১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১৪২. যোগেনের কানে ভারত আহ্বান

১৪২. যোগেনের কানে ভারত আহ্বান 

সিদ্দিকিশাহেব পরদিনই কর্পোরেশনে, জনসমাবেশে ধাঙড়-মেথর হরতালের দাবিপত্র অনুযায়ী ও দাবিপত্রের বাইরেও কিছু সুবিধে দেয়ার কথা জানালেন। তাঁর জন্য মঞ্চ বানানো হয়েছিল সেই বিখ্যাত করিডরের দক্ষিণ সীমায় যাতে তাঁকে ওদিককার রাস্তায় জমায়েতও দেখতে পায়। শাকিনা তারপরে জানাল যে কাল সকাল থেকে ওয়ার্কাররা কাজে ফিরবে—এটা নিশ্চিতই বলা যায়। কিন্তু এই জমায়েতের পর স্ট্রাইক কমিটি বসে এই সিদ্ধান্ত নেবে। আরো একটা কথা শাকিনা জানায়—ওয়ার্কারদের স্ট্রাইকের সময় যে-ময়লা শহরে জমা হয়ে আছে, সেইসব ময়লা ওয়ার্কাররাই সাফাই করে দেবে। তার জন্য কর্পোরেশনের কাছ থেকে কোনো ওয়ার্কার একটা লাল পয়সাও মজুরি নেবে না। 

মঞ্চটা ছোট কিন্তু উঁচু। একজন নেমে এলে আর-একজন উঠতে পারে। যোগেন আর-সব নেতাদের সঙ্গে সেই মঞ্চটাকে ঘিরে যে চৌকি পাতা ছিল তার উপর বসেছিল। সেই সমাবেশ দেখে যোগেন একেবারে অভিভূত হয়ে যাচ্ছিল যখনই তার মনে হচ্ছিল, এই সমাবেশের সে-ও একটা অংশ। সেই ঠান্ডা, স্তব্ধ, মানুষের ব্যগ্রতা দিয়ে ঘেরা নিরালায় যোগেনের একবারও মনে আসেনি—এই সমাবেশের নেতৃত্বেরও সে অংশ। জন্মের আগে থেকেই যোগেন তো এক ঘৃণিত সমাজের সন্তান। সে আলাদা কোনো মানুষ নয়। সে আরো একজন নমশুদ্র—এতদিন পর্যন্ত যোগেনের জীবনটা কেটেছে নিজের জন্য একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করার যুদ্ধে। অথচ কখনো তার ব্যক্তিত্ব তার জন্মের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো আত্মতায় সংলগ্ন হয়নি। কেন হয়নি, সেই উত্তর খোঁজার মধ্যেও একটা অস্বীকৃতি আছে, যেন যোগেন চাইতে পারত কিন্তু চায়নি। যোগেন তেমন কোনো চাওয়ার কোনো অঙ্কুরও দেখেনি নিজের মধ্যে। বরং তার আত্মতা গড়েই ওঠেনি বলে, যদি তার কোনো সামান্য কাজও সাফল্য স্বীকৃতি পায়, তাহলেও সে ভেবে ফেলে, ‘তাইলে শুদ্দুররাও পারে। চাঁড়ালরাও পারে।’ 

এতটা সংলগ্নতা, সমাজ বলে এক বিমূর্তনের এতটা সংলগ্নতা, হয়ত বাধা হয়ে দাঁড়ায় নেতা হিশেবে তার স্বতন্ত্র বিকাশে। দাঁড়িয়েছেও হয়ত। যোগেনের যে দাঁড়ায়নি, তার একটা আপাতকারণ বলে মনে হতে পারে, যোগেনের সমাজ তো বিমূর্তণ নয়। যোগেনের সমাজ তো জ্যান্ত। সে-সমাজের বুক ধুকপুক করে। সে-সমাজের শরীর থেকে সবসময়ই রক্ত ঝরে। ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণায় তার সমাজ নির্বাসিত হয়ে আছে সমুদ্রের মুখে মিষ্টি জলে ভেজা শেষ মাটিতে। বিলে হাওরে। জলের ভিতর থেকে ধান তুলে আনার ঐশ্বরিক কাজে। তেমন এক সমাজ থেকে যোগেন চাইলেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। পারবে না মানে, কোনো প্রতিশ্রুতির প্রতি আনুগত্যে নয়। পারবে না, শারীরিক কারণে। পারবে না, কারণ তার এখনো নাড়ি কাটা হয়নি। কারণ, সে এখনো শ্বাস টানছে তার মায়ের ফুসফুস দিয়ে। কারণ, মাতৃগর্ভ থেকে বেরনোর পর তার গায়ে পৃথিবীর রোদ-হাওয়া লাগছে কিন্তু সেই স্পর্শ সে নিজের শরীরে টেনে নিতে পারছে না। ওই বাতাস ও তাপ উচ্চবর্ণের আকাশ থেকে আসছে। সে, যোগেন, চাঁড়াল। সে জন্মেছে কিন্তু তার জন্মের প্রথম কান্না এখনো কেঁদে উঠতে পারেনি। কান্না তো মানুষের একার। 

শাকিনা তখন তার স্বরের উঁচু গ্রামে খুব ধীরে, প্রায় চিবিয়ে, বলছিল—’আমি আর-কিছু বলব না। লেকিন, একটা কথা আমাকে বলতেই হবে। কাকে বলছি না-জেনেই বলতে হবে। আমার মজদুর-সহকর্মীদের বলছি, হতে পারে। মজদুর কমরেডরা ছাড়াও যারা আছে, তাদের বলছি, তাও হতে পারে। যে মানুষরা এখানে হাজির নেই, তাদেরও বলতে পারি। আমার দুটো দেশ। ইরান আর বাংলা। আমার একটা দেশ দুই হাজার না তিন হাজার বছরের বাতিল, মুর্দা, পচা একটা শাহ্ বা সম্রাটের হাতে বন্দি। সেই দুনিয়ার প্রাচীনতম সাম্রাজ্য থেকে আমি এসেছি বাংলায়। সে-বাংলাও একটা বাতিল, মুর্দা, পচা একটা সাম্রাজ্যের বন্দি। এই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে নাকী সূর্যের কোনো অস্ত হয় না। দুনিয়ার সবসে বড়া, সবসে চওড়া সাম্রাজ্য। যেমন আমার দেশ ইরানের সাম্রাজ্য সবসে পুরানা। কিন্তু এইসব পুরানা আর চওড়া আর শক্ত সাম্রাজসে ভি ঔর পুরানা ঔর পুরানা ঔর শক্ত ঔর পাকা এক চিজ আছে। সেটা মানুষ। মজদুরির মানুষ। যে যত কঠিন কাজ করে সে তত বড় মানুষ। আমরা ধাঙড়-মেথররা সেই সবসে কঠিন কাজটা করি, যেটা ছাড়া দুনিয়ার সবসে পুরানা আর সবসে বড়া কোনো সাম্রাজ্য একদিনও পুরা বাঁচে না। আমরা তো ছ-দিনের হরতাল চালালাম। তাতেই তো লন্ডনকা যমজ বহিন কলকাতা নিজের শরীরের দুর্গন্ধে আর নিজের মুর্দা থেকে তৈরি অসুখ নিয়ে মরতে বসেছিল। কিন্তু এ-লড়াইটা তো আরো বহুত বড়া, বহুত কঠিন আজাদির লড়াইয়ের টুকরো। আমাদেরও তো একটা ভারত আছে—আমাদের মানে ছোটলোকদের, এই অচ্ছুৎদের, এই শুদ্দুরদের। আমরা সেই আমাদের আজাদি ভারতটা বানাব—আমরা, এই ধাঙড়-মেথর-শুদ্দুররা। কংগ্রেস আর মুসলিম লিগের নিজের নিজের ভারত আছে। ওদের পেছনে আমরা লাইন দিব না। আমাদের নিজের ভারত কায়েম করব। কোই ছোটাভি লড়াই ‘ওই আজাদির লড়াই থেকে আলাদা না—

যোগেন টের পায়, তার গলায় একটা দলা পাকিয়ে উঠছে। যেন ঢোক গিলতে পারছে না। হ্যাঁ, শাকিনার এই কথাগুলো থেকেই দলাটা পাকাচ্ছে। কাল পনের নম্বরের মিটিঙে মতিয়াকে নিয়ে শাকিনা ছিল। পুরো তর্কটা শুনেছে। সভা শেষে কাউকে না বলে বেরিয়ে গেছে। আজ কি তার জবাব দিল? সে জবাবই যোগেনের কর্মসূচি হয়ে তার দম আটকে দিচ্ছে? আজাদির লড়াই, শূদ্রের ভারত, সুভাষবাবু মেঘনার বুকের নিঃসীম জলের ওপর দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—না—কোনো কিছু স্থানীয় না, কোনো একটি ঘটনাও বিচ্ছিন্ন নয়। নীহারেন্দুবাবু, বঙ্কিমবাবুরা তো আরো এক পা এগিয়ে—কোনো ঘটনা এমন কি দেশীয়ও নয়। 

যোগেন নিজের ভিতরের বাসনা-ভাবনা নিয়ে ভাবতে পারে না। কোনো শূদ্রই পারে না। বর্ণহিন্দু তার স্বভাবনা নিষিদ্ধ করে রেখেছে। যোগেনের তো কেবল বাঁচা আর বেঁচে থাকা। ভেবে-ভেবে তো আর বাঁচা যায় না। যোগেন তারজন্য নির্দিষ্ট বাঁচা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *