১৭৯. যোগেন অন্তর্বর্তী সরকারে
অন্তবর্তী মানে কী?
ইনটেরিম। কোর্টের ইনটেরিম অর্ডার হয় না?
ও? ফাইন্যাল অর্ডার ইস্তক? আপাতত?
আপাতত আবার স্বাধীনতা হয় না কী?
হওয়ালেই হয়—ইনটেরিমের পর ডোমিনিয়ন?
সেটাই ফাইন্যাল তো? ফাইন্যাল অর্ডার?
দুটো আলাদা ডোমিনিয়নে আলাদা ফাইন্যাল।
ও? তা হলে ইনটেরিমটা কার, ইনটেরিম?
ওটা ধরে নিত হবে। বিষুব রেখা যেমন ধরে নেয়া।
কোন রেখাটা ধরব, ইনটেরিম বলে?
দুটো সীমানা কমিশনের একজন চেয়ারম্যান যা দাগিয়েছেন।
সেটা তো বর্ডার, পার্টিশন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বর্ডার বা পার্টিশন। অনন্ত অন্তর্বর্তী।
.
নানা নামই আছে।
ইনটেরিম সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার। নেহরুর প্রথম সরকার। মাউন্টব্যাটেনের একমাত্র সরকার—অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তা কে? ভাইসরয় ছাড়া কেউ তো কর্তা হতে পারে না।
এটা প্রথম তৈরি হয়েছিল ১৯৪৬-এর সেপ্টেম্বরে। তাতে লিগের পাঁচজন যোগ দিল অক্টোবরে। কিন্তু মোট সংখ্যা তো ১৪-র বেশি হতে পারবে না। লিগের জন্য খালি রাখা ছিল দুটো পদ। সেখানে পাঁচ এলে তিনজন বেশি হয়ে যায় না? সুতরাং তিনজন কমাতে হবে। কমানো হল শরৎ বোসকে ও আর-দুজনকে।
কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিশেবে মৌলানা আজাদ এলেন না? না। তাঁর সঙ্গে সিমলা বৈঠকে জিন্না হ্যান্ডশেক পর্যন্ত করেন নি। চাইছেন একটা সরকার বানাতে আর প্রথম থেকেই রগড়াবেন? অন্তর্বর্তী সরকারের মিটিং বসত, বড়লাটের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের মেম্বারদের মিটিঙের ঘরে। প্রতিদিনই। অফিসের মত। প্রতিদিনই ভাইসরয়ের সভানেতৃত্বে। কারণ, ভাইসরয় উইথ কাউন্সিলের মতই, ইনটেরিমও উইথ ভাইসরয়।
প্রত্যেক দিন সকাল শুরু হত, গত সন্ধ্যার মিটিঙের পর নতুন দাঙ্গার খবর দিয়ে। ভাইসরয় সামনে একটা আথালিক ম্যাপ ছড়িয়ে বসতেন। তাঁর সেক্রেটারি জনসন, রেডিওগ্রামের কাগজ থেকে নামগুলি পড়ে যেতেন। মাউন্টব্যাটেন তাঁর পাশে রাখা কুশন থেকে একটা করে পিন তুলে গাঁথতেন। পিনগুলোর সঙ্গে হয় সবুজ না-হয় শাদা ডট্ কাগজ লাগানো থাকত। আক্রমণকারীরা মুসলমান হলে সবুজ পিন, অমুসলমান হলে শাদা পিন।
চৌদ্দ জন মন্ত্রী। গোলটেবিল। কাঠের পিঠ উঁচু চেয়ার। দেয়াল ঘেঁষে সেক্রেটারির। কেবিনেট সেক্রেটারি ও সি-ইন-সি আনিলেক আলাদা দুটি চেয়ারে। তাঁদের পেছনে বোধহয় তাঁদের দুই সেক্রেটারি। পাগড়ি-পালক পরা বেয়ারারা আসছে যাচ্ছে, জল-চা-কাজু নিয়ে ঘুরছে, বেরিয়ে যাচ্ছে। কথাবার্তা চাপা গলাতেই হয়—বড় জোর একেকটা ঘরঘর আওয়াজ ওঠে মাঝে-মাঝে। উঠলেই সবার কানখাড়া হয়। হয় বলদেব সিং ঘুমিয়ে পড়েছেন, না-হয় লিয়াকত আলি কোনো বাগড়া তুলেছেন, যার জবাব হয় না।
প্রতিদিন দশটা-পাঁচটা যদি একটা মিটিং চলে, তা হলে বসার চেয়ার ও জায়গাটাও মোটামুটি পাকা হয়ে যায়। মাউন্টব্যাটেনের ডান দিকে বসতেন জওহরলাল, বাঁ দিকে বসতেন লিয়াকত আলি। জওহরলালের চেহারা ও পোশাক তো সকলেরই চেনা—ধুতি, কুর্তা আর জওহরকোট, গান্ধীটুপি। কারো কারো মাথাতেই কোনো টুপি থাকত না-পাঞ্জাবিদের পাগড়ি ছাড়া। পাকিস্তানের চারজনই স্যুট-কোট-টাই পরতেন, যোগেন পরতেন ধুতি-পাঞ্জাবি। বসতেন বলদেব সিং আর লিয়াকত আলির মাঝামাঝি। এই মাস দশেক মন্ত্রিসভায় অহরহ একসঙ্গে বসা সত্ত্বেও একটা দিনও এমন কোনো উপলক্ষ ঘটে নি যে জওহরলাল যোগেনের সঙ্গে কথা বলছেন। যোগেনেরও তেমন কোনো কারণ ঘটে নি। পরোক্ষে অবিশ্যি দু-একবার হয়েছে। যেমন যোগেন যোগ দেয়ার পরপরই মন্ত্রিসভায় যোগেন বলেছিলেন, এটা খুব অদ্ভুত ঠেকছে যে সমস্ত সমাধান যে-প্রদেশের ওপর নির্ভর করছে বা এখানকার সমাধানের ওপর যে-প্রদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সবচেয়ে বেশি, সেই বাংলার কোনো প্রতিনিধি এই মন্ত্রিসভায় নেই।
প্রথমে সবাই চুপ করে গেলেন, যেন যোগেনের কথাটা একেবারে অবান্তর। তারপর, প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার জন্য, মাউন্টব্যাটেন তাঁর সামনে রাখা ফাইলের পাতাগুলির কোনা দুটো-একটা নাড়িয়ে মুখটা নিচু রেখেই সামান্য হেসে খুব চাপা গলায় বললেন, আমাদের অবিশ্যি তেমন মনে হচ্ছে না, বরং মাননীয় মিস্টার মণ্ডলের দিকে তাকিয়ে আমরা বাংলাকে যথেষ্ট উপস্থিত মনে করছি।
বিশেষ করে সেক্রেটারিরা হেসে উঠল, যেন কথাটা বলার সময় যোগেন নিজে যে বাঙালি সেটাই ভুলে গিয়েছিল।
ঘটনার এমন একটা মোচড় প্রায়ই ঘটত, অসাবধানতায়। অসাবধানতা কখনো মনে হত বুঝি বলদেব সিঙের বা যোগেনেরই। পরে মনে হতে পারত, অসাবধানতা ছিল তাঁদেরই বোঝায়, যারা তাঁদের কথা শুনে হাসতেন। একদিন যোগেন জিগগেস করেছিল—বাংলার দাঙ্গা বললেই তো আমরা বুঝে নিচ্ছি হিন্দু-মুসলমান। পাঞ্জাবের দাঙ্গা বললেই আমরা বুঝে নিচ্ছি হিন্দু-শিখ ও মুসলমানের দাঙ্গা। কিন্তু বাংলাতেই হোক আর পাঞ্জাবেই হোক, যে দুটি সম্প্রদায়ের দাঙ্গা, সেই দুটি সম্প্রদায়ের বাইরেও তো অনেক মানুষ থাকেন, যেমন, তপশিলিরা, তাঁরা কী করছেন।
সকলেই ধরে নিয়েছেন, যোগেনের তৃতীয় পক্ষ কাল্পনিক। এতেই সবাই এমন হেসে উঠলেন।
বিহারের দাঙ্গা নিয়ে প্যাটেল বললেন, গভর্নর নাকী বরাবরই বলছেন, সাহেবরা যেন কোনো ভাবেই দাঙ্গা-হাঙ্গামায় থার্ড পার্টি না হয়ে যায়।
তখন কেউ আর হাসে নি।
১৫ আগস্টের সপ্তাহ ছয়েক আগে পাঞ্জাবে, লাহোর-অমৃতসরে, আগুন লুটপাট ও হত্যা যে-কোনো যুদ্ধের চাইতেও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা বারবার পাঞ্জাবের গভর্নর জেনকিনসকে জানাচ্ছিলেন—মার্শাল ল জারি করতে। গভর্নর করছিলেন না ও বরাবরই যুক্তি দিচ্ছিলেন, মিলিটারি রাজি নয়। জিন্না আলাদা করে মাউন্টব্যাটেনকে জানিয়েছেন যে সামরিক আইন জারি করার ফলে যদি মুসলমানদের ওপর গুলি চালাতে হয় তাই চলবে। তবু, এই গৃহযুদ্ধ এই মুহূর্তে বন্ধ করা হোক।
জওহরলাল হঠাৎ রেগে গিয়ে বলে উঠলেন, এ তো শৃঙ্খলাভঙ্গের ব্যাপার। গভর্নর থেকে শুরু করে চাপরাশি পর্যন্ত সবাইকে এক্ষুনি বরখাস্ত করা হোক।’
মিটিং একেবারে চুপ করে গেল। মাউন্টব্যাটেন থমথমে মুখে নিজের চোখ ফাইলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। তারপর থমথমে গলায় বলে উঠলেন, আমি সম্রাটের প্রতিনিধি হিশেবে আমার এই মন্ত্রিসভায় সভাপতিত্ব করছি। এটা প্রত্যাশিত যে এই মন্ত্রিসভায় যিনি আমার প্রধানমন্ত্রী তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রকাশ্যে আর-একটু দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য যেন মিনিট করা না হয়।
একটু তেতো মুখে, মাউন্টব্যাটেন বলেন, এ-বিষয়ে আমার আইনমন্ত্রী মিস্টার মণ্ডলের পরামর্শ জানতে চাই।
যোগেন বলল, এটাকে আইনের আওতায় বিচার করলে সত্যি করেই প্রধানত সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার আনুপাতিক ভাগের কথা উঠবে। আমার মনে হয় না, মার্শাল ল জারি করতে আদেশ দেয়া হয়েছিল বা গভর্নর তা করতে অস্বীকার করায় অনানুগত্য দেখানো হয়েছে। আইনের দিক থেকে ও কমনসেন্সের দিক থেকে এটাকে, এমন কঠিন-পরিস্থিতিতে, আলোচনার বিষয় হিশেবেই দেখা উচিত। আইনের খাঁচায় নয়।
যোগেন এত কম কথায় ও এত কাটা-কাটা করে বলেছিলেন, যা এ সভার সম্ভবত কেউই আশা করেন নি।
প্যাটেল যোগেনকে জিজ্ঞাসা করলেন, পাঞ্জাবের পরিস্থিতির সবচেয়ে জটিলতা কোথায় বলে আপনার মনে হয়।
কলকাতায় বা হয়েছিল। সিভিক অথরিটি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু নির্বাচিত সরকারকে তা জানায় নি। গভর্নর তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করেন নি। কলকাতা, পাঞ্জাব, নোয়াখালি, বিহার- সর্বত্রই এই সন্দেহ তৈরি না হয়ে পারবে না যে সব পক্ষকেই কর্তৃপক্ষ হিন্দু-মুসলমান-শিখ- তপশিলি ভাগাভাগি সাব্যস্ত করার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়। তাঁরা যে স্বাধীনতা দিয়েছেন, সেটা দেখাতেও চাইছিলেন।
প্যাটেল যোগেনের কথায় সম্মতি জানিয়ে জোরে ঘাড় হেলিয়ে বললেন, আমি মিস্টার মণ্ডলের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। আমাদের এক-একটা আন্দোলনের সময় লাঠিবন্দুক নিয়ে পুলিশ যে-ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ত ও সম্মানিত নেতাদেরও যে-রকম লাঠি ও বন্দুকের কুঁদো দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করত, এই দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঠেকাতে পুলিশ তার এক হাজার ভাগের একভাগও করছে না।
নেহরু একটি প্রস্তাব দিলেন, তাঁর বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতকে সোভিয়েত উইনিয়নে রাষ্ট্রদূত হিশেবে পাঠানো হোক।
লিয়াকৎ আলি সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠলেন, এটা তো পুরোপুরি গবর্মেন্টই নয়। একটা মাঝামাঝি ব্যবস্থায় রাষ্ট্রদূত কী করে হবে?
নেহরু খুব চোটে উঠে বললেন, সেটা তো আপনার ওপর নির্ভর করে না, আমার ওপর নির্ভর করে।
লিয়াক আলি তাঁর রাগ জানালেন অবাক হয়ে—এটা একটা খবরের মত খবর বটে। আপনার নিজের উপকার হবে যদি এই ধারণাটার ভুল আপনি এখনই শুধরে নেন।
জওহরলাল চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে আঙুল নাচিয়ে লিয়াকৎকে ধমকে উঠলেন, আমি আপনাকে শেষবারের মত সাবধান করে দিচ্ছি, আমার পা মাড়াতে আসবেন না। আমার কথা না শুনলে আপনার বিপদ ঘটবে।
লিয়াকও চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলেন, আপনার ভাষাই আপনার পরিচয় দিচ্ছে যে আপনার যোগ্য আসন চেয়ার নয়, আপনার যোগ্য আসন রাস্তার গুণ্ডাদের ঠেকে।
যা হোক, শেষ পর্যন্ত ঘুষোঘুষিটা এড়ানো গেল
কিন্তু এই গবর্মেন্টের সাংবিধানিক মর্যাদা নিয়ে ধোঁয়া কাটল না। সত্যি করেই তো এটা প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত মন্ত্রিসভা নয়, পার্টিদের প্রতিনিধিদের মন্ত্রিসভা।
গবর্মেন্টের উঁচু অফিসারদের সঙ্গেও এ নিয়ে টক্কর বাধে নেহরুর।
হায়দারাবাদের ব্রিটিশ প্রতিনিধি চাইছিলেন হায়দারাবাদ স্বাধীন থাক। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ীই নিজাম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা চান, হায়দরাবাদ নিজস্ব সৈন্যবাহিনীর প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে চারটি সামরিক প্লেনের অর্ডার দেয়।
ব্রিটিশ প্রতিনিধি যখন অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভার সঙ্গে দেখা করেন নেহরু তাঁকে ধমকে বলে ওঠেন, এগুলো হচ্ছেটা কী, আমাকে না-জানিয়ে এ-সব কী করে হয়। আমি পুরনো আবর্জনা ঝেড়ে ফেলে, নতুন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তৈরি করব।
হায়দারাবাদের ব্রিটিশ প্রতিনিধি দাঁড়িয়ে বলেন, তাঁর কর্তৃপক্ষদের না জানিয়ে তিনি কোনো কিছু করেন নি ও প্রতিটি ঘটনা তাঁদের জানানো হয়েছে।
ব্রিটিশ প্রতিনিধি নেহরুর নাম একবারও বলেন নি। নেহরু তাঁর ইঙ্গিত না বুঝে আবার ধমকে উঠলেন, আমি বলছি আমি জানি না আর তুমি বলছ রিপোর্ট করেছ। ব্রিটিশ প্রতিনিধি জবাব দিলেন, আমার রিপোর্টিং অথরিটি মিনিস্টার অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া, লন্ডন।
