১২৭. দুর্যোগ নিয়ে মিটিং ও মিটিঙে দুর্যোগ
পরদিন সকালে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সভা যে এত বড় হবে—কেউ ভাবতেই পারেনি। জিলা ম্যাজিস্ট্রেট অল পার্টি বলতে হয়ত বুঝিয়েছিলেন সকলকে ডাকা, এমন বিপদে কোনো বাছবিচার না করা। ফলে, বলতে গেলে বরিশালের সবাই এসেছেন। পুরনো মানুষজন এসেছেন—যে দুর্যোগ চার পাঁচদিন ধরে চলছে সে–সম্পর্কে কৌতূহল নিয়ে। বরিশালের কথা তো! কিছু বলা যায় না। সমুদ্রের এতই ভিতরে যে এখানে বাড়ির পুকুরেও জোয়ারের জল আসে। পুরনো মানুষ যাঁরা, তাঁরা আন্দাজ করতে পারবেন— এত দুর্যোগ কি স্থায়ী হয়ে গেল, নাকি ভোলার নাম। যে একটু রটেছে তার মানে ভোলা চিরকালের মত চলে গেল বা যাচ্ছে।
রাজনীতি, ক্লাব, ব্যায়াম সমিতি, সেবাসংঘ ইত্যাদি করে যারা সেই মাঝবয়েসি নেতারা এসেছেন—কী করে ত্রাণ ও সেবায় সরকার বা পাবলিককে সংগঠিত করা যায়, তার একটা আন্দাজ নিতে। বরিশালের সেবা ও ব্যায়াম সমিতি বহু কালের। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ, স্বামী পুরুষোত্তমানন্দ, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, এঁদের শিষ্য ও ভক্তদের মধ্যে আধ্যাত্মিক সাধনা ও স্বদেশপ্রীতি একাকার হয়েছিল। এঁদের সঙ্গে সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মসূচিরও সংযোগ ছিল। ‘অনুশীলন সমিতি’, ‘আত্মোন্নতি সমিতি’, ‘ঢাকা অনুশীলন সমিতি, যশোহরে বিজয় রায়ের দল, এরকম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এক-একটি জায়গার নাম জড়িত থাকলেও জিলা ও জিলার বাইরেও তাঁরা সক্রিয় ছিলেন। মাত্র একরাত্রির ভিতর এমন একটি বড় সভা সংগঠন করা কারো পক্ষেই সম্ভব হত না যদি এই দুর্যোগ নিয়ে উদ্বেগ-আশঙ্কা জড়িয়ে না থাকত আর বরিশালের মানুষজনের ত্রাণ ও সাহায্যের কাজে যুক্ত থাকার অভ্যেস না থাকত।
জিলা ম্যাজিস্ট্রেট খুব কম কথায় বললেন, ‘কাল বিকেলে প্রথমে ফোনে ও পরে মুখোমুখি বরিশালের এম এল এ মিস্টার জে এন মণ্ডল আমাকে জানান যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা সকলে প্রায় চার পাঁচদিন হল হতবুদ্ধি ও হতাশ হয়ে বসে আছি উনি সেই দুর্যোগের কেন্দ্র ভোলা-তে ছিলেন। তিনি, তাঁর এক বন্ধু, দুদু মিয়া, ওখানকার একজন প্রধান উৎপাদক ও ব্যবসায়ী, তাঁকে নিয়ে এসেছেন। তাঁরাই এ-বিষয়ে প্রথম খবরগুলি জানিয়ে দেবেন।’
চেনাজানা মানুষজনদের সঙ্গে যোগেনের দেখা হল কোথায়? সে জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের পাশে বসে, কাউকে নমস্কার করে, কাউকে হাত তুলে, কাউকে হেসে সম্ভাষণ জানাচ্ছিল কিন্তু দুর্গামোহন সেনকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। দুর্গামোহন চেয়ারে বসার পর, যোগেনের দিকে সম্মতি জানিয়ে হাত তুললে, যোগেন চেয়ারে বসে, কিন্তু ততক্ষণে জিলা ম্যাজিস্ট্রেট আবার ‘মিস্টার মণ্ডল’ বলা মাত্র উঠে দাঁড়ায়।
যোগেন প্রথমেই বলে, ‘আপনাগ মনের প্রথম প্রশ্নডার জব আগে দিয়্যা দেই। তাইলে পরে অনেক হাঙ্গাম কমব। আমি কেমন কইর্যা ঝড় পাইল্যাম বা ঝড়ই-বা আমাকে পাইল ক্যামনে।’ না। আমি এই ঝড়ড়ারে পিছনে বাইন্ধ্যা আনি নাই। ঝড়ড়াও আমারে কলিকাতার থিক্যা উড়াইয়্যা আনে নাই।’
যোগেন সামান্য হাসি আশা করেছিল, পেল না।
লোকজন ঘটনাটা শুনতে চায়। যোগেন বুঝে নিল।
‘আমি তিন চারদিন আমার অন্য একটি কর্মের ব্যপদেশে কইলকাতা থিক্যা খাগাবাড়ি যাই কাইল দুফরেই তো? বাবা অসুস্থ। সেইহেতু ছোট কবরাজমশায়ের নিকট যাই, মৈস্তারকান্দির। সেই বাড়ি হইতে বাহিরে হওয়ার সময় এই বাতাসডা ঠাহর করি। না। কথা ভুল হইল। এই বাওয়ের প্রথম ঠেলা পাই ছোট কবরাজমশায়ের ঘরে ঢোকার পিছ পায়ে। তারপর তো সারা রাইতই সবাই মিল্যা যমে মানুষে টানাটানি
‘কুথায়?’
‘আমি তো মৈস্তারক্যান্দিতে ছিলাম। যম নি আমারে তারপাশায় টাইনব?’ যিনি প্রশ্ন করেছিলেন তিনি তারপাশার। তিনি বলে উঠলেন, ‘যম প্রবেশ কইরল কহন? কোথায়? সেসব না কইয়্যাই এককেবারে তার লগে টানাটানিটা শুরু করল্যা?’
‘আমাগ বাড়ি তো কত্তা, বাবুইয়ের বাসা। দ্যাখতে ময়ুর পং খি, আর বাও উইঠলেই হোগা পুঙ্গি। চাল উইডায়্যা নিব্যার চায়। আমরা আছি, ধরেন, তিন-চার পুরুষ। সবাই মিল্যা একডা চাল ধইর্যা রাইখতে পারি না? যাক গিয়া, আমার ম্যাজদায় শ্যাষে সাহস কইর্যা উইঠল আড়কাঠে। সকালে, আজই তো?’ সকলে মিলে ‘কাল, কাল’ বলে উঠলে যোগেন ‘কাল হলেই-বা আগায় কী, আইজ হইলেই-বা অসুবিধা কী’ বলে নিয়ে বলে, ‘ঘাট থিক্যা নৌকা নিয়্যা বাড়াই। দেইখব্যার চাই, বিষয়ডা কী। শ্যায়না মাঝি কেউ রাজি গেল না। দুই চ্যাংরা রাজি হইল। সার রাত্রি জাগা গিছে। শরীর দিল প্রভাতবায়ুতে ছাইড়্যা?’
‘ঐ দুর্যোগে? নদীতে?’
‘নদী তো দুর্যোগেও নদীই যাহে। আমি আমার কোঁচা দিয়া মাথা ঢাইক্যা ঘুমাইয়্যা পইড়ল্যাম। এইডা আমি বরাবর দেইখছি ঠাকুরমশায়রা, ঘুম আর ক্ষিধ্যার কুনো ভদ্রতাজ্ঞান নাই। নাইলে ঐ সময় কি আমার ঘুমাইয়্যা পড়াডা উচিত ছিল? চ্যাংরা মাঝিরা যহন আমারে ডাইক্যা তোলে, আমি জাইগ্যা দেহি মুলাদি। দেহি না, শুনি। ওরাই কইল, মুলাদি। মুলাদি, তো ঝড় নাই কেন, লঞ্চ নাই কেন, মহাজনি নৌকা নাই কেন। তহন দেহি—লাইনবান্ধা লঞ্চ সব শিকল দিয়্যা অ্যাংকর, দেশী নৌকা ডাঙার উপর টানা আর মাঝিমাল্লাগ জমাৎ। কিন্তু দুর্যোগ নাই ক্যা? মুলাদি তো মেইনলাইন। মেইনলাইনে দুযোর্গ নাই, মানেডা কী, মানে কি এই যে-দুর্যোগ দেইখব্যার আইছি, সেডা তাইলে মেইনলাইনে দুর্যোগ না। যদি দুর্যোগ নাই হইব, তালি লঞ্চ কোম্পানি সব লঞ্চ বন্ধ জারি কইরছে ক্যা, নদী নৌকাশূন্য ক্যা, ছোটনৌকা ডাঙায় তোলা ক্যা। তহন শুনি, ঐ মাঝিমাল্লাগ সঙ্গে কথা কইয়্যা জানি—সবই ঠিকঠাক আছে, মেইনলাইন মেইনলাইনেই আছে, ঝড় ঝড়েই আছে, মুলাদি মুলাদিতেই আছে। আমার নিদ্রাভঙ্গ যাতে না হয়, সেই উদ্দেশ্যে আমার নাওডারে একটা ঘুপচির মইধ্যে ঢুকাইয়্যা রাইখছে। তাই দুর্যোগ গায়ে লাগে না। তহন আরো জানি, অত যে মাঝিমাল্লা, অত যে মহাজনি ডিঙা, অত যে লঞ্চ আর গাদাবোধ, তাগ একজনও ভাটি মাইর্যা দুই রশি আগাইয়া তহনো দ্যাহে নাই, তহনো জানে না, দুর্যোগডা কি ভাঁটিতে না উজানে। আমি তাগ দশকথা শুন্যাইল্যাম, কলঙ্ক বইল্যা। তারা লজ্জা পাইয়্যা কোথথিক্যা এক সাইজ মত হাল আইন্যা দিল ছোট মাঝির নৌকায় বাইন্ধ্যা। তারপর শানু বইল্যা এক পাগলরে হালে বসাইয়্যা নৌকা দিল ঠেইল্যা।’
যারা শুনতে এসেছিল তাদের কেউ-কেউ ঐ জনপথ ও জলপদগুলি চেনে। তারা একটু বেশি বুঝতে পারছিল।
এমন কথাও কেউ বলল, ‘কইল্যা যে এক পাগলারে হালে বসাইয়্যা নৌকা দিচ্ছে ঠেইল্যা। কত বড় ওস্তাদ মাঝি হইলে আড়িয়াল খাঁর জল না ছুইয়্যা আড়িয়াল খাঁ পার হয়। যেমন বইরশালের মানুষ-খাওয়া নদী, তেমনি নদীর পেট চিইড়্যা নদীগেলা মানুষরে বাইর করে বইরশালের মাঝি।’
যোগেন চরভাসানের দুদু মিয়ার পরিচয় ও এই দুর্যোগে মানুষকে বাঁচাচ্ছেন কী করে তার বিবরণ দিয়ে অনুরোধ করে, দুদু মিয়া যেন তাঁর আন্দাজটা দেন, কতটা ক্ষতি, জানপ্রাণ, গাইবলদের ক্ষতি কত, ফসল সম্পত্তির ক্ষতি কত।’
একা কথা বলছে আর ঘরভর্তি মানুষ শুনছে—এমন ঘটনা দুদু মিয়ার কত দেখা। সে তো মোল্লা-মৌলবি-পিরদের কাজ। নিজের অনেক পাপের জন্য কেয়ামতের দিন সে যে সবচেয়ে বেশি শাস্তি পাবে, এ নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাকে যে এই জীবনেই পির হয়ে কথা বলতে হবে, এতগুলো মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে, সেটা তার কাছে কেয়ামেেতর দিনের শান্তির চাইতেও অনেক কঠিন লাগল।
সে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলে বসে, ‘আমি তো জানিই না, কীসের মইদ্যে কী হইছে? চরভাসানে আমার একখান দলিজ আছে কিন্তু আমার বাড়ি তো মেহেন্দিগঞ্জের দক্ষিণে। গণেশপুরা জেনের নীচে। দুপুরে ঘুইরতে-ঘুইরতে আইস্যা পড়ি চরভাসানে। বেলাবেলি আর ফিরব্যার পারি না, এমন উলট্যা বাও আসা শুরু করে দক্ষিণ থিক্যা। স্যায় মনে হয় চক্ষু দুইড্যা খুইল্যা যাবে। তাও মনে নেয়, কী, আরে এই বাওয়ে যদি ভাসানচর থিক্যা ভোলা যাইব্যার না পারি তাইলে তো গোরে যাওয়াই ভাল। যতবার নৌকাডা ছাড়র বইল্যা আগাই, ততবার পিছাই। ক্যামন য়্যান ঐ বাওয়ে কাঠপুড়ানোর গন্ধ নাকে লাগে। মনে হইল, ডর খাইছি। মনে হইল, আমার নানি সেই কবে কইছিল-ডর যদি খাসই, ডরটা তালি স্বীকার দিয়াই খাস। ডর-খাওয়ায় লজ্জা নাই মণি। লজ্জা ডর খাই নাই বলার বুজরুকিতে। নৌকা না ছাইড়্যা ভাষানচরে থাইক্যা গেলাম। আর রাতদুফুরের আগে থিক্যা মানুষ তুইলব্যার শুরু। আন্ধারে তো কিছু বোঝাও যায় না। মনে হয় সারা নদীতেই মানুষ। শ্যাষে বড়-বড় জাইল ফেইল্যা মানুষ তুইলতে লাগল্যাম। কে কী কয় জানি নাই, শুনি নাই। পরেরদিনও নদীভর্তি মানুষ। তহন তো মানুষের থিক্যা বেশি গরুমেষ। ভাইস্যা যায়—বোঝার উপায় নাই জ্যান্ত না মরা। দ্বিতীয় দিন, তাও বেলা গেলে আমার মনে পইড়ল—তাইলে তো আমার বাড়িও ভাইসছে। এত বড় উঁচা বানা ঠেহাবার ঘর আমার একডাই। যেমন মৈষ ভাসে, তেমন কি আর খুঁটি না ভাইঙ্গ্যা পারে। আপনাগ কবড়া কী? আমার বাড়ির খবর না-জাইন্যাই আপনাগ কাছে কইব্যার আসছি। এডা সত্যি কথা, খোদার কিড্যা কাইট্যা কই সত্য কথা। দুদু মিয়াও তার বাড়ির খবর নিব্যার পারে নাই। সত্যি তো পারি নাই। এডা তো সর্বনাশের একডা মাপ–কতডা সাইকোলন হইছে, না, দুদু মিয়াও তার বাড়ির খবর নিব্যার পারে নাই। দুদু মিয়া তো একটা মানুষ না। একটা মাপ। সেই মাপড়া ভাইস্যা আইসছে। যুদ্ধে আর এমন সর্বনাশের একডাই গুণ—কোনো সংবাদই আর দুঃসংবাদ হয় না—’
বোঝা গেল, দুদু মিয়া ভেঙে পড়ছে, আর বলতে না-পেরে বসে পড়ে। সারা ঘর স্তব্ধ – হয়ে থাকে। এবার যোগেন নিচু স্বরে চেয়ারে বসে থেকেই বলে, ‘কাইল থিক্যা মিয়া ভাইয়ের সঙ্গে বইস্যা একডা কোনো আন্দাজ কি পাওয়া যায় দেখছি। আমি সেইডা কই। চরভাষান কিন্তু সব থিক্যা ডাইনের জায়গা। এইখানে সব থিক্যা কম লোক আসব্যার পারছে। স্বামী-স্ত্রী-পরিবার না-ধইরা মাথাগুনলেও ৮ হাজার ৩ শ ২৫ জন মানুষ। এইডা থিক্যা একডা হিশাব বাইর করছি—অ্যাহনো দুর্যোগ শ্যাষ হয় নাই। সমুদ্রের দুর্যোগের পাঁজিপুথি নাই। দুর্যোগ বাইরব্যারও পারে। আমরা সরকাররে কই যে সরকার আগাইয়্যা নাইলে এ দুর্যোগ পাড়ি দিব্যার খ্যামতা আমাগ নাই। আমি কই কী—আমরা যে আজ আইস্যা পইড়ল্যাম, তাতে তো এইডা সাবুদ হইল আসা যায়।’
দুদু মিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে অবিশ্বাস জানিয়ে বলে, ‘না, মণ্ডলমশায়, না, আমরা যে আইসছি তাতে এইডাই জাইন্যা আসছি যে আসা যায় না। আমাদের কাইল বরিশাল আসার থিক্যা ভাইস্যা যাওয়ার কথাই বেশি ছিল। আজও আমরা ঐ জল দিয়্যাই পার হব। আইজও আমাদের নৌকা পাড়ে নাও যাবার পারে। যাওয়া যায় এই হিশাব থিক্যা কোনো কাম ঠিক কইরবেন না।’
আলোচনা গুটিয়ে আনতে জিলা ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, ‘আমরা নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারি যে মিস্টার দুদু মিয়ার মত মানুষ এখনো জানতে পারেননি, তাঁর বাড়িঘর-নিকটজনদের খবর। এ-থেকেই আমরা অবস্থা যে কত খারাপ তার আন্দাজ পেতে পারি। আমি আজ এই মিটিঙের সব খবর গবর্মেন্টকে পাঠাচ্ছি—হাঁটাপথেও ও টেলিগ্রামেও। আমাদের এই মুহূর্তের দরকার রাফেস্ট পসি সি-তে নেভিগেট করতে পারে এমন কোনো ফ্লোটিলা। কিন্তু আমার দিক থেকে যা করার তা কাল থেকেই করা শুরু হয়েছে। আমি চাই এত কঠিন একটা দুর্যোগের মোকাবিলায় সরকার ও পাবলিকের মধ্যে সহযোগিতার একটা পরিবেশ তৈরি করতে। আমার অনুরোধ আপনারা এই সভা থেকে একটা কমিটি তৈরি করে দিন—’বরিশাল ডিজাস্টার রিলিফ কমিটি!’ আমাকে পদাধিকার বলে মাথায় রাখুন। আপনাদের মধ্যে থেকে কেউ সেক্রেটারি হন। আজ সভায় যাঁরা আছেন, তাঁদের সবাই সেই কমিটির সভ্য।’
‘রশিদ বইটই তো ছাপতে হবে।’
‘আমি কিন্তু ভাবছি—এটা এমন একটা আকারের ডিজাস্টার যা নরম্যাল ফ্লাড রিলিফ কমিটি বা গবর্মেন্টের রিলিফ ডিপার্টমেন্ট এঁদের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমি গবর্মেন্টের সঙ্গে কথা বলব। সমস্ত খরচ গবর্মেন্টের। খরচ ট্রেজারি থেকে হবে। পাবলিক ডোনেশন যদি নেয়া ঠিক হয়, তার পদ্ধতি পরে ভাবা যাবে। সেটা কোনো সমস্যা হবে না।’
এতদূর পর্যন্ত খুবই ভালভাবে চলা সভা শেষ হল আচমকা ও খুব খারাপভাবে।
সভাতে অনেকেই এসেছেন, বরিশালের সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা সতীন সেনও ছিলেন। এমন একটা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিশেবে সতীন সেন যে যোগ্যতম সে বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। এতটা বিশ্বাস আর কোনো নেতার ওপর নেই। সংগঠন শক্তি ও কর্মী সমাবেশের ক্ষমতাই-বা সতীন সেনের তুল্য আর কার আছে? কেউ একজন খুব সহজ ভঙ্গিতে ও স্বাভাবিক স্বরে বলল, ‘ঐ একটা পোস্ট তো! তাহলে সতীনদাই থাক।
হঠাৎ, একেবারেই হঠাৎ, দুদু মিয়া বলে উঠল, ‘আপনারা মাফ দিবেন। আপনারা কি সতীন সেন মশায়ের নাম বইললেন—।’
দুদু মিয়া চুপ করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন দেখে জিলা ম্যাজিস্ট্রেট মাথা হেলিয়ে বললেন, ‘ইয়েস’।
দুদু মিয়া বলে ফেলে, ‘আমার সঙ্গে তো উনার কোনো সাক্ষাতের কথাই না। উনি কত জেল খাইটছেন, কত দেশের সেবা কইরছেন সে তো দুধের ছাওয়ালও জানে। কিন্তু মুসলমানরা ওনাকে আপন মানুষ ভাবে না, বরং উলট্যা শত্রুই ভাবে। পটুয়াখালিতে মশজিদের সামনে ঢাকপিটানো পাশ করা জন্য হিন্দুরা যেমন ওকে সেলাম করে, মুসলমানরা তেমনি ওনাকে বেয়াদপ করে। তারপর কলেজের সরস্বতী পূজা নিয়্যা রায়ট। তারপর পোনাবালিয়ার ১৯ জন মুসলমান পুলিশের গুলিতে মরে। সেখানেও উনিই ছিলেন লিডার। ভোলা মহকুমায় হিন্দু মানুষজন কিন্তু নাই বললেই চলে। মাইল পাঁচ-সাতে একঘর কী দুইঘর। ছোট জাতের হিন্দুও নাই। সতীনবাবুর কমিটির উপর ভোলার কোনো মুসলমান কিন্তু কোনো বিশ্বাস রাইখতে পারবে না। আমি কুনোদিন এত মোড়ল-মাতবর-ম্যাজিস্ট্রেটের লগে মিটিং করি নাই। ভোলার এই বিপদে আপনারা আমার সব কথা বিশ্বাসে নিয়্যা এত বড় দায় নিলেন। আমি যদি সব কথা আপনাগ না জানাই, তালি তো আমার গোস্তাকি হয়।
হঠাৎ করে সভাটা চুপ হয়ে গেল। চুপ তো হয়েই যেতে পারে কোনো সভা। তেমন যে হতে পারে, এতক্ষণ তার কোনো ইশারাই ওঠেনি, যেন জলের আওয়াজ চাপা দিয়ে ইঞ্জিনের আওয়াজে নদীর দিগন্ত ভেঙে একটা মিস্টার বেশ গতি নিয়েই এগচ্ছিল, হঠাৎ করে চরে আটকে গেল, তখনো ইঞ্জিন চলছিল, স্টিমার উঠল না, ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল—
দিল—তার পরের আকাশ-বাতাসের চুপ হয়ে যাওয়ার মত সভা চুপ হয়ে থাকল। স্রোতের বাতাসেরও আরো সব আনুষঙ্গিক আওয়াজের পুনশ্রুতি তখনো ফিরে আসেনি। সতীন সেন কোথাও আছেন—অথচ তাঁকে দেখা যাচ্ছে না, এ তো হতেই পারে না, তাঁর শারীরিক কারণে—তিনি এতটাই লম্বা ও এতটাই প্রধান। এই সভায় এখন তাঁর দিকে লুকিয়ে চাইবার একটা চলৎ চাউনি তৈরি হতে পারত কিন্তু এ-সভায় তেমন কেউ ছিলই না যাঁকে চাউনি লুকোতে হবে। অথচ সভার একটা ভঙ্গি কিন্তু সেই নীরবতার কারণেই ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছিল। দুদু মিয়াকে এ-সভার কেউ চেনেই না প্রায়। সতীন সেন এক সভার প্রায় সকলেরই নেতা। কিন্তু এটা বোঝা গেল, সভা মনে করছে, দুদু মিয়াই এখানে প্রধানতম মানুষ, তিনি এখনো দুর্যোগের মধ্যে আছেন, নিজের বাড়িঘরের খবরও জানেন না, আবার সেই দুর্যোগের পথ বেয়েই দুর্যোগের ভিতরে যাবেন। তাঁর কথার কোনো অমর্যদা করা যায় না।
হাসেম আলি এমন মানুষ যিনি শেষপর্যন্তও অপেক্ষা করে থাকেন, নিজের নীরবতা রক্ষা করতে। সব সভাসমিতিতে থাকেন, যদি সেসব সাম্প্রদায়িক কিছু না হয়। কিন্তু তাঁর ভঙ্গিটাই এমন যে ভঙ্গিটা শুধু তাঁরই। ধার হিশেবেও সেটা তিনি কাউকে দেবেন না। আর তাঁর সেই ভঙ্গি এতই স্বনির্ভর যে কোনো লাঠি বা কারো ঘাড়ে তিনি কোনো ভর দিতে চান না।
তিনি তাঁর চেয়ার থেকেই বললেন, ‘আমার তো মনে হয় শ্রীযুক্ত দুদু মিয়ার কথাডা বাস্তবসম্মত। বিপন্ন মানুষজন কাকে ভরসা করবেন, সেটা তো ভাবনা করতেই লাগে। এডা তো শ্রীযুক্ত সতীন মশায়ের সম্পর্কে কোনো বিচার না। আরো কত যোগ্য মানুষও তো আছেন।’
সভা আরো চুপ হয়ে গেল।
সেই চুপের স্বর মেনেই সতীন সেন তাঁর চেয়ার থেকে বললেন, ‘হাসেম আলি শাহেব তো আসল কথাডা কয়্যা দিলেন। আমারে আপনারা যে-দায়িত্ব দিচ্ছেন আমার তাতে ‘না’–বলার অধিকারই নাই। তাই চুপ কইর্যা ছিল্যাম। কথাডা তো বিপন্ন মানুষগুলাক বাঁচান্। বাঁচান শুদু না। বাঁচাই য্যা রাখা। আমার কাজকর্ম নিয়া মুসলমান, সম্প্রদায়ের এই ধারণা যে আমি হিন্দুদের পক্ষে সেডা আমার জানা। এই ভোলা-র কাজে মনপ্রাণ দিয়্যা আমারে প্রমাণ কইরব্যার লাগব সে ধারণাডা ঠিক কি ব্যাঠিক। আপনারা আমারে কর্মী থিক্যা বাদ দিবে না। আর-কাউরে সম্পাদক করেন। আমারে কর্মী বইল্যা হিশাবে রাইখবেন।’
জিলা ম্যাজিস্ট্রেট বলে ওঠেন, ‘আমি একজন বিশ্বাসী খ্রিস্টান ও ধর্মাচরণ পালন করি। সেই হিশেবে বলছি, এমন একটা সভায় হাজির থাকতে পারাটা ভগবানের আশীর্বাদ। এ মিটিঙে মানুষই প্রধান। সত্য আর মহত্ত্ব এখানে শিশুর মত খেলা করছে। আপনারা দয়া করে একটা নাম বলুন।’
সভায় একটু-আধটু কথাবার্তা হয়।
একটু নবীনতর কেউ বলে ওঠে, ‘এখানে তো জিলা ম্যাজিস্ট্রেট নিজে আছেন। উনি যদি কথা দেন যে গোপালজ্যাঠাকে এর মধ্যে আর অ্যারেস্ট করবেন না, তাহলে গোপাল মুখোপাধ্যায় সাধারণ সম্পাদক হতে পারেন।
প্রস্তাবটি সত্যও হতে পারত কিন্তু একটু রসিকতাও ছিল। গোপাল মুখুজ্যে বরিশালের ছেলে। অনুশীলন সমিতির নেতা। সেই হিশেবে ২১/২২ বছর বয়স থেকে শুধু জেলই খেটেছেন। মাত্র বছর খানেক হল তিনি সিরাজগঞ্জের জাতৈল থানা থেকে মুক্তি পেয়ে আট-দশ বছর পর বরিশালে ফিরে এসেছেন।
বরিশালে এমন মানুষ কম ছিলেন না।
‘অকারণে আর নাম বলাবলি করে কী হবে’, সতীশ পাকড়াশি বলে উঠলেন, ‘দুদু মিয়াকে জিগগেস করে যোগেনবাবুকে সাধারণ সম্পাদক করে দিন।’
‘সেটা তো অতক্ষণ কারো মনে উদয় হয় নাই’, পণ্ডিতমশায় বলে উঠলেন, ‘যে-লোকডা সাঁতরাইয়া আইল, তারে মাথা মোছারগামছা আগুইয়্যা না-দিয়া সিংহ-প্যাঁচার গাও মুছান!’
যোগেন দাঁড়িয়ে উঠে বলে, ‘এইডা কি আমার সাজে? এইহানে বরিশালের বেবাক মানুষজন খাড়াইয়্যা আছেন, যাগ পায়ের ধুলার আমি যোগ্য না। আমারে আপনারা এই শাস্তি দিবেন না। আমি কই কী, বরিশাইলের বাইর থিক্যা কাউরে কইরলে হয় না– আচার্য পি সি রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, বিধান রায়, সৈয়দ বদরুদ্দোজা, বা এমন কাউরে?’
সভার ভিতর থেকে গলা ওঠে, ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি।’
যোগেন হ্যাঁ-না কিছু না বললেও তার সমস্ত শরীর সকলের সামনে পরিষ্কার করে দিল, সে এটা মানবে না।
সতীন সেন হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর গভীর স্বরে বলে উঠলেন, ‘মিস্টার চেয়ারম্যান, আই হ্যাভ টোল্ড ইউ দ্যাট আইড বি ওয়ার্কিং ইন দি কমিটি আন্ডার এনিবডি, অ্যাজ এ ভলান্টিয়ার। নাও, দেয়ার ইজ নো মোর নেসেসিটি ফর দি মিটিং টু কনটিনিউ। আই’ম লিভিং।’ সতীন সেন বেরিয়ে গেলেন, তাঁর সঙ্গে আরো কয়েকজন।
মিটিংও তারপরপরই শেষ হয়ে গেল। ডিস্টিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বললেন, ‘যেহেতু এটা একশ শতাংশ সরকারি কমিটি, সরকারের সঙ্গে কথা বলা দরকার। আমাকে একটু জেনে নিতে দিন, গবর্মেন্ট কী বা কাকে চান। সেটাই যে মানা হবে, এইটুকু আপনারা বলে যান
শাহেবরা ও প্রধান ব্যক্তিরা চলে গেলে, যারা উপস্থিত ছিল, তাদের মধ্যে এমন ঝগড়া বেধে গেল যেন হাতাহাতিও হতে পারে।
হিন্দুমহাসভার নতুন নেতা কালীশ বিশ্বাস এসে যোগেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল প্ৰায়, ‘আপনারা ভাবছেন আমরা কিছু বুঝি না? কোথথিক্যা এক মোল্লারে ধইর্যা আইন্যা তারে দিয়্যা সতীন সেনের বেইজ্জতি? আনেন-না, আপনার দুধু মিয়্যা নাকি চুদু মিয়্যাকে আর সতীন সেনরে এই রাস্তার মোরে খাড়াইতে। কয়ডা মানুষ সতীনদারে চেনে আর কয়টা আপনার খুদু মিয়াকে চেনে তা গুইন্যা দ্যাহেন। এই শিডিউল গুল্যাই মোছলাগুলার সঙ্গে মিল্যা মোছলাগ ত্যাজ বাড়াইয়্যা দিছে।’
কালীশ বিশ্বাসের কথাগুলি যে তাকেই বলা যোগেন বুঝতেই পারেনি। এত বড় দুর্যোগ যে এত তাড়াতাড়ি ত্রাণের এমন ব্যবস্থা করা গেল—তাতে যোগেন এতটাই বুঁদ ছিল, যে, সে দাঁড়িয়েছিল অভিনন্দিত হওয়ার জন্যই।
তাছাড়াও কালীশ বিশ্বাস তার কিছু চেনাও না যে তাকে কথা বলতে দেখে যোগেনের মনে হবে, তাকেই বলছে। ফলে লোকটির এমন আক্রমণের জবাবে যে পালটা আক্রমণ যোগেনের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল, সেটা ঘটল না আর যোগেন খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে বসল, ‘আপনে সতীনদারে কদিন চেনেন?
কালীশ তার মেজাজ একটুও না নামিয়ে বলে, ‘সেডার হিশাব কি আপনার কাছে দিব?’ যোগেনের গলা দিয়ে যে-নিম্নস্বরের প্রশ্নটা বেরিয়েছিল, সেটা তার নিজের কানে যুতসই ঠেকায়, সে ঐ স্বরেই কথা বলবে ঠিক করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েও ছিল। কালীশের পালটা প্রশ্নের আচমকা ধাক্কায় সেসব ঠিক-করা কথা ও ভঙ্গি, মুহূর্তে উড়ে গেল। ভোলার উপর-হাওয়ার দুর্বোধ্য তাণ্ডবে দুই রাত্রির আগের অন্ধকারে মৈস্তারকান্দির বাড়িঘরের চাল উড়ে যাওয়া ঠেকাতে বাড়ির অত মানুষ একফোঁটা আলো ছাড়া পালটা পাহাড় তুলে যেমন হাওয়া ঠেকিয়েছিল, বা ভাষানচরের রাত্রিতে লণ্ঠনের আলোয় মানুষজনের নামসাকিন লিখে লিখে এমন বেঠিক দুর্যোগকে যেমন একটা ঠিকানা দেয়ার চেষ্টা করছিল সে আর দুদু মিয়া আর, যে-ঘটনা এখনো পর্যন্ত তারা নিজেরাও একবারের জন্য বলাবলি করেনি, কাল সকালে বরিশাল-আসার সময় তুফানের দরিয়া পাড়ি দিতে একটা সুতোর মাপের বাঁকে তাদের বেঁচে যাওয়ার বিস্ময় যেন ফেটে পড়ল যোগেনের গলায়, ‘নিশ্চয়ই দিবেন। আমার কাছেই দিবেন। দিতে হইব। হিশাব না দিলে জিভ টাইন্যা বাইর কইর্যা হিশাব নিব।’
সেই যে সে টিনের ফুটো দিয়ে, কলকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনের সকালে, সুভাষ বোসকে কথার পাকে জড়িয়ে, পেঁচিয়ে, বেঁধে ভাগাড়ে ফেলে দেয়ার দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠে দম আটকে পালিয়ে এসেছিল শেয়ালদা হয়ে বরিশাল হয়ে খাগবাড়ি হয়ে মৈস্তারকান্দি হয়ে চরভাসান হয়ে বরিশাল—সেই ভয় ও ত্রাসের বিরুদ্ধে যোগেন তার শূদ্র-প্রতিক্রিয়ায় গর্জন করে উঠতে পারল, একই হিন্দু-রাজনীতির বিরুদ্ধে, ‘হিশাব না দিলে জিভ টাইন্যা বাইর কইর্যা হিশাব নিব।’ বারান্দায় যারা ছিল তারা সকলে থমকে গেল যোগেনের এই আক্রমণে।
ঐ কালীশ বলে লোকটিও।
সেই ফাঁকে সিরাজুল চৌধুরী দৌড়ে এসে যোগেনকে জড়িয়ে ধরে, ‘যোগেনদা, যোগেনদা, ঠান্ডা হোন, ঠান্ডা হোন’ বলে সিঁড়ির ওপর বসায়। পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসেন নলিনী বোস। তাঁর বাবা ছিলেন বি এম কলেজের অধ্যাপক, একনিষ্ঠ কংগ্রেসি। তিনি এসে যোগেনের পাশে বসেন।
একটু ঠান্ডা হয়ে সিরাজুল ও নলিনী বোস দু-জনকেই জিজ্ঞাসা করে, ‘এগো এতডা বাইড় বাইল কবে?’
‘তুমি যা মনে ভাবছ তা না। তোমারে পাইয়া, সতীনের ঘটনা লইয়্যা মিয়াভাইয়ের কথায় সুযোগ বুইঝ্যা এডডু খ্যামতা দেখাইল—’
‘এডা তো সাতপুরানা কথা। সতীনদারে তো বরিশালের মানুষ মাথায় রাখে। স্যা মানুষের মইধ্যে তো মুসলমান নাই। ক্যামনে থাকব। মুসলমান দাঙ্গাবাজদের ঠ্যাকাইতে গিয়্যা সতীনদাকে হওয়ার লাগল হিন্দু—অযোধ্যার প্রজারা য্যামন সীতারে কইল কুলটা। আর এই ছ্যামরারা ক্যামন পাটের পাইকারগ মত সতীনদা-শিডিউল-মুসলমান লইয়্যা ঘোট পাকাইল। নলিনী দা—এ রাজনীতি ঐ ছ্যামরার মাথা থিক্যা বাইরে হওয়া সম্ভব না। খবর নেন—আরো বড় মাথা কেডা। আমি আইজ কইলকাতা যাইয়্যা একডু কথা কইয়া দুই-চারিদিনের মইধ্যেই ফিরা আইস্যা দেখা করব।’
দুদু মিয়াকে যোগেন ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। তার জেদাজেদিতেই দুদু মিয়া নিজের নৌকোয় ভাসানচর রওনা দিলেন। সময়টা ভাল। জোয়ার সবে ঢুকছে। আসন্ন জোয়ারে উজান্ত যাত্ৰা শুভ।
ঘাট থেকে সরে যাওয়া নৌকোর দিকে হাত তুলে যোগেন চেঁচায়, ‘এইবার বাড়ির লোকজনের খবর করেন।
ছোটমাঝি আর তার সঙ্গীকে নিয়ে যোগেন প্রহ্লাদের বাড়ির দিকে চলে। পকেট তো ঢুঢু। এদের টাকা দিতে হবে। শ্বশুরমশায়ের ধারের টাকাও এদের হাত দিয়ে পাঠাবে। সে-ও আজই চায় কলকাতা রওনা হতে। প্রহ্লাদ দাদা ছাড়া যোগেন্দ্রের এত দায় মিটাইব কেডা?
কলকাতা ফেরার পর যোগেন জানল সেদিন তারিখ ৬ মে, ১৯৩৯। সে আগে আইনসভায় যাবে, সেখানে একটা মুলতুবি তোলার চেষ্টা করবে ভোলার সাইক্লোন নিয়ে। বোধহয়, সাজ তোলা যাবে না। বরং আজ শরৎবোসের ঘরে বসে এম এল এদের জানানো যায়। না, শুধু বিরোধী পক্ষের এম এল এদের জানালে কী করে চলবে? তার তখন যোগেনের মনে হয়—মুলতুবি প্রস্তাবটা সর্বসম্মত হতে পারে।
আইনসভায় যোগেন একটু আগে-আগে যায়। এই কদিনের খবরা তো সে কিছু জানে না। অন্তত বড় খবরগুলি তো জেনে নেয়া দরকার। সে শুরু করে আজকের কাগজ দিয়ে।
নো বরিশাল সাইক্লোন—
আরে, সাইক্লোন না থামলে খবর আসবে কী করে?
সুভাষবাবু ৩ মে তারিখেই কংগ্রেসের ভিতরে একটা রাজনৈতিক গ্রুপ হিশেবে, দেশবন্ধু-মতিলালের স্বরাজ্য দলের মত, ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করে ফেলেছেন। এটা কি আগেই ঠিক করা ছিল? যোগেন জানে না। তাহলে ওঁরা কি ভেবেছিলেন যে সুভাষবাবুকে না তাড়িয়ে ওরা ছাড়বে না?
যোগেন পালটা যুক্তি পায়—তা কেন হবে। এটাই তে স্বাভাবিক। ভোটে জেতা রাষ্ট্রপতিকে তাড়ালে সুভাষবাবুর তো উচিত—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জয়টাকে ধরে রাখা। তাতেই যোগেন জানল, সামনের বছর ১৯ মার্চ রামগড়ে কংগ্রেস অধিবেশনের সময়ই সুভাষবাবু একটা পালটা সন্মিলন ডেকেছেন—’আপোশবিরোধী সম্মিলন’।
আরো একটা খবরে যোগেনের চোখ গেল। সামনের বছরের মার্চে কর্পোরেশন নির্বাচন, তার আগেই কর্পোরেশন আইন (সংশোধন) পাশ করা হবে—মুসলমানদের ও তপশিলদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে। নতুন ভোট নতুন আইনে হবে।
সুভাষবাবু একটা বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন—বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি তিনিই আছেন ও থাকবেন। কোনোভাবেই তিনি বাংলার স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কংগ্রেসের ভিন্নতর কোনো নেতৃত্বকে কোনো সুযোগ দেবেন না।
