১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৬৪. কালানুক্রমিক ও বিষয়ানুক্রমিক

১৬৪. কালানুক্রমিক ও বিষয়ানুক্রমিক 

কোন কাল? 

ঐ ৩৭ থেকে ৪৭–দশ বছর। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ থেকে মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদ পর্যন্ত। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন থেকে দেশভাগ, একটি কেন্দ্রীয় সরকারের জায়গায় দুইটি কেন্দ্রীয় সরকার, একটি সেনাবাহিনীর জায়গায় দুইটি সেনাবাহিনী, একটি সংবিধানের জায়গায় দুইটি সংবিধান, একটি রাষ্ট্রীয় পতাকার জায়গায় দুইটি পতাকা। ঐ দশ বছরের মধ্যেই পড়বে—জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে আগস্ট বিপ্লব, মুসলিম লিগের নেতৃত্বে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম, আম্বেদকারের নেতৃত্বে দলিত-আন্দোলন ও বামপন্থী নেতৃত্বে বাংলায় সাম্রাজ্যবিরোধী আন্দোলন। 

ঐ দশ বছরের মধ্যেই পড়বে—সুভাষচন্দ্রের বিগ্রহের পুনস্থাপন, আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধ জাতীয় করণ ও সর্বত্র দলিত আন্দোলনকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভাগনামা। 

ঐ দশ বছরের মধ্যেই পড়বে—৪৩ ও ৪৬-এর নগ্নতা, ক্ষুধা ও রিরংসায় বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ মরণ। 

ঐ দশ বছরের মধ্যেই পড়বে—স্বাধীন হয়ে যাওয়া দুটি দেশ ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসে প্রতিটি ঘটনায় কেমন উৎরিয়ে যাচ্ছে তাদের পূর্ববর্তী রেকর্ড। 

কিন্তু ঐ দশবছরের মধ্যে পড়বে না—ক্রিপস, ক্যাবিনেট মিশন, ওয়াভেল ও মাউন্টব্যাটেনের ছলদৌত্য। 

বিষয় কী? 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আখ্যান বা ইতিহাস নয়। স্বাধীনতা আন্দোলন মানে তো ইংরেজ-বিরোধিতা, যেমন হয়েছিল ১৮৫৭-তে পাল্টা সম্রাট ঘোষণা করে। ইংরেজদেরও কিছুটা জায়গা ছেড়ে বা নিজেদের জন্য কিছুটা জায়গা কেড়ে তো স্বাধীনতা আন্দোলন হয় না। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কোথাও কোথাও কোনো কোনো প্রদেশে দশ বছরই মন্ত্রিসভা ছিল। বেশির ভাগ প্রদেশেই ছিল না। না-থাকার কারণ—কংগ্রেস তার সরকারগুলিকে হুকুম দিয়েছিল, ভারতকে, মানে কংগ্রেসকে একটি কথাও না বলে ভারতের হয়ে ভাইসরয়ের যুদ্ধঘোষণা অন্যায়-কংগ্রেস তাই পদত্যাগ করেছে। অকংগ্রেসি প্রদেশগুলিতে মেম্বাররা আয়ারাম-গয়ারাম হয়ে গেছেন। 

যদি এমন একটা ভাগ কল্পনা করে নেয়া যায়, তাহলে ব্রিটেনেরও একটা জাতীয়-আখ্যান থাকে তাহলে তার সূচি হতে পারে ব্রিটিশ-প্রশাসন-পদ্ধতিতে তৈরি ও ব্রিটিশ রাজনীতির উদ্দেশ্য-অনুযায়ী ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক আলোচনার পর গৃহীত ভারত শাসনের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন সংস্কার ও বিভিন্ন আইন। তাতে যদি গভর্নর-জেনারেল ভাইসরয়ও হন, বা, বড়লাটের একটা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলও হয় পরামর্শ দেয়ার জন্য, বা, মুসলমানদের জন্য কিছু চাকরি সংরক্ষিত রাখা হয়, এমন সংরক্ষিত আসন যদি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে—যেমন, টাউন কমিটি, ইউনিয়নবোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটি, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড—কিছু থাকে, চরম ক্ষমতা সরকারি অফিসারের কব্জায় থাকা সত্ত্বেও তেমন সংরক্ষণ যদি ব্রিটিশ সরকারের একটা নীতিই হয়ে যায়—তাহলে এই সবই তো ব্রিটিশের জাতীয় আখ্যানের অন্তর্গত, বড়জোর একটা আলাদা অধ্যায়ের নাম দেয়া যায় ‘উপনিবেশে ব্যবহার্য নীতি’ ও আরো বড়জোর ভারতের জন্য একটা উপপরিচ্ছেদও থাকতে পারে, দি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, নাম দিয়ে। কারণ, সত্যি তো, ভারতের মত বড় কলোনি কারোই আর ছিল না। 

কিন্তু ইতিহাসের বিষয়ের এমন একটা ভাগাভাগি কল্পনা করে নিতে হবে কেন? এই ভাগাভাগিই তো ইতিহাসের বিষয়। তাহলে? 

ব্রিটিশ জাতীয়-আখ্যানের অন্তর্গত এই সব নীতি, নিয়ম ও আইন ভারতবাসীর ওপর ব্যবহৃত হয়েছে, সুতরাং এটা ভারতের কলোনি-অস্তিত্বেরই অংশ এই যুক্তি মানলে, কি এটাও মেনে নেয়া হল না যে কলোনি-অস্তিত্বও আমাদের জাতীয় আখ্যানের অন্তর্গত? 

বাইরের দিক থেকে মনে হতে পারে, বাঃ, কলোনিই-ছিলাম আমরা আর তার কাহিনী আমাদের হবে না? 

ভিতরের দিক থেকে মনে হওয়া উচিত, কলোনি কি কেউ নিজের ইচ্ছেয় হতে পারে? তাকে কলোনি করা হয় বলেই সে কলোনি হয়। তাহলে কলোনি কী করে জাতীয় আখ্যান হতে পারে? কলোনি তো কখনোই ঐতিহাসিক কার্যকারণে অবশ্যম্ভাবী নয়। বা, কোনো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার পরিণতি নয়। 

যোগেনের তেমন কোনো বাইরের দিক বা ভিতরের দিক ছিল না। তেমন কোনো জাতীয় বা কলোনি-আখ্যানও না। 

যোগেন সরেজমিন হিশেব নিতে বেরিয়েছিল, সরকার আইনসভায় যে কথা দিয়েছে বছর দুই আগে—সরকারি চাকুরিতে তপসিলিদের জন্য ১৫ শতাংশ সংরক্ষিত থাকবে, সেটার অবস্থা কোন জিলায় কী রকম? ১৯৪২-এ গ্রামাঞ্চলে সৈন্য রিক্রুটের ক্যাম্প বসেছে। যোগেন জানতে চায় সরকারি চাকরির মধ্যে মিলিটারির চাকরি পড়ে কী না। যদি না পড়ে, তাহলে পড়ানোর উপায় কী? 

এগুলো যোগেন আইনসভাতে প্রশ্ন করে আরো বিশদে জানতে পারত, আরো অনেক মেম্বারের সমর্থন পেত। কিন্তু পাঁচ বছরে আইনসভায় যোগেন নিশ্চিত জেনেছে যে আইনসভার বিশদ কদ্দুর পর্যন্ত বিশদ ও অন্য মেম্বারদের সমর্থন কদ্দুর পর্যন্ত সমর্থন। দু-বছর আগে মুসলমানদের জন্য চাকরির শতাংশ সংরক্ষণের রিনিউয়্যালের সময় যোগেন আরো সব তপশিলি মেম্বারদের সঙ্গে মন্ত্রীদের কাছে দাবি করেছিল, এবার মুসলমানদের শতাংশের সংরক্ষণের রিনিউয়্যালের সঙ্গে তপশিলিদের জন্য সংরক্ষণের হার ঘোষণা করতে হবে। হকশাহেবের প্রথম মন্ত্রিসভার নাম-করা হিন্দু নেতারাই আপত্তি করেছিলেন—নলিনীরঞ্জন সরকার, স্যার বিজয়, মহারাজা শ্রীশ। এঁরা সকলেই বলেছিলেন, শিডিউল কাস্ট তো তৈরিই হল সেদিন, এর মধ্যে চাকরির জন্য সংরক্ষণের দরকার কী? হকশাহেব নাকি বলেছিলেন, শ্রীশ নন্দীকেই, ওরা যে-জাতের অগ চাকরিও তো সেই জাতেরই হব, তাতে আপনাগ কারো চাকরি যাওয়ার ভয় নাই তো—আপনারা তো মহারাজ আর স্যার। মন্ত্রিসভার এই কথা যোগেনের কাছে ফাঁস করে দেন হকশাহেবই। রাইটার্সে আচমকা বারান্দায় দেখা হয়ে যাওয়ায় হকশাহেব যোগেনকে বলেন, ‘তুমি তো বাসট্রামেই যাতায়াত করো?’ 

‘সে-বিষয়ে আপনার কাছে কি কোনো খবর আছে?’ 

‘আছে বইল্যাই তো জিগাই। মেম্বারদের মইধ্যে যারা বলাকওয়া করে তাগ কয়জনের গাড়িতে আসার সুযোগসুবিধা অ্যাহনো হয় নাই। এইডা এনকোয়্যারি কইরতে গিয়্যা জানি, তোমার অ্যাহনো সে সুবিদা হয় নাই। আমি মনে মনে তাই বল্যাম, বরিশালের বাঙাল তো! বোধোদয় হইতে টাইম লাগে। বামুন-বইদ্য হইলেও তো আশা ছিল। তাই কইতেছিল্যাম—ট্রামেবাসে যে চড়ো, পকেটমার হয় নাই?’ 

‘কী যে কন! এত কম বুদ্ধি হইলে পকেটমার হওয়া যায়? তাইলে তো স্যায় প্রাইম মিনিস্টার অব বেঙ্গল অইত।’ 

হকশাহেব হো হো হেসে যোগেনের কাঁধে হাত দিয়ে বাহবা জানিয়ে বলেন, ‘পকেটের দায় না-হয় পকেটমারগ বিবেচনা বোধের উপর ছাইড়া রাখছ? বাড়িতে সিঁদকাটা কী দিয়্যা সামলাও? সে তো মিনিস্টার হইয়াই আছে’। যোগেন কোনো উত্তর না-দেয়ায় হকশাহেব বুঝে নেন, যোগেনে বুঝেছে হকশাহেব কিছু বলতে চান। হকশাহেব গলা নামিয়ে ইংরেজিতে বলেন, তোমাদের রিজার্ভেশন তো পাশ হয়ে যেত, তোমাদের স্বধর্মীরাই বাগড়া দিচ্ছে, একটু চেঁচামেচি করো। বলে আবার খুব জোরে হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতেই তাঁর লিফটের দিকে চলে গেলেন। 

হকশাহেব চলে যাওয়ার পরও যোগেন দাঁড়িয়েই ছিল–হকশাহেবের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে। কাছাকাছি দু-একজন চাপরাশি-দারোয়ান ছিল। যোগেনের অমন দাঁড়িয়ে থাকায় তারাও যেন হক-মণ্ডল কথাবার্তার ভাগীদার হয়ে গেল। তারা যেন সবটা বুঝেছে, এমনভাবে হেসেও উঠল, হাততালিও দিল। যোগেন তাকালে একজন বলেও উঠল, ‘এইসা দিলওয়ালা লিডার…।’ 

যোগেন তারপর ‘ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল কাস্ট অ্যাসেম্বলি পার্টির সম্পাদক হিশেবে আইনসভার লনে সমস্ত পার্টির তপশিলি এমএলএদের পরদিন জড়ো হতে বলল। পরদিন সে মন্ত্রীদের নামও বলতে পারল যারা তফশিলদের চাকরির শতাংশ কোটায় আপত্তি করেছে। সেই সমাবেশ একটা স্মারকপত্রও তৈরি করল। গভর্নরের উদ্দেশে এক কপি ও প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে আর-এক কপি। 

যা-হোক, সেবারই সংরক্ষণ পাশ হল। 

সামনের বছর আইনসভার ইলেকশন। যোগেন জানে, ‘বাউনবাড়ি নেমন্তন্ন, না-আঁচাইলে বিশ্বাস নাই।’ সংরক্ষিত থাকলেই যদি চাকরি হত তাহলে শুদ্দুররা তো পুরাণের কালেই অমৃতের পুত্র হয়ে যেত, তাই তো বলেছিল উপনিষদে—কিন্তু সবাই অমৃতের পুত্র হলে আর মৃতপুত্র কে হবে? 

.

স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস বিশ-একুশ দিন দিল্লিতে থেকে লন্ডনে ফিরে গেলেন কেউই তাঁর প্রস্তাব মানলেন না বলে। তাঁর চলে যাওয়াটা একটু আকস্মিক ছিল। কোনো প্রমাণ নেই, তবু এখন আভাস পাওয়া যাচ্ছে—ভাইসরয় লিনলিথগ-র সঙ্গে তাঁর মত মেলেনি বলেই তিনি আর অপেক্ষা করেননি। কিন্তু এখন এ-খবরও তো বেরুচ্ছে যে ক্রিপস-এর প্রস্তাবে রাজাগোপালাচারি, জওহরলাল ও আজাদ রাজিই ছিলেন। গান্ধীজিই সব ভণ্ডুল করে দিলেন। 

ক্রিপস ভারত ছাড়লেন ১২ এপ্রিল। এক সপ্তাহ পরে ১৯ এপ্রিল ‘হরিজন’-এর জন্য গান্ধীজি লিখলেন ও ২৬ এপ্রিলের ‘হরিজন’-এ সেই লেখাটা বেরবার পর প্রথম আঁচ পাওয়া গেল যে ভিতরে-ভিতরে গান্ধীজি কতটা জঙ্গি হয়ে উঠেছেন। যেন এটা গান্ধীজির ভাষাই নয়, ভাবনা তো নয়ই, অথচ স্পষ্টতা একেবারেই গান্ধীজির নিজস্ব। গান্ধীজি লিখলেন, ‘সিঙ্গাপুরে যেমন ব্রিটিশ শক্তি সিঙ্গাপুরকে তার নিয়তির হাতে ফেলে চলে এসেছে, ভারতেও যদি তাই করে তবে অহিংস ভারত কিছুই হারাবে না ও সম্ভবত জাপানও ভারতকে একা থাকতে দেবে। তাঁর মতে, ‘ভারত ও ইংল্যান্ড উভয়েরই স্বার্থে যথাসময়ে যথাশৃঙ্খলায় ব্রিটিশশক্তির ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার ওপর সব নির্ভর করে।’ এও বললেন, ‘যুদ্ধের পরে স্বাধীনতার ব্যাপারে আমার কোনো উৎসাহ নেই। আমি এখনই স্বাধীনতা চাই। 

গান্ধীজির সব আন্দোলনের ভিতর যেমন একটা যোগসূত্র থাকে, তেমনি যোগসূত্র আছে ১৯২০-এর খিলাফৎ-এর সঙ্গে ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’র। কিন্তু এগুলো তো ভাবের কথা, কোনো প্রমাণ সাপেক্ষ কথা নয়। ম্যাকিয়াভেলির মত ধূর্ত, নেপোলিয়ানের মত রণবিদ—এসব কথার বারোক-বাহার আছে। তাতে গান্ধী-মানুষটি বদলে যায়। সেই কল্পিত বদলের ফলে গান্ধী হয়ে ওঠেন শব্দার্থে অতুলনীয়। তাঁর সঙ্গে তুলনীয়তা উত্থাপনই হয়ে যায় নৈতিক অপরাধ। জিন্না নিজে সেই তুলনীয়তা উত্থাপন করেছিলেন ও ব্রিটিশ ভারতের সামান্য কমবেশি ১০কোটি মুসলমানকে সেই তুলনীয়তায় কমবেশি বিশ্বাস করিয়েছিলেন। আম্বেদকর সেই তুলনীয়তা উত্থাপন করেছিলেন ও তখনকার ব্রিটিশ ভারতের কমবেশি ১০কোটি দলিতকে সেই তুলনীয়তায় বিশ্বাস করিয়েছিলেন। 

গান্ধীজি তাঁর সেই অতুলনীয়তা অসম্ভব সাহস ও সঙ্কটের সঙ্গে রক্ষা করেছেন। রক্ষা করতে সংকটও ঘনিয়ে তুলেছেন। ‘ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব গ্রহণের পরদিন ভারতব্যাপী অভূতপূর্ব দমন -পরিকল্পনা পাকা করতে লিনলিথগ যখন সমস্ত ব্যবস্থা শেষ বারের মত জরিপ করছিলেন, কোন নেতাকে কোন জেলে রাখা হবে সেসব বারবার যাচাই করছিলেন, তখন ভারতের সব প্রাদেশিক গভর্নর আলাদা করে তাঁকে একটা কথাই জানাচ্ছিলেন যে গান্ধীজি যে-মুহূর্তে জেলে অনশন শুরু করবেন, সেই মুহূর্তে তাঁকে যেন জেলখানা থেকে বের করে নিয়ে তাঁর আশ্রমে ডাম্প করা হয়। 

গান্ধীজি নিজেই বলেছিলেন, ক্রিপস চলে যাওয়ার একসপ্তাহের মধ্যে যে-সোমবার তাঁর মৌন দিবস ছিল, সেই সোমবার তাঁর এটা মাথায় আসে। 

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির একটা মিটিং ডাকাই ছিল। গান্ধীজি একটা প্রস্তাবের খশড়া তাদের পাঠিয়ে দিলেন। সে খশড়াতে বলা হল, ১. ক্রিপস আসার পর যে-নগ্নতায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে দেখা গেল, তেমন আগে কখনো ঘটেনি, ২. ব্রিটেনকে এই মুহূর্তে ভারত ছেড়ে চলে যেতে হবে, ৩. স্বাধীন দেশ হিশেবে ভারতের প্রথম কাজ হবে, জাপানের সঙ্গে শান্তিস্থাপন করা, ৪. যদি জাপান শান্তিস্থাপনে সম্মত না হয় তা হলে জনসাধারণকে অহিংস অসহযোগ করতে ডাক দেয়া হবে, ৫. ইংরেজ-শাসন ভারতের অভিশাপ, ইংরেজ এদেশ থেকে চলে গেলেই ভারত শাপমুক্ত হবে, ৬, ভারতের সঙ্গে জাপানের কোনো শত্রুতা নেই। তার শত্রুতা ব্রিটেনের সঙ্গে। 

ওয়ার্কিং কমিটির যাঁরা মেম্বার ছিলেন তাঁদের মধ্যে বল্লভভাই, রাজেন্দ্রপ্রসাদ ও কৃপালনী বিশ্বরাজনীতি খুব কিছু জানতেন না, যুদ্ধের কোনো খবরও রাখতেন না। তাঁদের গান্ধীজির প্রতি আনুগত্য ছিল—জল কাৎ তো জল কাৎ। মৌলানা, জওহরলাল আর রাজাগোপালাচারি এই তিনজন খবর রাখতেন, জানতেন, যুদ্ধ বুঝতেন, কে জিতলে কী হবে তা ভাবতেন। 

৫ জুলাই থেকে ওয়ার্কিং কমিটি টানা আলোচনা করতে থাকে কিন্তু কোনো মতৈক্য তৈরি হয় না। আগে থেকে ডাকা মিটিঙে গান্ধীজির ছয় দফা খাড়া পেয়ে সকলেই হাঁ। গান্ধীজি কোনো আভাসই দেন নি। কেউ বুঝতেই পারছে না—ইংরেজদের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধাতে পায়ে পা লাগানোর এই কি সময়। জওহরলাল মনে করতেন—গান্ধী যুদ্ধে মিত্রপক্ষের হার সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে জাপানের সঙ্গে বোঝাপড়ার দরজা খুলছেন আর, যখন ভারতবাসীকে ফ্যাসিস্তদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের টেকনিক শেখানো দরকার, তখন উনি ফ্যাসিস্তদের সমর্থন করছেন। রাজাগোপালাচারি মনে করতেন—জাপানের সম্ভাব্য আচরণ সম্পর্কে আকাশকুসুম ভাবা হচ্ছে, আর, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো শূন্যস্থান নেই। আজাদ মনে করতেন—এটা প্রায় বিপ্লবের জন্য খোলা ডাক, আর, আমরা আমাদের সমর্থকদের রক্ষা করতে পারব না, তাদের খোলা বন্দুকের সামনে ছেড়ে দেয়া হবে। 

মতপার্থক্য এমন জায়গায় পৌঁছয় যে ৭ জুলাই সকালে মৌলাদা আজাদকে গান্ধীজি একটা হাতচিঠি পাঠিয়ে জানালেন—তাঁদের দুজনের মতের পার্থক্য এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তাঁদের দু-জনের একসঙ্গে কাজ করা অসম্ভব। গান্ধীজি মনে করেন—মৌলাদা আজাদের কর্তব্য কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দেয়া ও ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করা। জওহরলালেরও তাই করা উচিত। 

দুপুরের মধ্যেই গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করে বল্লভভাই আপত্তি জানালেন। আজাদ ও জওহরলাল একসঙ্গে ওয়ার্কিং কমিটি ছেড়ে গেলে দেশের লোক কংগ্রেসের ওপর আর বিশ্বাস রাখবে না। গান্ধীজি মৌলানাকে ডেকে তাঁর কাছ থেকে চিঠিটা ফেরৎ নেন। 

ওই ৭ জুলাই থেকেই ওয়ার্কিং কমিটি মিটিং করতে-করতে ওয়ার্ধা গেল ও ওয়ার্ধাতে ১৪ জুলাই পর্যন্ত মিটিং করে গেল। গান্ধীজি সেই ১৯ এপ্রিল থেকে এই ১৪ জুলাই পর্যন্ত ‘হরিজন’-এ লেখার পর লেখায়, ‘হরিজন’-এর বাইরে দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকার সঙ্গে কথায়, বিদেশীদের কাছে লেখা চিঠিতে, তাঁর রোজকার প্রার্থনা ভাষণে ও অসংখ্য জনসভার বক্তৃতায় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রয়োজন ব্যাখ্যা ও প্রচার করে যাচ্ছিলেন। 

কিন্তু ওয়ার্কিং কমিটিতে মতপার্থক্য গভীর ও দুস্তর হল। রাজনীতির বিশ্বাস ও আন্দোলনের অভিজ্ঞতার শিক্ষা সম্পূর্ণ বিসর্জন না দিয়ে কেউই গান্ধীজির একমত হতে পারছিল না। পারা সম্ভব নয়। 

একবার গান্ধীজি এমন তিরস্কারও করে ওঠেন, ‘আপনারা এত বড় একটা রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ কমিটি। আপনাদের অনেক অসুবিধে থাকতে পারে। তাহলে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি ভারতের ধুলোমাটি থেকে এই আন্দোলন তৈরি করি।’ 

আর-একবার বলেন, ‘আপনারা তো সম্ভ্রান্ত নেতা। জুয়োখেলায় আপনাদের হারার ভয় থাকতেই পারে। আমি তো চিরকালের জুয়াড়ি।’ 

১৪ জুলাই ওয়ার্ধায় ওয়ার্কিং কমিটি ‘ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব মেনে নিল। বা, বলা ভাল, মেনে নিতে গান্ধী বাধ্য করলেন কমিটিকে। বস্তুত, ওয়ার্কিং কমিটিকে ব্ল্যাকমেইলই করলেন গান্ধীজি। কমিটি গান্ধীজিকে হারাতে চাইল না। তাই, কমিটি নিজেকে হারাল। 

তারপর সপ্তাহ তিন চলল দেশের ভিতরে ও বাইরে নানা প্রতিক্রিয়া ও প্রস্তুতি। বম্বেতে এআইসিসি ডাকা ছিল। সেখানে প্রস্তাবটি কী কী ভাবে কার্যকর হবে সেসব নিয়েই কথাবার্তার শেষে এআইসিসি জানিয়ে দিল—এটাই এখন কংগ্রেসের নীতি হয়ে গেল। 

প্রকাশ্য সভায় মহারাষ্ট্র ও বম্বে প্রদেশ কমিটি তাদের এলাকাভুক্ত নানা জায়গা থেকে লোকজন আনিয়ে ছিলেন। সেই কর্মীরা, ও নেতার বিশেষ করে গান্ধীজি, এই বিদ্রোহের পক্ষে কী বলছেন, সেটা শুনতে বুঝতে বম্বে ও তার কাছাকাছি নানা শহর থেকে হাজার-হাজার মানুষ এসেছিলেন। তাঁদের কাছে গান্ধীজি দু-ঘণ্টা ধরে বোঝালেন—কেন এখনই এই বিদ্রোহ, কেন এই বিদ্রোহ অহিংস থাকতেই হবে, সেই কবে থেকে যুদ্ধ লেগেছে, প্রথম দিন থেকে কংগ্রেস ব্রিটেনকে দুটো কথা বলে আসছে—যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করতে চাই, স্বাধীন দেশ হিশেবে সে-সাহায্য হবে আরো মূল্যবান, শাহেবরা সেই এক গোঁ ধরে বসে আছেন—যা হবে তা যুদ্ধের পরে হবে, গান্ধীজি বললেন, ‘তাই এই নতুন আন্দোলন, শান্তিপূর্ণ বিপ্লব, শাহেবদের বলব ‘ভারত ছাড়ো’, আর নিজেদের বলব ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’। 

যেন সবই তৈরি, সবই প্রকাশ্য। কারো তো কিছু অজানা ছিল না। সেই এপ্রিল থেকে। ক্রিপস শাহেব ভারতের নেতাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, যদি তাঁর মারফৎ ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাব পাঠানো, তারই একটু উনিশ-বিশের মধ্যে ভারত ও ব্রিটেনের সম্পর্ক স্থির না হয়, তাহলে যুদ্ধের সময় ও যুদ্ধের পরের অনিশ্চয়তায়, কথাটা যে আবার উঠবে, তারও কোনো সম্ভাবনা নেই। এই মুহূর্তে অনেকগুলি কারণে ভারতের জনসাধারণ কতকগুলি সুযোগের সুবিধে পাচ্ছে—গান্ধীজি বোঝালেন। 

যুদ্ধে ব্রিটিশ পক্ষের বস্তুত সম্পূর্ণ পরাজয় ও দক্ষিণ এশিয়ার রণাঙ্গনে একের পর এক দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা, অন্তত লাখখানেক যুদ্ধবন্দী হয়ে আছে জাপানের হাতে, ব্রিটেনের মিত্রদেশ আমেরিকা এখনো পুরোপুরি যুদ্ধে নামেনি, সোভিয়েত ইউনিয়নের উক্রেনের মত বিশাল সমতল, যুদ্ধাস্ত্রগুলির কারখানাগুলি সমেত, জার্মান দখলে ও জার্মানরা আরো দখল করছে। যুদ্ধ করতে হলে তো কোথাও একটা পা রাখার জায়গা চাই। ১৯৪২-এর এপ্রিলে তেমন একহাত জায়গাও ব্রিটেনের পায়ের নীচে ছিল না। উত্তর আফ্রিকার যুদ্ধে বিদ্যুৎগতি রোমেল প্রতিটি মুহূর্তে একটি করে যুদ্ধ জিতে ফেলায়, ব্রিটিশ-বাহিনীর সৈন্যদের কাছে কম্যান্ডার-ইন- চিফের দুই প্যারাগ্রাফের ছোট একটি আবেদন ছড়ানো হয়েছে, ‘রোমের আর-সকলের মতই একজন সৈন্য ও যোদ্ধা। তাঁর গতি ও সাফল্য নিয়ে যে-সব রূপকথা ব্রিটিশ-বাহিনীতে কানাকানি হচ্ছে—সে সবই বানানো। এতে বাহিনীর যুদ্ধোদ্যমের ক্ষতি হচ্ছে। এই ধরণের কানাকানি ও গুজব-ছড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।’ 

ভারত ছাড়া ব্রিটেনের লড়াই দেয়ার জায়গাও নেই। ক্রিপস এসেছেন যুদ্ধে পরাজিত ইংল্যান্ডের পক্ষ থেকে স্বাধীন ভারতের সঙ্গে প্রতিরোধের চুক্তি করতে। আর এই সুযোগ ও সুবিধে যদি ভারত না নেয়, যদি ক্রিপস-প্রস্তাব থেকে ব্রিটেনকে সম্পূর্ণ শর্তহীন সমর্থনের কোনো পরিস্থিতি, ভারত, তৈরি করে নিতে না পারে, তাহলে ইংল্যান্ডের যে-মানুষরা ভারতের স্বাধীনতার সমর্থক, তাঁরাও ভারতকে স্বাধীন করে দেয়ার জন্য কোনো উদ্যোগ নিতে পারবেন না। কারণ ভারত তো ইংল্যান্ডের এই বিপদেও তাকে সাহায্য করেনি। ‘ভারত’ বলতে ক্রিপস বোঝাচ্ছিলেন গান্ধী ও কংগ্রেস। 

স্যার স্ট্যাফর্ড ক্রিপস ব্রিটেনের খুবই বড় নেতা। ব্রিটেনের ওয়ার-ক্যাবিনেটের মন্ত্রী, লর্ড প্রিভিসিল। তাঁর রাজনীতি ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক সংসারে খুব একটা পছন্দসই নয়। সোস্যালিস্ট। চার্চিলের সঙ্গে তাঁর বেশ প্রকাশ্য অমিল। তবু ইংল্যান্ডের রাজনীতি চর্চায় রক্ষণশীলতার বিরোধী একটু খোলামেলা গণতন্ত্রের পক্ষপাতী ও অর্থনীতিতেও একটু সমাজতন্ত্র-ঘেঁষা মতের জন্য খানিকটা জায়গা থেকে যায়। ক্রিপস সেই মতের নেতা হিশেবে মান্যগণ্য ছিলেন। চার্চিল তাঁর রাজনীতির বারটা বাজাতেই তাঁকে এই প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়েছেন—এ-সব আজগুবি কথা তখনো শুরু হয়ে এখনো চলে। কিন্তু এখন তো লিনলিথগ-র কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, ক্রিপস সম্পর্কে নোটশিটে লিনলিথগ কত বদ-রসিকতা করেছেন। তিনি নোটের মার্জিনে লিখতেন ক্রিপসিস, ক্রিপসি, ক্রিপ। 

স্যার স্ট্যাফর্ড ক্রিপস একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েই এসেছিলেন দিল্লিতে। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের চাপে যদি প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর আগ্রহ ও উদ্যোগের প্রমাণ দিতে হয়, আর সেই প্রমাণের ওপর যদি যুদ্ধে আমেরিকার নামা না-নামা প্রভাবিত হয়, তাহলে মন্ত্রিসভারই প্রতিনিধি করে কাউকে সেখানে পাঠানোই সবচেয়ে নিরাপদ—এমন কূটনীতি চার্চিলসুলভ। খুব সম্ভবত, তেমন সংকেত পেয়েই স্যার স্ট্যাফর্ড এই মিশন দিয়ে তাঁকেই দিল্লি পাঠাতে চার্চিলকে কোনোভাবে সংকেত দিয়েছিলেন। সম্ভবত। কিন্তু প্রমাণ নেই। 

প্রমাণাভাবে অনুমানকে প্রমাণ জ্ঞান করা যায়। স্যার স্ট্যাফর্ড ছাড়া ওয়ার কেবিনেটের আর কোনো সদস্যের এই রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। ১. ফ্যাসিস্তবিরোধী যুদ্ধে জিততেই হবে। ২. সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করতেই হবে। ৩. ভারতের কংগ্রেসকে মধ্যবর্তী একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় রাজি করাতেই হবে। ৪. কংগ্রেস ও গান্ধীর রাজনৈতিক আদর্শ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ১ ও ২ সংখ্যক কর্মসূচি মেলাতেই হবে। 

মন্ত্রিসভার প্রস্তাব নিয়ে তাই এলেন স্যার স্ট্যাফর্ড, লর্ড প্রিভিসিল। 

এমন অনুমানের জায়গা থাকলে, ক্রিপস মিশনের অসাফল্যের আরো একটা অনুমানও করা যায়। 

স্যার স্ট্যাফর্ড তাঁর নিজের রাজনীতির কর্মসূচি সম্পর্কে এতটা দায়িত্ববান ছিলেন যার তুলনা ব্রিটিশ রাজনীতিতে ও প্রশাসনে খুব বেশি পাওয়া যায় না। ভারতবর্ষকে নিয়ে তাঁর কোনো ‘বড় ইংরেজ’-এর ভূমিকা ছিল না। ভারতবর্ষের কোনো উপকার তিনি করতে চাননি। স্বাধীনতা ভারতের অধিকার ও প্রাপ্য—এটাই ছিল তাঁর রাজনীতি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নেতৃত্ব ভারতকে সেই প্রাপ্যের অধিকার দেবে না—এটাও ছিল তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞান। রুজভেল্ট ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ব্রিটেনকে প্রায় জোর করছিলেন। এতটাই, যা দুটি সার্বভৌম দেশের একটি অপরের ওপর চাপাতে পারে না। ব্রিটেন ছিল আমেরিকার কাছে প্রার্থী। ব্রিটেনের পক্ষে সম্ভব ছিল না, আমেরিকার এই জোর-দেয়াটা অস্বীকার করা। রুজভেল্ট জোর দিচ্ছিলেন, যুদ্ধে আমেরিকার প্রত্যক্ষ ভূমিকা আমেরিকার জনসাধারণের মতামতের ওপর নির্ভরশীল ও সেই জনমত ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে—এই যুক্তির ওপর। তিনি তাঁর নিজের একজন দূত পাঠিয়েছিলেন, ক্রিপস মিশনকে সাহায্য করতে। সেটাকে যে চার্চিল ভালভাবে নেননি তা বোঝা যায়, একেবারে শেষ দিকে আবার নতুন করে ক্রিপসের চেষ্টার সুবাদে ভাইসরয়কে পাঠানো চার্চিলের টেলিগ্রামে—ক্রিপসের কোনো দরকার নেই জনসনের কথা শোনার। জনসনই ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত দূত। 

এতগুলি কারণ একই সময়ে সক্রিয় হওয়ায় স্যার স্ট্যাফোর্ড মনে করেছিলেন—ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে সেটাই সম্ভাব্যতম শুভক্ষণ। ক্রিপসের এই চিন্তার মধ্যে ছলনা ছিল না। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা-আন্দোলনের তুলনা করে বলেন—আমাদেরও তো স্বাধীনতা ঘোষণার পর মাত্র ১১টি রাজ্য একমত ছিল, তারপর তো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ, সিভিল ওয়ার ইত্যাদি ঘটতে-ঘটতে শেষে যুক্তরাষ্ট্রের আকার তৈরি হয়। ভারতেও তাই হত। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে এটা একটা স্থায়ী রসিকতা হয়ে আছে—মিত্রশক্তির তিন প্রধান স্ট্যালিন, চার্চিল ও রুজভেল্টের মধ্যে ভারত সম্পর্কে সবচেয়ে কম জানতেন কে? স্ট্যালিন কী সবচেয়ে বেশি জানতেন কারণ কোনো এক শীর্ষ সম্মিলনে তিনি নাকি ভারতের জাতপাত সমস্যার কথা তুলেছিলেন। চার্চিল এটা তাঁর জ্ঞাতব্য বিষয়ই মনে করতেন না। রুজভেল্ট বোঝাতে চাইতেন, তিনি ব্যাপারটি বোঝেন। তাই আমেরিকায় ব্রিটেনের কলোনি বানিয়েছিল যে-ইয়োরোপীয়রা, তাদের তুলনা করেছেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে, সেটা খুব ভেবেচিন্তে তৈরি করা একটি সূত্র। এই সূত্র ইয়োরোপীয় ইতিহাস চর্চায় এখনো সক্রিয়, বিশেষ করে আমেরিকায় ও অংশত ইংল্যান্ডে। সেই ইতিহাসচর্চায় কলোনি তৈরি করা না-করাকে কলোনিদেশের ও মালিকদেশের সম্পর্কের কোনো অপরিহার্য উপাদান মানা হয় না। তাঁরা সাম্রাজ্য মানেন, কলোনি মানেন না। 

কলোনি হয়ে যাওয়ার পর কলোনিদেশের ভিতরে কলোনি মালিকদের মধ্যে নানারকম গোলমাল হতে পারে। ভারতেও হয়েছে। তাতে কলোনিওয়ালাদের একপক্ষের কেউ-কেউ কলোনিদেশের কারো কারো সাহায্য নিতেও পারেন, দিতেও পারেন। এটা কলোনিকর্তাদের ভিতরকার লড়াই—মুনাফার ভাগ নিয়ে। 

ভারতে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ও তাঁর প্রথম কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে বিবাদ। সেই বিবাদের সুযোগ নিতে গিয়েছিলেন মহারাজ নন্দকুমার রায়। নেহাৎই এক বোকা বামুন। কলোনির মানুষ হিশেবে করেকম্মে খাচ্ছিল। ছিলেন হিজলি ও মহিষাদল পরগনার তসিলদার। ক্লাইভের সঙ্গে উকিল হয়ে পাটনায় যান। ক্লাইভের ওপর তাঁর প্রতিপত্তি দেখে তাঁকে বলা হত ব্ল্যাক কর্নেল। নদীয়া ও হুগলির কালেক্টর, ১৭৬৫-তে বাংলার নায়েব-সুবা। নায়েবসুবা মানে পুরো সুবার ট্যাক্স কালেক্টর। নগদ পয়সার ছড়াছড়ি। নন্দকুমার ধরা পড়ে যান। চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হয় ও ঐ পদে রেজা খাঁ নিযুক্ত হন। হেস্টিংস প্রথম গভর্নর-জেনারেল হলে হেস্টিংসের কাছে তিনি রেজা খাঁ সম্পর্কে নালিশ জানান। রেজা খাঁর চাকরি যায়। হেস্টিংস নন্দকুমারের ছেলে গুরুদাসকে বালক-নবাব মকরদদৌল্লার আমলা করে দেন। তার পর কাউন্সিলসহ গভর্নর-জেনারেল, সব সময়ই ভোটে হারছেন দেখে নন্দকুমার হেস্টিংসকে ছেড়ে কাউন্সিলে হেস্টিংসের বিরোধী পক্ষে যোগ দেন ও হেস্টিংসের নামে ঘুষ খাওয়ার মামলা করেন। নির্দোষ প্রমাণ হওয়ার পর হেস্টিংস নন্দকুমারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ও জালিয়াতির নালিশ রুজু করেন। ইংলিশ আইন অনুযায়ী বিচারে ৭০ বৎসর বয়সী নন্দকুমারের ফাঁসি হয়। ইংরেজের উপনিবেশে প্রথম ফাঁসি। প্রথম ব্রহ্ম হত্যা। অনেক হিন্দু কলকাতা ছেড়ে চলে যান। ফাঁসির দিন নাকী শহরের বাঙালিরা অরন্ধন পালন করেন। কলোনিকর্তাদের ভিতরকার লড়াইয়ে কলোনিমানুষ কখনো সহযোগী, কখনো অপরাধী। এটাই ধাঁচা। এর ভিতর কলোনিবিরোধিতা বলে কিছু নেই। 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তো ভারতবাসীদের নিজেদের যুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। ইয়োরোপীয় দেশগুলির সাম্রাজ্য-নির্মাণের সঙ্গে কলোনি যখন জুড়ে গেল, তখন উপনিবেশ-বিস্তারের যুক্তিতে কলোনি কত রকমের হতে পারে তার বিভাজন ও পুনর্বিভাজন ও পুনর্বিভাজন ও পুনরপুনর্বিভাজন শুরু হয়ে গেছে ও এখনো (২০১০-এও) চলছেই। 

কলোনি একটি নতুন দেশ, একটি বাইরের দেশের দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত—অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামাজিক। কলোনি হতে পারে, একটি দেশের সম্পূর্ণ কৃষিসম্পদ ও কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস করে সেখানে ইয়োরোপীয় কৃষি কোম্পানিকে বসিয়ে স্থানীয় কৃষকদের ভূমিদাসে পরিণত করা—যেমন কেনিয়ায়। ফলে, ‘কলোনি’ নাম দেয়া যায় সেই দেশকে যা কলোনি হয়েছে ও যে-কলোনির মালিকদেশ আছে। কলোনির উৎপাদনে শ্রমিক ও মালিক পক্ষের লড়াইটাও কলোনির ভিতরের সংগ্রাম। এর ওপর ভারতের মত একটা মহাদেশতুল্য দেশ জুড়ে কোটি কোটি মানুষকে জড়িয়ে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি নিয়ে আন্দোলন। এটাই স্বাধীনতা যুদ্ধ দখলদার দেশের বিরুদ্ধে। কলোনিয়ালিজমের রকমফের জানতেন স্যার স্ট্যাফোর্ড। জানতেন—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াকে শাদাদের দেশ বানানো ও কলোনি বানানো। জানতেন—আবার ভারতবর্ষ, উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা দখল করেও বসবাস না করে, তাদের রাজনীতি-অর্থনীতিকে গ্রাস করাও কলোনি। আবার, দক্ষিণ আফ্রিকাও কলোনি, আবার, ফ্যারাও-এর ইজিপ্টও কলোনি। 

কিন্তু স্যার স্ট্যাফোর্ডের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না-ভারতের মত দেশে কংগ্রেসের মত পার্টির গান্ধীজির মত নেতার অধীনে দেশের সমস্ত শ্রেণীর সমাবেশ ঘটনাটি কী। সে সমাবেশে রাজাও আছে, নবাবও আছে, মেথরও আছে, ধাঙড়ও আছে, চাষীও আছে, বাবুও আছে, উকিলও আছে, মক্কেলও আছে, ডাক্তারও আছে, রোগীও আছে…। 

এটা জানাই যদি স্যার স্ট্যাফোর্ড-এর পক্ষে অসম্ভব হয়, তা হলে এই সমাবেশে অনুপস্থিত বিপুলতর পরোক্ষকে জানা বা অনুমান তো অসম্ভবতর। সেই পরোক্ষে আছে, সেই সব ভিতু মানুষ যারা সরকারকে মা-বাপ জানে। বা, হয়তো স্বাধীনতা চায় না। বা, হয়তো শাহেবদেরই পক্ষে। 

নিজের ভয়ডর, মতামত ইচ্ছা-অনিচ্ছার অতিরিক্ত এক হাওয়া, বেঁচে থাকাটাকে একটা নৈতিক দায় করে দেয়। স্যার স্ট্যাফোর্ড এই পরোক্ষ কী করে জানবেন? এই পরোক্ষ সর্বদাই যুদ্ধক্ষেত্র। অথচ সর্বদাই যুদ্ধ এড়ানো চলছে। 

১৯৪০-এ লাহোর অধিবেশনে মুসলিম লিগ প্রথম পাকিস্তান প্রস্তাব নিল। একজন ও বিরোধিতা করেনি। অথচ ‘পাকিস্তান’ শব্দটি বলার বা লেখার সাহস হয়নি। কারণ, তখনো ভারতের মুসলমানরা পাকিস্তান নিয়ে, জিন্না নিয়ে, মুসলিম লিগ নিয়ে একমত ছিল না। কিন্তু একমত ছিল মুসলমানদের স্বাতন্ত্রের বিষয়ে ও হিন্দুদের সমতুল্য সম্মান আদায়ে। 

যুদ্ধধ্বস্ত চারটি বছরে মতৈক্যের প্রয়োজনই বোধ করলেন না মুসলমানেরা। তখন এই মুসলমানরাই অন্য একটা ঐতিহাসিক সমীকরণের মধ্যে পড়ে গেলেন। মুসলমানদের দেশ = পাকিস্তান = মুসলমান = জিন্না = লিগ = মুসলমান। 

পাকিস্তান ধারণা ও জিন্নানেতৃত্বের একশ শতাংশ বিরোধীও, মুসলমানদের বিরোধিতা করতে পারবেন না, করা সম্ভব নয়। পাল্টা হিন্দু সমীকরণও ঘটেছিল। কিন্তু সে-সমীকরণ ঘটেছিল মুসলমান-সংহতির প্রতিক্রিয়ায়। প্রতিক্রিয়ায় শক্তিহ্রাস ঘটা প্রাকৃতিক নিয়ম। তদুপরি হিন্দু প্রতিক্রিয়া ঘটছিল বহু বহু বিচ্ছিন্ন নিশানের তলে–কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, ফরোয়ার্ড ব্লক, হিন্দু মিশন আর জাতপাত দিয়ে তৈরি আরো অনেক ঝান্ডার নীচে। মুসলমানরা এক হয়ে যেতে পেরেছিলেন শুধু মুসলমানির প্রতি আনুগত্য থেকে। মুসলমানের সমস্ত শাস্ত্রে, সমস্ত সামাজিক পারিবারিক নীতিবোধে, ‘আনুগত্য’ একটা পরম ধারণা। হিন্দুদের যেমন শুদ্ধতা বোধ। আনুগত্য কিন্তু ভক্তি নয়। ‘ভক্তি’র ধারণায় বর্জনও নিহিত থাকে। ন্যায়শাস্ত্রের বর্জন, নিত্যকর্ম বর্জন, দশকর্ম-সহস্রকর্ম বর্জন। আনুগত্যে কোনো বর্জন নেই, শুধু আছে প্রস্তুতি। ইসলামি শাস্ত্ৰ, বিধিবিধান ও নীতিবোধ এই আনুগত্যকেই গড়ে তোলে। জিন্নাবিরোধী, পাকিস্তানবিরোধী, লিগবিরোধী হওয়ার মধ্যে মুসলমানির কোনো বিরোধিতা নেই 

কিন্তু মুসলমানির মধ্যে ওগুলোও থাকতে পারে, আরো কিছু থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। আনুগত্য, মুসলমানির প্রতি। সেই আনুগত্য ও ধারাবাহিকতাতেই মুসলমানরা জিন্নাকে অদ্বিতীয় নেতা করে তুলেছিল। 

জিন্না ধর্মাবিশ্বাসী ছিলেন না, কোনো মুসলমান রীতিনীতি জানতেন না, ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো নিষিদ্ধ খাদ্যগ্রহণে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না, জীবনে একদিন মাত্র নমাজে গিয়েছিলেন, নমাজিদের দাঁড়ানোর বসার ভঙ্গি পর্যন্ত জানতেন না। সারাক্ষণ জোড়াসনে বসে থাকলেন। ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা উপলক্ষে একটা বড় খানা লাগিয়েছিলেন না জেনে যে ওটা রমজানের সময়। 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যর্থতা বা রহস্য কোথায়? দেশভাগে? দেশভাগ, পার্টিশন, যেন স্বাধীনতাকেই মিথ্যে করে দিল? তাহলে গোলমাল তো শুরু বা গোলমালের বীজ তো পোঁতা আরো অনেক আগে, ভারতবর্ষ নামক রাজনৈতিক ভূখণ্ডকে অখণ্ড ভাবা হয়েছিল যখন? ভারতবর্ষ ও ভারতীয়তা এমন আকার পেল কবে—এই অখণ্ডতার আকার? 

একটা তো মনে হয়, ‘নিখিল ভারত কংগ্রেস’ এই নামকরণে সেই অখণ্ডতার আকারটা ছিল। ফলে, এর পরে রাজনৈতিক দলগুলি ‘অল ইনডিয়া’ হয়ে গেল। বিশশতকের তৃতীয় দশক থেকে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন যখন সহজানন্দ, কমিউনিস্ট ও সোস্যালিস্টদের নেতৃত্বে সারা দেশের আন্দোলন হয়ে উঠল, তখন তারা তো বাধ্যতই অল ইনডিয়া। ব্রিটিশ সরকার যখন গভর্নর-জেনারেলকে ভাইসরয় বা উপসম্রাট বানালেন, তখনো তো ভারতের অখণ্ডতাই সেই উপসম্রাটের সাম্রাজ্যান্তর্গত ছিল। ভারত হিশেবে এই দেশের অখণ্ডতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দান নয়। ওরা, সারা ইয়োরোপই তো, জানত ‘ইন্ডিজ’ বলে এক মায়াময় ও লুণ্ঠিতব্য দেশ আছে। 

৩৫-এর প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনে এই মিথ্যেটা তৈরি হল যে ইংরেজরা থাকল শুধু কেন্দ্রে ভোট হচ্ছে, আইনসভা হচ্ছে, আইন পরিষদ তো প্রায় সত্তর বছর ধরেই আছে। নিজেরাই দল পাকাচ্ছে। ভোটের আগে জোট করছ। ভোটের পর জোট ভাঙছ। আবার নতুন জোট বাঁধছ। মন্ত্রি হচ্ছ, মন্ত্রিসভা পাচ্ছ। স্বাধীনতা তো হয়েই গেল, স্বাধীনতা আর এর বেশি কী? প্রদেশের স্বাধীনতা এসে গেছে, স্বাধীন কেন্দ্রের কাজ ঠিক হলে, আকারও ঠিক হবে। ফেডারেশন তো হয়েই যেত, যদি কংগ্রেস রাজি হত। তবে কংগ্রেসের অনেক নেতাই রাজি ছিলেন। কংগ্রেসের আবার অনেক রকম গট-আপ আছে। যে যার মত মত দিয়ে গেলেন। গান্ধী এসে বললেন, ‘না’। ব্যস, না। ওয়ার্কিং কমিটি বলল, ‘না’। গান্ধী বললেন, ‘হ্যাঁ’। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। প্রস্তাব নেয়ার রাতটাও কাটল না। সারা ভারতের কংগ্রেস নেতাদের গুনে গুনে জেলে আটকানো হল। তারা ফাটকই খাটবে যুদ্ধ শেষ না-হওয়া পর্যন্ত। বাদ এক রাজাগোপালাচারি। তিনি ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন, ‘ভারত ছাড়ো’র বিরোধিতায়। 

গান্ধীর মাথায় কেন ‘কুইট ইনডিয়া’ খেলল—এটা তো কোনো জাতির স্বাধীন হওয়ার উপায়ের সঙ্গে জড়ানো নয়। প্রস্তাব দিয়েছেন গান্ধী। ওয়ার্কিং কমিটি একবার নয়, যতবার মিটিং করেছে, তার চাইতে মুলতুবি রেখেছে বেশি। শেষে ওয়ার্কিং কমিটি পাশ দিল। প্রস্তাব চলল এআইসিসিতে। ব্যস। পাশ। সব তো সাংবিধানিক পথেই ঘটছে। এমন কী ৮-আগস্ট রাতেই গ্রেপ্তারও সবাই জানত। রাজাজি তো সেই কথাই বলেছিলেন যে নিজেরা নিরাপদ থেকে জেল খাটছ, কর্মীদের বাঁচানোর কেউ নেই—ভারত যদি সত্যিই ছাড়ে শাহেবরা তা হলে কে কাকে বাঁচাবে? সারা দেশে সত্যাগ্রহ চলছেই। সব সময় বোঝাও যাচ্ছে না—আইনের দোষটা কী! ধরেছে হয়তো আইন-অমান্যে, জেলের ভিতরে জানা গেল মাদক আইনে। এটা অবিশ্যি আগেও ঘটেছে, এবারও ঘটল। এত লোককে একসঙ্গে ধরে রাখার জায়গা বাংলা বা ভারত সরকারের নেই। তাই এডেন বন্দরের গভর্নরকে জানানো হল—এক জাহাজ বন্দী পাঠাচ্ছি, রাখার ব্যবস্থা করো। এডেনের গভর্নর জবাব দিলেন, ‘বন্দীদের মধ্যে নিরামিষ কজন?’ আসলে জানতে চাওয়া হয়েছে—শাহেব কজন আর নেটিভ কজন? 

কিন্তু ক্রিপস নিয়ে এত মাথাব্যথা নতুন করে কেন? কারণ, আমাদের স্বাধীনতা অর্জনকে কলঙ্কিত করে রেখেছে দেশভাগ—এই একটা মত স্থায়ী হয়ে আছে। প্রায় অনড়। সেই কলঙ্কের খলনায়ক বরাবরই ভারতের হিন্দুদের কাছে মহম্মদ আলি জিন্না, ভারতের মুসলমানদেরও কারো-কারো কাছেও জিন্না-ই ভিলেন। প্রায় জিলাস্তরের নথিপত্র ঘেঁটে যে নতুন ইতিহাসবিদ্রা প্রমাণ করছেন যে জিন্না নন, জাতির আন্দোলনের প্রধান বিষয় হিশেবে হিন্দুরাই সাম্প্রদায়িকতাকে তৈরি করেছিলেন—তাঁরাও কিন্তু দেশভাগকে স্বাধীনতার কলঙ্ক বলেই ধরে নিয়েছেন। ক্রিপস যখন ভারতে এসেছিলেন ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার মিশন নিয়ে, তখন থেকেই একটা মত প্রচলিত ছিল যে ক্রিপস প্রস্তাব মেনে না-নেয়াটাই প্রাথমিক ভুল। এখন (২০১০), সেই মতটাকে আরো ছড়িয়ে ভাবা হচ্ছে যে ক্রিপসপ্রস্তাব মেনে নিলে দেশভাগ না করেই স্বাধীনতা আসত ও তাহলে স্বাধীনতা থাকত অকলঙ্কিত। ইতিহাস তো আর ‘যদি’-ঘটত ঘটনার আধার নয়। কল্পবিজ্ঞান যেমন বিজ্ঞান নয়। ‘যদি ঘটত’-ইতিহাসও তেমনি কল্পইতিহাস, ইতিহাস নয়। গত পঁচিশ বছরে যে-কয়েকটি নভেল বিক্রি-সংখ্যায় মোবাইল-ফোনের বিক্রি-সংখ্যার তুলনীয় হয়েছে, তার সবগুলিই কল্পইতিহাস—’ফুকোস পেন্ডুলাম’, ‘নেম অব দি রোজ’, ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ ও ‘হ্যারি পটার’। ভারত-শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান-বাংলাদেশের ইংরেজি লেখকদের মধ্যে এই ‘কল্পইতিহাস’, উপন্যাসের একটা আকার হিশেবে গৃহীত হয়ে যাচ্ছে ও এই উপন্যাসগুলির বেশিরভাগেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধ পর্যন্ত ত্রিশ বছর সময়কে ঘটনাকাল হিশেবে বাছা। লেখকদের অনেকেরই জন্ম এই ত্রিশ বছরের পর। এটা ধরে নেয়া যায়, স্মৃতির কোনো দুর্বহ ভার তাঁদের বাধ্য করেনি—ঐ ত্রিশ বছর পুনর্যাপনে। তাঁরা ঐ ত্রিশ বছরকে উপন্যাসে তৈরি করতে চেয়েছেন। যে আধুনিকতর চিন্তা থেকে ঘটা-ইতিহাস যথেষ্ট না-হয়ে ‘যদি ঘটত’ ঘটনার ইতিহাস প্রামাণিক ঠেকে, সেই আধুনিকতর চিন্তাতেই ঐ নভেলগুলি লেখা। 

ক্রিপস প্রস্তাব ব্যর্থ হল কেন—এমন একটি প্রশ্ন তখন ও এখন তোলা হয় কেন? তখন তোলা হয়েছিল—দোষী সাব্যস্ত করতে। এখন তোলা হয়—দেশভাগের কলঙ্কের কারণ খুঁজতে, বা এও এক দোষী-সাব্যস্ত করা। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নটির ভিতরে একটি সম্মতিবিন্দু ধরে নেয়া আছে যে আমাদের স্বাধীনতায় দোষ আছে। 

কেউ-কেউ মনে করেন যে ব্রিটিশ ভারত যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হল, তখন সেটা দোভাগা হওয়ার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। দেশভাগ সত্ত্বেও দুটি দেশ তো স্বাধীন হয়েছে—সে ঘটনাটি নাকচ করার তো কোনো উপায় নেই। এঁদের কাছে তাই ক্রিপস-মিশনের কোনো পৃথক মর্যাদা নেই। 

আরো কেউ কেউ মনে করেন ব্যর্থ হওয়ার কারণ, ব্যর্থ হওয়ার জন্যই এটা তৈরি হয়েছিল। গান্ধীজিও সেই কথাই বলেছিলেন স্যার স্ট্যাফোর্ডকে তাঁদের প্রথম সাক্ষাতে—’এই যদি আপনাদের প্রস্তাব, আর এর বেশি কিছু দেয়ার যদি ক্ষমতাই না-থাকে আপনার, তাহলে মিছিমিছি এলেন কেন এতদূর? পরের প্লেনেই ঘরে ফিরে যান।’ এরও পরে আর-একটা কথাও তিনি না কী বলেছিলেন বলে রটে আছে, প্রমাণ নেই কিন্তু রটে আছে—’একটা ফেল-পড়ছে এমন ব্যাঙ্কের ওপর আগাম তারিখের চেক। তামাদি হুন্ডি? 

এত ঠাট্টা করে ব্রিটিশ প্রস্তাবকে নাকচ করেননি আর কেউ। 

ঠাট্টাটা, বা আক্রমণ, উঠে এসেছিল ব্যক্তিত্বের এমন একান্ত থেকে, গান্ধীর, যেমন জায়গা আর কারো একান্তে ছিল না। পরে, লুই ফিসার-কে বলেওছিলেন যে ক্রিপসের প্রস্তাব থেকেই তাঁর মাথায় বিদ্যুৎ চমকে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের কথাটা এসেছিল। যে-ভাবে কবিতার কোনো লাইন মাথায় আসে কবির? বা, নভেলের কোনো বিস্তার দেখে ফেলেন কোনো নভেলকার? কোথাও কি অভিমানে বা সম্মানে লেগেছিল গান্ধীজির? সার্বভৌম ভারত যাঁর ইষ্ট ভারত, তাকে শুধু একটা নতুন শব্দ দিতে এসেছ, সে-শব্দের অর্থও ঠিক করা আছে তোমাদের ভূরাজনীতিতে, ক্যানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায়, ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস? আমরা তো নতুন শব্দ চাইনি, আমরা আমাদের লুণ্ঠিত দেশটাকে ফেরৎ চেয়েছি। নইলে আমরা ফেরৎ আদায় করে নেব। 

ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার কোনো ধারণাই ছিল না, তাঁরা রাজনীতির যে-সব মূল্য নানা অভিজ্ঞতা দিয়ে শ-আড়াই বছর আগে জেনেছেন, অভ্যাস করেছেন ও দুনিয়াকে শিখিয়েছেন সেই, নিয়মিত নির্বাচনে তৈরি পার্টি-প্রতিনিধি বা ব্যক্তিগত প্রার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টির সরকার চালনা, তার বাইরে আর কী ধরণের মানবসমাবেশ ঘটতে পারে? ব্রিটেনে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার স্বীকৃত খনি, রেলওয়ে, পরিবহণ, ইত্যাদির কর্মীদের সঙ্গে বিনিময়ের ব্যবস্থা আছে সেই বিনিময়ের একটা নিরপেক্ষতাও আছে। এ-কথাও তো ঠিক—ব্রিটেনে জীবনযাপনের ও শাসনের সমাজদুটি যেমন দুই পায়ে ভর দিয়ে একা ও খাড়া, তেমনি আবার এ ওর ঘাড়ে হেলেও থাকে। এটা পৃথিবীর আর-কোনো দেশে নেই। 

যখন থেকে ব্রিটেন কলোনি বসাতে শুরু করেছে ইয়োরোপের বাইরের নানা দেশে, তখন থেকে ইংরেজ সভ্যতার একক বিশিষ্টতা বেশ খানিকটা সময় জুড়ে বদলে গেল বিনিময় মূল্যে। কার মধ্যে বিনিময়? ইংরেজের নিজের দেশের জীবনের গণতন্ত্র ও ব্যক্তিমানুষের বেঁচে থাকার অধিকার যদি রক্ষা করতে হয়, তা হলে কলোনি বসাতে হবে। ইংল্যান্ডের লোকজনকে কলোনাইজেশনের নৈতিকতা বোঝাতে তো প্রায় এক শতক লেগেছে—পুরো আঠার শতক বোঝানো তো গেলই। কিন্তু সেই বোঝানোর দাম দিতে হল কড়ায়-ক্রান্তিতে। ব্রিটেনে, শাসনের ও জীবনের দুই সমাজ, নতুন এক সমাজের অধীনস্থ হয়ে গেল—তত্ত্বসমাজ। সেই তত্ত্বে গ্রেট ব্রিটেনের ঘরের জীবন আর তারই কলোনির জীবন বা বাইরের জীবনে আড়াআড়ি ঘটে গেল। ব্রিটেন হারিয়ে ফেলল জনজীবনের সমগ্রতা বোঝার বিশেষ শ্রুতি। সরকারের বাইরে বা বিরুদ্ধে কোনো সমাবেশ কী করে ঘটতে পারে? ডাকাতি, দাঙ্গা, লুটপাট—এমন অসামাজিকতা ছাড়া? বা গান্ধীজির অনশনের ‘ফেরেববাজি’ ছাড়া? 

গান্ধীজি ছিলেন সমাবেশ গড়ার শিল্পী। সমাবেশ ছিল তাঁর সৃষ্টি। সমাবেশকে তিনি ভাষা দিতেন। সবাক সমাবেশ রচনা ছিল তাঁর শিল্পকর্ম। এই শিল্পকর্মের প্রথম অস্পষ্ট আভাস ঘটে কোনো মাহেন্দ্রক্ষণে। তারপর, সেটা হয়ে ওঠে একটা সিমফনি। 

অহিংসা, অসহযোগ, আইন-অমান্য, সত্যাগ্রহ ছিল সেই স্বরলিপির প্রধানতম চারটি নির্ভর। সেই নির্ভর তিনি গুছিয়ে তুলে নিয়েছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার পথঘাটে, মাঠেবাটে, গলিতে-রাস্তায় বর্বরতর এক সরকারের সঙ্গে রোজকার চলাফেরায়, সশ্রম জেলখানায়। তাঁর আন্দোলনের ব্যাপারে তিনি এতই ছিলেন খুঁতখুঁতে যে তাঁর বাহিনী অন্য কোনো রকম বাহিনী যেন মনে না হয় সেই উদ্দেশ্যে তিনি তাদের নতুন নামকরণ করলেন, ‘সত্যাগ্রহী’। এমনকী দেখলেই যাতে তাঁর বাহিনীকে চেনা যায় সেজন্য সত্যাগ্রহীদের একটা ইউনিফর্মও ভেবেছিলেন তিনি, তাদের মাথার টুপির নকশাও। এখানে যে-টুপি গান্ধীটুপি সেটা দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু উপজাতির টুপি—মাথাঘেরা রিং, কাপড়ের ক্যাপ, মাঝখানটা গর্ত। এবার তাঁর সমাবেশের লক্ষ, ইংরেজকে বলা—’ভারত ছাড়ো’ আর নিজেকে বলা, ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’। আর নির্দেশ দিলেন, ‘কংগ্রেসের কোনো নেতা যদি জেলের বাইরে না থাকেন, তাহলে প্রত্যেক সত্যাগ্রহী নিজেকে মনে করবেন নেতা ও ভারতের কথা মনে রেখে একা সিদ্ধান্ত নেবেন। 

‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের এই নির্দেশনামার স্পষ্টতা, আইন-অমান্য-অসহযোগ আরো অনেক রকম সত্যাগ্রহের নির্দেশে এর আগে কখনো ছিল না। সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস থেকে বিতাড়নের একটা কারণ বলা হয়েছিল—অননুমোদিত সত্যাগ্রহ (সিরাজ দিবসে)। সত্যাগ্রহের নির্দিষ্ট অর্থ গান্ধীজি বারবার উদ্ধার করেছেন। কিন্তু ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সেই নির্দিষ্টতা থেকে তিনি সত্যাগ্রহীকে মুক্তি দিলেন। শুধু থাকল লক্ষ—’ভারত ছাড়ো’, শুধু থাকল উপায়—’করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’, শুধু থাকল সত্যাগ্রহীর পদমর্যাদা——তুমিই নেতা। সারা ভারতের কথা মনে রেখে যোগ্য সিদ্ধান্ত নেবে।’ 

কাউকে যদি ‘উপায়’ বলা হয় ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’, তাহলে তাকে নিজনেতৃত্বের মর্যাদা না দিলে কবিতার যুক্তির হানি ঘটে, ছন্দ মেলে না। 

আন্দোলন বা সমাবেশে ক্ষমতার প্রায় চরম বিকেন্দ্রণ ঘটালেন গান্ধীজি, যখন, সাম্রাজ্যক্ষম।র কেন্দ্রীয়তা রক্ষা করতে ব্রিটিশ ওয়ার ক্যাবিনেট, স্যার স্ট্যাফোর্ডকে মিশনে পাঠালে।। ক্রিপসপ্রস্তাবে যেন কোথাও একটা অভিমানের কারণ ঘটেছিল গান্ধীজির, অপমান ঠেকেছিল যেন, ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের সমাবেশের প্রতিনিধি হিশেবে অভিমান ও অপমান। নিজেদের পশ্চাদপসরণে শশব্যস্ত ব্রিটেনের সৈন্যরা যখন আশ্রয় খুঁজতে গৌহাটি থেকে লাহো! পর্যন্ত কত রকমের হাসপাতালে ছড়ানো, সিঙ্গাপুর-মালয়-থাইল্যান্ড-রেঙ্গুন পতনের পর পতনে ব্রিটিশের পরাজয় যখন আসন্ন, ঠিক তখনই সারা ভারতে ছড়ানো অসংখ্য সত্যাগ্রহীকে নির্দেশ দেয়া হল, জয় ছাড়া তোমার কোনো লক্ষ নেই। ইতিহাসে কি এই দ্বন্দ্বগুলি খোঁজা নিরর্থক? 

তা কোনো বস্তু বা ঘটনা বা মানুষ তো নিজের থেকে নিরর্থক হয় না। তাকে সার্থকতা দেয়া হয়নি বলে সে নিরর্থক। গান্ধীজির এই নির্দেশনামার ত্রিশ-একত্রিশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ একটি নাটকে বিকেন্দ্রণের জয় গেয়েছিলেন, ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।’ ত্রিশ-একত্রিশ বছর পরে তার দ্বিতীয় চরণটি এল সারা ভারতের মানুষের পায়ে-পায়ে, ‘আমাদের সবাই রাজা’। 

‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন যে বাঁধাধরা গতে চলবে না, সেটা গান্ধীজি জানতেন। কথায়-কথায় বলেওছিলেন অ্যাগুরুজ শাহেবকে। তিনি অনুভব করেছিলেন, ভারতের মানুষ স্বাধীনতা লাভের শেষ লড়াই লড়ার জন্য মনে-মনে তৈরি হয়ে গেছে কিন্তু তারা কোনো রাস্তা পাচ্ছে না। তিনি সেই রাস্তাটা খুলে দিতে চান ও তাদের সমবেত ইচ্ছাকে মুক্ত করে দিতে চান সমস্ত পেছুটান থেকে। এটাই লড়াইয়ের শুভতম লগ্ন কারণ তাদের যারা বন্দী করে রেখেছে সেই ব্রিটেন এখন সবচেয়ে বিপন্ন। সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ড মালয় আর বার্মার মত ছোট-ছোট জায়গাকে, দেড়শ বছর ধরে রাজত্ব করার পর যারা রক্ষা করতে পারে না, তারা বাঁচাবে ভারতকে? ভারতরক্ষার জন্য ব্রিটেনেরই সবচেয়ে বেশি দরকার ভারতীয়দের—সৈন্য হিশেবে, কর্মচারী হিশেবে, ডাক্তার-নার্স-ইনজিনিয়ার হিশেবে, গোলন্দাজ হিশেবে, যুদ্ধ জাহাজের খালাশি হিশেবে, বাহিনীর অস্ত্রবাহক হিশেবে, স্ট্রেচার বাহক হিশেবে, সাপ্লাই লাইন সব সময় খোলা রাখতে, অসামরিক জীবনযাত্রা চালু রাখতে, কারখানার মেশিন চালাতে, এয়ার রেইড ঠেকাতে, অ্যাম্বুলেন্স চালাতে, হাতে গ্রেনেড চালাতে, মাইন পুঁততে, ডুবুরি হয়ে জলে ডুবতে, পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্র-গভীর বনাঞ্চলে পুরুষানুক্রমে বসবাসী মানুষদের স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগাতে—ভারত ছাড়া লোক পাবে কোথায় ব্রিটেন? হ্যাঁ, যুদ্ধ করবে ভারতবাসী, তাহলে দেশটা তো ভারতবাসীকে পেতে হবে! ভারতবাসী ব্রিটিশের অত্যাচার সইবে শান্তির সময় আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষা করবে যুদ্ধের সময়? ভারত জাপানকেও লড়বে যদি জাপান ভারতে ঢোকে। ভারত জাপানকে ঠেকাবে স্বাধীন ভারত হিশেবে। ‘আগামী কালের স্বাধীনতায় আমার বিশ্বাস নেই। এই মুহূর্তে আমি স্বাধীনতা চাই। এই শয়তানের রাজত্ব আর-এক মুহূর্তও টিকিয়ে রাখা চলবে না।’ ব্রিটেন যদি চাইত তাহলে তার ভবিষ্যতের বিপদ থেকে বাঁচতে অনেক আগেই ভারত ছেড়ে চলে যেত। এখন ভারত ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতার ছলে কিছু সুযোগ-সুবিধে চাইছে না। এখন ভারত ব্রিটেনকে বলছে, ‘ভারত ছাড়ো’, ‘কুইট ইনডিয়া’। 

গান্ধীজির অন্ধ ভক্তও এই চিন্তার মধ্যে অনেক অসংগতি পাবে। সেই অসংগতি খুব আড়ালের চেষ্টাও নেই। গান্ধীজির সারা জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁকে নৈতিক পুরুষোত্তম স্থির করে, তাঁর সম্পর্কে নিজের বিচারক্ষমতা ব্যবহার না করে স্বেচ্ছায় অন্ধ হয়েছে, যে-ভক্ত, সে তো এমন কথায় চক্ষুষ্মাণ হয়ে দেখবে, গান্ধীজিই সবচেয়ে বড় আঘাত করছেন গান্ধীর জীবননীতিকে। যুদ্ধবিরোধী যে-মানুষটি অহিংসাকে তীব্র রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে প্রধান অস্ত্র হিশেবে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত, ‘গীতা’য় শ্রীকৃষ্ণও যা করতে পারেননি, বুদ্ধ-মহাবীর-খ্রিস্ট ছাড়া কোনো ধর্মপুরুষ যা করতে পারেননি, মানব সভ্যতার সেই প্রতিনিধি ও সেই ব্যতিক্ৰম যিনি, তিনিই বলছেন, মানুষের স্বতস্ফূর্ততাকে মুক্তি দিতে হবে, আন্দোলন এক-এক জায়গায় এক-এক ভাবে হবে, এ-আন্দোলন অহিংস থাকবে এ গ্যারান্টি কে কাকে দেবে? 

উপায় আর লক্ষের যে-অবিভাজ্যতা গান্ধীজি প্রথম নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন- সে-অখণ্ডতা কি তিনি নিজেই ভেঙে দিলেন না? 

ভারতীয় হিন্দু আধ্যাত্মিকতার বিমূর্তনের পদ্ধতি গান্ধীজি নীতিনির্ণয়ে ব্যবহার করতেন—এমন যাঁরা মনে করতেন ও মনে করেন, তাঁরা ভাবতেই পারেন, গান্ধীজি সেই বিমূর্ত আধ্যাত্মিকতা থেকে স্খলিত হলেন। এটা তাঁদের ভাবনা। তেমন ভাবতে গান্ধীজিই যে উৎসাহ জুগিয়েছেন কখনো-কখনো, তাও তো সত্য। ‘এক বছরের মধ্যে স্বরাজ’, ‘অস্পৃশ্যতা পাপের শাস্তি বিহারের ভূমিকম্প’, ‘এই বয়সে এক রাতে আমার স্বপ্নদোষ ঘটেছে—আমি নিজেকে অন্তরে শুদ্ধ করতে পারিনি, আমার পাপেই দেশের এই কষ্ট।’ কিন্তু যখনই তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য সমাবেশ গড়ে তোলেন, তখন তার প্রস্তুতির শৃঙ্খলা সীতা-উদ্ধারের জন্য রামচন্দ্রের প্রস্তুতির মত। প্রথমে প্রচার ও কী করতে চান ও কেন করতে চান—অজস্র সভায়, মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ কথায়, লেখায়, চিঠিপত্রে, প্রতিদিনের প্রার্থনাসভায় সেই প্রচার ও প্রস্তুতি চলতেই থাকে। পরের স্তরে তাঁর নিখুঁত সংগঠন। বেশির ভাগ সময়ই কংগ্রেসই সেই সংগঠন। কিন্তু কংগ্রেসের উচ্চতম নেতৃত্ব যে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি তাতে তো আছেন নানা প্রদেশের, ভাষার, শিক্ষার, বিশ্বাসের, ধর্মের মানুষ। তাঁরা প্রত্যেকেই তো একেবারে প্রাথমিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। সেখানে সংগঠনের শৃঙ্খলা মানা ও মানানোর একটা প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কখনো, যেমন সুভাষচন্দ্রের বেলায়, সংগঠনের শৃঙ্খলাই ব্যবহার করেন তাঁর প্রতিপক্ষকে হারাতে। কখনো সমবেত আপত্তির কারণে নিজেই নিজেকে সরিয়ে নেন শৃঙ্খলা থেকে। 

তার পরের স্তরে, আন্দোলনের দিন, তারিখ, লোকজন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে বিকল্প ব্যবস্থা—এই সব ঊণকোটি কাজ করে যাওয়া। 

প্রত্যেকটি আন্দোলন স্থান-কাল-পরিপার্শ্ব নির্দিষ্ট। 

‘ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাবে ওয়ার্কিং কমিটির একজনও তাঁকে সমর্থন করেনি। সেই অসম্মতিকে সম্মতিতে বদলে নিতে গান্ধীজি চার মাস ধরে অবিরাম চেষ্টা করে গেছেন। এর মধ্যে ক্রোধের মুহূর্ত ছিল। ব্ল্যাকমেইলের মুহূর্ত ছিল। শেষ পর্যন্ত হয়তো ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যরা তাঁর প্রতি আনুগত্যবশতই সম্মতি দিয়েছিলেন। আর, গান্ধীজি যে বারবার বলেছিলেন— সারা দেশ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, আর এই হচ্ছে সেই মুহূর্তে যখন ব্রিটেন আত্মরক্ষার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে—এটাই সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে সম্মতির। গান্ধীজির অনুভবশক্তি ও সমাবেশ ক্ষমতার ওপর আস্থা অন্য সব নেতার। 

তবু একটা সংশয় থেকেই যায়। ৩ বছর ৫ মাস থেকে মাত্রই তিন-দিন কম আগে ১৯৩৯-এর ১০ মার্চ কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশনের নির্বাচনজয়ী রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্র অবিকল এই যুক্তি বলেছিলেন—দেশের মানুষ অস্থির, বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন। এখনই সময়। তাঁর এই অনুভবকে কোনো মূল্য না দিয়ে গান্ধীজিকে ব্যবহার করে ওয়ার্কিং কমিটির নেতারা কংগ্রেস থেকে তাড়ালেন। তিনি তাঁর অনুভবের সত্য প্রমাণ করতে এক নিরুদ্দেশ অভিযানে বেরলেন। সম্পর্ণ অজানা অপরিচিত জায়গায় দরজায় দরজায় পাগলের মত ঘুরলেন, ‘আমাকে একটা সৈন্যবাহিনী দিন, আমি ভারতকে স্বাধীন করব।’ শেষে তিনমাস টানা সাবমেরিনের ওপরের বাঙ্কে শুয়ে পিঠময় বেডসোর নিয়ে জাপানে পৌঁছুলেন। ক্রিপস যেদিন এসে পৌঁছুলেন দিল্লিতে ১৯৪২-এর ২২ মার্চ, সুভাষচন্দ্র সেদিন আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে বার্মা সীমান্তে। সেখান থেকে তিনি রেডিওতে একটি ভাষণ দেন, গান্ধীজির উদ্দেশ্যে, ‘মহাত্মাজি’ সম্বোধন করে, বলেছিলেন, আমি বার্মা সীমান্তে, আমরা ভারতের দিকে এগিয়ে চলেছি। একমাত্র আপনিই পারেন সমগ্র ভারতকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আমাদের সঙ্গে মেলাতে। শুধু আপনিই পারেন। আপনি। 

গান্ধীজি ‘ভারত ছাড়ো’ ভাবলেন ক্রিপস চলে যাওয়ার পরপরই এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে ‘ভারত ছাড়ো’ কি সেই ‘দিল্লি চলো’ ডাকেরই সম্মত জবাব? 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *