১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১০৩. শিশির সকাশে হক

১০৩. শিশির সকাশে হক 

ভিতরটা প্রথমে অন্ধকার ঠেকে, আসলে হলের চাইতে আলো কম। এতক্ষণ যে স্টেজ ছিল সব আলোর লক্ষ, এখন সেটা প্রায় আবছায়া। ওপরে কোথাও মাত্র একটা আলো জ্বলছে। সেটাই শেষ সেটটাকে, উইংগুলোকে, ড্রপেরও তলার দিকটাতে আলো ও ছায়া ১০৩ দুই-ই ফেলছে। হকশাহেব আর যোগেন যে-জায়গাটা দিয়ে যাচ্ছেন সেটা স্টেজের মুখের বাঁ দিকের জায়গাটা। সেখানেও আলো নেই। কিন্তু কোথাও কোনো একটা আলোয় লম্বা-লম্বা ছায়ায় ছককাটা হয়ে আছে। সঙ্গে যে বা যারা ছিল, তাদের একজন হকশাহেবের হাত ধরেছে। 

ওখান থেকে দুই ধাপ সিঁড়ি নামতেই গ্রিনরুমে আলোতে একটা ডেকচেয়ারে শিশিরবাবু বসেছিলেন, হেদায়েত-এর পোশাকেই, মুখে দাড়িটাও খোলেননি। আরো দু-একজন বসে ছিলেন, অনেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। 

হকশাহেবকে দেখেই শিশিরবাবু চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরলেন, ‘হকশাহেব, কী যে খুশি হয়েছি। কিছুদিন আগে কাগজে দেখি আপনার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে। দেখে খুব ফূর্তি হল। যাক, এইবার হকশাহেব যেটা তাঁর নিজের জায়গা—হাইকোর্ট, থিয়েটার-সিনেমা, লাইব্রেরি—সেখানে একটু সময় দিতে পারবেন। বসুন, বসুন, বসুন।’ 

চেয়ারে যাঁরা বসেছিলেন তাঁরা আগেই উঠে গেছেন। কিন্তু হকশাহেব আর শিশির বাবুর হৈ হৈ হাসিতে পেছনের দরজাটায় লোকজনের ভিড়, তার মধ্যে কারো কারো অভিনয়ের 

পোশাক আর মুখ, মেয়েরাও আছে। 

বসে হকশাহেব বললেন, ‘তাইলে আপনার সঙ্গে এনার পরিচয় করানো দরকার। ইনি যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল অব বরিশাল। উনিই সেই অনাস্থা প্রস্তাবের নেতা ছিলেন। কিন্তু আপনার আশা পূরণে ব্যর্থ হইছে। তাই কইল্যাম, মণ্ডল, চলো তোমার ডিফিট সেলিব্রেট করতে যাই বড়বাবুর থিয়েটারে। আমার দেশের ছেলে, যারে কয় আগুনের গোলা। 

যোগেন উঠে গিয়ে শিশিরবাবুকে প্রণাম করে। শিশিরবাবু তার মাথা ছুঁয়ে আশীর্বাদ করে বলেন, ‘আপনার নাম কিন্তু আমি ভুলব না মণ্ডল অব বরিশাল’। 

‘সে তো আমার পরম সৌভাগ্য’, যোগেন গিয়ে তার চেয়ারে বসে। 

শিশিরবাবু তাঁর চিবুকটা এগিয়ে ইংরেজিতে বলে ওঠেন, ‘বাট ফর ওয়াট্ রিজন? হকশাহেব আপনাকে ইনট্রোডিউজ করে বললেন, মণ্ডল অব বরিশাল। বলতে পারতেন, মণ্ডল ফ্রম বরিশাল। কিন্তু তা বলেননি, বিকজ হি হ্যাপস্‌ টুবি এ কে ফজলুল হক অ্যান্ড নোজ হিজ ইংলিশ।’ হকশাহেব হেসে উঠতে গেলেন কিন্তু পারলেন না। শিশিরবাবু তাঁর কথা—বলার জাদুতে হকশাহেবের হাসি থামিয়ে দিলেন ও বলে চললেন, ‘ফ্রম মে মিন দ্যাট ইউ হ্যাপন টু বি বিলংগিং টু বরিশাল। কিন্তু অব বরিশাল উইল মিন দ্যাট বরিশাল বিলংগস টু ইউ।’ 

হাসাহাসি শেষ হলে হকশাহেব বললেন, ‘বাট বড়বাবু ইটস অনলি এ হাফটুথ।’

‘দেন, হোয়াট ইজ দি আদার হাফ?’ 

যোগেন কথা বলে ভাল, কথা-বলার রকমারি জানে, কথা তার মুখে আসেও ভাল। কিন্তু এ একেবারে অন্য জিনিশ, মুখ খুললেই মণিমাণিক্য ঝরছে। কী সুন্দর মুখ। অথচ পরে আছেন একটা ক্লাউনের পোশাক। 

‘এইডা ট্রুথ যে যোগেন মণ্ডল অ্যাহন বরিশালের মালেক—’ 

শিশিরবাবু উদ্ভাসিত মুখে হাততালি দিয়ে উঠলেন, ‘ব্রিলিয়্যান্ট। মা-লে-ক। নট, বাড়ির মালিক।’ 

‘আর আনট্রু হইল আমি ফ্রম আর অব-এর পার্থক্য করার মতো ইংরাজি জানি না।’

‘ইটস মোর দি রিজন দ্যাট ইউ বিলং টু ইংলিশ অ্যাজ এ নেটিভ অর ন্যাচরাল স্পিকার।’

‘একেবারেই না বড়বাবু। ইংরাজিতে তো বরিশালি টান আসে না। তার লগে শাহেবগ ইংরাজির লাগান শোনায়।’ 

যোগেন চায়নি কথা বলতে, তার মুখ ফশকে বেরিয়ে যায়, ‘তাইলে তো দাঁড়ায় বরিশাইল্যা ভাষা উইদাউট বরিশ্যাইলা টান মেকস দি কিংস ইংলিশ’ বলেই যোগেন মনে-মনে অপ্রস্তুত হয়ে যায়, এ সে কী করল, কথাটা বললই-বা কেন আর ইংরেজিতেই-বা কেন। ওঁরা কেউই যখন হাসলেন না, তখন যোগেন নিজের মুখেই একটা হাসি ফুটিয়ে রাখল। 

ততক্ষণে শিশিরবাবু ঘাড় নুইয়ে তাঁর ডানহাতের পাতাটা চোখের নীচে মেলে ধরে, বাঁ-তুর্জনী দিয়ে পাতার ওপর ঠুকতে-ঠুকতে যেন মনে বলছেন, এমন নিম্নস্বরে বিড়বিড় করেন, ‘তাহলে—মানে ফর্মুলাটা কী দাঁড় করালেন, বরিশালের ভাষা থেকে বরিশালের টান বাদ দিলেই সেটা কিংস ইংলিশ। এ তো ওয়ান্ডারফুল, ডিসকাভারি। সেই কারণেই বরিশালের লোকরা ভাল ইংরেজি লেখে।’ 

এইবার দু-জনের হাসি শুরু হয়। শিশিরবাবু যা বললেন তাতে যে যোগেন শ্বাস ফেলার স্বস্তি পেল, একেবারেই তা নয়। যে-স্বরে ও যে-মুদ্রায় শিশিরবাবু কথাটা বললেন, তাতে যোগেন এতই মুগ্ধ হয়ে যায়, যে, সে ভুলেই যায় নিজের বোকামো। 

শিশিরবাবু বলে ওঠেন ‘হকশাহেব, আপনার কাছে তো সব শো-এর চিঠিই যায়। আপনি যখনি আসবেন, প্লিজ মেক এ নোট অব ইট যে যোগেনবাবু অ্যাকম্প্যানিজ ইউ।’

‘আমার তো সব সময়ই মন উড়ান দেয়, যাই একবার বড়বাবুরে স্টেজে দেইখ্যা আসি, নয়নারাম, আত্মারাম, শ্রবণারাম। অ্যাহন মণ্ডল তাগাদা দিলে আমি ওর লগে পালাইতে পারব।’ 

‘সরি, যোগেনবাবু, আমাকে মার্জনা করবেন। আপনি কেন হকশাহেবের ওপর নির্ভরশীল থাকবেন। আপনি আপনার খুশিমত আসবেন। হকশাহেবও আপনার সঙ্গে আসবেন। আমার পক্ষে এটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হল—’ছী’, শিশিরবাবু কাকে ডাকলেন, কেউ একজন এসে মাথা নিচু করলে শিশিরবাবু বললেন, ‘এখন থেকে ওঁকে মনে করিয়ে দেবে প্রত্যেক শোয়ের আগে। শ্রীযোগেন্দ্র নাথ মণ্ডল, রাইটার্স বিল্ডিংস।’ 

‘কিন্তু মন্ডলরে পাঠাইতে গিয়্যা আমারডা আবার বিষ্ফরণ না হয়। আমি তো একা-একা থিয়েটার দেখব্যার পারি না, ডর লাগে।’ 

‘সে আবার কী। থিয়েটার কি সার্কাস যে বাঘ-সিংহ দেখে ভয় পাবেন?’ 

‘আমি আসলে গুল্যাইয়া ফেলি কোনটা থিয়েটার। মনে হয়, যা দেইখতেছি, আমি তার পার্ট। তাও না। মানে, সেড়া আমারও অ্যাকশন।’ 

‘মানে, চটি ছুঁড়ে মারেন? বিদ্যেসাগরের মত? থিয়েটারে গল্প আছে।’ 

‘না। মনে হয়, তার থিক্যা বেশিই। সন্দেহজনক। বহুকাল থিক্যা তো থিয়েটার দেখতেছি। স্বভাব বদলাইল না। তবে আপনার আইজক্যার থিয়েটারের মত থিয়েটারে তেমন হয় না।’ 

‘মানে, আজকের থিয়েটারটা আপনাকে খেপাতে পারেনি?’ 

‘না। এডা তো নানা বিষয়ে আলোচনামূলক নাটক। হিন্দু কী, মুসলমান কী, আবার হিন্দু-মুসলমান মিল্যা কী। আর কোনো তো কী হব, কী হব, এমন উদ্বেগও নাই। তবে, আপনের নতুন রূপ দেখা তো এক সৌভাগ্য।’ 

‘এমন কী আর? আমি তো নিমে দত্ত করেছি।’ 

‘এখন একবার করেন, বড়বাবু।’ 

‘সেটা একা-একা দেখতে ভয় করে?’ 

‘না-আঃ। হাসি আর কৌতুকড়া তো কমন। সবাই হাসে, হাততালি দেয়। একবার হইল কী, নাইনটিন টুয়েলভে ঐ দিল্লির দরবার-টরবার হইল না। খাশ শাহেবগ একডা দল আসছিল শেক্সপিয়্যার নিয়্যা 

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওটা একটা দল ছিল না, একটা কম্বিনেশন দল ছিল। গ্রিফিথ ছিলেন। থর্নডাইক ছিলেন। ইয়াগো করেছিলেন এক ছোকড়া। হ্যানসেন। সে তো ভিলেইনের ধারণাই বদলে দিল। আমাদের প্রফেসররা, বিশেষ করে প্রফুল্ল ঘোষ তো রেগেই গেলেন। আমার তখন ফিফথ ইয়ার।’ 

‘আমি তো তহন চাকরি ছাইড়্যা আশু মুখার্জির জুনিয়ার, হাইকোর্টে। ম্যাকবেথ দেইখতেছি। যেই ফার্স্ট অ্যাক্ট সিন সেভেনে ম্যাকবেথের সলিলকির পর এনটারস লেডি ম্যাকবেথ, আমি চিল্লায়্যা উঠছি, ম্যাকবেথ, বৌয়ের কথা শুইনো না, সর্বনাশ হইব। আমার চিক্কুর থামার আগে কাল ড্রপ গেল পইড়্যা, হলের লাইট সব গেল জ্বইল্যা, বিবির চোখ সরমে ঢাকা। দুই দুইডা গোরা পুলিশ অফিসার আমার রোয়ের দুই দিকে আইস্যা খাড়ায়। আমি ভাইবল্যাম, হইছে, সারা রাত্তির হাজতবাস। বিবিরে কইল্যাম—আমার লাইগ্যা ভাইব না, গাড়িডা খুঁইজ্যা বাড়ি চইল্যা যাঁইয়ো। 

হকশাহেব, আপনিই পারেন, নিজেকে সারপাস করতে।’ শিশিরবাবু নিজের বাঁ হাঁটু বাঁ হাত দিয়ে থাবড়ালেন, উচ্চ থিয়েটারি ভঙ্গিতে, তারপর হা হা হেসে উঠে বললেন, ‘গডস ওন একটিং’। তারপর? 

আমার তহন একটু-আধটু নামগাম হইছে, হাইকোর্টে। কিন্তু ঐ গোড়া পুলিশ আমারে যা পিটাইব। সময়ডা তো খারাপ–টেররিস্টগ ডরে শাহেবগ বিচি উইঠছে কপালে। যাই হোক—হাইকোর্টের এক জজশাহেব ছিলেন, তিনি উইঠা আইস্যা আমারে জিগান—তুমি কি ইনভলভড নাকি, এ-সব গোলমালে। তারে পাইয়্যা য্যান মহাদেবের দুইডা পাও একডা মুঠাতেই পাইল্যাম। জজশাহেবরে কইল্যাম,—আমি স্যার থিয়েটার ভুইল্যা থিয়েটারের মইধ্যে ঢুইক্যা গিয়া ম্যাকবেথরে কইছি—বৌয়ের কথা শুইন্যা ঐ কাম কইরো না ম্যাকবেথ। সে জজশাহেবও ছিল একটু থিয়েটার-পাগলা। আমার কথা শুইন্যা বলে, সত্যি এত ভাল অভিনয় করছে যে আমিও তোমার মতন চিল্লায়্যা উইঠবার পারতাম। জজশাহেব পুলিশ-টুলিশ সরাইয়া ঘটনা কইয়া দিলেন। মাইক্রোফোনে, আরে অরাই নিয়্যা আইসছিল বিলাত থিক্যা, এক মেমশাহেব খুব নরম গলায় কইলেন, আমাদের একজন দর্শক অভিনয় দেইখ্যা মেসমেরাইজড হইয়্যা ম্যাকবেথরে বাঁচাইব্যার লাইগ্যা কথা কয়্যা ফেইলছে। তারে ধইন্য ধইন্য দেই। আপনারা সিট লন। হলের আলো নিবব। ড্রপসিন উইঠব। তাই হৈল। তহন ঐ অন্ধকারে বিবি কয়, আমার গাও ঘুল্যায়, বাইরে চলো। কে কী শুইনল, কেডা জানে। একজন হাত বাড়াইয়্যা আমার বিবিরে লজেঞ্চুসের মত কিছু দিল। তারপর থিক্যা কোনো সাহায্যকারী না নিয়্যা আমি থিয়েটারে ঢুকি না। থিয়েটার দেখা না দেখা সেডা তো বিষয় না। নিজেরে বাঁচানোডা অবশ্য কর্তব্য। মণ্ডল লগে থাইকলে ভরসা পাই। বিকজ অব মাই এজ, বিকজ বোথ আব আস বিলং টু দি ডিস্ট্রিক্ট অব বরিশ্যাল এবং বরিশাইল্যারে বরিশাইল্যাই যদি না বাঁচাইব, তয় বাঁচাবে কেডা।’ 

যোগেন বলে, ‘যারে কইবেন, স্যায়ই তো আপনার লগে আইসব। আমার তো সবড়াই সৌভাগ্য।’ 

গল্পটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবার একটা সবাই মিলে হাসাহাসি হল। সেই হাসিটার শেষে হকশাহেব হাত জোড় করে বলেন, ‘বড়বাবু, যদি অনুমতি করেন, আইজ তাইলে ছুটি অনুমোদন করেন।’ শিশিরবাবু ও হকশাহেব যে যার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন, পরে যোগেন। হকশাহেবের একটা ভঙ্গি থেকে বোঝা যায় উনি বেরবার পথটা খুঁজছেন। হেদায়েতের পোশাকে শিশিরবাবু ডান হাতটা দিয়ে পথ দেখিয়ে এগিয়ে যান ‘ম্যাকবেথ’ নিয়ে যে আড্ডা হচ্ছিল, সেই সূত্রটা ধরে, বিড়বিড় করতে-করতে। 

ইফ ইট অয়্যার ডান, হোয়েন ইট ইজ ডান, দেন ইটয়্যার ওয়েল 
ইট ওয়্যার ডান কুইকলি : ইফ দ অ্যাসাসিনেশন 
কুড ট্র্যামেল আপ দি কনসিকুয়েন্স, অ্যান্ড ক্যাচ 
উইথ হিজ সুরসিজ সাকসেস; দ্যাট বাট দিস ব্লো 
মাইট বি দি বি-অল অ্যান্ড এন্ড অল—হিয়ার 

হেদায়েত খাঁ সাজা শিশিরবাবু কিছুটা আপন মনে, কিছুটা আপ্যায়নে, হকশাহেবের প্রতি মনোযোগে ম্যাকবেথের স্বগতোক্তি আবৃত্তি করতে-করতে চলেছেন বড় গ্রিনরুমের ভিতর দিয়ে। সে গ্রিনরুমে ততক্ষণে সকলেরই পোশাক খোলা ও রঙ তোলা হয়ে গেছে। তারা নিজেদের স্বাভাবিক পোশাকে ও চেহারায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল শহরের সান্ধ্য রাস্তায় যেন। একমাত্র শিশির ভাদুড়ীর শরীরে পোশাক, মুখে নুর ও রং, চোখে গভীর কাজল। যেন এটা নাটকই, ‘ম্যাকবেথই, যেন মঞ্চেই, হেদায়েত খাঁ-র যে পোশাক থেকে হলে কৌতুক ও হাসি উথলে তুলেছিলেন ঘণ্টা খানেক আগে, সেই পোশাকের ভিতর থেকেই উঠে আসছে, আত্মমগ্ন ম্যাকবেথের শেষ যুক্তিশীল দ্বিধা। এই লোকজন, এই একটু চলাফেরা, এই একটু ভিড়ও যেন মঞ্চনির্দেশে আছে। 

দিস ইভন-হ্যানডেড জাস্টিস 

কন্ডেস দ ইনগ্রেডিয়েন্স অব আওয়ার পয়জেনড চ্যালিস—বলতে-বলতে শিশিরকুমার দাঁড়িয়ে পড়েন, হকশাহেবের কব্জি ধরে ঝাঁকান আর ঠোঁট-চিবুক মিলিয়ে বানরের মুখের মত একটা ভঙ্গি করেন। 

বাইরের মাঠটাকে আলো করে দিয়ে হকশাহেবের গাড়ি আর সার্জেন্টের বাইক একই সঙ্গে আওয়াজ তুলল। 

শিশিরবাবু যোগেনকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘খুব ক্র্যাশ শুনিয়েছে-না ঐ হিন্দু-মুসলমান নিয়ে ডায়ালগগুলো?’ 

হকশাহেব একটু আগ বাড়িয়েই জবাবটা দিলেন, যাতে যোগেন কিছু বলে না বসে, ‘থিয়েটারে একটু-আধটু ক্র্যাশ না-থাইগলে ভালও লাগে না। ও আপনে ভাববেন না বড়বাবু মুসলমান দর্শকরাও তো ক্ল্যাপস লাগাইল।’ 

‘এই কথাটাই তো বিপদের। আমরা স্টেজে একই সঙ্গে হিন্দু কমিউন্যালিজম আর মুসলিমস সেন্স অব হিউমারকে সুড়সুড়ি দিচ্ছি। ১৯০৭-এ লেখা নাটক। তখন তো স্বদেশীর জোয়ার। কী করব? দল রাখতে হয়। আমি তো মহবৎ করি। ক-দিন রিহার্সাল দিয়ে নিজের মুখে কথাগুলো বলতে খুব খারাপ লাগল। কাউকে কিছু বললাম না। এর মধ্যে আমার কানে এসেছে দলের ম্যানেজাররা কানাঘুষো করছে, এখন তো রোজই রায়ট হচ্ছে, নাটকটা বেশ লোক টানবে। গতকালই মাত্র বলেছি—আমি হেদায়েতে নামব। কী করুণ আত্মরক্ষা, ভাবুন। কাউকে কিছু বলতে পারব না। আর, নিজে ভাবব, যাক বাবা, লোকে তো এটা বলতে পারবে না যে শিশির ভাদুড়ী এইসব বলল। এখন আবার নিজেই ভাবছি—হেদায়েতে নামার ডিসিশনটা ঠিক হয়েছে। লোকজন হিন্দু-মুসলমানের ঝগড়াঝাঁটি ভুলে হয়তো হেদায়েতকে নিয়ে মজায় ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তবে, আপনাকে আর মনের দুঃখ বলে লাভ কী? আপনাকে তো এই সব করেই গবমেন্ট চালাতে হয় আর নো-কনফিডেন্সের মুভারকে বডিগার্ড করে থিয়েটার দেখতে হয়—!’ সিঁড়ির ওপরে চৌকাঠের ঘেরে শিশিরকুমার, সিঁড়ির মাঝখানে হকশাহেব। যোগেন মাঠে। শিশিরবাবু আর হকশাহেবের মিলিত সরব হাসিতে ঝমঝমিয়ে উঠল থিয়েটার পাড়া। 

হকশাহেব নেমে হাত নেড়ে গাড়ির দিকে এগলেন। 

যোগেনের কী একটা দুঃখ হল শিশিরকুমারের দিকে তাকিয়ে, বলে উঠল, ‘এই সব বলা আর শোনা মানুষের অভ্যাসে ঢুক্যা গিছে। এগুলা কিছু বুঝায় না। কারোই ব্যক্তিগত দোষ নাই’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *