১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১৪০. ধাঙড় স্ট্রাইকের সমর্থন-বিতর্ক

১৪০. ধাঙড় স্ট্রাইকের সমর্থন-বিতর্ক 

শাকিনা বলে ওঠে, ‘আপনার কাছে বসে অর্গানাইজেশন করা কাকে বলে শেখা যেত যদি!’

‘কী যে কন। আপনারে দেইখ্যা তো চমকাইয়্যা উঠি। তাও তো যাগ নিয়্যা আপনার কাম, তাগ সঙ্গে আপনার কথাবার্তা কাজকর্ম তো কিছু জানিই না। আমাগ এই কাজটারে সংগঠন কইবেন না। বড়-বড় মানুষের সঙ্গে তাগ দয়াতে চেনাজানা হইলে সেডারে রক্ষা করা আর বিপদে-আপদে একটু সাহায্য চাওয়া। তাও, যদি একডাও নিজের জইন্য না হয় তাইলে বড় মানুষরাও নির্ভয় থাকে—না, এ-লোকডার নিজের কুনো মতলব নাই। তখন এডডু-আধডু মানসম্মান দেয়। তাইলে আমি বারাই।’ 

যোগেন দাঁড়িয়ে উঠলে শাকিনা বলে, ‘আপনি কি কোথাও-কোথাও যাবেন? না কি প্ৰথমে ফোন করবেন?’ 

‘রুটটা ঠিক করি নাই। রাস্তায় না-বারালে আমার বুদ্ধি খোলে না। তবে ফোন তো কইরব্যার লাইগবই।’ 

‘ফোন কোথা থেকে করবেন?’ 

‘আরে, কলকাতা শহরে কি ফোনের অভাব? কী করব সেডা ঠিক কইরতে পাইরলে ফোন কি একডা জুটব না?’ 

‘আমি একটা অনুরোধ করব? আপনি এখান থেকে বেরিয়ে মৌলালির দিকে না ঘুরে, ডাইনে দুই নম্বর ব্রিজের দিকে ঘুরবেন। দুই নম্বর ব্রিজটাকে বাঁ-হাতে রেখে ডাইনে ঘুরবেন। ডানদিকের ফুট ধরে মৌলালির দিকে হাঁটবেন। কয়েক পা এগলেই ডানদিকে একটা রাস্তা পাবেন। সেই রাস্তা ধরে এগলেই একটা তেমাথা পাবেন। তেমাথায় দাঁড়িয়ে ডানদিকে তাকালেই এই বাড়ির গেটটা পাবেন। সেই গেটটা দিয়ে ঢুকলেই এই দরজাটা পাবেন। সেই দরজার ভেতরে ঢুকলেই এই ঘরটা পাবেন। এত লোকজন থাকবে না। আপনার হাঁটা হবে, মাথায় বুদ্ধি খুলবে। এখানে বসে বসে যতগুলো দরকার ফোন করবেন। আপনার কাজের সাহায্যের জন্য একটি মেয়ে থাকবে—বাচ্চা মেয়ে, পনের-ষোল বছর বয়স। এর মধ্যেই দুই ছেলেমেয়ের মা। বিয়ে দিয়েছিল যখন, ওর বয়স সাত-আট হবে। কিন্তু ওর শ্বশুরের কী জিদ চাপল—আমার বহু ইশকুলে পড়বে। কর্পোরেশনের স্কুলে ভর্তি হল, ক্লাশ টুতে স্কলারশিপ পেল। ওর শ্বশুর সেটা সেলিব্রেট করল, বারদুয়ারি থেকে দু-পাঁইট ফরেন দিয়ে। শ্বশুর দিনরাত পাহারা দিত যাতে তার ছেলের সঙ্গে না মেশে। ক্লাশ ফোরে পাশ করে আবার স্কলারশিপ। এখানকার স্কুল ঐ পর্যন্ত ছিল। ওর শ্বশুর সারাবস্তির সঙ্গে ঝগড়া করে আর্মেনিয়ান রোডের মিশনারি স্কুল ‘অনলি ফর দি গার্লস অব ডিসট্রেসড কাস্টস’ সেখানে ভর্তি করে দিল। যাওয়ার সময় একাই যেত, ফেরার সময় শ্বশুর গিয়ে নিয়ে আসত। সেখানে সিক্সে বৃত্তি পেল, ওর বয়সও তের হল, ওর বরের সঙ্গে ও লুকিয়ে দেখাশোনা করতে লাগল। তার যা ফল তাই হল, পেটে বাচ্চা এল। আর তো পড়ার কথাই ওঠে না। কিন্তু স্কুলের দিদিমণিরা ছাড়বেন না। বাচ্চা হয়েছে, ভাল হয়েছে, স্কুলে আনবে, স্কুলের দাইদিদির কাছে থাকবে। তুমি ক্লাশের ফাঁকে এসে দুধ দিয়ে যাবে। বৃত্তি-পাওয়া মেয়ে। স্কুলের খুব আশা ক্লাশ টেনের পরীক্ষায়, বোধহয় ক্যামব্রিজ, ও বৃত্তি পেয়ে স্কুলের নাম বাড়াবে। নাইন পাশ করে টেনেও উঠল। পড়ছিল। কিন্তু এর মধ্যে মেয়েটির পেটে আবার বাচ্চা এল। সেই খবর শুনে তার শ্বশুর স্ক্যাভেনজিং ব্রাশের লাঠি দিয়ে ছেলেকে এমন পেটাল যে তাকে হাসপাতালে দেয়া হল। হাসপাতাল থেকে ছেলে গেল পালিয়ে। তখন তো মেয়ের বয়স আঠার-উনিশ বড়জোর। তার তো স্বামীর জন্য মনখারাপ হবেই। পেটে বাচ্চা, স্বামী নিরুদ্দেশ—সে মেয়ে আর স্কুলে যায়। কিন্তু ও এই পপুলেশনের সবচেয়ে শিক্ষিত। ঐ স্কুলের অফিসে চাকরি দিয়েছে। খুব নির্ভুল ইংরেজি লেখে ও বলে। খুব ভাল টাইপ করে। কলকাতার সব জায়গা চেনে। ওকে যদি আপনি চিঠি দিয়ে কারো কাছে পাঠান আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। ওর নাম মতিয়া? 

‘আর, ওর স্বামী?’ 

‘কদিন পরেই ফিরে এসেছে। তারপর ওদের আর কোনো ছেলেপুলে হয়নি,’ শাকিনা আর যোগেন দুজনেই উঁচু গলায় হাসতে লাগল। 

‘ওর শ্বশুর?’ 

‘আছে। তার শেষ ইচ্ছে, সে মরার পরে মুখে আগুন ছুঁইয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার সময় তার ‘বহু’ যেন ইংরেজিতে কাঁদে।’ 

শাকিনা হঠাৎ করেই চেঁচিয়ে যা বলে, যোগেন বোঝে, মতিয়াকে কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে হাজির হতে বলছে। তারপর যোগেনকে ‘আপনি বেরন, মাথায় রোদ লাগিয়ে রাস্তায় হেঁটে আসুন,’ বলে সে নিজেই দরজার দিকে দু-পা এগিয়ে যায়। 

যোগেন সত্যি-সত্যি শাকিনার বলে দেয়া রুটেই হাঁটে, দুই নম্বর ব্রিজের নীচ দিয়ে যে পায়ে হাঁটা রাস্তা ট্যাংরার দিকে গিয়েছে, তার মাথায় একটা চটের ছাউনির তলার চায়ের দোকানে যোগেন বেঞ্চির ওপর বসে—বেঞ্চিটা তৈরি হয়েছে, দু-দিকে ইট দিয়ে সমান মাপের দুটো স্তূপের ওপর একটা পাটা ফেলে। চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে যোগেন মনে মনে হিশেব কষে বোঝে—এমন কিছু বেশি কাজ নয়, বিশেষ করে সাহায্য যখন পাওয়া যাবে। সে ঠিক করে ফেলল, শাকিনার ওখানে ফিরেই নীহারেন্দুবাবুকে একটা চিঠি পাঠাবে। ঠিক করার পর তার মনে হয়, নীহারেন্দুবাবুর সঙ্গে ফোনেই কথা বলতে হবে—সারওয়ারদি-ইস্পাহানি- কিরণশঙ্কর মুখে না বললে হয় না কী? ওঁর অন্য পরামর্শ ও থাকতে পরে। সামসুদ্দিনের কাছে যেতে হবে, ফোনে হবে না। তার আগে তার পার্টির একটা বর্ধিত জরুরি সভা ডাকা দরকার। সবাইকেই তো ফোনে পাওয়া যাবে। বাইরের কজনকে ডাকতে হবে, বিশেষ করে কমবয়েসিদের। যোগেন ঠিক করে ফেলে—নোটিশ লিখে ঐ মেয়েটিকে দিয়ে ১৫ নম্বরের নোটিশ বোর্ডে মেরে দিয়ে আসতে বলবে। এখান থেকে ১৫ নম্বরে গিয়ে ফিরে আসতে আর কতটুকু সময় লাগবে? উপেন বর্মণকে পাওয়া গেলে খুব ভাল হয়। যোগেনের মনে হল—আলোচ্য তো ধাঙড়দের ধর্মঘটকে সমর্থন জানানো ও তার অত্যন্ত দ্রুত নিষ্পত্তি দাবি, তাহলে, সত্যেন দাসকে ডাকা উচিত—শিক্ষিত লোক; শিডিউল্ড কাস্টস ওয়াকার্স ইউনিয়নে এখন যারা নেতা, তাদেরও ডাকবে। এটা যখন তৈরি হয়েছিল তখন যোগেনই ছিল সভাপতি। পরে, রসিক কাকাকেই এই দায়িত্বটা দেয়া হয়—সমস্তরকম তপশিলি সংগঠনের একটি একত্রিত মঞ্চ তৈরি করা। 

শাকিনার বাড়িতে ফিরে দেখে, কমবয়েসি একটি ঝকঝকে মেয়ে তাকে সাহায্য করতে দাঁড়িয়ে। বাড়িতে আর-কোনো আওয়াজ নেই। যোগেন হেসে জিজ্ঞাসা করে, ‘মতিয়া?’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *