১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১৪৬. আবার মন্ত্রিসভা, আবার হকশাহেব এবার প্রোগ্রেসিভ

১৪৬. আবার মন্ত্রিসভা, আবার হকশাহেব এবার প্রোগ্রেসিভ 

৫ ডিসেম্বর ১৯৪০ বাংলার ছোটলাট হার্বার্ট ভারতের ভাইসরয়কে তাড়াতাড়ি একটা চিঠি লিখে জানান কলকাতায় প্রদেশ সরকার নিয়ে কী কী গুজব রটেছে। 

নলিনী সরকার দিল্লি থেকে ফিরে এলে দেখা হয়েছিল এক মুসলিম নেতার সঙ্গে। সেই নেতাটি এসে খবরগুলো ছোটলাটকে জানিয়ে দিয়ে যান। সেই নলিনী নেতা সরকারকে বলেন, হক আর নামিমুদ্দিন দুজনেই এখন সুভাষ ভজনায় ব্যস্ত। সুভাষ যাকে সমর্থন করবে, সে-ই হবে বাংলার প্রধানমন্ত্রি, শুনে সরকার বলেন, সুভাষ দেবে নাজিমুদ্দিনকে সমর্থন? এই বুদ্ধি নিয়ে ওরা কি মূর্খের স্বর্গে বাস করছে? 

এ রকমই আর একজন জানালেন—হকশাহেব নাকি নতুন একটা পার্টি বাজারে ছেড়েছেন, প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি, ও সেই পার্টি আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে ও হক প্রধানমন্ত্ৰি থাকবেন। 

শুনে ছোটলাট সাত তাড়াতাড়ি হককে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলেন, ব্যাপারটা কী? হক মুখ মুছে বললেন, ‘একেবারে বাজে কথা। তবে প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি নামে একটা পার্টি তৈরি হয়েছে। তারা সারওয়ারদির বিরুদ্ধে আজই অনাস্থা প্রস্তাব তুলবে। ছোটলাট সেদিনই, ২৯ নভেম্বর ক্যাবিনেট ডাকেন। ক্যাবিনেটে হক বলেন যে সারওয়ারদির বিরুদ্ধে তাঁর কোনো নালিশ নেই। সেই ক্যাবিনেট মিটিং থেকেই হক এক বিবৃতি দিয়ে জানান—প্রধানমন্ত্ৰি হয়ে তিনি তাঁর এক সহমন্ত্রির বিরুদ্ধে অনাস্থা আনবেন কী করে? 

গুজব অনুযায়ী ৪০-এর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ অবস্থা—হক ও নাজিমুদ্দিন এই দুজনের মধ্যে যাকেই ছোটলাট ডাকবেন, সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে, কারণ মেম্বাররা নিজেদের বাজারের লাইনে দাঁড় করাবে। যে মন্ত্রি করবে, তাকে ভোট দেবে। 

সবচেয়ে নিশ্চিত উপায় এম এল এ দের সমর্থনপিছু টাকা দেয়া। আর এক কাণ্ড ঘটে বসে আছে। আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হবেন এ সব গণতন্ত্র ‘হোমে’ চলে কলোনিতে চলে না। এখানে যে নিজেকে প্রধানমন্ত্রি হিসাবে পাকা প্রার্থী প্রমাণ করতে পারবে সে-ই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে। পাকা প্রার্থীর প্রমাণ কী? সে অনেক রকম। লাট শাহেবের ডাক। গুজব রটিয়ে দেয়া যে কোনো বড় পার্টি ভেঙে গেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দু-একজন নেতাকে দিয়ে বিবৃতি দেয়ানো যে তাঁরা এঁকে সমর্থন করবেন। 

লিগ-হকশাহেব মন্ত্রিসভা ভাঙাভাঙির পর লিগ নাকি ঠিক করেছিল, তারা নতুন মন্ত্রিসভা তৈরির দাবি জানাবে ও নবাবশাহেব হবেন সেই নতুন মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রি। ফলে, আবার হবিবুল্লাহ উৎসাহের সঙ্গে এমএলএ জোগাড়ে নেমে পড়েন। এমএলএদের পারহেড দর কত যাচ্ছে—এই কথা ইসপাহানিকে জিজ্ঞাসার পর ভাবলেন–পারহেড হাজার টাকা কি এই হেডগুলার ওপর খরচা করা যায়? কেউ বলেন এক, কেউ বলেন দেড় গন্ডা এমএলএ-কে টাকা দেয়ার পর নবাবশাহেব জানতে পারেন লাটশাহেব নাকি নাজিমুদ্দিনকে মন্ত্রিসভা গড়তে ডাকবেন। হবিবুল্লাহ এত চটে যান যে তিনি লিগ থেকে পদত্যাগ করে হকশাহেবের নতুন পার্টি প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশনে যোগ দেন। নবাবশাহেবকে নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে লিগের মিটিঙে ব্যালটে লড়তে হয় ও হারতে হয়। নবাবশাহেবের পদত্যাগ লিগ কর্তৃপক্ষ মানেনি। তারা তাঁকে বরখাস্ত করেছে। সেই খবর পেয়েই নাকি লাটশাহেব জন হার্বার্ট নবাবশাহেবকে শপথ নিতে নিষেধ করেন। কারণ, স্পিকারের কাজ থেকে তাঁর ‘স্টেটাস রিপোর্ট’ আসেনি। 

হক লিগ মন্ত্রিসভা ভেঙে যায় ১ ডিসেম্বর। ৪ ডিসেম্বর হকশাত্বে প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টির নেতা হিশেবে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের দাবি জানান। তাঁর পক্ষে ছিলেন ওই দলের ৪২ জন, বোস-কংগ্রেসের ২৮ জন, কৃষক-প্রজার ১৯ জন, হিন্দু মহাসভার ১৫ জন, তপশিলি ইনডিপেনডেন্ট ১২ জন, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ২ জন, শ্রমিক প্রতিনিধি ১ জন। এ ছাড়াও সরকারি কংগ্রেস ও ন্যাশন্যালিস্ট পার্টির ২৭ জন হকশাহেবকে সমর্থন করবে। 

লিগ নিশ্চিত ছিল—লাটশাহেব নাজিমুদ্দিনকে ডাকবেনই। লাটশাহেব, সরকারি শাহেবরা আর ব্যবসায়ী শাহেবরা সকলেই নাজিমুদ্দিনকেই চান। অনেকদিন ধরেই চান। নাজিমুদ্দিন সেটা জানেন বলেই হাবেভাবে হকশাহেবকে ট্যাকে গুজে রাখেন। ঢাকার পুলিশ প্যাকা। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন তো নাজিমুদ্দিনকেই জোগাড় করতে হবে। তাকে সেই জোগাড়ের সময় দিতেই হকশাহেবের চিঠি পাওয়া সত্ত্বেও এখনো লাটশাহেব ডাকাডাকি শুরুই করেননি। নামিমুদ্দিনকে নিজের মেজরিটি তৈরি করলেই তো হবে না। লাটশাহেবকে সাংবিধানিক অ্যালিবাইও জোগাতে হবে। লাটশাহেব প্রকারান্তরেও কোনো পক্ষপাতিত্বের দায় নিতে পারবেন না, কারণ, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধনীতি, ভাইসরয়ের সঙ্গে কংগ্রেস-লিগ-লন্ডনের সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইনডিয়া—ওয়ার ক্যাবিনেট ও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। 

সারওয়ারদি-নাজিমুদ্দিনরা চারদিক দেখেই ছক সাজিয়েছিলেন। 

ছকটা সাজিয়েছিলেন বাংলার এই মুসলিম নেতারাই, কিন্তু ছকটা এঁকে দিয়েছিলেন, লিগের সর্ব ভারতীয় সভাপতি জিন্না। হকশাহেবের সঙ্গে জিন্নার রাজনৈতিক বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এতদূর পর্যন্ত সম্পূর্ণ যে সেই ক্ষতস্থান থেকে কোনো রক্তপাতও আর ঘটছিল না ১৯৪১-এর ২৯ নভেম্বর, লিগ-হক মন্ত্রিসভা যেদিন ভেঙে গেল। 

বাইরের ঘটনাগুলি থেকে জিন্না-হক বিচ্ছেদের অনেকগুলি স্থান-বিন্দু চিহ্নিত করা যায় করা যে যায় সেটা বুঝেসুঝেই জিন্না-হক পত্রবিনিময় জিন্নার পক্ষ থেকে একতরফা কাগজে বের করে দেয়া হয়। হক-লিগ ছাড়াছাড়ির কোনো জায়গায় কোনো নীতির বালাই ছিল না। বাংলার মুসলিম লিগ সম্পূর্ণতই ছিল অবাঙালি মুসলমানদের দখলে। তারা আজ হোক, কাল হোক হকশাহেবকে সরিয়ে দিতেন। ভাইসরয়ের তৈরি প্রতিরক্ষা পরিষদে জিন্নার অনুমতি ছাড়া সদস্য হতে রাজি হওয়ার সুবাদে ভারতের মুসলিম রাজনীতিতে যে ফাঁক তৈরি হল, সেই ফাঁকটাকেই মুসলিম লিগ ব্যবহার করল। হকশাহেব এটাও জানতেন, খুব ভালোভাবেই জানতেন, মুসলমান প্রধান চারটি প্রদেশ—বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত—বিশেষ করে প্রথম দুটিতে নিজের নেতৃত্ব ষোল আনা কায়েম করতে না পারলে মুসলমান সমাজের একমাত্র নেতা হিশেবে জিন্নার দাবি ও মুসলমানদের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিশেবে মুসলিম লিগের দাবির এক কড়া দামও নেই। সঙ্গে সঙ্গে জিন্না ও হকশাহেব জানতেন যে বাংলায় হকশাহেবকে বাদ দিয়ে কোনো মুসলিম আধিপত্যকে বিশ্বাস্য করে তোলা যাবে না। 

১৯৪০-এর ২৪ মার্চ লাহোরে হকশাহেবকে দিয়ে জিন্না পাকিস্তান-প্রস্তাব তোলালেন। এই প্রস্তাব যুক্ত প্রদেশের মুসলিম নেতা খালিকুজ্জমান প্রথম খাড়া করেন। সেই খাড়া অংশত সংশোধন ও সম্পাদনা করেন পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী সিকান্দার হায়াৎ খান। সেই খশড়া জিন্না কখন দেখেছেন ও কী সংশোধন করেছেন, সেটা বলা যায় না। সম্মিলনের সভাপতি হিশেবে জিন্নাই একমাত্র পারেন—কাকে দিয়ে প্রস্তাবটি তোলা হবে তা স্থির করতে। ও তিনি ফজলুল হককে এই দায়িত্ব দেন। হকশাহেব আবার সেই খশড়াতে কিছু কাটেন ও কিছু যোগ করেন ও তারপর হকশাহেব সেটা উত্থাপন করেন। 

পাকিস্তান প্রস্তাব নিয়ে প্রায় সত্তর বছর ধরে অনেক সুতো ছেঁড়া হয়েছে। পাকিস্তানের যখনই অন্য কোনো জাতীয়তাবাদ প্রধান হয়ে উঠেছে, তখনই লাহোরে প্রস্তাবের নতুন ব্যাখ্যা হয়েছে। পাকিস্তান বা মুসলিম লিগ আন্দোলনের একজন নেতাও স্বীকার করেননি যে তিনি কোনোভাবে এই প্রস্তাবটির সঙ্গে জড়িত। হকশাহেবকে এই প্রস্তাব থেকে মুক্ত করার চেষ্টা এখনো করা হয়। এই প্রস্তাব যদি প্রতিটি শব্দ ধরে আজও পড়া যায়, তাহলে যিনি রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ অথচ একটি রচনার অন্তর্বর্তী গভীর সংগঠন উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ পাঠক-তিনি প্রায় রেখা গণিতে ছকে দিতে পারেন যে একই সঙ্গে কতগুলি ধারণা ও অভিমতকে আঁটাবার জায়গা তৈরি করে দিতে এই প্রস্তাবে চেষ্টা করছে ও চেষ্টা করছে বেশ অনেক দিন ধরে। প্রস্তাবটির বাক্যবন্ধে প্রকাশভঙ্গিতে ও বিন্যাসে সেই অনেক রকম চিন্তার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। যেমন, অনেকটা সময় অতিবাহনের পলিচিহ্নও চোখে পড়ে, খোঁজাখুঁজি না করেও। এখন নতুন করে আবিষ্কৃত নথিপত্র ও দলিলপত্রের সাহায্যে একটা পরম্পরা তৈরি করা যায়—এই প্রস্তাবটিতে লিগ ও জিন্না কী করে পৌঁছুল। সেই পরম্পরা রচনা খুব দরকার—আমাদের ‘জাতীয় বা ‘দেশীয়’, বা ‘স্বদেশী’ চেতনার যথাযথ লক্ষণগুলি উদ্ধারের প্রয়োজনে। 

১৯৪০-এর ২৪ মার্চ লাহোরে মুসলিম লিগ সম্মিলনের মাস ছয় আগে, বড়লাট লিনলিথগো সেপ্টেম্বর ১৯৩৯, ব্রিটেন-জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে ও ভারত সেই যুদ্ধের অংশীদার, এই ঘোষণার পরের সকালে গান্ধীজি ও জিন্নাকে জানান—যুদ্ধ যতদিন চলবে ততদিন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নিয়ে কোনো আলাপ-আলোচনা হবে না। যুদ্ধ শুরু হওয়ারও ছ-মাস আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনে একটা নতুন ধারা যোগ করে ১৯৩৫-এর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনকে কার্যত বাতিল করে। যুদ্ধ বা যুদ্ধের আশঙ্কাতে ভারত সরকার প্রাদেশিক সরকারগুলিকে প্রশাসনিক নির্দেশ দিতে পারবে, প্রদেশগুলির জন্য কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ নতুন আইন তৈরি করতে পারবে ও কেন্দ্রীয় সরকার সম্পূর্ণ প্রশাসনিক অধিগ্রহণ করতে পারবে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইন কার্যত নাকচ হয়ে যায়। 

কংগ্রেস ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯, যুদ্ধের বিশেষ অবস্থায় ভাইসরয়কে জানায় পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ও তা সম্ভব করার জন্য অবিলম্বে সংবিধান রচনার পরিষদ তৈরি করার দাবি। 

চারদিন পর ১৮সেপ্টেম্বর লিগ জানায়—যুদ্ধ শেষ না-হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা স্থগিত থাক ও লিগের সম্মতি ব্যতীত কোনো শাসনতান্ত্রিক সংস্কার যেন করা না হয়। 

ঐ দিনই বড়লাট লিনলিথগো লিগকে জানান, ‘এটা তো ভাবাই যায় না যে যাঁরা এতদিন হিজ মেজেস্টিজ গভর্নমেন্ট ও পার্লামেন্টকে এই রকম সংস্কার পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করেছেন, তাঁদের সঙ্গে আবার পরামর্শ না করে আমরা নতুন কোনো পরিকল্পনা করব বা ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধানের কোনো ব্যবস্থা সংস্কার প্রস্তাব করব।’ 

এর মাত্র মাসখানেক পরে, ৪০ সালের ১৬ জানুয়ারি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, জিন্নার সঙ্গে আলাপের সময় তাঁকে সম্ভবপর কনস্ট্রাকটিভ কোনো কর্মসূচি গ্রহণ ও প্রচারের পক্ষে পরিচিত সব যুক্তিগুলো আবার বলি ও তিনি (জিন্না) তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি (জিন্না) ও তাঁর বন্ধুরাও মনে করেন ‘তেমন একটা কিছু যথাসময়ে প্রকাশ করা যাবে, অন্তত আভাস দেখা যাবে।’ সেই চিঠিতে লিনলিথগো আর একটি জরুরি খবর ভারত সচিবকে জানিয়ে রাখলেন। এমন খবর লিখিতভাবে এই প্রথম নথিভুক্ত হল। 

খবর দেয়ার ভঙ্গিতে বেশ সাদাসিধে ভাব আছে। 

ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা কী হবে, তা নিয়ে তো কথাবার্তা চলছে বছর বিশ। গোলটেবিল বৈঠকগুলোও হয়েছে, প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি ভাবার উদ্দেশ্যে। তাতে অন্তত এই ধারণাটা পরিষ্কার হয়েছে যে ভারতীয়দের মধ্যেই এ নিয়ে কোনো মতৈক্য নেই। এমন কী সবচেয়ে বড় দল কংগ্রেসও জানে না, স্বাধীনতা, স্বরাজ, সংবিধান বলতে তারা ঠিকঠাক কী বোঝাচ্ছে। ১৯৩০-এ কংগ্রেস প্রথম পূর্ণ স্বরাজের কথা বলে ও ১৯৩৮-এ সংবিধান ও উন্নয়ন-পরিকল্পনা নিয়ে দলিল তৈরি করেছে। 

আবার, এই একই সময়ে ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইন পাশ করে ও কার্যকর করে সম্রাটের সরকার ভারতে নির্বাচন, প্রতিনিধিত্বভিত্তিক সরকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, আইন তৈরির ক্ষমতা ও প্রাদেশিক মন্ত্রীসভা চালু করার ব্যাপারে আন্তরিকভাবে আগ্রহী ও সৎ। বিভিন্ন প্রদেশের বহুরকম স্বার্থের প্রতিনিধিরাও এ-বিষয়ে আশ্বস্ত হয়েছে যে ব্রিটিশ সরকার তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে। কংগ্রেসে ফেডারেশনের পক্ষে মত সংগঠিত হচ্ছিল। সেটা একটি পরিণতির দিকে যেত যদি সুভাষ বোস কংগ্রেসের ভিতরকার কমিউনিস্টদের ও টেররিস্টদের এক করে একটা বিদ্রোহ না ঘটাত। 

এর ভিতর যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। 

মুসলমান প্রধান প্রদেশগুলিতে মুসলিম লিগই একমাত্র দল নয়। জিন্নাও মুসলমানদের একমাত্র নেতা নয়। অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও সমাজনেতা, ফেডারেশন-কনফেডারেশনের ধারণার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিলেন। জাফরুল্লা খান বেশ একটি বিস্তৃত প্রস্তাব লিনলিথগোর অনুরোধেই তৈরি করে গোপনে দিয়ে গেছেন। 

লিনলিথগোর ব্যক্তিগত কাগজপত্র সবে মাত্র গবেষকদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। সেখানেই এ-চিঠিটি প্রথম পড়া গেল ও জানা গেল মুসলিম লিগের পাকিস্তান প্রস্তাবের পেছনে ব্রিটিশ-শাসকদের সরাসরি হাত কতটাই ছিল। 

এতটাই ছিল যে বাংলায় জিন্নার কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর, নাজিমুদ্দিন-সারওয়ারদি- ইস্পাহানি, ছোটলাট হার্বার্টকে বোঝাতে পেরেছিলেন যে লিগ মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়ার পর, প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স পাটির নেতা হিশেবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি সত্ত্বেও ফজলুল হককে সাততাড়াতাড়ি ডাকার দরকার নেই। কারণ, একটু সময় দিলে নাজিমুদ্দিনই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন। জিন্নার অনুমতি নিয়ে নাজিমুদ্দিন কংগ্রেস-নেতা কিরণশঙ্কর রায়ের সঙ্গে পর্যন্ত দেখা করেন। গভর্নরের, সরকারের, ইয়োরোপিয়ান গ্রুপের ও ইংরেজ হৌসগুলির পূর্ণ সমর্থন ছিল হকশাহেবের বিরুদ্ধে ও নাজিমুদ্দিনের পক্ষে। ফজল হককে সরিয়ে দিতে পারলে মুসলিম প্রধান একটি প্রদেশের জিন্নাবিরোধী নেতাকে সরিয়ে দেয়া হবে। গভর্নর হার্বার্ট তাই নাজিমুদ্দিনকে সময় দিচ্ছিলেন। জিন্নার জন্য রাজনৈতিক মঞ্চ বাংলায় তৈরি করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে তখন সবচেয়ে বেশি দরকার। লিগ মুসলমানদের একমাত্র সংগঠন ও জিন্না লিগের একমাত্র মুখপাত্র—এই রাজনীতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। 

জাপান আমেরিকার বন্দর ও সেনাবাস পার্ল হারবার আক্রমণ করে বসল ৭ ডিসেম্বর। ৮ ডিসেম্বর জাপান মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। ১০ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে কংগ্রেসের তিনরঙা পতাকা উড়ল। ১১ ডিসেম্বর যুদ্ধবন্দী মোহন সিং আরো সব সহবন্দীদের নিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী ইন্ডিয়ান ন্যাশন্যাল আর্মি তৈরি করে জাপানের সঙ্গে যোগ দিলেন। দিল্লি থেকে ভাইসরয়ের আদেশ এল সেই দিনই বাংলার গভর্নর হার্বার্টের কাছে—এই মুহূর্তে ফজলুল হককে ডেকে মন্ত্রিসভা তৈরি করো। ব্রহ্মদেশ ও সিঙ্গাপুর থেকে যুদ্ধ-উদ্বাস্তুদের দায়িত্ব ও পোড়ামাটি নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব মন্ত্রিসভার ওপর ছেড়ে দাও। 

হার্বার্ট হকশাহেবের কাছে গাড়ি পাঠালেন। 

হকশাহেব এলে বললেন, ‘মন্ত্রি কারা, ডাকুন, এখনই শপথ নিতে হবে।’ হকশাহেব শরৎ বোস ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নাম লিখে দিলেন। হার্বার্ট বলে উঠলেন, ‘শরৎ বোস জাপানের গুপ্তচর। তাকে অ্যারেস্ট করার জন্যই এত তাড়া। আপনি একাই শপথ নিয়ে শরৎ বোসকে অ্যারেস্ট করার অর্ডার দিন।’ 

হকশাহেব সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আপনে দিল্লি থিক্যা ওয়ারেন্ট আনাইয়া অ্যারেস্টের কামটুক্ সাইরা আমাকে খবর কইরবেন।’ 

হার্বার্ট চটে উঠে বলেন, ‘এটা আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। আপনি যুদ্ধের মধ্যে প্রধানমন্ত্রি হবেন অথচ যুদ্ধকালীন দায়িত্ব নেবেন না এটা তো হিজ মেজেস্টিজ গভর্নমেন্ট মেনে নিতে পারে না। 

হকশাহেব চেয়ারে আর ফিরে বসেননি, বলেন, ‘হিজ মেজেস্টিজ গভর্নমেন্ট কী পারে আর কী পারে না, বিশেষ করে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেটা তো আপনার সাংবিধানিক চালচলন থেকেই আমরা শিখতে পারছি। পূর্বতন মন্ত্রিসভার পদত্যাগপত্র ও নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবিপত্র একই দিনে আপনার কাছে পৌঁছেছে। আপনি দশ দিন ধরে প্রদেশে একটা অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করেছেন। আইনসভা খোলা, গভর্নর্স রুল হয়নি অথচ প্রদেশে কোনো সরকার নেই। আজ শরৎ বোসকে অ্যারেস্ট করার জন্য আপনার হঠাৎ মন্ত্রিসভার কথা মনে পড়ল। আমি আপনার অনুমতি নিয়েই এখন চলে যাচ্ছি। আপনি যখনই ডাকবেন, আমি তখনই আসব।’ 

হকশাহেব আর লাটশাহেব দু-জনই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। লাটশাহেবই নাকি প্ৰথম চোখ নামান, ‘ওয়েল’ বলে। হকশাহেব লাটশাহেবের দিকে পেছন ফিরে দরজার দিকে দু-পা এগতেই হার্বার্ট তাঁর পেছন থেকে হিসিয়ে ওঠেন, ‘আপনাকে কড়ায়গণ্ডায় এই অবাধ্যতার দাম দিতে হবে ও অচিরেই।’ 

হকশাহেব পেছন ফিরে তাকাননি। কথাগুলো তিনি শুনলেন কী না, বোঝা যায় না। হকশাহেব তাঁর নিউ পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে ফিরলেন। বাইরে লোকজন কিছু দাঁড়িয়ে—সবাই হয়তো মন্ত্রি-সংবর্ধনার জন্য তৈরি ছিল। ফুলও দেখা গেল, প্রধান দরজার পাশে। গাড়িতে কোনো ফুল নেই দেখে কেউ দ্রুত সরিয়ে নিল। কারো সঙ্গে একটি কথাও না বলে হকশাহেব দোতলায় তাঁর শোয়ার ঘরে ঢুকে বিছানায় গড়িয়ে পড়লেন। তাঁর মাথা থেকে লম্বা সারসি টুপি খুলে পড়ে থাকল বালিশের পাশে, কাত হয়ে। হকশাহেব গভীর ঘুমিয়ে পড়লেন তাঁর নাকডাকার গুরগুর আওয়াজও শোনা গেল। 

কাউকে ফোন করলেন না। শরৎ বোসকেও না! 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *