১৪৭. শরৎ বোসের অ্যারেস্টের পর
আজ প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টির নেতা হিশেবে হকশাহেব শপথ নিলেন, সে তো শরৎ বোসেরই হাতে তৈরি। শরৎ বোসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর উপ-প্রধানমন্ত্রি হওয়ার কথা।
‘যার জন্য সিংহাসন সাজানো, তার হাতে পড়ল হাতকড়া’ বাসটায় উঠতে উঠতে মনিরুজ্জমান বলে।
ওরা দোতলায় উঠতেই বাস দিল ছেড়ে, ডিসেম্বর ঠান্ডা হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল—আড়াল নেই কোনো। যোগেনের নেড়া মাথা। বাবা মারা গেছেন মাখখানেক হল, নভেম্বর। বাবার পারলৌকিক কাজ করতে যোগেন মৈস্তারকান্দি যায়। নমশূদ্রদের অশৌচ দশ দিনের। দশ দিনের দিন কামান। পরের দিন আদ্যশ্রাদ্ধ। তার পরের দিন নিয়মভঙ্গ। নমশূদ্রদের অশৌচ যে ব্রাহ্মণদের সমান, সেটা ঐ সমাজের একটা গৌরব। নিয়মভঙ্গের মেবার পতনের দিন, একদিনে দুটো টেলিগ্রাম এল কলকাতায় থেকে। এসেছে বরিশালে আগের দিন। লোক দিয়ে পরের দিন বাড়িতে দিয়ে গেছে।
একটা করেছেন শরৎ বোস-’সিচুয়েশন ডিম্যান্ডস প্রেজেন্স।’ আর—একটা করেছেন—তার প্রেসিডেন্ট, ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল কাস্ট অ্যাসেম্বলি পার্টি।
নিয়মভঙ্গ না করেই যোগেন কলকাতায় ফেরার জন্য রওনা দেয়।
এসে দেখে—হকশাহেব নিজেই মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছেন ও আবার মন্ত্রিসভা গড়তে চাইছেন প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন পাটির নেতা হিশেবে।
বাতাসের কারণে অথবা সেই শিহরনে যোগেনের মনে পড়ে যায়, শিশির ভাদুড়ির গলায় ম্যাকবেথের শেষ সুস্থ স্বগতোক্তি—’ইফ ইট ওয়্যার ডান, হোয়েনটিস, ডান, দেন ইট ওয়্যার ওয়েল ইট ওয়্যার ডান কুইকলি।’
যোগেন জানে না, এখনো জানে না, সেই রাতে হকশাহেব মুসলিম লিগ নিয়ে যা বলেছিলেন, তা শুনতে শুনতে যোগেনের কেন মনে এসেছিল—মাত্র ঘণ্টা দেড়েক আগে শোনা শিশির ভাদুড়ীর ম্যাকবেথ। যোগেন এটা জানতেও চায় না। সে জানে—গানের একটা স্বর শুনলে বা কারো গলায় নতুন একটা আওয়াজ শুনলেও অকারণে চোখ ভিজে যায় বা গলায় যেন কিছু আটকে যায়। এরকম হয়, হয় এরকম।
‘মাইঝ্যান দাদা জাইনতেন তো যে-কোনো সময় অ্যারেস্ট হইতে পারেন?
‘এ-কথা তো আর ওঁকে জিজ্ঞাসা করে জানা যায় না। আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি এর মধ্যে?’ মনিরুজ্জমান জিজ্ঞাসা করে।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হইছে তো। ফরোয়ার্ড ব্লকের কথা হইল। আমি কিছু কইব্যার আগেই উনি কইলেন, আপনি আবার ফরোয়ার্ড ব্লকে চলে আসবেন না যেন। আপনার তো আলাদা পার্টি আছে। তার তো আলাদা ধরনের কাজকম্ম আছে। সুভাষের অনুপস্থিতির কারণে আপনারা ক্ষতিপূরণ করতে যাবেন না। ব্লকের সব নেতাকে তো আপনি চেনেনও না।
যোগেনের কথায় মনিরুজ্জমান বলে, একটু হাসি মিশিয়ে, ‘আমাকে অবিশ্যি এর উলটো কথা বলেছিলেন শরৎবাবু। বললেন, ‘ফরোয়ার্ড ব্লকের মুসলিম নেতা খুব দরকার, আপনি চেষ্টা করুন যাতে এই জায়গায় পৌঁছনো যায়, আমি আপনাকে, সাপোর্ট দেব। আমি অবিশ্যি পুরনো বা আদি ফরোয়ার্ড ব্লক।’
যোগেন হেসে বলে, ‘আর, আমি তো কোনো কালেই কোনো ব্লক না। সেইডা বিশ্বাস করানো তো খাড়া—ইচ্ছে মহাসংকট। যতই কই আরে আমার তো একডা অ্যাসেম্বলি শিডিউল কাস্ট পার্টি আছে, ততই সন্দেহ বাড়ে, আরে শিডিউল তো বামুনের টিকি—সেহানে তো গোত্ৰ নাই। তোমার গোত্রডা কী—তেওড়া না ওয়েলিংডন না সোদপুর না পটুয়াখালি? যত বলি আমার গোত্তর নাই, আমি নিগোরিয়্যা শুদ্দুর, আমারে গোতে নিব কেডা, তত সবাই ভাবে, আমি আসলে গুপ্তগোত্র। সেডা আবার কে য্যান শুধরাইয়্যা দিল পঞ্চম গোত্র।’
‘সে তো ওদের দুর্ভাবনা। আপনার তো এ নিয়ে কোনো ভাবনা নেই?’
‘ওদের, মানে, কাদের?’
‘যারা আপনাকে এখনো নিজেদের গোত্রে টানতে পারেনি, শিডিউল হলেও তো গোত্ৰ থাকে। কেউ শিডিউল কংগ্রেসি, কেউ আবার শিডিউল কংগ্রেসি গান্দীবাদী, কেউ আবার শিডিউল কংগ্রেসি সুভাষপন্থী, কেউ আবার শিডিউল লিগপন্থী—’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমাদের বড় নেতাদের তো সব পুরানা পার্টি একডা কইর্যা আছে, সেই যহন শিডিউল ছিল না, তহন থিক্যা। আমি তো তাইলে দাঁড়াই শিডিউলের শিডিউল।’
‘শিডিউল শিডিউলই এখন বাড়বে মনে হয়, সুভাষবাবু থাকলে তো বাড়তই। লোকটাকে কাজ করতেই দিল না। যদি ধরেন, বিশ বছরের পাবলিক কেরিয়ারের আট-নয় বছরই জেলে। থাকলে তিনি শিডিউল ও মুসলমানদের নিয়ে ফ্রন্ট করতেন।
একটু চুপ করে থেকে যোগেন বলে, ‘মনিভাই, কোলের সন্তান মারা যাওয়ার তিরিশ-চল্লিশ বছর পর পরশু মায়ে ভাবে, যদি পোলাডা থাইকত, তাইলে তার আর অভাব কিছু রাইখত না—’
মনিরুজ্জমান সঙ্গে-সঙ্গে বলে, ‘কয়বেটা কী মা? তার বেঁচে থাকা ছেলেদের তো আর বলতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে তাকে মরা ছেলের কথাই ভাবতে হয়।’
‘সেডা তো বুঝি। মরা ছেলে ছাড়া মায়ের ভরসা নাই। কিন্তু আপনে-আমি তো মরা ছেলের মা না। ঐ আইনসভায় থাইক্যা দশের কাজ যেটুকু করা যায়। খুব যে দানধ্যান কইর্যা নেতা হইছি তাও তো না। কাজটা কী করি তাও তো বোঝনে, আসে না। এর থিক্যা বরিশালে ওকালতি করাই কি ভালো ছিল?’
‘করুন। আপনাকে না-করেছে কে? এই যে এত মেম্বার তাদের একজনও কি নিজের জমিজমা চাষ-আবাদ, উকিল-মোক্তারি ছেড়ে এসে মেম্বারগিরি করে? একজনও না।’
‘সে তো আমিও করি এহানে। ইনকামের দিক থিক্যা বরিশালের চায়্যা বেশিই হয়তো। শরৎবাবুর নজর তো সব দিকে।’
‘আমার একটু অদ্ভুতই লাগে, জানেন। উনি তো সুভাষবাবুর বড় ভাই। কিন্তু সব সময় সুভাষবাবুকেই উঁচু করে রাখেন। যেই সুভাষবাবু অনুপস্থিত, অমনি এখানে সুভাষবাবুর সব কাজ ঘাড়ে তুলে নেন। উনি তো নিজের জোরেও কম বড় নেতা নন।’
‘সেডা কি আর বলার কথা? কারো কারো কাছে তো শুনি মাস মিটিঙে দাদা নাকি ভাইয়ের থিক্যাও ভাল বক্তা।’
‘আপনি, শোনেননি দু-জনকে, বড় সভায়?
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুনছি। সুভাষবাবু, একটু ঠান্ডা। শরৎ বোস গরম। কিন্তু আমার য্যান মনে হয় সুভাষবাবু বেশি কনভিনসিং। সুভাষবাবুর শরীর তো কোনো সময়েই ঠিক থাকে না। বড় দুর্বল। ত্রিপুরী কংগ্রেসের পর তো রানিগঞ্জের কাছে জামুগেড়িতে ছিলেন শরীর সারাতে। বাড়ির অনেকেই তো ছিল। আমারে খবর পাঠাইছিলেন। গিয়্যা দেহি, তান্ত্রিক চিকিৎসা শুরু হইছে। কোন তান্ত্রিক নাকি বিচার কইর্যা কইছে যে এই দেশের কোনো একটা জায়গা থিক্যা নাকি সুভাষবাবুরে বাণ ছোঁড়া হইছে। পালটা বাণ না ছুড়লে ওঁর শরীর ভাল হবে না। বাড়ির সবাই এক তান্ত্রিক নিয়্যা আইস্যা ঐ জামগেড়িয়ার বাড়িতে যাগযজ্ঞ কইর্যা ওনাকে দুইডা আংটি আর দুইডা কবচ পরাইয়া দিল। আমি গিয়্যা পইড়ল্যাম এর মইধ্যে। সুভাষবাবু আমারে জিগান, যোগেনবাবু, আপনে এই সব বিশ্বাস করেন? আমি কইল্যাম-সুভাষবাবু, অবিশ্বাস করার ক্ষমতা আমার নাই বইললেও চলে, আপনারও অবিশ্বাস করার কাম নাই, দুইডা আংডি আর দুইডা কবচ নিয়্যা অত বিশ্বাস-অবিশ্বাস জুইড়বার কাম কী?’
দু-জনেই একটু হাসলেন। মনিরুজ্জমান বললেন, ‘আমাদের ধর্মে আংটি-পাথর নেই কিন্তু পিরদের কবচ, দড়গার ধুলো, মশজিদের কোনো গাছের পাতা, কোন্ পুকুরের জল—এসব ছাড়া নিজেরই তো বিশ্বাস হয় না বেঁচে আছি। বেঁচে থাকার জন্য কিছু বিশ্বাস তো লাগেই।’
যোগেন খেয়াল করে ও খেয়াল করে তার ভাল লাগে যে ত্রিপুরীর পর জামগেড়িয়াতে সুভাষবাবু কিছুদিন ছিলেন শরীর সারাতে—এই খবরটা সকলে জানে না। মনিরুজ্জমান জানতে ও পারেন—উনি এদের এতই আপন মানুষ। আবার, আপন মানুষ হলেও না-জানতে পারেন। তিনি সে বিষয়ে একটি ইঙ্গিতও দিলেন না। এমনকী, সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্নটাও করলেন না—যোগেনকে কেন ডেকেছিলেন সুভাষ জামগেড়িয়ায়। মানুষ শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠে কত ছোট-ছোট অভ্যাস তৈরি করে। যোগেন, তার শ্রদ্ধাটুকু জানাতে চাইল। ঘাড়টা ফিরিয়ে খুব চাপাগলায় বলে, ‘আমাদের ওদিকে, বরিশালে, চাঁদসির টোটকায় খুব কাজ হয় তো। ওঁকে একটা তেল কইর্যা দিচ্ছিল্যাম। ওঁর নাকি উপকার দিচ্ছিল। তাই খবর পাঠাইছিলেন।’
