১২৪. ভোলার সাইক্লোন
ভোলার সাইক্লোন নিয়ে শেষ পর্যন্ত যোগেনই হয়ে উঠেছিল ভোলা সাইক্লোনের একমাত্র নেতা, যোগেনকে ছাড়া কেউই কোনো সিদ্ধান্ত পাকা করতে ভরসা পায়নি। এসডিও-কে খুঁজে বের করেছিল যোগেনই, দুদু মিয়ার সাহায্যে। যোগেন যখন বলল, ‘আরে এসডিও-টা কই? তারে তো লাগবই, সরকার’, তখন দুদু মিয়া বলে উঠেছিল, ‘এইডা লিখ্যা নেন সাইকোলনে হারাইয়্যা গেছে। হাজার-হাজার মানুষ ভাইস্যা গেল আর আপনার এসডিও ভাইসব্যার পারে না? একটা—না প্রস্তাব সবাই কয়। কুন বছরের বন্যায় চন্দ্রদ্বীপের কোন্ রাজা নাকি তালগাছে চইন্যা বাঁছছিল। আর কুন শাহেব তার অফিস টফিস নিয়্যা ভাইস্যা গিছিল। তারপর থিক্যা না সেরেস্তা আইল দৌলত কাজি। এবার দৌলত কাজিও রেয়াদ। রাজা ওঠে তালগাছে, শাহেব যায় ভাইস্যা, আর আপনার এস ডি ও তার একডাও পারে না?’ যোগেন একটু হেসে দুদু মিয়াকে বুঝিয়েছিল ‘পারব, পারব না ক্যা, অফিসার ও তো নিয়তির বশ, আবার তাগ চাকরিরও বশ, ভাইস্যা যাইব্যার আগে এসডিও-রে তো কোনো অফিসারকে চার্জ দিব্যার লাইগবে। না তো সাইকোলোনও আইন মোতাবেক হবার পারবে না, হাজার-হাজার মানুষজনের মরণ-ভাসানও আইনমাফিক হবে না। এস ডি তো সত্যি ভাইস্যা যায় নাই—’
‘ক্যা, মোড়ল, এর মইধ্যে সত্যি ভাসা আর মিথ্যা ভাসা দুই আলাদা ভাইসান আছে?’
‘শুনেন মিয়াভাই,’ কথা হচ্ছিল ভাষানচর দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে পরদিন সকালে। নদী আর ভাষানচরের মাঝখানের মাঠটার একেবারে উলটোদিকে, লঞ্চঘাট থেকে সেখানে যেতে হয়, পুরো গ্রামটি পেরিয়ে। সেইখানে, ইউনিয়ন অফিস আর থানার মাঠে—সাইক্লোন থেকে যারা বেঁচে আসতে পেরেছিল, তারা থাকছে। থাকছে মানে মাঠেঘাটে পড়ে আছে। খাওয়াচ্ছে দুদু মিয়া। আরো বেশি উঠেছে, মেহেন্দিগঞ্জ ও রাজপুরের দিকে–শোনা যায় সে রকম, পাকাপাকি তো জানা হয়নি, সাইকোলন তো এখনো থামেনি।
সারারাত ধরে যোগেন আর দুদুমিয়া ঘুরে-ঘুরে একটা লিস্টি বানানোর চেষ্টা করেছে। এখনো করছে। কী করে যেন, একটা ব্যবস্থাও হল। ইউনিয়ন বোর্ড অফিসের বারান্দায় একটা লন্ঠন জ্বালানো হল আর সকলে এসে, একের-পর-এক, নিজের নাম, সাকিল, পরিবারের লোকসংখ্যা, এখানে ক-জন আসছে, গাই-বলদ ছিল কটা, কটা বেঁচেছে এসব বলে যেতে লাগল। লাইনই একটা হয়ে গেল—যদিও এরা জানে না কাকে লাইন দেয়া বলে। এরা মুখে বলে, মিশিল বইন্ধ্যা। চৌকিদারি ট্যাক্সের হ্রাসবৃদ্ধির সুবাদে, ডাকাতির সন্দেহে গ্রেপ্তারের সুবাদে, হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সুবাদে, ভোটার লিস্টের সুবাদে, ঋণসালিশি বোর্ডের সুবাদে, সুপুরি চালানের ওপর ট্যাক্সের সুবাদে—সরকারি লিস্টিটা লোকজনের জানা ছিল। জানা থাকলেও, সেটা ভাল কি খারাপ এ-বিষয়ে কোনো মতৈক্য ছিল না। কেউ ভাবত, নিজেকে যতটা গরিব বলা যাবে, সরকার ততই সাহায্য করবে। কেউ ভাবত, নিজেকে যতটা বড় চাষি বলা যাবে, সরকার ততই ক্ষতিপূরণ দিবে।
যারা এই সাইক্লোন থেকে প্রাণে বেঁচেছে, তারা সবাই এখনো মরার আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দু-একজন বুড়ো তো মরোমরোই হয়ে আছে। দুদু মিয়ার আশ্রয় পেয়ে ও এখন যোগেন মণ্ডলও এসে যাওয়ায়, তার ওপর লন্ঠন জ্বালানোর ফলে এদের মধ্যে ধীরে-ধীরে একটা আশা বইছে যে সাইক্লোন আর মানুষ, পক্ষ এই দুটোই নয়, তাদের কী গেছে তা তারা নিজেরাই জানে না। এখন সরকারি লিস্টি যখন যোগেন মণ্ডল বানাচ্ছে, তখন, একটু ভরসা করেই ক্ষতি বাড়িয়ে বলা আর কমিয়ে বলা নিয়ে এদের ভিতরকার দু-রকম ভাবই বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল বটে, কিন্তু বেশিদূর এগয়নি।
একজন তার সাকিন বলল, ইউনিয়নের নম্বর ও নামও বলল, বাড়িতে তারা মরদ আর দুই বৌ এই তিনজন, তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি—বাড়িঘর জমিজিরেত ছাড়া। দুদু মিয়া তাকে বলে, ‘দুই-দুইডা শাদি, ছাওয়াল-পাওয়াল হইল না কোনো বিবিরই।’
‘হ্যাঁ। হইছে। ছোড়বিবির একডা ছেলে-
‘সে কোথায়?’
‘জানি না। ভাইস্যাই গেল নাকি সাঁতরাইয়া উইঠল?’
‘মাইয়্যার কি শাদি দিছিলেন?’ দুদু মিয়া বলে।
‘হ্যাঁ’।
‘গ্রামেই?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাগ খবরাখবরও তো জানা নাই।’
‘দুইডা শাদি কইরতে তো দ্যানমোহর কম লাগে নাই?’
‘প্রথম শাদির কম ছিল। ছোডবিবির বেলা বেশি হইছিল।’
‘দ্যানমোহর আইল কোত্থিক্যা? বলদ বেইচ্যা’।
‘হ্যাঁ। বলদ বেইচ্যা।’
‘অ্যাহন ছিল কয়ডা?’
‘তিনডা বলদ আর দুইডা গাই’।
‘সেগুল্যার কী হইল?’
‘জানি না। ভাইস্যা গিছে—’
যোগেন বলে, ‘আপনেই জেরা করেন। আমি লেইখ্যা নেই। কথা বলার সুবিধা হয় যদি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুদু মিয়া বলে, ‘মণ্ডলমশায়, এমন কইর্যা হবে না। সে সঙ্গে নাই, তারে নাই কইতে মনে বাজে। নিজে যার মরা দেহে নাই, সে ব্যাটাই হোক আর বলদই হোক, তারে ক্ষতি দেহাইতে নাই।’
‘কডু ঘুরাইয়্যা কন। বাড়িতে কয়জন ছিলেন, এহানে কয়জন আছেন। আর সম্পত্তিডা আপনে আন্দাজ কইর্যা নন। এই দুইডা যদি না দেয়া যায়—মৃতের সংখ্যা বা নিরুদ্দেশের সংখ্যা আর সম্পত্তির পরিমাণ—তাইলে ক্ষতির হিশাব বাইর হইব না।’
আবার, এর উলটোও হচ্ছে।
এক কমবয়েসি জোয়ান তার বিবিকে সঙ্গে নিয়ে বলে, তাদের বাড়ি ছিল চরকিলকিতে। ‘বাপ-বড় বাপ-মা-বড় আপা সব ভাইসা গিছে। বাড়ির জমির হিশাব তাগ জানা নাই। পুরা চরখানই আমাগ। তার উপর আইল ধইর্যা সুপুরিগাছ—’
দুদু মিয়া জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার বাপের নামডা কইব্যা?’
‘সরকারি নামডা তো কইব্যার পারব না। সবাই তো শুগুর মিয়াই কইত।’
‘তুমি আমারে চিনো?
‘না। আমি তো নালায়েক। কাজকামে হাত দেই নাই অ্যাহনো। আপনার মতন বড় মানুষরে চিনি ক্যামনে?’
‘তোমাগ সাকিনডা য্যান কী কইলা?’
‘চর কিলকি-ই তো কয়’-
‘নদীডা কী?’
‘তেঁতুলিয়া আর আড়িয়াল খাঁ—’
‘এ–ই, তোমরা কেউ চরকিলকি চেনো নি? শুগুর মিয়া—বড় মানুষ। সুপুরি ক্ষেতি। আমি তো চিনি না। তোমার দ্যাহো’।
পেছন থেকে অনেকেই এসে ছেলেটি ও মেয়েটিকে একঝলক দেখে যায়। দেখার ভঙ্গিতে সন্দেহ। দেখার পরেও সে-সন্দেহ কাটে না। এরমধ্যেই দুদু মিয়া জিজ্ঞাসা করে, ‘শ্বশুরবাড়ি কনে?’
মেয়েটি হঠাৎ বলে ওঠে, ‘আপনাগ যহন এত সন্দ, তহন ছাড়ান দ্যান,’ বলেই সে আলো থেকে সরে যেতে পা ফেলে, ছেলেটির দিকে না তাকিয়েই। ছেলেটিও সরে যেতে পা বাড়ায়। ঠিক তখনই কেউ বলে ওঠে, ‘আলিমাবাদ থিক্যা পশ্চিমে আর চন্দ্রমোহনের পুবে শকুর মিয়াশাহেবের জঙ্গলের কথা কয় না কী? তেনার ইন্তেকাম হইছে মাস দুই।’
‘শুক্কুর ভাই! শুকুর ভাইরে বাপ বানাইছে। আমারই লগে। ছ্যামরাডা কেডা? আবার বিবিও ধইরছে। দ্যাহো, তোমরা কেউ য্যান আমারে জালি কইরো না।’
দুদু মিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই, ‘ধর্ ধর্’ আওয়াজ করে অনেকে ছুটে যায় ছেলেটি আর মেয়েটিকে ধরতে। দুদু মিয়া সেদিকে কানও দেয় না, চোখও দেয় না। যোগেন চিৎকার করে বলে, ‘আরে, ওরা তো আর সাইক্লোনডা জালি করে নাই।
এখান থেকে শোনা যাচ্ছিল—’ধর্ ধর্’ আওয়াজটা বাড়ছেও, দূরেও চলে যাচ্ছে। দুদু মিয়া শুনতে পাচ্ছে না দেখে, যোগেন ডাকে—’এর পরে কেডা?’
.
পরের সকলেও সেই উপর হাওয়ার বেগ কিছু কমে না। যোগেন বলেছে, নতুন কোনো জায়গা ভাসার কথা যখন শোনা যায়নি, তখন বাতাসের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। সে দুদু মিয়াকে বলেন, ‘চলেন তো—আমার লগে, বরিশাল যাব, জিলা ম্যাজিস্টেটের সঙ্গে দেখা কইর্যা কইব কী হইছে আর সরকার কী কইরব। চলেন। চলেন। আপনেরে যাতে বেলা পড়ার আগেই ফিরত দেয়া যায়। আপনার ধুতির কাছা দেয়া শ্যাষ হইলেই আমরা রওনা দিমু।’
দুদু মিয়া আপত্তি করে, ‘আপনে তো সব বুইঝ্যা নিলেন, আবার লিখিতংও তো রাইখলেন, আবার আমারে ক্যা, ঐ শাহেব-শুবাগা মইদ্যে? মোড়লদাদা, আমারে কবেন না।’
‘আরে, আমি যে সত্যি এইহানে আইস্যা পড়ছি আর যা কব তা নিজের চক্ষুতে দেইখ্যাই কতেছি সেডার তো একটা সাক্ষ্য চাই। দুদু মিয়ার থিক্যা বড় সাক্ষী আর কেডা? আরে বেলাবেলি ফিরত।’
দুদু মিয়া কাছা দিয়ে ধুতি পরতে, চিকনের কাজের পাঞ্জাবি পরতে আর চোখে সুরমা লাগাতে সত্যি দেরি করে না। ঘাটে এসে সে নৌকো আর তার মাঝিদের দেখে সাইক্লোনের থেকেও জোরে হেসে উঠে বলে, ‘এই নাওয়ে এই মাঝিরা আমাগ সদরে নিয়া যাবে?’ তারপর কাউকে ডাকে। যোগেন প্রায় তার মত করেই বলে ওঠে, ‘আপনে কি ম্যাজিস্টেটকে বন্যার দুর্দশা দেখাবেন বইল্যা সদর যাচ্ছেন, নাকি চার নম্বর নিক্যা বসার কামে? আপনারে দেহাইয়া কাউরে বুঝান্ যায়, ভোলায় কী সর্বনাশই যে হইল!
কিন্তু নৌকো নিয়ে বিবাদ তাতে মিটল না। দুদু মিয়া কিছুতে ছোটমাঝির নৌকোয় উঠবে না।
‘এডা কী কন? নৌকা ভাড়া লইয়্যা আসছি আর মাঝখানে তারে ছাইড়্যা দিব—এডা কোনো বয়স্ক মানুষ কইব্যার পারে? তার থিক্যা আপনার নৌকারে পিছন পিছন আইস্যা বরিশালের ঘাটে ভিড়ায়্যা রাখুক। শাহেব যদি আমারে রাইতডা থাইক্যা যাইব্যার কয়, আপনি তালি আপনার নৌকা নিয়্যা পাড়ি দিবেন। আমি আমার নৌকা নিয়্যা যেহানে হয় যামুনে।’
এই কথাটার মধ্যে সত্য ছিল। সেই সত্যের জোরেই দুদু মিয়া নৌকায় বসে। আর নৌকা ছেড়ে দেয়।
দুদু মিয়া বলে ওঠে, ‘এই নৌকায় পাড়ি দিতে আপনের ডর লাইগ্গ্ল না। আমার তো দাঁতের খটখটি শুরু হইয়া গেল। দেখ বাবা, যদি ডুবাইসি, তাইলি এমন জায়গায় ডুবাইস, যেহানে ডুবলে পায়ে মাটি পাওয়া যায়। না-হয় তো শ্যাষে নদীর তলার কর্দমে এমন গাঁইথ্যাই গাঁইথ্যা গেলাম যে আমারে বাকিডা জীবন কাদামাটির জিন হইয়্যাই জীবন কাটাবার লাগব।’
দুদু মিয়া গান ধরে, ‘আমরা আছি পোলাপান/গাজি আছে লিখাবান/গিয়াসুদ্দিন শামসুদ্দিন/কালু মিয়া গাজউদ্দিন/ সেকেন্দার উদ্দিন/শিরে গঙ্গা দরিয়া/পঞ্চ পির মা গঙ্গা বদর-বদর।
বদর-বদরে নৌকোর সবাই গলা মেলায়—এটা জলাচার, জলে ভাসলে বদর-বদর শুনলে বলতে হয়।
