১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১২২. মুলাদি

১২২. মুলাদি 

মুলাদি হল একটা বন্দর জায়গা। সব রুটের লঞ্চই মুলাদি ছুঁয়ে যায়। পুবে—ধর্মগঞ্জ নদী দিয়ে চাঁদপুরের লম্বা লঞ্চ লাইন। আবার, দক্ষিণে বরিশাল পর্যন্ত তো আছেই তারও দক্ষিণে বাখের গঞ্জ পটুয়াখালি। মুলাদি থেকে একটু গড়িয়ে রাজগুরু নদীতে ঢুকলে সে-ই পশ্চিমে সাতলায় গিয়ে ঠেকবে। 

মুলাদিতেই জানা যাবে রহস্যা কী? 

লঞ্চ-লাইন সবগুলোই বন্ধ। সে তো দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু সকালের দিকে কি আপ লঞ্চ একটাও আসেনি। বা, খানিক দূর এসে প্যাসেঞ্জারদের নামিয়ে দিয়ে বলেছে, আর যাবে না। তেমন প্যাসেঞ্জারও কি আসেনি সকাল থেকে? পাড়ের প্রায় সব দোকান বন্ধ। একটা দোকান দেখা যায়, যেন চায়ের। ও বোধহয় ঐ দোকানেই শোয়। ঐ দোকানের সামনেই তাও একটা ভিড় আছে। যোগেন সেই দিকেই হাঁটে। হাঁটতে-হাঁটতে ভাবার চেষ্টা করবে, রহস্যাটা কী? জিজ্ঞাসা করবে কী? হাওয়া ক্যান এমন? সে হাওয়ারে জিগান। বরিশালের দিকে যাওয়া যাবে না? এ তো এতখানি চওড়া একডা দুইডা নদী বুক চিতাইয়া রাইখছে—গেলেই যাওন যায়। এই ভিড়ের মধ্যে কি এমন দু-একজন নেই যারা যোগেনকে চেনে ও যোগেনকে প্রশ্ন তৈরির কষ্ট না দিয়ে সব বলে দেবে। কিন্তু এখানে সেই হাওয়া নেই কেন? 

যোগেন একটু দাঁড়িয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। বাঁধল কোথায় নৌকাটা—তাই ঠাহর পায় না যোগেন। মুলাদির মত একটা বন্দর জায়গা যদি এমন ফাঁকা থাকে তাহলে ঠাহর পাবে কী করে? কিন্তু যোগেন মাথা ঘুরিয়ে নজর করেও ঠিকঠাক চিনতে পারে না জায়গাটা। ভাবল, একবার নৌকোয় ফিরে গিয়ে জেনে আসে, কোথায় বেঁধেছে নৌকোটা। 

অবশেষে যোগেন এই পর্যন্ত বুঝতে পারে, না, এটা মুলাদিঘাট না। সে-ঘাটের ভাটির বা উজানের কোনো জায়গা হতে পারে কিন্তু মুলাদিঘাট না। আড়িয়াল খাঁ না-পেরিয়ে মুলাদি? আর, যোগেনকে জিজ্ঞাসা না করে আড়িয়াল খাঁয়ে ঢোকার দম আছে ঐ দুই ছাওয়ালের? কিন্তু নৌকো বাঁইন্ধল কোথায়? সেই হাওয়া নেই কেন? যোগেন আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে। বোঝে না। 

সেই দোকানটার কাছাকাছি হতেই যোগেনকে দেখতে পেয়ে ভিড়টা ভেঙে যোগেনের দিকেই আসে, তারপর যোগেনকে ঘিরেই দোকানটায় ফিরে যায়। ছাই মিয়া হেসে উঠে বলে, ‘কাম দেইখছনি মেম্বারের, দরিয়ার উজান ঝড়ের উপর দিয়া চইল্যা আইসছে উইড়্যা? আপনার কাছে এ-সংবাদ যায় ক্যামনে।’ 

‘কোন্ সংবাদ—সেডা তো অ্যাহনো কইল্যা না?’ 

ছই মিয়াও পাটের পাইকার, বলে, ‘সংবাদ বাদ দ্যান, আপনে এই সকালে মুলাদি আইলেন ক্যা?’ 

‘আইছি তো? সাক্ষী দিবা তো? সব থিক্যা আগে আইছে মণ্ডল—’ 

‘সে তো দিবই। কিন্তু মামলাডা জাইনলে তো সাক্ষী। মামলাডা কী?’ 

‘আরে, মক্কেল শুধ্যায় মোক্তাররে আমার মামলাডা কী? মোক্তার জাইনব ক্যামনে? মোক্তার তো জানে কোন ধারার মামলা—৩০২ না ৩০৪ না ৩০৭–জামিন পাবি কীসে। মোক্তার জাইনাব ক্যামনে তুই তোর বৌরে কাটছিস না কলাবৌরে কাটছিস?’ 

‘সে-কথা তো আছেই। আমি জিগ্যাই এই ভোলার মামলা কি হইতে-না-হইতেই হাইকোর্টে উইঠল? নাইলে আপনে জাইলেন ক্যামনে। একেবারে পক্ষীর নাগাল, যাও পক্ষী তার লগে— 

শুনা শেখ হঠাৎ রেগে ওঠে। হঠাৎও নয়, রাগও নয়। এটাই তার কথা—বলার স্বাভাবিক স্বর। বা, সে রাগ না করলে কথা বেরয় না ও হঠাৎ ছাড়া তার রাগ হয় না। 

‘তোর পুঙ্গির ভাইয়ের কথা থামাবি ছাই মিয়া। আরে, এই বিপদের মইধ্যে এত বড় মানুষড়া নিজে হাঁইট্যা-হাঁইট্যা আয়্যা পাশে খাড়াইছে আর তার লগে দ্যানমৌরের দরাদরি করিস য্যান পাচতালাকের বিধিরে ঘরে তুইলব্যার মামলা ধইরছিস—’ 

যোগেন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘বিপদড়া কী, তা কি কইব্যা কেউ? না কী, কুনো বিপদ নাই, ও নিজেই আপনারে গিল্যা নিব, আপনারে কুনো চেষ্টা কইরব্যারই লাইগব না, পিছলাইয়্যা যাইবেন বইল্যা আমারে কুমিরের হাঁয়ে, ঢুকাইয়্যা দিব্যা। কাইল শেষব্যালা থিক্যা আইজ এই ঘড়ি পর্যন্ত প্রথম ব্যালা কাইট্যা গেল, জিগায়্যা গলাখান দুই চিত্তির বাড়ির ঘরের চাল শ্যাষ রাইত থিক্যা প্রসব বেদনার হিক্কা তুল্যা আর এইহানে নদীতীরে বইস্যা-বইস্যা য্যান কুলীন-বাউনের পাঠান নাপিত, বামুনের শ্বশুরবাড়ি আইস্যা কুলীনের বিয়াতী মাইয়ার একদিনের বার সাইজ্যা পাছার দাদ চুলকাই— ব্যার ধরছে। একডাও উদ্যা কথা কইবা না। কও। ব্যাপারডা কী?’

নজর আলি একটু আড়ালে ছিল। হয়ত এই ব্যাপার বলার কাজটা তার ওপরই চাপাল সবাই—চোখের ঠারেঠুরে, আঙুলের খোঁচায় 

‘আপনে কি কিছু শুইন্যা আইছেন? আইস্যা কিছু শুইনছেন?’ শান্ত গলায় নজর আলি জিজ্ঞাসা করে।’ 

‘মনে নেন কি আমার কান ছিল না, শুনি নাই। চোখ ছিল না, দেখি নাই।’ 

কেউ একজন টিপ্পনী কাটে, ‘আতুড় কাইটছে তো?’ 

নজর আলি বলে, ‘না-গুইন্যা কওয়া যায়, চার-পাঁচ রাত্তির আগের থিক্যা এই বাও দিছে। য্যান এইডার কুনো নামানও নাই, থামানও নাই। না-গুইন্যা কওয়া যায়, তিন-চার ফজিরের আগের ফজিরে শুনা গেল, দক্ষিণ সাহাবাজ পুর আর তেঁতুলিয়া নদী, পুব আর পশ্চিম থিক্যা নদীর তলা দিয়্যা সিঙ্গ কাইট্যা উত্তর-ভোলাবে নদীবক্ষ হইতে বেবাক উখরাইয়া ফেলাইয়া দিছে—’  

‘ফ্যালাইল কুথায়। নদী-বাড়ি-গাছপালা-খাল-বিল লইয়্যা উত্তর-ভোলা তো জায়গা কম না। নদী নিজে খাইলে খাইত। কিন্তু উখরাইলে উখরাইল কোন্ পাকে? উখরান-ভোলার দক্ষিণ সীমা কী?’

‘দৌলতখানের নাম শুনা গিছে প্রথম-প্রথম, এখন আর যায় না—’ 

‘অ্যাহন কি নতুন নাম শুনা যায়?’ 

‘চাঁদপুর-রাজাপুর।’ 

‘কোন্ চাঁদপুর?’ 

‘গণেশপুরা দোনের উত্তরে।’ 

‘মানুষজন সব ভাইস্যা গিছে না সবব্যার পারছে?’ 

‘মনে হয় না কেউ বাঁচা’ আছে। এখানে তো একজনেরও দেখি নাই।’ ঠাট্টা করে উঠল ছাই মিয়া, ‘দ্যাহন তো ক্যামন কথা। মানুষ ভাসে উত্তর ভোলায় আর মুল্যাদির মাতবর্ পা নাচাইয়্যা কয়, এদিগে তো আসে নাই। আইসব কেমন কইরা? সাগর যেহানে ভাসাইয়া লিব সেইহানে তো যাইব। মুল্যাদিতে যে আসে নাই, তাতে এইটুকু তো বোঝা যাইবার পারে, হয়ত মেহদিগঞ্জ ডোবে নাই।’ 

যোগেন ছাই মিয়াকে সমর্থন করে, ‘সেডা তো ঠিকই। এইডা তো মুল্যাদি না।’

‘মুল্যাদিই, এডডু উত্তরে। আপনে তো নৌকায় আইছেন’। 

‘হ্যাঁ। সে তো দুই ছ্যামড়া টানে।’ 

‘ছ্যামড়াগ বুদ্ধিজ্ঞান তো বুড়া মাঝি থিক্যা পাকা। এই হানে নৌকা বাঁইনধছে।’

‘আমি তো ঘুমায়্যাছিল্যাম। ওরা কী করছে, জানি না।’ 

‘শুনেন। এইডা চাইর পাকে আড়িয়াল খাঁয়ে বাঁধা। আপনার মাঝি আড়িয়াল খাঁরে এড়াইয়া-এড়াইয়া এই খাঁড়িডাতে নৌকা ভিড়াইয়্যা আপনারে ডাইকছে। অ্যাহন তো আর এড়াইনা যাবে না। তালি করবডা কী?’ 

‘তাইলে আমার কর্তব্যডা কী? এইটুকু জাইনল্যাম উত্তরভোলা ডুবছে। এইটুকুও বুইঝল্যাম—মানুষজনের কী হইছে সে-বিষয়ে তোমাগ কোনো খবর নাই। এইবার কও আমারে নিয়্যা তোয়াগ পরামর্শ কী? এতক্ষণ তো ঘুমাইয়্যা আসছি। অ্যাহনো ঘুমাইয়্যা ভাইসব যদ্দুর যাওয়া যায় ভোলার দিকে? যদি আগাইব্যার না পারি, পিছায়্যা আইসব।’ 

‘যাইব্যার তো একডাই পথ আড়িয়াল খাঁ ধইর‍্যা। এই বাতাস। জলে তো পিছ্যা কইলেই পিছান যায় না। আপনার তো কইলেন দুই ছ্যামড়া মাঝি। এই বাতাসখ্যাপা নদী। কুনো মানুষরে কওয়া যায়—তুই যা, এরই মইধ্যে যা?’ নজর আলি একটু আড়ালে চলে যায়, সে এই সিদ্ধান্তের ভাগিদার হতে চায় না।’ 

শুনা শেখ আবার রেগে ওঠে, ‘দ্যাহেন, দ্যাহেন মেম্বারসাহেব আপনার মানুষজন ক্যামন বামুনগ নাগাল কথা কয়। য্যাগ আপনে কালীবাড়ির পুরুতঠাকুররে স্যাবা দিয়্যা জিগ্যাব্যার ধইরছেন, ঠাউরমশায়, ঐ চতুমারানির আমি চুত মাইরতে চাই, সেইডা ঠিক হইব না ভুল হইব?’ এমন আচমকা বলে শুনা শেখ যে সকলেই হেসে ওঠে। শুনা শেখের কথা তখনো শেষ হয়নি, ‘পয়লা কথা এই যে আমরা এতগুল্যা হোগামারানি এইখানে, জলেই যাগ বসবাস, ত্যাগ মইদ্যে একজনও হোগামারানি আছে যে কইব এমন দুর্যোগে নদী পার হওয়া অসম্ভব?’ 

‘এই শুনা শেখ, কইব্যার চাও কী, নদীপারান যায়ই?—’

নজর আলি গলা তুলে বলে, ‘কইল্যাম তো অসম্ভব, কথা বুঝো না সব পিরশাহেব?’ 

