেউ বাঁ-হাতে মুখেরটা ধরে রেখে ডান হাতে আর-এক রকম ধরে রেখেছে।
‘এই দ্যাখো! ভীম নাগ দেখে সব শত্রুমিত্র ভুলে গেছে। সুভাষ বোস কংগ্রেস প্রেসিডেন্টে জিতলে ইস্পাহানি শিল্ড জিতবে কেন? ও না মুসলিম লিগের টেররিস্ট!’
ইস্পাহনি কোনো সন্দেশ নেয়নি। ও বাংলা বলতে পারে না, উর্দু-ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে বলে ওঠে, কংগ্রেস কংগ্রেসই থাকবে, লিগও লিগই থাকবে, ইস্পাহানিও ইস্পাহানি থাকবে, তাই বলে কলকাতার ছেলে বাঙালি সুভাষ বোস জিতলে ফূর্তি হবে না?
‘এই ইস্পাহানি, তুমি কী করে কলকাতার হও আর বাঙালি হও। ব্যাটা আপকানটি— জেতার পর একটু কনসেশন দেন বেরাদররা। আমি তো ভাবলাম আমার হাতের ছোঁয়া আপনারা খাবেন কী না। ভীমনাগের দোকান ক্রস করতে গিয়ে মাথায় খেলে গেল—মিষ্টি, ফল আর লুচিতে নাকি জাতপাত লাগে না!—এই কথাটা ইস্পাহানি বেশ হাততালি দিয়ে বোঝাতে পারল।
উত্তরে কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল, ‘এতই যদি শাস্ত্র জানো, পুঁটিরামের কচুরি আনলে না কেন এক ঝুড়ি? শুধু মিষ্টিতে জিভ ধরে যায়—না?’
এমন কথায় কে-একজন সন্দেশভর্তি মুখে এমন দুর্দমনীয় হেসে ফেলল যে বাতাসে ছানা ছিটিয়ে যায়।
কলকাতায় যেমন, তেমনি লাহোরে, মাদ্রাজে, এলাহাবাদে, (ত্রিবাঙ্কুরে ও) মহীশূরেও কংগ্রেস-মহলে খুব ফূর্তি হয়েছিল, সুভাষ রাষ্ট্রপতি ভোটে জেতায়। বাংলা ও এই পাঁচটি প্রদেশকেন্দ্রে সুভাষ ভোট পেয়েছিলেন ১১৫১টি। তার মধ্যে, এক বাংলারই ছিল তো ৪০৪টি ভোট। আর পট্টভি সীতারামাইয়া তাঁর নিজের জায়গা অন্ধ্রেই পেয়েছিলেন ১৮১টি। বাংলার কংগ্রেসসদস্য ছিল বেশি। আবার তেমনি ভুলাভাই-মহাদেব ভাই-বল্লভ ভাইয়ের গুজরাটে সুভাষ পেয়েছিলেন ৫টি ভোট আর সীতারামাইয়া পেয়েছিলেন, ১০০ ভোট। বিহারেও সীতারামাইয়া আর সুভাষ পেয়েছিলেন, ১৯৭ আর ১০, যথাক্রমে। এক পাটনাতেই ভোটের প্রচারে গিয়ে সুভাষ সংগঠিত প্রতিবাদের মুখে পড়েন। তিনি তো তখনো কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতি। সন্ধেবেলায় এক সিনেমা হলে জনসভা ডাকা ছিল। সেই সভাতে তাঁকে কালঝান্ডা দেখানো হয়, মঞ্চে জুতোটুতো ছোড়া হয় ও ‘গান্ধীদুষমনি চলবে না’ স্লোগান তোলা হয়। কে কোথায় কত ভোট পেয়েছেন, সেই সংখ্যার অনুপাত প্রদেশে কংগ্রেসের সদস্য সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। তাতে বেশ পরিষ্কার দুটো বিপরীত গতি দেখা যায়। সেই সব প্রদেশেই কংগ্রেসের সদস্য সংখ্যা বেশি যে প্রদেশগুলিতে কংগ্রেসের গান্ধী নেতৃত্বের ২১-২২ সালের সত্যাগ্রহ ও ৩১-৩২-এ দু-দফার অসহযোগ আন্দোলন ব্যাপকতর আকার নিয়েছে—বাংলা, মাদ্রাজ, গুজরাট, পাঞ্জাব, ত্রিবাঙ্কুর, হায়দরাবাদ, যুক্ত প্রদেশ। কংগ্রেসের যে-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সুভাষ ভোটে দাঁড়ালেন, সেই নেতৃত্বের সংগঠিত এলাকায়ই সুভাষ বেশি ভোট পেয়েছেন। তারও ওপর পেয়েছেন কংগ্রেসের মধ্যে অন্যান্য যে-সব পার্টির লোকজন, কংগ্রেস র্যাডিক্যাল, সোস্যালিস্ট, কমিউনিস্ট বলে পরিচিত দলগুলি। যেমন, বাংলায়। সেখানে গান্ধী আন্দোলনের পক্ষে সমাবেশ, তুলনায় কম অথচ বিপ্লবী সশস্ত্র আন্দোলন বেশ বেশি। সেখানে সুভাষ বিপ্লবীদের ভোট পেয়েছেন বেশি। সীতারামাইয়া পেয়েছেন গান্ধীবাদী ও সংগঠন নেতৃত্বের ভোট। সুভাষ পেয়েছেন— গান্ধীবাদ-বিরোধী, সংগঠন-বিরোধী, অন্য রাজনীতিরও ভোট।
প্রদেশ কংগ্রেস অফিসে সন্দেশ খেয়ে যোগেন এলগিন রোডে যাবে বলে বেরতে গিয়ে কারো ডাক শুনে পেছন ফিরে দেখে, মনসুর আহমদ। যোগেনকে জিজ্ঞাসা করে, ‘যাও কই?’
যোগেন জিজ্ঞাসা করে পালটা, ‘তুমি আছো কই?’
মনসুরও পালটা বলে, ‘তুমি ছিলা যেখানে।
যোগেনও পালটা বলে, ‘যাইব্যা লগে?’
‘কোথায় যাবা কইলে যাই না।’
‘কই নাই তো, আও তালি—’
মনসুর চেয়ার থেকে উঠে আসে। দু-জনে বড় দরজা দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ে। যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘ভাগের সন্দেশ খাইছ? পেট পুইর্যা?’
মনসুর বলে, সঙ্গে ঠোঁটের একটা ভঙ্গিও করে, ‘খাইছি এক গণ্ডা—
‘মুখ দেইখ্যা তো মনে হয় পাচন গিলছ য্যান। সন্দেশ কি তিতা লাইগল?’
‘সন্দেশ তো আর বিশল্যকরণী দিয়্যা বানায় নাই। তিতা খাওয়ার সাইধ হইলে ভ্যাড়েন্ডা পাতা খাও’।
‘আমার যা খাওয়ার, তা খাব নে। খাইল্যা সন্দেশ, মুখড়া বিজরাইয়া রাইখলা ক্যা? ইস্পাহানি আইনছে বইল্যা?’
‘ধইরছ ঠিকোই, শালা চাঁড়ালের পো, বামুনের দিকে অষ্টপ্রহর চাইয়্যা থাকার অব্যাস তো। চোখ খুব একডা ভুল করে নাই।’
‘আমারে চাঁড়াল বইললে তো গালি দেয়া হয় না। হইয়া যায় সত্যকথন। কিন্তু আমারে গাইলের ছল কইর্যা নিজেরে বানাইল্যা বাউন? তার উপর তোমার মুখ আইঠ্যা হইয়া আছে ইস্পাহানির সন্দেশে—’
‘দুধ মঙ্গলার দুহিয়াছে প্রসন্ন। আমার তো কোনো স্বত্ব নাই। সন্দেশ ভীমনাগের। আনিয়াছে ইস্পাহানি, তবে আমার মুখে যে-দুঃখভাব দ্যাখো সেইডার নিমিত্ত শুধু ইস্পাহানি না।’
‘তাইলে তো তোমার দুঃখের বেশ বড় কেচ্ছা আছে। কও-না ক্যা?’
‘শুনো মণ্ডল। তোমাগ থিক্যা নিকৃষ্ট জীব মনুষ্যসমাজে তো আর হয় না—’
‘এত পচা পুরানা কথা কন যে তোমার লগে তো কথা কওয়াই মুশকিল। তা ছাড়া কইলকাতায় গুজব রটাইয়্যা থুইছ তুমি নাকী জ্ঞানীগুণী মানুষ। ঐ ফরিদপুরের পোলাডার নাকী বিলাতি ডিগ্রি। তারে দিয়্যা তামুক সাজাইয়্যা তো দৈনিক কাগজের সম্পাদকও হইছ। নতুন কথা কিছু শেখ নাই?’
‘শিখছি। সেই শিক্ষাডাই তোমারে দিব্যার চাইছিল্যাম। কিন্তু তুমি নিল্যা না। জন্মের দোষ, কাটাইব্যা ক্যামনে?
‘শিক্ষাডা শুনি। নিব কি না-নিব বাদে ঠিক কইরব।’
‘শিক্ষাডা হইল, যার সঙ্গে তোমার হাঁটা-যাওয়ার কথা ছিল না কিন্তু তোমার হাঁটাচলায় সে সঙ্গী হইয়্যা পইড়ছে, তার মুখে যদি দুঃখছাপ দ্যাহো, সে যদি তোমার আপনজনও হয়, জিগ্যাইও না। মাথায় গেল?’
‘এ তো ভাবের কথা। এর আবার মাথার কাম কী?’
‘মাথার কাম এই হানে যে তোমারে যদি অ্যাহন আমি কই—কইলকাতার এই ভীম নাগ-ভরত নাগের কতকগুল্যা ছানার দলা আমার জিভে রোচে না। তাও চার গণ্ডা খাইতে হইল ইস্পাহানি আইনছে বইল্যা। আমার এই দুইড্যা কারণের দুঃখের কথা যদি তোমারে কই, মানে, তোমার কথার জবে কই, তাইলে তো তোমারে জিগাইতে হয়—কেন আমি সন্দেশ আর ইস্পাহানি দুইডারেই একসঙ্গে অরুচি করি।’
‘ও বোধ হয় সরল মনেই আইছে। সুভাষবাবুর জয়ে আনন্দ হইব্যার পারে না, ওর?’
‘আরে, আনন্দের কি গুরুদশা? কেন? সুভাষবাবু কংগ্রেসের ভোটে জিতলে ওর ক্যান আনন্দ হইব?’
‘এইডা কী কও? চেনাজানা মানুষ একজন নেতা হইলে আনন্দ হয় না?’
‘আরে মুখ্যু। ও তো নেতা পোষে। খাওয়ায় দাওয়ায় হাতখরচা দ্যায়। জিন্নারে রাইখছে। নাজিমুদ্দিনরে রাইখছে। অ্যাহন, সুভাষবাবুরে যদি রাইখতে পারে, তালি আর বাকি থাকে কী?’
‘হকশাহেব?’
‘টাকার গন্ধ পাইলে তো হকশাহেব পা বাড়াইয়্যাই যাবে। চেষ্টা করছিল। পারছিলও খানিক। নাইলে কি এই সরকার হইত না চইলত? হকশাহেবরে তো লিগ বানাইয়্যা দিল? দিল না?’
‘হকশাহেব এক পার্টির হইয়্যা জোহর আর ইশা-র নমাজ আদায় দেয় না। আর, দোষ হইল ইস্পাহানির?’
‘হকশাহেবরে এত খাতিরদানের বিষয়ডা কী ইস্পাহানির?
‘দ্যাহো মনসুর! তোমার এই পোলাপানের নাগাল কথা বলা ছাড়ো যে-কথাডা তুমি জানো, সেইডা আর-এক জনের মুখে শোনা।’
‘শুনাও-না, শুনাও। তাইলে আমিও হয়তো কিছুড়া শুনাইব্যার পারি।’
‘একডাও বাঙালি লিডার না পাইলে মুসলিম লিগ অল ইন্ডিয়া হয় ক্যামনে?’
‘বাঃ। মণ্ডল, দেহি তোমারও তো বুদ্ধি খেলে! এইডা তালি মুসলিম লিগরা মানে? আর আমরা, বাঙালি মুসলমানরা, মানি না? না কী জানি না? তুমিও যা বুঝো মণ্ডল, হকশাহেব তা বুঝেন না, যে বাঙালিই তাঁর টেক্কা। ঐ টেক্কা ভাঙাইলে শের-ই-বাংলা হইয়্যা যাইবে বাঘের মাসি। মুসলিম লিগও জানে হকশাহেবের লিগ-হওয়ার কুনো স্থায়িত্ব নাই, হকশাহেবও জানে লিগেরও হকশাহেবরে নেতা মানার কুনো স্থায়িত্ব নাই।’
‘খবরের কাগজে চাকরি করার এই এক বিপদ। প্রত্যেক দিন একই কথা নতুন কইর্যা লিখতে হয় আর প্রত্যেকদিন এডার সাক্ষী দিব্যার লাগে আইজক্যার খবরডাই সবথিক্যা নতুন।’ ওরা একটা ট্রাম রাস্তায় পৌঁছে যাচ্ছিল। যোগেন হঠাৎ থেমে গিয়ে বলে, ‘ঐ যে পানের দোকানডা, ওরে গিয়্যা জিগ্যান, ও-ও কইব, লিগ আর হকশাহেবের শাদি-তালাকের গল্প। ও তো কুনো কাগজের এডিটার না?’
‘আল্লা। বেকুব কি এক বরিশালেই জন্মায়? ও যে এডিটার না, তা কবুল কইরতে ওরে এতডা খাটাখাটনি কইরতে হবে ক্যা? কপালে চক্ষু নাই? সেই চক্ষু-দুইডাতে দ্যাহা যায় না, ও পানই বানায়!’ এইবার এডিটরি দ্যাহ। সামনে কর্পোরেশনের ভোট, নতুন আইনে, রিজার্ভ সিট নিয়্যা। সুভাষবাবুর মতো চেনা পুরানা মানুষ নেতা হইলে লিগের সঙ্গে তো সিটভাগ হইতেও পারে—মুখ খুইল্যা বা বুইজ্যা। অ্যাহন কি ইস্পাহানির সন্দেশ-রহস্য মাথায় গেল?’
ওরা একটা ট্রামস্টপেই দাঁড়িয়েছিল। ওখানে দাঁড়ালে পার্ক সার্কাস আর গড়িয়াহাটের ট্রাম পাওয়া যায়। শোনা যাচ্ছে ট্রাম নাকী বালিগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
জানুয়ারির শেষ। কলকাতার সবচেয়ে ঠান্ডা পড়ার সময়। সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা পড়ে সাউথেই। যোগেন শুনেছে—আলিপুরেও নাকী খুব ঠান্ডা।
মনসুর বলে, ‘খবর তো নতুন দিল্যাম, মণ্ডল, চুপ মাইরা গেলা ক্যান? কথা কও।’
‘জানো মনসুর ভাই, তুমি ঠিকই বলছ, আমার মাথায় এই সব ঠিক ঢুকে না। কিন্তু সবাই যহন সবই জানে দেহি, তহন কখনো-কখনো মনে হয়, ঐ, তুমি যা কইল্যা, অত কথা বোঝার মত মাথা না। কিন্তু আমাগর এমন মানুষ আছে, জানো, যারা এইসব খুব ভালো বুঝে যে আমাগ মন্ত্রী মল্লিক।’ ট্রাম এসে যাওয়ায় যোগেন ওঠে, পেছনে মনসুর। সিটে বসে যোগেন যে-কথা বলছিল, সেটা শেষ করে, ‘এই কংগ্রেসের ভোটাভুটি নিয়ে তো সুভাষবাবুর একটু-আধটু কাজ করল্যাম, তাতে তো দেখি, দেশের যারা আস্ত-আস্ত মাথা, সেগুল্যাও খুব পরিষ্কার মাথা না। তাইলে আমাগ লেভেলে তো এই হিশাব কাজ করতেই পারে কারো মাথায়, কর্পোরেশন ভোটে লিগের সুবিধা হব্যার পারে যদি কংগ্রেসের সঙ্গে ভাবসাব করা যায়, ভাবসাব রাখা যায়। কংগ্রেস যদি চায় তাইলে তো হকশাহেবের সঙ্গে সরকারই কইরব্যার পারে।’
‘মণ্ডল, তুমি যেইডা ভাবছ, সবড়া সেরকম সাজানো না। ধরো, নিজের কথাই কই। আমি মুসলিম লিগ অপছন্দ করি। ভিতর থিক্যা। কিন্তু আমি মুসলমান বইল্যা একডা গর্ব আছে। সেই জন্যই কৃষকপ্রজা। তার নেতা যদি কৃষক ভুইল্যা, প্রজা ভুইল্যা, নিজেই মুসলমান হইয়্যা যায়, তাইলে আমাগ জায়গাডা কই? সুভাষবাবু সম্পর্কে হিন্দুমুসলমান সব মানুষের একটা বেদনা আছে। অ্যাহন, সুভাষবাবু যদি মুসলমানদের সঙ্গে এমন একডা ব্যবস্থা করেন যে মুসলমান মুসলমানই থাকবে, থাইক্যাও দেশের ব্যাপারে তাগ একমত হওয়ার বাধ্যতা নাই। অবস্থা যা খাড়াইতেছে আমার কেমন ভয় করে যোগেন, আমিই-না কোনদিন লিগ হইয়্যা যাই।’
যোগেন সুভাষবাবুর সঙ্গে চোখের দেখাটুকু সারতে এলগিন রোডে আসছিল, মনসুর সেটা বুঝেই তার সঙ্গ নিয়েছে।
এলগিন রোডের বাড়িতে ভিড় থাকবে, সেটা যোগেনের আন্দাজই ছিল। বাড়ির লোকজন তো তাকে চেনেজানে। এটাও জানে, যোগেন যে এ-বাড়ি ও-বাড়িতে সব সময়ই আসা-যাওয়া করে, সেটা সুভাষ বাবুরই কাজে। এখন দেখে, ভিড় বাইরের গেট ছাড়িয়ে পথে। মনসুরকে নিয়ে এই ভিড় ঠেলবে কী করে? সুভাষের সঙ্গে তো মনসুরের ‘তুমি’র সম্পর্ক, সুভাষ পর্যন্ত যাবে কী করে?
যা হোক, বাড়ির কাজের লোকদেরই কেউ যোগেনকে চিনতে পেরে কাছে এসে বলে, ‘আপনি আমার সঙ্গে আসুন!’ যোগেন বলে, ‘উনি আছেন আমার সঙ্গে।’ লোকটি বলে, ‘হ্যাঁ, আসুন’।
লোকটি ভিড়টার মধ্যে ঠেলেঠুলে ঢুকে গিয়ে কম আলোর সরু একটা প্যাসেজ দিয়ে বাড়ির পেছনে একটা লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ায়। সিঁড়ির মাথায় আলো আছে। লোকটি বলে, ‘এই সিঁড়ি দিয়ে উঠে যান, স্যার।’
মনসুর বলে, ‘যদি চোর বলে মারে?’
লোকটি হেসে বলে, ‘আমরা তো এই সিঁড়ি দিয়েই উঠছি-নামছি। কিছু হবে না।’
মনসুর বলে, ‘যোগেন, এক্ষেত্রে সিংহের গহ্বর থিক্যা কোনো নিষ্ক্রমণের পদচিহ্ন নাই। সুতরাং তুমিই অগ্রে প্রবেশ করো।’
‘অগ্র পশ্চাতে খুব একটা তফাত হব বইল্যা তো মনে নেয় না,’ যোগেন বেশ পেঁচিয়ে- পেঁচিয়ে উঠে যায়। মনসুরও। আর, দেখে একটা দরজা খোলাই আছে। তারা নির্ভয়ে সেই দরজা দিয়ে ভিতরের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে যায়।
সেই ভিড়ের মধ্যেই পেছন থেকে মনসুর বলে, ‘যোগেন, সুভাষবাবুর সঙ্গে চোখাচোখির চেষ্টাও কইরো না। সিধা সদর সিঁড়ি দিয়্যা রাস্তায় নাইম্যা যাও। উঠাইব্যার লোক মেলে, নামাইব্যার লোক মেলে না যোগেন।’
যোগেন আন্দাজ করে সামনে ডানদিকের দেয়াল শেষ হলেই যে-ঘর সেখানেই সুভাষবাবু আছেন।
যোগেনের আন্দাজ ভুল হওয়ার কথা নয়, ঐ ঘরেই সুভাষবাবু দরজার দিকে মুখ করে বসে। একটু এগতেই যোগেনকে তিনি দেখে হাত তোলেন। যোগেন বোঝে, আর কাছে যাওয়ার চেষ্টাও ঠিক হবে না। সে দাঁড়িয়ে পড়ে, পেছন থেকে মনসুরকে টেনে সামনে আনে। তখনো সুভাষের দৃষ্টি সরে যায়নি। যোগেন আঙুল দিয়ে মনসুরকে দেখায়। মনসুর আদাব জানিয়ে ছিল, সুভাষবাবু চোখ বড় করে বলে ওঠেন, ‘ম-ন-সু-র’।
মনসুর সামনের লোকজনকে হাত-কনুই দিয়ে সরিয়ে এগিয়েই যায়। যোগেন এগয় না। যোগেন দেখে, মনসুর ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল।
তার পরই দেখে, সুভাষবাবু মনসুরের হাত ধরে আছেন আর মনসুর তাঁর কানে-কানে কী বলছে। শুনে, সুভাষবাবু ভুরুতে দাগ তুলে একটা কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। মনসুর আবার তার মুখ সুভাষবাবুর কানের কাছে নিয়ে কিছু বলতেই, সুভাষ তাঁর হাতে ধরা মনসুরের হাতটা ঝাঁকিয়ে ওঁর সেই উজ্জ্বল হাসিটা হেসে উঠলেন। মনসুর বেরিয়ে আসা শুরু করে।
বেরিয়ে আসার সময় খুব কিছু ঝামেলা হল না, সুভাষবাবুর এক ভাইঝি কিছুতেই মিষ্টি না খাইয়ে ছাড়ল না। ঐ ভিড়ের মধ্যে ডিশে দুটো রসগোল্লা, রস না-গড়িয়ে ও মেঝেতে না-ফেলে খাওয়ার ঝামেলা যোগেন মিটিয়ে ফেলে দুটো রসগোল্লাই একসঙ্গে মুখে পুরে গাল ফুলিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিয়ে।
মনসুর অবাক হয়ে পেছন থেকে যোগেনকে দেখে বলে, ‘ডিশটা নীচে রেখে যাব’। সে আধখানা রসগোল্লা চিবুতে চিবুতে ও দেড়খানা রসগোল্লা ডিশের ওপর গড়াতে-গড়াতে সিঁড়ি বেয়ে তাড়াতাড়ি যোগেনকে ধরতে, প্রায় ছোটে।
ডিশটা মনসুর বেরবার সিঁড়ির পাশেই রাখে রাস্তায় নেমে দু-জনেই একসঙ্গে হেসে ওঠে, যেন খুব মজা হল।
মনসুর বলে, ‘পারল্যাম না। কইয়্যা দিল্যাম। ছোট ইস্পাহানি প্রদেশ কংগ্রেসে সন্দেশের পাক বসাইছে’।
‘আপনার ব্যাখ্যাডাও কইলেন?’
‘আমি কি তোর নাগাল বেকুফরে। সে-সব তো কওয়া যায় রাজনৈতিক ডিসকাশনের টাইমে।’
