১২৬. বরিশালে : মণ্ডল-মিয়্যা তৰ্ক
প্রথমে যোগেনের মাথায় ছিল যে শিবু সরকারের মারফত হাতচিঠি পাঠিয়ে সার্কিট হাউসে একটা অল পার্টি আর একটা অল অফিসার্স মিটিং ডাকবে। একসঙ্গে কিন্তু পৌঁছুতে পৌঁছুতেই তার মনে আসে—তার মানে, আজ সারাদিনও তো কোনো কাজ হবে না। কাজ মানে, কী কী করতে হবে তার কোনো ফর্দও তো তৈরি হবে না। স্কুলের উঁচু ক্লাশে পড়ে যখন, তখন অশ্বিনীকুমার শিখিয়েছিলেন—এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রথম কাজ যারা বেঁচে গেছে, তাদের বাঁচিয়ে রাখতে মাথার ছাউনি আর পেটের খাওয়া। দ্বিতীয় কাজ, যারা বেঁচে থাকল, তাদের নিরাপত্তার জন্য কলেরা-টাইফয়েডের ইনজেকশন। যোগেন তো সে-ই প্রথম ইনজেকশন দেয়া শিখেছিল। আরো একটি জরুরি শিক্ষা পেয়েছিল যোগেন, বাস্তব ছাড়া যে-শিক্ষা পাওয়া যায় না, বিপর্যস্ত এলাকার সবচেয়ে দূরের জায়গা থেকে কাজ শুরু করতে হয়। সেটার হদিশ না থাকলে জানা—এলাকারই দূরতম জায়গা থেকে
যোগেন ঠিক করল, একটা দুপুর, বিকেল, রাত তো কম সময় নয়। একটু হলেও তো কাজটা এগিয়ে রাখা যায়। তাই ঘাটে নামতেই সে ‘খাড়াও’ বলে সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে উধাও হয়ে গেল ও মিনিট—পাঁচ-সাত পরেই আবার যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়ায়।
‘মিয়াভাই, ডি এম শাহেবের সঙ্গে সরাসরি কথা হৈল। উনি তো বিশ্বাস করব্যারই চান না যে আপরে নিয়্যা আসছি। কয়, এখনই আসেন। তো চলেন, একডা টমটম ধইরা…..। ওরা এই হানে থাউক। শহর দেহুক। টকি দেহুক।’
দুদু মিয়া সবে বলতে শুরু করেছে, ‘মণ্ডলমশায় এ তো শাদা ডি এম?’
‘ডি এমরা তো শাদাই হয় সাধারণত—’
‘তা তো হবেনই। কিন্তু আমি য্যান অসাধারণ হইয়্যা যাই। ইংরাজি তো?’
একটা টমটমকে হাত তুলে দাঁড়াতে বলে যোগেন দুদু মিয়াকে ডাকে, ‘উঠেন তো। নমাজ পইড়তে মিসিলে খাড়াইয়্যা কন, কাছা খুইলব না। চলেন দেহি। আপনার যা কওয়ার আমারে কইবেন হইল তো!’ যেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে—এমন ভঙ্গিতে দুদু মিঞা পেছনের আসনে বসে।
জিলা ম্যাজিস্ট্রেট রেঞ্জশাহেব নিজেই বেরিয়ে এসে ওদের দু-জনকে তাঁর ঘরে নিয়ে এলেন, বলতে-বলতে, ‘সারা দুনিয়া তো জেনে গেছে ভোলা-দৌলতকাজি উপে গেছে, তখন আপনারা এসে জানালে, আমরা ভোলা-দৌলতকাজির লোক। আমি তো ভাবছিলাম, ভূতরা কি এখন ফোনও করে? বসুন। বসুন। এটা সত্যি চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর মত কাজ, রিপ্রেজেনটেটিভ গবর্মেন্ট, ব্যাপারটি কী আর পিপলস রিপ্রেজেনটেটিভ বলতে কী বোঝায়। মিস্টার মণ্ডল, আপনার মত পিপলস রিপ্রেজেনটেটিভ পাওয়া গবর্মেন্টেও ভাগ্য, পিপলেরও ভাগ্য। ওঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল –’
রেঞ্জশাহেব বুঝতে পারেন, যোগেন সব কথা তার সঙ্গীকে বাংলা করে শোনাচ্ছে। বোঝার পর থেকে উনি কথা বলার গতি কমিয়ে দিলেন, যাতে যোগেন বাংলা করার সময় পায়। যোগেন দুদু মিয়ার পরিচয় দিচ্ছিল—ঐ দিককার, ঐ ভোলা সাইডের খুব বিখ্যাত বংশানুক্রমিক এক্সপোর্টার, সুপুরির, এক্সপোর্টার মানে বেয়ন্ড ইন্ডিয়া, বাই শিপ টু ইতালি অ্যান্ড মেডিটেরেনিয়ান কান্ট্রিজ—।
শাহেব যথাযথ বিস্ময় জানালেন। ওঁর নাম শুনে শাহেব জিজ্ঞাসু হলেন, ‘ডুডু মিয়া। ইজ ইট নট এ হিন্দু নেম?
‘না স্যার। উনি খুব নিষ্ঠাবান মুসলিম—’
‘এ মুসলিম?’
হ্যাঁ স্যার। খুব নাম করা মানুষ।
‘এ মুসলিম ইন ধোতি?’
‘হ্যা স্যার। দেখেন না। দাঁড়ি গোঁফও নেই, টুপিও নেই।’
‘ইট ইজ এ রেয়ার সাইট ইন বেঙ্গল—’
দুদু মিয়াকে শাহেব কী বললেন, সেটা বলে দেয়ার পর শাহেব তাঁদের স্টোরি ইন এভরি ডিটেইল শুনতে চাইলেন। আর সেটা এঁরা দু-জন একসঙ্গে বলতে-বলতে নিজেরাই বুঝছিস, সত্যিই, এতটা ঘটেছে। শাহেব মাঝে-মাঝে তাঁর ভ্রূর ওপর হাত রাখছিলেন, বিস্ময়ে, হতাশায়।
শেষে ঠিক হল—যা যা এক্ষুনি দরকার বলে যোগেন ও দুদু মনে করে তার একটা ফর্দা শাহেবের অফিসের সঙ্গে বসে ওরা করে দিয়ে যাবে। আগামীকাল সকাল নটায় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড অফিসে শাহেব অল পার্টি মিটিং ডাকছেন, মণ্ডল ও মিয়ারই জন্য।
রাতে কোথায় থাকা এই নিয়ে মণ্ডল আর দুদু মিয়ার নতুন বিবাদ শুরু হল ফেরার পথে। দুদু মিয়া এটা বুঝেছে যে জিলা ম্যাজিস্ট্রেট তাদের যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন। এটাও বুঝেছে যে তারাই প্রথম, যোগেন আর দুদু মিয়াই প্রথম, বাইরের সবাইকে খবর দিচ্ছে, সুতরাং দায় দায়িত্ব আছে। দুদু মিয়া মনে-মনে জানে, সবটাই যোগেন মণ্ডলের কাজ। মণ্ডল যদি নিজে এসে না পড়ে তাহলে দুদু মিয়া ওখানকার আরো দশের সঙ্গে নিজের দুর্ভাগ্য ভাগ করতে থাকত, তার মাথাতেও খেলত না সদর ম্যাজিস্ট্রেট দৌড়াদৌড়ি করা। সদর-ম্যাজিস্ট্রেট যদি তার কাছে যেত তাহলে কাজের বিলিবণ্টন ঠিকভাবে করার জন্য দুদু মিয়া তার করণীয় করত। যা হোক, এসে যখন পড়েছে কালকের মিটিংটা না করে আর ফেরার উপায় নেই।
যোগেন যতই বলে, প্রহ্লাদার বাড়িতে চলুক দুদু মিয়া, দুদু মিয়া ততই বলে, সে তো বলতে পারে না তার আড়তদারের ওখানে থাকতে মণ্ডলমশায়কে, মণ্ডলমশায়ের অসুবিধে লাগতে পারে, ছোঁচ লাগতে পারে যবনের বাড়িতে, তাই তাকে ছেড়ে দিক মণ্ডল, মণ্ডল যাক প্রহ্লাদের বাড়িতে।
তার হিন্দুত্ব নিয়ে দুদু মিয়ার হিশেব শুনে যে হাসাহাসি শুরু করল মণ্ডল, তাতে দুদু মিয়া প্রথমে ভড়কি খেয়ে পরে মজা পেল। যোগেন তাকে এই কথাটা কিছুতেই বোঝাতে পারে না যে হিন্দুধর্মের বিধান অনুযায়ী যোগেনের হাতে বা যোগেনের ছোঁয়া কোনো জল বা ফল পর্যন্ত খেলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। দুদু মিয়া এই কথায় বারবারই জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনারাও তো হিন্দু। গরিব। কিন্তু হিন্দু।’ আবার যোগেন এই কথাটার জবাবে বলে না বা বলতে পারে না, না, আমরা হিন্দু না। বা, এ রকম করেও বলতে পারে না, হিন্দু কি একরকমের? উলটে সে দুদু মিয়ার কাছে বিষয়টা আরো রহস্যময় ও দুর্ভেদ্য করে তোলে, এই কথা বলে যে, ভগবানের দয়ায় তারপরে আর ছোঁয়াছুঁয়ি নেই। দুদু মিয়া বোঝে না, ‘তারপরে’ মানে ‘কার পরে’? তারপরে মানে ‘আমার’ পরে। মানে, যোগেন মণ্ডলের পরে। তাতেও দুদু মিয়ার প্রশ্নের নিরসন হয় না, যোগেনের পরে না মণ্ডলের পরে? যোগেনকেই হার মানতে হয়, ‘এরে কয় ব্যাপারীর বুদ্ধি। নাই, নাই, কিন্তু ছটাকে শেয়ানা। আরে আমি, এমন একডা বড় ব্যাপারী, বাপও যার বড় ব্যাপারী, যার গাছের সুপুরির লগে মহারানী ভিক্টোরিয়ার দত্ত শুল্যায়, স্যায় কী কইর্যা না জাইনতে পারে হিন্দুগ জাতপাতের কথা?’ দুদু মিয়া এর যা ব্যাখ্যা করল, তেমন ব্যাখ্যা যোগেন তো কোনোদিন শোনেইনি, পণ্ডিতমশায়রা শুনলে যজ্ঞের আগুনে নিজেদের চিতা জ্বালাবে। দুদু মিয়া বলে, ‘আরে আমরা সারা জীবনে হিন্দুদেহি কয়ডা? একডা না দুইডা। তাও তো চেনা বামুন বাড়ি। সারা ভোলা-দৌলত খান-তজুমুদ্দিন-চরফ্যাসান এই সারা জায়গা খুঁইজ্যা একডা হিন্দু বাইর কইরব্যার পাইরবেন। আমরা শুধু শিখ্যা রাইখছি হিন্দুরা মুসলমানগ ছোঁয় না, ছোঁয়া খায়ও না। হিন্দুরা যে হিন্দুগ ছোঁয়াও খায় না—এমন আজব জীব খোদাতালা বানাইছিল ক্যা। আপনে আসন কথাডা প্রকাশ দিলেন না, আপনারা হিন্দু তো?’
সেই প্রশ্নের উত্তরে আগে যোগেন দুদু মিয়াকে জিজ্ঞাসা করে, ‘হিন্দু-মুসলমান ছাড়েন। আইজ রাইডা আমার আপনার একজায়গায় থাকাডাই উচিত তো?’
‘চিরজীবনই থাকা উচিত। আইজ রাইতডা ক্যা শুদু?’
‘সে তো চিরজীবনের টাইমে ভাবা যাইব। সব চিরজীবনের পরের সকালে কাকাডাকার আগে তো মিটিং যাইব্যার লাগব না।’
‘তা লাইগব না।’
‘আমাগ দুইজনরে তো একসঙ্গে মিটিঙে হাজির হওয়া লাগব?’
‘অসুবিধাড়া কোথায়?’
‘কাইল মিটিংডার লগে যদি একডা একথা মনে খেলে, সেডা আপনারে কইব ক্যামনে যদি আপনে থাহেন আড়তে আর আমি থাহি প্ৰহ্লাদে’।
‘এ তো আমারে আপনে খুনের আসামি বানাইয়্যা দিলেন মণ্ডলমশায়। আপনে নিশ্চয় হিন্দু হিন্দু ছাড়া উকিল হয় না তো। সেই খুনের আসামি রে একের-পর-এক কথা জিগ্যাইব্যার ধরছে উকিলবাবু। অয় সারা জীবনেও মোট এতগল্যা কথা শুনে নাই। কথায়-কথায় জ্যারবার হইয়্যা শ্যাষে কাঁইন্দতে-কাইন্দতে উকিলবাবু রে কয়—বাবু, খুনড্যাও কইরব আমি আর কথাডাও কব আমি। আগে কইবেন তো! কোন বলদ তাইলে নিজের শাশুড়িরে খুন করার মত হারামের কাম করে? তাও যদি শাশুড়ির মাইয়্যা বাঁইচ্যা থাইকত—
‘আমি কি কইল্যাম মিয়াভাই যে নিজেরে ফাসির আসামি ভাবেন?’
‘কইলেন না মইধ্যা রাইতে যদি কাইলক্যার মিটিঙের কথা স্মরণে আসে, কইবেন ক্যামনে?’
‘সে কথাডা অন্যায্য ঠেকে ক্যা?’
‘হায় আল্লা—মইধ্যরাইতেও যদি স্মরণ হয়, তালি মধ্যরাইতডা হইব কহন? না। আপনে আপনার পেহ্লাদে যান, আমি আমার আড়তে যাই—’
‘না, মিয়াভাই, পাড়ে আইস্যা নৌকা ডুবাইবেন না।’
‘নাও যদি ডুবাইব্যার লাগে তাইলে পাড়ে ডুবাটাই তো পছন্দ ঠেহে। মরার ভয় কম—’
‘না, মিয়াভাই, এডা অযুক্তির কথা। দ্যাহেন, আপনে ছিলেন আপনার ঝড়ি-হাঙ্গামে। আমি আইস্যা ইতিউতি চাইয়্যা নাইমলাম। দুই ভাই মিল্যা সব বুদ্ধি কইরল্যাম। ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কথা হইয়া গেল। স্যায় মিটিং ডাইকলেন। এতডা কাজ আগাইয়্যা আইজ রাইতে দুইজন দুইজায়গায় ঘুমাইয়্যা কাইলক্যার মিটিংডারে খয়রাত কইরব। না, মিয়াভাই, চলেন, আপনার আড়তেই থাহি। আমার পরে তো কুনো ছোঁয়া নাই।’
‘কিন্তু মধ্যরাইতডা মধ্যরাইতেই হবার দিবেন তো?’
‘দিব। দিব। এই কাগজগুল্যা আছে, এই ফাউন্টেন কলম আছে। মধ্যরাইতে কোনো নতুন কথা স্মরণ হইলে কাগজডায় লিখ্যা রাখব, সকালে কথা কব?’
‘হায় আল্লা, আমারে তুমি এডা কী ফিকিরে ফেলাইলা আল্লা? ছিল শুদু কথা। অ্যাহন যোগ হইল কলম। আমার মরণের কী আর বাকি রাইখল্যা, ‘আল্লা’, তারপর যোগেনকে বলে, ‘চলেন মণ্ডলমশায়। মালেক আইছে তার গুরুঠাউররে নিয়্যা। আড়তদার মুরগি খাওয়াইব নিশ্চিত। আর আপনার নীচে তো কুনো ছোঁয়ার দোষ থাকে না’।
