১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৬৫. যোগেনের তিন সাক্ষাৎ

১৬৫. যোগেনের তিন সাক্ষাৎ 

ক্রিপসের প্রস্তাব, ‘ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব আর ‘চলো দিল্লি’ প্রস্তাবের ভিতর যোগেন যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল। তার দিশে আরো হারিয়ে গেল বাংলার রাজনীতির অস্থিরতায়। ১৯৪২ সালেও বাংলায় যাদের কিছু-না-কিছু সংগঠন ও কর্মী আছে তাদের কেউ এই তিনটি প্রস্তাব নিয়ে একটি কথাও বলেনি। কাগজ পড়ার সময় আর পড়ে, তার মনে হত যুদ্ধের রিপোর্টগুলি তার কাছে যতটা দুর্বোধ্য, সে যেখানে আছে সেই বাংলার কলকাতা শহর ঐ যুদ্ধের সঙ্গে বা ঐ সব প্রস্তাবের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত নয়। যেন, ও-সব আর-কারো সমস্যা, আর-কোনো দেশের, সে-দেশের সঙ্গে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে কংগ্রেসের নেতাদের মধ্যে জেলের বাইরে ছিলেন ডাক্তার বিধান রায় ও তুলসী গোস্বামী। কিরণশঙ্কর রায়ও কখন জেলে যাচ্ছেন আর কখন বেরিয়ে আসছেন ঠিক বোঝা যেত না। ‘নলিনাক্ষ সান্যালও বাইরেই ছিলেন কিন্তু তিনিও বুঝে উঠতেই পারছেন না ইংরেজদের এখনই নোটিশ দেয়াই-বা হল কেন, নিজেদেরই বা জেলে যাওয়ার দরকার কী? 

কিন্তু দরকারের এত অভাব পড়ল কেন? যোগেন একদিন জানতে চেয়েছিল কিরণশঙ্কর রায়ের কাছে, ‘দাদা, এই-যে দিল্লিতে এত লেনদেন হচ্ছে, একটু বুঝায়্যা দেন-না’। কিরণশঙ্কর খুব হেসে বলেছিলেন, ‘যোগেনবাবু, আমি বুঝলে তো আপনাকে বলব? আমার তো কোনো শোর্সও নেই, আপনার শোর্স হয়তো আমার থেকে বেশি।’ 

‘আমার শোর্স আসবে কোথা থেকে—আমার কেউ চেনাই নাই দিল্লিতে—’ 

‘বাঃ, আপনি তো সুভাষের সব কন্ট্যাক্টই জানেন। তাঁদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ বা ফোনাফুনি নেই? না-থাকলে কনট্যাক্ট করুন। বার্মা মানে রেঙ্গুনে তো সুভাষের অনেক বন্ধু—তাঁদের কাছ থেকে জানুন। আমাদেরও একটু জানান। অন্যে যে-খবর জানে না, সে-খবর জানতে সকলেরই কৌতূহল হয়।’ 

‘কিন্তু আপনে তো ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার।’ 

‘সে ওদের ইচ্ছে হয়েছে, রেখেছে, মিটিং ডাকলে যাব, শুনব। যদি ভোট দিতে হয়, তাহলে হয়তো প্যাঁচ কষে একটু কদর বাড়াবার চেষ্টা করব, চেষ্টা করে কোনো লাভ নাই জেনেও আমার চাইতেও যারা বেশি বুদ্ধিমান তারা পৌঁছেই ভুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে মহাত্মাজির ইচ্ছে জেনে নেন। হাত তুলতে হলে, তোলেন। চুপ করে বসে থাকতে বললে, বসে থাকেন। 

‘আপনে এত বানায়্যা কন! এত বড় শাহেব আইস্যা এদিন ধইর‍্যা শলা পরামর্শ, সে যাওয়ার আগেই আপনাদের নিজেগ শলাপরামর্শ, এক-একদিন এক-এক খবর। আর আপনে কন, আপনেরা সব হাত-পা কাটা জগন্নাথ?’

‘উদাহরণটা জুতসই হল না, যোগেনবাবু। হাতটা কাটা হলে আর তুলবটা কী বা না-তুলবটা কী। আর পাও যদি না থাকে তাহলে—গান্ধীজি যেমন করে লবণে হেঁটেছিলেন, বা, খিলাফতে, না আপনারা তো তখন খুবই ছোট, হয়তো মনে নেই, আমাকে তো আমার জায়গায় সে-রকম হাঁটতে হবে। না-হলে রটে যাবে যে আমি গোপনে সুভাষপন্থী ও সোস্যালিস্ট। তাই হাত-পাটা কেটে নিলে মুশকিলে পড়ব। বরং কনিষ্ক বলতে পারেন—মুণ্ডু বা মুখের তো কোনো দরকার নেই।’ 

‘কিরণশঙ্করদা একডা কথা কইয়্যা একডু শান্তি পাই। বলেন তো জিগাই।’ 

‘বলুন। এ কী? নিজেদের মধ্যে কথা বলা যাবে না?’ 

‘ক্রিপসের প্রস্তাবগুল্যা আমি এড্‌ডু খুটাইয়্যাই পড়ছি। আমার মতামতও একডা তৈরি হইছে। সে-কথা না। ধরেন, খুব পরিষ্কার না-থাইকলেও ভাগাভাগির একটা কথা কিন্তু উইঠ্যা পইড়ছে। কী ভাগাভাগি, কী কথা—সে সব কই না। আপনে জমিদার—ভাগাভাগির কথা ক্যামনে উঠে, সেডা আমি কী কইব, যার চোদ্দ পুরুষেরও একডা কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ির মাপের জমি নাই। হাওয়াড়া যে উইঠল, এড্‌ডু উইড়ল তাতে বারবারই কয়েকডা জায়গার নামই ঘুরাফিরা উইঠল—পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম, বাংলা, আর বাংলার সঙ্গে মিশ্যাইয়া দুই-একবার আসাম। তো বাংলার একডা নেতার সঙ্গে কোনো কথা হইল না? বাংলার, যে-পার্টিরই হোক, তো একটা মতামত নিব?’ 

‘কেন? হকশাহেবের সঙ্গে তো কথা হয়েছে। নাজিমুদ্দিনের সঙ্গেও বোধহয়—’

‘সে তো নামরক্ষা। আমার য্যান মনে হইল—বাংলারে হিশাবের বাইর কইর‍্যা রাইখছে। আপনাগ মনে হয় নাই?’ 

কিরণশঙ্কর একটু চুপ করে থাকলেন, চোখটাও সরিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, ‘বাংলার আর লিডার কোথায়, সুভাষের পর, যার কথা না শুনলেই না। আমরা তো সব অ্যাড-হক ‘ যোগেনও চুপ করে থাকে। বোঝাতে চায় যে সে কিরণশঙ্করের নরম জায়গা ছুঁয়ে ফেলেছে। যখন সে কথা বলল আবার, তার স্বরটা নেমে গেছে। 

‘কিরণশঙ্করদা, অ্যাদ্দিনে হয়তো আন্দাজ পাইছেন যে আমি যে কংগ্রেস না সেডা কুনো স্বার্থের কারণে না। কংগ্রেস আমার কাছে সত্যি-সত্যি উচ্চবর্ণ হিন্দুপার্টি। কিন্তু সুভাষ বোসরে শরৎবোসরে নেতা মাইনতে আমার ঠেকে না।’ 

‘সে তো সবাই দেখতেই পাচ্ছে শিডিউল্ড কাস্ট পলিটিক্সে আপনি একটা ননকাস্টিস্ট ডাইমেনশন এনেছেন কিন্তু তার ফলে আপনাদের নিজেদের পরিচয়টা আরো স্পষ্ট হয়েছে। হ্যাঁ, আপনি বোধহয় কিছু বলছিলেন— 

‘হ্যাঁ, ওই নিজেগ পরিচয়ের কথাড়াই। কংগ্রেসের পক্ষে গেলে সেটাই আমাগ হারাইবার লাগব। পুরাটা গিল্যা খাবে। কিন্তু তাই বইল্যা তো এডা মানা যায় না যে বাঙালি উচ্চবর্ণের মাথা নাই। তোগ দ্যাশ শিখাইল কেডা? এত বড় আলোচনায় তাগ কোনো জায়গা নাই?’ 

‘ভাল বলেছেন। আমরাও এমন করে ভাবতে পারি না। আপনি ভাবতে পারলেও বলতে পারবেন না।’ 

‘আমি তো চাঁড়াল বইল্যা গৌরব পাই। চাঁড়াল বইল্যাই চোখের দৃষ্টি দেইখ্যাই বুইঝব্যার পারি—এর নজরে কিন্তু আমারে হিশাবের বাইরে ধইরছে। অবহেলা বোঝা যায়।’ 

যোগেন একেবারে সোজা চিফ সেক্রেটারিকে গিয়ে বলে বসল, ইংরেজিতেই, আপনি কি এখন যুদ্ধ ছাড়াও কিছু-কিছু কাজ করছেন? 

চিফ সেক্রেটারি শাহেব খুব ঠান্ডা মানুষ। কম বয়সেই মাথায় টাক পড়েছে। সেই জন্য সিথির একদিকের চুল আর একদিকে ফেলে টাক ঢাকা দেন, ঐ একটা কাজ ছাড়া আর-সব কাজ করছি। কোনো মারামারির মধ্যে নেই আমি। 

তাই তো। এটা তো খেয়াল করিনি। এত রকমের দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি আর আপনি তো হেড অব দি গবমেন্ট, কোথাও তো আপনি নিজে হাজির থাকেন না। 

আমরা সিভিল সার্ভেন্টরা হচ্ছি সরকারের ভিতরের কঙ্কাল, স্কেলিট্যাল ফ্রেম। কোনো লোকের বুকের বা কোমরের হাড় যদি বেরিয়ে আসে—তা হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে— শুনে, যোগেন গলা খুলে হাসে আর চিফ সেক্রেটারি হাসিটা ঠোঁটে বাড়িয়ে দেন।

আমার একটা উপকার করে দিন। ডরম্যান্ট-স্মিথের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিন।

ডরম্যান্ট-স্মিথ? বার্মা-র? 

তাই তো শুনেছি। 

আর কী শুনেছেন? 

আমি এই যুদ্ধটার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছি না। এই শাহেব নাকী বার্মায় যুদ্ধ করে এখানে এসেছেন। উনি নাকী যুদ্ধের ব্যাপার সব থেকে ভাল জানেন। 

হ্যাঁ—আ, হয়তো বার্মার যুদ্ধ জানেন। উনি তো কলকাতায় এসেছেন দিন পনের। আপনি তো এখানকারই মানুষ। আপনি যা বোঝেননি, উনি কী করে বুঝবেন? আপনার সমস্যাটা কী? তাছাড়া উনি তো আর্মির মানুষ। 

সেটাই তো কারণ। নইলে আপনিই তো সবচেয়ে ভাল জানেন। কিন্তু আপনি তো আমাকে বলবেন না। গবমেন্ট, অ্যাসেম্বলি, ক্যাবিনেট এ-সব বাধা আছে। যদি বেআইনি না হয়, তা হলে দিন-না একটা সময় ঠিক করে। আমি ক্ষতি করব না কোনো। 

ছি ছি। তাই কি হয়। আপনার মত মানুষ তো দুর্লভ। 

ও, এত প্রশংসা যখন করছেন তখন আর চান্স নেই। 

একেবারেই না। দেখুন, আপনি আমাকে কী বিপদে ফেললেন। এখন যদি আমি করতে না পারি, আপনি তো ভাববেন আমি ইচ্ছে করে করিনি। বসুন, দেখি বলে। 

চিফ সেক্রেটারি কাউকে কিছু বললেন, তারপরই ফোনটা বেজে উঠল। রিসিভার মুখের কাছে নিয়ে এত ফিসফিসিয়ে কথা বলেন, যোগেন কিছুতেই শুনতে পায় না। শুনতে পাচ্ছে না বুঝে যোগেন সাবধান হয়, চিফ সেক্রেটারি যেন সন্দেহ না করেন সে শোনার চেষ্টা করছে। সে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঘাড় চুলকোতে শুরু করে। 

চিফ সেক্রেটারি ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে সামান্যতম হাসির একটা আওয়াজ তুলে ফোন রেখে দিয়ে কলিং বেলটা টিপলেন। যোগেনকে বললেন, আজই যান। উনি অপেক্ষা করছেন। খুব কাজ-পাগলা মানুষ। আমি বলেছি—আপনি কোস্ট্যাল এরিয়ার ইলেকটেড মেম্বার। আপনিও উনি যদি বরিশাল-নোয়াখালি নিয়ে কিছু জানতে চান, খুব পরিষ্কার করে বলে দেবেন। তা হলে উনিও আপনি যা জানতে চান সেটা বলবেন—যদি ওঁর কোনো আইনি বাধা না থাকে। হি ইজ এ ম্যান অব প্রোফাউন্ড ইনটেলিজেন্স অ্যান্ড হাইলি অ্যাডমায়ার্ড বাই আওয়ার প্রাইম মিনিস্টার। 

হকশাহেবের সঙ্গে দেখা হল কোথায়? 

সরি। আমি স্যার উইনস্টনের কথা বলছিলাম। আপনি একা যাবেন না। শেষে আটকে-টাটকে দেবে, ও আপনার সঙ্গে যাচ্ছে—দরজায় পৌঁছে দেবে। তুমি গাড়িতে নিয়ে যেও। তাঁর বেল শুনে যে এসেছিল তাকে বললেন চিফ সেক্রেটারি। সে টেবিলের দিকে দু-পা এগিয়ে জিগগেস করল কিছু। শাহেব মাথা হেলিয়ে হ্যাঁ জানিয়ে দুই হাত তুলে ডান-বাঁ কিছু বোঝালেন। 

যোগেন উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। চিফ সেক্রেটারি তাঁর হাসিটা হাসলেন। যোগেন নমস্কার জানিয়ে বলল, আপনার মত ব্যস্ত মানুষকে এমন একটা ব্যাপারে কষ্ট দেয়ার জন্য ক্ষমা করবেন। তবে, আমার প্রয়োজন কিন্তু ব্যক্তিগত না। আইনসভার মেম্বারদের মাথায় যদি পরিষ্কার ছবি না থাকে, তা হলে মানুষের কাছে গবমেন্টের কথা বলব কী করে। আমি কি সাক্ষাৎ সেরে আপনাকে জানিয়ে যাব, কী কথা হল। 

নেভার মাইন্ড। আমাকে আপনি যে-কথা বললেন না, সে কথা আমি শুনব কেন। ও কে। থ্যাঙ্ক ইউ। 

যোগেন আবার নমস্কার করে লোকটির সঙ্গে বেরিয়ে যায়। 

লোকটি একটি জিপ গাড়িতেই তাকে নিয়ে গেল, যোগেনকে সামনের আসনে বসিয়ে। চিনতে পারল যোগেন, জায়গাটা, এই রাস্তার শেষে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল থেকে বাঁয়ে ঘুরলে এলগিন রোড। জায়গাটা বেশ নামজাদা জায়গা——স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চ’। ভিতরে অনেকটা মাঠ। ডান দিকে ঘুরিয়ে পরের সমকোণটায় গাড়ি থামল। 

‘আসুন’, বলে লোকটি বারান্দায় উঠে তাকে সোজা নিয়ে গেল, একটা আবছা প্যাসেজ দিয়ে এক ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে ঘরটা দেখিয়ে দিল। যোগেন ইতিমধেই দুই জোয়ানের স্যালুট পেয়েছে। এই দরজার সামনেও এক সান্ত্রী। যোগেন তার সঙ্গের লোকটিকে বলল, ‘আপনে আমার জইন্য খাড়াবেন না। আমি ফিরব্যার পারব।’ লোকটি একটু হেসে ঘুরে চলে গেল আর সান্ত্রী বুটের আওয়াজ তুলে স্যালুট করল। যোগেন প্রতিনমস্কার করে এগতেই সান্ত্রী দরজাটা খুলে দিল। 

একমাথা লাল চুল নিয়ে ডরম্যান-স্মিথ টেবিলের ওপর ঘাড় নুইয়ে কিছু দেখছিলেন। ঘাড় তোলেননি। যোগেন বুঝতে পারে, উনি বুঝেছেন সে এসেছে। নিশ্চয়ই কোনো একটা কিছু থেকে চোখ তুলতে পারছেন না। যোগেন বসেনি। উনি সেটাও টের পেলেন। তারপর, একটা ছোট বই বন্ধ করার মত কিছু একটু আওয়াজ তুলে, ‘স্যরি’, বলে খাড়া শালগাছের মত উঠে দাঁড়ালেন। আপনি মিস্টার মণ্ডল? বসুন— বলে তিনি নিজের চেয়ার থেকে বেরিয়ে এসে একটা চেয়ার টেনে যোগেনকে বলেন, বসুন, তারপর তার পাশের চেয়ারটি টেনে ঘুরিয়ে যোগেনের মুখোমুখি বসে পড়লেন। কোনো ভূমিকা না করে সোজা জিগগেস করলেন, ওরা যখন বলল তুমি কোস্টাল বেঙ্গলের লোক, তখন তো আমিই তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তুমি কি এখনো ওখানে থাকো নাকি ইনার মাইগ্রেসন করে সরে এসেছ? 

যোগেন পুরো হেসে বলল, আমি এখানে থাকতে চাইলেই কি থাকতে দেবে? আমি তো বরিশালের ছেলে। বরিশালে না থাকলে কোথায় থাকব? 

ভেরি গুড। তোমার মত কারো সঙ্গে কথা বলতে যে আমি কী অস্থির হয়ে আছি! জানো, আমি তো ওয়েলস থেকে। ঐ ইংলিশ চ্যানেলের প্যারালাল আছে, উত্তরের দিকে, বিস্টল চ্যানেল, ঐ বিস্টলের অপর পাড়ে কার্ডিফ বলে একটা পুরনো শহরে। এখন, সেখানে তো আর যাওয়া হয় না। যার যেখানে কাজ সে সেখানেই থাকে। আমার মা তাঁর ছেলেমেয়েদের কাছে ঘুরে-ঘুরে থাকেন। আমার প্রথম চাকরি নিয়ে আমি সুমাত্রায় এসেছি। সাউথ এশিয়া—সুমাত্রা। একদিন দু-চারজন গেস্ট এসেছেন, নাথিং স্পেশ্যাল, দেখা করতে এসেছেন, কে কোথাকার লোক কথা হচ্ছে, ওঁরা জানতেনও, আমি বলেছি, ইংল্যান্ড থেকে। গেস্টরা চলে গেলে, মা আমাকে বকে উঠলেন, তুই কেন বললি তুই ইংল্যান্ড থেকে, কেন বললি না ওয়েলস থেকে? আমরা মোটেই স্যাকসন নই। সে মাকে শান্ত করতে পারি না। তারপর থেকে যে . যখন জিজ্ঞাসা করে, আমি বলি, কার্ডিফ থেকে। তখন, তিনি আবার জিগগেস করেন, সেটা কোথায়। আমি তখন বলি, ওয়েলস্-এ। ওয়েলস কী করে জানবে সবাই? তিনি আবার জিজ্ঞাসা করেন, সেটা কোথায়। তখন আমি বলি, গ্রেট ব্রিটেন। ফলে এখন সব জায়গায় আমি কোত্থেকে সেটা বলতেই এতটা সময় লাগে। কিন্তু সেই সময়টা জুড়ে আমার মায়ের হাসিমুখটা দেখতে পাই। নিজের জায়গাকে ভালবাসাটা কি সব ভালবাসার আগে? 

হতে পারে। ভেবে দেখিনি। প্রথম ভালবাসা বোধহয় মা, বুকের দুধের কারণ। দ্বিতীয় ভালবাসা নিজের জায়গা। তখন তো আর-কোনো ভালবাসা নেই। 

শাহেব খুব এক চোট হাসল, একটুও আওয়াজ না করে। 

তোমাদের জায়গা থেকে সমুদ্র কদ্দূর- 

বলা মুশকিল। রোজ চারবার জোয়ার-ভাঁটা, একেবারে সমস্ত খালবিল দিয়ে পুরো জিলায় ছড়িয়ে পড়ে— 

শরীরে যেমন রক্ত? 

তাই বটে। তবে রক্ত তো দেখা যায় না। আমাদের রোজ কার সমুদ্র তো পুকুরের মত আমাদের ঘাটে আসে। 

শাহেবের চোখদুটো অর্ধেক নেমে আসে, ‘ও য়া ন্ডা র ফু ল। দি সি ইজ মাই পন্ড’, তুমি কি কবি নাকী?’ 

না, না। ঠিক উল্টো। উকিল। 

ওঃ, ওয়ান্ডারফুল। তোমার সঙ্গে কথা বলাই তো প্লেজার। 

শাহেব একটু বুঁদ থেকে বলে, চোখটা আধখোলা রেখেই, দেখো, মনে- মনে তোমাকে হিংসে করছিলাম—রোজ জোয়ার-ভাঁটায় থাকো। হঠাৎ মনে হল—তার অসুবিধেও তো আছে। ধরো, আমার মত কেউ তোমার ওখানে গেছি। আমার বড় জোর এটুকু জানা যে নদীতে-খালে জোয়ার-ভাঁটা খেলে। এখন…যখন গেছি তখন তো জোয়ারের জলে তোমাদের ঘাটে পৌঁছে গেছি, কিন্তু ফেরার সময় ভাঁটা হয়েছে। তখন পাড় আর জলের মাঝখানে একটা থকথকে কাদার জায়গা থাকবে তো—যার ওপর হাঁটা যায় না, তাহলে তো আমাকে আবার জোয়ার আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে? 

যোগেন চুপ করে থাকে এতটাই যে শাহেব তার দিকে চোখ তুলে তাকায়, চুপ করে আছো কেন। আমি নিজেকে কতটা স্টুপিড প্রমাণ করেছি। 

যোগেন একটু হেসে বলে, ‘আমি আপনার অসুবিধেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। সত্যি তো এমন অসুবিধে হতেই পারে, কারো। কিন্তু সারা জীবনে কখনো এই অসুবিধের কথা শুনিনি কেন, বুঝিনি কেন, কেউ বলেনি কেন। তাতে মনে পড়ল—যদি একটু দূরে কোথাও যাওয়া হয়, কিংবা দূরে না, হয়তো কিছু ঘুরপাক খেয়ে যেতে হয়, মানে, জোলা থেকে খালে, খাল থেকে বিশাল স্রোতের নদীতে, নদী থেকে আবার খাঁড়িতেতা হলে একটা হিশেব তো করতেই হয় জোয়ার-ভাঁটার, বা, যাওয়া আর ফেরতের প্ল্যান করতে হয়, তখনো তো একটা হিশেব থাকে। হিশেবটা থাকে প্রধানত মাঝির, যেমন গাড়ির তেলের হিশেবটা থাকে ড্রাইভারের। সঙ্গে-সঙ্গে যাত্রীদেরও থাকে। যাত্রীদের মধ্যেও অনেকের বদবুদ্ধি থাকে। ভাঁটার সময় তার ঘাটে নামার সুবিধা। জোয়ার এসে গেলে তাকে উজানে নেমে আবার অনেকটা হাঁটতে হবে। লেগে গেল দুইপক্ষে যুদ্ধ। ঠিক ঠিক। আপনি ঠিক বলেছেন। আমার মনেই পড়েনি—এটা এমন স্বাভাবিক গতিতে হয় যে খেয়ালই থাকে না। আপনি ঠিকই বলেছেন- 

মানে একজন বিদেশীর পক্ষে যাওয়া-আসায় ঝামেলা থাকতে পারে। চিটাগাঙে বোধহয় এই সমস্যাটা নেই, বিরাট একটা সৈকত আছে আর চিটাগাঙে, তো খাল কম। তবে সাউথ নোয়াখালিতে আপনাদের মত, না? ঐ ফেণীর দিকে— 

আপনি কি আমাদের ওদিকে গেছেন? 

না, না, আমি তো রেঙ্গুন থেকে দৌড়ে পালাতে পালাতে সবে এসে পৌঁছেছি। এগুলো সব পুস্তকলব্ধ খবর। 

মনে হচ্ছিল যেন গেছেন, দেখেছেন— 

থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু আমি তো পড়ছিলাম, দেখার সবচেয়ে কাছাকাছি হল পড়া, ম্যাপ দেখা—তাই মনে হচ্ছে আপনার। 

রেঙ্গুন থেকে আপনারা যে সরে আসবেন, কেউ ভাবতে পারেনি। আমি দেখিনি কিন্তু শুনেছি, বার্মাশেলের ট্যাঙ্কার আর খনিতে যে আগুন লাগিয়েছিল সেটার শিখা পাঁচ-সাতদিন ধরে চিটাগং থেকে দেখা যাচ্ছিল। অবশ্য শুনেছি, ইংরেজরাই নাকী আগুন লাগিয়ে সব পুড়িয়ে দিয়েছে যাতে জাপানিরা পেট্রল ব্যবহার করতে না পারে। 

শাহেব তাঁর চওড়া তেলো দিয়ে চওড়া কপালটাকে চেপে ধরে মাথা ঝাঁকাচ্ছিলেন। খুব না হলেও, একটু তো নাটুকে বটেই। তারপর, তিনি নিজেই সংযত হয়ে গলাতে একটা খাঁকারি দিয়ে বললেন, যারা বলেছে আগুন আমরাই লাগিয়েছি তারাই ঠিক কথা বলেছে। রেঙ্গুন, মানে, বার্মা থেকে যে, উইড্র করা হবে এটা এই যুদ্ধের সর্বোচ্চ কর্তারা আগেই ঠিক করেছিলেন। কিন্তু আমরা যারা এক-একটা ফ্রন্টের কর্তা, আমাদের জানানো হয়নি। সেটাও প্ল্যানিঙের পার্ট। এটা জেনে আমি এত খেপে গিয়েছিলাম যে আর্মি ছেড়ে দেব ঠিক করি। কিন্তু আমার দেশ যখন হারছে তখন আর্মি ছেড়ে যেতে পারি না। 

এখানেও কি তাই হবে? ডিস্ট্রিক্ট থেকে অদ্ভুত সব খবর পাচ্ছি। নৌকো, সাইকেল সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। নৌকো পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যত ধান-চাল সব কিনে নেয়া হচ্ছে। কলকাতাতেও নানারকম অজানা ব্যাবসা চলছে। কন্ট্রোল, পারমিট, পারমিট, লাইসেন্স, ব্ল্যাকমার্কেট, এই সব শুরু হয়েছে। শুনছি—কলকাতাও ছেড়ে দিয়ে লড়াইটাকে আরো পশ্চিমে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি সেটা একটু বুঝতেই আপনার কাছে এসেছি। আমি দেশে যাব। সবার কাছ থেকে খারাপ খবর পাচ্ছি। 

মিস্টার মণ্ডল। আমি জানলেও আপনাকে বলব না। এটা যুদ্ধ। পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ। যুদ্ধ বোধহয় মানুষের বিচারশক্তি ব্যবহারের সবচেয়ে কঠিন জায়গা। যুদ্ধ চলে সম্পূর্ণ আস্থার ওপর। আর তার উল্টো ষড়যন্ত্রের ওপর। রেঙ্গুন থেকে সরে আসা হবে—এটা রাজনৈতিক নেতা ও যুদ্ধের সেনাপতিদের সিদ্ধান্ত। এটাও সেই সিদ্ধান্তের অংশ যে এরিয়া-কম্যান্ডার বা সেক্টর-কম্যান্ডারদের জানানো হবে না, শেষ মুহূর্তে আদেশ দেয়া হবে, ‘উইথড্র’। কেন? যদি ফ্রন্ট-কম্যান্ডার লেভেল পর্যন্ত জেনে যায় তা হলে, যুদ্ধের ধরণে সেটা ধরা পড়বে আর জাপান মিলিটারির যা চোখ তাতে তারা বুঝে ফেলবে। আমি এ-কথা মানি না। এমন ভাবার মধ্যে যে-সোলজার মুখোমুখি এনিমিকে ফেস করছে, তার ইনটিগ্রিটিকে সন্দেহ করা হচ্ছে। আমার মনে হয়, একমাত্র সেই যুদ্ধই জেতা যায়, যে-যুদ্ধে জিততেই হবেটা প্রধান শক্তি। আমাদের এরিয়া কম্যান্ডারকে যখন আমি এ কথা বলি উনি হেসে বলেন, যাঁরা আমাদের যুদ্ধের কৌশল ঠিক করছেন, তাঁরা চাইছিলেন বার্মা থেকে উইড্রয়ালকে এমন নাটকীয় ও অপ্রত্যাশিত করতে, যাতে জাপান অহংকারে অন্ধ হয়ে যায়। 

যোগেন জিজ্ঞাসা করে, আপনাদের বার্মিজ উইড্রয়াল কবে থেকে শুরু হল? 

শাহেব একটু হেসে বলেন, যুদ্ধের কালক্রম তো যুদ্ধ-চলার সময় তৈরি হয় না। যুদ্ধে কে জিতল সেটা ঠিক হয়ে যাবার পর তৈরি হয়। যা হোক, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে বলা যায়, এ বছরের নয়ই মার্চ, অফিসিয়ালি। আর উইড্রয়্যাল শেষ হল, অফিসিয়ালি শেষ হল ৪৯ দিন পর ২৮ মে, ফটটি-টু, জেনারেল ওয়াভেল-এর ঘোষণার পর। কিন্তু বোম্বার্ডমেন্ট তো শুরু হয়েছে ৪১-এর ডিসেম্বর থেকে। আর, সিলেকটিভ ডিন্যায়াল, আমাদের পক্ষ থেকে ভাঙতে ভাঙতে পোড়াতে পোড়াতে পেছিয়ে যাওয়াও শুরু হয় ঐ সময়ই, যদিও ফ্রন্টে আমরা জানতাম না। 

আর, চার্চিল-রুজভেল্টের মিটিং? মানে সেই বিখ্যাত মিটিং? আর্কেডিয়া? শুরু হল ডিসেম্বর, একচল্লিশে, আর শেষ হল তিন সপ্তাহ পর ১৪ জানুয়ারি, বেয়াল্লিশে। 

তা হলে যখন চলছে ঐ আর্কেডিয়া, তখনই চলছে বার্মা উইড্রয়াল?

তাই কী? কেন? আপনি যেন কী একটা হিশেব খুঁজছেন? 

সেটা আবার একটু বেশি বেশি বলা হয়। হিশেব কী খুঁজব? তবু, কাগজের খবরও যদি সাজানো যায় কালানুক্রমিক, তাহলে বার্মা যুদ্ধ থেকে উইথড্রয়্যাল, আর অ্যাংলো-আমেরিকান ইউনাইটেড নেশনস চুক্তি নিয়ে কথা শুরু হল প্রায় একই সময়ে—ঐ ডিসেম্বরে, মানে ঐ তিন সপ্তাহে মোটামুটি। আমি বলছিলাম—দুটো তারিখের এতটাই মিল। তা হলে তো ধরে নিতে হয় প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের প্রথম এই মিটিং যখন তৈরি হয়েছে তখনই বার্মা যুদ্ধে উইড্রয়াল শুরু হয়ে গেছে। মিটিংটা রেঙ্গুনে করলেই পারতেন—! যদিও রেঙ্গুনে বসে ঐ জোড়া-ডিসিশন নিতে পারতেন কী, যে ‘ইউনাইটেড নেশনস’ জার্মানিকে প্রথম অপরাধী হিশেবে মার্কা দিয়েছে।

আপনি তো মশায় এ গ্রেট হিস্টরি অ্যানালিস্ট গিভিং ইয়োর কমেন্টস অন ইভেন্টস দ্যাট হ্যাভ নট ইয়েট হ্যাপেন্ড। 

আমার যুদ্ধ ইতিহাস ও ভুগোল নিয়ে কোনো বিশেষ জ্ঞান নেই, অ্যাসেম্বলি লাইব্রেরিতে যে—কাগজগুলো বাইরে থেকে আসে, সেগুলো পড়তে পড়তে মনে একটা সময়পঞ্জি আর জায়গাগুলো সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে—সেটা আমার পেশাগত ব্যাপার। আমাদের যখন একটা ক্রিমিন্যাল কেসে ডিফেন্ড করতে হয় তখন আমরা অকুস্থলের একটা ম্যাপ ছকে নেই। আমার ডিফেন্সের বিপক্ষে যাবে তেমন ডিটেল বাদ দিয়ে। 

সেটা তো একটা আলাদা ক্ষমতার ব্যাপার। আমি তো আর পারব না। 

একেবারেই কোনো ক্ষমতা-টমতার ব্যাপার না। কারণ, ল-তে কেউ তো ঘটনাস্থল বা উপস্থিত লোকজন বা রোদের তাপ বা জলো হাওয়া, যা ঘটনার সঙ্গে জড়ানো, সে কথা আনছে না। আপনাকে শুধুই অ্যাবস্ট্রাক্ট করতে হচ্ছে। উদ্দেশ্য, যাতে ক্রাইমটা আইনের ধারার খাপে সেঁটে যায়। 

শাহেব দুটো ভুরু তুলে তাঁর বড় কপালে সমান্তরাল লাইন তৈরি করেন। যোগেন বলে, আপনার কাছে আমি এসেছি জানতে। আমি দেশে যাব। বন্ধু-বান্ধব চেনাজানা মানুষদের কাছ থেকে চিঠি পাচ্ছি, বাড়ি থেকে চাল নিয়ে যাচ্ছে, ক্ষেত থেকে সরিয়া দিচ্ছে, নৌকো পুড়িয়ে দিচ্ছে। আমি কলকাতায় থেকে আইনসভা করছি। অথচ এসব কেন হচ্ছে, কী হচ্ছে তার কিছুই বুঝতে পারছি না। কেউ আমাকে বুঝিয়ে দেবে না—এটা আমি জানি। কিন্তু এটা কি যুদ্ধের অংশ? যে সব নাম শুনছি তারা তো আমাদের মতই দেশের লোক। তাহলে তারা কি যুদ্ধের সুযোগ নিচ্ছে? 

আপনি জানতে চাইছেন সব কাজেরই তো অধিকার থাকে। এখানে তিনটে অধিকার থাকতে পারে—এক যুদ্ধ ও আর্মি, দুই সিভিল গভর্নমেন্ট, তিন প্রফেশন্যাল অপরাধী যারা লোকজনকে ভয় দেখিয়ে পয়সা কামাচ্ছে। ইয়োরোপে এটা কোনো সমস্যা নয়। শিক্ষার একটা ন্যূনতম হার আছে। পাবলিকের একটা দায়িত্ব আছে। সিভিল অথরিটি আর মিলিটারির সম্পর্কটা একেবারে নির্দিষ্ট। কিন্তু কলোনিতে এটা সমস্যা। শিক্ষার অভাব তো আছেই। তাছাড়া মিলিটারিই বলুন আর সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বলুন—সবাই তো লোকদের শাসন করছে। একটা মতলববাজ লোক তো সেই ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতেই পারে। বার্মাতে দেখেছি, এখানেও দেখছি—এটা আমাদের সবচেয়ে বড় ফাঁক। এর ফলও ভয়াবহ হতে পারে। আপনার মত একজন পাবলিকম্যানকে আমার মত একজন অফিসারের কাছে এসে জানতে হচ্ছে নৌকোপুড়নো, চাললুট ইত্যাদি কি যুদ্ধের ব্যাপার নাকী যারা আসলে যুদ্ধের ক্ষতি করছে তেমন নোংরা লোকদের ব্যাপার। বাংলা তো একটা ফ্রন্ট হয়ে গেছে। আপনারা তো যুদ্ধ-অঞ্চল। আমার মনে হয়—আপনি একটা আধা-ব্ল্যাক আউট বা দুটো বাফার ওয়াল বা পার্কে ট্রেঞ্চ কেটে এটা সবাইকে বোঝাতে পারবেন না যে এটা একটা যুদ্ধ-অঞ্চল। 

আমি তো আর জানতে চাইতে পারি না, আপনার মত হাই অফিসারকেও যদি না-জেনে থাকতে হয় যে আপনি পালাচ্ছেন না এগচ্ছেন—তা হলে আমরা কী করে বুঝব? 

ডরম্যান-স্মিথ শুধু একজন মান্যগণ্য আর্মি অফিসারই ছিলেন না, তাঁর একটা খাতিরও ছিল মিলিটারিতে ও সিবিল গবর্নমেন্টে দিল্লিতে কিংবা লন্ডনে। এ খাতিরটা তৈরি হয় নানা উপাদানের ভাল মিশেলে। যদি ওঁর অর্থ সম্পত্তি যথেষ্ট থাকে, যদি তাঁর মিলিটারিতে আসার অন্য কোনো বাধ্যতা না থাকে, যদি উনি একেবারে ট্রেঞ্চের সোলজারের সঙ্গে বিপন্ন রাত কাটান, যদি উনি তাঁর চাইতে বড় অফিসারদের সঙ্গে মত-পার্থক্য প্রকাশ্যে জানান, যদি উনি সব সময়ই বড় পদের ও ছোট পদের অধিকারীর মধ্যে কোনো বিবাদে সব সময়ই ছোট পদের অধিকারীর পক্ষে থাকেন—সেটা মেজর জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ারের মধ্যেই হোক, আর লাইনস-নায়েক ও তার সহকর্মী লাইনস-ম্যানের সঙ্গেই হোক, তা হলে তাঁর যেমন খাতির হয়, তেমনই ছিল তাঁর সম্পর্কে খাতির। তাঁর সম্পর্কে একটা গুজবও ছিল যে তিনি স্পেশ্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্টে মিলিটারিতে এসেছেন। তাঁর কাজটা কী, সেটা খুব স্পষ্ট ছিল না আর উনি ইউনিফর্ম পরতেন না বলে, তাঁকে নিয়ে একটু রহস্যও ছিল। উনি ওঁর মত বা ধারণা খুব মজা করে প্রকাশ্যেই বলতেন, যুদ্ধটা কী করে সবচেয়ে গোপন ব্যাপার হয়, এটা আমি হাজার মাথা খাটিয়েও বুঝতে পারি না। ধরুন, যুদ্ধটা তো একটা স্বাভাবিক অবস্থা নয়। যেমন, আপনার একটা কার্বাঙ্কল হয়েছে। যদ্দিন ঘরোয়া ও টোটকায় চলল, চলল। কিন্তু যদি ফেটে যায়, তা হলে হয় তোমাকে দৌড়ে হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে যেতে হবে, নয়তো, সবচেয়ে কাছের কবরখানায় গিয়ে নাম লেখাতে হবে। এ দুটোর মাঝখানে তো কিছু হয় না। যুদ্ধটা তো কারবাঙ্কল, ফেটে গেছে। এখন আর গোপনতা কী? সবাইকে সব জানিয়ে দিলেই তো সবাই মিলে যুদ্ধটা ভাল করে করা যায়। তা নয় তো, টপ সিক্রেট, প্রাইভেট, এমারজেন্সি, হায়েস্ট প্রায়োরিটি—এত কিছু। মানে, যাকে এত লেবেল সেঁটে কিছু জানানো হচ্ছে, তিনি ইতিমধ্যেই সেটা জেনে গেছেন। 

চিফ সেক্রেটারি যোগেনের অনুরোধে যে এই অ্যাপয়েন্টমেন্টটা এমন তাড়াতাড়ি করিয়ে দিলেন, তার কারণ, মাত্র দু-দিন আগে ডরম্যান-স্মিথকে লন্ডন থেকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে উনি কি জরুরি কাজ হিশেবে ইস্টার্ন ফ্রন্টের সিভিল-মিলিটারি সংযোগের (লিয়াজোঁ) দায়িত্ব নেবেন, ডিন্যায়াল পলিসি কার্যকর করার দায়িত্বসহ। 

ডরম্যান-স্মিথ ইতিমধ্যেই কোস্ট-লাইন নিয়ে বলতে পারেন এমন স্থানীয় সংবাদদাতাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। মণ্ডল সে খবরও দিতে পারবে, মণ্ডলও তার যা দরকার তা জেনে নিতে পারবে। 

চিফ সেক্রেটারি গত মাসের শেষ পনের দিনের যে রিপোর্ট অনলি ফর ভাইসরয়, গভর্নরের কাছে পাঠিয়েছেন, যে রিপোর্ট দেখে ও তাঁর ইচ্ছে মত আরো কথা লিখে গভর্নর তাঁর রিপোর্ট জানাবেন ভাইসরয়ের কাছে, সে-রিপোর্ট ছোটলাট নিজের হাতে লেখেন। টাইপ যাঁরা জানেন, তাঁরাও টাইপ করেন না-কার্বনপেপার টেপ এগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হয়। চিফ সেক্রেটারির কাছ থেকে যে রিপোর্ট ছোটলাটকে পাঠানো হয়েছে ও যে রিপোর্টটাও উনি ওঁর রিপোর্টের সঙ্গে পাঠাবেন, তাতে এক নম্বরে ছিল, ডিন্যায়াল পলিসি আপাতত উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রয়োগ করা হচ্ছে, চিটাগঙে কমপ্লিট ইভ্যাকুয়েশন। ডিমোলিশন অব চিটাগং তো মিলিটারিই করবে কিন্তু শত্রু আসার আগে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চিটাগং ছাড়তে পারবে না। ছাড়লে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, চুরিজোচ্চুরি, খুনোখুনি, আগুন লাগানো শুরু হয়ে যাবে। 

এর আগের রিপোর্টেও চিফ সেক্রেটারি লিখেছিলেন, কলকাতা বন্দর থেকে দিনে ১০টার বেশি জাহাজ ছাড়া যায় না। কলকাতা থেকে নিতান্ত প্রয়োজনের বাইরের সব লোকজন, অফিসপত্র ও মালপত্র ইভ্যাকুয়েশন যদি প্যানিক তৈরি করে, তা হলে পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে। কলকাতা হঠাৎ আক্রান্ত হলে, এখানকার লোকজন আটকা পড়ার ভয়ে পাগল হয়ে যাবে। কলকাতা থেকে এখন পর্যন্ত সাতলক্ষ লোক সরেছে। রোজ দেড় লক্ষ মত শড়ক বেয়ে যেতে পারে। 

চিফ সেক্রেটারি আন্দাজ করছেন—বার্মার মত বেঙ্গল থেকেও আর্মি উইথড্র করবে ও বোমা মারার যুদ্ধ চালাবার উপযুক্ত খোলা জায়গায় জাপানকে নিয়ে যাবে। কলকাতায় আকাশের যুদ্ধ কি লন্ডনের মতই বীভৎস হবে? চিফ সেক্রেটারির এমন স্বগত জিজ্ঞাসায় একটা মন খারাপও লেগে ছিল। এই সময় লন্ডনে থাকতে পারলে দেশের জন্য কিছু খাটা যেত! 

কলকাতায় যুদ্ধে খাটাও তো দেশের জন্যই খাটা। এখন ভারতই ব্রিটেনের পা-রাখার জায়গা। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *