১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১৩৪. সুভাষসহ বরিশালে

১৩৪. সুভাষসহ বরিশালে 

যোগেনের জেতায় সুভাষবাবু বিশেষরকম খুশি হলেন কী না, সেটা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। তাঁকে তো কর্পোরেশনের সবগুলি আসনই নজরে রাখতে হচ্ছিল। অলডারম্যানদের ইলেকশন আছে। তা নিয়ে দল পাকানো চলছে। তার ওপর কংগ্রেসের হেডঅফিসের সঙ্গে প্রতিদিনের যুদ্ধ এটা প্রমাণ করতে যে বাংলায় সুভাষছাড়া কোনো কংগ্রেস নেই ও হবে না। জেতার পর যোগেনের সঙ্গে প্রথম দেখাতে সুভাষবাবু একগাল হেসে বললেন, ‘থাক, আপনাকে বরিশালছাড়া করা গেল।’ 

‘কন কী? এইডা কি নেতার কাম? আমার ভিটামাটি উচ্ছেদ করার বুদ্ধিতে আমারে কইলকাতায় আইন্যা ফেলাইলেন? এহানে তো নিজের বলতে আমার একখান আস্ত ইটও নাই যে শিয়রে দিয়া শুব!’ 

‘আপনাকে বরিশাল থেকে না-তুললে বরিশালে আমি ঢুকব কী করে? বরিশাল পুরোটা তো ভাগ করে নিয়েছেন হকশাহেব, সতীন সেন আর আপনি। যোগেনবাবু, চলুন-না বরিশালটায় দু-চারদিনের জন্য ঘুরে আসি।’ 

‘সে তো আমাগ ভাগ্যি। কিন্তু এহন তো ভোলা হইয়্যা যাইতে হইব—’ 

‘সে যেতে হলে তো অন্তত কিছু রিলিফ নিয়ে যেতে হয়। আপনাদের সেই হাঙ্গামা তো মিটে গেছে। সতীনবাবুকে নিয়ে। রিলিফ কমিটিতে।’ 

‘সে আর হাঙ্গামা কী? আমি কলকাতায় ফিরাই তো বরিশালের সুসন্তানের সন্ধানে বাইর হইল্যাম। আপনাগ আশীর্বাদে ও ঘরজামাইরাখা সম্মানের ঘটনা হওয়ায় বরিশালে এই অভাবড়া একেবারেই নাই। বরিশাল যেমন বাংলার অন্নভাণ্ডার তেমনি সর্বাধিকসংখ্যক স্বর্ণগর্ভারও ভাণ্ডার। কিন্তু আমার বিপদ হল এমন সুসন্তান জোগাড় করা যাকে বর্তমান কুসন্তানগণের কেউ হোগায় কাঠি দিতে পাইরবে না।’ 

‘সে আবার কী? বেশ তো বংশপরিচয় চলছিল, এর মধ্যে আবার কুসন্তান কেন?’

‘কারণ, হিন্দুমহাসভা বরিশালে শিকড় গাইড়ছে।’ 

তারা য্যান সতীনদার মাসিপিসি। সতীনদারে রক্ষার দায়দায়িত্ব সবই তাগ। সতীনদা তো সন্ন্যাসী মানুষ, পিছন দিকে চোখ না মেইল্যা চলেন। ঐ হিন্দুমহাসভাগুলান যদি সতীনদার চেলা বইল্যা নিজেগ প্রচার করে, তাইলে তো সর্বনাশ। সুতরাং আমার এমন একজন বরিশাইল্যা সুসন্তান দরকার যে সতীন সেনরেও জানে, বরিশালরেও জানে, পটুয়াখালি-পোনাবালিয়া জানে, লাউকাঠিও জনে। ব্যস, কইলকাতায় আইস্যাই হাসেম আলি শাহেবকে সমস্ত বৃত্তান্ত কইয়্যা উদ্ধার চাইল্যাম। উনি তো মন্ত্রী। সেডাও বাধা হইব্যার পারে। তো হাসেম আলি শাহেব হাসেম আমি শাহেবের মতই জব দিলেন, আমারে কি সেক্রেটারি বানাইবার চান? আমি কইলাম, হ্যাঁ, যদি না মন্ত্রী হওয়ায় কোনো অসুবিধা না ঘটে। উনি কইলেন—মন্ত্রী হওয়ার লোকের তো অভাব নাই। কেউ হইব। সাইক্লোনে ভোলা ভাইসব আর আমি ভোলায় যাওয়ার পারব না—এ কী হয়? তুমি জানাইয়্যা দ্যাও। আমি দুই-একদিনের মইধ্যে বরিশাল গিয়া সতীনদারে নিয়্যা ভোলায় যাব। আমি কইল্যাম, এতডা দয়াই যদি কইরলেন, আপনার লগে আমারেও নিয়্যা চলেন। আপনারে ভোলায় গস্ত করাইয়্যা আমিও অ্যাহন ভোলা ভুলি। কইব কী, সুভাষবাবু, পরের দিন সাতসকালে ফোন কইর‍্যা কয়, আও, আইজ বরিশাল মেলে। 

‘বাবা আপনিও তো কম কিছু নন। এর মধ্যে বরিশালে করছেন? তাহলে তো আমাকে যেতেই হয়। এত যদি হিন্দুমহাসভা হয়ে থাকে। কবে যাবেন? দু-চারদিনের মধ্যে চলুন। না হলে আমি আবার আটকে যাব।’ 

১৯৪০-এর জুনে সুভাষকে নিয়ে যোগেন রওনা হল বরিশালে পৌঁছুতে। সুভাষের সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন অবাঙালি। তাঁর সঙ্গে সুভাষ হিন্দিতেই কথা বলছিলেন। সুভাষচন্দ্র যে বরিশাল যাচ্ছেন এ-খবর কাগজে বেরিয়েছিল। সুভাষ তখন বাংলার বীর নেতা। রানাঘাট স্টেশনে যুবকরা ভিড় করেছিল—ট্রেন ঢুকতেই তারা স্লোগান দিতে শুরু করে—’বাংলার নেতা সুভাষচন্দ্র জিন্দাবাদ’, ‘বন্দেমাতরম’, ‘জাতীয় কংগ্রেস জিন্দাবাদ’। কমিউনিস্ট ও শ্রমিক আন্দোলনের দৌলতে ‘জিন্দাবাদ’ তখন আন্দোলনের ধ্বনি হয়ে উঠেছে। ট্রেন দাঁড়ালে দরজা খুলে যোগেনই সম্মুখে দাঁড়ালেন। তাকে দেখে আবার ‘ভারতমাতা কী জয়’, ‘সুভাষচন্দ্র বোস জিন্দাবাদ’। 

সুভাষ এসে যোগেনের পেছনে দাঁড়াতেই যোগেন নীচে নেমে যায়। এত মালা সুভাষের দিকে আসতে থাকে যে সুভাষকে অগত্যা ট্রেন থেকে নামতেই হয়। দেখতে-না-দেখতে গলার মালা তাঁর গলা ঢেকে দেয়। তাছাড়াও, অনেকেই হাতে ফুলের তোড়া দিচ্ছিল। স্টেশন মাস্টার তাঁর ইউনিফর্মে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে, আরো দু-জন গ্যাংম্যান, তাঁর সঙ্গে, তাদের পরনে নীল হাফহাতা জামা ও খাকি প্যান্ট এসে সুভাষের সামনে স্যালুট করে দাঁড়ান ও তারপরে নিচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। একজন গ্যাংম্যান একটা বিরাট হাঁড়ি গাড়ির ভিতরে তুলে দেন। সুভাষচন্দ্র হেসে বললেন, ‘এত বড় হাঁড়ি—রেলকোম্পানি তো ভাড়া চাইবে। রানাঘাট কি হাঁড়ির জন্য বিখ্যাত?’ 

‘না স্যার, এখানকার পান্তুয়া খেতে সবাই ভালবাসে।’ 

‘ভালবাসে বলে এই একটা সিন্দুক ভর্তি—?’ 

ইতিমধ্যে ট্রেনছাড়ার ঘণ্টা পড়ল। প্রথম ঘণ্টাটির পর, অনেকগুলি ঘণ্টা বেজে ওঠার আগে যে একটা বিরতি থাকে সেটা যেন একটু বড়ই হল, তারপর ঢং-ঢং-ঢং-ঢং করে বেজে উঠল। কিন্তু ছাড়ার বাঁশি দিল ট্রেন সুভাষবাবু কামরায় ফিরে আবার সমবেত মানুষজনের হাত নাড়াবার পর। যোগেন তার আগেই কামরায় উঠে পড়েছিল—ওঠার সময় সুভাষবাবুর যাতে কোনো অসুবিধে না হয়। 

তাঁর আসনে বসে সুভাষবাবু বললেন, ‘যোগেনবাবু এমন হাঁড়ির ব্যবস্থা আর ক-জায়গায় করে রেখেছেন?’ 

অবাঙালি সেই সঙ্গী এবার ইংরেজিতে যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘সারা বাংলার কি উনি এমনই ভালবাসার মানুষ। ওঁর সঙ্গে ঘোরাটা তো একটা অভিজ্ঞতা। এমন নেতাকে কংগ্রেস কী করে সরিয়ে দিতে পারে? উনি নিজেই তো একটা জাতীয় আন্দোলন।’ তিনি তাঁর পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন, এই জায়গাটার বানান কী?’ 

যোগেন একটু ঠাট্টা মিশিয়ে বলে, ‘আপনার তো আরো অনেক বানান দরকার হবে। যাত্রা শেষে একসঙ্গে সবগুলো করে দেব।’ 

‘উনি দক্ষিণ ইতালির একজন সাংবাদিক—এখানে ঘুরছেন ইতালির রাজনীতি বুঝছেন’, সুভাষ ইংরেজিতেই বলছিলেন, ‘আমাকে যা বলেছেন, তাতে তো উনি খুলনা পর্যন্ত যাবেন, সেখান থেকে ফিরে আসবেন। ওঁর যদি কিছু জানার থাকে, এখন জানিয়ে দেয়াই ভাল।’ 

যোগেন দেখে শাহেব হাতের বিঘৎ দিয়ে হাঁড়ির ব্যাস মাপছেন। যোগেন হেসে বলে, ‘দেয়ার’জ অ্যান ইজিয়ার ওয়ে টু মেজার’। 

শাহেব ‘ইনক্রেডিবল’ বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ‘হাও’ জিজ্ঞাসা করেন ও কোমর ভেঙে খুব মন দিয়ে দেখেন, যোগেন কী করে হাতের এক-এক টানে কলাপাতার ঢাকনা, তার নীচে লাল সালুর ঢাকনা, তার নীচে শালপাতার ঢাকনা—খুলে ফেলছে। শাহেব বেশ ব্যগ্র হয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘প্লী-ই-জ হাউ মেনি লেয়ারস ওয়্যার দেয়ার?’ 

‘থ্রি। টু অব লিভস অ্যান্ড ওয়ান অব পেপার।’ 

‘ইজ ইট ওপেন বাই নাও? দি ইনসাইড?’ 

‘ইয়েস, বাট ফর ইউ ইর্টল বি এ হার্ড ওয়ে, লেট মি সি’, যোগেন দরজা খুলে অ্যাটেনড্যান্টদের কাউকে ডাকে। চোগা-চাপকান-পাগড়িতে বেয়ারা এসে দাঁড়ায়। তাকে যোগেন বরিশাইল্যা ভাষায় বলে, ‘অ্যাডডা চামচ পাওয়া যায় কত্তা?’ লোকটি বেরিয়ে যেতে নিলে যোগেন তাকে পেছন থেকে ডাকে, ‘আরে, খাড়ো, খাড়ো, কত্তা না মিয়া?’ 

লোকটি যোগেনের প্রশ্নের নিহিতার্থ ধরে ফেলে হাসে, একটু অপ্রস্তুত আত্মীয়তার হাসি, ‘মিয়া, কত্তা, শাহেব এই সব তো বাবুরা হয়। আমরা তো দাস। তাগ সেবার। 

যোগেন হেসে ফেলে, ‘এতখান বুদ্ধি নিয়্যা বাবা তুমি বাবুর্চি হইয়্যা থাইকব্যা আর কতদিন। শাহেবরে পান্তুয়া খাওয়াব। একটা লম্বাগোছের হাতা আর একটা বৌল চাই। ছেলেটি ফিরে আসে মাত্রই মিনিট-তিন-চারে। এসে সেই হাঁড়ির সামনে উটকো বসে, হাতাটা দিয়ে ভিতর থেকে একটা পানতোয়া বের করে বৌলে রাখে। বৌলটি প্রায় ভরে যায়। 

‘এ দো একডায়ই দশডা। কড়া তুলি বাবু?’ সে জিজ্ঞাসা করে যোগেনকে। যোগেন শাহেবকে প্রশ্ন করে, ‘দিস ইজ দি হার্ডার ওয়ে টু রিচ ইট। দিস ইজ সুইট। হাউ মেনি ডু ইউ লাইক টু টেক?’ 

‘অল্ দেয়ার অব দি সেম সাইজ?’ 

‘জেনারেলি সো। বাট এ ফিউ মে বি বিগার?’ 

‘অ্যান্ড ইউ আর আসকিং হাউ মেনি আই মে টেক। ইট’স মইনাস-ওয়ান।’ 

‘দেন, প্লিইজ টেক ইয়োর ডিশ অ্যান্ড হেল্প ইয়োর সেলফ উইথ ইয়োর আইস আন আস সি দি কুইকার ইনডিজিনাস ওয়ে?’, বলে যোগেন বাকি সকলকে ডাকে, ‘আসেন, শাহেবরে পান্তুয়া ভক্ষণ দেখাব্যার লাগব।’ তারপর হাঁড়ির ভিতর হাত ঢুকিয়ে পাকা মর্তমান কলা সাইজের পান্তুয়া বের করে মুখের ভিতরে একবারে ফেলে দিল, পুরোটা এক গ্রাসে। শাহেবের হাতে সেই বৌল, হাতে একটা কাঁটা, এখনো ব্যবহৃত হয়নি। সে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। 

পরে সুভাষ বললেন, শাহেব দক্ষিণ ইতালির একটি রাজনৈতিক দৈনিকের সঙ্গে যুক্ত। মুসোলিনির বিরুদ্ধে। ইতালিতে ফ্যাসিস্টদের যারা বিরোধী তারাও এক হতে পারছে না। তাদের বিরোধিতার কারণগুলো কিছুতেই এক হচ্ছে না। এই নানা কারণের মধ্যে কোনো-কোনো দল বা গোষ্ঠী মনে করে গণ-আন্দোলন কখনো ক্যারিসম্যাটিক নেতা ছাড়া তৈরি হয় না সুতরাং মুসোলিনির পালটা কোনো ক্যারিসমা চাই। এই রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাব খুঁজতে উনি নিজের চোখে দেখতে এসেছেন—ভারতের মত একটা বিশাল মহাদেশে গান্ধীজির ক্যারিসমা কীভাবে কাজ করে যে তিনি দরকারে কংগ্রেসদলের নির্বাচিত সভাপতি, তাঁর ক্যারিসমাও কিছু কম নয়, তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারেন। এখন শাহেবেরও তো রাজনীতি আছে। উনি মনে করেন ক্যারিসমা একটি সম্পূর্ণ বানানো জিনিস। সবসময়ই এটা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। শাহেব লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের ছাত্র ছিলেন। সেই সুবাদে ফেবিয়ান সোস্যালিস্ট। ভারতে এসে ওঁর দিব্যজ্ঞান হয়েছে। উনি গ্রামে মফস্বলেও গেছেন। তাতে ওঁর ধারণা হয়েছিল যে ভারতের লোকজনের ক্যারিসমা না-হলে চলে না। অবতারের দেশ। কিন্তু যেটা ওঁর ইয়োরোপীয় অভিজ্ঞতাকে শিকড় শুদ্ধু নাড়িয়ে দিয়েছে, ভারতে এই ক্যারিসমা প্রাথমিকভাবে নেতাদের নিজেদের তৈরি নয়। মুসোলিনির ক্যারিসমা যেমন সুসংগঠিত। গান্ধী, গফফর খাঁ, নরেন্দ্র দেও, এঁদের দেখে উনি বুঝেছেন, এঁরা কেউ ক্যারিসমার ধারেকাছে নেই। জওহরলালকে ওঁর মনে হয়েছে, ওঁর সমর্থকদের সংগঠিত করার দিকে তাঁর যত্ন ও নজর আছে। সুভাষ সম্পর্কেও তেমন কিছু শুনেছিলেন। বড়লোক, গ্রামে-কলকাতায়-কটকে ভূসম্পত্তি আছে, শাহেবপাড়ায় প্রাসাদের মত বাড়ি, আইসিএস ছেড়ে দেশের কাজে এসেছে, চিরকুমার, খুব সুন্দর দেখতে—সুতরাং এ তো অনেকটা ক্যারিসমা নিয়েই বড় হয়েছে, সর্বভারতীয় নেতা হতে তাঁর আরো কিছু জঙ্গি ক্যারিসমা দরকার হতে পারে। কিন্তু বেশ কয়েকদিন নানা পরিস্থিতিতে সুভাষকে দেখে—নিজের রাজনৈতিক দল করার অভ্যেস থেকে উনি টের পেয়েছেন—সুভাষ প্রধানত একজন ফ্যাকশন লিডার, অপারেটার, নিজেকে আড়ালে রেখে কাজটা সম্পন্ন করার মত গোপন মানুষ, ক্যারিসম্যাটিক নেতার ঠিক উলটো। এটা নিশ্চয়ই গান্ধীর মত কিছু নয়। কিন্তু নিশ্চয় গান্ধীর বিকল্প কিছু হতেও পারে, কোনো সংযোগের ফলে, বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে। 

