১৪৩. নাগপুর থেকে ভারত আহ্বান
সিদ্দিকিশাহেবের মিটিঙের পরের দিন সকালে সুভাষ ফিরলেন নাগপুর থেকে। যোগেন ওঁর প্রোগাম জানত। তবে এখন যা ব্যস্ততা, সেটার অদলবদল হওয়া স্বাভাবিক। এদিকে যদি কোনো প্রোগ্রাম করা থাকত, তাহলে অদলবদল হত না, বিশেষ করে পাবলিক প্রোগ্রামে। ফোনে যোগেন জেনে নিল, ফিরেছেন কীনা, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেল বিকেলে।
‘কেমন হইল নাগপুর?’
‘আপনি কি নাগপুরে গেছেন?
‘নাগপুর যদি মেঘনার পারে হয়, তাইলে বলি গিছি।’
‘ও আপনার তো বরিশালের বাইরে পৃথিবী নেই, নমশূদ্র ছাড়া জাত নেই—’
‘আর সুভাষ বোস ছাড়া নেতা নেই কিন্তু, সুভাষের কুনো পার্টিতেও আপনি নাই।’ যোগেন হেসে ফেলে—’এগুলা ভাবেন কখন, বানান কখন। আপনে তো নাকী সদগুরু সন্ধানী। ওই, আমাগ চাইর জিলায়—বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, নোয়াখালি এই চার জিলায় গুরুগ মাহাত্ম্য তাতেই এই কথাডা শুনছি—গুরু তালাশি। মানে, যারা চিরজীবন গুরু খুঁজে বেড়ায়। অগ নামে লোকে আবাদ দেয়, অরা কহনো গুরুর ঠেক কাউরে জানায় না, সেডা না কী ধর্মে নিষেধ। লোকজন অগ পিছনে বলে, ‘অরা গুরু গরাসি। গুরুরে ধাইট্যা খাইয়্যা গরাস কইর্যা নেয়। আপনে কি আমারে সেই আবাদ দেন—যে আমি গুরুগরাসি, নাইলে আপনার কোনো পার্টিতে চুক্তি কেন? সেডা তো আপনে কন নাই।’
‘যেমন আছেন, তেমনি থাকেন—আপনার মতন মানুষ সব পার্টিরই দরকার।’
‘সে তো হইল। নাগপুরডা একটু কন। হইলডা কী?
‘হওয়ার তো আর দু-রকম নেই। যাঁরা এই সম্মিলনে যোগ দেবেন তাঁরা তো নিজেদের এআইসিসি রাজনীতির বিরোধী মঞ্চেই দেখাতে চান। কম বয়েসিদের খুব ভিড় হচ্ছে, সব জায়গাতেই যেমন। তারা মনে করে—গান্ধীজি ও তাঁর প্রধান চেলারা সব বুড়ো, সত্যাগ্রহ-অসহযোগ তারা বুঝে উঠতে পারে না, চায়ও না, আবার দেশব্যাপী আন্দোলনে কংগ্রেসের মত একটা ছাতা না পেলে তারা ভরসা পায় না। ফরোয়ার্ড ব্লককে এখনো কংগ্রেসের বিকল্প বলে গ্রহণ করছে না, কংগ্রেসের মধ্যেই ‘বোসজিকা কংগ্রেস’ ভাবছে। পুরনো চেনা কংগ্রেসি নেতারা ক-জন এলেন, সেটা তো একটা ভাল করে দেখার বিষয়। নাগপুরে তো মনে হল সেটা বেশ ভাল। জিলা কংগ্রেসের নেতা এসেছিলেন পাঁচ-সাতজন। দু-জন এসেছিলেন দেশীয় রাজ্য থেকে গাড়োয়ালদের খুব নামডাকওয়ালা নেতা একজন এসেছিলেন। তবে, তিনি আমার সঙ্গে ভদ্রতা-সৌজন্য করতে এসেছিলেন না রাজনীতির সমর্থন জানাতে তা বোঝা গেল না। রাজনীতি নিয়ে কোনো কথাই তুললেন না।’
‘আপনাদের কংগ্রেসে রাজনীতির কথা তোলার অর্থ তো গান্ধীজির বিরুদ্ধে কথা বলা। কংগ্রেসিদের পক্ষে সেটা কি সম্ভব? তাও, দরজা-জানলা আটকানো ঘরে যদি-বা সম্ভব, প্রকাশ্যে মিটিঙের মধ্যে সম্ভব? জয়প্রকাশ নারায়ণ পারে? বরং নতুন যুবকগ আসাডা শুভ লক্ষণ। এ গ তো কোনো পিছুটান নেই।’
‘পরিণতিতে নিশ্চয়ই। শুরুতে পুরনোদের দরকার। আমি মুসলমানদের সম্পর্কে রাজনৈতিক মৈত্রীর কথা বলায়, সিরাজদৌল্লা দিবসের কথা বলায়, আমি কলকাতায় ফিরেই হলওয়েল মনুমেন্ট, অন্ধকূপ হত্যার মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ শুরু করব শুনে ওঁরা, মুসলমান নেতারা খুব খুশি হলেন। জানেন, আমি বক্তৃতা করতে-করতেই বুঝতে পারলাম, যেদিন জনসভা ছিল, শ্রোতাদের মধ্যে বেশ বড় একটা অংশ কীরকম হাঁ করে আছে। তারা কোনোদিন শোনেইনি বাংলার মুসলমানদের দেশপ্রেমের কথা। শোনেইনি অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মশায়ের বইয়ের কথা। শোনেইনি হলওয়েলের গাঁজাখুরি অন্ধকূপ সত্যি ঘটেনি। সেটা আমি বোঝবার পর ওই বিষয়টি নিয়েই আরো খানিকটা বললাম। মুসলমানদের কেন চিরকালের জন্য দোষী থাকতে হবে যেন তাঁরাই দেশটাকে শাহেবদের কাছে বিলিয়ে দিয়েছেন? যে হিন্দু রাজারা শাহেবদের ডেকে নিয়ে এসেছেন, নিজেদের জ্ঞাতিবিরোধে দেশের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছেন তাঁদের চাইতে মুসলিম নবাব-সুলতানরা নিশ্চয়ই বেশি অপরাধী নন—এসব শুনে ওঁরা চমকে উঠেছেন। এসব কথা কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে ওঁরা কোনোদিন শোনেননি। শুনবে কোত্থেকে? জাতীয় নেতারা তো প্রায় সবাই অ্যান্টি মুসলিম। সুতরাং মুসলমানের প্রশংসা তাঁদের মুখ থেকে বেরবে না। বাকি রইলেন গান্ধীজি আর জওহর। গান্ধীজি যে-ভাষায় মুসলমানদের প্রশস্তি করেন, সেই ভাষাটাই তো হিন্দুভাষা। আর, হিন্দু-মুসলমান বিরোধ সম্পর্কে কিছু বলতে জওহরের আভিজাত্যে লাগে। তাহলে বুঝুন—’
‘আচ্ছা সুভাষবাবু, আপনে কি সত্যি-সত্যি উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ ভাগাভাগি আপনাদের আন্দোলনে তেমন দরকারি মনে করেন না? নাইলে, এত বড় একডা সম্মিলনে আমাগ কথা একবার উঠে না? আপনেও তোলেন না?’
‘যোগেনবাবু, আপনি এটা ভুল বুঝছেন। আমার ব্যক্তিগত মত কী, আপনি জানেন না? আমি নাগপুর রওনা হওয়ার আগে আপনাকে বিশেষ করে ধাঙড়-মেথর ধর্মঘটের খোঁজখবর নিতে বলিনি? শাকিনার সঙ্গে দেখা করতে বলিনি? আপনি ভেবে দেখুন—আমি তো কংগ্রেসের নেতাদেরও কাউকে এই কাজটার কথা বলতে পারতাম। তা না বলে আপনাকে বলেছি কেন। কংগ্রেস মানেই এদের কাছে, এই ধাঙড়-মেথরদের কাছে হিন্দুবাবু। এই বাধাটা কোনো পক্ষই ডিঙতে পারত না। আপনার বেলায় এসব ওদের মাথাতেই আসবে না। আর আমি চাইও যে ডিপ্রেসড কাস্টরা যত ঐক্যবদ্ধ হয়, ততই ভাল।’
যোগেন হেসে ফেলে।
‘হাসছেন কী মনে করে, না আমার কথায়?
‘দুইয়েই। আপনে কলেন না কংগ্রেসের লোক হলেই আমরা ভাইব্যা নেই হিন্দুবাবু। কথাডা চট কইরা শুইনলে মনে হয়, ঠিকই তো। তারপরই ভাইব্যা দেখি—এই ধাঙড় আন্দোলনের বেবাক নেতাই তো কুলীন বামুন—বঙ্কিম মুখার্জি—কুলীন, শিবনাথ ব্যানার্জি–কুলীন, সুরেশ ব্যানার্জি–কুলীন, নীহারেন্দু দত্ত-মজুমদার—কায়েত বা বৈদ্য। এদের তো ওরা কংগ্রেস-নেতা বইল্যাই জানে। তাইলে এগ ক্যান হিন্দুবাবু ভাবে না?’
‘হ্যাঁ, ঠিকই, তবু একটা কোথায় যেন একটু বাছাবাছি আছে। পাবলিক ঠিক বোঝে। ধরেন, আপনি যাদের নাম বললেন, তাঁদের কিন্তু কেউ ‘স্বদেশী’ বাবুও বলে না। কংগ্রেসিদের বলে, স্বদেশিবাবু, হিন্দুবাবু, কংগ্রেসবাবু। আমাকে এসব ডাকে বলে তো শুনিনি। জওহর একবার বলছিল—এলাহাবাদের আনলাই-সেন্সড ছোট-ছোট সব ফ্যাক্টরির ওয়ার্কাররা তাকে নাকী ডাকত, ‘বেটাবাবু’, এরকম ডাকতে নাকি শিখিয়ে দিয়েছিলেন ওদের মালিকরা মতিলালজির কথা মনে রেখে। এখন সেটাই তাঁর নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘আপনি রুব্যার চান—রাজনীতি সবসময় কমিউন্যাল ইস্যু হয়ে থাকে না আর যেখানে হিন্দুগ নিজেগ ঝগড়া সেস্থানে তো রাজনীতিতে এটা আনা হয় না, মুসলমানদেরও তো ভাই। কার না কী?’
সুভাষ হাসি মিশিয়ে বলেন, ‘এ উক্তি তোমার মুখে না হি সাজে, হে যুবক—’
‘খাইছে। আপনে পাট মুখস্থ করব্যার গিছেন নাকী? ও কামের কাছাকাছি থাকবেন না।’
‘কাছাকাছি না-থাকলে আমাদের কী হবে, আমাদেরও তো পার্টি করতে হবে। আমরা তো আমাদের হিন্দু সমর্থকদের ভুলতে দিতে পারি না যে আমরা তাঁদের পাশে থাকব। সময়টা ভাবুন, আমাদের ওপর রাগ হলেই এআইসিসির খাতা খোলা, তাতে নাম লেখাবে। আপনাকে আগেই বলে রাখছি, এই স্ট্রাইকের সেট্লমেন্ট নিয়ে যদি আমি একটু ক্রিটিক্যালও হই, আপনারা ভুল বুঝবেন না।’
‘আমি না-হয় ঠিক বুঝল্যাম। কিন্তু আর-সবাই তো আমার কাছ থিক্যা বুদ্ধি ধারে নাই। তারা ক্যান মাইনব? এডা আপনার পক্ষে খারাপ হইব তো!’
‘আমি চেষ্টা করব কিছু না বলতে। কিন্তু একটা আপত্তি তৈরি হয়েছে বলে শুনেছি। সিদ্দিকিশাহেব আর শাকিনা দু-জনেই নাকী সরাসরি বলেছেন—বাবুরা তোলা নেয়া বন্ধ করুন’।
‘হ্যাঁ, কইছে তো। দুইজনেই।’
‘হ্যাঁ, একটা আপত্তি হয়েছে—সবাই তো আর তোলা নেয় না। সেই ভাগাভাগি করা হল না কেন? আর, আপনি জানেন তো কর্পোরেশনে এমন অনেকে বাবুর বা মাস্টারির কাজ করেন, যাঁরা বহু বছর জেল খেটে এসেছেন।’
‘তাঁদের তো মনে হতে পারে যে সারাটা জীবন জেলে কাটিয়ে ঘুষখোর বদনাম জুটল।’
‘তাগই তো তাইলে আপত্তি কর্তব্য।’
‘যাই অফিসে, বেশি হাঙ্গামা না হলে কিছু বলব না। অনেক সময় দেখা যায়—দু-একজন বদবুদ্ধি করে এসব কথা চালিয়ে দেয়। খোঁজ নিতে গেলে কেউই স্বীকার করে না।’
‘হ্যাঁ, আমার কিন্তু মনে হয়—কর্পোরেশনে যে এইডা এত ভাল কইর্যা সেটেলড হইল, এর সবড়াই আপনার জইন্যে। আপনেই সিদ্দিকিশাহেবরে কয়্যা গিছেন। শাকিনারা তো এমনও ভাবছে—আমিই আপনার ম্যাসেনজারের কাম করছি। শিডিউল্ড কাস্টগ সঙ্গে আপনার এই সম্পর্কটারে রক্ষা করার লাগে। যেন ভুল না-বুঝে কেউ।’
সুভাষ বলে উঠলেন, ‘একজ্যাক্টলি সো। পুরনো কায়দায় যে চলে না আর নতুন-নতুন মৈত্রী করাটা যে আমাদেরই দায় এটা মানুষজনকে সাহস করে দেখাতে হবে। দেখালে তারা নিজেরাই বুঝে নেবে-আপোশ আর সংগ্রামের পার্থক্য। ইট হ্যাজ টু বি প্রুভড দ্যাট এ স্ট্রাগল ক্যান বি ওন। আমি নাগপুরেই ঠিক করেছি—এবার আমার উচিত কিছু ক্যালকুলেটেড রিস্ক নেয়া। আমি মনে-মনে ঠিক করে ফেলেছি।’
সুভাষবাবু, আমারে মাফ দিবেন। আপনে যতগুল্যা কথা কইলেন—মানুষরে চমকান্, মানুষরে দেখাইয়্যা দেয়া, ক্যালকুলেশন, রিস্ক—এই সব কথায় আমার পিল্যা চমকায়। নেড়ার কোনো পলিটিক্যাল বা ফিলজফিক্যাল কারণ নাই। আমরা, হিশাব কইরা দুই-শতাংশ পাঁচ-শতাংশ বাদ দেয়ার কাম নাই। আমরা, শুদ্দুররা, গ্রামের, অ্যাহন শহরেরও, এমন দুঃখী মানুষ যে আমাদের সমাজেও তো বুড়াবুড়ি আছে, আবার, নতুন কথা শিখতেছে এমন দশ মাস-একবছরের শিশুও আছে, তাগ কেউ কুনোদিন গল্পও শোনে নাই যে মানুষে দুই বেলা খায়। সে কষ্ট-অনাহার কোনো দুঃখও দেয় না—খিদার জায়গাটাক অসাড় কইর্যা দ্যায়। অ্যাহন, এত মানুষের মধ্যে, এত সব ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদার, দশডা ঠাকুরদাদার টাইমে, আর কখনো সমুদ্রের তলায়, কখনো কচ্ছপের পিঠের নাগাল, ডোবে আর ভাসে যে-জায়গাগুল্যান, কোনো একদিন কোনো একজন মানুষের তো মাথা চাইগ্যা উঠতে পারে যে আর সহ্য হয় না, একটা এসপার ওসপার হইয়্যা থাক। ওই ক্যালকুলেশন শুরু হয়। আর প্রত্যেকবারই ক্যালকুলেশনটা ভুল প্রমাণিত হয় সর্বনাশ হইয়্যা যাওয়ার পর। এডা হচ্ছে বাঁচার ডর। হাজার-হাজার বছরের না-খাওয়ার ডর। আপনে কন। আমার এই কথাডারে কোনো পাত্তা দিবেন না। আপনে কন।’
সুভাষ একটু চুপ থেকে বললেন, ‘আমি বলেছি পিয়োরলি আন্দোলনের কথা। লন্ডনের, দিল্লির, কলকাতার সব গভর্নমেন্টই চায় আমাকে ডিওআই রুলে অ্যারেস্ট করে জেলে পচাতে কিন্তু এখানকার মন্ত্রীরা সাহস পাচ্ছে না। বিশেষ করে ফজলুল হক। গভর্নরের নাকী খুব পছন্দ—আমাকে আটকে রাখলে অন্তত একটা দিকে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। বরং ভাইসরয়ের নাকী দ্বিধা আছে। কারণ ফজলুল হক সবার চাপে পড়ে নাকী বলেছেন—যুদ্ধটুদ্ধ তো দিল্লির ব্যাপার, দিল্লি যা করার করুক, এর মধ্যে আমাদের জড়ায় কেন? এটা জেনেই আমি ঠিক করেছি গবর্মেন্টকে এক্সপোজ করার সুযোগটা ছাড়ব না। ইয়োরোপিয়ান গ্রুপ নাকী বলে দিয়েছে আমাকে অ্যারেস্ট না করলে হক-মন্ত্রীসভাকে তারা ফেলে দেবে। সুতরাং আমি কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দোসরা জুলাই হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙার জন্য সত্যাগ্রহ করব। এদিকে গবর্মেন্টের পক্ষে হলওয়েল মনুমেন্ট যে জায়গায় সেখানে প্রাইভেট প্রপার্টিতে পুলিশ লাগিয়ে মনুমেন্ট রক্ষা করাও সম্ভব না, ভাঙাও সম্ভব না। কিন্তু আমার তো কোনো আইনের বাধা নেই। আমি তো বলেকয়েই যাচ্ছি। সাহস থাকে আটকাও। নয় তো প্রকাশ্যে বেইজ্জত হও। আর লাটশাহেব সহ ইয়োরোপিয়ান গ্রুপ হকশাহেবের গবর্মেন্টকে যদি ফেলতে পারে, ওয়েল, আল ইনভাইট দি কোল্যান্স অ্যান্ড ক্যাওস। রিস্কটা এই জায়গায় যে যদি আমাকে অ্যারেস্ট করে ফেলে, তাহলে তো আমার সব কাজকর্ম মাথায় উঠবে। অ্যারেস্ট হয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। আমি চাইছি টু প্লে অন দি মারজিন। আপনার কী মনে হয়। কিছু শুনেছেন নাকী?
যোগেন একটু চুপ করে থাকে তার ঠোঁটের কোণে একটুখানি চাপা হাসি নিয়ে। এটাই তার চিন্তার মুদ্রা। বা, হয়ত জবাব তার জানা আছে। সেই জবাবটা খুব সরল নয়। তাই নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছে। যোগেন হঠাৎ ঘাড় তুলে জিগগেস করে, ‘আপনার শরীরের যন্ত্রপাতি চালু আছে তো?’
সুভাষ একটু অপ্রস্তুত স্বরে বলে, ‘ঠিক খেয়াল করিনি, তবে ভালই আছি তো, কাজ থাকলেই আমি ভাল থাকি।
‘খাওয়া আর ঘুমের পরিমাণ ঠিক আছে তো?’
সুভাষ একটু হেসে বলেন, ‘আপনি জিগেস করায় আবার নার্ভাস লাগছে। না, ঠিকই আছে। ঠিকই আছে।’
‘মানে ঠিক-ঠিক সময়ে খাওয়া পাইলে ক্ষুধা পায় না এই তো?’
‘সেটা হতে পারে। খেয়াল করিনি।’
‘আর রাত্তিরে যখন শোয়া হয়, তখন ঘুমানো ছাড়া গতি নাই।
‘সেটা হয়ত ঠিক। তবে আমি তো ইনসোমনিয়ায় অনেকদিন ভুগেছি। এটা ইনসোমনিয়া না—সেটা বুঝি।’
‘আপনে যে ক্যালকুলেটেড রিস্কের কথা কইলেন, সেডা তো শুধু পলিটিক্স ভাইব্যা?’
‘তাছাড়া কী ভাবব। তবে পলিটিক্সটা তো আমার জটিল হয়ে গেছে। একইসঙ্গে এআইসিসিকে বাংলায় ঢুকতে না দেয়া, বিপিসিসিকে শক্ত করা, বাংলার বাইরে ফরোয়ার্ড ব্লককে অলটারনেটিভ পলিটিক্স হিশেবে তৈরি করা আর তার সঙ্গেই অ্যান্টি ব্রিটিশ মোবিলাইজেশন ও অ্যাকশন প্ল্যান করা। লেফট কনসোলিডেশনে কমিউনিস্টরা খুবই সাহায্য করছে। ওদের কৃষক সমিতিগুলিতে ‘না এক পাই, না এক ভাই’ স্লোগানটা খুব ধরেছে। একই সঙ্গে অ্যান্টি ওয়ার ও নো রেন্ট। মুসলিমদের সঙ্গে আমার যে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে সেটা কাজে লাগাতে চাই। হলওয়েল সেদিক থেকে বড় সুযোগ। এমন সুযোগ আর নাও আসতে পারে। এই মুহূর্তে একটা অ্যাকশন খুব দরকার। রিস্কটা এই জায়গায় ওই অ্যাকশনের ফলে অনিশ্চিত ইনঅ্যাকশন, যদি অ্যারেস্ট করে। তাহলে তো ফার্দার অ্যাকশন শিকেয় উঠবে। এইটা আমার প্ল্যানে এখনো ঢোকাতে পারছি না—অ্যারেস্ট করলেও, আমাকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য জেলে আটকে রাখলেও, এমন কী আমাকে বাইরে কোথাও একজাইলে আটকে রাখলেও ফার্দার, গ্রেটার ও ম্যাসিভ স্ট্রাগল শুরু হতে পারে, ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
‘আমি তো ক্যালকুলেটেড রিস্ক বলতে শুধু আপনার শরীর বুঝি। আপনার শরীর কোনো অতিরিক্ত কষ্ট বওয়ার অনুপযুক্ত। জেলে তো অত্যাচার হইতে পারে, খিদা আর ঘুম যাইবে কইম্যা, রক্তপাত ঘটতে পারে শরীর থিক্যা। রিস্কডা বেশি হয়্যা যাচ্ছে না?
