১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১১৪. শিবের নন্দীর মত

১১৪. শিবের নন্দীর মত 

যোগেন যখন খাগবাড়ির ঘাট থেকে উঠে এসে ভিতর-দুয়ারের ফাঁকাটায় দাঁড়ায়—একবেড়া শেষ আর দু-হাত ভিতরে আর-এক বেড়া শুরু ফাঁক, তখন পুব-দক্ষিণের আকাশ থেকে সব তারা অস্ত গেছে আর সেই তারাগুলোর দীপ্তিমণ্ডিত জায়গাটুকু যেন লেপে রাখা হয়েছে। যোগেনের এই আগমন পরে কমলার মায়ের মুখে-মুখে খালে-খালে হাটে-হাটে দশদিকে এতদিন ধরে এতই ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখান থেকে আবার দিকে দিকে এত দিন ধরে এতই ছড়িয়ে পড়েছিল যে তা থেকে সব মানুষগুলো খসে গিয়েছিল,–যোগেন, যোগেনের বৌ, যোগেনের ছেলে, যোগেনের শ্বশুর-শাশুড়ি—সব এক পর্ণমোচী বৃক্ষের পত্রপল্লবরাজির মতো নিঃসাড়ে সম্পূর্ণ খসে গিয়েছিল, যেন এটা একটা ভবিতব্য পুরাণ, যে-কারো জীবনেই ঘটতে পারে, যেন এটা একটা সামাজিক বিধি—সন্ধেবেলা চুল এলো না রাখা, শোয়ার আগে হাত দিয়ে শোয়ার জায়গা—সে মাটিই হোক আর শতরঞ্জি ই হোক বা কাঠই হোক—মুছে নেয়া সূর্য অস্তে গেলে কারো কথা আর মনে আনতে নেই, সে মৃতই হোক বা জীবিতই হোক, যেন বাড়ির আঙিনায় নেই তাকে মনে আনতে নেই, মনে এসে গেলেও কোনো দীর্ঘশ্বাসপতনের আগেই মন থেকে মুছে ফেলতে হয়। তুমি তো জানো না তোমার মনেপড়ার জোর। স্বর্গ-নরক বা জল-ডাঙা যেখানেই সে থাকুক, তোমার মনেপড়ার জোর টানে তাকে হয়ত কত উলটো জোয়ার ঠেকিয়ে, কোন্ সবে বালিপড়া চরের বালি খুঁড়ে, কোন্ রাত্রির ছায়ার ওপরের অবচ্ছায় আলো-ধোঁয়া পথ পেরিয়ে তোমার কাছে আসতে হল। অসময়ে মনে করতে নেই। নিজের বুকে নিজের থুতু তিনবার ছিটিয়ে মনেপড়াটা ঠেকিয়ে রাখতে হয়, দীর্ঘশ্বাসটা আটকে দিতে হয়। এমনিই তো নিষেধ আছে, ঘুমের মধ্যে তোমার নাম ধরে ডাক যদি-বা শোনো, পরপর তিনবার না শুনলে সাড়া দিয়ো না। তিনবার, পরপর তিনবার শোনার পর, তোমার নাম আর-একজনের মুখে তিনবার শোনার পর সাড়া দিয়ো, কিন্তু দুয়ার খুলো না। নিজের মনে হিশেব করো, আবার, সত্যি তো তিনশোনা হয়েছে ডাক? দুটো শোনার মাঝখানে কোনো ঝিমুনি এসে গোনাটা ভুলিয়ে দেয়নি তো? সন্দেহ থাকলে, দুয়ার না খুলেই একবার, দুবার, তিনবার একই কথা জিগগেস করো। 

যোগেন তেমন কোনো আশ্চর্যের আগে-আগে আসেনি, তেমন কোনো আশ্চর্য যোগেনের পেছন-পেছন আসেনি। সে যে খাগবাড়িতেই আসবে তাও ঠিক ছিল না। স্টিমার থেকে নামার সময়ই যোগেন দেখে, তার পকেটে পয়সাকড়ি যা আছে তাতে কোনো ভরসা হয় না। একবারের জন্যও যোগেনের মনে হয়নি, প্রহ্লাদের ওখানে যাওয়ার কথা। সে ঘাটপারে এসে যে-নৌকোয় কিছু লোক ছিল, সেই নৌকোতে গিয়ে বসে। দশজনের সঙ্গে ফেরির পয়সা হয়ে যাবে। খাল বেয়ে বেশ খানিকটা যাওয়ার পর কোনো-এক-ভাবে তার কানে এল, ভুলও এসে থাকতে পারে, নৌকো খাগবাড়ি হয়ে যাবে। বা খাগবাড়ি পর্যন্তই যাবে। এসব নৌকোর হয়ে-যাওয়াও নেই, পর্যন্তও নেই। কয়েকটা বড় হাট ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। হাটের লোকজন ঘাট এলে নেমে যায়। হাটছাড়া মানুষ তার ঘাট এলে নেমে যায়—বললেই মাঝি নৌকো ভিড়িয়ে দেয়। যোগেন জিগগেস করে না, খাগবাড়ি ছেড়ে নৌকা কি আগৈলঝরা যাবে, আগৈলঝরার পরে নৌকো কি মাহিলারা যাবে। এমন কোনো জায়গায় যে যোগেনকে যেতে হবে, তা তো না। সে আত্মরক্ষার জায়গার দিকে ছুটছিল। এখন যোগেন ভাবতে পারে—যখনই সে জল ও বায়ুর বিশ্বে ঢুকেছিল তখনই সে তার আত্মরক্ষার বলয়ে ঢুকে পড়েছিল। 

খাগবাড়িতে নৌকো লাগতেই দু-চারজন নেমে যায়, যোগেন দাঁড়ায় কিন্তু নামে না। যারা নেমে গেল তাদের পেছন-পেছন নামবে বলেই যোগেন দু-পা এগিয়ে চোখ বুলিয়েছে, ঘাটের ওপরের দিকে। মনে হল, অতটা অন্ধকারে চিনতে পারবে না। না-পারলে, না পারবে, তাতে তো নামার বাধা নেই। নেমেই যেত যোগেন, কিন্তু মাঝি নৌকো ঠেলে দিল, ভেবেছে, যোগেন হয়ত পরের ঘাটে নামবে। পরের ঘাট বলতে লগির ঠেলা তিনবার। নৌকো সেখানে ভিড়ল আর যোগেন দাঁড়িয়ে বলেই যোগেন নৌকো থেকে ঘটে নামে, পাড় বেয়ে পাড়ে ওঠে, পেছনে তাকিয়ে দেখে খালের জলে অন্ধকার এতই কঠিন যে নৌকোটাকে আর দেখা যায় না, ছপ ছপ শব্দ পাওয়া যায়, বৈঠার। যোগেন মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দু-পা এগিয়ে আবার থেমে যায় নৌকোটাতে কি বৈঠা ছিল? তার মনে পড়ে না। নৌকোয় এতটা সময় ভেসে আসতে যে-বৈঠার আওয়াজ সে পায়নি, এখন এখানে পাড়ে নেমে গিয়ে অদৃশ্য নৌকোটির অলৌকিক বৈঠার আওয়াজ সে শুনতে পায়। ঘাড় ফিরিয়ে আরো দু-পা হাঁটতেই যোগেন অন্ধকারের ঘনতাভেদে, তলভেদে, আর দক্ষিণাকাশে মাটি-লেপা দুয়ারের মতো নিবিড়তরতা দেখে চিনে ফেলে, অভ্রান্ত, কমলাদের বাড়ি। তার স্ত্রী-পুত্র সম্ভবত এখানেই থাকে। তার ছেলের নাম কী দেয়া হয়েছে? তাকে ডাকে কী ডাকে? যোগেন জানে না সে-নাম। ততক্ষণে অন্ধকার যোগেনকে ছেয়ে ফেলেছে। পরিত্রাণ চাওয়ার মতো স্বরে যোগেন ডেকে ওঠে, ‘কমলা, কমলা।’ 

‘বাড়ির মইধ্যে আমার ঘুমই তো আগে ছোটে। শীত-গ্রীষ্মে তফাত নাই। মেঘ-রৌদ্রে তফাত নাই। ঘড়ি নাই, কোনো মুরগিও ডাকে না। বারো মাস তিরিশ দিন ঠিক একৈ সময়ে শরীর থিক্যা ঘুম ঝইর্যা যায়। কিন্তু ঝরনেরও তো আগাগোড়া আছে। কালে একডা ডুব দিয়্যা উঠ্যা আইলেও মাথার জলই তো শরীর বাইয়্যা ঝরে আগে। আর, পায়ের জল তো ঘর পর্যন্ত গেলেও শুকায় না, ঘরের মাটিতে জল-পা আঁকে। স্যায়, মাঘ মাসের ত্রয়োদশী। দুই দিন পরে আমাবস্যা। পাথরের মতন আন্ধার। ঘুম য্যান আর শরীর থিক্যা ঝরে না। তার মইধ্যে শুনি, শিবের নান্দীর মত গলার স্বরে কে য্যান ডাইক্যা উঠে, ‘কমলা, কমলা’। 

‘বুকের ভিতর তো ঢেঁকির পাড়। গলার ভিতরডা য্যান বালির চড়া। জিভা শুকাইয়্যা কাঠ। যদি-বা খাড়া হইছি, খাড়া হইয়্যা তো থাকব্যার পারি না, কাঁইপ্যা পড়ি, ঝড়ের মুখে পাটখ্যাতের মত। একবার ভাবি—কমলার নাম ধইরা ডাকি। গলা দিয়া স্বর বারায় না। একবার ভাবি—আমাগ চাষের মানুষডারে ডাকি—ভাবাই সার, ডাকা হয় না। ন্যাক্কেরে শেষে ভাবি—কমলার বাপডারেই ডাকি। কুনোদিন তো এত আন্ধারে এত দূর থিক্যা ডাকি নাই। ডাক তো জানি না। শ্যাষে ভাবি—আমারই শোনার ভুল। তারপরই বুঝি, এ-শোনা ভুল হয় না। এ-শোনা ভুল হইব্যার পারে না। তারও পরে ভাবি, আমি শুইন্যা ফেলছি বইল্যা আমারেই উইঠতে হব ক্যা? আর-একবার তো ডাইকব? তাও তো ভাগে না। এ ভাগ তো দুইবার উঠে না। সেই কথা আছে না—দক্ষের কইন্যা সতীরে শিব কালো কইছিল বল্যা, সতী গিয়্যা হত্যা দিয়্যা কোন্ ঠাকুরের মন্দিরে কাইড়্যা আছে। শ্যাষে বৌ-ছাড়া মহাদেব নন্দীর পিঠে চইড়্যা আইস্যা হাজির সেই মন্দিরে। নন্দী ডাক দিয়্যা উঠে। য্যান, প্রলয় আমার আগের গর্জন, কমলা, কমলা।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *