১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১১১. ‘সব কিছুর পরও সুভাষবাবু তো আর দেশের শত্রু নন’

১১১. ‘সব কিছুর পরও সুভাষবাবু তো আর দেশের শত্রু নন’ 

৩১ জানুয়ারিও যোগেন উডবার্ন বা এলগিন মুখো হয়নি। ১ ফেব্রুয়ারি বেশ রয়েসয়ে এলগিনে গিয়ে কাউকে কোনো তাগাদা না দিয়ে ও সুভাষের সঙ্গে দেখা না করে টানা বারান্দার রেলিঙে লাগানো কাঠের চেয়ারটায় গা এলিয়ে পাশের গোল শ্বেত পাথরের টেবিল থেকে সেদিনের ‘ফরোয়ার্ড’ কাগজটা তুলে ভাঁজ খোলে। দেখে, নীচে, ‘বঙ্গবাসী’ও আছে। যোগেনের দু-হাতে ‘ফরোয়ার্ড’ মেলা, অথচ তার ঘাড় ডানদিকে ঘোরানো, ‘বঙ্গবাসী’র পৃষ্ঠায়। সেখানে তার চোখ আটকে থাকে—‘ঘুঁটে পোড়ে, গোবর হাসে’, এইরকম একটা এক-কলমি টানা লেখায়। যোগেন টেরও পায় না, কখন সে ‘বঙ্গবাসী’র লেখাটাই পড়তে শুরু করেছে। নিখিল ভারত কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সুভাষ বোসের সঙ্গে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বিবাদে বাংলার মুসলিম লিগের হর্ষের কারণ কী—তা নিয়ে লেখকের দুশ্চিন্তা। যার যে-বিষয়ে ইচ্ছা, সে, সেই বিষয়ে কি দুশ্চিন্তা করতে পারে? কংগ্রেসকে সারা ভারতের কথা ভাবতে হয় আর লিগ বা পাঞ্জাব পার্টি বা সিন্ধু পার্টিকে কেবল নিজ-নিজ প্রদেশের ভাবনা ভাবলেই মুসলমানদের চলে ও গান্ধী-সুভাষ বিবাদ হলে মুসলমানরা উলুখাগড়ার মতো মারা পড়ার ভয় পায় না বরং তাহারা ঘোলা জলে মৎস্যশিকারের সম্ভাবনায় ঘুমের ঘোরে খোয়াব দেখিতে চায়। 

যোগেন ‘ফরোয়ার্ড’-এ ফিরে আসে। বাংলা কাগজে প্রতিদিন অন্তত চার-পাঁচটি মারামারি, কাটাকুটি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, আগুন লাগানো ও পাশবিক অত্যাচারের খবর ছাপা হয়। বাংলা কাগজের কোনো নিরপেক্ষতার দেখনদারি নেই। তারা অবশ্যই এক পক্ষের সমর্থক। ফলে, কেন মারামারি, কী মারামারি, হারজিৎ কী, সরকারের ভূমিকা এ-সব নিয়ে কোনো খবরই থাকে না। তারপর ‘জনৈক আলি নামধেয় মুসলমান’, বা ‘বাংলা অক্ষরজ্ঞানহীন মাদ্রাসার মৌলবি’—এই সব বর্ণনায় অস্পষ্টতা আরো বাড়ে ও সেটাই অবশেষে নানা গুজবের কারণ হয়ে ওঠে। 

যোগেন ‘ফরোয়ার্ড’কে কাগজের মতো ভাঁজ করে চোখের ওপর মেলেই চমকে সোজা হয়ে বসে। ‘মহাত্মা আডমিটস ডিফিট ফ্রম সুভাষ।’ এক পাতার খবর চার পাতায় গেছে। 

রাষ্ট্রপতি-নির্বাচন নিয়ে গান্ধীজির একটি বিবৃতিও ছাপা হয়েছে। কাগজ পড়ার একটা গতি আছে। সেই গতিতে অভ্যাসমত পড়তে গিয়ে যোগেন হোঁচট খায়, কাগজের লেখায় এমন শ্বাসরোধী হিংসা ও চিন্তাশীল খুব বেশি দেখা যায় না। যারা হিন্দুদের বা মুসলমানদের খেপাতে চায়, তারা কোনো সূক্ষ্মতার ধার ধারে না। সব একেবারে, ‘গর্জিলা মোহনলাল, নিকটে শমন।’ এটা গান্ধীজির লেখা? 

‘শ্রীসুভাষ বোস হ্যাজ অ্যাচিভড্ এ ডিসাইসিভ ভিক্টরি। আমাকে স্বীকার করতেই হবে, শুরু থেকেই আমি তাঁর পুনর্নির্বাচনের দ্বিধাহীন বিরোধী।…তিনি যে-সমস্ত তথ্য ও যুক্তি তাঁর প্রচারের জন্য ব্যবহার করেছেন, তার কোনোটার সঙ্গেই আমি একমত নই। আমি মনে করি তাঁর সহকর্মীদের সম্পর্কে তিনি যে-সব কথা বলেছেন, সে-সব অপ্রমাণিত ও বিশ্বাস-অযোগ্য। তবু আমি তাঁর জয়ে খুশি। যেহেতু আমি শ্রীযুক্ত পট্টভিকে নির্বাচন থেকে সরে আসতে নিষেধ করি, তাই, এ-পরাজয় যতটা তাঁর তার চাইতে বেশি আমার। …এটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে, যে-সব নীতি ও মতের পক্ষে আমি দাঁড়াই, তার কোনোটাই কংগ্রেস-প্রতিনিধিরা স্বীকার করেননি। 

‘এই পরাজয়ে আমি খুব খুশি। যাঁদের তিনি দক্ষিণপন্থী বলেন, তাঁদের কষ্টকর সমর্থন নিয়ে সুভাষবাবুকে রাষ্ট্রপতি হতে হয়নি, তিনি একটি প্রত্যক্ষ নির্বাচনী দ্বন্দ্বে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর ফলে, কোনো দেরি না করে একটি সমস্বত্ব ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করে তিনি তাঁর কর্মসূচি পালন করতে পারবেন। …সর্বোপরি, সুভাষবাবু তো দেশের শত্রু নন। তিনি দেশের জন্য কষ্ট ভোগ করেছেন। তাঁর মতে, তাঁর কর্মসূচি ও পরিকল্পনাই সবচেয়ে সাহসী ও অগ্রসর কর্মসূচি। যাঁরা সংখ্যালঘু হয়েছেন তাঁরা [সুভাষবাবুর ] সুভাষবাবুর কোনো কাজে নিশ্চয়ই বাধা দেবেন না। সাহায্য যদি নাই করতে পারেন, তাঁরা অন্তত গরহাজির থাকতে পারেন। 

‘কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্টদের মধ্যে একটা দিকে মিল আছে। কংগ্রেস সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধতা। ‘হরিজন’-এ আমার লেখাগুলিতে দেখানো হয়েছে কংগ্রেস যেভাবে তাদের সদস্য তালিকা তৈরি করছে, পাতা ভর্তি করছে বোগাস সব সভ্যদের নাম লিখে। কয়েকমাস ধরেই আমি এই সদস্যতালিকা ঠিক করার কথা বলে আসছি। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে স্কুটিনি করলে যারা বোগাস সভ্যদের ভোটে জিতেছেন, তারা তাঁদের পদ হারাবেন। অতটা আমি এখনই করতে বলছি না। খাতা থেকে বোগাস সভ্যদের নাম বাদ দিতে পারলেই যথেষ্ট, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটতে না পারে। 

যাঁরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন, তাঁদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কংগ্রেসের বর্তমান কর্মসূচিতে যাঁদের আস্থা আছে, তাঁরা সংখ্যাগুরুই হন আর সংখ্যালঘুই হন, এমন কী, তাঁরা কংগ্রেসের ভিতরে থাকুন আর বাইরেই থাকুন—তাতে কংগ্রেসের কর্মসূচি অনুযায়ী কাজ করতে কোনো বাধা ঘটবে না। 

‘একমাত্র পার্লিয়ামেন্টারি কর্মসূচি সংগঠনের এই বদলা-বদলির কারণে ব্যাহত হতে পারে। এই সাংগঠনিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণিত হওয়ার আগেই কারা মন্ত্রী হবেন ও তাঁদের প্রধান কর্মসূচি কী হবে, তা পূর্ববর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠরা স্থির করে দিয়েছেন। কিন্তু পার্লিয়ামেন্টারি কর্মসূচি আর কংগ্রেসের সামগ্রিক কর্মসূচির কতটুকু? কংগ্রেস-মন্ত্রীদেরও তো একদিনের পর আর-একদিন কাটাতে হবে। কংগ্রেসের নীতির সঙ্গে মতৈক্য সত্ত্বেও তাদের মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হল বা কংগ্রেসের নীতির সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে তাঁরাই পদত্যাগ করলেন—এতে খুব একটা কিছু আসে যায় না। 

‘সব কিছুর পরও, সুভাষবাবু তো আর দেশের শত্রু নন। তিনি দেশের জন্য কষ্ট করেছেন। তিনি মনে করেন, তাঁর নীতি ও কর্মসূচিই সবচেয়ে অগ্রণী ও সাহসী। সংখ্যালঘুরা তাঁর সাফল্য কামনা করতেই শুধু পারে। তারা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে একই বেগে চলতে না পারে, তাদের তাহলে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যদি তাদের পক্ষে সম্ভব হয়, তা হলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি বাড়াতে পারে। 

‘কিন্তু সংখ্যালঘুরা কোনো অবস্থাতেই যেন বাধা না দেয়। তারা সাহায্য করতে না-পারলে, সরে থাকবে। সমস্ত কংগ্রেসিকে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি তারা যারা স্বেচ্ছায় কংগ্রেসের বাইরে থাকে। সুতরাং কংগ্রেসের ভিতরে যারা এখন থাকতে অস্বস্তিবোধ করবে, তারা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, কোনো অসদিচ্ছায় নয়, কংগ্রেসকে আরো ফলপ্রসূ ও সদিচ্ছুক সেবা করতে।’ 

পড়তে-পড়তে যোগেন ক্রমেই এতই অবিশ্বাস করছিল যে খবরটা শেষ করার পর তার মনে হল সে বোধহয় ঠি ঠাক পড়েনি। তার কেমন অবিশ্বাস্য লাগছিল। মহাত্মা গান্ধী—যাঁর নামে মুমূর্ষু বেঁচে ওঠে, স্পর্শে নিরাময় ঘটে, যিনি ভারতের প্রতীক, তিনি সুভাষকে বলছেন—মিথ্যাবাদী, বলছেন—তার নির্বাচন হাস্যকর, অমানুষিক শ্লেষে সুভাষের ব্যাজস্তুতি করেছেন, সুভাষের চাইতে নিকৃষ্ট সভাপতি হতে পারত এক দেশের কোনো শত্রু, সুভাষের জেলখাটাকে পর্যন্ত উপহাস করেছেন। যেন সুভাষ সকলেরই বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছেন— এমনভাবে তিনি প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাগুলিকে ভয় দেখালেন। আর, নিজের ঘোঁটকে বুদ্ধি বাতলালেন, কী করতে হবে। সে আবার মাথা থেকে পড়তে শুরু করল, ‘মহাত্মাস স্টেটমেন্ট অন বোসেজ ভিক্টরি।’ তারপর প্রত্যেকটা বাক্য আলাদা-আলাদা, যেমন সূক্ষ্মতায় একটা জটিল সম্পত্তি মামলায় দুর্বল পক্ষের উকিল হয়ে সে কোনো পুরনো নথি পড়ে। 

যতই এগচ্ছিল, ততই যে সে তার প্রথম পাঠের কোনো ভুল ধরতে পারছিল না, তাতেই তার মনখারাপ হয়ে যাচ্ছিল। সারা দেশের মানুষ যাঁকে অবতার মনে করে, যাঁর প্রত্যেকটি কথা দেশের কোটি-কোটি মানুষের কাছে ভগবানের নির্দেশ, যাঁকে নিয়ে সকলেই ভাবে ব্রিটিশরাজের পর গান্ধীরাজ, যিনি বারবার দেশের কোটি-কোটি মানুষকে শিখিয়েছেন—অহিংসা মানে শুদ্ধতম মনের পরম সাহস, তিনি এই বিবৃতি দিয়েছেন তাঁর পুত্রসমান এক কংগ্রেস-নেতা সভাপতির পদে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জিতেছেন বলে? সাংসারিক জীবনেও তো এ-ব্যবহার চলে না। 

কিন্তু এই ব্যবহারের একটা সমতুল্যতা যোগেনের মাথায়, মনে, স্মৃতিতে, শ্রুতিতে কোথাও যেন আছে, কোথাও যেন আছে তার সেই জীবনে, যাকে অস্তিত্ব বলা যায়। নিজের অধিকার-অন্ধ কোনো দুই-হাত, দুই-পা, একটা মাথাওয়ালা কোনো মানুষ, যে তার নিজের মাথাটা দেখতে পায় না, তেমন দেখা শারীরিক সম্ভবের বাইরে বলে, কিন্তু তার নিজের কাছেই অদৃশ্য তার মাথা-ঘেরা একটা জ্যোতির্বলয়ের তাপ সে পেয়ে যায়, তেমন পাওয়া সামাজিক সম্ভবের বাইরে নয় বলে, আর সে নিজেকে বিশ্বাস করে ফেলে যে সে শুধুই শাস্ত্রের বিধান প্রয়োগ করছে, সে নিজেকে এতটাই বিশ্বাস করে ফেলে যে তার নিজের বাইরে কোথাও নৈতিকতা নেই, সে যে সেটা চায় তা নয়, কিন্তু ঈশ্বর তাকেই বেছেছেন। যোগেন টের পায় সমতুল্য যে-দৃষ্টান্তটা বিদ্যুতের মতো ঝলসে ওঠেনি, সেটাই অব্যর্থ ধীর সম্মুখগতিতে একটা আকার নিচ্ছে। নিচ্ছেই। নিচ্ছেই। যোগেন তার রক্তের পুরুষানুক্রমিক রাসায়নিক কণাগুলি বহন করে এনেছে লঙ্ঘনের দণ্ড, পাপের প্রায়শ্চিত্ত, নির্বাসন-আদেশ, অস্পৃশ্যতার বিধান। গান্ধীজি সুভাষকে শূদ্রের জীবনে নিক্ষেপ করলেন। যোগেন সুভাষের জন্য মর্মান্তিক এক বেদনার উত্থান টের পায় নিজের মধ্যে। 

যোগেন আত্মস্থ হওয়ার দরকার বোধ করে। 

এ-বাড়িতে এই সদর বারান্দায় এতক্ষণ সে বসে আছে অথচ একজনও কেউ এল না, এটা তো অস্বাভাবিক। কতক্ষণ এসেছে যোগেন। চেয়ারের দুই হাতল ধরে সোজা হতেই যোগেনের ডানদিকের প্যাসেজ দিয়ে সুভাষ এসে দাঁড়ালেন, স্মিত হাসিতে। 

‘কী এমন পড়ছিলেন, যেন অর্জুনের লক্ষবেধ। দু-বার এলাম, ফিরে গেলাম। খবর দিলাম—কেউ যেন এদিকে না আসে -’

যোগেন উঠে দাঁড়িয়েছিল, একটু হাসির চেষ্টা করে বলল, ‘তাই বলেন, আর আমি তো ঝিমাচ্ছিলাম, বারবার চায়ের কাপের দিকে আঙুল বাড়াইছিলাম’। যোগেনের নিজের স্বর তার নিজেরই কাছে এত মিথ্যা শোনায়। কিন্তু সুভাষ সে-মিথ্যা শুনলেন না। জিগগেস করেন, ‘এখানে বসতে ভালো লাগছে না কী ঐ ঘরের যাবেন?’ 

‘ও-ঘরে কী আছে?’ 

‘আপনার জন্য ফাইল বানিয়ে রেখেছি। নানা জায়গা থেকে নানা রকম চিঠিপত্র আসছে, লোকজনের, নানা স্থানীয় সংগঠনের, এক-এক জায়গার এক-এক পেশার? দেখুন, যোগেনবাবু, এই চেতনাটা কিন্তু চর্চা ছাড়া আসে না। বিবেকানন্দ যেমন সারা দেশ পরিব্রাজক হয়ে ঘুরে বেরিয়েছিলেন, আমার খুব ইচ্ছে ছিল…’ 

‘কেন? আপনার ঘোরাঘুরি কি একটু কম হচ্ছে?’ 

‘এটা আবার ঘোরাঘুরি নাকী? এ তো ভ্রমণ, টুর—’ 

‘আর মিটিংগুলার হিশাব নাই, আপনার মিটিঙে তো ভিড় হয় খুব।’ 

‘তা হয়। বাংলার লোকজনের তো মিটিং শোনার অভ্যাস বহু পুরনো। বক্তৃতা করতে শেখাটা বোধহয় শাহেব হওয়ার পার্ট ছিল। তা ছাড়া বাঙালিরাই তো প্রথম উকিল হল, না?’ 

‘এখন তো বাংলা-বাংলা করলে হবে না। এখন তো ভারত-ভারত করতে হবে।’

‘সে কী? আমার আর কী বদলাল? পেনশন নেই নি, এই তো? যা বলছিলাম, পরিব্রাজক হওয়ার সাধ মেটালাম আমার আত্মজীবনীর নাম ‘ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম’ দিয়ে।’ 

‘তাতেই তো আপনার নেতারা এত রাইগ্যা গিছেন। আমরা সব বুড়া, খোঁড়া, অকম্মা, দক্ষিণপন্থী আর উনি আসছেন কল্কি অবতার।’ 

‘আমার ও আমার সঙ্গে যাঁরা একমত তাঁদের, উদ্দেশ্য ছিল, একটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সংবিধানে যদি নির্বাচনের কথা থাকে, সেটাকে সর্বসম্মতি মনে করা হবে কেন? একটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল তার কর্মসূচি ও আন্দোলনের জন্য কেন একজন মাত্র নেতার ওপর নির্ভর করবে? বিকল্প প্রস্তাবকে সমমর্যাদা দেয়া হবে না কেন? কেনই-বা একজন নেতার ব্যক্তিগত নীতিবোধ—অহিংসা, চরকাকাটা, খদ্দর পরা—একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের শর্ত হবে? ভোটের সুযোগে এই কথাগুলো তো ওঠানো গেল। কংগ্রেসে অবিশ্যি বরাবরই এমন তর্কাতর্কি দিয়েই মীমাংসা হয়ে থাকে। এবারও হবে।’ 

‘এ নিয়্যা আমার তো কোনো মত দেয়া চলে না। এ-বিষয়ে আমার কোনো পড়াশুনাও তো নাই।’ 

‘এ তো সকলের জানাই। ১৯০৫-এ স্বদেশী নিয়ে তর্ক। বিপ্লব নিয়ে তর্ক। সুরেন ব্যানার্জি। অরবিন্দ। তারপর, নরমপন্থী-চরমপন্থী। তারপর, কাউন্সিলের ভিতর-বাহির, তারপর গান্ধী-দেশবন্ধু-স্বরাজ্য পার্টি, তারপর বিপ্লবী হিংসা ও অবিপ্লবী অহিংসা, এখন এই ভোট নিয়ে 

‘এটাকে কী বলা যাবে—গান্ধীবাদ বনাম সুভাষবাদ?’ 

‘এটা কী রকম মুশকিল, বলুন। ভোটের কথা তো কংগ্রেসের সংবিধানে আছে। কেউ যদি দাঁড়ায়, তখন তাকে বলতে হবে গান্ধীবিরোধী। গান্ধীবিরোধী মানে কংগ্রেস বিরোধী? দেশের সামনে কর্তগুলো সমস্যায় কোনো নেতৃত্ব নেই? হিন্দু-মুসলমান। হিন্দু-তপশিলি—গান্ধীজি বললেন মন্দিরে ঢোকার অধিকার পেলেই শূদ্র আর শূদ্র থাকবে না। জমিদার-কৃষক—গান্ধীজি বললেন জমিদার কৃষকের ট্রাস্টি হিশেবে কাজ করবে। এগুলো নিয়ে সারা দেশে ঝড় তুলতে হবে, ঝড়। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটিটা তৈরি হয়ে গেলেই প্রোগ্রামগুলো ভাবতে হবে। 

‘ওয়ার্কিং কমিটি নিয়ে কোনো গোলমাল হবে না তো?’ 

