১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১৩৫. সুভাষের সভায় সভাপতি যোগেন

১৩৫. সুভাষের সভায় সভাপতি যোগেন 

ভোলায় ঠিক সভা ডাকা হয়নি। কারণ, এই স্টিমারই বরিশাল যাবে। ভোলায় আধঘণ্টা থাকে। কিন্তু স্টেশন মাস্টারকে একঘণ্টা স্টিমার-ভোলায় রাখতে অনুরোধ করার জন্য যোগেন আগেই মোড়লমাতব্বরদের জানিয়ে রেখেছিল। বিশেষ করে দুদু মিয়াকে। 

স্টিমারঘাটেই সকলে জড়ো হয়েছিল। এর আগে কোনো পার্টির এত বড় নেতা কোনোদিন ভোলায় আসেননি। সাইক্লোনের দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপ চারদিকে। সেই বাধা কাটিয়েও শ দুই-তিন মানুষ ঘাটে দাঁড়িয়েছিল। সুভাষচন্দ্র স্টিমারের সিঁড়ি দিয়ে নামার আগেই মাতব্বররা সিঁড়ি বেয়ে সুভাষের কাছে এসে তাঁকে মালা পরায় আর জয়কার দিয়ে ওঠে, ‘সুভাষচন্দ্র বসু—জয় জয়’, ‘বন্দেমাতরম’, ‘আল্লা হো আকবর’। 

সর্বাগ্রে দুদু মিয়া—কাছা দিয়ে ধুতি ও পাঞ্জাবি পরা। ঘাটের মাঠে সুভাষ গিয়ে দাঁড়াতেই একজন ছুটে গিয়ে ঘাটমাস্টারের টেবিলটা তুলে নিতে গেলে ঘাটমাস্টার চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আরে আরে, করস কী, ড্রয়ারে আমার ক্যাশ আছে, ক্যাশলুটের মামলায় পড়বি।’ 

টেবিল আনতে গিয়েছিল যে, সে এক হ্যাঁচকা টানে টেবিলটা মাথার ওপর তুলে বলে, ‘এত বড় মানুষ কুনোদিন দেইখছেন? স্বচক্ষে? ক্যাশলুটের জইন্য ফাটক খাইট্যা আইসবনে। আপনার ক্যাশের উপর পাওনা দিয়া দিব। তাই বইল্যা, দেশের সামনে ভোলার নাম খারাপ কইরতে পারব না।’ 

টেবিলটা সে উলটো করে মাথার ওপরে তুলেছিল বলে ড্রয়ার থেকে কিছু খুচরো পয়সা পড়ে যাচ্ছিল। কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে সেই পয়সা কুড়ুতে ও আরো পয়সার লোভে লোকটার পেছন-পেছন। লোকটি গিয়ে টেবিলটা আবার সোজা করে সুভাষের সামনে রাখে। তখনো কিছু খুচরো পড়ে যায়। দুদু মিয়া সুভাষকে আগলে রেখে লোকটিকে ধমকে ওঠে, ‘আ রে বলদের বাচ্চা, টেবিল আনছিস, চেয়ার আইনব কি তোর বোনাই?’ 

সে লোকটিও একইরকম চিৎকার করে ওঠে, ‘টেবিল আনছি কি হোগা বিছায়্যা বসার লগে। টেবিল আনছি উনি যাতে টেবিলে খাড়াইয়া ভাষণ দেন। নাইলে এই সমুদ্দুরের লাগান মিলাদের মানুষ ওঁয়ার বচন শুইনব ক্যামনে?’ 

দুদু মিয়া এটা ভাবেনি ও ভাবনাটা তার ভাল লাগায় সে চুপ করে গেল আর সেই লোকটি খুব শক্ত করে টেবিলটা চেপে ধরে রেখে সুভাষবাবুকে বলে, ‘উঠেন, উঠেন কত্তা—’ 

সেই লোকটির দেখাদেখি আরো দু-জন এসে টেবিলটা চেপে ধরে, ‘উঠেন, কত্তা, উঠেন—’

টেবিলটায় ওঠা একটু মুশকিল, এত তো শক্ত নয় যে সোজা উঠে ধরে পা তুলে দিয়ে উঠবে। একটা টুল থাকলে হত। সেটা বুঝে ফেলতে উদ্যোগীদের এক মুহূর্ত লাগে। একজন টেবিলের সামনে হামা দিয়ে বসে, যেন টুল। ওর পিঠের ওপর পা দিয়ে সুভাষ মঞ্চে উঠবেন। কিন্তু সুভাষ বললেন, না, তিনি ওরকম করে উঠবেন না।’ 

‘ক্যা কত্তা, ওর জীবন তো ধইন্য হইয়া যাবে নে, আপনার পায়ের ধূলায়—সুভাষচন্দ্র বসু জয় জয়—আল্লা হো আকবর।’ এমন একটা জয়কার উঠতেই কয়েকজন সুভাষকে পেছন থেকে হাতবগল ধরে মাটি থেকে টেবিলের ওপর তুলে দিতে-না-দিতেই কেউ কোমর ধরে, কেউ পা ধরে, সুভাষকে খাড়া করে দেয়। সুভাষ খাড়া হয়েও যান। তিনি হাসিমুখে সবার দিকে ঘুরে নমস্কার দিতে শুরু করতেই আবার জয়কার ওঠে, ‘সুভাষচন্দ্র বসু জয় জয়,’

‘আল্লা হো আকবর’। সুভাষ চিৎকার করে বলেন, ‘আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি এইমাত্র। আপনারা সাইক্লোনের যে-বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন, তখন আপনাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর কোনো উপায় অন্তত আমার ছিল না। কিন্তু বাংলার কৃষক প্রাকৃতিক এমন দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই চিরকাল বেঁচেছে। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর খরায় জলের অভাবে মানুষ বিপদে পড়ে আবার নিম্ন বঙ্গে এমন ঝড়জলে মানুষ বিপন্ন হয়। আপনারা কী ভাবে একে অপরকে সাহায্য করে সেই সময় বেঁচেছেন, সে-সব কথা, আমি আমাদের বন্ধু শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল মশায়ের কাছে শুনেছি। আপনাদের এই দুর্দশায় সাহায্য সংগ্রহের জন্য শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এমএলএ মহাশয়ের উদ্যোগে ও এই জিলার ম্যাজিস্ট্রেটদের সাহায্যে একটা ত্রাণ কমিটি তৈরি হয়েছে। তাঁরা একটা ভাল নিয়ম করেছেন যে ব্যক্তিগত ও সংগঠনগত সমস্ত দানই এই কমিটি মারফৎ দেয়া হবে। আমরা বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস থেকে সামান্য কিছু সাহায্য ঐ কমিটিতে জমা দিয়েছি। আরো দেব। কিন্তু দেশের বর্তমান অবস্থায় খুব কিছু একটা করে ওঠা খুব কঠিন। তবে, যত কঠিনই হোক, আপনাদের যে-কোনো ধরনের অসুবিধা নিয়ে যদি বিপদে পড়েন, তাহলে, যোগেনবাবু মারফৎ বা যে-কারো মারফৎ বা কেউ এখান থেকে গিয়ে সরাসরি আমার সঙ্গে দেখা করে জানাবেন। সাইক্লোনের পর জ্বরের ও পেটের অসুখের মহামারী শুরু হয়। যদি সরকার থেকে কোনো ইনজেকশন-টিকা দিতে আসে, আপনারা ইনজেকশন-টিকা নেবেন ও তাদের সাহায্য করবেন। আমি বিশেষ করে এতদঞ্চলের মুরুব্বি-মুখতার-মৌলবি- মোড়লগণকে অনুরোধ করছি—তাঁরা নিজেরা সর্বাগ্রে ইনজেকশন ও টিকা নিয়ে সাধারণ মানুষকে যেন উদ্ধার করেন, বিশেষ করে বাড়ির মেয়েদের ও বাচ্চাদের। আবারও বলছি, টিকা বা ইনজেকশনের বদলে ধুলোপড়া, জলপড়া, নিমছাল, এগুলোতে কোনো কাজ হবে না। আপনারা ভারতমাতার সৈনিক, আপনারাই যদি অসুখে মহামারীতে অকেজো হয়ে পড়েন, তাহলে স্বাধীনতালাভের জন্য ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে আপনারা টক্কর নেবেন কী করে। আমি এইটুকু বলে আমার বক্তৃতা শেষ করছি। আপনাদের জয় হোক, প্রদেশ কংগ্রেস জয় জয়, ভারতমাতা কী জয়-জয় জয়। বন্দেমাতরম্ আল্লা হো আকবর। নমস্কার। সেলাম। মা-বোনদের দোয়া চাই। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। কৃষক-মজুর এক হোক, এক হোক। 

সুভাষ ঘুরে-ঘুরে আবার নমস্কার দিতে থাতেন। কয়েকজন মিলে ঘূর্ণমান তাঁকে পা ধরে, হাত ধরে, কোমর ধরে, নীচে নামায়। 

স্টিমারের ভোঁ তখনই বেজে ওঠে বেশ লম্বা করে। মিটিং হয়ে গেছে বুঝেই হয়তো ইচ্ছে করে বাজিয়ে দিয়েছে। বা, মিটিং ভাঙার সংকেত দিয়ে। 

বরিশালে এমন কোনো অপ্রস্তুতভাবে ছিল না। সেখানে বঙ্গভঙ্গের সময় ১৯০৬-এ বিখ্যাত প্রাদেশিক সম্মিলন হয়েছে—সুরেন ব্যানার্জি, বিপিন পালদের নিয়ে ১৯২১-এ আবার প্রাদেশিক সম্মিলন রয়েছে। সালের পর প্রাদেশিক রাজনৈতিক সম্মিলন হয়েছে, আগৈলঝরাতে রাজনৈতিক সম্মিলন হয়েছে—সেখানে মদন মোহন মালব্যের মত নেতা এসেছিলেন। তাছাড়া অনেক গোপন বিপ্লবীদলের অঘোষিত বহু ছোটখাটো সম্মিলন অনবরত হয়েছে। স্বামী প্রভশনানন্দ, পুরুষোত্তমানন্দ অবধূত, ভোলানন্দ গিরি, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, প্রভু জগদ্বন্ধু—এই সন্ন্যাসী নেতারা ছিলেন বরিশালের সামাজিক জীবনের সঙ্গে মিশে। সেই সন্ন্যাসের আবার একটা ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী জনপ্রিয় দেশপ্রেমের ধারা বইত মুকুন্দদাস থেকে। 

বরিশাল অভ্যর্থনা ও আয়োজনে অনভিজ্ঞ তো ছিলই না, বরং বহু অভিজ্ঞ। তাদের নেতাদের অনেকেই ছিলেন সারা বাংলার নেতা। তাদের কর্মীরাও ছিলেন সারা বাংলায় কর্মী হিশেবেই পরিচিত। বরিশালের বিভিন্ন আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল নেতারাই ছিলেন, প্রধান কর্মী। অশ্বিনী দত্তের বরিশাল, সতীন সেনের বরিশাল, ভেগাই হালদারের বরিশাল, বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলার দেবেন সেনের বরিশাল, সুভাষকে তাঁর যোগ্য মর্যাদায় অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত ছিল। তার ওপর, বরিশালের রাজনীতির বা সমাজের অনেক নেতাই ছিলেন সুভাষের বন্ধুতুল্য। সুভাষ এর আগেও বরিশালে এসেছেন—যতীন সেনকে অনশন ত্যাগের অনুরোধ জানাতে। ভোটে এআইসিসি থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও সুভাষকে কংগ্রেসের সভাপতি হতে দেয়া হল না।—এতে সারা ভারতের কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও অভিমান ছিল বরিশালের সব দলেরই নেতাদের মনে। আবার, বরিশালের অনেক নেতার সঙ্গেই ভারতের অন্যান্য নেতাদের সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল—ডক্টর মুঞ্জে, শ্যামাপ্রসাদ, সাভারকর, গান্ধী, সি আর দাশ, অনুগ্রহ নারায়ণ সিং, মুজাফফর আমেদ, পি সি যোশী প্রমুখ। তাঁদের সকলেরই এই টুকু সহবৎ ছিল, যেন সুভাষচন্দ্রের অভ্যর্থনার ফলে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত প্রাধান্য না পায়। বাংলার গৌরব ও ভারতের নেতাকে বরিশাল যেন তাঁর যোগ্য অভ্যর্থনা জানাতে পারে। 

ব্যবস্থা সব আগে থাকতেই করা ছিল। একটা ফিটন গাড়ি নদীর সমান্তরাল পাকা রাস্তার ওপরে একই মুখে দাঁড়করানো ছিল। স্বাভাবিক ছিল—নদীতে পেছনে রেখে দাঁড়করানো। বহু বছর আগে সে-তর্কের মীমাংসা ঘটে গেছে। ১৯০৫-এর প্রাদেশিক সম্মিলনে সুরেন ব্যানার্জি ও বিপিন পালের জন্য ফিটন ছিল। ওঁদের সঙ্গে কালীপ্রসন্ন বিদ্যাবিশারদও ছিলেন, খালি গায়ে, উত্তরীয়ে ঢাকা কিন্তু পৈতে দেখা যাচ্ছে। তিনজন তো এক ফিটনে এঁটেই যাবেন। কিন্তু বিদ্যাবিশারদ বললেন, পেছন থেকে ঘোড়ায় ওঠা শাস্ত্রে নিষেধ, এটা শাহেবদের আমদানি, সুতরাং বিদেশী বর্জনের আওতায় পড়ে। সুরেন ব্যানার্জি না শোনার ভান করলেন, আর, বিপিন পাল মশায়ের সবচেয়ে স্বাভাবিক মুখাবয়বই যেন প্রত্যক্ষ নিষেধ-কোঁচকানো ভ্রূ, চোখের পাতা অর্ধেক নামানো, নীচের ঠোঁট ওপরের ঠোঁট থেকে এগিয়ে, খাড়া নাক—সুতরাং বিদ্যাবিশারদের নিষেধে তাঁর কিছু যায় আসে না। কিন্তু নিষেধতো নিষেধই—নৈব অশ্বারোহণ পশ্চাদাৎ। যা হোক ফিটন চলে গেল, বিদ্যাবিশারদের জন্য অন্য ব্যবস্থা করতে হল। কিন্তু বরিশালের নেতা ও সংগঠকরা বংশানুক্রমে এ-নিষেধ ভোলেননি, নৈব অশ্বারোহণ পশ্চাদাৎ। তখন থেকে ফিটনযোগ্য অতিথির জন্য ঘাটে ফিটন নদীর দিকে পেছন ফিরে থাকে না, নদীর সমান্তরালে থাকে। 

‘ভারতমাতা কি জয়’, ‘সুভাষচন্দ্ৰ জয় জয়’, ‘প্রদেশ কংগ্রেস জয় জয়’, ‘বন্দেমাতরম্’–এইসব জয়কারের মধ্যে সমবেত বিশিষ্টগণ সুভাষকে ঘাট থেকে রাস্তায় তুললেন, ইতিমধ্যে অনেকেই সুভাষকে মালা দিলেন, ফিটনে চড়বার মুখে এক বৃদ্ধা তাঁর কাঁপা আঙুলে সুভাষের কপালে রক্তচন্দন লেপে দিলেন। সুভাষ তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম সেরে যখন সোজা হলেন, দেখেন, চন্দনচূর্ণ তাঁর চশমার ডান কাচে পড়েছে। সুভাষ ফিটনে ওঠার পর বরিশাল জিলা ফরোয়ার্ড ব্লকের সভাপতি পি এল রায় মশায় উঠলেন। সুভাষ তাঁকেই বললেন, ‘যোগেনবাবু তো আমাদের সঙ্গে এলেন। উনি যাবেন না?’ এটা ছিল ফরোয়ার্ড ব্লকের আয়োজিত জনসভা ও কর্মিসম্মিলন। রায়মশায় চট করে বুঝতে পারেননি যোগেন বলতে কাকে বোঝাচ্ছেন সুভাষ। তিনি বলে ফেললেন, ‘কে যোগেন?’ সুভাষবাবু তখন আসন থেকে পেছনের শোভাযাত্রার দিকে তাকাচ্ছেন, ঘাড় না ঘুরিয়েই তিনি বললেন, ‘যোগেন মণ্ডল, আপনাদের এমএলএ।’ সুভাষের গলা অনেকেই শুনতে পেল ও বোঝা গেল যে-শোভাযাত্রা তৈরি হচ্ছে সেখানে যোগেন মণ্ডল, যোগেন মণ্ডল, রব উঠল। সুভাষ সোজা হয়ে বসতেই যোগেনবাবুকে ধরে দু-তিনজন এলেন। একজন রসিকতাও করলেন, ‘আসামী হাজির।’ যোগেন সুভাষকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনে নাকি ডাকছেন?’ 

‘ডাকব না? একেই বলে গাছে তুলে দিয়ে…। উঠে আসুন- 

যোগেন জিভ কেটে দুই কান ধরে বলে ওঠে, ‘সে কী কথা! এডা তো বরিশাল। আপনার লগে ফিটন চইড়্যা নগরকীর্তন আমার করা সাজে?’ 

ততক্ষণে অনেকেই যোগেনকে ঠেলে প্রায় তুলেই দিয়েছে। এমন কথাও কেউ চাপা স্বরে বলে ওঠে, ‘কী কর যোগেন, উনি ডাইকতেছেন, যদি কুনো অসুবিদা বোধ করেন। উঠো।’ কথাটার মধ্যে আদেশ ছিল, যোগেনকে উঠতেই হল। তাঁর পাশের জায়গাটি থেকে ফুল-পাতা ঝেড়ে রায়মশায় বলেন, ‘তুমি বরং এইখানে বইস্যা সর্বজনের সমক্ষে তোমার শাস্তি প্রদর্শন করো। যোগেন যে ফরোয়ার্ড ব্লকে যোগদান করছে, সে-সংবাদ আমার নিকট পৌঁছায় নাই। তাই আমি বুইঝতে পারি নাই, কোন্ যোগেন?’ 

সুভাষ একটু হাসি মিশিয়ে বললেন, ‘না, না, উনি ব্লকের কর্মী নন। ব্লক তো কংগ্রেসেরই ভেতর। উনি কংগ্রেসের ধারেকাছে থাকেন না। উনি তো আইনসভায় বিরোধীপক্ষের বড় নেতা। বন্ধু হিশেবে কখনো-সখনো আমার অভিভাবক।’ 

রায়মশায় তাতেও ঠিক বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করে বসেন, তয়?’ 

সুভাষ তাঁর চশমাটা খুলে ধুতির খুঁটে মুছতে থাকেন। চন্দনটা ভেজা ছিল, কাচে আটকে গেছে, সুভাষ পকেট থেকে রুমাল বের করেন। 

যোগেন ঠিক বুঝে উঠতেই পারছিল না, সুভাষ তাঁর কাছে কী চাইছেন। কর্মসূচি অনুযায়ী সুভাষকে নিয়ে এই মিছিল নগর পরিক্রমা করছে। মিছিলের কোথাও গান, কোথাও জয়কার। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকে ফুল ছিটচ্ছে। দুটি-একটি মোড়ে ফিটন থামাতে হল, সুভাষকে কোনো প্রতিষ্ঠান বা বিদ্যালয় থেকে সংবর্ধন করা হল। 

শহরের একটু পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন অংশ দিয়েই শোভাযাত্রা শেষ হল পি এল রায় মশায়ের দোতলা বাড়ির সামনে। বেলা দুটোয় বাণীপীঠ স্কুলের মাঠে জনসভা। শোভাযাত্রার মানুষজন যে যার পথে পা বাড়ায়। সুভাষকে নিয়ে রায়মশায় দোতলায় ওঠেন। সেখানেই সুভাষের থাকার ব্যবস্থা। সুভাষ সেই ঘরে বসলে, যোগেন তাঁর কাছে গিয়ে বলে, ‘আমি আমার বাড়িতে যাচ্ছি। মিটিঙে যাব। কিন্তু সেখানে সাক্ষাৎ-হওনের সম্ভাবনা কম। আমি রাইতে ফিরার পথে একটা ঘুরান দিয়া যাব।’ 

‘সে কী? আপনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন না? খাবেনও না? আপনি যাচ্ছেন কোথায়?’

‘বরিশালে আমার বাড়িঘর নাই না কী। এইডাই তো আমার কর্মক্ষেত্র।’

‘কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন এখানে আপনার কোনো বাসাবাড়িও করেননি। এক বন্ধুর সঙ্গে থাকেন। 

‘সে-ও তো আমারই বাড়ি। বাড়ি আইল্যাম অথচ বাড়িতেই গেলাম না, এডা কেমন হইব? লোক কী কবে?’ 

‘লোক তো এও বলতে পারে যে সুভাষবাবুকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে যোগেনবাবু কোথায় যে গা-ঢাকা দিলেন। 

‘য্যান আপনার পাশে থাইকলে আমার মুখোজ্জ্বল হইব! রামচন্দ্রের পাশে হনুমানের পোড়া মুখ 

‘আমি তো গৃহকর্তার অতিথি। অতিথি দেবো ভবেৎ। আমার সেই অধিকারে আপনাকে নিমন্ত্রণ করছি—আমাদের সঙ্গে আহার করবেন। আর, একটু প্রস্তুত হয়ে নেবেন। আজকের জনসভায় আপনি সভাপতিত্ব করবেন।’ 

‘সুভাষবাবু, আপনার কথামত এই বাড়িতে আমি দিনে আটবার খাব।’ 

‘না, না, ভয় দেখাবেন না গৃহকর্তাকে। শেষে আপনিই জব্দ হবেন’, সুভাষ বলেন।

‘আটবার খাব মানে অষ্টপ্রহর খাব। শিয়াল-মোরগার নাগান। কিন্তু বরিশালের জনসভায়, মানে বরিশালে আপনার জনসভা বরিশালের ইতিহাসে যে কত বড় ঘটনা, সেডা আপনে কল্পনাও কইরতে পারবেন না। আমি এখানকার বারের নেহাৎই জুনিয়ার এক উকিল। আপনার লগে পরিচয়ের সূত্র এমন এক দিগ্বিজয়ী ব্যারিস্টার মারফৎ আর আইনসভার খেজুরা রাজনীতির মইধ্যে যে আপনে আমার সাইজ মাপতে পারেন নাই। কিন্তু বরিশালের পোলাপানরাও তো আমার সাইজ জানে। আপনার সভায় সভাপতি হওয়ার ভাগ্যে আইজ আমারে কেউ কিছু কবে না। কাল থিক্যা তো আপনে নাই। তহন এই পোলাপহনগুল্যা তো আমারে ঢিল্যাব। আর পিছন থিক্যা লুক্যাইয়া ডাকব ‘যোগেন পাগলা’।’ 

‘আচ্ছা। তাহলে আমার বক্তৃতার ওপর তো আপনি সেন্সর করতে পারেন না। আমি আজ বরিশালবাসীদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাব। সেটাই আমার বিষয়। দেশ প্রতিটি দিন স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য নতুন হয়ে উঠছে অথচ আমাদের নেতৃত্ব এত পুরনো যে ঝুড়ি নেমে গেছে। বরিশাল দেশকে দেখিয়েছে-যোগেন মণ্ডলের মত সৎ, পরিশ্রমী, জ্ঞানী, নিঃস্বার্থ নেতাকে কী করে প্রদেশ ও দেশের রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে তোলা যায়…’ 

‘আপনে ছাড়ান দ্যান, ছাড়ান দ্যান। আপনে তো আমারে ডর খাওয়াইয়া কর্মসম্পন্ন করতিছেন। আমি আপনার তুলনায় এতই তুচ্ছ যে আমি ডরাইয়্যাই থাকি। তার জইন্য আপনার এতডা শক্তি ব্যয় শোভা পায় না।’ 

‘আমি একটু অসাবধানে এমন করে বলেছি যেন এগুলো বানানো। আপনি কিছু মনে করবেন না। আপনার সম্পর্কে এটাই আমার ধারণা। আমি ও আপনি ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তি নেই যে জানে নেতৃত্বের ভয়, জড়তা ও অক্ষমতা এই মুহূর্তে নতুন নেতাদের উঠে আসা কেমন ঠেকিয়ে দিচ্ছে। আসার পথে স্টিমারে আপনার সঙ্গে সারারাত তো এই কথাই হল। আমাদের সমাজ যাদের নিম্নবর্ণ করে রেখেছে, আবার একই সঙ্গে, উচ্চবর্ণের স্বার্থে যাদের বর্ণব্যবস্থার অন্তর্গত করে রেখেছে—তাঁদের সেই নিম্নবর্ণের আন্দোলনের জন্য সারা ভারতের পরিপ্রেক্ষিত তৈরির কথা হল। এখন আপনাকে উদ্দেশ্যহীন হয়ে কোনো একটি কাজের কথাও বলছি না।’

‘আমারে অপরাধী কইরবেন না। আপনার মত মানুষের কোনো কাজে লাগা তো আমাগ মত তুচ্ছ মানষের ভাগ্যের কথা।’ 

‘যোগেনবাবু, আপনার মুখে কিন্তু এ-বিনয় মানায় না। আপনার আক্রমণমুখী বিখ্যাত হিউমার কোথায় গেল?’ 

‘আমার কি এটুক বোঝনেরও খ্যামতা আছে যে আপনে শুইনলেন কাল রাইতে আর আজ সকালেই কাজ আরম্ভ কইর‍্যা দিচ্ছেন?’

‘এটা বাড়াবাড়ি করছেন। কাজটা তো আমার নয়, হয়তো ওরা জোর করে না তাড়ালে কাজটা নিয়ে এগনো যেত। কংগ্রেসের ছাতাটা তো বিশাল। তবে, মনে হয় না, কংগ্রেসের ঐ সব নেতাদের রাজি করানো যেত। তবু, কংগ্রেস বা গান্ধীজি যদি শূদ্র-অধিকারের এতটা সম্প্রসারণে রাজি না হতেন, তাহলেও কংগ্রেসের তর্কবিতর্ক তো? এটা একটা ন্যাশন্যাল ইসু হয়ে যেত।’ 

‘দ্যাহেন, সুভাষবাবু, আপনি তো সারা দ্যাশের নেতা, শুধু শুদ্দরগ নেতা না। কিন্তু কংগ্রেসে তো আমাগ সমাজের বড় মানুষরা তো ছিলেন, আছেন। তারা তো অন্তত কথাটা, মানে তর্কটা তুলব্যার পারতেন। তাইলেও তো ইস্যুডা লোকের চক্ষুর সামনে থাইকত।’ 

‘তেমন ইফেকটিভ বড় নেতা কংগ্রেসে কোথায়, যিনি নিজের ক্ষমতায় একটা অঞ্চলের বা প্রদেশের নেতা, আবার নিজের সম্প্রদায়েরও নেতা, আবার ডিপ্রেশড জাতগুলোরও নেতা। এক আপনি যদি আসতেন কংগ্রেসে, বা মহারাষ্ট্রের আম্বেদকর, বা মাদ্রাজের রাজা। জগজীবন রাম বলে বিহারের এক নেতার কথা, শুনছি যিনি জাতিতে শূদ্র। তাঁকে হয়তো কংগ্রেস তুলবে এখন।’ 

‘বিহারে কি গান্ধীজির আন্দোলনের সঙ্গে মানে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জাতের পার্টিগুল্যার কুনো আকছা-আকছি নাই?’ 

‘তা নিশ্চয়ই আছে। ওদের ভাঙিয়ে তো উঁচুবর্ণের নেতারা করেকম্মে খান। তাই কংগ্রেসের ভিতরে অন্তত কারো কারো তেমন দলিতনেতাকে মেনে নেয়া হয়। এখানকার উলটো। এখানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনগুলিতে কোনো নিম্নবর্ণের নেতার নাম পাবেন না। বিহারে প্রচুর। জগজীবন রামের কথা বললাম। আরো কয়েকজনের নাম শুনছি, যাঁরা আগামী কোনো আন্দোলনের নেতা হয়ে উঠবে—প্রসাদ মণ্ডল বলে একজন। বিহারে তো প্রদেশের নেতৃত্ব ঠিক করে উচ্চবর্ণও না, নিম্নবর্ণও না। মধ্যবর্ণ যাদব, ভুঁইহার, কুরমি এইসব মধ্যবর্ণ।’ 

‘বিহারের নিম্নবর্ণ নেতারা কি তাদের শ্রেণী বা জাতের দাবি সবার সামনে হাজির করব্যার পারছে?’ 

‘সেখানে সমস্যাটা আলাদা। আমাদের এখানে যেমন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুযোগে হিন্দু উচ্চবর্ণের একচেটিয়া জমিদারি, বিহারে সেরকমই একচেটিয়া দখল নিম্নবর্ণের উচ্চবিত্তের। তারা চেষ্টা করছে বর্ণেও উচ্চ হওয়ার। কিন্তু আমাদের এখানে ব্রাহ্মণ আর শূদ্রের মাঝখানে মধ্যবর্তী বর্ণের আর্থিক দাপট খুব বেশি নয় হয়ত, ইংরেজ আমলের শুরু থেকেই তারা সব কায়স্থ হয়ে গেছে, সেনসাস শুরু হওয়ার পর তো রেকর্ডও হয়ে আছে, বিহারে ঠিক সেরকম নয়। সে-কারণেই উনিশ শ বত্রিশের গোলটেবিলে অনেক ঐতিহাসিক মত দিয়েছিলেন যে বাংলায়, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে, অস্পৃশ্যতা, প্রধান সমস্যা নয়। তারপর তাঁরা আবার ব্যাখ্যা করেছিলেন—দাক্ষিণাত্যের তুলনায় তাঁরা কথাটি বলেছেন। তেমন বলার কারণ ছিল, এখনো আছে ও ইংরেজদের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তরে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেলে আবারও উঠবে, বাংলা নিয়েই। কেন আমি এটা বলে রাখছি, তা আর বিশদ করছি না। এই ঐতিহাসিক সূত্র যদি মানিয়ে নেয়া যায় যে বাংলায় অস্পৃশ্যতা হিন্দুদের প্রধান সমস্যা নয় ও বাঙালি মুসলমানরা সব নিম্নবর্ণের ধর্মান্তরিত হিন্দু—তাহলে লাভ কাদের সেটা আপনারা ভালই জানেন। 

‘আপনের পাশে বইস্যা ফিটনে চইড়্যা নগরপরিভ্রমে বা মধ্যাহ্ন আহারে বা সভায় সভাপতিত্বে রাজি না-হওয়ায় আপনার গোসা যে এমন আশীর্বাদ হইব, ভাবি নাই। আপনে যে রাজনীতির ফিলজফিটা এমন সাজাইয়্যা দিলেন, সেডা নিজে বুঝার সাধ্য আমার ছিল না, সুভাষবাবু। এইডা যে আমাগ কত বড় নির্দেশ হইয়া গেল, সেডা আপনার পক্ষে ধারণায় আনা সম্ভব না। তার উপর একটা বড় বাধা যে উঁচা হিন্দুগ লগে আমাদের শুদ্দুরদের খটাখটি, মান-অপমান, পরিবারগ রক্ষা, চাষ রক্ষা এমন একডা বারমাস চব্বিশঘণ্টার ঝামেলা যে, নিরপেক্ষ বিচারের জন্য নাকের ডগা থিক্যা একটু বেশি দূরের দৃষ্টি আমাগ আসে না।’ 

‘এই কথাগুলো আপনাকে বলতে চাই। কলকাতায় তো সম্ভবই নয়। কথা বলতে আপনার সঙ্গে আপনার জিলায় আপনার শহরে এলাম আর আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন’, সুভাষ একটু হেসে বললেন, ‘আমি তো বাংলার অস্পৃশ্যতা বুঝতে পারলাম আপনার ব্যবহারে। আপনি আমার সঙ্গে একাসনে বসতে রাজি নন, দুই আসনে খেতে রাজি নন, এক সভায় বক্তা হতেও রাজি নন। অস্পৃশ্যতার আর বাকি থাকে কী?’ সুভাষই হেসে উঠলেন জোরে, যোগেন জিভ কেটে শুধুই মাথা নাড়তে লাগল। ঘরে লোকজন আর-কেউ ছিল না। সুভাষ তাঁর কথাগুলো বারবার যোগেনকেই বলতে চাইছিলেন যে সেখানে উপস্থিত থেকে শোনাটা অনেকের কাছে মনে হল—এটা লুকিয়ে কান পেতে শোনার মত আত্মমর্যাদা-নষ্ট করার মত কিছু হয়ে যাচ্ছে। আরো কেউ-কেউ সুভাষ-যোগেনের আলাপের বিষয়টাতে কৌতূহলী হয়ে উঠতে পারছিল না। ফলে, সুভাষ আর যোগেনই ছিল বক্তা ও শ্রোতা, দুই-ই। 

‘আর-একটা খুব দরকারি কাজের কথা আপনাকে বলেনি। এরকম ফাঁকা আর পাব কী না কে জানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনারা সারা ভারতের ডিপ্রেসড কাস্টদের একটা কমন কজ পাবলিক করুন। সে যাই হোক। এমন কী, আপনি যেটা বলছিলেন, ‘আমরা হিন্দু না’, বা, ‘আমরা হিন্দুদের হয়ে রায়ট করব না কিন্তু আমাদের শক্তিতে রায়ট ঠেকাব।’ 

‘মনে হচ্ছে, আপনারে কাইল রাত্তির থিক্যা এডডু ভাবাইয়্যা তুলছি।’ 

‘এটাই তো মুশকিল এত টানা জেল খাটার। আপনি শুধু সমস্যাটাকে ভাবতে পারেন ও আপনার রাজনীতি অনুযায়ী সমস্যাটাকে ব্যবহারের উপায় ভাবতে পারেন, চার দেয়ালের মধ্যে আটকে, তার একটা লোহার শিকের। কিন্তু সেটা তো আপনার ভবিষ্যৎ শক্তিরও সঞ্চয়।’ 

‘সে তো যে-মানুষ তার বর্তমানটাকে তার ভবিষ্যতের থিক্যা বেশি দেখে তাগ পক্ষে—’

‘আমি তো গান্ধীজির কাছ থেকে রাজনীতিতে আসিনি। সি আর দাশের কাছ থেকে এসেছি। কিন্তু, জানেন, গান্ধীজির কাছ থেকেই রাজনীতির কর্মসূচি কী করে তৈরি করতে হয় সেটা শিখেছি—ঐ কম বয়সেই, জেলে যাতায়াত শুরু করার আগেই। গান্ধীজি ভারতে আসার পর নতুনরকমের আন্দোলন যখন শুরু করলেন, ১৯১৭, তখনই চমকে উঠেছিলাম। দেখছিলাম ওঁর কাছে কোনো একটি বিষয়ও স্থানীয় নয় ও তুচ্ছ নয়, প্রত্যেকটা ইসুই জাতীয় বিষয়; প্রত্যেকটা বিষয়েই চরম, মানে, আলটিমেট বিষয়। গুজরাতের ওয়াধোয়ান বলে একটা রেলস্টেশনে ঐ আবগারি অফিসাররা খুব সার্চটার্চ করতেন। প্ল্যাটফর্মে এক যুবক এসে তাঁকে এর প্রতিকার করতে বলল। গান্ধীজি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—এটার প্রতিকারের জন্য কি সে জেলে যেতে রাজি আছে। ছেলেটি বলল, হ্যাঁ। শুরু হল আন্দোলন। গোখলের মৃত্যুসংবাদ জেনে বর্ধমান থেকে পুনে যাচ্ছিলেন। থার্ড ক্লাসে উঠতে না পেরে ইনটারক্লাসে উঠেছিলেন। মুঘলসরাইয়ে এসে আবার থার্ড ক্লাসে উঠলেন। রেল কোম্পানির সঙ্গে চলল আন্দোলন ও রেল কোম্পানি তাঁকে মুঘলসরাই-পুনে এই অংশের টারা ফেরত দিলেন। রেঙ্গুনে গেলেন ডেকে ডেকের যাত্রীদের নোংরামির বিরুদ্ধে চলল আন্দোলন। কোনো একটি বিষয়ও স্থানীয় নয়। কোনো একটি বিষয়ও ব্যক্তিগত নয়। আমি চাই আপনি মহারাষ্ট্রের আম্বেদকার ও মাদ্রাজের রাজা-র সঙ্গে বসে একটা কমন কজ করুন।’ 

যোগেনকে সবই করতে হল। 

সুভাষবাবুর পাশে বসে খেতে হল। 

খাওয়ার পরে সুভাষবাবুই তাঁর ঘরে ডেকে নিয়ে রাজনীতির কথা তুললেন। 

‘বাণীপীঠ’ স্কুলের মাঠে জনসমাগম ঘটেছিল এতই অভূতপূর্ব যে সংগঠক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ৩০-৪০ বছর পরে চারিত স্মৃতিতে তা বিশ হাজার থেকে দু-লাখের মধ্যে ওঠানামা করত। হাটের মত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, কেউ কারো কথা শুনতে পায় না, শুধু আওয়াজ, শুধু আওয়াজ। তখনো বরিশালে মাইক আসেনি। জানা থাকলে কলকাতা থেকে সঙ্গে আনা যেত। 

দুই ডজন মত মানপত্র পড়া হবে ও সুভাষবাবুকে দেয়া হবে, ঠিক ছিল। অন্ধকার হওয়ার আগেই শেষ করতে হবে বলে মিটিং ডাকা হয়েছিল দুপুরে। শেষে, যোগেনই সুভাষের প্রতিনিধি হয়ে একে-একে মানপত্রগুলি নিল ও নামগুলি বলল। পড়া হল শুধু নাগরিক কমিটির মানপত্র। সুভাষ বেশ কিছুক্ষণ দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বললেন—যুদ্ধ লাগল বলে, এই যুদ্ধে এমন কোনো কারণ কী আছে যাতে আমরা ব্রিটেনকে সমর্থন করতে পারি, নাকী, যাই হোক না কেন, কোনো এমন কারণ কি ঘটতে পারে যে আমরা ব্রিটেনকে বিপন্ন বন্ধু ভাবতে পারি ও এই সময় ব্রিটেনকে যুদ্ধে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকতে পারি? নাকী, ব্রিটেনের এই বিপদের সময় আমরা সবথেকে বড় আন্দোলন তৈরি করে, ব্রিটেনকে ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য করতে পারি? 

বলার পর সুভাষবাবুর মনে হল, এই মূল কথাটি বোধহয় পরিষ্কার হল না। তিনি যোগেনকে অনুরোধ করলেন, কথাটাকে সরল করে বলে দিতে। যোগেন বলতে গিয়ে বেশি বলল। ‘ধরেন একডা বড় হাটের মইধ্যে এক বুড়া ধর্মের ষাঁড় ঘুরে বেড়ায়। সে আপনার দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। আপনি কি সেই বলদকে একটা বাঁশের ঝুড়িতে একটা লাউ, বাঁধাকপি, একটা বড় বেগুন, একপাল্লা শসা ভুজ্যি দিবেন, জিভের একটা ছোটমত গ্রাসেই তিনি পেটে ঢোকাবেন? লাঠি মেরে তাকে তাড়াবেন? অথবা, আহারের অভাবে শীর্ণ সেই বলদ-নন্দনটিকে আপনার প্রতিবেশীর জমিতে খুঁটিতে বেঁধে রেখে আসবেন যাতে আপনার প্রতিবেশীর ক্ষতি হয়, বলদের লাভ হয় ও সেই সুবাদে আপনেও লাভের দু-আনি চার-আনি ভাগ পাবেন? নাকী, একটা লাঠি ধইর্যা সেই বলদডারে হাট থিক্যা বাইর কইর‍্যা দিবেন? সুভাষবাবু এই কথাডাই আপনাগ নিকট বলব্যার চান—ধর্মের ষাঁড়, মানে শাহেবদের ধর্ম। ধর্মের ষাঁড়ের ধর্ম। সেই ধর্মপালনের দায় দোকানদারের ওপর চালানো কেন। দোকানদারের ধর্ম দোকানদারের ধর্ম। যে সেই ধর্মপালনের দায় প্রতিবেশীর ওপর চাপাল কেন? একমাত্র সেই মানুষডাই নিজের ধর্ম নিজে পালন করল যে একখান লাঠি পাকাইয়া ধর্মের ষাঁড়কে সীমানা পার কইর‍্যা দিল। সুভাষবাবু এই কথাডাই বলতেছেন যে যুদ্ধডা একডা সুযোগ—আমরা সে-সুযোগ নিব কি নিব না?’ 

যোগেনের সারসংক্ষেপে খুব হাততালি পড়ল। 

পরদিন রাতের স্টিমারে ওঁরা বরিশাল ছাড়লেন। যোগেন সুভাষবাবুকে তাঁর ক্যাবিনে ঢুকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল। এই দিনটাতে সুভাষবাবু সারাদিন ব্যস্ত ছিলেন ফরোয়ার্ড ব্লকের জিলা সংগঠন তৈরিতে। একটু বোধহয় বাইরেও যেতে হয়েছিল। সুভাষবাবুর সঙ্গে সেদিন যোগেনের দেখা হল শেষ বিকেলে। কলকাতা ফেরার জন্য। সারাদিনই দুজন-দুজনের নিজের কাজে ঘুরেছেন। 

যোগেন দেখতে পাচ্ছিল—কোনো একটা সময়াভাবের অভ্যন্তরীণ তাড়ায় সুভাষ নিজের বইবার ক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ নিচ্ছেন, এবার শরীর তার শোধ নেবে। সেই কথা ভেবেই যোগেন সুভাষবাবুকে ক্যাবিনে ঢুকিয়ে বেরিয়ে এসে রেলিঙের পাশে সাজানো দুটো চেয়ারের একটাতে বসে থাকল। একরাত্রির টানা ঘুম হলে শরীর সামলে যাবে। ক্যাবিনে একা-একা না-ঘুমিয়েও উপায় নেই। ফেরার সময় লোকসংখ্যা কম, এক শাহেব-ছাড়া। কিন্তু শাহেব তো স্বাধীন। কোনোভাবেই সুভাষবাবুর দলের নন। সে তার নিজের কাজ করছে, নিজের প্রশ্নের জবাব খুঁজছে, একটা প্রশ্ন থেকে আর-একটা প্রশ্নে যাচ্ছে। 

গম্ভীর লম্বা সিটি বাজিয়ে লঞ্চ ছাড়ল। 

গুমোট লাগছিল। একটু পিছিয়ে গিয়ে বাহিরজলে পড়ার জায়গাটায় বা লেনে ঢুকে পড়ল। তারপরই জল আর হাওয়া আর বন্দরের আলো ছোট হতে থাকা ও ভুলে যাওয়া। 

যোগেন ঝিমুতে ভালবাসে। কিন্তু ঝিমুচ্ছিল না। 

যোগেনের কাছে তো এই বিপুল জলস্রোত, এই স্রোতস্বী অন্ধকার, অন্ধকারের এমন প্রবল আলোড়ন আকাশজুড়ে—মাতৃগর্ভের মত রক্ষণশীল ও নিয়ত শুশ্রূষাময়। যোগেন নিজে সেটা জানে না—যেমন গর্ভের কোনো ভ্রূণই জানে না। 

তেমন না-জেনেই তো জীবন চলে যায়। চলে যাচ্ছিল। তাদের কেমন উলটো জানা। যে-বিষয় আমারই নয়, যে-বিষয় আমার জাতেরও নয়, পাতেরও নয়, যত পেঁচিয়েই হোক যে-বিষয় থেকে কোনো একটি স্বার্থ আমি ছুঁড়ে আনতে পারছি না, যে-বিষয় থেকে আমার কোনো লাভই গড়ায় না সেটা আমার স্বার্থ নয়। কোনোকালে এমন করে ভাবতে শেখেইনি যোগেন। কোনোকালেই না। বাড়িতেও না, স্কুলে না, কলেজে না, ল-কলেজে না, বারে না, কোর্টে না। 

সে না-হয় হল। 

কিন্তু যোগেনরা তো এটাও জানেনি, তাদের স্বার্থটা কী। স্বার্থ নিশ্চয়ই সমতা নয়। উচ্চবর্ণের সমতা কি স্বার্থ? নাকি সম্মান? 

রাত্রির সংকীর্ণ দিগন্তগুলি থেকে স্রোতোধ্বনির প্রত্যাঘাতে আর ক্রমেই নিবিড় ও উত্তরঙ্গ সামুদ্রিক হাওয়ায় যোগেন জেনে যায়—কোনো বিষয়ই স্থানীয় নয়, কোনো বিরোধই রায়ট নয় শুধু, প্রত্যেকটা বিষয়ই জাতীয়, প্রত্যেকটা বিষয়েই আমার স্বার্থ। 

যোগেন আরো একটু টের পায়। 

তার ঠাকুরদা, বাবা, কাকা, এত গরিব যে তাদের এমন কী কোনো স্বার্থের মালিকানা ও নেই। এমন স্বার্থনির্বাসিত না-হলে যোগেন এই কথাটার অর্থ কি ধরতে পারত—কোনো বিষয়ই সংকীর্ণ নয়, সব বিষয়ই আমার বেঁচে থাকা নিয়ে। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *