১৩৩. যোগেনকে নিয়ে মিছিল
দেখতে-দেখতে হেদুয়া পার্ক ভরে গেল মিছিলের মানুষে আর মিছিলের রঙে। কংগ্রেসের জাতীয় পতাকাই বেশি—লালঝান্ডাও ছড়িয়েছিটিয়ে আছে। সেগুলিতে শাদা ফেস্টুনে কারখানার নাম লেখা। স্লোগান উঠছে টানা সুরে—’ভারতের জাতীয় কংগ্রেস—জিন্দাবাদ,’ ‘কংগ্রেস-সভাপতি সুভাষচন্দ্র–জিন্দাবাদ’। জিন্দাবাদ এসে গেছে। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। ‘বন্দেমাতরম’। ‘বাংলাদেশে অ্যাড হক লাই। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস—জিন্দাবাদ।’
এর মধ্যে কখন যে লাইন সাজানো হচ্ছে, যোগেন খেয়ালই করেনি। হঠাৎ কে এসে হাত ধরে টেনে দৌড়ে-দৌড়ে তাকে মিছিলের মাথায় দাঁড় করিয়ে দেয়। সামনে-পেছনে-দু-পাশে তাকিয়ে যোগেন দেখে—হেমন্ত বোস, সুধীরবাবু, নৃপতিবাবু, আর-একজন গলায় মালায়, ডাক্তার রহমান, দু-জন মহিলা, আরো একটু দেখতে যোগেন পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে খাড়া হলে দেখে—শরৎ বোস, মাথায় গান্ধীটুপি।
যোগেন কখনো এমন মিছিল সাজায়নি বা এমন মিছিলে হাঁটেনি। মিটিং করেছে—ছোটবড়। হাটে-হাটে ঘুরে অপ্রস্তুত মিটিং করেছে। গ্রামে-গ্রামে ঘুরেছে কোনো একটা ঘটনা আটকাতে বা বাধাতে বা কোনো একটা রটনা যাচাই করতে বা লোকজনকে কোনো একটা কাজে জড়ো করতে। মিটিঙে তার বক্তৃতার খুব নামডাকও আছে। তার গলার জোরের জন্য বা তার রসিকতার জন্য বা সে হঠাৎ-হঠাৎ গান গেয়ে ফেলার জন্য। সেসব তো তার একার দোষ বা গুণ। যোগেন এমন করে কোনো মিছিল কখনো তোলেনি যে-মিছিলে শরৎ বোসের মত বড় নেতা আর চামারবস্তির অচ্ছুত্রা একইসঙ্গে হাঁটছে একটাই উদ্দেশ্যে। কর্পোরেশনের ভোটে সুভাষ বোসের প্রার্থীরা জিতে যেন কর্পোরেশনের দখল নিতে পারে। পারলে, নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটিকে যোগ্য শাস্তি দেয়া হবে। পারলে, বিপিসিসি হয়ে দাঁড়াবে এআইসিসির বিকল্প। পারলে, কংগ্রেস হাইকম্যান্ড কর্তৃক নিযুক্ত অ্যাড হক কমিটি উপে যাবে। এগুলি তো এমন স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যার সঙ্গে যোগেনের কোনো সম্পর্কই নেই। সে কংগ্রেস করে না। কংগ্রেস কর্পোরেশন দখল করল কী করল না তাতে তার কিছুই যায়-আসে না। সে যা চায়—তপশিলি জাতগুলির স্বাতন্ত্র্য ও সম্মান—এই মিছিল তা তাকে দিতে পারবে না।
কিন্তু মিছিলটায় যখন তাকে ভোট দেয়ার জন্য সকলে মিলে ছন্দে-ছন্দে গানের মত করে সুর তুলছে, তাকে ভোট দিয়ে জেতাতে বলছে, যখন মিছিলের সামনে তাকে রাখা হয়েছে যাতে চেনা যায় সে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এই মিছিলের একজন চালক, রাস্তার দু-পাশের বাড়িগুলির তিনতলা ও তার চাইতেও উঁচু বারান্দায় জড়ো মানুষজন তাদের দিকে হাত নাড়াচ্ছে, যখন এই বাসরাস্তা ট্রামরাস্তার পুরো দখল নিয়ে মিছিল চলছে, যেন রাস্তাটা খাড়া হয়ে আকাশের দিকে উঠে গেছে, যখন এই মিছিলের এই মাথা থেকে যে-রাস্তা সে প্রতিদিন পেরয় সেই রাস্তাটার শেষপর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, যেন সেটাই তাদের যাওয়ার জায়গা, সিঁড়ি বেয়ে আকাশে ওঠার জায়গা, রামধনু ওঠার জায়গা, রামধনু বেয়ে আকাশে ওঠার জায়গা, বরিশালের জোয়ার-ভাঁটা খেলা খালগুলোর ওপর দিয়ে যে-রামধনু ছড়িয়ে পড়ছে, কীর্তনখোলার ঢেউগুলির ওপর দিয়ে নেচে-নেচে ভেসে যায়,
বিলের জলেমাটিতে
কোমর পর্যন্ত ডোবা
শূদ্র মানুষ
দুই হাতের মুঠোয়
অন্নপূর্ণার ধান নিয়ে
হাসে,
আর
পাছে তার ছোঁয়া লাগে
ভয়ে
শাস্ত্রগুলো
শুধু
পেছন দিকে গোড়ালি ঘুরিয়ে
দৌড়য়
তাদের খাঁচার দিকে,
আর এই মিছিল এই মিছিল
জেগে উঠেছে
শীতঘুম-ভাঙা
রাস্তার মত,
আমাদের কোনো মালিক নেই,
কারণ, আমাদের কোনো জমি নেই,
কারণ, আমরা শূদ্র,
কারণ যার জমি থাকে
সে শূদ্র নয়,
কারণ যে শূদ্র
তার কোনো জমি থাকে না
যা কাঠা বা বিঘা বা হাল দিয়ে
মাপা যায়, কারণ
শূদ্রের থাকে শুধু দেশ
তার মাটির ঘাস থেকে
শূদ্ররা ছড়িয়ে পড়ে
মিছিলটা শুধু ৩ নম্বর ওয়ার্ডটাই ঘুরল। এত বড় একটা মিছিলের পক্ষে ৩ নম্বর ওয়ার্ড আর কতটুকু, ভিতরের রাস্তাগুলিত যদি ধরা যায়। কর্পোরেশন ভোটে এত বড় ও রংচঙে মিছিল হয় না। হল—যোগেনের জন্য। আইনসভায় তার বন্ধু—বঙ্কিমদা, নীহারেন্দুবাবু, শিবনাথবাবু, আইনসভার বাইরেও ভূপেশবাবু, এঁরা যোগেনের জন্য মিছিল তুলে এসেছেন। তারা ৩ নং ওয়ার্ডের ভোটার নয়। অথচ তারাই সত্যি-সত্যি বলে গেল—যোগেন শুধু ৩ নং ওয়ার্ড নয়। তাহলে যোগেন কী? যোগেন মণ্ডল?
যোগেন জানে—সবকিছুরই কারণ আছে। সে সত্যিই নিমিত্তমাত্র। কিন্তু কোনো-কোনো মুহূর্ত তো এমন আসে যে নিমিত্ত ভাবতে চায় সে-ই কারণ, সে-ই নিয়তি। তখন তো তার কারণ খুঁজতে ইচ্ছে করে না, বোধহয় পারেও না কারণ খুঁজতে। যোগেন মণ্ডল এখন নিজের এই উপলব্ধিতে মাখামাখি হতে চায়—সে, যোগেন মণ্ডল, সেই বেদের আমল থেকে শূদ্র, চণ্ডাল, চতুর্বর্ণের মধ্যে তাকে রাখা হয়েছে তারপর তলিয়ে দেয়া হয়েছে অতল অস্পৃশ্যতায়, সে, যোগেন মণ্ডল, নমশূদ্র, সে-ই এই মিছিলের নায়ক ও মিছিলের অনুগামী। মিছিল টলিয়ে দেবে চতুর্বর্ণের ভারসাম্য, যদি চতুর্থ থেকে অনুগত বর্ণগুলি বেরিয়ে আসে ভারসাম্যের সেই নির্মাণ থেকে।
যোগেন এক আবৈদিক চণ্ডাল, আত্মরক্ষা করতে-করতে হাজার-হাজার বছর ধরে তার অনুভব আর অনুমানের ক্ষমতা হয়ে উঠেছে মানব-বিবর্তনের বিপরীত। তার মানুষের মতই মাথা আছে। সেই মাথা দিয়ে সে ভাবতেও পারে বটে। কিন্তু সে বেঁচে থাকে পশুর মত অনুভব ও অনুমানের ক্ষমতায়। চণ্ডাল জানে, কত আপদ মিশে একটা ঘটনা হয়। চণ্ডাল জানে, ঘটনাটা ঘটে গেলে আর কতকগুলি হঠাৎ-যোগাযোগের ফল মাত্র থাকে না সেই ঘটনা। ঘটনাটা তখন স্বাধীন হয়ে যায়। চণ্ডাল জানে, তখনই, ঠিক তখনই, তাকে যুক্তিশাস্ত্র শেখানো হবে। শেখানো হবে আপতিক আর নিত্যের দ্বন্দ্ব ও তফাত। চণ্ডাল জানে, সে যদি গুরুদক্ষিণা দিতে অস্বীকার করে, মাত্র একবার, সে যদি হরিজনের মিথ্যা পদবী ফেলে দিতে পারে, মাত্র একবার, সে যদি মন্দিরে প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেয়, মাত্র একবার তাহলেই সে মুক্ত ও স্বাধীন। যোগেন তার ভিতরে মুক্তির পাখসাটের হাওয়া আর স্বাধীনতার আঁচ পায়। সে অস্থির হয়ে ওঠে। দুদিন পরের ভোট, ভেটের একদিন পরে গোনা হয়। যোগেন জিতেছে। ভোট পাওয়ার হিশেবে ওপর থেকে চার নম্বর।