সুভাষ শাহেব সম্পর্কে এই কথাগুলো ইংরেজিতেই বললেন। বলা শেষ হলে, শাহেব দুই হাত ওপরে তুলে বিস্ময় জানিয়ে বললেন, ‘এটা তো আমার টিউটোরিয়্যাল ক্লাশ হয়ে গেল, আমি জানতে পারলাম, ফ্রম বোসেজ সামারি, হোয়াট আই অ্যাম হান্টিং ফর—।’ 

যোগেন বলে—তাহলে আর খুলনা থেকে ফিরবে কেন। আমাদের সঙ্গে চল বরিশাল বাই এ স্টিম বোট ফুল অব পিপল অব অল ভ্যারাইটিজ, ওখানকার মিটিং দেখে আমাদের সঙ্গেই ফিরবেন। 

শাহেব আবার নিজের মনেই কী যেন বলল, মুখটুখ বেঁকিয়ে। বোঝা গেল, শাহেবকে হাওয়া দিয়ে ফোলানো যাবে না। ওর নিজের কাজই ওর একমাত্র বিবেচ্য। 

পথে আরো দুটি-একটি স্টেশনে কিছু-কিছু ‘বাংলার নেতা সুভাষচন্দ্র জয় হোক, জয় হোক ও ‘ভারতমাতাকী জয়’ হয়েছে। রাত সাড়ে এগারটায় এক স্টেশনে সুভাষকে দরজা খুলে দাঁড়াতেও হল কিন্তু সে-স্টেশনে আলো এত কম যে সুভাষকে অভ্যর্থনাকারীরা খুঁজে পাওয়ার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিল। সুভাষ অবিশ্যি দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়াচ্ছিলেন ও শোভাযাত্রাকারীদের দলটাকে একঝলক দেখতে পেলেন, তাদের জয়কার শুনে মনে হল, তারাও সুভাষকে দেখতে পেয়েছে। 

খুলনা স্টেশনে গাড়ি থামার পর, মনে হল, সমবেত মানুষজন যেন সুভাষকে লুট করে নিয়ে যাবে। এমনিই তো খুলনা স্টেশনে লোকের ভিড় বেশি হয়, রাতে। খুলনা থেকেই দূরের মেল বা এক্সপ্রেস স্টিমারগুলি ছাড়তে থাকে। নামেই খুলনা-সাতক্ষীরা, আসলে খুলনা-চাঁদখানি, খুলনা-মাদারিপুর লাইন, তার পাশা লাইন, খুলনা-বরিশাল লাইনে পাটগাড়িতে নেমে নৌকোয় ফরিদপুরের কোটালিপাড়ায় যাওয়ার লাইন, খুলনা-বরিশাল লাইনে হুলার হাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, কচুয়া—পটুয়াখালি লাইনে বাগাবন্দরের ১০ মাইল পুবে বৌফল থানা, উলটো পাড়ে কচুয়া। এই তেঁতুলিয়া নদী ভোলাকে দ্বীপ করে রেখেছে বরিশাল-সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম। এর ওপর আছে খুলনা থেকে লাইন ধরে এক স্টেশনে নেমে অন্য নানা দিকে যাওয়ার সব ছোটখাটো লঞ্চের লাইন। খুলনা মানে রেলপথ শেষ। আর স্টিমারে যদি যেতে হয়, তাহলে তো রাত্রির স্টিমারই সবচেয়ে ভাল। রাতে ঘুম হবে ভাল, নদীর ওপরের হাওয়ায়, বাড়ি থেকে খেয়ে না-এলে স্টিমারের রান্নার তারই আলাদা। একটু আগে বাড়ির ছেলেপুলেদের কাউকে বালিশ আর শতরঞ্চি পাঠালেই হল। ওরা সবচেয়ে ভাল জায়গায় বিছানা পেতে জায়াগার দখল রেখে আসে। 

এরপর আবার শেয়ালদা থেকে ট্রেন আসে-একের-পর-এক। শেয়ালদার দিকে ট্রেনও যায়—একের-পর-এক। ফলে, গরমের সময় বিকেল শুরু হতে-না-হতে বা শীতকালে বিকেল শেষ হতে-না-হতে খুলনা রেল ও স্টিমার স্টেশন তল্লাটটা, পেছনের বাজার সমেত, আলো আর মানুষে ঝলমলে গমগমে হয়ে থাকে। খুলনার এক রসনাম তাই খলনা। শেষে একটা খুব ছোট জ আছে। সেটা গিলে নেয়। খনা মানে উলুঘাসের ছাওয়া ঘর। খুলনা তো রাতের শহর, সবাই জেগে থাকে। তোমার সাথি জুটবেই। সাথিকে নিয়ে নদীপাড়ে একটা উলুঘাসের ঘর তুলে কয়েক প্রহর কাটাও। কোঁক পাখি প্রহর ডেকে দিলে আর থেকো না। দুজন বেরিয়ে দু-পথে চলে যেত। উলুঘাসের ঘর একপ্রহরের বেশি বাঁচে না, বাতাসে মিশে যায় তুলোর মত। 

তবে খুলনা নামের এত রসিক ডাক জানতে হলে তো রসিক হতে হয়। ক-জন আর রসিক হয়? তারা জানে, খুলনা নাকী কোন্ ব্যাপারীর দুয়োরানী। 

মধ্যরাতে খুলনায় স্টেশন থেকে স্টিমারঘাটায় যেতে সুভাষকে নিয়ে এগনে যাচ্ছিল না। ফুলের মালা আর তোড়া নিয়ে যারা এসেছিল এদের নিয়ে তেমন হাঙ্গামা কিছু হল না—তাঁরা অনেকেই প্রবীণ, জিলা কংগ্রেসের সভাপতি, মহকুমা কংগ্রেসের সভাপতি, কংগ্রেস সংখ্যালঘু কমিটির সভাপতিও ছিলেন কেউ-কেউ। অনেকে সঙ্গে মাটির হাঁড়িতে যশোরের বিখ্যাত রসকদম্ব নিয়ে এসেছেন। সুভাষ হাতে করে গ্রহণ করলেন, কেউ তাঁর পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে নিল। মেয়েদের একটা দল এসেছিল। তাঁদের মধ্যে দু-চারজন ছিলেন ছাত্রী, বাকি সকলেই বাড়ির মেয়েরা? রাত্রির খুলনা স্টেশনের আলোও তাঁদের প্রতিদিনের প্রাণান্ত শ্রমের চিহ্ন তাঁদের মুখ থেকে নিঃশেষ মুছে নিতে পারেনি। কিন্তু সুভাষ যখন তাঁদের সম্মুখে করজোড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ালেন আর তাঁদের কেউ-বা সুভাষের কপাল লেপে দিল রক্তচন্দনে, তাঁর পায়ের দুই পাতার ওপরে এঁকে দিলেন বরণচিহ্ন, সুভাষের গলায় ঝুলিয়ে দিলেন বাটিকের এক উত্তরীয়, তার মাঝখানে দুলছে মহাত্মাজির একটা ছোট্ট রঙিন ছবি, অনেক সময় ঢাকা, মোহিনী মিলস ইত্যাদি স্থানীয় মিলের কাপড়ের বান্ডিলে এই ছবি থাকে। মেয়েরা তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গান ধরলেন, 

সুজলাং সুফলাং, মলয়জশীতলাং শস্যশ্যামলা—

এই গানের সমবেত উচ্চারণে ও স্বরের ঐক্যে পুরো স্টেশনের ওপর একটা স্তব্ধতা নেমে এল, যে যেখানে ছিল সে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল, প্রত্যেকেরই হাত জোড়া। যে-আলো এতক্ষণ মনে হচ্ছিল প্রকট সে-আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। মনে হল অকালে সকাল যেন ছড়িয়ে পড়ল আর সকলেই যেন নমস্কার করছে নিজেকে—সামনে আদিগন্ত সমুদ্রের ভিতর থেকে উদীয়মান সূর্যের কিরণরেখায় যেন এই মানুষজন তাদের স্বদেশকে দেখছে ও নিজেদের সেই উদয়কিরণের দীপ্তিতে উজ্জ্বল করে নিচ্ছে। সুভাষ মাথা নুইয়ে গাইছিলেন, 

ত্রিংশ কোটি কণ্ঠ      কলকল নিনাদ করালে 
দ্বিত্রিংশ কোটি ভুজ্যৈ ধৃত খরকরবালে 
অবলা কেন মা এত বলে- 

গানের শেষে সুভাষ যখন তাঁর ভেজা দুই চোখ মেলে মায়াবী এক স্বদেশ ও প্রভাতের দিকে তাকালেন—তখন মনে হল সত্যি ত্রিশ কোটি মানুষের ষাট কোটি হাত তার ললাটে রক্তচন্দন এঁকে দিয়েছে আর একইসঙ্গে সুভাষ তাঁর প্রসারিত দুই হাতে সেই স্বদেশকে গ্রহণ করছেন। এত মানুষ, প্রহর মধ্যরাত, সামনে কিছুদূর পর আলো আর নদীকে স্পষ্ট করছে না, স্টিমারের দোতলায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সুভাষ, যোগেন, সেই শাহেব ও অন্যান্য সঙ্গীরা। মেয়েরা কেউ-কেউ তখনো গাইছিলেন। 

পরিবেশটা খুব গভীরে বদলে গেল। 

কলকাতা থেকে ট্রেনটা যখন এল, তখনো ছিল অভ্যর্থনা। এখন খুলনা থেকে স্টিমারটা যখন ছাড়ল, তখন এটা হয়ে যায় যেন, আমার শ্রেষ্ঠ বীরকে যুদ্ধযাত্রায় এগিয়ে দেয়া। সেই যুদ্ধে ও প্রবাসেও যে এই বিজয় আনতে বিদায়সুর শোনা যাবে সেই সংকেত তৈরি হচ্ছিল—পাড় যখন দেখা যাচ্ছে না, তখনো। সুভাষ রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। 

পরিস্থিতিটা একটু হালকা করতে যোগেন সেই শাহেবকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কী হল শাহেব, তুমি-না খুলনা থেকে ফিরে যাবে? তুমি জানো তো—খুলনা কিন্তু ফেলে যাচ্ছ’। 

শাহেব ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আমি কী করব। আমার পাশ্চাত্য শিক্ষায় ও অভিজ্ঞতায় আমি একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দেখতে এসেছিলাম। খুলনায় দেখলাম, তোমরা এটাকে আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া করে ফেলেছ। এটা তো আমার নতুন হোমওয়ার্ক হয়ে গেল। 

এটা তো স্টিমারঘাটা—আর মধ্যরাতের কাছাকাছিই দূরের লাইনের স্টিমার-লঞ্চ ছাড়ে। যাত্রীছাড়া শুধু মালবাহী গাদাবোটও ছাড়ে—তাদের রুটের যাত্রীলঞ্চ ও স্টিমারের সঙ্গ নিতে। নইলে ডাকাতির ভয় থাকে। তবে, গাদাবোট তো খুব ধীরে-ধীরে এগোয় আর তার থামার জায়গাও বেশি। সঙ্গ দরকার তো ঘণ্টা তিন-চার, রাত ১২টা থেকে একপ্রহরের একটু বেশি। নদীর সকাল সবচেয়ে আগে ফোটে। সেই প্রথম ভোরে ডাকাতদের মুখ চিনে ফেলতে পারে নৌকার মাঝিরা। তাছাড়াও রাত চারটার সময় বা গায়ে গায়ে এমন জলডাকাত পড়লে ধরে নেয়া হয় পাশাপাশি গ্রামের কোনো দলই করেছে, ডাকাতি সেরে ঘরে ফিরে আসতে যাদের সময় লাগতে পারে, বড়জোর আধা ঘণ্টা। ফিরতি-ডাকাতি—একজায়গায় ডাকাতি সেরে ফেরার পথে এক গাদাবোট হাতে পেয়ে লুটে নিল। আর-এক হয়, মিয়াবিবি ডাকাতি। পুলিশ মাঝে-মাঝে জলে চৌকিদারি করে, ডাকাতি ঠেকাতে। অনেক সময় অনেক নদীতে ডাকাতরা একটা আলাদা নৌকোয় চলে পুলিশের লঞ্চের সঙ্গেই। সে-ডাকাতি দিনদুপুরে হলেই-বা ঠেকায় কে? 

ছাড়ার সময়টা রহস্যময়, স্টিমার ছাড়ার সময়ের রহস্য। নানা লঞ্চ, স্টিমার, বড় নৌকো ছাড়ে। মাঝেমধ্যে এক-একটা লঞ্চ বা স্টিমারের সিটি বেজে উঠেই থেমে যায়। এ-সব হচ্ছে জানান-হুইস্ল্। নিয়মিত যাত্রীরা টের পেয়ে যায়—তাদের রুটের নৌকো মজুত আছে। কখন যে ছাড়া হয় টের পাওয়া যায় না। একটু অবাক করে জলের তরল স্রোত জায়গা বদলায়, তারই ফলে জলটা গতিময় হয়ে যায়। 

সুভাষবাবুকে নিয়ে যোগেন, শাহেব, বরিশাল জিলা কংগ্রেসের সভাপতি, সম্পাদক আর আরো কয়েকজন জাহাজের উলটোদিকের রেলিঙের গলিটাতে দাঁড়িয়ে। তাদের সামনে একটা কাঠের দেয়াল। তার ওদিকে স্টিমারের রেস্টুরেন্ট। 

যোগেনই এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। খুলনা স্টেশনের কাণ্ড দেখে যোগেন সাবধান হয়েছে। সারা রাস্তা তো সব ঘাটায় সারা রাত ধরে সংবর্ধনা চলতেই থাকবে। তাদের গ্রাম দিয়ে এত বড় একজন মানুষ পাস করলেন অথচ তাঁকে একটা জয়জোকার দেয়া হল না, বা, তাঁর গলায় একটা মালা পরানো গেল না—এটা তো পুরোগ্রামের অসম্মান 

একটা পরিত্রাণের পথ পেয়ে গিয়েছিল যোগেন। এটাই রটনা ও খবর ছিল যে সুভাষচন্দ্ৰ পূর্ববঙ্গে সফরে বেরচ্ছেন শিডিউল্ড কাস্ট নেতা ও এমএলএ যোগেন মণ্ডলকে সঙ্গে নিয়ে। যোগেন যখন টিকিট ইত্যাদি সব ব্যবস্থার কথা রেল-স্টিমার কর্তৃপক্ষকে জানায় তখন সে রিকিউজেশন করেছিল গন্তব্যের জায়গায় ব্র্যাকেট ভায়া ভোলা লিখে—বরিশাল (ভায়া ভোলা)। দিনে অন্তত একটা লঞ্চ ভোলা ছুঁয়ে বরিশাল যায়। বাকি সব যায় বরিশাল হয়ে ভোলা। তোলায় এই সাইক্লোনের পর সুভাষবাবু ভোলা ছুঁয়ে না-গেলে, তকে সবাই খারাপ কথা বলবে। আগেই যোগেন খবর দিয়ে রেখেছে। দুদু মিয়া লোকজন নিয়ে স্টিমারঘাটায় অপেক্ষা করবে। সেখানেই মিটিং হবে। তারপর আবার জাহাজ ছাড়বে। বরিশাল রুটে যারা সারারাত বিভিন্ন স্টেশনে অপেক্ষা করবে, তারা ভোলা-রুটের স্টিমারে তো আর সুভাষবাবুকে খুঁজবে না। 

সুভাষবাবু বললেন, ‘সবকিছুই কলকাতাকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় বাঙালির সংস্কৃতিতে কিন্তু খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কলকাতায় কত জন মানুষ আছেন, যাঁরা জানেন, বাংলা একটা নদী-বদ্বীপ। অথচ হিশেব যদি করেন, দেখবেন পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যা অনেকটাই বিচিত্র ও বেশি।’ 

‘ঢাকার একটা প্রাধান্য কি নেই?’ যোগেন জিজ্ঞাসা করে। 

‘হ্যাঁ, আছে, বা আলাদা প্রাধান্য একটা হচ্ছিলই। নতুন প্রদেশ হল। সেটা আবার তুলে নেয়া হল। কোনোটাতেই দেশবাসীর মতামত নেয়াই হল না।’ 

‘একে বলে হাঙড়ের কামড়। কামড় যদি বসাতে পারে একবার, তাহলে নিজের হাজার চেষ্টাতেও আর খুলতি পারব না—’, খুলনা থেকে কংগ্রেসের যে নেতা সুভাষের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তিনি বললেন। সুভাষবাবু বললেন, ‘আমার অবিশ্যি কোনো কামড় সম্পর্কেই কোনো অভিজ্ঞতা নেই তবু ছোটবেলা থেকে তো শুনেছি, কচ্ছপ কামড়ালে মেঘ না-ডাকলে ছাড়ে না। ছোটবেলা থেকে আজও এই কথাটা বুঝে উঠতে পারলাম না—কচ্ছপ আর মেঘডাকার সম্পর্কটা কী?’ 

স্টিমার খোলা নদীতে এসে পড়েছিল। হাওয়া বেশি-বেশি করে ভিজে উঠছিল ও তার জোরও বাড়ছিল। এতটাই যে এত কাছাকাছি দাঁড়িয়েও এঁরা পরস্পর কথা বলতে পারছিলেন না। প্রত্যেককেই নিজের ধুতি-পাঞ্জাবি সামলাতে ব্যস্ত হতে হয়। যোগেন বলে সুভাষকে, ‘আপনার পক্ষে কিন্তু এতটা হাওয়া নেয়া ভাল না। চলেন, যে যার কেবিনে যাই।’ 

‘এ হাওয়ায় কি ঠান্ডা লাগে? এত মানুষ খোলা ডেকে যান। তাছাড়া, আমার কিন্তু সি-সিকনেস নেই। সি-সিকনেস সম্পর্কে শুনেছি ওটা নাকি ঢেউয়ের দুলুনির জন্য হয়, যেমন অনেকের এমনকি ট্রেনে চড়লেও হয় বা পাহাড়ে চড়তে বা পাহাড় থেকে নামতেও হয়। এমন হাওয়ায় না কি সেরে যায়।’ 

‘আপনার তো হয় নাই আর হয়ও না। তাইলে সারানোর জইন্যে এই হাওয়া গাওয়ার চিকিৎসারও কাম নাই। চলেন, ক্যাবিনে যাই।’ 

কার কোন্ ক্যাবিন সেসব কাগজপত্র যোগেন তার পকেট থেকে বের করল—ডানদিকের বাঁকটা ঘুরে। সেখানে হাওয়া ঠেকে যাচ্ছে একটা আগাগোড়া লোহার বেড়ায়। কিন্তু যোগেন দেখে, ক্যাবিনের চাইতে লোক বেশি। খুলনা থেকে যাঁরা উঠেছেন, তাঁদের স্লিপ যোগেনের কাছে নেই। সমস্যাটা সুভাষবাবুকে টের পেতে না দিয়ে যোগেন শুধু তাঁর স্লিপটা হাতে রেখে, বাকিগুলো একসঙ্গে পাশের জনকে দিয়ে বলল, ‘আপনারা খুঁইজ্যা ঢুক্যা পড়েন। আমি ওঁকে পৌঁছায়া আসতেছি।’ 

সুভাষের জন্য নির্দিষ্ট ক্যাবিনটা ঐ সারির একেবারে শেষে। দরজা খুলে যোগেন আলো জ্বালালে সুভাষ ঢুকে দেখে বলেন, ‘সত্যিকারের লাইনারগুলোর দুটো ফার্স্টক্লাশ ক্যাবিন জোড়া লাগালেও তো এত বড় হবে না।’

যোগেন সুভাষের বিছানার চাদরটা টানটান করতে-করতে বলে, ‘শাহেবরা তো বড়লোকি করব্যার লগেই এত বড় দেশখান দখল কইরছে। অগ দ্যাশেই যদি এই বড়লোকি পাইত তাইলে সাতসমুদ্দুর উজাইয়্যা খুলনা-বরিশালে আইসব ক্যা?’ 

সুভাষ অন্য কোনো কথা বলার ভঙ্গিতে তার বিছানায় বসে কিন্তু যোগেনের শেষ কথায় তাঁর স্থির করা কথাটা গুলিয়ে যায়, তিনি সেই সরল হাসি হেসে বলেন, ‘এর চাইতে সোজাসুজি ইমপিরিয়্যালইজমের ডেফিনিশন কেউ দিতে পারত না। বার্নার্ড শ-র একটা বই আছে, ‘অ্যান ইনটেলিজেন্ট উইম্যান’স গাইড টু ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড সোস্যালিজম।’ আপনারও একটা বই লেখা উচিত, ‘এ লেম্যানস গাইড’।’ 

‘আমি লিখলে তো ইন্ডিয়ান লইয়ারস ইংলিশ হইব। ইংল্যান্ডেও নিশ্চয়ই বরিশ্যাল আছে। কিন্তু আমি তো বরিশাইল্যা ইংলিশ জানি না।’ 

সুভাষ আরো একচোট হেসে বলেন, ‘বাইরের সি-উইন্ড থেকেও আপনার কথায় অক্সিজেন বেশি। আমি কি আপনাকে ইংরেজিতে লিখতে বলেছি? যেমন করে আপনি কথা বলেন, অবিকল তেমন ভাষাতে লিখবেন। নইলে মজাটা কীসের?’ 

যোগেন সোফার মত একটা আসনে বসে পড়ে, ‘বইয়ের নামডা তো মাথায় খেইল্যা গিছে, ‘অগাগ ডিকসনারি।’

সুভাষ এতটাই হাসতে থাকে যে দুইহাত পেছনে দিয়ে হেলে তাকে হাসি সামলাতে হয়। ‘ওঃ যোগেনবাবু, আপনি একটা লোককে হাসিয়ে মেরে ফেলতে পারেন।’ 

‘আপনার মরণে আমার কোনো হাউস নাই। আপনে অ্যাহন নিদ্রা যান। আমি যাই,’ যোগেন সোফা থেকে উঠে পড়ার ভঙ্গি করতেই সুভাষ বলে ওঠেন, ‘নিদ্রা আসবে কোথ থিক্যা। আলো নিবিয়ে চোখ বুজে শুয়ে পড়লেই তো আপনার কথাগুলি মনে পড়বে আর আরো হাসব একা-একা হাসা কি স্বাস্থ্যকর?’ 

যোগেন চুপ করে থাকে। স্টিমারের চাকার জল কাটার আওয়াজ উঠে এসে রাত্রিটাকে গভীর করে দেয়, হঠাৎ। 

‘আপনারে তো এতডা খালি পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আবার, আপনে চাইরপাশের মানুষ হারাইয়া একলা হইয়া আছেন, সেডাও তো আমার কাছে কোনো শুভদৃশ্য না। আপনে যদি রাজি থাহেন, তাইলে, আমাগ একডা সমস্যা নিয়্যা একডু কথা কবেন?’ 

‘সে কী? আপনার কী এমন সমস্যা হতে পারে যার জন্য এত বড় নদী, এত বেশি রাত্রি ও এতটা নির্জনতা দরকার?’ 

‘কথাডা এড্‌ডু আকস্মিক ঠেকব্যার পারে। আপনে যদি সে-বিষয়ে কিছু ভাইব্যা না থাকেন, আপনে সেডা কয়্যা দিবেন—ভাবি নাই কিছু। যা জানি তেমন কথা আবার শোনার লগে কথাডা আমি তুইলতেছি না।’ 

‘আপনি কী জিজ্ঞাসা করবেন জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি, এখন কিছু বলব না যা আগে ভাবিনি বা ভাবতে হয়নি। কিছু যদি না-ভেবে থাকি, না বলতে পারি তবু বিষয়টা শুনতে চাই। আমারও তো কিছু প্রশ্ন থাকতে পারে।’ 

‘আমি কইতেছিল্যাম, আমাদের, যাগ শিডিউল্ড কাস্ট বইল্যা নতুন নাম হইছে, গান্ধীজি যাগ বলেন হরিজন, মহারাষ্ট্রে কেউ-কেউ বলেন দলিত, জন্ম থিক্যা শুইনতে-শুইনতে আমি ‘চাঁড়াল’ ছাড়া কিছু কইব্যার পারি না, মনে হয়, ‘শূদ্র’ কথাডাই ঠিক।’ 

‘শূদ্রটাই ঠিক মনে হয় কেন আপনার?’ 

‘কারণ, হিন্দুগ যে সমাজবিন্যাস তাতে ‘শূদ্র’ চারবর্ণের এক বর্ণ। চতুর্বর্ণং ময়া সৃষ্টম। শূদ্রেরও নানা ভাগ-উপভাগ আছে। সৎশূদ্র, অতিশূদ্র, পঞ্চম বর্ণও আছে। হিন্দু উত্তরাধিকারের যে স্বীকৃত বিধি ও বিধান তাতেও শূদ্র একটা ক্যাটিগরি হিশাবে গৃহীত। বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু চিন্তা থেকে যে-সমাজশাসিত তাতে ব্রাহ্মণ এই ক্যাটিগরির কোনো বদল হয় না। শূদ্র ক্যাটিগরিরই সব থিক্যা বেশি বদল হয়। সেই বদল ঘটাতে পারেন একমাত্র ব্রাহ্মণরা। টাকাপয়সার জোরে, গায়ের জোরে, ক্ষমতার জোরে শূদ্র থেকে ব্রাহ্মণের মধ্যে যে আরো দুই বর্ণ আছে—বৈশ্য ও ক্ষত্রিয়—সেই মধ্যবর্ণগুলিতে প্রমোশন আদায় করা হইছে। অ্যাহনো হয়। ফলে, কার্যত হিন্দুসমাজের ক্যাটিগরি মাত্র দুইটা—ব্রাহ্মণ আর শূদ্র। আমি শূদ্র কইতেই পছন্দ করি কারণ, এটা একটা স্বীকৃত স্তর। খুব উদারমনা সংস্কারকরা এই পদটিই ব্যবহার কইরছেন। অন্য নামগুলি হয় প্রায়শ্চিত্তসূচক অথবা আইনি—হরিজন, দলিত, শিডিউল্ড কাস্ট। ভারতের মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ উচ্চবৰ্ণ হিন্দু আর ৭৭ শতাংশ শূদ্র। শূদ্রদের বিভাজন করব্যার লগেই শিডিউল্ড কাস্ট বানান হইছে। তাইলে শিডিউলগ নামাইয়্যা আনা যায় ২২ শতাংশে আর কুলীন শূদ্র বা উচ্চবর্ণ শূদ্রগ ধরা যায় ৫৩ শতাংশ। আমি কব্যার চাই—শূদ্রদের ভাগ করা চলে না, শূদ্র শূদ্রই থাকে। 

‘হ্যাঁ। এটা তো বোঝা গেল—নামে যথেষ্ট এসে যায়। এটাও বোঝা গেল যে, যে-নামেই ডাকুক, তার সেই ডাকের পেছনে একই সঙ্গে উদ্দেশ্যও আছে, রাজনীতিও আছে। আমি যদি আপনার নামটিই পছন্দ করি, তাহলে, ব্রাহ্মণবর্ণ ও মধ্যবর্ণের বাইরের চতুর্থ বর্ণ কি শূদ্র বলে পরিচয় দিতে রাজি হবে? থার্টি ওয়ানের সেনসাসে তো হয়নি। ফর্টি ওয়ানেও তো গোলমাল। এমন কোনো আন্দোলন তো কখনো হয়নি যে শূদ্রদের কোনো নতুন ভাগাভাগি করা চলবে না। এমন কি স্থানীয় কোনো আন্দোলনও তো কোথায় হয়েছে বলে জানি না। আপনি অবিশ্যি খবরের কাগজের পোকা। কোথাও দেখেছেন?’ 

‘না। তা হইতেও পারে না। ক্যান? না, সেডা তো কইব্যার পারে এক সেই শূদ্র যার নীচে আর শুদ্দুর নাই। শূদ্রগ একটা লিস্টি টাঙাইয়া দেয়ার পরে যে শুদ্দুরের জাতনাম ঐ লিস্টে নাই কিন্তু তার টাকাপয়সা নামগাম আছে স্যায় তো নিজেরে অশূদ্র বা নন-শিড়ুইল্ড বা সৎচাষী বা নবশাখ এমন সব নতুন জাত বানাইবার পারে। যদি তার নীচে একডা শূদ্রজাত না থাহে, তাইলে একজন উচ্চ জাইত হয় কী কইর‍্যা?’ 

‘আপনি বোধহয় একটা ডায়ালেকটিকসের ইনার ভিতরের ডায়ালেকটিকসের কাছে চলে যাচ্ছেন। পোলিটিক্যাল ইকনমিতে ক্যাপিট্যাল তৈরি করে তার জন্য প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্লাস। সোস্যাল হিস্ট্রিতে দাস তৈরি করে তার প্রভু, নিচু জাত তৈরি করে উঁচু জাত। তাই তো আপনি বললেন, না কী? 

‘আমি ডায়ালেকটিকস জানি না।’ 

‘আমিও কি জানি না কী? কিন্তু আমার ভিতরে যদি প্রশ্ন থাকে, তাহলে অ্যাপলিকেশনটা পড়ে নেয়া যায়। জেলে থাকলে বা বিদেশে থাকলে সুবিধে। তবে ওকালতি আর এমএলএ গিরি করেও কলকাতা শহরেও একা-একা পড়া যায়।’ 

‘আপনে আমার একডা পোস্ট বাদ দিলেন, কাউন্সেলার, ক্যালক্যাটা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন। 

‘দুঃখিত’, সুভাষ বললেন হেসে কিন্তু যোগ করলেন, ‘ভাল কথা মনে করেছেন। কর্পোরেশনের ধাঙড়-মেথররা স্ট্রাইক নোটিশ দিয়েছে। তাদের লিডার এক অদ্ভুত মহিলা। নাম—সাকিনা ফারুক সুলতানা মোয়াজ্জেদা। জন্ম শুনেছি পারস্যে। তাঁর বাবা ছিলেন বিপ্লবী, পারস্যের। ১৯০৫-এ রাশিয়ার প্রথম বিপ্লব ব্যর্থ হল, পারস্যেরও গণতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যর্থ হল। অবধারিত মৃত্যুদণ্ড এড়াতে উনি ঐ একমাত্র মেয়েকে নিয়ে দেশ থেকে পালালেন। পালিয়ে কলকাতায় এলেন। এখান থেকে উর্দু সাপ্তাহিক বের করতেন, ‘হাবুল-এ-মতিন’। বের করতেন কলকাতায় কিন্তু পারস্যের জন্য। প্রতি সপ্তাহে গোপনে সেই পত্রিকা পারস্যে পাঠাতেন। সাকিনা কলকাতাতেই বড় হয়ে উঠতে থাকে। খুব উঁচু পদের এক অফিসারের সঙ্গে বিয়ে হয়। একটা মেয়েও হয়। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারলেন না। সাংসারিক জীবন থেকে বেরিয়ে পড়লেন। কলকাতার ল কলেজ থেকে পাশ করে ক্যালক্যাটা হাইকোর্টের প্রথম মহিলা অ্যাডভোকেট হন। এর আগের কর্পোরেশন ভোটে মুসলমান মেয়েদের রিজার্ভ সিটে ইনডিপেনডেন্ট প্রার্থী হিশেবে জিতে কাউন্সিলার হন। ধীরে-ধীরে ধাউড়-মেথরদের মধ্যে কাজ শুরু করেন। তাঁর সঙ্গী ছিলেন শিবনাথবাবু, মহম্মদ ইসমাইল এঁরা। ফলে পুলিশ তাকে কমিউনিস্টই ভাবত। হতেও পারেন। কিন্তু তিনি লিগ বা কংগ্রেসে ছিলেন না। এই ধাঙড়-মেথর ইউনিয়নের অফিস তাঁর বাড়িতে, মৌললিতে, মিড্‌ল্ রোডে। বিশাল বাড়িতে ধাঙড়-মেথররাই থাকে। ওকে মাতাজি বলে ডাকে। আপনি নিশ্চয়ই ওঁর সঙ্গে দেখা করবেন, কথা বলবেন ও চেষ্টা করবেন এই আন্দোলনটা যে শিডিউল্ড ক্লাসের আন্দোলন, সেটা প্রচার করতে, মাতাজিকেও বোঝাতে, বোধহয় শিবনাথবাবুদের সঙ্গেও একটু কথা বলতে হবে। ওঁদের একটা মত আছে—কাস্ট পলিটিকস ক্লাস-মুভমেন্টের পক্ষে ক্ষতিকর।’ 

যোগেন চুপ করে থেকে হেসে বলে, ‘যাক, মনের মত একটা কাজ জুটল।’

‘কেন? মনের মত কেন?’ 

‘আমি তো আমার প্রশ্নডা অ্যাহনো কইই নাই কিন্তু আপনে তার জব দিয়া দিলেন।’

‘তাহলে প্রশ্নটা বলুন। কোন্ প্রশ্নের জবাব দিলাম, সেটা জানব না?’ 

‘সুভাষবাবু, আপনে যথার্থই বুঝছেন, আমার প্রশ্নটা ছিল শিডিউল্ড ক্লাস মুভমেন্ট নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু এমএ, বিএ পাশ তো আছেন। আমাদের মানে নমশূদ্রদের মধ্যে। উঁচুস্তরের কারো যদি নমশূদ্রদের খুশি করার দরকার হয় ঐ এমএ, বিএরা হাতের কাছেই থাহেন। জিলা বোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটিতে তারাই থাকেন। এই সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ হঠাৎ নমশূদ্র-পরিচয়টাকে দামী কইর‍্যা তুইলল। একডা আইনসভায় তিরিশডা মেম্বার তো কম না, তার মইধ্যে তেরজন আমার জাতভাই। কিন্তু এমন একডা রাজনীতিরে আমাগ জাতের স্বার্থে নিয়া আসার কোনো চিন্তা কী কাম এসব আমাগর অভ্যাসেই নাই। কী করা যায় সেডাই ছিল আমার জিগ্যাইবার।’ 

‘কিন্তু, এ-জবাবটা তো আপনিই তৈরি করলেন আমার কথা থেকে। সে তো করতেই পারেন। তবে আপনার আসল প্রশ্নটি এমন আড়াল করবেন না। ভারতবর্ষের বার-আনি মানুষের মুক্তির সঙ্গে আপনাদের আন্দোলন-সংগঠিত জড়িত। গান্ধীজি ভাবতে পারেন ঐ ৭০ কোটি মত মানুষকে হরিজন বলে হিন্দুমন্দিরে ঢুকতে দিলেই বর্ণভেদজনিত সমস্যা মিটে যাবে। গান্ধীজির মত নেতা এ খবর রাখেন যে তাঁর প্রধান চেলারা কতটাই জাতবাদী। কিন্তু তাঁর মত নেতাও কি এ-খবর রাখতে পারেন—উনি হরিজন বলে ডাকলে, ওঁর প্রধানতম সেনাপতিরা প্রত্যুত্তরে অস্ত্রত্যাগ করতে পারেন?’ 

‘সেই সেনাপতিগরই কাছে গিয়া যদি আমাগ নাম লিখাইতে হয়, নাইলে যদি শুদ্দুরের কোনো সম্মান না জোটে, তাহালি আর সে-সেনাপতির দোষ কী? তার তো নাম লেখানোর দরকার নাই। দরকার তো আপনাগ—নিম্ন জাতির দুই-চারজনের নাম না দিলে, পার্টিটা য্যান ক্যামন ছোড় দ্যাহায়। এইডাই আমার জিজ্ঞাসা–কোন্ হিশাবে আমরা হিন্দু? আমরা উচ্চবর্ণ হিন্দুরই আপনজন? গ্রামে কোথায় কোন্ জাতের লোকজন বাস করে একসঙ্গে, খায়দায় একসঙ্গে, মহোচ্ছবও করে একইসঙ্গে, অষ্টপ্রহর বাড়িতে, দলিজে, হরিলুটে, কীর্তনে? কন্।’ যোগেন কথা বলতে-বলতে নিশ্চিত বোঝে সুভাষবাবু অস্বস্তিতে পড়ছেন। আরো কিছু রাত্রির জল থেকে আওয়াজ উটী আসে ইঞ্জিনের, এই ঘরটায়। সুভাষ বলে বসেন, ‘আপনাদের ন্যাচারাল অ্যালির কথা জিগগেস করবেন তো? 

যোগেন একটু হেসে বলে, ‘কথাডা আপনে ঘুরায়্যা নিলেও তো আমার আপও থাইকবার পারে যে যারে আপনে বা গান্ধীজি ন্যাচারাল কন, সেডা আমরা ন্যাচারেল তো মানিই না, অ্যালি বইল্যাও মানি না।’ 

‘সেটা তো না-মানতেই পারেন। কিন্তু আপনাদের সমাজের মানুষরা মুসলমানদের ন্যাচালে অ্যালি ভেবে নেবে সবাই? মুসলমানের ছোঁয়া খাবে?’ 

‘গান্ধীজি যহন প্রথম কইছিলেন, অহিংস প্রতিবাদ, আইন অমান্য তখন কেউ বিশ্বাস কইরছিল কংগ্রেসের কেউ?’ 

সুভাষ হেসে বলেন, ‘কেউ না। এখনো কেউ না। বিপিন পাল প্যাসিভ রেজিস্টান্সের প্রতিবাদ করে বেশ জ্বালাময়ী বক্তৃতা করতেন। আমার মনে আছে, একটা বক্তৃতায় বলেছিলেন—অহিংস প্রতিরোধ? ননভায়েলেন্ট ননকোঅপারেশন? অহিংস অসহযোগ? এটার মানে কী? নপুংসকের ব্রহ্মচর্য? না কী ভীষ্মকে নিরস্ত্র করতে তাঁর সামনে গিয়ে শিখণ্ডী নৃত্য?’ 

বলতে-বলতে সুভাষ একটু নকল করে ফেলছিলেন, বিপিন পালের বক্তৃতার ঢং।

‘এই ছিল গান্ধীজির পার্টি?’ 

‘যদি আপনি সিক্রেট ব্যালট নিতেন তাহলে দেখতেন যে কংগ্রেসের বেশির ভাগ নেতা ও কর্মী মনে করে, অহিংস থাকার তো খরচা নেই কিছু। খরচা তো সরকারের। তাহলে একটু অহিংসা করলে ক্ষতি কী? মানে, এটা একটা কৌশল তো হতেই পারে। সত্যের খাতিরে এটা বলা উচিত সংখ্যায় কম হলেও শক্তিতে ভক্তিতে গান্ধীজিকে যাঁরা অবতার ভাবেন বা তাঁকে অদ্বিতীয় মনে করেন, তাঁদের কোয়ালিটি কিন্তু অন্য ধাতুর। যেমন, ধরুন, বিনোবা ভাবে, বল্লভভাই, বাদশাহ খান, জওহরলাল, গোবিন্দ বল্লভ পন্থ, মৌলানা আজাদ, রাজেন্দ্ৰ প্ৰসাদ।’

‘গান্ধীজির মত নেতা না পাইলেও এঁরা নিজেগ চিন্তায় শক্তিতে এত বড় নেতা হতেন?’

‘সেটা বলা খুব কঠিন। সি আর দাশ তেমন নেতা ছিলেন। মতিলাল নেহরু ছিলেন। তাঁরা পেরেছিলেন দেশের স্বরাজের বড় ও বহু ডালপাতার বটগাছের নীচে কংগ্রেস ও গান্ধী ও বিপ্লববাদীদের জন্য জায়গা দিতে। এই নেতাদের কারো কারো তেমন ভাবার ও করার ক্ষমতা আছে। কিন্তু এখন তো বটগাছটাই হয়ে গেছে গান্ধী, তার নীচে কিছু-কিছু জায়গা। রাজনৈতিক ইতিহাস যদি কখনো লেখা হয়, তাহলে হয়তো ঘটনাক্রমের এমন ক্রনিকলও তৈরি হতে পারে যে গান্ধীজি এই স্ট্যাটাসটা পেয়েছিলেন ইংরেজদের কাছ থেকে, তাদেরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ১৯২০ থেকে ৩০—গান্ধীজির এই স্বীকৃতি তৈরি হয়েছে—ইংরেজরা তাঁকেই পেয়েছে এমন একজন নেতা যিনি আন্দোলন তৈরি করতে পারেন যেমন অসংখ্য লোককে নিয়ে, তেমনি আন্দোলন সংবরণও করতে পারেন।’ 

‘তাইলে তো খাড়ায় সেই তত্ত্ব যে সুপারম্যান না হইলে কেউ মানুষরে চালনা কইরব্যার পারে না আর-এক সুপারম্যানই পারে মানসের ইচ্ছাডা কী, চায়ডা কী। সবাই তো এক জিনিস চায় না। সুপারম্যান যেডা দ্যায় সেডাকে বেবাকই ভাবে, সে যেডা চাইছিল সেডাই পাইছে।’ 

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই সেঞ্চুরিতেই তো এইটা প্রমাণ হচ্ছে। রাশিয়ার লেনিন, ইতালির মুসোলিনি, জার্মানির হিটলার, আমেরিকার আব্রাহাম লিঙ্কন; আয়ার্ল্যান্ডের ডিভ্যালেরা-সবাই জনসমাবেশ করিয়েছেন, জননেতা, এঁরা কেউ কিন্তু সামরিক নেতা নন।’ 

‘আমি শিডিউল ক্লাস শব্দডা কইতে চাই না। ধরেন, শূদ্র বা নন-ব্রাহ্মণ মাসেস—তারা তো এই কথাডা কইব্যার পারে উইথ ফুল রাইট তে আমরা হিন্দু না- 

‘তাহলে তো বলতে হবে তোমরা কী?’ 

‘এইডা কী কন সুভাষবাবু। খুনের আসামী যদি কয় আমি খুন করি নাই, তাইলে খুনডা কইরল কেডা সেডাও তাইরেই কইতে হব?’ 

সুভাষ একটু হেসে বলেন, ‘সেটা তো ঠিকই। কিন্তু ভারতবর্ষ তো ধর্মপ্রধান রাষ্ট্র আপনি বলতে পারেন, আমি হিন্দু না, যদি আপনার সমাবেশ লম্বাচওড়ায় এমন একটা স্টেটমেন্টকে ধারণ করতে পারে। 

‘সেইডাই আসল কথা। কতডা ছড়ানো জায়গা থিক্যা কত মানুষ কথাডা কয়। নাইলে এই সুযোগে তো সব জায়গায় গুরুদেব আশ্রম তৈরি হবে—যারা কবে আমরা হিন্দু না, আমাগ যাহোক একডা ধর্ম আছে,’ বলে যোগেন একটু বেশি হাসে, ‘সেই কারণেই তো কইল্যাম—শূদ্রগ স্বাভাবিক মিল মুসলমানগ সঙ্গেই বেশি।’ 

‘সে তো আপনার মত। এটার কার্যকর চেহারাটা কী? 

‘মতটা তো আমি আইনসভায় কয়্যা দিচ্ছি ঐ যশোর রায়টের উপর একটা মুলতুবি তুলতে গিয়া। তার মইধ্যে কাজের পার্টও একটু ছিল। ভবিষ্যতে কোনো দাঙ্গায় শুদ্দুররা আর হিন্দু উচ্চবর্ণের হইয়া মুসলমানগ লগে রায়ট কইরবে না।’ 

সুভাষ একটু গম্ভীর হয়ে যান। 

যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনে য্যান কী ভাবেন?’ 

‘হ্যাঁ, ভাবছিলাম, কথাটার মধ্যে সামাজিক ঔচিত্যের দায়টা এড়ানোর পথ খোলা থাকছে না? মুসলমানরা যদি একটা দাঙ্গা বাধায় সেটা ঠেকানো তো সবারই কাজ। মুসলমানদেরও কাজ। তাহলে শূদ্ররা কেন বলবে—আমরা হিন্দু হয়ে রায়ট করব না। দুটো তো আলাদা কাজ আমরা হিন্দু না। যেমন আমরা বলছি আমরা পরাধীন না। আর-একটা হচ্ছে অ্যাকশনের পার্ট। আমরা দাঙ্গা করব না। হিন্দু থেকে। এটা কি কোনো অ্যাকশন প্রোগ্রাম হতে পারে? আপনারা বলতে পারেন—আমরা কোনো দাঙ্গা বাধাব না। আমরা, শূদ্ররা দাঙ্গা ঠেকাব। তাহলে এটা স্লোগানটা পজিটিভ হয়। সারা ভারতের আন্দোলন না হলে, কথাটায় কিন্তু হরাইজেন্টাল জোর আসছে না। একটামাত্র জায়গায় যত গভীর আন্দোলনই হোক্, সেটা দেখাবে লোক্যাল। ধরুন, শিখদের মধ্যেও তো শূদ্র আছে। মারাঠিদের মধ্যেও আছে। 

সুভাষ একটু অন্যরকম হাসেন, একটু দুষ্টুমির হাসি। ‘স্লোগানটায় কিন্তু খুব প্যাঁচ আছে। অল ইনডিয়া মবিলাইজেশনের মেটেরিয়্যাল আছে। তার ওপর গান্ধীজির পজিশন থেকে এটা এত আলাদা কংগ্রেস বা গান্ধীজি এর পালটা কী বলবেন? না, শূদ্রদের রায়ট করতে হবে? এটা মানতেই হবে, এটা খুব ভাল প্যাঁচ, এ ভেরি ক্লেভার মুভ। আপনারা অল ইনিডিয়ায় একটা গোষ্ঠীর স্বীকৃতি পেয়ে যেতে পারেন, যদি সারা দেশের প্রধান জায়গাগুলোতে একই সঙ্গে কথাগুলো তোলা যায়। বিভিন্ন কাস্ট-সংগঠনই তুলল বটে কিন্তু কথা একটাই।’ 

‘বিপদডা তো সেই হানেই। ভারতের স্বাধীনতা লাভে আমি কি শূদ্রের জায়গা চাই, না, আমার নিজের জায়গা চাই? যদি আমার জায়গাই চাই, তাইলে কংগ্রেস হইতেও আপত্ত নাই, হিন্দুমহাসভা হইতেও আপত্ত নাই। মুখে তো কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতা। সেই সুযোগে সব দলই তো নিজেগ দরজা হাট কইর‍্যা রাখছে, শিডিউলগ লাইগ্যা।’ 

‘যোগেনবাবু, সেই কারণেই তো আমাকে সভাপতিপদ থেকে তাড়ানো। আমি কেন বলছি যে সারা দেশ একটা চরম সংগ্রামের জন্য ছটফট করছে। আমি কে সে-কথা বলার? সে-কথা বলতে পারেন একমাত্র গান্ধীজি। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *