১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১১৯. দুর্যোগের রাত

১১৯. দুর্যোগের রাত 

হাওয়ার এমন নিরবচ্ছিন্ন হুংকার বরিশালের মানুষজনের কাছে নতুন নয়। যেমন নতুন নয়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস। যেমন নতুন নয়, অজস্র খালদোনা দিয়ে প্রত্যন্তের জলও নোনা হয়ে যাওয়া। আলাদা করে এই পাথরের মত অন্ধকারও কিছু নতুন নয়। যারা সত্যি-সত্যি একটা ধারালো সুতোর ওপর কাটিয়ে দেয় এক-একটা জীবন, তাদের কাছে অনভিজ্ঞপূর্ব বলে ধারণা কোনো সময়ই সত্য হয়ে ওঠার ফাঁক পায় না। যদি কেউ সেই সুতোর ওপর থেকে ছিটকে যায়, সে-ছিটকে যাওয়াটা মৃত্যুই মাত্র, কিন্তু অনভিজ্ঞপূর্ব নয়। কারণ, তাদের বাঁচার কারণ তাদের কাছে পূর্বনির্দিষ্ট নয় আর তাদের মরণের একটা মাত্র কারণই তাদের জানা—আর বাঁচতে না-পারার ব্যর্থতা। 

হাওয়া, এই বেশামাল হাওয়া, এখনো চেনা যায়নি যে-হাওয়া সেই হাওয়া, একটা গোটা রাত পুইয়ে যে-হাওয়া চিনে নেয়া, এখন আর ঠেকানো যাচ্ছে না, যদি এই নিকষ আঁধার না-থাকত, যদি দিনমান হত, যদি রাতের আকাশ থেকে মেঘচাপা একটা দীপ্তি ভুলবশত স্থির হয়ে আছে, মনে হত, যদি মেঘ না থাকত, যদি আবার আলো থাকত এই হাওয়ার অনেক ওপরে, তাহলেও তার আভা বিদ্ধ করত হাওয়ার তলার এই অন্ধকার, যে-আলো সেই আকাশ-হারানো দীপন নিয়ে মাটি জল থেকেও দৃশ্যমান হয়, সেই আলো এদের চোখে প্রতিফলিত হয়ে অন্ধকারে সহস্রচক্ষু হয়ে উঠত। 

কিন্তু হাওয়া সেই শেষ বিকেল থেকে উঠেছে ধীরগতিতে, কোনো ছেদ না দিয়ে অথচ ধীরগতিতে। আঁধারও নেমেছে অচ্ছেদ্য ও অবিরত ও নিশ্চিত। এই দুইয়ের কোনো আচমকা নৈকট্য যে সংগঠিত হয়ে যেতে পারে রাতের গভীরতর কোনো প্রহরে-তার কোনো আভাসও কেউ পায়নি। পেলে তো একটা কোনো ব্যবস্থা করা যেত। কারো তো অজানা নেই কোণ্ ঘরের চালা কোণ আড়ে ঢিলা বা কোণ ঘরের হোগল এমন হাওয়ায় ভেসে যাবে। তেমন কোনো জানা খবরও কাজে লাগানো গেল না। রাত্রি যখন অনন্ত হয়ে গেছে তখন, নিজের নাকড়াকার আওয়াজে নিজেই চমকে জেগে ‘আওয়াজ কীসের’ জিজ্ঞাসায় বায়ুসমুদ্রে ঝাঁপ দেয় যোগেন, বা আঁধারসমুদ্রে, তখন, তখনই তারা দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। কিছুই দেখা যায় না, নিজের হাত-পাও না। মাঝদরিয়ায় বহর ভাঙলে কাঠ না মানুষ না ফেনা কি আলাদা করা যায়? 

যায় না। দেখা যায় না। 

কিন্তু বহর যদি ভেঙে না গিয়ে ঠেকে যায় লুকনো পাহাড়ে, আর বাইরের সেই জলরাশির স্রোত থেকে প্রায় অদৃশ্য একটা ধারা যদি বহরের তলার ফাটল দিয়ে ভিতরে চুঁইয়ে ওঠে—তাহলে এক বহরের মানুষের অত জোড়া চোখ, ইঁদুর, পোকা-মাকড়-বিড়াল এইসব জীবজন্তুর সমবেত দৃষ্টি হয়ে ওঠে। তখন বহরের খোলের অন্ধকার আর আকাশের খোলের অন্ধকার চিবতে পারে সেই অলৌকিক দৃষ্টির সমবায়। চিনতে পারা যায়—রাজকৃষ্ণকে, সে একলাফে আড়কাঠে পা তুলতে না পেরে পড়ে যায়, দ্বিতীয়বার পারে, তারপর আড়ে আড়ে বটামে-বটামে উড়ে যায়, ভেসে যায়, সাঁতরে যায়, হেঁটে যায়, নুয়ে যায়, চিতিয়ে যায় আর যতটা পারে বেঁধে যায় কানছি আর আড়ার বাঁধন। 

রাজকৃষ্ণ নেমে আসে। 

ঘরটার অন্ধকার আয়তন ভরে যত মানুষ ছিল, তারা কান খাড়া রেখে অন্ধকারে হাওয়ার আওয়াজ শোনে। আর কি শোনা যায় সেই মৃদু অথচ ভবিতব্য সেই মড়মড় আওয়াজ। যে-আওয়াজ সবাই শোনেনি, সেটা কোথা থেকে উঠেছে তেমন আন্দাজ তো দূরের কথা, সকলেরই ভয় ছিল এই হাওয়ায় ঘরটা যদি ভেঙে পড়ে, তাই, সেই আঁধারে সেই প্রথম তারা পরের সর্বনাশ আগে রুখল। 

আর আওয়াজ হচ্ছে না দেখে কানাই চিৎকার করে ‘মাইঝ্যান দাদা, আর কি আওয়াজ উঠব?’ কানাইয়ের স্বরে ঠাট্টাটা ছিল অনাবৃত। ফলে, সকলে হেসে উঠে জানায়, ঠাট্টাটা তাদেরও। প্রেমানন্দ বোঝে না। সে তার স্বরের মান্যগণ্যতা রক্ষা করে বলে ওঠে, ‘পছন্দ হয়, না। ফলে, সকলে আবার হেসে উঠে জানায়, জবাবটা তাদের নয়। 

একটা গোটা রাতের এই হাওয়ার জিঘাংসু হাহা রব আর অন্ধকারের এই নীরব স্থবিরতাকে মনে হয়েছিল—এর যেন শেষ নেই। ঠিক তেমনই যে মনে হয়েছিল, তা নয়। মনে-হওয়া বলতে যদি মনে-হওয়াই বোঝায়, তাহলে সেই সক্রিয় ‘মনে-হওয়াটা ঘটে কিছুটা মাথা খাটিয়েও বটে। এই যে-মানুষগুলি, যে-কৌমের মানুষগুলি, এই বাতাসে, আঁধারে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, তারা কোনো আত্মিকতায় ভোগে না, চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন তাদেরই কিছু আত্মিকতায়। আত্মিকতা ছাড়া নিজস্ব সেই সময়বোধ তৈরি হয় না যার মাপে তারা তুলনা করতে পারে কোন্ সময়টা বড়—সেই পাছ-বিকেল থেকে রাজকৃষ্ণের আড়েওঠার সময়টুকু, না কী, রাজকৃষ্ণের আড় ছেড়ে নামা থেকে, এই যে-সময়টা এখন চলছে সেইটি। ‘মনে-হওয়া’ এই বাচ্যটিকে বরং এক-শব্দ কমিয়ে ‘ঠেকছিল’ বললে ঠিক হয়। তাহলে সংশোধিত বাক্যটি দাঁড়াবে, ‘…হাহা রব আর…স্থবিরতাকে ঠেকছিল যেন…’। 

তাতে এই মানুষজন ও এই কৌম, ক্রিয়ার কর্তৃত্ব থেকে সরে আসে ও হাহারবসহ অন্ধকারও স্বাভাবিক থাকে। বা, আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাগুজে নাটক থেকে জীবনের স্বাভাবিকেই থাকে। অন্ধকার এমনই অন্ধকার থাকে, এতটা রাক্ষ জুড়ে, যে-রাত অন্ধকার। হাওয়াও তো এমনই ভীষণ থাকে, যে-দিনরাত হাওয়া-উথাল। এই রকমই, কোনোকিছুই ব্যতিক্রম নয়—এমন আজন্ম অভ্যাস ছাড়া কোনো রাতও ভোর হয় না, কোনো সাঁঝও রাত হয় না। 

অন্ধকারে এতটা লেপটে থাকলেও, অন্ধকার চিরে যেতে কি এরা একসঙ্গেই দেখে? না। সেটা একেবারে যার-যার, তার-তার মত। ঘুমের শরীর যেমন। ছায়া-অরুণ, সাত ঘোড়ার রথ, রামধনু অথচ পলকে পলকে বদলায় এমন কোনো প্রাচীন, বিখ্যাত কাব্যময়, নাট্যময়, উদ্ভাসন নয়। এমনকী, সূর্যোদয়ই নয়। একটা কোনো লহমায় নিকষ অন্ধকারে একটু যেন তরুলতা আসে। আকাশ বলেই মনে হয় আলোভাসিত অনচ্ছ কোনো অবয়বকে। গাছের পাতাগুলো তাদের বিশ্বস্ততাতেও যেন ছায়া থাকে। 

হাওয়া কমেনি এক ফুঁ-ও। অন্ধকারও কাটেনি আলোয় আলোকময় হয়ে। তবে? অন্ধকারে তো ছায়া পড়ে না। গাছের খুব উঁচু ডালের পাতাগুলো হাওয়ায় মাথা কুটতে কুটতে নিজেরাই নিজেদের ছায়াছবি হয়ে গেল। হাওয়া যত আছড়ে পড়ে, গাছের পাতা-পল্লব ততই মাথা তুলে ছায়াছবিটাকে খাড়া করে। হাওয়ার এই দাপটে কি আর বোঝা যায়—সেই ছায়া নীচে নামছে, নীচের ডালের পাতাগুলোও ছায়া হয়ে ছায়া ঝরাচ্ছে গাছপালা, আকাশমাটি, ঘরদুয়োর, এতক্ষণ অন্ধকারে লেপটে ছিল। হঠাৎ করে আকাশের ধূসর, বিরোধাভাসে গাছপালার কলঙ্করেখাকে স্পষ্টতা দেয়। 

তখন এরাও দেখতে পায়-আর-একজনের শরীর। কারো একচোখের পাতা, কারো নাকের ডগা, কারো ছড়ানো পায়ের খাড়া আঙুল। 

যোগেন এক দাওয়ায় হেলান দিয়ে দুই ঠ্যাং ছড়িয়ে ঝিমচ্ছিল। ঘুমুচ্ছিল বলাই সংগত কিন্তু একজন মানুষের ঘুমের ভঙ্গি হিসেবে এটা গ্রাহ্য হবে না। হঠাৎ একবার জেগে উঠে, ওর হিশেব মত যেখানে আকাশ থাকার কথা, সেদিকে তাকিয়ে কী দেখে নিয়ে আবার নিজেরই বুকে নিজের মাথা ঝুলিয়ে দিয়েছিল। ছোট একটা নৌকোর ভিতরে একজনই মাত্র নিশ্চিত মানুষ—সে একাই যাত্রী, মাঝি ও জেলে, ঐ বারদরিয়ায় ঐ ডিঙি আর ঐ মানুষের ঢোকা ও ফিরে আসা অসম্ভব, তবু সে যেমন দরিয়ার বুক থেকে হঠাৎ চোখ তুলে তার মধ্যরাতের দিক ঠিক রাখার তারাটা একপলক দেখে নিয়েই ঘাড়টা আবার ঝুলিয়ে দেয় কালো রাত্রির প্রবল তরলে—যোগেনের ভঙ্গিটা সেরকমই ছিল। যেন ঝিমুনোর দিক ঠিক করে নিল। 

সকাল যখন আরো একটু সকাল হল, যোগেন হঠাৎ জেগে লাফিয়ে উঠে, ‘খালপাড় ঘুইর্যা আসি’ বলে বাইরের দিকে বেরিয়ে গেল। 

তাই তো, খালপাড়ে না গেলে তো জানা যাইত না, দুনিয়া দুনিয়াতেই আছে তো? কানাই যোগেনের পেছনে দৌড়ল। এ-বিষয়ে আর-কারো কোনো কৌতূহল ছিল না। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *