১৫২. বেঙ্গল টেনান্সি বিল হারিয়ে গেল
ইতিমধ্যে ৩৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর বড়লাট লর্ড লিনলিথগো ফিসফিসিয়ে রেডিয়োতে জানিয়েছেন—ভারত যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। জার্মানির বিরুদ্ধে।
যুদ্ধ কাকে বলে সেটা ভারতের লোকজন একেবারে জানত না, তা নয়। প্রথম মহাযুদ্ধে তো বেশ বড় একটা পল্টনই যুদ্ধ করেছিল পশ্চিম এশিয়ায়। কিন্তু যুদ্ধ নিজের দুয়োরে ঘটলে কী হয় তা বাঙালিরা জানল—সিঙ্গাপুর জাপানের দখলে চলে যাওয়ার পর তামিল ও সিঙ্গাপুর আর ব্রহ্মদেশে আর মালয়ে যারা ছিল বাঙালি, ভারতীয়, তারা বার্মা রোড ধরে পায়ে হেঁটে বাঁচতে ছুটল নাগা পাহাড়ের দিকে। এদিকে সিঙ্গাপুরেই ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’, ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ তৈরি হয়ে গেছে ও তার সর্বাধিনায়ক সুভাষ তখন নেতাজি, কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত সুভাষ, দেশ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসিত সুভাষ, কলকাতার সুভাষের গলা শোনা গেছে রেড়িয়োতে। আজাদ হিন্দ ফৌজ পৌঁছে গেছে কোহিমায়। ভারত সরকারের যুদ্ধবিভাগ ঘোষণা করে দিয়েছে পোড়ামাটি নীতি। নৌকো ভেঙে দাও, সাঁকো ভেঙে দাও, বাঁশবন পুড়িয়ে দাও, ধানের গোলা ও মাঠের ধান জ্বালিয়ে দাও। শত্রু যদি বাংলায় ঢোকে, তাহলে সে যেন কোনো খাবার বা যানবাহন না পায়। সারা প্রদেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ। কৃষক জমিজমা ফেলে চলেছে শহরে, কলকাতায়, ভিক্ষা মাঙতে। তখন ফ্লাউডই-বা কে, তাঁর কমিশনই-বা কী, তাঁর পাঁচ খণ্ডের প্রমাণপত্র ও সুপারিশই বা কে। যে-কৃষক সপরিবার হারিয়ে যেতে টাউনে আসছে—টাউনে কত গলিঘুঁজি, কত আলো-অন্ধকার, কত ভদ্দরলোক, কত নদী, নদীর ওপর ব্রিজ, রাস্তার ওপর পুলিশ হাত ছড়িয়ে যেখানে রাস্তার গাড়িঘোড়া সামলায়, সেখানে, সেই টাউনে ঢুকছে কৃষক। তখন ভূমি সংস্কার? তখন বাংলা প্রদেশে কত রকমের সংজ্ঞাসন্ধান—জমি বলে কাকে, জমির মালিক যে, সে কি অনিবার্যভাবেই ফলনেরও মালিক? যুদ্ধ, পোড়ামাটি, মুসলমানদের স্বার্থে চাকরির বরাদ্দ ঠিক হতে পারে—কিন্তু তাই বলে কি জমির বরাদ্দও ঠিক হতে পারে? কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, প্রজাপার্টি, দলহীন স্বতন্ত্র যারা, তাদের মধ্যে জমির মালিক যারা, জমির রায়ত যারা তারা বারবার ‘বেঙ্গল টেনন্সি বোর্ড’ নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে। শুধু বাংলা কৃষক এমএলএরা আইনসভায় মাঝেমধ্যেই কথাটা তুলে রাখে।
১৯২৮ সালে ‘বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্ট সংশোধন’ বিলটি জমিদার-হিন্দু ও কৃষক মুসলমানের স্বার্থে দু-টুকরো হয়ে যায়। একটিও সংশোধন বর্গাদারের পক্ষে আসেনি। স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন ও স্যার আরদুর রহিম দু-চারটি সংশোধনে বর্গাদারদের সমর্থন করেছিলেন বটে তবে সে-সমর্থনের উদ্দেশ্য ছিল কাউন্সিলের সদস্যদের হিন্দু-মুসলমান ভাগাভাগি কায়েম করা। তাঁরা এটা নিশ্চিতই জানতেন যে ওই সব সংশোধন গৃহীত হবে না, তাই, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে আরো একটু শক্তপোক্ত করতে চেয়েছিলেন তাঁরা।
১৯২৮-এর ‘বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্ট (সংশোধন)’ বিলটি প্রত্যাহৃত হওয়ায় প্রায় দশ বছর ধরে বাংলার কৃষকরা নানা ধরনের আন্দোলন করে হিন্দু-মুসলমান ভাগকে সত্য করে তুলেছিলেন ও ১৯৩৭-এর ভোটে ফজলুল হকশাহেব প্রজাপার্টির নির্বাচনী চোদ্দ দফাতে এক নম্বরে রাখলেন : বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্টের নতুন সংশোধন। ভোটে জিতলেনও। কিন্তু তাঁর প্রধান মন্ত্রিত্বের সাত বছরেও বিলটি আইনসভায় আনতে পারলেন না। কিন্তু হকশাহেবই হন আর খাজাই হন আর সারওয়ার্দিই হন—পরাধীন বাংলায় ফ্লাউড কমিশনের রিপোর্টটা একবারও উঠল না। শুধু একটা স্তোক দিতে ৪০ সালে একটি সংশোধনে খাজনা বৃদ্ধির মেয়াদ করা হয় ১৫ বছর আর বৃদ্ধির হার ধরা হয় ষোল আনায় অনধিক দু আনা বা ১২.৫ শতাংশ। সারওয়ার্দির প্রধানমন্ত্রিত্ব কালে তেভাগা আন্দোলনের ফলে বর্গাদার সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বিল (১৯৪৭)-এর একটি খসড়া গেজেটে ছাপা হয় কিন্তু আইনসভায় আসার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের ২১ এপ্রিল জমিদারি ক্রয় ও প্রজাস্বত্ব বিল (১৯৪৭) বিধানসভা থেকে সিলেক্ট কমিটিতে যায়। সেটা ফেরৎ আসার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।
বাংলার ভূমি সমস্যা সমাধানের এই সব চেষ্টা খুব বেশি দুর্গম না হলেও, এসব নিয়ে তত্ত্বতালাশ ও খোঁজখবর বিশ শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝির আগে শুরুই হয়নি। শুরু হওয়ার আর শেষ নেই। তাঁরাই মুখ্যত আলোচক যাঁদের জন্ম স্বাধীনতার পর অথবা স্বাধীনতার সময় যাদের বয়স ১০ কিংবা ১২। স্বাধীনতার আগের দশকে বাংলার জোতজমি, সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের পর রাজনৈতিক পার্টি আর নেতাদের নিজেদের স্বার্থ—এসব নিয়ে খোঁজখবর কিছু হয়নি।
হকশাহেব যে আইনগুলি পাশ করেছেন, সেগুলো ইংরেজ সরকারও করতে পারতেন। তাতে হিন্দু-মুসলমান-গরিব-গেরস্ত সকলেরই উপকার। জমিদারির আবোয়ার, চক্রবৃদ্ধিহারে মহাজনি, সেই রেটে বর্গাদারদের ভাগ কাটা, বন্ধকী কারবার-এগুলো তো কোনো ব্যবস্থা নয়, এগুলো সবই অব্যবস্থা, হকশাহেব সেই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে আইন করেছেন। কিন্তু কোনো সম্পত্তিওয়ালার ওপর, কোনো মালিকশ্রেণির ওপর কোনো আইন চাপাননি। হকশাহের জমিদারদের, শিল্পপতিদের, ও যুদ্ধের বাজারের ব্ল্যাকমার্কেটিয়ার ও মজুতদারদের কারো ওপরে কোনো আইন বসাননি, এদের কাউকে কোনো কেসে অপরাধী করেননি। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে তিনি কোনো প্রভেদ করেননি।
৪০ সালের ২৪ মার্চ ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান সম্পর্কে মুসলিম লিগের সম্মিলনে প্রস্তাব দিলেন হকশাহেব আর ২৮ মার্চ তাঁরই সরকারের তৈরি কলকাতা মিউনিসিপ্যাল আইন (সংশোধন)-এর আওতায় কর্পোরেশনের ভোট হল! বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সঙ্গে লিগের সমঝোতা হল। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নেতা তখন সুভাষ—কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত। ২৪ মার্চ থেকে ২৭ নভেম্বর ১৯৪১ পর্যন্ত ২০ মাস—হকশাহেব আর জিন্নাশাহেব পরস্পর থেকে কেবলই দূরে সরে যাচ্ছিলেন।
