১৩২. ইস্তাহারে যোগেনপক্ষ
দু-দিনের মধ্যে উত্তর কলিকাতা জিলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি সুরেশ মজুমদার ও সম্পাদক হেমন্ত বসুর নামে একটা লিফলেট বেরল। যোগেনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিন্দুসভার রাধানাথ দাসের বিরুদ্ধে আক্রমণ। প্রসঙ্গ সেই পুরনো ইস্তাহার-ডায়মন্ড প্রিন্টিং হাউস ও ত্রিগুণা গুপ্ত। যোগেনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের যে-ইস্তাহারটিকে আগে মূল্য দেয়া হয়নি। তাতে রাধানাথবাবুর কথাটাই প্রধান হয়ে উঠল। ‘নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যখন রাধানাথবাবু বুঝিতে পারিলেন যে তাহার জয়লাভের বিন্দুমাত্র আশাও নাই, তখনই তিনি যোগেন্দ্রবাবুর বিরুদ্ধে হীন ও কাপুরুষোচিত মিথ্যা প্রচার কার্য আরম্ভ করিলেন।’ আরো লেখা হল, ‘রাধানাথবাবু ত্রিপুরী কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচনে দেশগৌরব বাংলার প্রাণ শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দর বসু মহাশয়কে ভোটপ্রদান না করিয়া তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী সুদূর মাদ্রাজ প্রদেশের অধিবাসী – ড. পট্টভি সীতারামাইয়াকে ভোট দিয়াছিলেন।’
এর পরদিনই ছাড়া হল সুভাষের ছবি সহ তাঁর আবেদন।
আগামী মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে
৩ নং ওয়ার্ডের করদাতাগণের নিকট
দেশগৌরব সুভাষচন্দ্রের আবেদন—
আগামী কর্পোরেশন কাউন্সিলার নির্বাচনে ৩ নং ওয়ার্ড হইতে শ্রীসুধীরচন্দ্র রায়চৌধুরী (বর্ণহিন্দু) ও শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল (তপশিলভুক্ত সম্প্রদায়) কংগ্রেসের পক্ষ হইতে প্রার্থী-মনোনীত হইয়াছেন। এ বৎসর ৩ নং ওয়ার্ড হইতে একজন বর্ণহিন্দু ও একজন তপশিলভুক্ত নির্বাচিত হইবেন। শ্রীসুধীরচন্দ্র রায়চৌধুরী ৩ নং ওয়ার্ডে সুপরিচিত। তিনি বর্তমানে কর্পোরেশন কংগ্রেস দলের একজন বিশিষ্ট সভ্য। শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ওয়ার্ডের করদাতাগণের নিকট প্রত্যক্ষভাবে সুধীরবাবুর ন্যায় পরিচিত না হইলেও ইঁহার নাম করদাতা গণের নিকট অপরিচিত নয়। বর্তমান বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদে তিনি প্রথম হইতেই সংশ্লিষ্ট আছেন এবং তাঁহার কার্যদ্বারা পরিষদে কংগ্রেসের মর্যাদা বৃদ্ধি করিয়াছেন। গত বৎসর বহু প্রলোভন সত্ত্বেও তিনি বর্তমান মন্ত্রিমণ্ডলীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনয়ন করিয়া বিশেষ নির্ভীকতার পরিচয় দিয়াছেন। বর্তমানে বাংলার প্রতিক্রিয়াশীল মন্ত্রিমণ্ডলী ও ইংরেজ ব্যবসায়িগণ কলিকাতা কর্পোরেশনে কংগ্রেসের ও জাতীয়তার প্রভাব নষ্ট করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইয়াছেন। গত বৎসর ব্যবস্থা পরিষদে যখন কলিকাতা মিউনিসিপ্যাল সংশোধিত আইন পাশ হয় তখন তাঁহাদের এই মনোভাব সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল। আমি আশা ও প্রার্থনা করি ৩ নং ওয়ার্ডের করদাতাগণ ও যুবকসম্প্রদায়— যাঁহারা এ যাবৎকাল কংগ্রেসের শক্তি বৃদ্ধি করিয়াছেন—তাঁহারা আজ কংগ্রেসের পতাকাতলে সমবেত হইয়া কংগ্রেস প্রার্থীদের জয়যুক্ত করিয়া জাতীয় আদর্শের সম্মানরক্ষা করিবেন।
বন্দেমাতরম
৩৮/২ এলগিন রোড
কলিকাতা
(স্বা:) শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু
যোগেন এই ইস্তাহারটি পড়ে খুশি হল ও মনে-মনে হাসল। সুভাষবাবুর স্বাক্ষরিত ইস্তাহার অথচ কোথাও তিনি ‘তপশিলি সংরক্ষিত’ বা ‘তপশিলি হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। বরং একটু ভুলভাবেই ‘বর্ণহিন্দু’ কথাটি সুধীরচন্দ্র রায়চৌধুরী-র আসনজ্ঞাপক শব্দ হিশেবে ব্যবহার করেছেন ও যোগেনকে বলেছেন ‘(তপশিলভুক্ত সম্প্রদায়)’, যেন শব্দটি যোগেনের পরিচয়জ্ঞাপক।
পরেরদিনই ৩ নং ওয়ার্ডে মিছিল বেরবার কথা। বঙ্কিমবাবু, নীহারেন্দুবাবু, আবদুল হালিম তাঁদের মিছিল নিয়ে এসে হেদোতে দাঁড়াবেন আর ওয়ার্ডের মিছিলগুলি এসে তাদের নিয়ে ওয়ার্ড ঘুরবে।
যোগেনের কিছুই করার ছিল না। সে তো আর কোথাও থেকে মিছিল আনতে পারবে না—মিছিলের শেষে হয়ত কেউ ডেকে কিছু বলতে বলবে। মিছিলটিছিল যারা সাজাচ্ছে, তাদের চলাফেরা দৌড়ঝাঁপ দেখেই বোঝা যায় তাদের দক্ষতাও আছে, অভিজ্ঞতাও আছে। তার পার্কের মালিকে বুঝিয়েসুঝিয়ে মেইন গেটটা খুলিয়ে সেখানে একজন স্বেচ্ছাসেবক দাঁড় করাল যাতে গেট ফাঁকা পেয়ে গরুছাগল ঢুকে না পড়ে। বাইরে থেকে যে-মিছিলগুলি আসবে সেগুলি ঠেলাগেট ঠেলে ঢুকতে গেলে মিছিল ভেঙে যাবে। বা, তাদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে পার্কের ভিতরের মিছিল বাইরে এনে মেশাতে গেলেও ঠেলাগেটে ঠেকে ভেঙে যাবে। যোগেন তো কখনো মিছিল সাজায়নি—সে এই তৎপর কল্পনাশক্তি দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল।
শাদা কাপড়ের ওপর বড় করে লেখা সুধীরবাবুর নাম, যোগেনের নাম, কংগ্রেসের নাম, বাঁদিকে সুভাষের একটা ছবি আঁকা, নীচে বড়-বড় করে ‘ভোট দিন।’
এক ভদ্রলোক এসে যোগেনের হাতে বেশ বড় একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে, ‘মিছিলে যাবে, বলে চলে গেল—মুখচেনা যোগেনের। যোগেন দেখে সেটা একটা নতুন ইস্তাহার, (স্বা) সুভাষচন্দ্ৰ বসু।
দেশগৌরব সুভাষচন্দ্রের বিবৃতি
কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী
৩ নং ওয়ার্ডের হিন্দুসভার সম্পাদকমহাশয়ের ইস্তাহারে একথা লিখিত হইয়াছে যে, ‘কংগ্রেস এবার কর্পোরেশন নির্বাচনে বিরত হইয়াছে।’ এ কথায় আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইয়াছি। জানি না সম্পাদকমহাশয় শ্রীযুক্ত বন্ধুবিহারী ঘোষ এমএ (ক্যানট্যাব) কোথা হইতে এ সংবাদ পাইলেন। হিন্দুসভার মনোনীত পদপ্রার্থীরা (অর্থাৎ ডা. গিরীশচন্দ্র ঘোষ এবং শ্রীযুক্ত রাধানাথ দাস) বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির নিকট মনোনয়নের জন্য দরখাস্ত করিয়াছিলেন। কংগ্রেস কর্তৃক মনোনীত না হওয়াতে তাঁহারা হিন্দুসভার মনোনয়ন প্রার্থী হন এবং এখন হিন্দু মহাসভা কর্তৃক মনোনীত হইয়াছেন। তাঁহাদের দিক দিয়া এইরূপ ইস্তাহার কেন জারি হইয়াছে যে, ‘কংগ্রেস এবার কর্পোরেশন নির্বাচনে বিরত’ হইয়াছে তাহা আমাদের ধারণার অতীত। যাহা হউক, সমগ্র কলিকাতাবাসী এ কথা জানেন যে, বাঙ্গলার কংগ্রেস এই নির্বাচনের ভার গ্রহণ করিয়াছেন এবং তার জন্য সমস্ত আয়োজন চলিতেছে। কলিকাতাবাসী এ কথাও জানেন যে ‘ওয়ার্কিং কমিটি’ কর্তৃক নিযুক্ত ‘এড হক কমিটি’ বাঙ্গালীর এবং বাঙ্গলার অনুমোদিত কংগ্রেস নয়। সুতরাং ‘এক হক কমিটি’ বা ‘এড হক কমিটি’র সমর্থকদের কোনো ইস্তাহার কংগ্রেসের ইস্তাহার নয়। ইহা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে ‘এড হক কমিটি’র সমর্থকেরা এখন হিন্দু মহাসভায় আশ্রয় পাইয়াছেন। আমি আশা করি, ৩ নং ওয়ার্ডের ভোটারগণ কংগ্রেস মনোনীত পদপ্রার্থীদিগকে ভোট দিয়া জয়যুক্ত করিবেন। কংগ্রেসের জয় মানে জনসাধারণেরই জয়।
(স্বা:) শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু
১২/৩/৪০
তারিখ দেখে, যোগেন ভাবে, এটা কি আগেই বেরিয়েছে? সে তো পায়নি। কে জানে? এটাও হয়ত ভায়া বাগেরহাট এসেছে! তবে, সুভাষবাবু হয়ত সই করার তারিখ দিয়েছেন, প্রেস আর বদলায়নি।
