১৩৭. শাকিনা- যোগেন সাক্ষাৎ
এই সমাবেশের ভাষণগুলি থেকেই যোগেন ধীরে ধীরে বিষয়টি জানতে পারে, বুঝতে পারে। যদি সুভাষবাবু বারবার না বলে দিতেন তাহলে হয়ত আসত না। যোগেনের রাজনৈতিক উৎসাহ খুবই ছোট-ছোট বৃত্তে ভাগ করা। বৃত্তের বাইরে হয়ত বড় বৃত্ত আছে কিন্তু তেমন ছোট বৃত্ত আর বড় বৃত্ত কোনোটাই যোগেনের তৈরি করা নয়। রাজনীতি, এই প্রদেশের, তেমনি সারা দেশেরই, পাক খায় কয়েকটি মাত্র বিষয় ঘিরে। সেই কয়েকটি বিষয়ের বাইরে স্থানীয় ঘটনাও আসে কিন্তু সাধারণত সেইসব ঘটনা রাজনৈতিক হয়ে ওঠে না। বরিশালের সাতলাবিলের জল বের করতে খাল কাটার দরকার—এটা কে না জানে? কবে না জানে? এর মীমাংসাও তো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডেই হয়ে যেতে পারত—অনেক বছর আগেই হতে পারত, আইনসভা না-হলেও হতে পারত, চাইলে টাকাও জোগাড় হত। কিন্তু সাতলার খাল কাটা হলে লাভ সেখানকার চাষীদের। কাটা না-হওয়ায় ক্ষতি যা হওয়ার তাও সাতলারই কৃষকদের। কিন্তু তারা ক-জন? বড়জোর ৫০ ঘর। এই ৫০ ঘরের সবগুলো মানুষ মিলে অষ্টপ্রহর খাটলে সোনা ফলে। তারা কী করে জানবে কাকে মুরুব্বি ধরে কাকে বলতে হবে। সে যদি কেউ এটা মাথায় নেয়, তাহলে হতে পারে কিন্তু সকলের মাথা তো আর জগা পাগলার মত খারাপ হয়নি যে হাটে হাটে সাতলাবিলের দুঃখের গান গেয়ে বেড়াবে, সাতলাওলারা বরং এত প্রচার চায় না। এমনিতেই সাতলার বিলের ধানের দর বেশি। দুনিয়ার সব মানুষ জানে, সেই চালের গুণ আর সেই দরের গুণ। যা রটেছে, তা রটুক। আরো রটনার কাজ নেই। শিয়ালকে ভাঙা বেড়া দেখাতে নাই।
সব স্থানীয় সমস্যা তো এইরকমই—এগুলো থেকে রাজনীতির ফ্যাকড়া আর কী বেরবে। আর আছে—হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। আর আছে—সুভাষ বোস। আর আছে সরকার চালানো। এর বেশি রাজনীতি যোগেন শুনবে-জানবে কোথায়? যে-খবর কাগজে বেরয় না, আইনসভাতেও শোনা যায় না, যেমন এই ধাঙড় ধর্মঘটের খবর।
কিন্তু সমাবেশ থেকে ফিরে, সমাবেশে বসে-বসেই তার মনে হচ্ছিল—এখানে তো তার অনেক আগে আসা দরকার ছিল। এ সমাবেশটাই ছিল তার জাতের মানুষদের, শুদ্দুরদের। সেই শুদ্দুর, যারা হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী শূদ্রের কাজ করছে এই শাহেবদের রাজধানীতে। শাহেবদের ধর্মে শূদ্র নেই। শূদ্রদের ধর্মে শাহেব নেই। কিন্তু শাহেবদের এই এত বড় রাজধানী চলবে না, যদি ঐ ২০-৩০ হাজার শূদ্র না থাকে। শূদ্রকাজে নিযুক্ত শূদ্র, না থাকে। তারা যখন শূদ্রকাজে অধিকারী ও বংশানুক্রমে পারদর্শী, তখন সেই শূদ্রকাজের, সরকারি শূদ্রকাজের, দখল নেয়া তো তাদের হকের ব্যাপার। যোগেন তার চোখের চশমার পাওয়ার বাড়িয়ে ফেলল শুধু হিশেব কষতে যে সরকারি কাজে সাম্প্রদায়িক অনুপাত রক্ষা করা হচ্ছে কী না, অন্ততপক্ষে ১৫ শতাংশ সরকারি নিয়োগ শিডিউল জাতগুলো থেকেই ঘটছে কী না ও বিভিন্ন বিভাগে বড়কর্তাদের উচ্চবর্ণ সংস্কারে শূদ্রনিয়োগ কার্যত হয়ই না।
তার পাশাপাশি এদের কথা তো কোনোদিন ওঠেনি, এই বিশ-তিরিশ হাজার ধাঙড়দের কথা, যারা স্বাধিকারেই বলতে পারত আমাদের এই ডিপার্টমেন্টে শূদ্র ছাড়া কাউকে রাখা চলবে না। তেমন কথা এরা কোনোদিন বলেনি।
কথা হচ্ছিল শাকিনা বেগমের প্রাসাদের একতলা হলঘরে বসে পরদিন সকালে। শাকিনা হাসিতে ভেঙে পড়ল, যখন শুনল, আগের দিনের সমাবেশে মণ্ডল শ্রমিকদের সঙ্গে বসেছিল। যোগেন তাঁর ‘কেন?’ প্রশ্নের জবাব জানে না, ‘আমাদের ওপর এত্ত গুসসা কেন’, প্রশ্নেরও কোনো জবাব জুটল না জিভে।
যোগেন বলে বসল, আমি যদিও কর্পোরেশনে চাকরি করি না, তবু এই সত্যটা আর আমি লুকাব কেন যে আমি নমশূদ্র সম্প্রদায়ভুক্ত চাঁড়াল ও শাস্ত্রে আমাদের মেথরই বলা হয়ে আসছে। ‘তাহলে আমি তো হরতালি, তাহলে আমি আমার জাতভাই-কামদারির সঙ্গে বসব না কেন। হিন্দুশাস্ত্র আর ব্রিটিশ গবর্মেন্ট একমত হয়ে আমাকে আমার জায়গায় বসিয়ে দিয়েছেন। আমি বসে পড়েছি।
‘সে ভালই করেছেন। আমাদের একটু বলে গেলে পারতেন। তাহলে আমাদের আর দশদিকে লোক পাঠাতে হত না-আপনার খোঁজে। ১৫ নম্বরেও গিয়েছিল।’
‘সেডা আমি বুঝব্যার পারব ক্যা? আমারে তো কেউ জানানই নাই। আমি তো বাদাম খুইলতে-খুইলতে নিজ চক্ষুতে ঐ জমায়েত আবিষ্কার কইরল্যাম। আমি আমার জাতভাইগ পাইয়্যা ঐ হানেই বইস্যা পইড়ল্যাম। আপনারা আমারে খুঁইজ্যা পাইলেন না কারণ আমি আপনার জাতভাই না।’
শাকিনা তার বড় পাঞ্জা সহ বড় বড় আঙুল নাচিয়ে বলে, ‘আজ তো আমরা একটা অফেনসিভ ফেস করব বলে মনে হচ্ছে—’
‘খবর কিছু আইসছে?’
‘মাতাজি, আপনি কি এর আগে কোনো বরিশাইল্যার সঙ্গে কথা বলেছেন, না হলে ওটা তো আবার অনুবাদ করে দিতে হবে।’
‘আপনি কি আমাকে মণ্ডলজিকে চেনাবেন? আমরা কর্পোরেশনে কলিগ। উনি কি আমাকে ভুলে যাবেন? দুজনে জিতেছিও রিজার্ভ সিটে। আমরা জানি ‘আমরা এক গোয়ালের গরু’। আপনি কী বললেন, মণ্ডলজির কি ভাষা কি জায়গা নিয়ে? বরি…, বরি…’
‘ওটা একটা মজার কথা হচ্ছিল। আপনাদের মধ্যে কথা হওয়াটা খুব দরকার’। নীহারেন্দু বলেন।
‘সে-কথা কি বাসি হয়ে যাবে? আমিও আছি। মণ্ডলজিও আছেন। কথাও আছে। কিন্তু আপনি কী বললেন, নীহারজি, আমি বি বাংলা বুঝি না, কিছু গড়বড় করেছি?’
‘আরে না। ওটা একটা ঠাট্টা। মণ্ডলের দেশ বরিশাল। ওদের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা কেউ বোঝে না। কিন্তু বরিশালের লোক বরিশালি ছাড়া কোনো ভাষায় কথা বলে না। তাই মণ্ডলের পেছনে লাগছিলাম—আপনি বরিশাইল্যাতে এক্সপোজড কী না জানতে।’
‘এত অসুবিধা হবে? তাহলে উনি যে অ্যাসেম্বলিতে আছেন?’
‘হ্যাঁ। তাতে অসুবিধে কী?’
‘সেখানে কথা বলতে হয়, বুঝতে হয় তো! তাঁরা কী ভাষায় শোনেন, মণ্ডলজি কী ভাষায় বলেন?’
‘আরে, আইনসভায় সব লোকই তো বরিশাইল্যা। ওদের ওদের মধ্যে কথা হয়ে যায়। হকশাহেবও বরিশাইল্যা। হোম মিনিস্টার নাজিমুদ্দিনও হাফ্ বরিশাইল্যা, হাসেম আলি শাহেব বরিশাইল্যা। সুতরাং অসুবিধা নেই। আমি আছি। আপনারা কথা শুরু করুন।’
যোগেন বলে, ‘হ। এরা তো বিলাত থিক্যা উকিল হইয়া আসছে। দ্যাহেন না হাইকোর্টের বার লাইব্রেরিতে আলাদা গোয়াল—শুধু দুষ্ট বলদদের লাইগ্যা, যারা বিলাত থিক্যা আইন পাশ। আপনে আর আমি দুইজনেই তো আইনশিক্ষার কাশীধাম ক্যালকাটা ল-কলেজের পাশ উকিল। তাই হিংসা—’
শাকিনা হাততালি দিয়ে উঠল, ‘এটা তো আমার জানা ছিল না যে আপনিও অ্যাডভোকেট। ঠিক বলেছেন। নীহারজির হিংসা হিংসা। আপনি তো বরিশাইল্যাতেই বললেন। আমি তো প্রত্যেকটা কথা বুঝলাম। তবে? আপনি বলুন।’
‘আমাকে সুভাষচন্দ্র বোস বলছিলেন আপনার লগে দেখা কইর্যা এই স্ট্রাইকটাতে নাক গলাইব্যার।’
‘নাক গলাইব্যার? মানেটা কী হল। যতটা জানি সুভাষজি তো আমাদের স্ট্রাইক পছন্দ করছেন। তবে সেটা অনেক আগের কথা। এর আগেও একবার আমরা প্রায় স্ট্রাইকে যাচ্ছিলাম। সুভাষবাবুই একটা মিটমাট করে দিলেন। কিন্তু ওরা, মানে, কর্পোরেশন কোনো কাজই করল না। এখন সুভাষবাবু কি স্ট্রাইকের পক্ষে আছেন, না বিপক্ষে তা আমি জানি না। এর মধ্যে তো ওঁদের পলিটিক্স অনেক বদলে গেল। আপনাকে যে সুভাষবাবু আমার কাছে পাঠালেন তার মানে কি এই যে তিনি আমাদের পক্ষে দাঁড়াতে চান নাকী আমাদের এই স্ট্রাইকে কোনো মিটমাট চান নাকী উনি এটা অপোজ করতে চান? আপনাকে যে উনি পাঠালেন আমার কাছে—সেটার কারণটা কী?’
যোগেন তৈরি ছিল না—শাকিনা এত গোপন কথা এত সোজা বলবে। কলকাতার ট্রেড ইউনিয়নেই তো যোগেনের একটু-আধটু আড্ডা, আর আইনসভায়। সেখানে তো যে-কথাটা বলা হল তার ভিতর খোঁড়া চলে, কোন্ কথাটা বলা হল না। যোগেন মনে-মনে তৈরি হয়েই বলল, ‘আপনার এই কথাডার জবাব দেয়ার ক্ষ্যামতা আমার নাই। জ্ঞানের দিক দিয়া তো নাইই। সুবিধার দিক দিয়াও নাই। সুভাষবাবু এত বড় নেতা যে তিনি আমাকে দিয়্যা তাঁর কোন্ উদ্দেশ্য সিদ্ধ কইরবেন, তার আন্দাজ আমি পাব। আমি ওঁর পার্টির লোক না। আমি কংগ্রেসের লোক না। মনে হয় না যে ওঁর কোনো রাজনীতির উদ্দেশ্যে উনি আমাকে আপনার সঙ্গে দেখা কইরতে পাঠাইছেন। আমি জাতিতে নমশূদ্র, যাদের মুখের কথায় চাড়াল ডাকা হয়। এখন শিডিউল হয়ে যাওয়ার পর নিম্নবর্ণদের মধ্যে যে কত ভাগ আছে, তা বোঝা যায় না। আমার যা কিছু পলিটিক্স সবই নমশূদ্রগর নিয়্যা, বলতে পারেন শিডিউলদের নিয়্যা। আর প্রধানত হিন্দুগ বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিপক্ষে বা শাহেবদের বিরুদ্ধে আমি কখনো কিছু বলি নাই। সেটাকে যদি আমার রাজনীতির মধ্যে ধরব্যার চান ধরতে পারেন। সুভাষবাবুর সঙ্গে এ নিয়ে কথা হইছে কিন্তু ওনারে জানাইব্যাব উদ্দেশ্যে যে আমারে কিছু ভুল না ভাবেন। তবে সে কথা হইছে হিন্দু-মুসলমান নিয়্যা। শাহেবগ নিয়্যা না। কথা হইতে কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু যে-মানুষড়া শাহেবগ জেলখানার ভাত খাইয়্যা আর মার খাইয়্যা এতগুলা বছর বাঁইচ্যা আছে, তার লগে এমন কথা তুইলতে ক্যামন লজ্জা করল। তবে কব একদিন। আপনারে আজই কই। তাও শাহেবসুবা আছে বইল্যা আমরা শুদ্দুররা নিম্নশ্রেণীর মানুষরা একটু-আধটু নালিশ জানাইবার জায়গা পাই, বিচারও পাই কুনো-কুনো সময়। তাই আমি স্বাধীনতা-টাধিনতার কথাবার্তায় যাই না। আমার একমাত্র কাজ শূদ্রগ লগে সুবিধা আদায়। যাতে চাকরি পায়। যাতে লেখাপড়া শিখ্যা সমাজের নীচ অবস্থাটা বদলাইতে পারে। আর-একডা কথা। ধরেন, সত্তর-আশি বছর আগে আমাগ বলা হইত ধাঙড়-মেথর। গাইল হিশাবে না। কাম হিশাবে। তাই আমার এড্ডা ভাই-ভাই ভাব হইল আপনাগ জমায়েৎ দেইখ্যা। আমি হরতালি হইয়্যা বইস্যা গল্যাম। থাউক, আপনার তো এতডা কর্মাভাব নাই যে আমার জীবনীও আমার জাইতের জীবনী আপনারে শুইনতে হব। এসবই কইল্যাম টু জাস্টিফাই মিসেল্ফ অ্যান্ড দি পার্সন হু সেন্ট মি হিয়ার
শাকিনা আর দত্তমজুমদার দুজনেই খুব মন দিয়ে যোগেনের কথাগুলি শুনছিল। যোগেনের কথার মধ্যেই একজন এসে বসল—সে-ও শুনছিল, সে-ও কোনো কথা বলেনি। তাতে অবিশ্যি খুব নৈঃশব্দ্য এই বাড়িটাতে তৈরি হয়েছিল তা না। মাঝেমধ্যে এক-একটা ছোটখাটো দল ঢুকছিল। ওঁরা যেখানে বসেছিলেন, তার মাথার ওপর দিয়েই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। যারা আসছিল তারা ওঁদের দিকে একপলকও না তাকিয়ে সোজা ওপরে উঠে যাচ্ছিল। কালকের জমায়েত দেখা বলে যোগেন বুঝতে পারছিল এরা সকলেই হরতালি ধাঙড়-মেথর। একটি মেয়ে দরজা দিয়ে ঢুকে চোখ নামিয়ে ধীর পায়ে ওপরের সিঁড়ির দিকে বেঁকল। একটা শাদা শাড়ির ওপর জরির কাজের রং, মেয়েটির শাড়িটি সামনে আঁচল দিয়ে পরা। যোগেনের মনে হল, ছবিতেই এক এত সুন্দর কাউকে দেখা যায়। ওর ওঠার সময়টুকু সিঁড়িতে কেউ ছিল না। শাকিনা বেশ মুগ্ধ হয়ে বলল, ‘বাঃ, আপনি তো আমাদের লোক। নীহারজি কী বলছিলেন বরি…। সুভাষবাবুর নামের দরকার ছিল না, আপনি তো নিজের নামেই আসতে পারতেন। আমি বুঝেছি, সুভাষবাবু আপনাকেই কেন পাঠিয়েছেন। এমন কাউকে পাঠাতে চাননি যেখান থেকে রাজনীতির জাল বেরবে। আমরা আজ সকাল থেকে অপেক্ষায় আছি—কখন কমিশনারের নোটিশ আসবে যে এটা ইমারজেন্সি সার্ভিস, এখানে স্ট্রাইক করা চলবে না, এখনই যে যার কাজে জয়েন করো।’
‘কেন? সেরকম কোনো সংকেত কি পান?’
‘কী যে বলেন মণ্ডলজি। একনম্বর কর্পোরেশনই জানে না মোট ধাঙড়-মেথর তাদের কত। আমরাও ঠিক জানি না। আমরা অনেক দিন খোঁজখবর লাগিয়ে ২০,০০০ পর্যন্ত পেয়েছি। সেই খোঁজখবরের কোনো অসুবিধে নেই। সবাইই তো কর্পোরেশনের বস্তিতে থাকে। সুতরাং বাড়ি-বাড়ি ঘুরে সেনসাস করলেই তো মোট কত তা বেরিয়ে আসবে।’
‘সেটা আপনাগ আগে কেউ করে নাই?’
‘কেন করবে? কার দায়? এরা তো সব পার্মানেন্ট কনট্রাকচুয়্যাল লেবার। স্থায়ী মানে কিন্তু একটা লোকের চাকরি স্থায়ী তা নয়। কনট্রাক্টটা স্থায়ী। মানে কর্পোরেশন এই কাজটা এভাবেই করবে। কনট্রাকটারও স্থায়ী নয়। পদ্ধতিটা স্থায়ী।’
‘কর্পোরেশনের কোনো দায় নেই এই এত লোকের ব্যাপারে?’
‘আছে। অ্যাকোমোডেশন, ওয়াটার সাপ্লাই, লাইট, ইউনিফর্ম আর দরকারি ব্লিচিং পাউডার, তেমন কাজের জন্য গ্লাভস আর হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা সু, গ্যাস মাস্ক আরো এ-রকম কিছু ননসেন্স। এর মধ্যে প্রথম তিনটি হয়। হয় মানে আছে, তাই আছে। ধাঙড় বস্তি, মেথর বস্তি, ডোম বস্তি আছে, আলাদা-আলাদা। সেটা এদের নিজেদের সাবকাস্ট পার্থক্যের জন্য।
‘এটা আমারে আর বুঝ্যায়্যা বলার চেষ্টায় যাবেন না। আমাগ নমশুদ্দুরগ সবাই নমশুদ্দুরই জানে। কিন্তু মোট মানুষের সংখ্যাডা কত? ব্রিটিশ ভারতের পূর্বাঞ্চলে সব থিক্যা সেকেন্ড বড় জাইত। ফার্স্ট হইল রাজবংশী। এডা তো যে-কোনো লোকেই বুঝে যে এমন কোটি-কোটি মানুষের একটাই পেশা হওয়া সম্ভব না। পেশা যদি এক কইরতে হয় তাইলে জাতটারে ছোট রাখার লাগে। বামুনরা যেমন রাখছে।
‘এটা তো আমার বোঝা হল না—’
‘কী? কোটা’, নীহারেন্দু জিজ্ঞাসা করেন।
‘ঐ বামুন ছোট শূদ্র বড়—বললেন মণ্ডলজি?’
‘শাকিনা, ওটা তোমার এখনই না বুঝলেও চলবে।’ নীহারেন্দু যোগেনকে বলেন, ‘নিন, বোঝান, হিন্দু জাতিভেদ, এদিকে শিয়রে শমন।’
যোগেন অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ‘এমন কিছু না। ধরেন, আমরা শূদ্র পপুলেশন ভারতে, যদি একটু ব্রডলি, অ্যান্ড স্ট্রিক্টলি ধরেন তাহলে কিন্তু প্রায় ১০ কোটি হব। এখন কোনো উচ্চবর্ণের হিন্দুকে যদি জিগান, তাইলে উনি কবেন, কী আবার করবে, ধাঙড়-মেথর-ডোম-কসাই-চামার কাজের কি আর অভাব আছে না কী। কিন্তু আপনি তো নিজেই বোঝেন ১০ কোটি ধাঙড়-মেথর যদি লাগে তাইলে তাগ সেবা নিব্যার সংখ্যা তো হতে হয় ৬০ কোটি-৭০ কোটি।’
‘হাউ কাম, মণ্ডলজি?’
‘আমি কইতেছিলাম সিস্টেমটাই এমন যে, ধরেন, আপনে তো কইলেন কর্পোরেশনের ধাঙড় ২০,০০০-এর বেশির থিক্যা কম হব না। কিন্তু যদি আপনে জিগান–ধাঙড়দের কামডা কী, তহন শুইনবেন, স্ক্যাভেনজিং, তারপরেও যদি জিগ্যান, স্ক্যাভেঞ্জিং বলতে কী কাম বোঝায়, তালি শুইনবেন—ধাঙড়-মেথরগ যা কাজ। তেমনি আমাগ বেলাতেও, শুইনবেন, শুদ্দুর। জিগান, শুদ্দুরগ কামডা কী? তহন শুইনবেন লোয়ার কাস্ট। তারও পরে যদি জিগ্যান লোয়ার মানে তো একডা কিছু হায়ার আছে, তার তুলনায়, সেডা কী? তহন শুইনবেন—হায়ার কাস্ট। তহন যদি জিগান এগ মইধ্যে মিলডা কী যে তুলনা হইব? কাস্ট মানেডা কি জাত? তহন কইব যে যেহানে জন্মায়। আরে, জন্মাইল তো একবার, তারপর যে যে-কাজই করুক সে শুদ্দুরই থাইকব। ধরেন, আমাগ মইধ্যে একডা বড় অংশ বিলে চাষ করে, পূর্ববঙ্গের বিলে। হাজার-হাজার। ঐ জমিতে যে চাষ হব্যার পারে সে কথাডাও তো কেউ ভাবে নাই। ধরেন, আমাগ মইধ্যে বিরাট একডা পপুলেশন কৈবর্ত, মানে মাছ ধরে, সারা বছছর, হাজারে-হাজারে। আর-একডা বড় পপুলেশন চাষের কাম করে হাজারে-হাজারে। ঐ টেনান্সি বিলের সুবাদে টেনান্ট, রাইয়ত, আন্ডার রাইয়ত এইসব শব্দ তৈরি হইছে। কেউ ভূমিদাস, কারো দু-এক ছটাক জমি আছে কী, নাই। মানে, কইতেছিলাম, একডা প্যারাসাইট সিস্টেম এমন প্যারাসাইট যে কী খাইয়্যা যে প্যারাসাইট হইয়্যা আছে, তাও জানে না। তহন কয়, কালচারাল সুপিরিয়রিটি অব দি কাস্ট হিন্দুস। সেডা বস্তুডা কী? ভাজে না খায়?’
যোগেন থামার পর শাকিনা তার বাঁ হাতটার কনুই হাঁটুর ওপর রেখে আঙুলগুলো কপালে ছোঁয়ায়। যোগেন সেই ভঙ্গিটা দেখে এত মুগ্ধ হয়ে যায় যে থেমে যায়। তার দৈনিক জীবনে তো হামেশা এই ভঙ্গি তৈরি হয় না। যোগেন বলছিল তাদের জীবনের কথা, বেঁচে থাকার কথা, একটা পরগাছা ব্যবস্থার কথা, তাদের জীবনের এক বংশানুক্রমিক দাসত্বের কথা এ-কথাগুলোর মধ্যে যোগেনদের সারাটা জীবন ছড়ানো। এ-কথাগুলো এত বেশি করে যোগেনদের যে সেখানে কোনো অজানিতের চমক ঘটে না। অনেক সময় যে শোনে, সে কোনো একটা কিছুতে অজানিত পেয়ে যেতে পারে, যদি তার এই জীবনের কিছুই দেখা না থাকে। কিন্তু এই যে একটি খাড়া মেয়ে বসে তার হাঁটুর ওপর কনুই রেখে, আঙুলগুলো নিজেরই কপালে বুলচ্ছে—এটা যোগেনের জীবনের কোনো টুকরো তো নয়—নিরবধি জীবনেরও নয়, জীবনের একটা দিনেরও নয়। এমন অজানিতের সামনে পড়ে যোগেনের কথা গুলিয়ে গেল ও সে আচমকা থেমে গেল। নীহারেন্দুবাবু বা শাকিনাও বোঝেনি, সে থেমে গেছে।
‘মণ্ডলজি, আপনি তো ঐ সমাজের মানুষ। এই কষ্টটার মধ্যে তো আপনি বড় হয়েছেন আমার তো তা না। আমি তো ইনডিয়ানই না। বাই বার্থ ইরানিয়ান। বাবার অবস্থা ভাল ছিল অ্যান্ড হি ওয়াজ টুলি এ রেভেলিউশনারি ফর দি কজ অব ডেমোক্রেসি ইন ইরান। হি ওয়াজ কমপেল্ড টু লিভ ইরান। এই কলকাতা থেকে প্রত্যেক সপ্তাহে কাগজ ছেপে ইরানে পাঠাতেন। আমি বাবাকে দেখে ভাবতাম, বাবার কতটা ভালবাসা ইরানের জন্য। নো, ইট ওয়াজ নট হোমসিকনেস। সামথিং নব্লার। ইরানের মানুষ নিজেকে ফ্রি ভাববে, স্বাধীন ভাববে, নিজের মত ভাবতে পারবে, নিজের মত কাজ করতে পারবে—এগুলা আমার বাবার কাছে জ্যান্ত ছিল। আমার তো তা নয়। আমি তো ঐ দুনিয়ায় জন্মাইনি। আমার খুব ভাল শাদি হল। সেরকমই তো হবে। অন্যরকম আর কী হবে? কিন্তু যেদিন আমি বুঝলাম শাদি আমাকে আমার মত ভাবতে দেয় না, আমার মত কাজ করতে দেয় না, নিজেকে ফ্রি ভাবতে দেয় না—আমার বাবার মতই আমি দেশ ছেড়ে দিলাম। শাদি তো একটা দেশ। শাদি ছেড়ে দিলাম। কিন্তু এই পর্যন্ত আর এরপরও এটা তো আমার নিজের কথা। আমি জানতাম না মণ্ডলজি, আমার বাবার মধ্যে যে ইরানের মানুষের গণতন্ত্রের দরকারটা তাঁর নিজের ক্ষিদে কী ঘুম পাওয়ার মত শারীরিক ব্যাপার ছিল, আমার শরীরের ভিতরে সেই কষ্টটাই আমি পেতাম। কিন্তু আমার তো বাবার মত জন্মসূত্রে পাওয়া কোনো ভালবাসার টান ছিল না। ভালবাসার টান যেন শরীরের টান। কিন্তু অন্য একটা মানুষের জন্য না। সেই কষ্ট থেকে আমি ধাঙড়দের কাছে পৌঁছে গেলাম। আমি এইসব ইউনিয়ন করব, কখনো ভাবিনি। কত বছর ধরে বেশি রাতে, বেশি সকালে আমি ধাঙড়দের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কাজ দেখতাম। ওরা কিছু মনে করত না। ওরা নিজেরা মনের দিকে এত স্বাধীন, বরং, সম্পূর্ণ, যে কাউকে কোনো কারণে সন্দেহ করার কোনো দরকারই হত না। আমার মনে হত—ওরা সকলেই এক-একজন সন্ত্। ওরা সন্তের কাজটুকুই করছে। আপনি কিন্তু ভাববেন না, এটা কোনো ধর্মের ভাব থেকে এসেছিল। কিন্তু যদি আমি সত্য কথা বলি, তাহলে বলব, আমি তো ইরানের, ইরানে সুফিদের একটা পুরনো ধারা ছিল। বাবা, তাঁর বেআইনি কাগজে আঠা লাগাতে-লাগাতে, ঐরকম একটা কঠিন রাজনীতির মধ্যে, বিপদের মধ্যে যে-গানটা গুনগুন করতেন, তার সুরটা তো আমার কানের ভিতরে পোঁতা ছিল। পরে বড় হয়ে দেখি ওটা সুফিদের গান। আমি যে ওদের রাতদিনের কাজের সময় ওদের কাছে থাকতাম আর ওদের সন্ত্ ভাবতাম, তার ভিতর সুফি টানও থাকতে পারে একটা, কিন্তু ধর্মের কোনো ব্যাপার ছিল না। তারপর যা ঘটার ঘটল সব। কিন্তু আপনাকে যে এই গল্পটা বললাম তারও একটা কারণ আমি বুঝতে পারছি। যখন আমি ধাঙড়দের আবিষ্কার করলাম আমার দেশ বলে আর ওদের সঙ্গে জুড়ে গেলাম, তখন রাতদিন আমার বাবাকে বলতাম, মনে মনে, বাবা তো তার অনেক আগেই চলে গেছেন, বলতাম, বাবা, তুমি তো একটা দেশ পেয়েছিলে জন্মসূত্রে, আমি আমার দেশ আবিষ্কার করেছি। আপনি একজন মানুষ এলেন, যিনি ঐ শূদ্র সমাজেরই মানুষ। আপনি জন্মে শূদ্র। তারপর আপনি খুব কষ্ট করেই হয়ত লেখাপড়া শিখেছেন। তারপরও আপনি শূদ্রই থেকেছেন, আপনার নিজের ইচ্ছেতে, আপনি শূদ্রদের আবিষ্কার করে যাচ্ছেন, আবিষ্কার করতে চান, নিজেকে তাদের প্রতিনিধি সাজাননি, তাদেরকে আপনার প্রতিনিধিত্ব দিয়েছেন। তারা নিজেরাই নিজেদের মুখতিয়ার’।
নীহারেন্দুবাবু বলে উঠলেন, ‘আমার যে এমন ভাগ্য হবে তা ভাবতেই পারি না। শাকিনার কথা তো সবাই জানি কিন্তু ও যেভাবে বলল, সেভাবে তো কখনো ভাবিনি। যোগেনবাবু তো বন্ধু মানুষ। বন্ধু হলে তো বন্ধুকে মানুষ বেশি চেনে। আমাদের বেলায়—বন্ধু হয়ে গেলেই তাকে আর চেনা দরকার নেই। সে তো আমারই মত। আপনাদের কথা থেকে কিন্তু আমার চোখ খুলল। জানি না, আমাদের সমাজসংসার সে চোখ এমন করে খোলা রাখতে দেবে কী না। সম্ভবত দেবে না। কিন্তু আমি তো আপনাদের দুজনের এই আলাপটা ভুলতে পারব না। চোখ বন্ধ হয়ে গেলেও ভাবতে পারব না, চোখ খোলা আছে।’
যোগেন বলে ওঠে, ‘আপনাদের দুজনের কারো কথাই যে আমি বুঝতে পারলাম, তা না। এসব কথা তো, ঐ যে কইলেন না, সুফি গানের সুর, সেই সুরের লাগান। অনেক পরে বোঝা যায় সুরটা কানে রোয়া আছে। কিন্তু এডা আমি বুঝি—আমি শুদ্দুরগ নেতাও না, গুরুও না। আমার সেই বড় গুণ নাই। আমি বড় ছোট-ছোট কাজে ফাঁইস্যা থাইকতে পছন্দ করি। ধরেন, চাকরি বাড়ানো। আমাগ ছেলেরা তো আর কথায়-কথায় জজ-ম্যাজিস্টেট হব না। কিন্তু খালাসি তো হইতে পারে, রেলের গ্যাংম্যান তো হইতে পারে। আমি শুধু এইটুক চাই, যে চাকরিডা তার প্রাপ্য সেইডা য্যান সে পায়। লাঠিঅলা সেপাইয়ের কামে জয়েন কইরতে গেল, বিহারী বন্দুকওয়ালা বামুন সেপাইরা তাকে তাড়াইয়্যা দ্যায়। ক্যান? না, ঐ পুলিশ লাইনের রান্নাঘরের খুপরি আছে তো লাইনবাঁধা। সেইখানে তো ঐ শূদ্রকেও রান্না করতে হব। তাইলে বামুন জাইত মারা যাইব। অ্যাসেমব্লিতে সেই কথা নিয়্যা চেঁচামেচি। শ্যাষে রেফার করা হইল সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপ্যালরে। তিনি কইয়্যা দিলেন দেয়াল থাইকলে জাত যায় না আর বাইরের দিকে একডা ফুটা কইর্যা দিলে তো কথাই নাই। প্রাইমারি স্কুল যদি একডা-দুডা কইর্যা বাড়ানো যায়। দুডা-একডা প্রাইমারি স্কুলরে যদি মডেল স্কুল করা যায়। কইলকাতায় যারা পইড়তে আসব তাগ একডা হস্টেল চাই। দ্যাহেন, কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড শুদ্দুরগ একডা ভিজিবিলিটি দিছে, অ্যাহন এদিক-ওদিক চাওয়াচাওয়ি কইরলে দুডা-একডা চাঁড়াল দেখা যায়—এই ইউনিয়ন বোর্ডে, এই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে, এই ঋণ সালিশি বোর্ডে, এই মিউনিসিপ্যালিটিতে। সেই সুযোগডা নিয়্যা নিজেরে দেখাইব্যার চাই, এই যে স্যার, আমরাও আছি।’
শাকিনা হঠাৎ বেশ জোরেই বলে ওঠে, ‘একেবারে ঠিক। ইউনিয়ন তো হল সেখান থেকেই। আমি যখন বললাম, ইউনিয়ন কর, এই নীহারজি, বঙ্কিমদা এরাই সব বুদ্ধি দিলেন। ওদের বলতেই ওরা বলে, ‘বানাও’। ব্যস, তারপর দুই হাত মাথার ওপর তুলে চলে গেল। নেশার তো আর শেষ নেই। রাতদিনই নেশা। চুন্নু। শিসা মেশানো। আমি একদিন আইন জারি করলাম—যখন কাজের কথা হবে তখন নারাজদের হাজির থাকতে হবে, যারা সবকিছুতেই নারাজ। একদিন আমি বলে ফেললাম, ‘আচ্ছা, ধরো তুমি অন্ধকার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছ, অন্ধকারে তোমাকে দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় একটা লোক বড় একটা করাত কাঁধে তোমার উলটোদিক থেকে তোমার দিকে আসছে। সে-ও তোমাকে দেখতে পাচ্ছে না, তুমিও তাকে দেখতে পাচ্ছ না। লাগল দুজনের মুখোমুখি ধাক্কা। ঐ লোকটার হাতে তো করাত ছিল। ওর করাতটা তোমাকে দু-ফালা করে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে গেল। তখন তুমি কী করবে?’ একজন বলল, কী আর করব, ও তো দেখতে পায়নি, বেচারা। দুফালি হয়ে পড়ে থাকব—সকালে সাফাইয়ের গাড়ি না-আসা পর্যন্ত। তারপর ডাম্প হয়ে যাব।’ আর-একজন বলল, ‘এত তকলিফ কীসের? ফালিদুটো জোড়া লাগিয়ে আবার হাঁটব।’ আমি বললাম, ‘তার চাইতে নিজেকে যদি দেখাতে পারতে, তাহলে তো লোকটার সঙ্গে তোমার ধাক্কাই লাগত না।’ একজন জিগগেস করল, ‘কী, হর্ন লাগবে, সাফাই গাড়ির মত, প্যাক প্যাক। তাহলে তো কুকুরগুলো আবার তাড়া করবে। নাঃ, হর্ন বাতিল।’ এরপরও একজন বলল, ‘ঐ যে হাইড্রান্টে নামার সময় ডেনজার দেয়া লাল লণ্ঠন থাকার কথা, সেটা তো থাকে না’। কেন থাকে না? জিগগেস করায় একজন বলল, ‘ডেনজার না হলে, বেকার কেন লন্ঠন জ্বলবে?’ আর-একজন বলল, ‘আরে, ওর কেরাসিন তো ঠিকদার বেচে দেয়’। তখন আমার রাগ উঠেছে খুব। আমি খুব ঠান্ডা গলায় বললাম, ‘তোমরা কেউ সবচেয়ে সহজ উপায়টাই বললে না, কেরাসিনও লাগবে না, হর্নও লাগবে না, কুকুরও আসবে না, করাতও আসবে না।’ তার প্রতিক্রিয়া হল, এরকম আজব চিজ কী হতে পারে? একটু গুঞ্জনও উঠল, আলোচনার। শেষে আমি আর ধৈর্য রাখতে না পেরে বলে উঠলাম, ‘নিজেদের ভূত বানাও। সঙ্গে-সঙ্গে সবাই একমত হয়ে গেল, জরুর, ভূত বনে যাওয়া তো খুবই সোজা, ভূত হওয়ার আগে শুধু একটু মরে নিতে হবে। ব্যস, মর গ্যয়া? আব বন যাও ভূত।’ কিন্তু যাদের সঙ্গে ডেনজার হতে পারে তাদের কী করে দেখানো যাবে সে আদমি না, সে ভূত? জবাবটা আমি দিলাম, ‘ভূত কাউকে দেখতে পায় না। কিন্তু ভূতকে সবাই দেখতে পায়।’ ব্যস হয়ে গেল ইউনিয়ন।
নীহারেন্দুবাবু বললেন, ‘এটাও কিন্তু আমার প্রথম শোনা মানে এত গল্প করে শোনা। আপনি যে একটা অলৌকিক কাজ করছেন, এটা তো তখনো রটেছিল, এখন তো সবাই দেখছে।’
‘কী দেখছে নীহারজি? বিশ হাজার ভুত?’
‘ভূত যদি বিশ হাজার হয় আর এককাট্টা হয় না-দেখে উপায়?’
‘মণ্ডলজি যখন এসেই গেছেন, উনি বোধহয় সাহায্য করতে পারবেন। সুভাষবাবুকে বলে একটা বুদ্ধিও বের করতে পারবেন। আমরা সরাসরি যুক্ত থাকলাম না।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ। যোগেনবাবুকে বলা যাবে না কেন? আর উনি তো কর্পোরেশনে চেনা ভূত না, সুতরাং কাজেও লাগতে পারেন। বলুন।
‘আপনি বলুন। আমি বললে এলোমেলো হবে।’
‘শুনুন যোগেনবাবু। আপনি তো ডিম্যান্ডগুলো দেখেছেন—’
‘হ্যাঁ। ঐ তো চাকরি পার্মানেন্ট, বোনাস, ইউনিফর্ম, সেফটি–-’
‘হ্যাঁ। কিন্তু কর্পোরেশন যদি রাজি হয়ে যায়, সব ডিম্যান্ডই মানছি, তাহলে আমাদের মুশকিল। কনট্রাকটারের কাছে যে লিস্টি আছে তাতে এদের ঠাকুরদাদের নাম আছে। সেদিক থেকে আমাদের কোনো লিগ্যাল স্ট্যাটাস নেই। কিন্তু এটা তো কর্পোরেশন কনট্রাকটারদের বলতেই পারে, তাদের একটা আপডেটেড লিস্ট দিতে হবে, ওয়ার্কারের নাম-ঠিকানাসহ। এই দাবিটুকু মানতে কর্পোরেশনের কোনো খরচ নেই। ওয়ার্কাররাও এতে মাথা ঘামাবে না। কিন্তু আমার মতে এটাই ভবিষ্যতে সবচেয়ে কাজে লাগবে। অন্তত এনলিস্টমেন্টটা থাকল।
‘আমি আপনার সঙ্গে একমত’।
‘বোনাসের কথাটায় পরে আসছি। ইউনিফর্ম, গ্লাভস, গামবুট এগুলোতে আমাদের অসুবিধে হচ্ছে–হয়ত কখনো কাউকে দিয়েছে কিন্তু তারা তো সঙ্গে-সঙ্গে বেচে দিয়েছে। আরো অনেকে হয়ত পেয়েছে বলে টিপসই দিয়ে দিয়েছে কনট্রাক্টারকে, বদলে, টোট্যাল প্রাইসের ওয়ান ফোর্থ নগদ নিয়েছে। ইউনিফর্মের ব্যাপারে গড়বড় আছে। কর্পোরেশনে নাকী সিদ্ধান্ত হয়েছে—খদ্দরের ইউনিফর্ম দেয়া হবে। এটা তো কর্পোরেশনের খরচা। অর্ডার দেয়া হয়েছে খুব নামকরা নেতার দোকানে, ফর্টি ফাইভ পার্সেন্ট অ্যাডভান্স। কনট্রাক্টার বলছে, সে যখনই খোঁজ করতে যায়, দোকানের লোকজন সেই খাদির দোকানের ম্যানেজার-নেতাকে বলতে বলে। বাবুকে বলার সাধ্য এই কনট্রাক্টারের নেই। তাছাড়া, দোকানটা তো ট্রাস্টি বোর্ডের। কিন্তু উনি এটাকে প্রাইভেট অর্গানাইজেশনই করে রেখেছেন। আমার মনে হয় না, এখন যে অবস্থা তাতে ওঁকে কেউ ঘাঁটাতে চাইবে। এখন তো সোনায় সোহাগা। বিপিসিসি কিছু বললে সে বলবে আমি এআইসিসি, এআইসিসি কিছু বললে বলবে, আমি বিপিসিসি। তাছাড়া, এআইসিসি অডিটটডিট নিয়ে ঝামেলা পাকাচ্ছে। এইবার আসল কথাটা বলছি যেটা চার্টার অব ডিমান্ডে নেই। সেটা হচ্ছে গ্র্যাফট। কর্পোরেশনের ধাঙড়দের কাছ থেকে তোলা আদায়। ক্যাশ পেমেন্ট। কনট্রাকটার যখন পেমেন্ট করে তখন সে বলে—বিলিং সেকশন থেকে শুরু করে ক্যাশ সেকশন পর্যন্ত প্রতি টেবিলে পার ওয়ার্কার যদি পাঁচ টাকা করে না দেয়া যায়, তাহলে কোনো বিল পাশও হবে না, পেমেন্টও হবে না। ওয়ার্কাররা জানেই না তাদের মাইনে কত, আরো সব পাওনা কী। সেটা বুঝতে পারে যখন দেখে মাস চলে না। তখন বললে, জিনিশপত্রের দামের কথা বলা হয়। সেটাও তো ঠিক। ইউনিয়ন হওয়ার পর শাকিনা এটাকেই প্রধান বিষয় করে তুলেছে। ওয়ার্কাররা এটা বুঝেছে। সেটাই ২০,০০০ শ্রমিকের এক হতে পারার প্রধান কারণ। এটা একেবারে বন্ধ হলে তো কর্পোরেশনই উঠে যাবে। কিন্তু একটা ব্যবস্থা যদি করা যায় যে কনট্রাকটারের সঙ্গে অ্যাকাউনট্যান্ট বসে মোট বিলের অ্যামাউন্টের ওপর একটা তোলা ফান্ড তৈরি করুক। ওয়ার্কার ও অফিলাররা নিজেদের টাকা ভাগ করে নেবে।
যোগেন বলে, ‘এ তো ছোটকাল থিক্যা শুইন্যা আসছি, ধান কাটা তোলা ঝাড়াই বাছাইয়ের পর চাষা খালি ধামা নিয়্যা বাড়ি ফেরে। বাজে আদায় আর আবওয়াবেই যায় সব। জমিদারের মাইয়্যার বিয়্যা আর মায়ের শ্রাদ্ধে তো কথাই নাই, গোবর যদি পাতলা হয়, তারজন্যও আবওয়াব দিতে হয়। আমার নিকট শোষণের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত এইডাই। আর শাসনের চূড়ান্ত উদাহরণ বামুনদের বা কায়েত-বৈদ্যদের ব্যবহার শুদ্দুরদের সঙ্গে। আইজ আবার নতুন দিগদর্শন হইল—ধাঙড়ের মায়নার টাকার ভাগও বামুন-কায়েত খায়। কইলকাতায় আইস্যা একডা নতুন গালি শিখছিলাম—বেশ্যার অন্নভুক। সেইডাও তো যা শুনাইলেন তার থিক্যা ভাল।’
