১৪১. পনের নম্বরের সভা
যোগেন ভেবেছিল এত কম সময় দিয়ে ডাকা সভায় আর ক-জন আসবে। কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার তো নেই, একটা স্ট্রাইককে সমর্থন জানাতে আর আপত্তি কী, যদি তারা আমাদের সমর্থন চায়। কিন্তু যোগেনেরই পৌঁছুতে আধঘণ্টাটেক দেরি হয়ে যায়—ট্রামের তার ছিঁড়ে গিয়েছিল মানিকতলায়। নেমে দেখে লাইন বেঁধে ট্রাম দাঁড়িয়ে। কোথায় ছিঁড়েছে, কখন সারবে এসব খোঁজখবরের মধ্যে না গিয়ে যোগেন তার চেনা অলিগলি দিয়ে হাঁটা দিল। পটুয়াটোলা দিয়ে এসেও দেরি হয়ে গেল। অনেকেই এসে গেছে—যারা না এলে মিটিং শুরু করা যায় না। রসিক কাকা, বিরাট মণ্ডল, সুরেন বিশ্বাস আর সুনীল বিশ্বাস দুজনেই, পি আর এখনো আসেননি, বললেন তো আসবেন, সত্যেনবাবু এসে গেছে।
যোগেনের দেখে নেয়া শেষ হলে রসিকলাল তাঁর সেই অনুচ্চ স্বরে বললেন, ‘আমারে তো প্রোফেসর ফোন কইরা বললেন, উনি আইসবেন, সঙ্গে বরিশালের অগ্নি মণ্ডলও আইসবে। ওরা আসুক।’
‘আসুক’, যোগেন সুরেন বিশ্বাস আর সুনীল বিশ্বাসের দিকে চোখ নাচিয়ে জিগগেস করে, ‘কেডা কারে ধইর্যা আইনলেন?’
‘দুইজনেই দুইজনারে—’
ধনঞ্জয় রায়ের দিকে তাকিয়ে যোগেন নমস্কার দিল। পি আর ও মুকুন্দবিহারী একসঙ্গেই ঢুকল, বরিশালের পিরোজপুরের অগ্নি মণ্ডল। মুকুন্দবিহারীকে দেখে কয়েকজন দাঁড়ালেন, আরো কেউ-কেউ নমস্কার করলেন। তিনি সবার দিকে সহাস্যে জোড়হাতে নমস্কার জানিয়ে, চেয়ার খুঁজছিলেন। রসিকলাল বলে, ‘মিছামিছি আর বসাউঠা কইরবেন ক্যা। আপনার সিটেই বসেন। পি আর একটু হেসে মুকুন্দবিহারীকে সভাপতির চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করে।
রসিকলাল বলে ওঠেন, ‘আরে প্রস্তাব-সমর্থন-টমর্থন কি তুইল্যা দিল্যা? যে-পূজার যে-মন্ত্ৰ। এ কি কুলীন পাত্র নাকী, মাইয়্যা দেইখলেই বিয়্যার টোপর মাথায় খাড়াইয়্যা পড়ব?’
যোগেন লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমি প্রস্তাব করি’, এই পর্যন্ত বলে দাঁত বের করে হাসে ও হাসিটা দেখায়, তারপর বলে, ‘কী প্রস্তাব তাতো আপনাগ সবারই জানা।’ সে এবার মুকুন্দবিহারীকে হাত দেখায় চেয়ারে বসতে। পি আর বলে দেয়, ‘আমি সমর্থন করি—। কী সমর্থন করি সে তো আপনাদের সকলের জানা।’ মুকুন্দবিহারী গিয়ে সভাপতির চেয়ারে বসেন। আবার নমস্কার করে বলেন, ‘সাগত হি সাগতনাম। যারা এখানে নিজেরাই এসেছেন, তাঁদের স্বাগত জানাই।’ উনি এরকম কোনো কথা সংস্কৃতে বলে সভা শুরু করেন, যে সভার তিনি পতি। তাঁর শ্রোতারা সংস্কৃত বলেই জানে বটে, কিন্তু উনি এই সদুক্তিগুলি বলেন, পালিভাষায় ওঁর শ্রোতাদের মধ্যে হয়ত কেউই পালি জানেন না, হয়ত বেশির ভাগই জানেন না— -পালি নামে একটা ভাষা আছে। সেজন্য তিনি বাংলাটা সঙ্গেসঙ্গে বলে দেন।
সভাপতি বলেন, ‘তাহলে সভা আরম্ভ হোক। যোগেনবাবু উত্থাপন করুন।
যোগেন তার চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়েই পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে মেলে ধরে বলে, ‘এমন কিছু কওয়ার নাই, প্রস্তাবড়া পইড়্যা দিলেই হইত। কিন্তু সকলের জানা নাও থাইকতে পারে বইল্যা ব্যাকগ্রাউন্ডটা বইল্যা নেই। আমরা অনেকে যেমন কলকাতায় কিছু কিছু খবর রাখি, অনেকেই তেমনি আমাদের নিজনিজ দেশে থাকি বইল্যা, কলকাতার সব খবরের বা ঘটনার মূল বা বদল জানি না।
‘কলকাতায় জমাদার, ঝাড়ুদার, ধাঙড়, মেথর প্রমুখ কর্মরত জনসংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ে। কলকাতা কর্পোরেশনেই সব থিক্যা বেশি কর্মী—কত তার হিশাব নাই, শুইন্যা-টুইন্যা ঠাহর হয় তিরিশ হাজার হইবই। হিশাব নাই কেন? কারণ, এরা কর্পোরেশনের লোক নন। এঁরা কনট্রাকটারের লোক। কিন্তু এগ মাইনা ও বাসস্থান ইত্যাদি কর্পোরেশনই দিয়া থাকে। আমি খুব বেশি জানি না। তবে শুনছি, বরাবরই এই চাকরির ব্যবস্থা এইরকম। এই ব্যবস্থা আইনসঙ্গত। কর্পোরেশনের আইন অনুযায়ী এই ব্যবস্থার নাম স্থায়ী কনট্র্যাকট। মানে এই কাজটার লোক কনট্রাকটার মারফৎই সংগ্রহ করা হবে। হয়ত এমন ব্যবস্থার একটা যুক্তি—এই কাজগুলি বিশেষ-বিশেষ সম্প্রদায় করে থাকে ও সেই সম্প্রদায়ের লোকজন বংশানুক্রমে পারিবারিকভাবে এই কাজ করে থাকেন। যে-কাজ তাঁরা করেন তাতে বিশেষ ধরনের দক্ষতা বা স্কিল দরকার। এরকম কর্মী-সংগ্রহ কর্পোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়।
‘কিন্তু এই লোকজনের জন্য বেশ বড় জায়গা জুইড়া বড় বড় বস্তি আছে। সেখানে আলো ও জল দেয়া কর্পোরেশনের দায়িত্ব। যাই হোক—কলকাতা কর্পোরেশন ছাড়াও অনেক প্রাইভেট জায়গাতেও এই কাজের লোক নিয়োগ করা হয়। সম্প্রদায়গতভাবে এঁরাও ধাঙড় শ্রেণির।
‘যেহেতু এঁরা নির্দিষ্ট জায়গাতে বসবাস করেন ও নির্দিষ্ট কাজ করেন, সেই কারণে এগ সংগঠিত করা সহজ মনে কইর্যা নানারকম রাজনৈতিক পার্টি এগ মতামত তৈরি করার কাজ করতেছেন অনেকদিন হয়। আমি যা শুইনছি ১৯২০ সালেই এগ একডা ধর্মঘট হয়। এইডা বুঝি নাই—ধর্মঘটটা এগ ছিল না কনট্রাকটারের ছিল। ১৯২৮ সালেও নাকী দুইবার হইছে। এবারও কর্পোরেশনের ভোটের আগে একটা ধর্মঘট শুরু হইয়্যা থাইম্যা যায়। নতুন কর্পোরেশনের কাছেই দাবি আদায় করা হইব বিবেচনাবশত। নতুন কর্পোরেশন হইছে। এরাও থামানো ধর্মঘট চালু কইরছেন। আজ দিয়্যা চারদিন না ছয়দিন হইল। কলকাতার ভিতর দিয়্যা আসা-যাওয়ার কালে দুর্গন্ধে শ্বাস টানা যায় না এহন। কলকাতা কর্পোরেশন এলাকায় খাটা পায়খানার সংখ্যা ১০ হাজারের উপর। এইগুলি প্রত্যহ পরিষ্কার না কইরলে মহামারীর ভয় থাকে। তার উপর নাকী হাজার পাঁচ-সাত লাইসেন্স-ছাড়া খাটা পায়খানা আছে। যেসব মানুষের কলকাতায় কোনো বাসস্থান নাই, কর্পোরেশন অনুমোদিত বাসস্থান নাই, সেইসব মানুষজন বিশেষত কলকাতার খালগুল্যার ধারে বসবাসের একডা চালা খাড়া কইর্যা থাকে ও তাগ পরিবারের নারীগ জন্য অন্তত খানিক আড়াল দিয়া পায়খানার ব্যবস্থা কইরতে হয়। এইগুলি খাটা পায়খানাও নয় ও প্রতিদিন পরিষ্কার কইরব্যার উপায় নাই ও কর্পোরেশনের কোনো বাধ্যবাধকতাও নাই। তবু জনস্বাস্থ্যের কারণে এই পায়খানাগুলিতে কাজ কইরতে হয়। তার উপর কলকাতায় প্রতিদিন অশনাক্ত ও স্বীকারহীন মৃতদেহের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এইগুলির যথাযথ সৎকার এই কর্মীদের কাজ। প্রতিদিন সকালে রাস্তা ধোয়া একডা বড় কাজ। সুতরাং এই ধর্মঘট তাড়াতাড়ি মিটানো দরকার। কর্পোরেশন এখনো হাঁচে নাই। নাকে কাঠি দিছে কীনা জানি না। তাই কর্পোরেশনের ধাঙড়দের স্ট্রাইক কমিটি সব রাজনৈতিক দল ও আইনসভার দলকে অনুরোধ কইরছে, যে, তারা এই ধর্মঘট যথাশীঘ্র মিটাইব্যার জন্য সরকারের কাছে কথা তুলুক। এই কারণে, আমাগ একডা প্রস্তাব নিব্যার লাইগব। সেই উদ্দেশ্যেই মিটিং।
‘আমি প্রস্তাবড়া লিখ্যা আনছি। পড়তেছি। আগে পইড়্যা দিলেই হইত। একডা ভাষণ দিব্যার কাম কী ছিল?
যহন প্রথম এইসব শুইনল্যাম ও জাইনল্যাম তহন আমি মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি নাই। আমি ধইর্যা নিল্যাম—আমাগ মইধ্যে প্রতিভাধরগ বাদ দিলে গড়-মেম্বারগ বুদ্ধি আমার খুলির মাপেই হওয়ার কথা। তাই যেটুক্ না-জাইনলে পরেরটুক্ বোঝা যাব না, আমি সেই টুকখানি শুধু আপনাগ কইল্যাম। সবই ভুল হওয়ার ভয় আছে। আমার এত তাড়া কইরব্যার কারণ এই ধাঙড়-মেথর-ডোমরা আমাগ মতই শিডিউল্ড কাস্ট সমাজের মানুষ। তারা সগলে মিল্যা একডা আন্দোলন কইরব্যার লাগছেন। এমনিই তো আমাগ কর্তব্য অগ পাশে গিয়া খাড়ানো। অনেকে খাড়াইছেনও। কিন্তু অ্যাহন তো একডা রাজনীতির চাপ দিতে হয়। সেই কারণেই এই সভা অ্যাসেম্বলি পার্টির নামে ডাকা। কিন্তু বর্ধিত। সবাইরেই ডাকছি, যদ্দূর কুল্যাইছে। কেউ কেউ তো শুইন্যাই আসছেন। যেমন, পিরোজপুরের নেতা অগ্নিকুমার মণ্ডল।
‘আমি নির্ভয়ে লিখ্যা আনছি এই ভাইব্যা যে মিটিঙে এমন সব পণ্ডিত-বিদ্বান থাইকবেন যাগ চক্ষুকর্ণ এড়াইয়া সটকান যাবে না।
শাকিনা বেগম ঘরে ঢোকেন মতিয়াকে সঙ্গে নিয়ে। যোগেন বলেছিল, ‘যদি পারেন এক পাক ঘুরান দিয়্যা যাইবেন।’ সেই কথা রাখতেই শাকিনা এসেছেন। যোগেন কথা থামিয়ে ডান হাত ঘুরিয়ে তাঁকে বসতে বলে। পেছন দিকে অনেক চেয়ার খালি ছিল। তারই একটা করে তুলে নিল, শাকিনা আর মতিয়া। সে দুটো চেয়ার আলতো করে বসিয়ে, তারা বসে। চেয়ার টানার যে-আওয়াজের সঙ্গে তাদের এত চেনা—তেমন কিছুই ঘটল না দেখে শাকিনাকে এক চোখ দেখেও নিল কেউ-কেউ। যোগেন তখন পড়ছে—ইংরেজিতেই।
কলকাতা কর্পোরেশন সীমানার মধ্যে গত চার-পাঁচ দিন যে অস্বাভাবিক ও আতঙ্ককর অবস্থা চলিতেছে তাহাতে ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল্ড কাস্ট পার্টির কর্মসমিতির এই বর্ধিত সভা উদ্বেগ বোধ না-করিয়া পারে না। কর্পোরেশনের ধাঙড়-মেথররা তাঁহাদের নির্বাচিত স্ট্রাইক কমিটির নেতৃত্বে চারদিন হইল ধর্মঘট করিয়াছেন। ফলে, রাস্তা ধোয়ামোছা হইতে শুরু করিয়া বাড়ির ময়লা সাফ পর্যন্ত সমস্ত রকম কাজ বন্ধ আছে। এর ফলে, বাড়ির ভিতরে, রান্নাঘরে, ও বাথরুমে আর বাড়ির বাইরে ফুটপাতের ময়লা ফেলার ড্রামে বিভিন্ন মহামারীর সংক্রমযোগ্য বীজ প্রতিদিনই বাড়িয়া চলিয়াছে। কলিকাতা শহরে কোনো অঞ্চলে দু-চারজনও যদি এই সকল মহামারীর কোনো একটিতেও আক্রান্ত হন, তাহা হইলে কলকাতা শহরের বর্তমান অবস্থায় তাহা স্বাভাবিকের অপেক্ষা শতগুণ বেগে একপ্রান্ত হইতে অন্যপ্রান্তে ছড়াইয়া পড়িবে। সেই মহামারীগুলিরও শিকার হইবেন প্রধানত গরিব মানুষজনই, যাঁহাদের কোনো নির্দোষ পানীয় জল জোটে না। শুধু পেয় জলের অভাবে কলকাতা শহরে প্রতি বৎসর ওলাউঠা মহামারী ঘটিয়া থাকে। এই ধাঙড় ও মেথর ধর্মঘট সেই নিয়মিত মহামারীর উপর এই বিশেষ মহামারীকে সম্ভাব্য করিয়া তুলিয়াছে। স্বতন্ত্র শিডিউল্ড কাস্ট পার্টির বর্ধিত কর্মসমিতির এই মিটিং কলকাতা শহরকে অবিলম্বে মহামারীর আতঙ্ক হইতে রক্ষা করিবার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন ও অনুরোধ করিতেছে।
আমাদের এই আবেদন ও অনুরোধ কর্পোরেশনের ধর্মঘটী ধাঙড় ও মেথরদের দাবিদাওয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাইতেছে। ধর্মঘটী শ্রমিকদের দোষে আজ কলকাতা, মহামারীর আক্রমণের আশঙ্কায় বিপন্ন নহে, এই মহামারীর আশঙ্কা তৈরি হইয়াছে ধাঙড় ও মেথরদের দাবিদাওয়ার প্রতি কর্পোরেশনের কর্তৃপক্ষের অনমনীয় মনোভাবে। এই কর্মিগণ এখনো বেতন পান মাসিক মাত্র ১২ টাকা। ইহাদের চাকরির কোনো নিয়োগপত্র নাই। সারাজীবন কাজ করিয়া অবসর গ্রহণকালে ইহাদের কোনো পেনশন বা রিট্যায়ারমেন্টের জন্য আর্থিক সাহায্য নাই। পরন্তু কর্পোরেশন চুক্তির জোরে ইহাদিগকে সপরিবার চাকরি করিতে বাধ্য করেন। অথচ সেই চুক্তির ধারা অনুযায়ী এক পরিবারকে একাধিক পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্য একাধিক কাল মঞ্জুর করেন না। তদুপরি, কর্পোরেশন হইতে এই ধাঙর ও মেথরদের যে সামান্য টাকা মাস মাহিনা হিশাবে কোনোরূপ বৃদ্ধি ছাড়া দেয়া হয়, সেই টাকা হইতেও দালাল শ্রেণির কিছু অসৎ লোক আংশিক টাকা কাটিয়া লন। আমরা এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করিতেছি এবং অতি সত্বর এই অসাধু অব্যবস্থা না-বদলাইলে আরো আগুন জ্বলিয়া উঠিবে বলিয়া কর্তৃপক্ষকে জানাইতে চাহি।
ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল্ড কাস্ট পার্টির কর্মসমিতির এই সভা মনে করিতেছে পশ্চাৎপদতার কারণে শিডিউল্ড কাস্টদের মধ্যে শিক্ষিতের হার খুবই কম। সেই সুযোগে কেরানি ও অফিসার শ্রেণির উচ্চতর জাতির লোকজন শিডিউল্ড কাস্টদের প্রাপ্য আয়ের উপরও ভাগ বসান। একদিকে বর্ণহিন্দুগণ আমাদের উপর অস্পৃশ্যতা, অশিক্ষা ও অবিচার চাপাইয়া দিয়াছেন, অন্যদিকে বর্ণহিন্দু জমিদারগণ নিম্নবর্ণ প্রজাদের উপর করের বোঝা চাপাইয়া দিতেছেন, এখন আরো অন্যদিকে তপশিলি গোষ্ঠিভুক্ত আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করিলে, আমাদের, তপশিলি গোষ্ঠিভুক্ত কর্মীদের, প্রাপ্য অতিসামান্য বেতন হইতেও ভাগ বসাইতেছেন। বর্ণহিন্দুদের শাস্ত্রীয় শাসন, সামাজিক শাসন ও আর্থিক শাসনের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শাসন ও শোষণ যুক্ত হইয়া আমাদের, শিডিউল্ড কাস্টদের, জীবনধারণই প্রায় অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছেন। ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল্ড কাস্ট পার্টির এই বর্ধিত সভা, আইনসভার অন্তর্গত একটি পার্টি হিশাবে তো বটেই, তদুপরি, বাংলার তপশিলি জাতিসমূহের একটি সমবেত প্রতিষ্ঠান হিশেবে কর্পোরেশনের ধাঙড় ও মেথরদের বর্তমান ধর্মঘটের সকল দাবি সমর্থন করিতেছে, অবিলম্বে এই ধর্মঘটের মীমাংসার দাবি ও অনুরোধ জানাইতেছে। আমরা বর্তমানে অনতিবিলম্বিত মহামারী আর উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মধ্যে দাঙ্গার আশঙ্কা—এই দুই আতঙ্ক হইতে উদ্ধার চাহিতেছি।
বিনীত
স্বাধীন শিডিউল্ড কাস্ট পার্টি, কলকাতা।
যোগেন ‘বিনীত’ বলায় ও পার্টির নাম বলায় ও হাতের কাগজটি ভাঁজ করতে-করতে বসে পড়ায় সবাই বুঝে নিল প্রস্তাব পড়া শেষ হল।
একটু পর মুকুন্দবিহারী বলেন, ‘এত সুলিখিত ও সুসম্পাদিত একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার ইচ্ছা থাকে না। গ্রহণের ইচ্ছাই প্রধান হয়। তবুও আমাদের যার যা বক্তব্য তাতো শুনতেই হবে। কিন্তু তারও আগে একটা আনুষ্ঠানিক সমর্থন তো কেউ করবেন নিশ্চয়ই।’ মুকুন্দবিহারী একেবারে পেছন থেকে তাঁর চোখ দুটো নিজের পাশে নিয়ে এলেন। তারপর তাঁর বাঁ-দিকে তাকালেন। সেখান থেকেই একজন বলে ওঠেন, ‘খুঁজেন কী, সভাপতি? প্রস্তাবের সমর্থক? আমি সমর্থন দিচ্ছি।’
‘এটা তো আপনাকে সভাকে বলতে হবে। সভাই একমাত্র কর্তা। এক সভাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সমর্থক হিশেবে আপনাকে স্বীকার করা হবে কী না।’
পেছনের ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে বলেন, ‘সভাপতি মহাশয়ের অনুমতি অনুযায়ী আমি যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাবটি অন্তরের সঙ্গে সমর্থন করি।’
সভাপতি এবার সভার ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে বলেন, ‘আপনারা কে কে বলতে চান, তাঁদের নাম দিন।’ হয়ত নামলেখার সময় দিতেই সভাপতি গল্প বলার মত করে বললেন, ‘জাতক-এ একটা মজার গল্প আছে। বোধিসত্ত্ব তখন এক উপনগরে বাস করেন। এক ধনাঢ্য বৈশ্যের বাড়িতে নেমন্তন ছিল—আর-সকলের সঙ্গে এই নাপিতটিরও। এই নাপিত ছিলেন বোধিসত্ত্ব। তিনিও গিয়েছেন ও তাঁর জন্য নির্ধারিত পংক্তিতে বসে, আহার করে, প্রস্থান করেন। কারো সঙ্গেই তাঁর কোনো বাক্যবিনিময় হয় না। সে যখন বাড়ি পৌঁছেছে, তখনই একজন দাসী এসে বলে, ‘একজন দর্শনপ্রার্থী আছে।’ নাপিত বলল, ‘জিগগেস করো সে ক্ষৌরপ্রার্থী না দর্শনার্থী। দর্শনার্থী হলে নিয়ে এসো।’ এল দর্শনার্থী, ‘হে ক্ষৌরকার, আমাকে তো গৃহকর্তা শ্রেষ্ঠী পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘আপনি আহারের আগেও কথা বলেননি। পরেও কথা বলেননি। ফলে তিনি খুব দ্বিধায় আছেন।’
‘তিনি তোমাকে কী আদেশ দিয়েছেন। আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে? না, তাঁর কাছে আমার উত্তর নিয়ে যেতে।’
‘আপনি গেলেই তো ভাল হয়। মুখে-মুখে বললে অনেক বড়-বড় কথাও সোজা হয়ে যায়। তৃতীয় ব্যক্তির দৌত্যে কথা বললে অনেক ছোট-ছোট কথাও বড় হয়ে যায়।’
‘আমি ওঁর নিমন্ত্রণ পেয়ে বাধিত হয়েছি। আমি ওঁর অন্নাদিতে সম্পূর্ণ তৃপ্ত হয়েছি। আমি যে এ-বিষয়ে ওঁকে কিছু না-বলে চলে এসেছি তার কারণ উনি তো আমার আহার দেখেছেন, আমার তৃপ্তি দেখেছেন ও আমার প্রত্যাবর্তনও দেখেছেন। সেই ভাষাতেই তো সব বলা হয়েছে। মুখোমুখি কথাতে সামাজিকতাবশত কিছু সমালোচনার কথাও বলতে হয়। সেটা আমি করতে চাইনি।’
এমন গল্প বলা মুকুন্দবিহারীর অভ্যেস। তিনি নিজেই হাসলেন। সুতরাং আরো কেউ-কেউ সামাজিকতাবশত হাসলেন। ওঁর হাতে ইতিমধ্যে চারটি স্লিপ জমা পড়েছিল। মুকুন্দবিহারী বললেন, ‘শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের প্রস্তাব আপনারা যে-রকম ভঙ্গিতে শুনেছেন, তাতেই বোঝা গেছে মুখোমুখি কথার কোনো প্রয়োজন নেই। এই চারজনকে আমি পরপর ডাকছি।’ তিনি সত্যেন্দ্র রায়কে ডাকলেন।
যোগেন একটু সতর্ক হল।
মুকুন্দবিহারী আসার পর থেকেই এই প্রস্তাবের ও এই উদ্যোগের এত প্রশংসা করছেন যে সম্ভবত একটা গোলমাল হবে। পিরোজপুরের অগ্নি মণ্ডলকে তো প্রায়ই কলকাতায় আসতে হয়। সেই সুবাদে এসেই মিটিং শুনে হাজিরা দিয়ে গেলেন।এমনই ভেবেছিল যোগেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—ঘটনাটা অত সিধে নয়।
সত্যেন রায় বললেন, ‘যোগেনবাবুর ভাষণ ও প্রস্তাবটা আমিই আলাদা করে শুনিনি। তাঁর ভাষণের কথাগুলোকেও আমি প্রস্তাবের অংশ ভেবেছি। এসব খবর আমার জানা ছিল না। জানার ফলে প্রস্তাবটির প্রতি আমার সমর্থন আরো জোর পেল। আমার মত লোকই তো বেশি। এরকম এক-একটা ঘটনায় আমাদের জানা হয়ে যায়। সেই জন্যে আমার মনে হচ্ছে—ওই ইতিহাসের অংশটা, ধাঙড়-মেথরদের সঙ্গে কর্পোরেশনের সম্পর্কের ইতিহাসটা ছোট করে মূল প্রস্তাবে থাকলে ভাল হয়।’
এরপর বললেন প্রেমহরি বর্মণ, ‘আমরা তো একটা আন্দোলনকে সমর্থন করছি। কারণ, তাঁরা যে-দাবিগুলি করছেন সেগুলিকে আমাদের ন্যায়সংগত মনে হয়েছে। জিনিশটা তো খুব ভাল নয়। ধাঙড়-মেথর ছাড়া স্বর্গও স্বর্গ থাকে না। কিন্তু তাদের এক-একটা জায়গায় ঘিরে রেখে তাদের দিয়ে কাজ করানো, মাইনে না-বাড়ানো, জিনিশপত্রের দাম এত বেড়েছে সেই কারণে তাদের কোনো বিশেষ অ্যালাওয়েন্স না-দেয়া, তাদের সম্পর্কে সব দায় কনট্রাকটারের ঘাড়ে ফেলা—এসবই তো লজ্জাজনক শোষণ। বিশেষ করে এতগুলো লোক জড়িয়ে আছে। সেটাই তো আসল কথা। ইতিহাসের কথা তুলতে গেলে তো নানা কথা উঠে পড়বে। ধরেন, ওঁরা সেই বিশ সাল থেকে আন্দোলন করছেন। তখন শিডিউল্ড কাস্ট বলে কিছু ছিল না। আমাদের এরকম পার্টিও ছিল না। তার পর ধরুন ১৯২৮ সালের স্ট্রাইক নিয়ে তো উলটো কথাও আছে। ওয়ার্কার্স পার্টি ও কমিউনিস্টরা ধাঙরদের দিয়ে এই সব স্ট্রাইক করিয়েছে। করিয়েছে তো ভালই করেছে। কিন্তু তখন তো আমরা শিডিউল্ড ক্লাস হইনি। তাহলে, ওসব গণ্ডগোলে আমাদের যাওয়ার দরকার নেই। আমরা এই আন্দোলন নিয়ে সোজা ভাষায় ও দু-এক কথায় আমাদের সমর্থনটা জানিয়ে দেই। কথা এত বেশি বললে, মনে হয়, যেন আমাদেরই আন্দোলন, তা তো নয়। তাহলে পাবলিককে এত কথা বলার দরকার কী?’
প্রেমহরি তাঁর কথা শেষ করে ফিরে যাওয়ার আগেই একজন বলে ওঠেন, ‘আপনাগ এই কায়দাডা আমরা বুঝি না। আরে, আমাগ দেখেই-বা কেডা, পৌঁছেই-বা কেডা? অষ্টপ্রহর য্যান্ ভূতের ভয়—এই অত চিল্লাস না, কত্তায় শুনব, এই কথা বেশি কস ক্যান, কত্তায় শুনব, অত মুখ বাড়াইস না, কত্তায় দেখব, অত কাঁধ ঝাঁকাইয়্যা হাঁটিস না, কত্তার পালকি নড়ব। এইডা তো সারাজীবন শুইন্যা অ্যালাম। অ্যাহন তো মনে হয়—জীবনডা সাইরা আনছি। একডা জীবনও তো কম-জীবন না। কিন্তু কত্তাডা যে কেডা সেইডা দেখব্যার তো পাল্যামই না, শুইনবারও পাল্যাম না। দ্যাখব ক্যামনে? আমরা নিজেরাই তো নিজেগ দেখি না তাইলে কত্তারে দেইখব ক্যামনে। তহন তো আমরা শিডিউল ছিলাম না। শিডিউলই ছিল না—তাতে আমরা থাকি কী প্রকারে? শিডিউল না হই, নমশূদ্র ছিল্যাম তো? ধাঙড়-মেথর ছিলাম তো? সাহা-শুঁড়ি ছিল্যাম তো। না কী-শিডিউল হইলে আর নমশূদ্র থাইকব্যার চলে না। আমাদের এত কিছু বলার কাম কী য্যান আমরা সব জানি। ভ গ বা ন। কুনোদিন শুইনছেন কোনো ভদ্রলোক কী বামুনের বেটা কইছে—নমরা এগুলা জানে। ক্যা বলে নাই। আমরাই বলি নাই, আমরা কিছু জানি। অ্যাহন তো আমাগ উচিত, যা জানি তার থিক্যা বাড়াইয়া বলা। যোগেন মণ্ডলের ওই টুক কথায় মাথায় এক্কেরে আকাশ ভাইঙ্গা পড়ে। থাউক, যোগেনবাবু যা লিখছেন সবটাই থাউক। একডু তর্জন-গর্জন হউক।’
সে থেমে গেলে, সভাপতি বললেন, ‘আমার কাছে এখন তো একটা নামই আছে। শ্রীঅগ্নিকুমার রায়, পিরোজপুরখ্যাত অগ্নিকুমার রায়। অগ্নিবাবু বলার পর যোগেনবাবু তাঁর উত্তর দিবেন। শ্রীঅগ্নিকুমার রায়।’
অগ্নিবাবু উঠলেন, সভার মুখোমুখি দাঁড়ালেন, কাঁধের ভাঁজ করা চাদরটা একটু টানলেন, তারপর বললেন, ‘আমি পিরোজপুরে যত বিখ্যাতই হই, কলকাতায় এমন কী অজ্ঞাতও না। কিন্তু এই বিষয়ে কথাবার্তা হইব শুইন্যা লোভ সংবরণ হয় নাই। একবার ভাবল্যাম, কাম নাই। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস মহাশয়দ্বয় তাগ নিজ-নিজ পত্রে সমস্ত মতামতই নিয়মিত প্রকাশ করিতেছেন, রসসিক্ত ও জ্ঞানসিদ্ধ কইরা’।
অগ্নিবাবু তাঁর জিভটা বের করে আবার মুখের ভিতর গুটিয়ে নিয়ে, ‘রসসিক্ত’ বললেন, আবার নিজের দুই হাত বুকের উপর আড়াআড়ি রেখে বললেন, ‘জ্ঞানসিদ্ধ’।
সভায় বেশ একটা বোধগম্য উৎসাহ এল। এর আগে অনেকেই অগ্নিবাবুর বক্তৃতা দেখেননি। তাঁর হাত-পা-মুখ এইসব ভঙ্গি বেশ নতুন লাগল।
তাঁর ভাষণের ধরতাই শুনে মনে হল অনেকক্ষণ বলবেন। যেমন মনে হয়, তিনি অনেকটাই যা মনে আছে তাই বলে দেয়ার মত বক্তা একটু পরেই বোঝা যায় একেবারেই তা নয়। তবে, বক্তা হিশেবে তাঁর আত্মবিশ্বাসটা দু-একজনের কাছে একটু বিপজ্জনক ঠেকে—এমন চুপচাপ শ্রোতা পেলে তাঁর উৎসাহ বাড়তে পারে।
ধীরে ধীরে অগ্নিকুমার তাঁর বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করেন এই যুক্তির ভিতের ওপর যে শিডিউল্ড কাস্ট একটি সরকারি কাগজের নাম। সেই কাগজ কি পরাশর সংহিতা বা মনুসংহিতার সমতুল্য স্মৃতিশাস্ত্র যে তার দ্বারা কারো ধর্ম নিরূপিত হবে? মুসলমানদের শিয়া-সুন্নিভাগের একটা ইতিহাস-নির্ভরতা আছে। শিডিউল্ড কাস্ট আর অশিডিউলড কাস্ট তেমন ইতিহাসনির্ভর ভাগ নয়—এই ভাগ হিন্দুসমাজের বিধিবিধানের উপর ইংরেজদের শাসনের ব্যবহারিক প্রয়োগ। ইংরেজ রাজপুরুষগণ হিন্দুদের উন্নতি চান। তাই তাঁরা একটা তালিকা তৈরি করেছেন— হিন্দুসমাজের ভিতরে কোন্-কোন্ জাত অনুন্নত। এই জাতগুলি কখনো বৃত্তিনির্দেশ—অর্থাৎ কার কী কাজ। কখনো স্থানজ্ঞাপক—অর্থাৎ হিন্দু সমাজের ভিতর কোন্ স্থানে তারা আছে।
এই যে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে, তার দুটি ভাগ। একটি উপলক্ষ ভাগ, আর-একটি যুক্তিভাগ উপলক্ষভাগ সম্পর্কে কোনো আপত্তি নেই, থাকার কথাও নয়, কারণ কবি বলেছেন,
‘যারে তুমি নীচে ফেলো সে তোমারে বাঁধিবে
যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে
কর্পোরেশনের ধাঙড় ও মেথররা যখন দুর্দশায়, তখন আমাদের হাত বাড়িয়ে তাদের তুলতে হবে। এটা আমাদের কর্তব্য, ধাঙড়-মেথরদের অপেক্ষা আমরা উচ্চতর বলে। আমরা এক বিপুল হিন্দুজাতির অংশ। সেই হিন্দুধর্ম বেদ, ধর্মশাস্ত্র, মহাভারত পুরাণ, লোকসংগ্রহ দ্বারা দৃঢ়ভাবে বাঁধা।
এই বাঁধা কথাটি অগ্নিকুমার বলার পর অভিনয় করে দেখান—কাল্পনিক কোনো দড়িতে কীভাবে বজ্র আঁটুনি দেয়া হয়। তাঁর দুটি হাঁটুই একটু ভাঙে আর তাঁর মুখচোখে শরীরের শক্তিপ্রয়োগের লক্ষণ ফুটে ওঠে : কপালের দুই পাশের ধমনীর স্ফীতি, দাঁতের চাপে দুদিকের চোয়ালের হাড়ের দৃঢ়তা, নাসারন্ধ্রের ব্যাপ্তি ও কণ্ঠদেশের শিরা-উপশিরার স্পষ্টতা। তার পর তাঁর দুই হাত এক করে একবার তালি বাজান ও তাঁর হাস্যসহ তাঁর মুখখানি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এই দৃঢ় বন্ধনের কোনো বন্ধন ঢিল হইবার উপায় নাই।’
‘মহাভারত’-এর অনুশাসন পর্বে
আছে—
ধর্মং জিজ্ঞাস মানানং প্রমাণং পরম শ্রুতি।
দ্বিতীয়ং ধর্মশাস্ত্রতু তৃতীয়ং লোকসংগ্রহণ।
অর্থ-ধর্মজিজ্ঞাসুদের প্রথম শাস্ত্র শ্রুতি বা বেদ, দ্বিতীয় শাস্ত্র ধর্মশাস্ত্র ও তৃতীয় শাস্ত্র লোকাচার। এই কোনো প্রমাণের জোরেই প্রমাণ হয় না যে ধাঙড়-মেথর ও নমশূদ্রগণ একই জাতিত্বের অন্তর্গত। সুতরাং এই ভুল কথা বলে যেন আমাদের সঠিক প্রস্তাব ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমি বলছি না, প্রস্তাবটি এই ভাষায় সংশোধিত হোক যে, যদিও আমাদের ও ধাঙড়-মেথরদের মধ্যে কোনো জাতিগত ঐক্য নাই, তবু, তাদের দাবি ন্যায্যতাবশত সমর্থন করছি। তেমনি, আমি বলছি যে এই কথাখানিও বলা অপরিহার্য নয় যে একই শিডিউলের অন্তর্গত বলিয়া আমরা এক-শিডিউল, আর-এক শিডিউলের দাবি সমর্থন করছি। এই যুক্তিটি কেটে দেয়া হোক। অগ্নিকুমার এক হাতের ওপর আর-এক হাত বসিয়ে ছেদন বোঝান এইটুক্ বদল করে প্রস্তাবটিকে সুন্দর, শোভন ও যথার্থ করা হোক। শাস্ত্রে বলেছে, কোনো কারণেই কোনো বাচ্যকে অকারণহেতুক, অযুক্তি নির্ভর ও তুলনা ভিত্তিক করবে না। করলে তুমি ক্রমেই তোমার বক্তব্য থেকে দূরে চলে যাবে, যেমন, কাকদের হয়, জ্যোৎস্নার তীব্র আলোকে দিন ভেবে।
অগ্নিকুমারের বক্তৃতা যে শেষের দিকে এসেছে, সেটা তাঁর স্বরক্ষেপ থেকে বোঝা যাচ্ছিল। নমশূদ্র আন্দোলনের নেতা যাঁরা তাঁরা অগ্নিকুমারের রাজনৈতিক দর্শনও জানতেন। অগ্নিকুমার শিডিউল কাস্ট করা বা সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের বিরোধী। সে রোয়েদাদ যখন ঘটলই তখন তিনি নমশূদ্রদের সেই শিডিউলের অন্তর্গত করে নেয়ারও বিরোধী। তিনি গান্ধীজির যুক্তিই সঠিক মনে করতেন—এই রোয়েদাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হিন্দু ভোট ভাগ করা। তা করতে দেয়া উচিত নয়। তাঁর অনেক যুক্তিই গান্ধীজির যুক্তির সঙ্গে মিলত। তিনি এমন একটি অবস্থাকে বলতেন—’আমি মুসলমান-বিরোধী না হয়েও কি নিষ্ঠাবান হিন্দু হতে পারব না?’ এই মতের সমর্থক তখন কম ছিল না। বিশেষ করে অগ্নিকুমারের এই যুক্তিটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, নানারকমে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, ‘যবন না মাইর্যা বামুন হওয়া যায় না’, ‘হিন্দু হইবার লগে আগে মুসলমান হইব্যার লাগব?’
এসব কথা তিরিশ সাল নাগাদই খোলাখুলি বলা হতে থাকে, যোগেনরা তখনো ওকালতি থেকে বেরই হয়নি। নমশূদ্র আন্দোলনেও খুব একটা জোর নেই তখন। গুরুচাঁদ ঠাকুরের নির্দেশে সমস্ত স্বদেশি কাজকর্ম থেকে নমশূদ্ররা দূরে থাকে। আবার, সাম্প্রদায়িক ভাগাভাগি তখন এসে গেছে। এদেশে যত, তার চাইতে বেশি বিলেতে। গান্ধীজির একটা কথা তখন খুব রটেছিল যে গান্ধীজি তখন বলেছিলেন, ‘কিছু লোক আমাকে হিন্দু বলে মানতেও নারাজ কারণ আমি অহিংসায় বিশ্বাস করি। কিছু লোক আমাকে মুসলমান বলে মানতেও নারাজ কারণ আমি খিলাফতে বিশ্বাস করি। তারা এখন একটা মতে এক হয়েছে যে আমি ক্রিস্তান। এ তো মনে হয়, সবচেয়ে বড় লটারির চাইতে বেশি পাওয়া—একসঙ্গে তিন-তিনটি ধর্ম পেয়ে যাওয়া।’
গান্ধীজির এইসব কথা অগ্নিকুমারকে খুব প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু তিনি গান্ধীজিকে দেখেনওনি শোনেনওনি, কাগজপত্রও তাঁর কাছে আসেনি। তাঁর প্রধানতম কাজ হিশেবে তিনি বিধবাবিবাহকেই বেছে নেন।
বিধবাবিবাহের পক্ষে তাঁর একটি ছোট ইস্তাহার পুস্তক বেরয়। বিধবাবিবাহ যে হিন্দুধর্ম সংগত তা পাণ্ডিত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও এই বইটিতে তাঁর সততা সেই সময়ে অনেকের চোখে পড়েছিল। গান্ধীজি যেমন সরল পদ্ধতিতে তাঁর সত্য বলতেন, অগ্নিকুমারও তেমনি সরলতায় বিধবা-বিবাহের সমর্থনে বলেছিলেন, নিম্নবর্ণ হিন্দুসমাজে বিধবা-বিবাহ বেশি করে প্রচলিত হওয়া প্রয়োজন। ‘অনেক বিধবা অসৎচরিত্র পুরুষের ভোগের সামগ্রী হইয়া পড়ে। অনেক নিরাশ্রয়া মহিলা দুর্বৃত্ত কর্তৃক অপহৃতা, ধর্ষিতা ও নির্যাতিতা হইয়া থাকে। কত বিধবা দুষ্টলোকের প্রলোভনে পড়িয়া প্রথমে সতীত্ব এবং পরে জমিজমা যথাসম্পত্তি খুয়াইয়া একেবারে পথের ভিখারিণী হইয়া বসে। কত বিধবা হিন্দুসমাজে বিবাহের সুবিধা না পাইয়া, হিন্দুধর্মের মতকে মাথায় পদাঘাত করিয়া অন্য ধর্মাবলম্বী পুরুষের সহিত বিবাহসূত্রে আবদ্ধা হন। কোন বিধবা লম্পট পুরুষের প্রলোভনে পড়িয়া উভয়ই জাত্যন্তর গ্রহণ করিয়া পরস্পর বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়, অন্য ধর্ম গ্রহণ করিবার পরই উহারা এক-একটি কালাপাহাড় হইয়া যায়।… যাহারা ভক্তি সহকারে গরুর সেবা করিয়া ধন্য হইত, তাহারাই আবার গরুর তাজা রক্তে স্নান করিয়া তৃপ্ত হয়।’
নমশূদ্র আন্দোলনে তাঁর এইমত ও সেইমত অনুযায়ী সমাজ সংস্কার, বিশেষ করে বিধবাবিবাহ, সমাজের ভিতরের ব্যাধি আবিষ্কার ও তার বাস্তব নিরাময়ের এক বিকল্প উপায় সম্ভব করে তুলেছিল। তিনি প্রায় দুই হাজার নমশূদ্র বিধবার বিবাহ দেন। পরে, রাজনীতি, ধর্মভেদ ও জাতিভেদ যখন একাকার হয়ে গেল তখন জঙ্গি হিন্দুত্ববাদের সংগঠন, হিন্দু মহাসভা ও ভারত সেবাশ্রম সংঘ তাঁর এই মত ও কর্মসূচিকে গ্রাস করে নিয়েছিল বটে, তবু, অগ্নিকুমার নমশূদ্র সমাজের একটি অংশের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের পাত্র ছিলেন।
অপছন্দ হলেও অগ্নিকুমারের মত অবহেলা করা যায় না। তাঁর বক্তৃতার শেষে সভায় একটা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়তে-না-পড়তেই সিঁড়ির দিকের আসনগুলি থেকে একটা তরুণ গলা বলে উঠল, ‘সভাপতি মশায়। কিছু বলতে চাই।’
মুকুন্দবিহারী ঠিক বুঝতে পারেননি, কে, তিনি ঘাড়টা ঘুরিয়েছেন মাত্র, সেই তরুণ ততক্ষণে বলতে শুরু করেছে, ‘আমরা প্রস্তাবটি শুনেছি ও সেই প্রস্তাবের ওপর তিনজন-চারজনের বক্তৃতাও শুনেছি। মনে হল, প্রত্যেকেই প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেছেন ও কেউ কেউ দুটি-একটি সংশোধন প্রস্তাব করেছেন। মোটামুটি ধরে নেয়া যায় প্রস্তাবটি সর্বসম্মত হয়েছে ও গৃহীত হয়েছে। তবু এই সুযোগ নিয়ে আমি কয়েকটি কথা বলতে চাই। তুলতেই চাই মাত্র। কোনো তর্ক বা আলোচনা এখনই দরকার নেই। আপনারা ব্যবস্থা করলে অন্য একদিন হতে পারে। আমি পূর্ববর্তী বক্তার বক্তব্য নিয়েই বলছি। এই ধরনের জাতি আন্দোলনের একটা প্রধান বাধা হচ্ছে—সময়ের সঙ্গে তাল রেখে জাতি-আন্দোলনগুলি তাদের কর্মসূচি বা লক্ষ বদলাতে পারে না। যেন ৮০ বছর আগে যে পৈতে পড়ার আন্দোলন হয়েছিল, এখন সেটার কোনো দাম আছে। এখন তো উলটো কর্মসূচির সময় পার হয়ে যাচ্ছে—আমরা পৈতে পরব না, আমরা শূদ্র, আমরা দলিত, আমরা মনুবাদী না। মহারাষ্ট্রে আম্বেদকরজি এই আন্দোলন জোরদার করে তুলেছেন। এখন কি আমরা হিন্দু হয়েও ধাঙড়-মেথরদের ধর্মঘট সমর্থন করছি, বলার সময়, নাকী, আরো জোর দিয়ে বলার সময় যে, শিডিউল্ড কাস্ট বলে কথিত জাতগুলোর ভিতরে যে-ঐক্যবোধ তৈরি হয়েছে, সেটা ইংরেজের দান নয়। ইংরেজ তার নিজের স্বার্থরক্ষার মতলবে হিন্দুভোট ভাগ করতে চেয়েছে। গান্ধীজি ‘হরিজন’ বলে সেই ভাগ জুড়তে চেয়েছেন—কিন্তু মন্দিরে ঢুকে উচ্চবর্ণ হতে চাওয়ার মত বোকা শিডিউল্ড কাস্টের মধ্যেও পাওয়া কঠিন। আমরা, শিডিউল কাস্টরা এক হয়ে বিপরীত ঐক্য তৈরি করে একই সঙ্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ও হিন্দু-উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সুযোগ পাচ্ছি। এই সুযোগটা আমাদের খোলা মনে ব্যবহার করতে হবে। আমরা কতটা হিন্দু ও কতটা শিডিউল্ড তা মাপার সময় এখন নয়। আমাদের সোজা কথা—আমাদের আলাদা জাত বলে নোটিশ ঝোলাবে আর পুরনো হিন্দু বলে টিকি রাখাবে—এ চলবে না। আমরা আলাদা তো আলাদা। আমরা কংগ্রেস বা হিন্দুসভার কেনা সম্পত্তি না। মুসলমানদের সঙ্গে আমাদের কোনো স্থায়ী বিরোধ নেই। কোনো বিরোধকে আমরা স্থায়ী হতে দেব না।’
হঠাৎ সবাই মিলে হাততালি দিয়ে উঠল আবেগ থেকে। যোগেন অনেকক্ষণ ধরে ঘাড় ঘোরানোর চেষ্টা করছিল, দেখতে, কে বলছে কিন্তু কিছুতেই পুরোটা ঘোরাতে পারছিল না। হাততালিসহ ছেলেটির ভাষণ শেষ হলে আর না-পেরে যোগেন রসিকলালকে জিগগেস করে, ‘কাকা, এ কেডা?’ রসিকলালও স্বর না তুলে জানান, ‘আরে, যশোরের কংগ্রেস অফিসে তোর লগে কথা হইল না। এহানে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। রায়িস্ট।’
ছেলেটি এত সুন্দর বলেছে যে মিটিং ভেঙে গেল। মুকুন্দবিহারী দাঁড়ালেন ও গলায় জোর এনে বললেন, ‘আপনারা আমার কাজটি সম্পন্ন করতে দিন। প্রস্তাবটি সম্পর্কে আপনাদের সিদ্ধান্ত কী।’ কেউ কথা বলল না, আবার একটা হাততালি। মুকুন্দবিহারী বললেন, ‘এই করতালিধ্বনি কি গ্রহণসূচক না বর্জনসূচক?’ এ-কথার উত্তরেও একটা হাততালি উঠল। এবার মুকুন্দবিহারী আরো জোরে বললেন, ‘আপনারা কিন্তু সভা মুলতুবি রেখে যাচ্ছেন। কোনো প্রস্তাব গৃহীত হল না। আমার শেষ অনুরোধ, আপনারা যারা এই প্রস্তাবের বিরোধী, তেমন কেউ থাকলে, হাত তুলুন’। এবার সবাই দাঁড়িয়ে পড়েছিল আর মুকুন্দবিহারীর নির্দেশ মত জনা দশ-বার হাত তুলে দিল। মুকুন্দবিহারী তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘আপনারা কি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন?’ সঙ্গে সঙ্গে সমবেত ‘না না’ আওয়াজের সঙ্গে হাতগুলো লুকিয়ে ফেলা হল। মুকুন্দবিহারী বলে উঠলেন, ‘তাহলে আমি কি এই বর্ণনা করতে পারি যে সভ্যগণ কেহই এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন নাই’। আবার এক সমবেত ‘হ্যাঁ’ ও হাততালি।
ঘরটা একটু ফাঁকা হতেই পি আর সভাপতির দিকে এগিয়ে আসে, মুকুন্দবিহারী তখনো সভাপতির চেয়ারেই বসে। পি আর বলে, ‘সকলে এত রগচটা হয়ে আছে কেন? একটা সাপোর্টিং প্রস্তাব। আমি তো ভেবেছি লোকই হবে না। আমি তো কোরাম রাখতে এলাম। আমি তো বুঝতেই পারলাম না। অথচ বোঝা তো গেল যে দুটো পক্ষ আছে, দুটো পক্ষ সংগঠিত।’
‘আম অতটা বুঝিনি, রসিকলালবাবু, পক্ষাপক্ষি কি বুঝতে পারলেন?’
‘আমার তো মনে হয় সুভাষকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া। আইস্যা দেখে—কোনো প্রতিপক্ষ নাই। আর বোধহয় বামপন্থীগ প্রভাব।’
যোগেন প্রস্তাবের কাগজটা মুকুন্দবিহারীকে সই করিয়ে নিয়ে শাকিনার কাছে আসে। আরো দু-একজন ছিলেন। তাঁদের কী কথা হচ্ছিল না শুনেই যোগেন শাকিনাকে বলে, ‘পাঁচ মিনিট একটু খাড়াইবেন, তাইলে রিজোলিউশনের টাইপড কপিডা আপনে হাতে গরম নিয়্যা য্যান, পাঁচ-সাত মিনিটে বেশি লাইগব না।’
‘মিনিট কো সওয়াল নেহি। হাম পাঁচ ঘণ্টাভি খাড়ি রোহেগী। কিন্তু মতলব কী? এটা তো মিস্টার সিদ্দিকের দরকার, সে তো আপনিই নিয়ে যাবেন। না? তা হলে এখনি কপি নিয়ে আমি কী করব?’
মতিয়া কিছু-একটা ইঙ্গিত করে। শাকিনা নিচু হয়ে তার কথাটা শুনে নিয়ে খাড়া হয়ে বলে, মতিয়া বলছে আমাকে চলে যেতে। ও কপিটা নিয়ে পিছে-পিছে চলে আসবে।’ যোগেন ততক্ষণে সিঁড়ির এক ধাপ নেমে গেছে। ‘আপনারা ঠিক করুন, টাইপডা সাইড়্যা রাখি। যেই আপনেগ টাইম হইব, সিড়ি দিয়্যা নামেন এক্কেরে গোড়ায়। গোড়ায় বাঁয়ে’–যোগেন নেমে যায়।
যারা তার সঙ্গে কথা বলছিল তাদের মধ্যে লাইব্রেরিয়ান সত্যেন আর সেই এম-এ পড়া ছেলেটিও ছিল। তাদের কারো দিকে না তাকিয়ে অথচ যেন তাদের দু-জনের দিকেই তাকিয়ে একটু হাসিমাখিয়ে শাকিনা বলে, ‘হি হ্যাজ হিজ ওন স্টাইল টু ডু থিংস।
সকালবেলায় এই মিটিংটা অর্গানাইজ করার যখন কথা হল, উনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি বললাম, আপনার তো এখন ফোনাফুনির কাজ চলবে। তো আপনি কেন বাইরে যাচ্ছেন। আপনি ইউনিয়ন—অফিসে বসে যোগাযোগগুলো করুন। এই মতিয়া মজুত থাকল। যা দরকার, বলবেন, ও করে দেবে। তখন বলছেন, না, আমি রাস্তায় হেঁটে মাথায় রোদ না লাগালে আমার বুদ্ধি খোলে না। ব্যস, উনি রাস্তায় বেরিয়ে মাথা গরম করতে গেলেন, আমরাও ঘর ফাঁকা করে সরে পড়লাম।
শাকিনার একটা কোনো ভঙ্গিতে ওঁকে যারা ঘিরে ছিল, তাদের কেউ একজন সরে তাঁকে পথ দেয়, তারপর পর পর সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। পেছন থেকে এম-এ পড়া ছেলেটি বলে, ‘যে-লেফ্ট কনসিলিডেশনের জন্য জেলে এতকিছু, এখানে সেটা আপনার স্ট্রাইকের সুবাদে জেলের বাইরে কেমন অনায়াসে হয়ে গেল।’
‘তা হলে এই গভমেন্ট সব পলিটিক্যাল প্রিজনারদের ছেড়ে দিচ্ছে না কেন! আন্দামানে আবার তো হাঙ্গার স্ট্রাইক করবেন প্রিজনাররা। তো এই গমেন্টটাও বুরবক। তোদের তো এখন লেফট-কনসোলিডেশনই দরকার। তাহলে রাজবন্দীদের ছাড় দিচ্ছে না কেন।’
‘আপনার যুক্তিটা খুব মৌলিক। আর, জজশাহেবরা যে—প্রশ্নগুলির উত্তর জানে না, সেগুলোতে বলে দেন, অবজেকশন ওভার রুলড।’
শাকিনাই নামছিল আগে। সে কথাটাকে তারিফ দিতে একটা ধাপে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে বলল, ‘খুব ভাল পয়েন্ট। নীহারেন্দুদাদের বলুন-না কোর্টে তুলতে।’
ওরা সিঁড়ি থেকে নামতেই যোগেন পাশের গলিটাতে হলুদের মধ্যে বড়-বড় হরফে ইংরেজিতে ‘টাইপ’ লেখা। যোগেন হাত তুলে কিছু বলে, শোনা যায় না। তারপর বাকি আঙুলগুলি তালুতে ডুবিয়ে শুধু তর্জনী তুলে ‘এক মিনিট’ বোঝায়।
সত্যেন বলে, ‘এখানে তো দৌড়কে বলে স্লো হাঁটা। কার ধাক্কা লেগে পড়ে যাব। চলুন, আমরা একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াই।’
বাইরে মানে হ্যারিসন রোডে।
ইউনিভার্সিটির ছেলেটি বলে, ‘এখন তো অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে, মানে, আপনাদের স্ট্রাইকের কথা বলছি, এখন তো টস্ করে দেয়া হয়েছে, ছেলেটি তার বাঁ হাতের আঙুলগুলো দিয়ে টস করার একটা ভঙ্গি করে। তারপর সেই হাতেরই একটা আঙুল আকাশের দিকে তুলে বলে, ‘দি কয়েন কি আপ দি এয়ার,’ তারপর হেসে বলে, ‘ইট মাস্ট কাম ডাউন উইদাউট এ থার্ড চয়েস। ইদার দি হেড অর দি টেইল। হয় আপনারা জিতবেন, নয় তো কর্পোরেশন জিতবে। কিন্তু যখন ওয়ার্কারদের এটা বোঝাতে হচ্ছিল, যখন তাদের ভয় কাটাতে হচ্ছিল, যখন তাদের বুঝতে হচ্ছিল—তার নিজের ক্ষতি হবে কত, যখন একদিন যা ঠিক হল পরদিন তা ওয়ার্কাররাই ভেঙে দিল—তখন নিশ্চয়ই খুব টেনশন, আনসার্টেইনটি, ক্লাশ এলায়েন্সের চাইতে মাস্টার-সার্ভেন্ট অ্যালায়েন্সটাই বড়, আমি তো পড়েছি টেন ডেজ দ্যাট শুক দি ওয়ার্ল্ড’-
‘কী করে পড়লেন। ওটা তো ব্যানড। না।’
‘ঐ যেমন আসে, পেয়ে গেলাম এক কপি। তখন আপনাদের সঙ্গে চেনা থাকলে কাজ করতাম। এই স্টাডি সার্কল, ক্লাশ নেয়া…’
‘তখন আর আমাদের চেনা হবে কী করে—আমি তো রাশিয়ার বিপ্লবে ছিলাম না—গলার স্বরে ধরা পড়ে গেল, শাকিনা ছেলেটির পেছনে লেগেছে। ছেলেটি বলল, ‘আরে
রাশিয়ায় নয়, আপনাদের ইউনিয়নে, ঐ স্ট্রাইকটাকে অরগ্যানাইজ করতে—’
‘ও। আপনি যে-রকম করে বলছেন, আমি কী করে ভাবব যে আপনি কর্পোরেশনের স্ক্যাভেঞ্জার স্ট্রাইকের কথা বলছেন? তো, এখন তো স্ট্রাইক চলছে। ‘স্ট্রাইক’ শেষ হলেই কি ইউনিয়নের কাজ শেষ? এখন তো আরো কঠিন কাজ। চলে আ—সু–ন।’
যোগেন এসে একটা টাইপ-করা কাগজ মতিয়াকে বাড়িয়ে দেয়। মতিয়া খুব মন দিয়ে পড়ে। যোগেন বলে, ‘যুদ্ধে যে কী লাগে আর কী লাগে না? কার্বন পেপার নেই। কিন্তু টাইপের দরকার তো আর কমে নাই। টাইপিস্টের রোজগারের দরকারও কমে নাই। সুতরাং একপাতা টাইপের পয়সা দিলেই ডুপ্লিকেটটাও টাইপ করে দিচ্ছে। শুধু একটা জিনিশই তো বেচারা কমাতে পারে—ওর খাটুনির দাম।’
মতিয়া খুব সঙ্কোচে বলে স্পষ্ট স্বরে—’একজন একটা অ্যামেন্ডমেন্ট বলছিলেন না–আপনার ইনট্রোডাকশনটাকে ম্যাটার অব কনটেস্ট করে দিতে?’
‘ঐ প্রথম তিন লাইনে তো করা আছে। এর বেশি করতে গেলে তো রিরাইট কইরব্যার লাগে। ঐডা বরং তুমি কাভারিং লেটারে দিয়্যা দ্যাও।’
যোগেন শাকিনাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনারা কি বাস ট্রাম কিছু ধইরবেন? তাইলে তো রাস্তা পার হওয়ার লাগে।
‘এখান থেকে মৌলালি যাব—তার বাস ট্রাম। আমরা হেঁটে চলে যাব। আর, এটার কপি তো আমরা পেলাম। আমাদের কি এটা কোথাও পাঠাতে হবে?’
‘সেডা তো আমাগরই দায়। আপনাদের সাপোর্ট দিল্যাম–সেটুক তো আমাগ জানাইব্যার লাগব আপনাদের। আপনারা যদি কন তোমাগ সাপোর্ট আমাগ লাগে না’, সবাই মিলে হাসিটা শেষ করার পর যোগেন বলে, ‘কী সত্যেন, তাই তো ঠিক হব। আমরা পাঠাইল্যাম কর্পোরেশনকে। আরো যার-যার কাছ থেকে ওঁরা এমন সাপোর্ট পাবেন—সেইগুল্যা মিলাইয়্যা ওঁরা যদি কর্পোরেশনরে কিছু জানাইব্যার চান, সে তো ওঁরাই ঠিকঠাক করবেন?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এ-ছাড়া আবার কী হবে? তবে কর্পোরেশনে যেটা দেবেন সেটাতে প্রেসিডেন্টের সই থাকলে ভাল হয়?’
‘খাইছে! প্রেসিডেন্টের মানে প্রফেসারের? তারে অ্যাহন পাই কোথায়?’
‘বললেই তো থাকতেন?’
‘কী যে কন? আমি কব প্রফেসররে একডু খাড়াইয়া যান?’ যোগেন চুপ করে অন্যদিকে তাকিয়ে একটুখানি ভেবে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলে, ‘চলেন, আপনাগ এডডু আগাইয়া দেই—
‘সে তো ভালই। কিন্তু আমাদের তেমন দরকার নেই।’।
‘তাইলে বেদরকারেই চলেন’, এক পা এগিয়ে সত্যেনের দিকে তাকিয়ে যোগেন বলে, ‘ওদিকে কি যাওয়া হবে?’
সত্যেন বলে, ‘আমি উল্টোপথে যাব কেন। সে যদি আপনার ফেরার সময় সঙ্গী লাগে—’
যোগেন বলে, ‘আরে, আমি তো কাজ সাইরব্যার যাই। মৌলালি থিক্যা যাব সিদ্দিক শাহেবের কাছে। সেখানে হাতে হাতে চিঠিপ্রস্তাব দিব। এ-চিঠিড়া তো লিখত্যাছি আমি, আমার সই থাকতিছে। প্রফেসরের সই তো এস-ডি কইর্যা যাইব। তাই তো?’
সেই ছেলেটি শাকিনাকে বলে, ‘আমি যাচ্ছি তাহলে?’
শাকিনা হেসে মাথা হেলায়।
সত্যেন বলে, ‘নিজেরই তো সব জানা। আমারে মিছামিছি নিমিত্ত করা কেন?’ ওরা দুমুখে আলাদা হয়। হ্যারিসন রোডের মাথা থেকে ওরা সার্কুলার রোডে পা দেয়।
ফুটপাতে খুব বেশি লোকজন নেই। এখন তো সিভিল ডিফেন্সের নির্দেশে সব আলোই ঢেকে রাখতে হয়। যোগেন কোনোদিন ব্ল্যাক-আউট দেখেনি, বা, ব্ল্যাক-আউট ছাড়া দেখেনি। অন্ধকারে জল-মাঠ-খাল-গর্ত আরো ভাল দেখা যায়। পরে, কানখাড়া রেখে জেনেছে—আলো জ্বলা শহর নাকী বোমারু বিমানগুলি দেখতে পায় ও দেখতে পেলে বোমা ফেলে। এখনো পুরো ব্ল্যাক-আউট হচ্ছে না। আলোগুলোকে ঠোঙা পরানো হচ্ছে যাতে আলোর রোশনি না-ছড়ায়। বোমারুগুলি নাকী খুব নিচু দিয়ে ওড়ে। যোগেন কোনোদিন প্লেনে ওড়া দূরের কথা, এই যুদ্ধের সুবাদে মাঝে মধ্যে উড়ন্ত প্লেন দেখেছে ও দেখলে তাকিয়ে থাকে, এখনো। ট্রামে বাসে, পাড়ায়, কোর্টে সর্বত্র সর্বত্র এতলোক কী করে প্লেন, বোমারু বিমান এ-সব এত জানে কী করে। এরা সবাই কি প্লেনে চড়েছে। এমন কী, ব্ল্যাক-আউট কত রকম হয় তার পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখে। যোগেনকে যেহেতু কান পেতে-পেতে নিজের অজ্ঞানতা গোপনে দূর করতে হয়, সে কোনো বিষয়ে কোনো খবর সন্দেহ করত না। উলটে সে তার নিজের খবর নেয়ার উৎস বের করে ফেলেছিল। স্টেটসম্যান কাগজ, নিউ স্টেটসম্যান সাপ্তাহিকে কিংসলি মার্টিনের লন্ডন ডায়েরি আর-একটা বুলেটিন –’ব্যাকগ্রাউন্ডার’ নামে, আরো একটা ঐ বুলেটিন-মতই—কিংস আর্কাইভস। ‘ব্যাকগ্রাউন্ডার’-এ থাকে যে-সব জায়গায় বা সমুদ্রে তখন যুদ্ধ চলছিল তার ইতিহাস-ভূগোল। আর, ‘আর্কাইভস’-এ থাকে প্রায় গতকালের যুদ্ধের টাটকা খবর। আইনসভা লাইব্রেরিতে ম্যাপের অভাব নেই। আর, এই সব কাগজই তো সেখানেই খুঁজে বের করেছে। ফলে, ইয়োরোপের যুদ্ধ নিয়ে সে ছবি এঁকে-এঁকে বলে দিতে পারে—কোথায় কী যুদ্ধ হচ্ছে। অথচ লোকের মুখে-মুখে শুধু কলকাতার যুদ্ধের খবর। মনে হয়, ময়দানে মহামেডান স্পোটিং আর মোহনবাগানের শিল্ড-ফাইন্যাল খেলা হচ্ছে, বা, হাওড়া-আমতা লাইট রেলওয়ের কামরায় বসলে ট্রেনের জানলা দিয়ে যুদ্ধ দেখা যেতে পারে। এমনও অনেকবার হচ্ছে যে নিজের কান খাড়া রাখতে-রাখতে হঠাৎ অনেকক্ষণ পর আবিষ্কার করে যে সে ইংল্যান্ডের দুটো বড় রেসের মাঠের ঘোড়াদের নাম শুনছে—ডার্বি আর রেনজার্স-এর রেসের লটারি টিকিটের দুই খদ্দেরের মধ্যে কথা হচ্ছে ঘোড়াদের নিয়ে। অত ইংরেজি নাম শুনে যোগেন ভাবছিল যুদ্ধের জায়গাগুলোর বা কামান-বন্দুকের নাম। প্রায় দশ মাস চলছে, কিন্তু যুদ্ধটা কোথায়, দেখাই যাচ্ছে না। এ তো পদ্মবিলের কাইজ্যা।
১৫-নম্বরে মিটিং সেরে সিদ্দিক শাহেবকে প্রস্তাবটি দিয়ে আসতে ও আর কাদের প্রস্তাব এল জানতে, শাকিনা আর মতিয়াকে মৌলালি পর্যন্ত অকারণ এগিয়ে দিতে-দিতে যোগেন যে যুদ্ধের কথা ভাবছিল—একেবারেই তা নয়। কিন্তু, সন্ধ্যা হয়ে গেছে বলেই শেয়ালদা কোলে মার্কেটের ফুটপাতটার আলোর অল্পতা, একটু কম লোকজন, কিছু-কিছু বন্ধ দোকানপাট আর লোকজনের চলমান ছায়াগুলো চকিতে লম্বা হয়ে চকিতে মিলিয়ে যাওয়ায় যুদ্ধ ছিল এত ওতপ্রোত যে যুদ্ধ ও যোগেনের সম্পর্কের প্রত্নতত্ত্ব ছাড়া ও-রকম সন্ধ্যা সত্য হত না।
সত্য না হলে আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে যোগেন যুদ্ধ সংক্রান্ত ঘটনায় প্রথম এমন জড়িয়ে পড়ত না। বা, যোগেনের প্রথম যুদ্ধদৃশ্য দেখা ঘটে উঠত না।
শাকিনা আর মতিয়া পাশাপাশি যাচ্ছিল কথা বলতে-বলতে। ফুটপাত দিয়ে পাশাপাশি তিনজন হাঁটা যায় না। কিন্তু যোগেনের সঙ্গে তাদের দূরত্বটা ছিল তেমন ভাঙা—পাশাপাশি থেকে বেশি। খুব ভিড়েও বোঝা যায় কারা কারা পাশাপাশি। সেটা বোঝা যাচ্ছিল না।
প্রথমে খানিকটা তো ওরা পাশাপাশিই এগচ্ছিল। শাকিনাই বলছিল—যোগেনদের মিটিং নিয়ে। যোগেন শুনছিল, হুঁ-হাঁও করছিল। কিন্তু তার চোখ ছিল দোকানগুলিতে, যেন কিছু খুঁজছে। তাতেই ওদের সঙ্গটা ভেঙে গেছে। কিন্তু পেছন থেকে সকলের মাথার ওপর শাকিনার বেণী বাঁধা মাথা এমন ভেসে যাচ্ছিল যে যোগেন তাড়াতাড়ি হেঁটে দূরত্বটা পেরতে চাইছিল। কিন্তু সে যে-দোকান খুঁজছিল সেই খোঁজা থেকেও সম্পূর্ণ নিবৃত্ত হতে পারছিল না। বৌবাজারের রাস্তা পেরবার আগেই যোগেন দোকানটা পেয়ে যায়। সঙ্গে-সঙ্গে সে প্রায় দৌড়েই ‘মতিয়া-মতিয়া’ ডাকতে-ডাকতে ওদের দিকে ছোটে। শুনে, ওরা দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকায়। যোগেন হাত উঁচু করে তাদের দাঁড়াতে বলে। যোগেনের সংকেত ওরা বুঝতে পেরেছে বুঝে যোগেন নিশ্চিন্ত মনে দোকানটায় দাঁড়িয়ে একটা খাম চায়।
দোকানি প্রশ্ন করে, তার হাতদুটো দিয়েও আবার বোঝাতে, ‘খাম চান? মানে খাম?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। পোস্টাপিসের না। এমনি অফিসের খাম’, যোগেনকেও বোঝাতে তার দুই হাত ব্যবহার করতে হয়, ‘অফিসের খাম। ব্রাউন পেপারের। হয় না? যে-রং আছে, তাই দ্যান—?’
যোগেনের ভাষা ও উচ্চারণ তাকে এতটাই অকৃত্রিম বাঙাল বলে চিনিয়ে দেয় যে এ নিয়ে যার সঙ্গে কথা হচ্ছে সে আর কিছু জিজ্ঞাসা করে না। কিন্তু এই লোকটি করল, ‘কী? একুনি নাবলেন ট্রেন থেকে?
যোগেন কিছু বুঝে উঠতে পারে না, ‘ক্যা? কী হইল? খাম—’
শাকিনা আর মতিয়া ফিরে যোগেনের পাশে দাঁড়িয়েছে। লোকটি তখন যোগেনকে বলছে, ‘এই সন্দেয় তো বাঙালদের ট্রেনগুলো আসে। আর পিলপিল করে সব কাল-কাল’ নোক নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা শতরঞ্চির বেডিং মাথায় দৌড়ুতে-দৌড়ুতে নিজেদের জায়গার মেসগুলোতে ঢোকে বৌবাজারে—ঢাকা মেস, চিটাগাং মেস, সবচে বেশি সিলেট মেস, বরিশাল মেস, নোয়াখালি মেস; আপনাদের ওদিকে তো যুদ্ধুটুদ্ধু নেই।’
শাকিনার ‘কী হল যোগেনবাবু, আর যোগেনের ‘সিদ্দিক, শাহেবের চিঠিটার জন্য একটা খাম খুঁজছিলাম, আফটার অল মেয়র বলে কথা’, এই প্রশ্নোত্তর চলে লোকটির কথা-বলাটুকু জুড়ে। লোকটি স্বগতোক্তির মতই বলে যায়। দোকানের ঠোঙা-ঢাকা আলোয় কেউই কারো মুখ দেখতে পায় না।
‘তো পেলেন?’ শাকিনা তার বড় পাঞ্জা ও চওড়া কবজির হাতটা রাখে কাউন্টারের ওপর। ঠোঙা ঢাকা আলোর সবটুকু উজ্জ্বলতা, যদিও সেটাও খুব বেশি নয়, ঐ হাতটুকুর ওপর পড়ে দোকানি ও যোগেন দুজনকেই জড়োসড়ো করে দেয়।
‘হ্যাঁ, বলছি তো? বলল্যাম-না, একডা অফিসখাম দ্যান।’
লোকটি ‘মেয়র’ শব্দটি, ‘আফটার অল’ কথাটি ও শাকিনার একটা হাত প্রায় একসঙ্গেই শুনে ও দেখে ফেলে গুটিয়ে গিয়ে ভাবে সে কি কিছু ভুল করল, লোকটা তো ‘দ্যান’ই বলল, যতটুকু দেখা গেল তাতে কালই তো দেখাল। তাহলে এমন দশাসই মেচ্ছেলে এল কোতথেকে? সে সেয়ানা বুদ্ধিতে আর-কোনো আওয়াজ করল না, শুধু বলল, ‘নেই।’
‘নাই? সে কী কথা?
লোকটি হয় বাচাল, না-হয় অতিচালাক। বলে ফেলে, ‘যুদ্দ নেগেচে তো? খাতা-কাগজ-কালি এ-সব আর পাওয়া যাচ্চে না।’
যোগেনের যেন কিছু বলার ছিল। শাকিনা বলে, ‘ওঁর কাছে তো নেই। চলুন।’
ওরা দোকান ছেড়ে চলে গেলেও আলোর রশ্মির কোনো হেরফের ঘটল না। আলো যাতে ঠিকরে না বাইরে যায়, সেই কারণেই ঠোঙা। যখন ওরা ছিল, তখনো তো ওদের দেখা যাচ্ছিল না। যুদ্ধ।
যুদ্ধের টাইমে সবাইকে আবছা দেখায়—লোকটি ভাবল।
ভেবেই মনে পড়ল শাকিনার বড় পাঞ্জা, চওড়া কবজি। যুদ্ধ।
যুদ্ধে কি মেচ্ছেলেদের পাঞ্জা বড় হয়ে যায়?
লোকটি ভয় পেয়ে গেছে। ভয় তাড়াতে রসিকতা ভাবছে।
তার ও ফুটের মাঝখানে সেই ঠোঙাপরা আলোটা ঝুলে।
লোকটা সেই আলোর কুয়াশা ভেদ করে ওদিকটা দেখতে চায়। দেখা যায় না। লোকটির দুই ভুরুর মাঝখানে খাড়া ভাঁজ পড়ে। চোখের মণিদুটো স্থির। আলোর সে-কুয়াশা ভেদ করতে পারছে না। লোকটা ঐ একভাবে বসে ও তাকিয়ে থেকে ভয়টাকে আর ঠেকাতে পারল না। ভয়টা তাকে এখন জাপটাল যে সে আর নিজের বসা বা তাকানো একটুও বদলাতে পারে না। যুদ্ধ।
কিচু বেফাঁস বলিচি? দেকলুম, মানে, আবছা দেকলেও কি বাঙাল চিনতে ভুল করব? ব্ল্যাকআউটের একটা বিভ্ৰাট—বাঙালগুলো অন্ধকারে মিশে যায়। ওরা নিজেদের মেসবাড়ি ছাড়া ওটে না। কেন? ভদ্দরনোকের হোটেলের চাকর-ঠাকুররা ওদের কতা বুঝতে পারে না। তার ওপর নেড়া-শুদ্দুর কী সব ছোট জাত! কিন্তু অমন একটা খাড়া মেচ্ছেলে পেল কোত্থেকে বাঙালটা? হাতের পাঞ্জাই যেন চিড়িতন। চিড়িতন ভাবতেই লোকটি হাসে। মেচ্ছেলেকে নতুন নামে ডাকতে কী যে ওম, উস।
লোকটি হেসেই থাকে, ঠোঁটটা বন্ধ করতে পারে না, চোখদুটো বড় ও গোল হয়ে যায়। আতঙ্কে। সন্ধ্যায় বৌবাজারের মোড়ে, আতঙ্কে। হাতের পাঞ্জাটা চিড়িতন যেমন তেমনি ত্রিশূলও তো।
কেন যে এত কতা বলি। এত! সাধে কি বৌ বলে, টানাটানি করো না, তোমার লিঙ্গ তো জিবে। নাড়াও, জিবে গাজা নাড়াও। তাতেই তোমার হয়ে যাবে খন।
লোকটা এত ভয় পায় যেন দোকানটা খোলা রেখেই সে পালিয়ে যাবে। এত তাড়া করে সে কাঠের ভাঁজ-দরজা টেনে দিয়ে আলো নিবিয়ে বেরতে গিয়ে দেখে—সে তো নিজেই টেনে দিল দরজা, এখন বেরবে কী করে। যুদ্ধের টাইমে। কেন যে কতা বলি? বেফাঁস কিছু বলেচি?