‘অসম্ভবডা কী? নদীপারান নাকি নাপারান’, ছবি মিয়ার প্রশ্ন শুনেই যোগেন হেসে ফেলে বলে, ‘শুনা। সম্ভবড়া কী, সেইডা বলো। চারদিক, দশদিক ভাইব্যা বলো।’ 

‘ভাবব কী দিয়া? যাহার মইধ্যে তো দুইখান অঙ্গ, চ্যাট আর প্যাট। আর ভাইবব্যার কন চাইরদিক আর দশদিক। সেই দুইডা দিয়্যা তো পারান যায়। ভাবান যায় না।’ 

‘এই না—কইলি নদী পারান অসম্ভব?’ ছবি আঙুল তোলে। 

‘কইল্যাম—এই এতগুলা হোগামারানির মইধ্যে কেউ কি আছে যে কইছে নদী পারান যাবে না। যাবে কি যাবে না, নদীতে না-ভাইস্যা সেটা কওয়া যায়? তুই য্যান আবার নামাজ পড়ব্যার যাইস না রে ছবি—মৌলবির সব জোবান গুল্যাইয়্যা যাব।’ 

‘শুনেন। ভোলা তো আমার ভোটের এলাকার মইধ্যে। তাই এইডা আমার কাজ-বিপদের সময় গিয়া দাঁড়ান। তাছাড়া, আমি এডডু চক্ষে দেইখলে তো আইনসভায়, মন্ত্রীগ, লাটশাহেবকে, নেতাগ কইব্যার পারব, বরিশালের জিলা ম্যাজিস্ট্রেটরে কইব্যার পারব—ক্ষতি কতডা, কষ্ট কতডা। নিজের চক্ষে দেখার তো দাম আলাদা। তার উপর ভোলার মানুষ যহন শুইনব আমি মুল্যাদি পর্যন্ত আইসছি, ভোলা পর্যন্ত যাই নাই—তাইলে তারা তো চইট্যা যাইবে গা। আমি মৈস্তারকান্দির বাড়ি থিক্যা খালপাড়ে আইস্যা আর বাড়ি ফিরি নাই। নৌকা নিয়া বাইরাছি। বাইরাছি যহন, আমার না-যাওয়ার কুনো উপায় নাই। আগাইয়া দেহি। আগাইতে না পাইরলে ফিরা আইসব।’ 

‘তার আগে তো আপনার নাওডারে দেখা লাগে,’ ওরা সকলে মিলে নৌকোর দিকে এগয়।

যোগেন জিগগেস করে, ‘তোমরা এই পর্যন্ত শুইনছ যে তেঁতুলিয়া আর দক্ষিণ শাহবাজপুর মিল্যা উত্তর ভোলারে ডুবাইছে, দৌলতখান পর্যন্ত—’ 

‘এত ঠিকঠাক ধইরবেন না। আমরা শুনেছি দক্ষিণ শাহাবাজপুর আর তেঁতুলিয়ার কথা, দৌলতখানের কথাও শুইনছি, কিন্তু দুই-একবার। এর বেশি কিছু দেখিও নাই, শুনিও নাই।’ 

‘তেঁতুলিয়া আর মেঘনা—’

‘মেঘনা না। দক্ষিণ শাহাবাজপুর।’ 

‘তোর যহন লোম উঠে নাই তহন ছিল আলাদা থানা-শাহাবাজপুর, নদীও শাহাবাজপুর। তারপর জিলা যখন ফারাক, হইল তহন নামডা থাইক্যা গেল দক্ষিণ শাহাবাজপুর বইল্যা। মেঘনাটা? 

যোগেনের নৌকো ও মাঝি দেখে এতক্ষণ এত কথার পর যোগেনই নিরুৎসাহ হয়ে যায়। এই ফাঁকটায় যে হাওয়াটা নেই, তার ফলে নানারকম সহজ সমাধান সম্ভব মনে হয়। নজর আলি বলে, ‘ছোট ছিপের একডা সুবিধা ডুইব্যা গেলে সোজা কইর‍্যা নেয়া যায়। কিন্তু হাল তো লাগে একডা। নাইলে তো এই হাওয়ায় নাও সোজা রাখা যাবে নে না।’ 

নজর আলির কথার ওপরে এ নিয়ে আর কথা চলে না। ফলে নৌকো দেখে হাসাহাসিটা বন্ধ হয়ে গেল। ছোট মাঝি পায়ে-পায়ে উঠে এসে যোগেনকে বলে, ‘আপনে কি অন্য নৌকা নিবেন? নিবেন না। আমরা পারব।’ 

এর মধ্যে কাউকে পাঠানো হয়েছিল, সে এই ছিপনৌকার মাপের এক হাল কোথাও থেকে নিয়ে এল। 

চলো তো। তুমি তো পারবা, তোমার নৌকা নি পারবে? চলো, দেহি,’ যোগেন পাড়ের ঢাল বেয়ে এগায়। ছোটমাসি আর ছ্যামড়া মাঝি খালের জলে নেমে নৌকোটাকে ওদিক থেকে ঠেলে আর পাড়ের দিকে টানে। নৌকো দেখার মানে যে এরা জানে—এটাই যোগেনকে আশ্বস্ত করে দেয়। কিন্তু জানা দিয়ে তো আর বাঁচা যায় না। 

খানিকটা ডাঙায় টানা নৌকোটার ওপর ওঠে যোগেন-পেছনে নজর আলি। 

মায়ের পেট থেকে পড়েই যাদের বাপের কামের দিকে হাত বাড়াতে হয়—সে লাঙলই হোক আর বৈঠাই হোক, জালই হোক আর শুকনা লবণ বানানোই হোক—তারা জন্মকাল থেকেই সেই কামের বা পেশার দড় বুঝে যায়। মৈস্তারকান্দির মণ্ডলবাড়ির ছেলে আর দউদাখানের নজর আলি যখন নৌকা দেখতে নামে—তুফান পাড়ি দেয়ার আগে—তখন তাগ সাহায্য করার কুনো উপায় নাই –চেঁচামেচি কমান্ ছাড়া। ভিড়টাই একটু সরে যায়, যদিও ওরা ঘাটে নামেই নি। 

কী দেখে যে এই নৌকোর সঙ্গে আড়িয়াল খাঁর তুফানের বিচার করে দুজন?

যোগেন মণ্ডল নিচু হয়ে দেখে পেটে জল জমে আছে কতটা—এই চার-পাঁচ ঘণ্টায় জল খাল থেকে ভেতরে এসেছে কতটা—সেটা সামান্যই, যদি-না দুই ছ্যামড়া এর মধ্যে ছিচ্যায়্যা থাকে। জল ছিঁচিয়েছে কী না দেখতে একবার নৌকার ভিতর-গা, পাটাতন আর কিনারে চোখ বোলালেই জানা হয়ে যায়। না। নৌকার তলা শক্ত। সেদিক থেকে কোনো বিপদ-আপদ নেই। 

নজর আলি গলুইয়ের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে মাথা ঝুঁলিয়ে দেখতে চায়—গলুইটা যে তলার কাঠ হয়ে নেমে গেছে তাতে আঙুল বুলালে, আঙুলে লাগে কী না। নজর আলির কড়া-পড়া আঙুলে সেটুকু খোঁচাখুঁচি বোঝা যায় না। তুফানের মধ্যে দুই গলুইয়ের ওপর এতটা বেশি চাপা পড়ে—সঙ্গে-সঙ্গে অবিশ্যি সরেও যায়—যে জোড় কাবু হইলে নৌকা ফাঁক হইয়্যা যাবে নে—য্যান কুড়াল দিয়্যা ফাড়া হইল নৌকাখান। এদিকে নজর থাকে কম। 

নজর আলি নৌকোর গল্পই জড়িয়ে নীচে নেমে, নৌকোর তলার দিকে যায়। অতটা ওপরে তো জলের থাবড়া পড়ে, দাঁত তো পড়ে এইখানে, কুমিরের দাঁত, দুই সারিতে একশডা পাটির দরোজা, পাতালের। সেই রাবণের দরজায় যদি খিল শক্ত থাকে, তাহলে নৌকো থেকে কোনো ভয় নেই। 

নাজির আলি হালটা চায়। 

হালটা নৌকোর সঙ্গে কোণ মিলিয়ে একটু দেখে! 

তারপর, ‘এই শুনা’, ডাকে। 

শুনা লাফিয়ে কাছে আসে। নাজির আলি নৌকোর তলা থেকে খুব ঠান্ডা গলায় বলে, ‘হালডা বাইন্ধ। ধইর‍্যা যাহি—’ 

শুনাকে লাফ দিয়ে আবার উঠে নারকেলদড়ির খোঁজ করতে হয়। কাউকে বলেও হয়ত, কেউ কিছু হদিশও দেয় হয়ত, বা, শুনার নিজেরই জানা আছে। শূন্য পথের ওপর দিয়ে সে ছুটে যায়। ফিরেও আসে প্রায় ছুটেই, কিন্তু কাঁধে নারকেলদড়ির পাহাড়ে, তাই পুরো ছুটে নয়। 

নাজির আলি হালের কোণটা মাপমত ধরে বসেই ছিল, ছেড়ে দিলে পাচ্ছে কোণের মাপটা ভুলে যায়, বা বেঠিক হয়ে যায়। সে শুনাকে বলে, ‘আলগা দিস ন্যা, শক্ত কইরা দিস, য্যান, বাঁয়ে-ডানে একবিঘৎ-একবিঘৎ কইরা ঘুইরব্যার পারে। তার বেশি না।’ 

কাঁধে নারকেলদড়ির বান্ডিল, দুই হাতেও গুছি, শুনা শেখ কেমন উদাস হয়ে খালের উজানে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছু মনে করতে, বা, যেন কোনো জানা কথা ভুলে যেতে। 

‘কী রে বান্ধ্যা ধরছিস?’ নাজির আলি বলে। 

‘না। এইডারে তো ভাসাইবেন তুফানে? 

‘চা লা ই ল্যা ম—’ 

‘এইডার হাল নাই ক্যা?’ 

‘চালায় তো লগি ঠেইল্যা, খালে। হালের কামডা কী? মিছামিছি হাল বাইন্ধ্যা ঘুইরব ক্যা?’

‘বড় ভাসানে তো লাইগব্যার পারে।’ 

‘পারে। তহন বাইন্ধব। বাইন্ধতেছি অ্যাহন।’ 

‘বাইন্ধেন ক্যা? না। তুফানের জল য্যান পথ থিক্যা সরাইব্যার না পারে।’ বলতে-বলতে ভাবছিল শুনা শেখ, ‘ধরেন, কোষা নৌকা কি ভারী নৌকা, ভারী হালের নৌকার তো নিজের ওজন আছে। জলের ধাক্কায় সেডারে আর কদ্দূর ঘুরাবে। আর যদি ঘুরাব্যার পারে জল, তাইলে তো নৌকা উলট্যায়্যা যাবে নে। সেডা তো হাল ঠেকাবার পাইরব না। তাই হালডারে এডডু শক্ত কইর‍্যা দিলেন। কিন্তু এই ছিপের কাম দিশা ঠিক রাহা। এমন একডা কলার মোচারে নিয়্যা তো বাতাসে-জলে লোফালুফি চইলব। ওর হাল শক্ত বাইন্ধলে অয় পালাইব কোথ দিয়্যা?’ 

শুনা শেখ গলুইয়ের ওপরে আকাশে দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে। নজর আলি গলুইয়ের নীচে হালের কোণ ধরে ভেজা মাটির দিকে তাকিয়ে, যেন বরশির চার বের করছে মাটি খুঁড়ে। আলাপটা চলছে—এমন স্বরে যে নিজেরাও নিজেদের কথা শুনতে পায় না বটে, কিন্তু একে অন্যের কথার ছাড়া-ধরা মিলিয়ে সবটা শুনতে পায়। 

দুইজনের কথায় কোনো মিল নেই। 

কোথাও একটা মিল ঘটাতে না পারলে হাল বাঁধা হবে না। দুইজনেই এখন এইরকম নৌকায় একা-একা আড়িয়াল খাঁ বা তেঁতুলিয়া পাড়ি দিচ্ছে, আর পরের বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। 

‘হাল ঘুরাইয়া যে নাওরে পলাইতে হয়, সে-নাও তো পলাইবার লগেই ঘুইরব, তার তো আর যাওন নাই,’ নাজিব আলি খুক করে হাসে। 

শানু শেখ খুক করে হাসতে পারে না। সে যেন পাখি তাড়াচ্ছে, এমন একটা আওয়াজ দিয়ে বলে, ‘হাল ঘুরাইয়্যাও যে নাওয়ের পলানো নাই, তার তো মরণ ছাড়া যাওনও-নাই। খুইল্যা রাইখ্যা মরণ, না, বাইন্ধ্যা রাইখ্যা মরণ?’ 

অনেকক্ষণ কোনো কথা হয় না! 

ঢালের মাঝামাঝি যোগেন তার দুই ছ্যামড়া মাঝির সঙ্গে। ঢালের ওপরে সেই ভিড়টাও আলগা-গিঁটের পাটের গোছার মত। দুই-একজন এদিকওদিক বিড়ি টানছে। গলুইয়ে খাড়া শানু, কাঁধে দড়ির পাঁজা। গলুইয়ের নীচে নজর আলি-নৌকোর ফুটোফাটা সামলাতে যেন হাতে ডলে গাব পাকাচ্ছে। 

‘এডা তো চলা-নৌকায় বজ্রপাত না, য্যান বাঁচার কোনো উপায় নাই। বারাইছিল্যাম খটখটা রোদ্দুরে, দেওয়া নাই, দায়ি নাই, কোথাথিক্যা আয়্যা পইড়ল ম্যাম ভিতরে নিয়্যা আগুন। বজ্ৰপাত আর বৃষ্টি—একই সঙ্গে। এমন কাণ্ডও তো ঘটে, সমুদ্রের জলে আগুনে পুইড়া গেল নৌকা এক হাতে জল ছিটাইলেও সে-আগুন নিব্যা যায়। নৌকা ডুবাইয়্যা দিলেও সে-আগুন নিব্যা যায়। সে আগুন থিক্যা কুনো মাঝিরই বাঁচা নাই। কিন্তু এইডা তো তেমন যাত্রাই না। যা বিপদ আছে, তার একশগুণ বিপদ বাড়ানো হইছে। কত জায়গা মুখের কথায় ভাইস্যা গিছে। আলগা দুই-একটা নাম শোনা গিছে। শ-মাইনষের মুহে মুহে দুইডা নাম হইয়া গিছে পাঁচশ নাম। ভোলা নাই। দক্ষিণ সাহাবাজপুর নাই। দৌলত খাঁ নাই। এতখান ‘না’-য়ের আগে জাইন্যা যে-যাত্রার শুরু সেডার সরহদ্দ তো জানা। গণেশপুরা দোনা, মাছকাটা নদী, লতা নদী, নয়াভাং গিনিয়া নদী—এই পথে যড়া যাইব্যার পারব, যাইব। যড়া পাই না, ফিরা আইসব। হাল ঢিল্যা না দিলে তো মাঝিগ ঘাম হালেই খাব।’ 

শনু শেখ মনে-মনে একবার এই পথটা দেখে নেয়। 

মনেমনেই তাকে স্বীকার করতে হয়, ভাইবছে ভাল। 

এখন আর এই পথটাকে বাঁধভাঙা আড়িয়াল খাঁ কী মেঘনা মনে হয় না। 

‘লতা নদীতে ঢুইকব কোথায়?’ 

‘এহান থিক্যা নয়া ভাঙ্গানি দিয়্যা, ভাসানচরের তল্যা দিয়্যা যাউক। তারপরে অবস্থা বুইঝ্যা ব্যবস্থা। লতা দিয়্যা উজানে উইঠ্যা মাছকাটা দিয়্যা রাইবতে পারে। তবু, অদ্দূর যাইব্যার ভরসা নাই। যেটুক গ্যাল, সেটুকই লাভ।’ 

‘তাইলে হাল ব্যক্তি?’ 

‘বাইন্ধতেই তো কই?’ 

‘দুই দিক মিল্যা একহাত কোণ?’ 

‘আলাদা কইর‍্যা মাপো। একবিঘৎ-একবিঘৎ। বান্ধার পর একবার ঘুরাইয়া দ্যাখব্যার লাগবো পাখনাও একবিঘৎ কইর‍্যা কোণ মারে না কী? তুই যাবি তো লগে?’ 

শানু শেখ বাঁধতে-বাঁধতে জিজ্ঞাসা করে, ‘আর কেডা’ 

‘কেউ না। আমরা পারব। না-হয় তো নৌকা নিয়্যা ফিরত যাব। আপনারা নতুন নৌকা, নতুন মাঝি দিয়্যা মেম্বারের নতুন নদী পারাইয়্যা দ্যান।’ 

প্রায় চমকেই তাকায় শানু শেখ আর নজর আলি। তাদের ধারণাতেই ছিল না—তারা ছাড়া আর মগুল ছাড়া আর কেউ আছে। ছোটমাঝি তার কথাটা বলে বাঁ হাতে গামছা দিয়ে ওপরের ঠোঁটের ঘাম মোছে। তার সঙ্গী দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে পায়ের আঙুল দিয়ে মাটি খোঁড়ে। 

নজর আলি বলে, ‘বাবা, তোমরা নিচ্চয়ই পারবা। এতখানি আইছ এত বুদ্ধি খাটাইয়া নতুন-নতুন পথ দিয়্যা। কিন্তু এ তো বাবা সমুদ্রযাত্রা। এ তো শিক্ষা লাগে। তোমরা লগে যাহ, শিখো, এই হান থিক্যা দুই মাঝি যাউক।’ 

যোগেন ব্যাপারটা বোধহয় আঁচ করতে পেরেছিল—নিজের দিক থেকেই। এরা সব ওস্তাদ মাঝির দল এত আয়োজন, বাঁধাবাঁধি করছে দেখে তার অনেক আগেই মনে হয়েছে—এই নৌকো নিয়ে প্রলয়ের নদী পাড়ি দেয়া কি সম্ভব? সম্ভব হলেও কি ঠিক? কিন্তু এরা তো কেউ একবারও বলল না—যাবেন না। একথাও বলল না—এই ছ্যামড়াগুল্যার কাম না। নতুন কোনো নৌকো নিয়ে এসেও বলল না—চলেন, আপনারে নামাইয়্যা আসি। যোগেন ঠিক করার আগেই যেন এরা যোগেনকে নৌকোয় তুলে দিচ্ছে—ঠিক এতটাই ভাবেনি যোগেন, কাছাকাছি পর্যন্ত ভেবেছে। নজর আলি আর শানু শেখের সঙ্গে তার মাঝিদের কথা হচ্ছে দেখে সে এগিয়ে আসে। 

গলুইয়ের মাথায় হালটাকে নারকেলদড়ির প্যাচে শরীরের সব জোর দিয়ে বাঁধতে শানু শেখের মুখ মুখটা বেঁকে গিয়েছিল। যোগেনকে সে বলে, ‘এই-যে দ্যাহেন কত্তা, কয় যে আমরাই যাব, না-হয় তো আমাগ নৌকা ফিরাইয়্যা দ্যান!’ 

নজর আলিকে শুধু তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে যোগেন, ব্যাপার কী? 

নজর আলি বলে, ‘অগ কথাডা তো ফেলনা না। মাঝি হইয়্যা কী কইব্যা মাঝির বেটারে কওয়া যায়—এমন খারাপ নদীতে যাইস না বাপ। অ যদি ডর না পায়, আমি ক্যান অক ডরাইতে চাই। ওরও তো মাঝি হিশাবে চেনা হব্যার লাগব। এর থিক্যা বড় সুযোগ ওর কী আর আইসব? আপনার মত প্যাসেঞ্জার নিয়্যা মেড়েজলে উখরান উত্তর ভোলাতে পৌঁছিবার প্রথম মাঝি। অর যদি দরিয়ার মাঝি হওয়ার দম আর হিম্মৎ থাহে, তাইলে আমি কেডা অরে আটকাইব্যার?’ নজর আলি ধীরে-ধীরে কথাগুলোতে জোর দিচ্ছিল। জোরটা তার ভিতর থেকে উঠে আসছিল। কিন্তু সে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার মধ্যে থাকছে না, এটা বোঝাতে সে নৌকোর কাছ থেকে সরে যায় বলতে-বলতে, ‘স্যা আপনে নিজে যদি বাদ দ্যান না, অ্যাহন যাওয়াড়া। নীরাপদ না, তাইলে, আলাদা কথা। মাঝির কাছে আবার নদীর ভালমন্দ কী? নদী সবসময়ই তো ভাল।’ 

যোগেন হঠাৎ একটু একলা হয়ে যায়। 

তার একটু একটু মনেও এসেছে—এমন অবস্থায় এমন বিপদের নদীতে যাওয়া উচিত হচ্ছে না। এও তার মনে এসেছে—সে বললেই তো হল, ‘আইজ বাদ দেই।’ 

নজর আলি তার শেষ কথায় যোগেনকে যেন উদোম করে দিল—যোগেনের ডর করে কী না সেডা ন্যায্য কথা, কিন্তু মাঝিরে ডর-খাওয়ান ন্যায্য না। 

এমন উদোম যে তাকে হতেই হবে সেটা জানতে-জানতে ও এড়াতে-এড়াতে পাঁচ দিন আগে তিরিশে এপ্রিলের সকালে উডবার্ন পার্কের কংগ্রেস থেকে সে আজ এখানে—আড়িয়াল খাঁর অজস্র বাঁকের এক খুপচিতে, দুই বালক মাঝির খুঁজে বের করা মুল্যাদির এই জায়গাটিতে, সামুদ্রিক হাওয়া ও জল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে, দাঁড়িয়ে। সামুদ্রিক বাত্যা আর জল ভূসংস্থান বদলে দিচ্ছে যে ভোলা-দৌলতখান দ্বীপের সেই প্রলয়পয়োধি থেকে যোগেন এখনো মাইল চল্লিশ দূরে। যোগেন ভয় পাচ্ছে। দুই বালক মাঝি প্রস্তুত। 

সুভাষবাবু কেন নিজের ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করলেন না? গান্ধীজি তো বলেছিলেন সুপরামর্শের ছলে। এম এন রায়রাও চাইছিলেন। সুভাষবাবু অভিমানী গলায় বলে উঠলেন, পদত্যাগ নিয়ে আমি কী বলব, আপনারা বলুন। অমনি কাড়া-নাকড়া বাজিয়ে ‘পদত্যাগ’

‘পদত্যাগ’ চিৎকারে নতুন রাষ্ট্রপতির নাম ঘোষণা। এত মিথ্যা ও অন্যায় এক দেবতারা আর নিজেকে দেবতা সবে, এমন মানুষরা করতে পারে। 

যোগেন ছোটমাঝির কাছে গিয়ে বলে, ‘কী মাঝি, নাও ছাড়ো, দরিয়ায় চলো।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *