১৩৮. শাকিনা ও ধাঙড় স্ট্রাইক নিয়ে যোগেনের নতুন ধরনের কষ্ট
যোগেনের ঘুম যখন ভাঙল, তখন খুদ্দুর স্কুলে যাওয়ার জন্য একেবারে তৈরি—পিঠে ব্যাগ, গলায় টাই।
যোগেন চিৎকার করে ওঠে, ‘আ-রে তোরা কেউ ডাকস নাই আমারে। আমি কি রাত্তিরে সিঁধ কাইটতে বারাইছিলাম।’
‘আমি তোমাকে ডাকতে গিয়েছিলাম, মা বলল, ডাকিস না, উঠলেই তো সারাদিনের মত বের হয়ে যাবে।’
‘এই মাতৃআদেশ তো খুব মাইন্যা চলো। তোমার তো মামার প্রতিও কিছু কর্তব্য আছে।’
খুদ্দুর রুটিন মিলিয়ে খাতা ভরছিল। ব্যাগটা আটকে দিতে দিতে বলে, ‘সেই কর্তব্য পালন করে তোমাকে আবার ঘুমুতে বলছি—’ বলেই খুদ্দুর নটি বয় সু-র খটখট আওয়াজ তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামে। যোগেন চিৎকার করে তার পেছনে—’ছাওয়ালগুল্যা কি ফাল পাইড়্যা বড় হওয়া ধইরল? অ্যাহন কি ল-কলেজও মর্নিং স্কুল?’
উদ্দুর পাশের ঘর থেকে আসে, ‘এখন তো বাত্রি না, তা-হলে লাস্ট বাসের মত গিয়ার বদলাচ্ছ কেন?’
উদ্দুর ল-কলেজে ঢুকেছে। লম্বা, পাতলা চেহারায় যেন ওর চোখ-নাক-ঠোঁট কুঁদে বেরচ্ছে। কাঁধদুটো চওড়া হচ্ছে। বরাবরই তো ঠান্ডা আর বুদ্ধিমান। যোগেন তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, ‘তোরা তো আইনসভার গল্পও শুনতে চাস না, কর্পোরেশনের গল্পও শুনতে চাস না, এদিকে আমার প্যাট ফাঁফাইয়্যা ওঠে।’
উদ্দুরের মা বলতে বলতে ঢোকে, ‘প্যাট যদি ফাঁফে চুনের জল খাও। মাথায় মা-গঙ্গা ঢাইল্যা দুই গা মুখে দিলা কি দিলা না, কাছা খুইল্যা দৌড়। আমি ডাক্তাররে জিগাইল্যাম, ভাই ভোটে জিত্যার আগে দ্যাশ চইলত কী কইর্যা? ডাক্তার উলটা আমারে ঠাসে, আরে, আগে তো আইনসভাও ছিল না, কর্পোরেশনও ছিল না। মণ্ডল আইস্যা খুইলল তো সব। বাড়ি বইস্যা কি গাব পাকাবে? আর, কী যে কইল্যা খুদদুররে, মিটিঙে কে কার ঘাড় ধইর্যা বসাইয়্যা দিছে, সে তো সারাদিন সেই এক গল্পই করে আর হাসে।’
কর্পোরেশন ভোটের সময় যোগেন একেবারে কাছেই একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। ভাড়া বললে বেশি বলা হয়। কংগ্রেসের এক নেতার এক গলি ভরা নানা সাইজের বাড়ি আছে। তারই একটা কোনো একতলায় একটা ঘরে ভদ্রলোক জোর করে যোগেনকে বসালেন। ‘আরে, আপনার তো নিজের একটা আপিস চাই নয় তো পোস্টার মোস্টার মই লেই বিবেকানন্দ সুভাষচন্দ্র থাকবে কোতায়? ডাক্তারবাবুর ঐ টুকুনি ফ্ল্যাটের ওপর কত আর চাপাবেন? তা ছাড়াও বাপপিতামর শুভ নজর তো একটা দরকার? দরকার কী না?’ রাজি হয়ে যাওয়া ছাড়া যোগেনের কোনো উপায় ছিল না। ঘরটার সঙ্গে রান্নার একটা জায়গাও আছে। আর পায়খানার দরজাটা বাইরের দিকে, ঘর থেকে বেরিয়ে দুপা এগিয়ে। সামনে গলিটা যেখানে মোড় নিল সেখানে গঙ্গাজলের একটা কল আছে কিন্তু ফুটপাথ নেই। তবে, বেশ আধা গোল করে ইট পাতা, জলধোয়ার ফলে পোড়ামাটির রঙের বাহার ঝলক দেয়। তখন বোঝা যায়, এক মাটিরই কত রং। ভদ্রলোকের পরনে ঢোলা হাতা খাটো পাঞ্জাবি আর ধুতির ঝুলটা গোড়ালির ইঞ্চি তিনেক ওপরে। গলিটার নাম অনিত্যশিখর বসাক লেন। তিনি ছিলেন কর্পোরেশনের অ্যাসেসার। সেই সূত্রেই এই এক গলি-ভরা বাড়িগুলো কিনে নিতে পেরেছিলেন। সি-আর দাশের সময়। তিনি মারা গেলে, কর্পোরেশন তাঁর এই ছেলে নিত্যশিখর বসাকের তৎপরতায়, এই নামকরণ দুই প্রান্তেই করে। বেশ লম্বা গলি। কী করে-কী করে যেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিট বা উত্তরের ট্রাম লাইনের দিকে রাস্তাটার নাম হয়ে থাকল নিত্য বসাক লেন আর ফড়েপুকুরের দিকে নাম হয়ে গিয়েছিল অনিত্য বসাক লেন। তাতেও কোনো অসুবিধে হয়নি বাবুদের বা, একটা ছোট আর একটা বড় বস্তির লোকদের। নিত্য বসাক পিতৃসূত্রে যেমন জীবিতাবস্থায় রাস্তার শিরোনাম হয়েছেন, এই বিপুল ভুসম্পত্তির মালিক হয়েছেন, তেমনি, অবসর নেয়ার আগেই মৃত্যু তাঁর বাবাকে অবসার দিয়েছে বিধায় বাবার কর্পোরেশনের অ্যাসেসরের চাকরিটিও মানবিক সহানুভূতির কারণে, নিত্য বসাকের ওপর বর্তায়। এমন সব প্রকাশ্য কারণে, কর্পোরেশনে তাঁর নিজের একজন কাউন্সিলার দরকার। যেই দাঁড়াক, জয়ী যিনি, তাঁকে নিত্য বসাক লেনে অফিস খুলতে হবে। সেটা এখন দাঁড়িয়ে গেছে, যিনি খুলবেন, তিনিই জিতবেন।
ফলে কিছুদিনের জন্য প্যারী সরকারের বাড়ির সঙ্গে যোগেনের সম্বন্ধ একটু আলগা ছিল। প্রথমদিকে দুই বেলাই খেতে আসত, তারপর একবেলা, তারপর একবেলাও না। যেখানে হোক খেয়ে নিত। উদদুর অবিশ্যি যোগেনের ভোটে খুব খেটেছিল আর ঐ অফিসেই পড়ে থাকত।
ভোট টোট চুকে যাওয়ার পর যোগেন আবার সরকার-বাড়ির দোতলার মাদুরে ফিরে এসেছে। কিন্তু তার কাজের ধরণও বদলে গেছে আর উদ্দুর-খুদ্দুরও যেন বর্ষার পাটগাছের মত ফনফনিয়ে বড় হচ্ছে।
যোগেন উদ্দুরের মা-কে জিজ্ঞাসা করে, ‘বুন, একডা বুদ্ধি দ্যাও তো কী করি?’
‘তোমারে বুদ্ধি দিব আমি? তুমি-না বুদ্ধি দিয়্যা সরকার চালাও। হইলডা কী?’
‘উদ্দুর, তুইও শোন। কর্পোরেশনের ধাঙড়-মেথররা স্ট্রাইক করছে—’
‘কী করছে কইল্যা?’
‘স্ট্রাইক। কামকামাই।’
‘তাতে তোমার কী ভাই! ঐ ধাঙড়-মেথরগ দলে যাইও না। তোমারে দেখাইয়্যা আমাগ একডা সম্মান জোটে। সেইডা বাড়াও। তা না, কোথাকার ধাঙড়-মেথর-ডোম—ছিঃ।’
যোগেন দুলে-দুলে হেসে ওঠে।
উদ্দুর ভুরু কুঁচকে চাপা গলায় বলে ওঠে, ‘একী মা? আমরা নীচজাত না? মামা তো নীচজাতের প্রার্থী হয়েই জিতল!’
‘তুই কি আগ বাড়াইয়্যা সবাক কইব্যার গিছিস যে আমরা নীচজাত? কইলকাতায় জাইতের উঁচুনিচু নাই। কাম নাই কিছু? যে গু-মুতের কথা কব্যার লাগব?’ উদ্দুরের মা ঝামটা দিয়েই উঠে গেলেন। আরো একবার হেসে যোগেন উদ্দুরকে বলে, ‘ক্যারে? করি কী?’
‘ইনভলভড় কত ওয়ার্কার?’
‘সে কেউ জানে না। বিশ হাজার তো বটেই—’
‘বলো কি মামা? এত বড় একটা ওয়ার্কিং ফোর্সের বাইরে থাকবে? মুভমেন্ট থেকে ঢিলে দিয়ো না।’
.
যোগেন ঠিক বুদ্ধি বের করতে পারছিল না কাকে কী বলবে, বলে কিছু লাভ হবে, খদ্দরের আশ্রম-টাসরমের ট্রাস্টিবোর্ড, কার সঙ্গে তার যোগ কী সেটা বাইরে থেকে আন্দাজ করাও মুশকিল। শেষে দেখা যাবে ওয়ার্কারদের কাছ থেকে যে-টাকা তোলা হয়, তার ভাগ আসে মুরুব্বি নেতার কাছেও। ব্যস, যোগেনের আমও গেল, ছালাও গেল। ধর্মঘট মেটা তো দূরস্থান—তাদের ওপর লেঠেল লাগানো হল। ধর্মঘট ভেঙে দিতে।
সবচেয়ে নিরাপদ, যোগেনের পক্ষে এ থেকে দূরে থাকা। তার তো সত্যি এরকম আন্দোলনের অভিজ্ঞতাও নেই, চেনাজানাও নেই। তার ভরসা তো নীহারেন্দুবাবু, বঙ্কিমবাবু এঁরাই। এঁরাই তো আছেন শাকিনার পাশে। যোগেনকে কোনো দরকার আছে?
দরকার যে নেই সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহও থাকত না, যদি কথাগুলো নীহারেন্দুবাবু না-বলে শাকিনা বলত। নীহারেন্দুবাবুই যে ব্রিফিং করবেন সেটা আগে থাকতে স্থির রাখতে হলে তো তাঁদের জানতে হয় যে সুভাষ যোগেনকে পাঠাচ্ছেন এই দায়িত্ব দিয়েই। সুভাষ এখন নাগপুরে, নইলে সুভাষকেই জিজ্ঞাসা করা যেত। স্টাইকটা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে অপেক্ষা করার সময় নেই।
যোগেন বুঝে উঠতে পারে না, সুভাষের ফিরে আসা পর্যন্তও অপেক্ষা করা সংগত নয়, এমন একটা যুক্তি তার নিজের কাছে এত দরকারি হয়ে পড়ল কেন? বা, সুভাষ ছাড়া তারই উদ্যোগে একটি মীমাংসার রাস্তা খুঁজতে তারই-বা এত আগ্রহ কেন?
ধাঙড়রা এমন একটা আন্দোলনে এতদূর এসেছে, এটাই যোগেনের কাছে খুব বড় ব্যাপার নিশ্চয়ই। শাকিনার নেতৃত্বের গুণ প্রায় অবিশ্বাস্য। যদিও এই ওয়ার্কাররা একই জায়গায় থাকে ও একই কাজ করে এই দুটো ঘটনার ফলেই সবাইকে এতটা জড়ো করা সম্ভব হয়েছে। যোগেনরা যদি ভাবে, নমশূদ্ররা তাদের অভিযোগ জানাতে এমন সবাই মিলে স্ট্রাইক বা জমায়েত করলেও কাজ হত, সেটা আকাশকুসুম। কেন? নমশূদ্র কৃষকদের একজায়গায় থাকা মানে তো তিন নদী ছয় বিলের কাটাকুটি। তাছাড়া, তাদের একেক জনের সমস্যা তো এক-এক-রকম, তাদের চাষও তো আলাদা-আলাদা। এই মুশকিলটা এমন করে যোগেন এর আগে কখনো বোঝেনি।
নমশূদ্ররা এক হলেও এক শূদ্র না।
সে তাহলে কেন সিদ্দিকি শাহেবকে সরাসরি জানাবে না? সিদ্দিকিশাহেবই তো মেয়র। তাহলে, এটা তো ওঁরই ব্যাপার। তার ওপর মেয়র হয়েই এত বড় একটা হরতাল মেটাতে পারলে, সিদ্দিকিশাহেবের নাম ফাটবে। তারও ওপর সিদ্দিকিশাহেবের সঙ্গে যোগেনের ঘনিষ্ঠতাই আছে, আইনসভার কাজে। সিদ্দিকিশাহেব যদি আঙুল তুলে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলেন, সকলেই বোঝে কিছু গোলমাল হয়েছে। অনেক মেম্বারই তখন বাইরে একপাক ঘুরে আসতে যান। সিদ্দিকিশাহেব ছাড়ার পাত্র না। আর তখন হালকা সভায় যোগেন সিদ্দিকিশাহেবের সঙ্গে একটা হাসি লেনদেন করে। দুই উকিলের পেশাদারির স্বীকৃতি। মিটিঙের বাইরে সিদ্দিকিশাহেব যোগেনের কোনো-কোনো পয়েন্ট নিয়ে বাহাদুরি দেন, আলোচনা করেন, খাতির দেখান। সিদ্দিকিশাহেবের মেজাজে সমস্যাটা বুঝতে আর মেনে নিতে কোনো অসুবিধে হওয়ার কথা না। কংগ্রেসের বা লিগের বড় নেতাদের কেউ হলে তো এরকম তোলা তোলার ঘটনাই মানত না, বলত অসম্ভব। যোগেনের বুদ্ধি সেটুকু পেকেছে যে বোঝে, যে যত জোরে অস্বীকার করে তার তত বেশি মাছের মা-র চোখের জল। সে-জল মোছাতে কে পারে? তাই তো, সিদ্দিকিশাহেবের মত মেয়র, তাঁকে এমন রগড়ের কথার রসই আলাদা।
যোগেন ঘরে ঢুকতেই সিদ্দিকিশাহেব বললেন, ‘যোগেনবাবু, যদি আপনার এমন কোনো ইমার্জেন্সি থাকে যে আপনি আমাকে বলেই সেখানে না গেলে কেউ মারা যাবে, তাহলে আপনি আর ঝুটমুট কুরসিতে বসবেন না। যা জানাতে এসেছেন, জানিয়ে তুড়ন্ত চলে যান।’
‘তবে যে শুনি লখ্লউ খানদানির সব রসের গল্প, মোকান পুড়তেছে তো পুড়ুক, তাই বল্যা কি বাপঠাকুরদার চলন বদলাইব?
খুব হেসে উঠে সিদ্দিকি বলেন, ‘আপনার দুটা ভুল। তবে আমি কিছু দোষ ধরছি না। ওয়ান, আমার শহর দুটো—এক, বম্বে, জন্মসূত্রে, দুই, কলকাতা, আর সব সূত্রে। যোগেনবাবু, লখনৌভি বললে আমাদের জাতে একটু লাগে। থাবড়া মেরে আমার রাজ্য কেড়ে নিয়ে কলকাতায় জেলখানায় রেখে মসজিদ আর কবরস্থানের নাম নবাবের নামে দেয়া! ধুস, সব বেফিগারি নওয়ার। আমাদের ঘরানা হচ্ছে মুম্বইয়ের বিজনেস কমিউনিটির। পারসিদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে ব্যবসা করি, এখন শাহেবদের টক্কর নিচ্ছি। দেখুন, কলকাতা ছাড়া আর-কোথাও আমরা ওয়েস্টার্ন মুসলিম বলে খাতির পাই না। আর আপনি কি কখনো পারসি ব্যবসায়ীর পার্টনার হয়েছেন? ‘আপনার সঙ্গে কথা বলার এটাই বিপদ। আরে, আমরা বাঙালি হিন্দুদের চাঁড়াল। ব্যাবসা? কী যে কন!’
‘কিন্তু আপনাকে এইটুকু অ্যাডভাইস করি, আপনাদের সামনে তো গোটা জীবন পড়ে আছে। যদি কখনো সুযোগ পান, এই এক্সপিরিয়েন্সটা করে নেবেন। ধরুন, পার্সি পার্টনারের সঙ্গে আপনার এত দোস্তি যে রাতে একসঙ্গে শুয়ে আছেন। সকালে উঠে দেখলেন, আপনার গায়ের পুরা চামড়াটা চেঁছে খুলে নিয়ে পাশে মুচির দোকানে বেচে দিয়ে আবার আপনার পাশে শুয়ে বাকি ঘুমটা সেরে নিচ্ছে। আমরা ওদের কাছ থেকে বিজনেস টিপস নিয়েছি। দেখছেন-না, মুম্বই ঘরানার এক মুসলিম, কংগ্রেসি গুজরাতি বানিয়াকে কী ঘোল খাওয়াচ্ছে! নাউ, উই মে টক শপ। যদি আপনার কোনো টক থাকে। না-থাকলে, যেমন চলছে চলুক আড্ডা।’
‘আপনার এই বুদ্ধিডা সবাই ধইর্যা ফেলাইছে। এমন আড্ডা দিবেন যে কেউ আর কামের কথা তুইল্যাবার পারব না।’
‘না, না। এটা আমার বদনাম। আমি কখনো আড্ডার পিওরিটি, বিজনেস মিশিয়ে নষ্ট করি না। এটা খুব বড়দস্তুর আপনাদের, বাঙালি ভদ্রলোকদের। সেজেগুজে আসে আড্ডা মারতে, কিন্তু এসেই ভাব দেখাবে খুব আর্জেন্ট কাজ আছে।’
‘এইডা আবার কী কন। চারিদিকে তো বাঙালির সুনামে কান বন্ধ—এমন আড্ডাবাজ লোক নাকী দুনিয়ায় নাই। আবার, একই দুর্নামে রাস্তায় চলা যায় না। বাঙালির নিন্দায়—এমন আইলস্যা জাইত দুনিয়ার বার।’
‘কী বললেন কথাটা? আইলস্যা? আমি জানি না কথাটা আমি জানি কী না। আ ইল স্যা। মতলব কী?’
‘আরে কী যে কন, আইলস্যা মিনস আইলস্যা। মিনস আয়ডল, লেজি। আইলস্যা—‘ সিদ্দিকিশাহেব ঘর ফাটিয়ে হাসতে-হাসতে মাঝখানে বলে নেন, ‘সরি, সরি, আলসে! আরে আমি তো ভুলে গেছি আপনারা বাঙাল। আমরা তো আবার কলকাতার ঘটি। কী বললেন, আলইস্যা? না। হল না। আলসে।’
সিদ্দিকিশাহেবের হাসি থামলে যোগেন হাতজোড় করে বলে, ‘এবারে কি আমারে মুখখোলার এড্ডু সুযোগ দিবেন? কেন আইছি?’
‘আপনার বেলায় সেটা আমি পারব না। আমার ঘরানায় বাধবে। আমার বন্ধুরা কি আমার কাছে কোনো কাজ নিয়েই আসেন? আপনার খেয়ালে আসেন না! যদি কিছু জানানোর থাকে জানাবেন। আপনার যদি কিছু বলার থাকে, বলুন। আর, যদি না থাকে, আপনার দুশ্চিন্তার কারণ নেই—আমি একাই দুজনের সমান কথা বলে দেব।’
যোগেন কী বলবে, কতটা বলবে, কোন্টার পর কোন্টা বলবে—সে সব ভেবে এসেছিল, তেমন ভেবে আসাটা তার অভ্যাসে ঢুকে গেছে। সিদ্দিকিশাহেব যে দুটো-একটা কথা জিগগেস করলেন ও যোগেন সেসবের যেটুকু জানে সেটুকু উত্তরে মোটামুটি কেসটা যাকে বলে হাজির করা হল। যোগেন বুঝে নিল, ‘সিদ্দিকিশাহেবের নিজের সূত্রে জানা খবরও আছে। যোগেন যখন তার কেসটা হাজির-করা শেষ করল, তখন সিদ্দিকিশাহেব পাশে-রাখা একটা ঢাকনা নামিয়ে কাচের গ্লাশ থেকে একচুমুক জল খাওয়ায় যোগেন বুঝে যায়, এবার সিদ্দিকিশাহেব কথা বলবেন।
‘ওদের তো ইউনিয়ন বা স্ট্রাইক কমিটি আছে, তারা কেউ না-এসে আপনি এলেন-যে!’
‘এডা আপনাকে কি জব শুইন্যা বুইঝতে হব। হরতাল চূড়ায় উঠছে। অ্যাহনি একডা সমাধান না পাইলে গড়াইয়া পড়ব। নেতারা কেউ আইলে খবর রটবে—মেয়রের কাছে গিছে মেথরেরা। আপনে ডাইকলে আইসবে। আপনে যে ডাকছেন সেটা বেবাকরে জানাইয়া তারপর আইসব। আর, আমারে ক্যান? না। সকলের সব সন্দেহের বাইরে। বরিশালের লোক আর কী কইরবে কর্পোরেশনে?’
‘বরিশালের লোক যদি কলকাতার বুকে খাড়াইয়া কর্পোরেশনের ভোটে জেতে, তাহলে সে সন্দেহের ভিতরে ঢুকে পড়তে পারে না? আমি এই স্ট্রাইক সাপোর্ট করি। ২০,০০০ ধাঙড়কে এক করা কি চাট্টিখানি কাজ? শাকিনা অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। কিন্তু আমার ধারণা, কেউ ওদের দিকে ফিরেও তাকাবে না। ২০,০০০ ধাঙড়, লেড বাই আ উওম্যান—এটার কি কোনো দর আছে আমাদের রাজনীতিতে, মানে, পাবলিক রাজনীতিতে? তার ওপর আপনার মত নন-আপকানট্রি মুসলিম এমএলএ হচ্ছেন, প্রধান নিগোসিয়েটার।’
‘সেডা না-হয় হইল। কিন্তু আমি কী কইর্যা নন-আপকান্ট্রি মুসলমান হইল্যাম, সেইডা তো বুইঝল্যাম না।’
‘সেটা বোঝা না-গেলেও তো ঠিক। আপনি নন-আপকান্ট্রি এটা তো ঠিক, মানে, ডাউনকানট্রি বললেও কম বলা হয়, কাঠ-বাঙাল। আপনি মেইনস্ট্রিম পলিটিক্সের বাইরে, মানে হকশাহেবের প্রি-ইলেকশন প্রজাপার্টির হলেও হতে পারেন কিন্তু তার শেপ এখন যা তাতে তো সুপার-মেইন-স্ট্রিম। আপনি মহাসভা না, লিগ না, কংগ্রেস না—তাইলে তো বাকি থাকে দেশি, বাঙালি, মুসলমান। আপনে সেই স্ট্যাটাসই ভোগ করেন, আমাদের বড়ি-পলিটিতে। নাম যাই নেন। যেটা বলার তা হল, এই ধাঙড়-মেথর ধর্মঘট আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনার সমমর্যাদার ঘটনা। কিন্তু সে মর্যাদা দেয়া হবে না। এবার বলুন—কোনটুকু অন্তত করতেই হয়, টু মেক ইট এ সাকসেস।’
যোগেন বলে, ‘তাইলে আমি অগ বলি গিয়া যার যার পাঁঠা, স্যায় স্যায় কাটো।’
‘সেটা সম্ভব হলে ওরা আপনাকে পাঠাত না। আমি বলি যেটা রিয়্যাল ডিম্যান্ড অর্থাৎ ধাঙড়দের প্রাপ্য মাইনে থেকে বেআইনি তোলা—এর কিছু করা যাবে কী না, জানি না। অন্তত কারা সেটার খাতক সেটা না জেনে। কিন্তু এটা নিশ্চয়ই আমি বলতে পারি যে আমার কাছে অনেক নালিশ এসেছে—মজুরদের প্রাপ্য টাকা দেয়া হয় না, মাইনের টাকাও পুরোটা দেয়া হয় না, অন্য যেসব উপকার ওদের পাওয়ার কথা সেসব দেয়া হয় না। এইসব বিষয়টি এনকোয়্যারি করার জন্য আমি একটা কমিটি করব ও তাঁদের অনুরোধ করব একমাসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে। তারপর দেখব কী কতটুকু করা যায়। আমি আপনাদের আজ এইটুকুই বলতে পারি—মজুরদের টাকা-খাওয়া ধর্মে মহাদোষ, প্রায়শ্চিত্য করতে হয়, খোদার দরবারে গুনাহ্।’
‘ওপেন ডিম্যান্ডগুলো?’
‘সেটা তো ওরাও জানে না, আপনিও জানেন না, আমিও জানি না। যাহোক, সে একটা কিছু হবে। ধরুন, হেল্থ্ ডিপার্টমেন্টকে যদি বলা যায়, কোনো কাজ হ্যাজার্ডাস কী না সেটা জানিয়ে দিতে—সেই-বা কী করে সম্ভব। যাই করা যাক, তার যদি কোনো লেখাপড়া-জানা লোকের দরকার হয় বা যদি কারো সার্টিফিকেট দরকার হয়, তাহলে তোলা থাকবেই। এ এক অদ্ভুত প্যাঁচ। আপনি যদি ঠিক করেন, গামবুট আর গ্লাভস ওয়াকাররা নিজেরাই কিনবে, তাহলে ওয়াকাররা কুপন বিক্রি করে ক্যাশ নেবে। আপনি যদি ঠিক করেন, ঠিকেদার বা বাবু কিনে দেবে, তাহলে বাবু-ঠিকেদার ঐক্যে অদৃশ্য সব ক্রয়বিক্রয় ঘটবেই। সিস্টেম একটা শাহেবরা বানিয়েছে বটে, যাই করুন, পিকপকেট হবেই। যদি পকেটমার না-পাওয়া যায়, তাহলে নিজেই নিজের পকেট কাটবে।’
‘এইডার জইন্যে শাহেবগ ক্রেডিট দেয়াড়া কি ঠিক হইল? তারা কি এত জাইন্যাবুইঝ্যা সব করছে? যেখানে বুঝছে, ডুবজল, সেহান থিহেই পলায়ন। শাহেবরা কী কইর্যা জাইনব কন, এই কামডা ধাঙড় ছাড়া হয় না আর সেই কারণেই তাগ থাইকতে হব শুয়ারের খোঁয়াড়ে।’
‘আপনে ভাল কথা বলছেন। হাইলি স্পেশ্যালাইজড জব মে বি ডান অনলি বাই এ গ্রুপ অব স্কিলড পিপল হু হ্যাব লার্নন্ট ফ্রম দেয়ার অ্যানচেস্টার্স দি নেসেসারি স্কিল। আর সেই কারণেই দে আর ক্যাপটিভ টু দেয়ার স্কিল। যা হোক, সেই ক্যাপটিভিটিকেও তো লজিক্যাল হতে হবে। ঐ স্কিলের সঙ্গে যা জড়িয়ে আছে, তার ব্যবস্থা করুন। যে-কাজ ধাঙড়রা করেন, সে-কাজ মদ না-খেলে করা যায় না। তাহলে ওদের মদের ব্যাপারে সাবসিডি দিন। দিন। সঙ্গে-সঙ্গে গান্ধীজির চেলারা এসে রাস্তা আটকে মাদকবর্জন
‘কিন্তু, এডা কিন্তু সহজেই করা যায়। কর্পোরেশনের কার্ড দেখালে এক পাঁইট বোতলে এত পার্সেন্ট রিবেট পাবে। এ নিয়ে তো আপত্তির অভাব হবে না। সেইজন্য এক পাঁইটের ওপর রিবেট দেয়া হবে অন দি স্পেসিফিক মেডিক্যাল নেসেসিটি। আচ্ছা, তাহলে ঐ ঠিক থাকল। আপনি আমারে চার-সাড়ে চারটায় ওদের সঙ্গে কথা বলে অলক্লিয়ার দিলে, আমি বাই-সাড়ে-পাঁচ কর্পোরেশনে পৌঁছে যাব। আমিই ঘোষণা করব।’
