১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১২৫. চরভাসান থেকে বরিশাল : নদীর নৈরাজ্য

১২৫. চরভাসান থেকে বরিশাল : নদীর নৈরাজ্য 

গতকাল মুলাদি থেকে নামার পথে, নদী ও হাওয়াকে ফাঁকি দিতে শানু আড়িয়াল খাঁর একটা সোঁতা দিয়ে নয়াভাংগানিয়া নদীতে ঢুকেছিল। লতা নদী পর্যন্ত যায়নি। আর যোগেনও আর না-এগিয়ে ভাষানচরেই নোঙর করতে বলেছিল। সব মিলিয়ে নিজেদের সাহস আর নিজেদের বুদ্ধির ওপর ভরসাও একটু অসাবধানে বেড়ে গিয়েছিল—মাঝি কোনো বড় বিপদ কাটানোর বাহাদুরি মনে জমতে দেয় না। মনে তেমন জমতে দেয়া নিষেধ। ওদের মনে রোজকার ভাবটাই ফিরে এসেছিল—যেন দুর্যোগ আর হাওয়া নেই। চিরভাষান থেকে বরিশাল আর কতটুকু। নদীর যে বেগ তাতে নৌকো ছাড়া আগেই পৌঁছে যাবে। ফেরার সময় জোয়ারের বেগ ধরতে পারলেও এই একই সুবিধে। ভাসানচর থেকে পাড়ি দিতে হবে আড়াআড়ি—শায়েস্তাবাদ। তারপর পাড় ঘেঁষে ঘেঁষে সাবধানে শায়েস্তাবাদের তলার রাজাগুরু-আড়িয়াল খাঁ-কীর্তনখোলার তেমোহনটা গড়িয়ে গেলেই কীর্তনখোলায় পড়বে। কীর্তনখোলা মানে তো বরিশাল। এই হিশেব থেকে ঠিক তেমোহনার আগে শানু শায়েস্তাবাদের পুবসীমায় চরজংলার ধারে নৌকোটাকে নিয়ে যেতে পরল। ওখানে একটা ছোট তেমোহনা আছে কীর্তনখোলা-শায়েস্তাবাদ-খাঁড়ি আড়িয়াল। এবার ওরা কীর্তনখোলা দিয়ে ভেসে নামবে-বরিশাল তো এসে গেল। শানু শেখ চিৎকার করে ওঠে নদী-হাওয়ার সব আওয়াজ ছাপিয়ে, ‘দ্যাখরে ছ্যামড়া মাঝি, বৈঠা জলে না ফেলাইয়া কেমন ভাসা যায়।’ এই ছোট তেমোহনাটা শাহুর হিশেবে ছিল না, ছোট তেমোহনা যে বড়টার সঙ্গে মিশে গিয়ে থাকতে পারে—এটাও শাহুর মাথায় খেলেনি। ওরা সেই ছোট তেমোহনা পার হয়েই গেছে প্রায়। ওটা আসলে তিনমোহনা না, চারমোহনা। বরিশালের নদীর মোহনা গুনতে গেলে সংখ্যা শেষ হয়ে যাবে। এটা চারমোহনা হওয়ার সুবাদ—তেমোহনার ঠিক আগেই একটু ওপরে, শায়েস্তাবাদ থেকেই সরু একটা নদী বেরিয়ে একটা ছোট পাক দিয়ে তেমোহনার ঠিক পরে শায়েস্তাবাদেই মিশেছে। এমন এক-পাকের নদী, ভুলে যাওয়া নদী, গিঁঠ-না-খোলা নদী, ফাড়া নদী, খিটকেলে নদী, বরিশালে আর নোয়াখালির তলায় বাঁশবনের মত অজস্র, তার শুরু নেই, শেষ নেই আর রাতদিন দিনরাত বাঁশবনের মধ্যে পথ হারানো হাওয়াদের পথখোঁজার আওয়াজ। 

বড় তেমোহনা পার হওয়ার পর শানুর জয়ধ্বনির পর, প্রায় গায়ে গায়েই, নৌকাটা যেন জলের স্রোতের ধাক্কায় বাঁয়ে একটু বেশি কাত হয়। শানুর লাফালাফিই এর কারণ—এমন মনে হতে-না-হতেই নৌকো একটা কোন্ উল্টো টানে একই নদীর অন্য—একটা স্রোতে ঢুকে যায়। এমন পাক বড় নৌকোয় ঠেকানো যায় না—নৌকো ডুবে যায়। ডুবে যাওয়ার পর, বাঁচামরা ভেসে যাওয়া ঘটে যাবার পর, পুরনো মাঝিরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে বুঝতে চায়—কিছু করে কি ডুবি ঠেকানো যেত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেসব বোঝাবুঝির কোনো মানে থাকে না। কারণ নদীর স্রোতটাই তো বদলে যায়, ঠিক ডোবার সময়ের নদীটাকে তো আর পাওয়া যায় না। সবাই-ই জানে—এই ডোবার কোনো ঠেকনা নাই। তাই এমন মরণডোবা সংক্রান্ত অনেক প্রবাদ-নিষেধ চালু আছে। কোনো-কোনো মাঝি আছে যারা সারা জীবন বহরের নৌকো নিয়ে সমুদ্রের ভিতরের নদী পথ দিয়ে যাতায়াত করে, তাদেরও মধ্যে দু-একজনরেই মাত্র জলের দিকে তাকানো দৃষ্টি জলের ভিতরে অনেকটা যায় আর ঐরকম দু-একজনই নদী-সমুদ্রের আকাশের পথ চেনে পেঁচার মত। তবে, সেসবও গল্পকথায় গীতে-গানেই শোনা যায় বেশি। যে-বিদ্যা দেখা যায় না, শোনা যায় না, তার ওপর মানুষের শরীরের ভালমন্দ আছে, চোখের দৃষ্টির কমাবাড়া আছে, নিদ্-জাগরণের প্রভাব আছে, তবু, লোকের মুখে মুখে এসব প্রবাদ-নিষেধ ছড়িয়েই থাকে—বাওজল চেনা নাই, সে-জলেরে বিশ্বাস নাই; হাইল ধরো য্যান সামনে কুম্ভীপাক; ডোবার কালে কারণ খুইজো না; দুই ঘাটের মাঝখানে শুধু মরণ যাহে; ডুইবব বুঝলে উলট্যা ঝাঁপ (নৌকো যেদিকে হেলে সেদিকেই ডোবে, মাঝিই সবচেয়ে আগে টের পায় ডুবছেই, তখন আর নৌকো বাঁচানোর চেষ্টা না করে, যেদিকে নৌকো হেলছে তার উলটোদিকে ঝাঁপ দিয়ে জলে পড়ে নিজের প্রাণ বাঁচাও, আপনে বাঁচলে বাপের নাম, হেলাদিকে ঝাঁপ দিলে মাঝি নিজের নৌকোতেই চাপা পড়তে পারে); যে নদী ছাড়াইল্যা সে নদীর দিকে চাইও না; সব নদীই নতুন, সব জলই নয়া জল। 

কখনো সখনো বা, বেশিরভাগ সময়ই, এক-একটা নৌকোডুবি বা লঞ্চডুবি বা স্টিমারডুবির বড় ঘটনা ঘটে গেলে লোকের মুখে-মুখে কারণও ছড়িয়ে পড়ে। যমুনায় একটা জাহাজ ডুবি ঘটেছিল দিনেরবেলা, ১৯৩০ সালে, কন্ডোর-জাহাজ নগরবাড়ি ঘাটের কাছে। সব লোকই মারা গিয়েছিল। সারদা অ্যাক্ট পাশ হয়ে গেলে মেয়েদের আর বিয়ে দেয়া যাবে না—এই গুজবে জাহাজভর্তি বর-বৌ ছিল, ছোট ছোট, বেশির ভাগই মুসলমান। সে নিয়ে অনেক গান হয়েছে—সব গানেই সারেংকে বাঁচিয়ে আর শাহেবকে দুষে। দোষগুণের সাক্ষী কেউ ছিল না। 

এক-পা-র আর-এক পা যেখানে পড়ার, সেখানে পড়ল না, হিশেব তো এইটুকু, বাঁয়ে-হেলাটা সামলে নৌকো ডাইনের স্রোতে গেল না—দুদু মিয়া এক লাফে গিয়ে হাল ধরে নৌকো যাতে বাঁয়ে আর না-হেলে। দুই চ্যাংড়া মাঝি নৌকোর আড়কাঠে শুয়ে আর উঠে, শুয়ে আর উঠে বৈঠা মারছিল। দুদু মিয়া হাল ধরতেই শানু লগি তুলে নিয়ে জলে ডোবায় ডোবানোর আগেই লগি যেন বাতাসে বা স্রোতে ভেসে যায়। শানু দ্বিতীয়বার লগি ফেলে, নৌকো গিয়ে লগির গায়ে লাগে, থরথরিয়ে ওঠে লগির ঐ সোনালি দণ্ড, যেন মনে হয়, লগিটা যে-কোনো মুহূর্তে দু-টুকরো হয়ে যাবে, অথবা শানুকে নৌকো থেকে তুলে নেবে। বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার দুই মেরু কতটুকু লম্বা, অন্তত তখন, খুব বেশি ধরলেও বুকের ভিতরে পাঁচ-ছ বারের বেশি ধুকপুক হয়নি। পেছন থেকে একটা বড় স্রোত এই নৌকো ভাসিয়ে ভেঙে পথ করে নিতে বড় ধাক্কাই দেয়। জলে ডোবানো লগিটা শানুর এমন থরথর করে ওঠে, যেন লগি ভেঙে ফেলে নৌকো সেই বাঁয়েই পাক নিল গো-ও-ও, মরণ পাক। নিল তো—’। 

নি…ল। কিন্তু গলুইটা যেন বাঁয়ে ঘুরল না। নতুন স্রোতটা নৌকোর তলা দিয়ে একটু ডান বাঁকে নৌকোর মুখটাকে ঘুরিয়ে দিল। বা পেছনের স্রোত এগিয়ে পেছনের নৌকোটার মুখ টেনে দিল। ঘুরিয়েই দিয়ে থাক আর টেনেই নিয়ে যাক, নৌকোটা যে ডুবতে-ডুবতেও ডুবল না, সেটুকু বুঝে নিতে বুকটাকে অন্তত দশবার-বার ধুকপুক করতে দিতে হয়। 

নিশ্চিত মৃত্যু থেকে এমন বাঁচা বেঁচেও কাউকে ধন্যবাদের কিছু নেই, নিজেদেরও কোনো পরিত্রাণবোধ নেই। 

শানু লগি তুলে নৌকোর ভিতরে ফেলে গলুইয়ে এসে দাঁড়াতেই দুদু মিয়া হালটা তার হাতে দিয়ে আবার তার পুরনো জায়গায় বসে পড়ে। 

নৌকো স্রোতের ওপর এত বেগে, ক্রমেই বেশি বেগে, গড়াচ্ছে যে আবার হালের পাশে লগিটা ফেলে গতি কমাতে হতে পারে। তবে, তার দরকার হল না, তার আগেই বরিশালের পাড়ঘাটা এসে গেল। সংখ্যায় কম হলেও জলপথ খোলা। ওপরের সেই হাওয়াটাও নেই। ঐ বিপদের কারণে কারো খেয়ালে আসে নি—ওপরের হাওয়াটা কোত্থেকে নেই। যোগেন সেই ভুলটা সংশোধন করতে যে খাল পথটা তারা পেরিয়ে এল, দু-সারিতে সবুজ দাগকাটা সেই আকাশখাত একবার দেখে নিল। 

দুদু মিয়া পাড়ে নেমে দাঁড়িয়েছিল। 

তার নৌকোটা এখনো আসেনি। 

তারা আবার কোন্ নদী, কোন্ খাল ধরেছে। 

যোগেন জুতোজোড়া পায়ে গলাতে গলাতে চেঁচিয়ে দুদু মিয়াকে বলে, ‘ঐ দেখা যায়, আইল বইল্যা’। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *