১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১১৫. যোগেনের বডিসার্চ

১১৫. যোগেনের বডিসার্চ 

খাগবাড়ির শ্বশুরবাড়িতে যোগেনের যেন এমন করেই দিনকাটানোর কথা। কে কাকে কী কথা দিল সেটা কারো জানা নেই। এখানে যেদিন পৌঁছুল যোগেন সেই শেষরাত থেকে পরের দিন সাতসকাল পর্যন্ত যোগেন যেন তার সারা জীবনের অনিদ্রা ঘোচাতে ঘুমিয়েই যায়। কমলা দু-বার তার মায়ের কাছে এসে বলে, ‘মা, তুমি দেইখ্যা য্যাও। এ কেমন মরণঘুম!’ কমলা তো স্বামী-স্ত্রীর সেই জীবনে কোনোদিন ঢোকেই নাই যেখানে এইসব ঘুম-জাগরণের কারণ বোঝা যায়, অন্তত অনুমান করা যায়। কমলার মার দৃষ্টি একটু তির্যক কোণে থেমে যায়! সে কিছু আন্দাজ করতে পারছে। শাড়ির আঁচলটা দিয়ে ঠোঁট মুছতে গিয়ে আঁচলটা আর নামায় না। আঁচলের আড়াল থেকে ফ্যাসফেঁসে পলায় জিজ্ঞাসা করে, ‘জামাই কাল তরে কিছু রাইখব্যার দিছে?’ 

‘স্যায় শ্বশুরের ব্যাটা আইল-না তোমার দুয়ারে। তুমি-না আইনল্যা তারে। আর কিছু দিব্যার লাইগ্যা চাইব আমার হাত? কস কী মা? আমারে কি চিন্যাশুন্যা তাকাইছে একবারও? আর, তুমি কত্ত থুব্যার দিছে কিছু?’ 

‘তোরে যা জিগ্যাই তার জবাব দে। অত কথা কস ক্যা? মোট তো একডা ছাওয়াল বিয়াইছিস, তাতেই দেহি মুখ দিয়্যা মা-বারুণীর স্রোত। যা জিগ্যাই তার জব দে। দিয়্যা এইহানে শুইয়া-বইস্যা থাক। যতক্ষণ না ফিরি।’ 

‘যতক্ষণ না ফিরি? তুমি যাও কই মা?’ 

‘যাই তোর সতাল (মামা) শাশুড়ির বাড়ি নায়র খাইতে। ক। কিছু রাইখব্যার দিছে, জামাই, তক, আইস্যা। লুকাইস না রে কলা। লুকাইলে তরতো স্বামীজ্যান্তে বিধবা। আর, আমার আর তোর বাপেরে তো ঘানি টানাইব।’ 

‘ঘানি? কিয়ের লাইগ্যা?’ 

‘যে-জামাইর্যা ঐ সময়ে আইস্যা পরিবারের নাম ধইরা ডাকে, তারপর দেড়রাত ধইরা ঘুমায় তার শাশুড়ি তার শ্বশুররে ঘানি ঘুরাইব্যার লাগে। শাহেবগ আইনে। আমিই যদি কিছু না জানি, তর বাপেরে কইব কী। জামাই তরে কিছু থুব্যার দিছে, গামছায় কি ত্যান্যায় পুটলি কইর‍্যা?’ 

‘তোমরা ক্যা ঘানি ঘুরাইবা মা? বলদে ঘুরায় না?’ 

‘তোমার মতো মাইয়্যার মাও হইলে মানুষগও ঘুরান লাগে কত? 

‘আমারে গাইল পাড় ক্যা চুল ঝাইর্যা? এতখান বয়সে আমার একডামাত্তর ছাওয়াল! তগ দয়ামায়া নাই রে মা!’ 

‘প্যাট বানাইছস একফসলি আর আবাদ তুইলব্যার চ্যাও গোবর্ধন গিরি? এই তো পাইছস এইবার, ধুইয়্যা মুইছ্যা বিছন নে কমলা। তাইলে তো কোলে পো কাঁখে পো হইব। কলি ন্যা, জামাই কি তর হাতে কিছু পোঁটলা বাইন্ধ্যা রাইখতে দিচ্ছিল?’ 

‘কী রম মা-বাবা তোমরা? কুন বিয়াতী মাইয্যারে জিগান যায়, জামাই তরে কী দিছে, পোটলা বাইন্ধ্যা, প্রথম সাক্ষাতে? নিজের মাইয়্যার লজ্জা বুঝ না? না-দিলে কি কওয়া যায়, দেয় নাই। আমি কি নটী নি? দিলেও কি কওয়া যায়, দিছে। আমি কি নটী নি? পুরুষের উশুল দ্যাখাইব।’ 

‘তাইলে আর আইস্যা কাইন্দ্যা পউড়ো না, মা, জামাই এত ঘুমায় ক্যা!’ 

কমলা একটু দাঁড়িয়ে থেকে বলে, ‘খাড়ো মা, একবার খুঁইজ্যা দেইখ্যা আসি। তারপরে কই।’

‘খুঁজবিনি কই? দিলে তো তোরেই দিছে। দিলে তো তর মনই থাকব। খুঁজবি কোথায়?’

‘না রে মা। তোর জামাই খুখিতে রাইখছে না কী কাছায় বাইন্ধ্যা থুইছে না কী, সে তো দেহা হয় নাই। দেইখ্যা আসি। খাড়া’। 

কমলার মা তার পেছন থেকে ছড়া কাটে, ‘এই না কান্দলি, বয়স হইল এত আর ছাওয়াল হইল একডা মোটে? তর ছাওয়াল রি হাঁইট্যা হাঁইট্যা বাড়াইব তোর প্যাট থিক্যা? দুই রজনী ঘুমায় জামাই। খুঁখি-কাছা খোলা হয় নাই। 

কমলা দুয়োরটা দৌড়েই পার হয়। তার ঘরের ঝাঁপ তো সরানো হয় না—জামাইয়ের চোখে রোদ লাগবে। কমলা তার মায়ের ঘরের আধা-আলো থেকে তার নিজের ঘরের জলের মতো আঁধারে ডুব দেয়—মাঝখানে এই রোদের খরতা পেরিয়ে। 

যোগেনের কোমর আর কাছাতে হাত দেয়ার আগে প্রথমত যোগেনকে ভালো করে দেখে নিতে হয় কমলাকে। দেখা হলে, সে শুধু আঙুল বুলিয়ে আন্দাজ পেয়ে যায়—খুঁখিতে কিছু আছে কীনা। যোগেন শুয়েছিল বাঁ কাতে, তাই ডান কোমরটা একবার হাত বুলিয়েই দেখে নেয়া যায়, এমন কী একটু ঝুঁকে বাঁ-কোমরেরও খানিকটা। না। কোথাও কোনো উঁচু-নিচু নেই। কাছা দেখতে যে কোনো বাধা ঘটতে পারে, কমলা এটা ভাবেইনি। ঐ দিকে পাশ ফিরে আছে। কমলার হাতের নাগালে কাছা। টান দিলেই খুলে যাবে। ফের গুঁজে দিতে অসুবিধে হলে, না-গুঁজেই বেরিয়ে যাবে। কিন্তু যোগেনের কাছ ধরে টানতেই কাছাটা খুলে এল, কমলার দেখাও হল কিছু আছে কী নেই, নেই, তারপর যে-ই আবার গুঁজে দিতে গেছে, যোগেন তার হাত ধরে ফেলে এক হেঁচকা টানে কমলাকে নিজের পাশে টেনে নেয়। 

‘তোমারে কাছাচুরি শেখ্যালো কেডা?’ 

কমলা অপ্রস্তুত হয়েছে এতটাই যে যোগেনের কথাটুকু ধরে সে পরিত্রাণ পেতে চায়।

‘কত্ত! এমন পাকা আঙুলের চুরি শিখাইল কেডা?’ 

কমলা খুঁজছিল এমন কোনো কথা যা তাকে চুরির দায়মুক্ত করবে। কিন্তু অপ্রস্তুত যে এতটাই হয়েছিল যে কোনো কথাও খুঁজে পায় না। 

যোগেন কমলাকে আরো টাইট করে ধরে রেখে বলে, ‘তুমি নিশ্চয় বিদ্যাসুন্দর পড়ছ। না-হলে চুরির এত ভালো আঙুল পাইতা না।’ এতক্ষণে কমলা বলতে পারে, ‘আমি পড়তে শিখি নাই : কেউ আমারে শিখায় নাই।’ 

‘তালি শুনছ গান কুনোদিন—

‘না। শুনি নাই। আমি চুরি করি নাই।’ 

‘৩য়? কোমরের কষি আর কাছা দেখো ক্যান?’ 

‘মারে জিগাইল্যাম, এত ঘুমায় ক্যান, য্যান অজ্ঞান। 

য্যান কত রাইত ঘুমায় না। মা কইল, সে যে আইল তর হাতে পোঁটলা বাইন্ধ্যা কিছু দিচ্ছিল। আমি কই, না তো। আমি কই, খাড়াও, দেইখ্যা আসি একবার, কিছু আনছে কিন্তু ভুল্য গিছে নি—’  

যোগেনের হাত শিথিল হয়ে আসে। সে যেন একটা ফুটোতে তার একটা চোখ রেখে দেখতে পায়—সুভাষবাবুকে ঘিরে ফেলেছে তাঁর প্রতিপক্ষ, তাদের প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র, সেগুলোর যে-কোনোটির একটি মাত্র আঘাতে সুভাষের মরণ। মরণ দেখলে তো বাঁচার জন্য পালাবেই যোগেন। যোগেনের হাত একেবারে আলগা হয়ে গেলে, কমলাকে তার মায়ের কাছে যেতে উঠতেই হয়। তার প্রস্থানে ঘরের আবছায়া একটু দোলে, যেন জল। সেই দোলনটা জুড়ে যোগেন বুঝে নেয়—কমলার মা ভাইবছে তার জামাই কোনো ডাকাতি সাইরা আইসছে, মেয়েরে তাই ডাকাতির পোঁটলা খুঁইজব্যার পাঠায়। বরিশালের মাইয়া তো। কত বামুন-কায়েতরে ডাকাইত দেখছে। সে তো যোগেন মাত্র। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *