১৪৯. মুসলিম ঐক্য : নানা রকম
১৯৩৭-এর ১ এপ্রিল প্রজা-লিগ জোট মন্ত্রিসভা তৈরির পর থেকে শুধু মন্ত্রিসভা ও হকশাহেবকে নিয়ে গুজব থামেনি। গুজবের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-তা প্রমাণ-অপ্রমাণের উপর নির্ভর করে না। প্রত্যেকটা গুজবই আলাদা। যেমন চৈত্র মাসে ঘরের চালের আগুন পাশের চালে আগুন ধরিয়ে দেয় গুজবের ছড়িয়ে পড়া তেমন নয়। সকাম গুজবের নানা রকম উদ্দেশ্য থাকে না।
কংগ্রেস আর প্রজা পার্টি মিলে নতুন মন্ত্রিসভা হবে এটা নৌকায়-লঞ্চে, হাটেবাজারে ও নদীর সংলাপযোগ্য দুই পাড়ে—এটাই ছিল প্রধান মনোবিলাস—কী হবে হকশাহেবের মন্ত্রিসভা, কে কী মন্ত্রি হবেন—কংগ্রেসের ও প্রজার।
কিন্তু কংগ্রেস হাইকম্যান্ড অন্য কোনো পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা তৈরি নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলে ঐ হালকা মনোবিলাসী খেলা বন্ধ হয়ে গেল। রাতারাতি প্রজালিগ মন্ত্রিসভা হয়ে যাওয়ায় গুজব ক্রমেই ভৌতিক হয়ে উঠল। ‘হকশাহেবকে জানো না? দেবে একদিন সারওয়ারদিকে কুপোকাত করে।’
‘নির্লজ্জডা কেডা? হকশাহেব না খাজা? পটুয়াখালি থিক্যা খাজারে ডুবাইয়া যে-পোশাকে তারে ছাড়া হইল—তাতে তার সঙ্গেই আবার ঘর করা? ‘হকশাহেব এই মন্ত্রীসভা ভেঙে দিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা বানাবেন বলে কংগ্রেস, মহাসভা, ন্যাশন্যালিস্ট ও নির্দল সব হিন্দু নেতাদের সঙ্গে শলা পরামর্শ করছেন। যতবারই যোগেন শোনে প্রত্যেকবারই যেন প্রথম শোনে।
জে. সি গুপ্তের বাড়িতে হকশাহেবের সঙ্গে লিগরিরোধী পার্টিগুলির নেতাদের বৈঠকের মেনু পর্যন্ত যোগেন শুনেছে।
এও না-হয় বোঝা যায়। হকশাহেব যে গুজবটা ছড়াতে বলেছিলেন যোগেনকে, সেই কাজে তিনি নিশ্চয়ই আরো অনেককে লাগিয়েছেন। সবাইকে নিশ্চয়ই এক কায়দায় বলেননি। কিন্তু কথাটার আন্দাজ যাতে শ্রোতার কাছে নির্ভুল পৌঁছয় সেটা নিশ্চিত তিনি খেয়ালে রেখেছেন। আবার এই একই সময় জুড়ে হকশাহেব এমন সব আইন পাশ করিয়ে নিচ্ছেন আইনসভায়, প্রথম ধাক্কায় যে-সব আইন নির্লজ্জ মুসলমান-পক্ষপাতী বলে মনে হতে পারে। এমন কী একজন গোঁড়া মুসলমানেরও তেমন মনে হতে পারে।
ক্যালক্যাটা মিউনিসিপ্যাল (সংশোধন) আইন, মধ্যশিক্ষা সংস্কার আইন, সব জিলায় ঋণ-সালিশি বোর্ড গঠন, কৃষক ঋণ (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন, মহাজানি আইন, বন্ধকি ও অবন্ধকি ঋণের সর্বোচ্চ সুদ আইন, মুসলিম অধ্যুষিত পার্ক সার্কাসে ১০০ শতাংশ সরকারি খরচে মুসলিম মেয়েদের জন্য লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ প্রতিষ্ঠা, সংস্কৃত কলেজ-টোল-বৌদ্ধ বিদ্যালয়ের গ্র্যান্ট বন্ধ করা, কলাকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্টও অংশত কাটা, গ্রাম-উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল বাড়ানো, ২৭ জন জিলা গ্রামীণ উন্নয়ন অফিসার নিয়োগ, ২৬ জন প্রচার অফিসার নিয়োগ, থানা-ওয়ারি ২৫০ সংগঠক নিয়োগ, সংগঠকের সংখ্যা বাড়িয়ে ৬০০ করা হবে, নির্দিষ্ট খাত থেকে উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে পাঠানো বন্ধ, গ্রামীণ প্রকল্পগুলির জন্য অনেক অফিসার নিয়োগ, ‘আইন ও প্রশাসনের সাহায্যে শ্রমিককল্যাণের কাজ ও সালিশি মারফৎ শিল্পগত সমস্যা মেটানোর’ ঘোষিত শিল্পনীতি, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ট্রাইবুন্যালকে কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার, লোক্যাল বোর্ডগুলির ওপর লিগের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও সাংগঠনিকভাবে মুসলিম লিগের সভ্য ও শাখা বাড়ানো আর সাংস্কৃতিক দিক থেকে ইসলামের বিপন্নতা ও শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস প্রচার ও সেই উদ্দেশ্যে মোল্লা-মশজিদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো।
তিন বছর আগে যোগেনকে যে এই কথা বলেছিলেন, তার মানে তো এই না যে ১৯৩৮-এর পুজোর আগের সেই রাতে সেই প্রথম হকশাহেব তাঁর কর্মসূচি তৈরি করলেন। হকশাহেব সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুলধারণা হল—তিনি অস্থিরমতি, কখন কী করে বসবেন ঠিক নেই, তাঁর ওপর নির্ভর করা যায় না। এই ভুলধারণা অন্য এক ভাষাতেও প্রচলিত—তিনি স্বার্থপর, সুযোগসন্ধানী ও বিশ্বাসঘাতক।
এই ধারণা প্রচলের একটা ইতিহাস ও তখনকার রাজনীতিতে অভ্যস্ত অনেকগুলি আদবকায়দার ব্যতিক্রমণ আছে। বিশের দশকের গোড়ায় চিত্তরঞ্জন দাশের ‘স্বরাজ্য দল’ প্রতিষ্ঠা ও কাউন্সিল—ভোটে দাঁড়ানো থেকেই রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে উপদল, উপদলের মধ্যে আরো উপদল, উপদলের নেতার জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার জন্য নানা বোঝাপড়া—এই সব অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, এটাই রাজনীতির প্রধান ও একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবচেয়ে পুরনো ও বড় রাজনৈতিক দল হিশেবে কংগ্রেসেই এটা সবচেয়ে বেশি ঘটেছিল। হকশাহেবকে নিয়ে কোনো উপদলের উপদল তৈরি করা যেত না। হকশাহেব কখনো উপদল-তৈরির মধ্যে যেতেন না যদি সেই উপদলের উদ্দেশ্য ও তাঁর উদ্দেশ্য এক না হত। সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে গেলে তিনি আর সে উপদলের থাকতেন না।
হকশাহেব প্রধানত কলকাতার লোক ছিলেন না।
কলকাতার প্রধানত অবাঙালি ও কিছুটা বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে খেয়োখেয়িটাই ছিল একমাত্র কাজ। দ্বিতীয় গোলটেবিলের পর মহম্মদ আলি জিন্না আর ভারতে ফেরেননি। লন্ডনে প্র্যাকটিস করছিলেন ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ঢোকার একটা আসন খুঁজছিলেন। ১৯৩২-এর নভেম্বরে সাম্প্রদায়িক রোয়দাদ ঘোষণার পর কলকাতার কয়েকজন শিক্ষিত, উদ্যোগী ও সম্মানিত মুসলমান নিউ মুসলিম মজলিশ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পত্তন করেন। কলকাতায় ‘নিউ মুসলিম মজলিশ’-এর নেতা ছিলেন—খাজা নুরুদ্দিন সিদ্দিকিমুজিবর রহমান ও ইস্পাহানিদের ছোট ভাই। এই চারজনের উদ্দেশ্য ছিল, কংগ্রেসের ক্রমহিংস মুসলিম-বিদ্বেষ ও সারওয়ার্দি, নাজিমুদ্দিন, গজনভিদের সংকীর্ণ মতলববাদি থেকে কলকাতার মুসলিম সমাজকে দায়িত্বশীল, নিঃস্বার্থ, দাঙ্গাবাজিমুক্ত ও রাজনৈতিক বিকল্পের পক্ষে জড়ো করা। আসন্ন পৌরনির্বাচন তাঁদের সুযোগ করে দিল। প্রত্যেক ওয়ার্ডে একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে নিয়ে সংগঠন তৈরি হল। এরা একটা মুসলিম চেম্বার অব কর্মাস তৈরির চেষ্টাও শুরু করল।
হকশাহেব ১৯৩২-এর জুলাইয়ে মুসলিম জমিদার, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও কাউনসেলারদের নিয়ে ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম সম্মিলন’ করলেন ও ঐ বছরের শেষ ছ-মাস জুড়ে কলকাতার নানা শ্রেণির নানাবৃত্তির মুসলমানদের সঙ্গে একাধিক মিটিং করতে লাগলেন—জাহাজে লশকর, খলিফা-দর্জি, কসাই, ছোট দোকানদার, বড়বাজারের পাইকার, কলকাতার একটু বাইরের জেলা। হকশাহেব এই নতুন সমাবেশের প্রধানতম নেতা হয়ে উঠলেন। ১৯৩৩-এর ১২ অক্টোবর ‘স্টেটসম্যান’ কাগজে হকশাহেবের একটা চিঠি বেরল, ‘যে কোনো বিচারকের সামনে যদি আমি প্রমাণ করতে না-পারি যে বাঙালি হিন্দুরা হল মূর্তিমান সাম্প্রদায়িকতা আর তার ভিত হল এই হিন্দুদের চূড়ান্ত স্বার্থপরতা—তা হলে, আমি ফাঁসি যেতে রাজি আছি।’ হকশাহেবই বাঙালি মুসলমানদের প্রথম জানালেন, এই প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হিশেবে প্রাপ্য মান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের সময় এসে গেছে। তার জন্য যতটা এক হওয়া সম্ভব হতে হবে। এখন আর দেরি নয়। এখন মুসলমানদের নিজেদের জানারও জানানোর সময়।
তখন কোথায় জিন্না?
সত্যি করেই তো হকশাহেব এই মুসলিম ঐক্য তৈরি করেছিলেন। তিনিই তো খিদিরপুর ডকের বাঙালি লশকরদের ইউনিয়ন করার পথ খুলে দিয়েছিলেন সারওয়ারদিকে। হকশাহেবের চেলা দাউদ ছিল ওখানকার সব ইউনিয়নের বড় পান্ডা। দাউদকে বলে দিয়েছিলেন, সারওয়ারদিকে জায়গা করে দিতে।
মাত্র দু-তিন বছর পরে লন্ডন থেকে ফিরে জিন্না এসে মুসলিম লিগ পার্লামেন্টারি বোর্ড আর ইউনাইটেড মুসলিম লিগের খাঁচায় হকশাহেবকে পুরতে চাইলেন, হকশাহেব ঝিমুতে ঝিমুতে সে খাঁচায় ঢুকলেন। মুসলিম ঐক্যের জন্য সারা ভারতে একটা আকঙ্ক্ষা তৈরি হচ্ছে। হকশাহেব আলাদা থাকতে চান না।
