১২৮. মুসলমান : আপকানট্রি ও ডাউনকানট্রি
কেউ নিশ্চয়ই রহমানশাহেবকে যোগেনের কথা গিয়ে বলেছে—যোগেনকে চিনে নয়, তার পরনের ধুতি দেখে তাকে বিশিষ্ট অর্থাৎ হিন্দু মনে হয়েছে বলে। নইলে রহমানশাহেব তাকে দেখতে না পেলেও কি চেঁচিয়ে ডাকতে পারেন—’যোগেনবাবু, এখানে আসুন, এখানে।’ যোগেন দেখে ওখানে একটা চেয়ারও আছে আর তাতে একজন বসেও ছিল, সে উঠে দাঁড়িয়ে যোগেনকে বসতে দেয়। ডাক্তারবাবু একটি দাঁড়ানো মেয়ের পেট টিপছিলেন, আর পেটের কাছে কান পেতে যেন কিছু শুনতে চেষ্টা করছিলেন। ওঁর ভুরুতে লাইন পড়েছে শোনার চেষ্টায়। তারপর হঠাৎই মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে, কাগজছেঁড়া ছোট-ছোট স্লিপের একটা কাগজে কিছু লিখে, মেয়েটিকে দিয়ে বললেন, ‘এই দুটো পিল খেয়ে নেবেন, কাল ফজিরে। দাস্ত হবে। দাস্ত হয়ে গেলে আসবেন। কাল হলে কালই। না-হয় তো পরশু। তাড়াহুড়ো করবেন না। দাস্ত পরিষ্কার না-হলে দুদিন পর আবার এই দুটো পিল খাবেন।।
স্লিপ-কাগজটা মেয়েটির হাতে ধরিয়ে রহমানশাহেব ঘরভরতি রোগীদের বললেন, ‘আজ আর ডাক্তারি হবে না। আমার বহুত ইমানদার দোস্ত, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, বিএ, বিএল, এমএলএ। ওঁর সঙ্গে আমার কথা আছে। তোমরা কাল সকালে এসো।’
রোগীরা একে-একে বেরিয়ে যেতে শুরু করে।
যোগেন রহমানশাহেবকে বলে, ‘এঃ, আপনি আমাকে অন্য সময়ও তো দিব্যার পারতেন। খারাপ লাগছে। আমার জন্য ওদের চিকিৎসা আটকাইয়্যা গেল!’
রহমানশাহেব বলেন, ‘দোষটা তো তাহলে, আমার হয়েছে। কর্পোরেশনের কাউন্সিলার হবেন আবার ডাক্তারিও করবেন—এমন হলে তো এইরকমই হবে। আমি ডাক্তারি ছেড়েই দিয়েছিলাম। আমার রোগীরা একেবারে হত্যে দিয়ে বসল—কাউন্সেলের ভোটই হোক, আর যাইহোক, আপনি না-দেখলে আমরা মরে যাব। তাই এই ব্যবস্থা—হপ্তায় তিনদিন।’
‘আপনি যে ওদের কাল আসতে বললেন?’
‘সেটা তো কমপেনসেটারি, আজ সবাইকে দেখলাম না বলে। আপনি বলুন তো, ঘটনাটা কী? ফোনে আমি বুঝতে পারি না ভালো। আপনাকে তো সুভাষবাবু তিন-নম্বর ওয়ার্ডের রিজার্ভড সিটের ক্যানডিডেট করলেন, তারপরে, আবার গোলমাল কীসের?’
সব শুনে রহমানশাহেব খুব একচোট হাসেন, আওয়াজ না করে, তাঁর লম্বা ধড়টা কাঁপছিল হাসির দমকে। তারপর একটু থেমে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি তো কোনো কালে কংগ্রেস না।’
যোগেন মাথা নাড়ে।
‘আপনার বাপদাদারা কেউ?’
যোগেন মাথা নাড়ে।
‘আপনি এমএলএ হলেন তো অন্যপার্টির?’
যোগেন ঘাড় হেলায়।
‘ও! আপনি তো কংগ্রেসপ্রার্থীকে হারালেন?’
যোগেন ঘাড় হেলায়।
‘বড়তলায় কংগ্রেসের হয়ে দাঁড়ালেন কেন? সুভাষবাবুর কথায়?
‘হ্যাঁ। সেটাই প্রধান। তবে আমরাও নিজেদের মধ্যে কথা বলে ঠিক করছি। কংগ্রেসটা বড়ো কথা না। বড়ো কথা রিজার্ভড সিট। জিততে পারলে কলকাতায় আমাদের একটা ঘাঁটি হয়।’
‘আপনাদের? মানে, শিডিউল কাস্টদের?’
‘হ্যাঁ। কলকাতায় থাকলে তো মনেই আসে না, দেশে সিডিউল কাস্ট বইল্যা কিছু আছে।’
‘কিন্তু কলকাতায় শিডিউল কাস্ট আছে বলেই তো আইন বদলে চারটি সিট রিজার্ভ করা হল। এটা একটা খুব ভালো আইন হয়েছে। কিন্তু লিগ গভর্মেন্ট বা হকশাহেবের মন তো শাদা কাগজ না। তাহলে, ওদের নিশ্চয় ভাবা ছিল, ঐ চারটি সিটে কাদের জিতিয়ে আনলে লিগের প্রেস্টিজ বাড়বে। না হলে রিজার্ভেশনের কথা ওদের মাথায় এল কেন?’
‘কংগ্রেস আর লিগে তো বোঝাবুঝি হয়েছে। কংগ্রেস আর লিগে!
‘সেটা তো পরের ডেভেলাপমেন্ট। লিগও চায় জাতীয় কংগ্রেসকে ভাঙতে। সুভাষবাবু চান বাংলায় জাতীয় কংগ্রেসকে জমি না-ছাড়তে। তাই বোঝাবুঝি হল। কিন্তু আইন সংশোধনের সময় লিগের বা হকশাহেবের বা নাজিমুদ্দিনের বা সারওয়ারদির তো মাথায় ছিল কেউ। সেটা কে জানেন?’
যোগেন চুপ করে গেল। সে রহমানশাহেবের কথামত ভাবতে লাগল এই অনুতাপটুকুসহ যে এই কথা তার মনে আসেনি কেন? শিডিউলদের কোনো-কোনো নেতার দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নামে মাত্র। তাদের কাজকর্ম কলকাতাতেই। যেমন বিরাট জ্যাঠা। কৃষকপ্রজার ভাইস-প্রেসিডেন্ট। তাঁকে যদি কর্পোরেশনে পায়, তাহলে লিগ ও হকের দুয়েরই লাভ। আর কে?
যোগেন মন দিয়ে ভাবছিল। রহমানশাহেব তাকে মন দিয়ে ভাবতেই সময় দিচ্ছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ কাটার পর যোগেন বলে, ‘না, রহমানশাহেব, আমাকে আপনে যত সময়ই দ্যান, আমি ঘুরাফিরা সে-ই বরিশাল। আমি কলকাতার পলিটিক্স তো জানিই না কিছু।’
‘যোগেনবাবু, কলকাতার পলিটিক্সের এটাই তো মজা। আপনি কিছুই জানতে পারবেন না, সে মাথা খাটান বা খুড়ুন। আবার, আপনি ভাত মাছ খেয়ে দুপুরে ঘুমোচ্ছেন, দেখলেন, সেই ঘুমের মধ্যেই আপনার যতটুকু জানা দরকার, ততটুকু জেনে গেলেন।
‘স্বপ্নে নাকী?’
‘সে তো জানি না। স্বপ্ন তো হতেই পারে। আবার চোখ-কান বুজে যে পড়ে আছেন তার ফলও হতে পারে। কলকাতার পলিটিক্স, সব পার্টিরই, বড়লোকদের হাতে। সে হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, খ্রিস্টান হোক, এখন শিডিউলই হোক, পয়সার মদত না থাকলে কলকাতায় নেতা হয় না।’
যোগেন একটু চুপ করে থাকে। তাতে মনে হতে পারে, রহমানশাহেবের কথাটা তার পছন্দ নয়। সে সেটা বলেও ফেলে, ‘না, রহমানশাহেব। কলকাতা আইস্যাই না প্রথম দেইখল্যাম পলিটিক্স কত বড় ব্যাপার। ধরেন, এক, এই-যে শ্রমিকদের নিয়্যা দাবিদাওয়া তৈরি করা, আদায় করা—এই পলিটিক্স কি বরিশালে আছে? সেখানে তো মাঝিমাল্লালস্কর কিছু কম নাই। স্টিমার আর লঞ্চ কোম্পানিও তো আছে। ধরেন, দুই, ছাত্ররা যে এত কাণ্ড কইরব্যার পারে সেডা কি কইলকাতা ছাড়া জানা যায়, আইনসভায় তো রোজই একটা কইর্যা মিছিল আসে।’
‘আপনার দুই নম্বরটা ভুল হল। সেই ১৯০৫ সাল থেকেই তো ছাত্ররা রাস্তায় নামে। আমি তো ডাক্তারির ফাইন্যাল পরীক্ষা না দিয়ে ‘বঙ্গভঙ্গ চলবে না, বন্দেমাতরম্ বলে জেলে চলে গেলাম।’
‘তবে যে শুনি, পড়ছিও, মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিল।’
‘সেটাও ভুল শোনেন নাই বা পড়েন নাই। জেল থেকে বেরিয়ে দেখি আমার জাতভাইরা আমার ওপর এত চটে আছে যেন আমি তাদের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিয়েছি। হচ্ছিল মুসলমানদের একটা আলাদা প্রভিন্স, তুমি তার উলটো কথা বললে কেন। বছর পাঁচ-সাত পরে যখন ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’ তুলে দেয়া হল, তখন আমার জাতভাইদের গিয়ে বললাম, চলো, আমরা আন্দোলন করি—‘নতুন প্রদেশ তুলে দেয়া চলবে না’—
‘আপনেই উলট্যা কথা কইলেন?’
‘কাজ যদি উলটো হয়, কথাও তো উলটোবে, না কী? বঙ্গভঙ্গ চলবে না বলে জেলে গেছি। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ তো হয়ে গেল। পাঁচ-সাত বছর না কাটতেই আবার সেটা উলটে দেয়া হল। আমরা কি-একবার আলুর বস্তার আলু হব, আর একবার পাটের গাঁটের পাট হব? কিন্তু আমার জাতভাইরাই রাজি হল না। তারা তখন আপকানট্রি মুসলমান হতে চায়, বাঙালি মুসলমান হয়ে থাকতে চায় না।’
‘তাইলে আপনে টাকার কথা কইলেন য্যা? এগুলা তো জাতের সকলের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ছাড়া হয় না। কইলকাতা ছাড়াও হয় না।’
‘সেই কারণেই তো টাকার সাপোর্ট লাগে। তার সঙ্গে বংশমর্যাদা ও বামুন-কায়েত জমিদারের ছেলে হতে হয়। না-তো আপকানট্রি মুসলমান হতে হয়। না-হলে দাঁড়ানো যায় না।’
‘রহমানশাহেব—আমার তো সবই বইপড়া অবিদ্যা। শুদ্দুর বাড়িতে তো বাপখুড়ার কাছ থিক্যা কিছু জানা যায় না। তাদের কিছু জানা থাইকলে তো কইব। বামুন-কায়েতদের বাড়িতেই তো এইসব ঘটত। তারা শুদ্দুরগ সে-কথা বলতে আসব ক্যা? আপনে মুসলমান, শুনছি আপকানট্রি, কংগ্রেস হইলেন ক্যামনে? আর যদি হইলেনই তো গান্ধীর চেলা হইলেন না ক্যা?’
‘গান্ধীজির চেলা হওয়ার আগেই তো আমি স্বদেশীর চেলা হয়ে জেল খেটে এসেছি।’
‘আপনে তাইলে স্বদেশী-কংগ্রেস। গান্ধী-কংগ্রেস না।’ যোগেন হেসে বলে, রহমানশাহেব হো-হো করে হাসতে থাকেন, যোগেন বলে যেতে থাকে, ‘শুনছি খিলাফৎ আন্দোলনেই হিন্দু-মুসলমান প্রথম মিলছিল।’
‘মিলছিল একরকম। আমার পছন্দ ছিল না?’
‘খিলাফতে ছিলেন না আপনি?’
‘না। খিলাফৎ আমার তখনো পছন্দ ছিল না, এখনো পছন্দ না। গান্ধীজি তো বাঙালি বা মুসলমানকে আলাদা জাত ভাবতেন না। তিনি একটা দাবি খুঁজছিলেন যে দাবি ভারতের সব মুসলমানের দাবি। খিলাফৎ সেই সুযোগটা দিল তাঁকে।’
‘গান্ধীজি না করলে আর কেউ করত না?’
‘অন্যেরা করেছে বলেই গান্ধীও করলেন? তাইলে তাঁর আর গান্ধী-হওয়ার দরকার কী ছিল? আমি খিলাফতে যাইনি, ৩২ সালের আইন-অমান্যে আবার জেল খেটে এলাম।’
‘তাতে তফাতটা কোথায় হৈল?’
‘এক খিলাফতে তো মুসলমানদের নাম-পোশাক-ধর্ম সব বদলে দিল। যে-ছিল দুধু মিয়া সে আর বাংলা নাম রাখতে চাইল না, হল এনতায়েজ মাহমুদ হাসিম· মুখতাসিন শেখ’–
‘তাতে তার লাভ হৈল কী?’
‘রাজহংসের ডিম। সে নাকী তাতে খাঁটি মুসলমান হল। সে তো মনে রাখতে পারে না। সরকারি কোনো কাজে যদি নামের দরকার হয় তাহলে সরকারিবাবুকে নিয়ে মৌলবির কাছে গিয়ে বলে, ‘আমার নামটা বলে দেন, একটু, মৌলবিশাহেব।’
‘সে আর কী করবে? তারে নাম দিছে মৌলবি। আর মৌলিবি তো যত আপকানটি তত বড় মৌলবি। রহমানশাহেব ঐ দুধু মিয়া তো আর মৌলবি বানায় নাই। আপনারা মৌলবি আইন্যা মশজিদে বইস্যা অগ কইলেন, যা, আপকানট্রি হ। দুধু মিয়া আপকানট্রি হইল। তবে, আমি শুইনছি—বাংলার মুসলমানদের মধ্যে না কী দুই ভাগ—আপকানট্রি থিক্যা দেশী মুসলমান হইছে আর অন্য ভাগ দেশি থিক্যা আপকানট্রি হইছে। আপনেও তে আপকানটি? না?
‘আপনার কি মনে হচ্ছে, আমি বাঙালি না?’
‘সে তো কারোই মনে হবে না। তবু শুনা যায়।’
‘সে তো শোনা যায়—মানুষ একদিন বাঁদর ছিল।’ সেই শোনার সুবাদে কি একজনকে বলা যায়, আপনি তো বাঁদর।’
যোগেন মাত্র সেইটুকু হাসে, যাতে বোঝা যায়, তার প্রশ্নের পালটা প্রশ্নটায় কোনো যুক্তি নেই। রহমানশাহেব তখন বলেন, ‘আমি বাঙালি, আমার বাবা বাঙালি, আমার শ্বশুরমশায় বাঙালি, আমার মা বাঙালি, আমার শাশুড়ি বাঙালি, আমার বেটাবেটি জামাইবউরা বাঙালি। তাদের বাপের বাড়ি বাঙালি, তাহলে আমি কী করে আপকানট্রি মুসলিম হই?’
‘তাহলে এ কথাটা সবাই কী কইর্যা এমন জাইনল?’
‘একই ভুল কথা সকলেই জানে বলে—কথাটা জানে, অথচ ভুলটা কেউ যাচাই করেনি। তাই কোনো মতভেদ নেই যে আমি আপকানটি।’
যোগেন একটু হেসে যোগ করে, ‘এক আপনে ছাড়া।’
‘আমি কী জানি তা কি আপনি জানতে চান? তাহলে জানুন। বলছি। কলকাতার মুসলমান ও হিন্দু জনসংখ্যা সম্বন্ধে আপনার ধারণাটা স্পষ্ট হবে। তাতে আপনার আসনটার রহস্য আপনি বুঝতে পারবেন। মানে আপনার ভোটারদের কমপোজিশনটা। আমরা বংশগতভাবে বেশ গোঁড়া আপকানট্রি হিন্দু–’
‘ও? মানে, হিন্দু হাইকান্ট নিশ্চয়ই,’ যোগেন তেমন কিছু অবাক হল না।
‘মনে হয়, আমার মতন প্রাক্তন হিন্দু বর্তমানে মুসলমানদের সঙ্গে আপনার রোজই নাস্তা হয়।