‘কংগ্রেসের সংবিধান এ-সব নিয়ে পরিষ্কার! গান্ধীজি দ্বিমত না হলেই হয়।’

‘ভোটের সঙ্গেই তো তাঁর দ্বিমত!’ 

‘চিঠি লিখি। তারপর যাব।’ 

সুভাষ বা যোগেন কেউ গান্ধীজির বিবৃতির কথা তুললেনই না। 

সুভাষ গান্ধীর কাছে ও গান্ধীবাদীদের কাছে বিনীত চিঠিপত্র লিখতে লাগলেন—যাতে ভুল বোঝাবুঝি কেটে যায়। 

কাটল না। 

১৫ ফেব্রুয়ারি সুভাষ গেলেন গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করতে। ঘণ্টা তিন তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন। কিছুই মিটল না। এমন কী, তাঁর জয়ের পর গান্ধীজির বিবৃতি নিয়েও কোনো কথা হল না। 

কলকাতায় ফিরতে-ফিরতেই সুভাষ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ২২ ফেব্রুয়ারি (৩৯) ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং ডাকা ছিল, ওয়ার্ধায়। সুভাষ বল্লভভাই প্যাটেলকে তাঁর অসুস্থতার কথা বলে জানালেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে যেন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া না হয়। সুভাষ ভয় পেলেন, তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে ওয়ার্কিং কমিটি আবার কিছু গোলমাল না পাকায় 

অপমান বোধ করলেন ওয়ার্কিং কমিটি। নেহরু ও শরৎ বোস ব্যতীত বাকি সকলে পদত্যাগ করলেন। নেহরুও করলেন, পরে, একটা আলাদা চিঠিতে। 

ত্রিপুরীতে কংগ্রেস অধিবেশন হওয়া ঠিক ছিল ১০ মার্চ। সুভাষ তখন সবচেয়ে অসুস্থ। তাঁর অসুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ করে কংগ্রেস-নেতাদের নানা মন্তব্য ও তাঁদের অনুগামীদের বানানো সব গুজব। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও সুভাষ ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে রওনা হলেন। দাদা শরৎ বোস ও ডাক্তার-দাদা সুনীল বোস ও তাঁর স্ত্রী তাঁর সঙ্গে গেলেন। 

ত্রিপুরীতে গোবিন্দবল্লভ পন্থ একটা প্রস্তাবে বললেন, গান্ধীজি কংগ্রেসের নেতা ও তিনি আমাদের পরিচালনা করেছেন। তাঁর নেতৃত্ব ছাড়া কংগ্রেস কোনো পথ পাবে না। কংগ্রেস রাষ্ট্রপতিকে গান্ধীজির ইচ্ছা ও উপদেশ অনুযায়ী নতুন ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করতে হবে। বামপন্থীদের যে-ঐক্যের ফলে সুভাষ রাষ্ট্রপতি পদে জিতেছিলেন, মাত্র ৪১ দিনে সে-ঐক্য খানখান হয়ে গেল। কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে কংগ্রেসের আপোশ হয়ে গেল। পন্থ-প্রস্তাবে কংগ্রেস সোস্যালিস্টরা নিরপেক্ষ থাকলেন। পন্থপ্রস্তাব পাশ হয়ে গেল। 

ত্রিপুরী অধিবেশনের পর থেকে অসুস্থ শরীরেও সুভাষ গান্ধীজি ও নেহরুর সঙ্গে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস চিঠিপত্র লেনদেন করতে লাগলেন। শরৎ বোসও গান্ধী ও নেহরুকে আলাদা চিঠি দিলেন। এই সব চিঠিই ছিল গান্ধীজির আনুগত্য স্বীকার করে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা আর সুভাষের পাশে পুরোপুরি না-দাঁড়ানোর অপরাধে নেহরুকে অভিযোগ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *