১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৬১. জাত, জাতি, জাতীয়তা বিভ্ৰাট

১৬১. জাত, জাতি, জাতীয়তা বিভ্ৰাট 

জিন্নার এই দ্বিজাতিতত্ত্বটা এল কোত্থেকে? ভারতবর্ষে জাতির সংখ্যা তো কখনোই কিছু কম ছিল না। জাত আর জাতির ফারাকটা হল কবে, কেন? জাত গোনার দরকার পড়ল কেন, তাও এত সূক্ষ্ম হিশেব কষে? গোনাগুলি দুইয়েই কেন থেমে থাকল—হিন্দু ও মুসলমান? বা এক না দুই, এই ঝগড়াতেই কেন আটকে গেল? এর আগে, ও পরেও, শিখ, হিন্দু ও মুসলমানরা সবাই মিলে পাঞ্জাবীও ছিল। 

১৯৩৬-এর মার্চে পাঞ্জাবের শহিদগঞ্জে শিখ ও মুসলমানদের ভিতর এমন একটা বিষয় নিয়ে দাঙ্গা প্রায় বাঁধে-বাঁধে যে জিন্নাকে অনুরোধ করা হয় তিনি যদি একটা সুপারিশ দেন। জিন্না একটি মীমাংসাসূত্র বের করায় কৃতজ্ঞ পাঞ্জাবের একটি শাহেব তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, পাঞ্জাবে তিনটি ধর্মের লোকজন সমসংখ্যক থাকায় এখানে কোনো একটি সম্প্রদায়ের লোকের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না—এটাই পাঞ্জাবের শক্তির সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি। 

এর পর বছর না-পড়তেই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রথম ভোট হল। ভোটের প্রচারের সময় কংগ্রেস ও লিগের মধ্যে রেষারেষির বদলে বরং বোঝাবুঝির ভাবই বেশি ছিল। যুক্তপ্রদেশ, আসাম, পাঞ্জাব, সিন্ধু, বাংলা—সর্বত্রই এই দুটি দলের—কংগ্রেস ও মুসলিমদের প্রাদেশিক কোনো দলের—কোয়ালিশন সরকার হবে। কাজে তা হল না। যুক্তপ্রদেশে কংগ্রেস বলেছিল, লিগকে মন্ত্রিসভায় নেব না। বাংলার ব্যাপারে কংগ্রেসের হাইকম্যান্ড বলে দিল, কোনো কোয়ালিশনেই যাব না—কৃষকপ্রজার হকশাহেব হলেও না। কংগ্রেস ও লিগের কোয়ালিশন মন্ত্রিসভাই হবে যুক্তপ্রদেশে। প্রচারের সময় লিগ কংগ্রেসকে আক্রমণ করেনি, কংগ্রেসও লিগকে তেমন গালাগালি দেয়নি। জামায়েত-উল-উলেমা-হিন্দ ছিল লিগ-কংগ্রেসের তৃতীয় পার্টনার। লিগের দুই নেতা খালিকুজ্জমান ও নবাব ইসমাইল খাঁ ছিলেন যথেষ্ট সম্মানাস্পদ। অথচ ভোটের পর মন্ত্রিসভা তৈরির কথা উঠলে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু একটা প্রকাশ্য বিবৃতিতে জানালেন, তিনিই তখন কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতি, ‘দেশের রাজনীতির বিবর্তনে এখন ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি মাত্র পক্ষ মতবিনিময় করতে পারে—ব্রিটিশরাজ ও কংগ্রেস।’ এরই উত্তরে জিন্না বলেছিলেন, ‘তিন নম্বর আর-এক পক্ষও আছে—মুসলিমরা।…আমরা কোনো পার্টিরই তল্পিবাহক নই কিন্তু ভারতের কল্যাণকর যে কোনো কাজে আমরা সমানাধিকার নিয়ে প্রস্তুত থাকি। 

জওহরলালের ঠিক এই বিবৃতিটি থেকেই ভারতের জাতীয়তাবাদ সংখ্যা দিয়ে গোনার শুরু কী না, তার দলিলি প্রমাণ তেমন কিন্তু কেউ যদি চান, তাহলে তিনি এই তারিখটাকে তেমন জাতিসুমারির শুরুর বছর ধরতে পারেন। জওহরলাল সারা দেশের সব নেতাদের মধ্যে বেশি আধুনিক, সংস্কারমুক্ত, ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত ও গণতন্ত্রী। আর তিনিই কী না ব্রিটিশ বনাম ভারত, পাশ্চাত্য বনাম প্রাচ্যে, সাম্রাজ্যবাদ বনাম গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক মহারণে পক্ষ স্থির করলেন ধর্ম দিয়ে? তা তিনি করতে চান নি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল—জিন্নাকে নিষেধ করা। তিনি আপত্তি করছিলেন—ধর্মের যুক্তিতে মুসলমানদের জাতীয়তাবাদী করে তোলা। ইতিহাসের নিয়তিতে তিনিই হয়ে গেলেন তাঁর দলের সেই সমস্ত মুসলিম বিদ্বেষীর প্রতিনিধি, বিশেষত উত্তরপ্রদেশে, তাঁর দলে যারা গিজ-গিজ করছিল। কিন্তু জওহরলাল নিজে তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত মনে করে গেছেন, তখনকার সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে, সাম্প্রদায়িক ক্ষমতাকেন্দ্রগুলির বিরুদ্ধে ওই জায়গায় দাঁড়ানো ছাড়া কোনো পথ খোলা ছিল না। 

মাত্র একবছর আগেই কিন্তু শিকরবন্দের শিখ-মুসলমান দ্বন্দ্বে, পাঞ্জাবের গভর্নর বলেছিলেন—সাম্প্রদায়িক দলের বৈচিত্র্য ও বহুতাই দাঙ্গার বিরুদ্ধে গ্যারান্টি। 

ব্রিটিশরাজের প্ররোচনায় সাম্প্রদায়িকতা বেড়েছে বা সাম্প্রদায়িকতা ধারণাটাই ব্রিটিশরাজের আমদানি—এমন সিদ্ধান্তের মধ্যে একটা কোনো সত্য হয়তো আংশিক আছে কিন্তু সঙ্গে আছে বহুতর অসত্য। ভারতে হিন্দুরা সংখ্যায় বেশি। একটা জিলা বোর্ডে বা স্কুলবোর্ডে বা মিউনিসিপ্যালিটিতে বা টাউনকমিটিতে বা ইউনিয়ন বোর্ডে বা ফজলুল হকের তৈরি নানাবিধ মনোনীত প্রার্থীপদে একজন উঁচু জাতের হিন্দু মনোনীত হলে, সে যে হিন্দু এটা হিশেবে ততটা আসত না, যতটা আসত তার যোগ্যতার প্রসঙ্গ। কিন্তু কোনো মুসলমান মনোনীত হলে, বা, তপশিলি কোনো প্রার্থী মনোনীত হলে, সে যোগ্য কী না—এ প্রশ্ন উঠতই না, উঠত তার ধর্ম-পরিচয় ও জাত-পরিচয়। সেই পরিচয়ের ওপর তার হাতে জল বা খাদ্য খাওয়া চলবে কীনা—এত দরকারি সব প্রশ্ন উঠত, যুক্তপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর মত বড়-বড় সব জায়গায় 

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা বা জাতীয়তাবাদের এই সুযোগটা ছিল, বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের সিটভাঙা ভোটজোড়া এই সবের পর। মুসলমান ব্যতীত অন্য সব ধর্মই যেন হিন্দু-সংস্কৃতির অংশ। এমনকি আদিবাসী (ওরিজিন্যালস) হলেও। ভারতবিদ্যার পেডাগজিতেও এই অসমব্যবধান মেনে নেয়া হয়েছে। এখন তো সে প্যাঁচ আরো শক্ত হয়েছে যে মুসলমানরা যদি মেনে নেয় তারা ভারতের মুসলমান তাহলে তাদের জায়গা দিতে আপত্তি নেই। ফলে, সমস্ত প্রদেশেই কংগ্রেস নেতা, হিন্দু মহাসভার নেতা, গীতাযজ্ঞের নেতা, রথযাত্রার নেতা, এখন গণেশ চতুর্থীর নেতাও একই রকম দেখতে, একইরকম জামাকাপড় পরা। 

এটা নিয়ে একটা কোনো মতৈক্য এতদিনে ঘটে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এতদিন পর এইটুকু বোঝা যাচ্ছে যে সে-মতৈক্য কোনোদিনই ঘটা সম্ভব নয়। 

কেন সম্ভব নয়? 

জাতি-ধারণাটার মধ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণেই ইয়োরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের ধারণা ও বিচারশীল জ্ঞানের ধারণাটা মিশে আছে। শুধু মিশে আছে বললেও হবে না। এ দুটো ধারণা এমন লেপ্টে আছে যে আলাদা করতে হলে অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে। আলাদা করা বা আলাদা হওয়া তো সম্ভবই নয়, বরং, এই দুটো জীবন আরো এক পরতে ঢাকা পড়ছে যে, হতে পারে, দুটো মিলিয়ে একটা জীবন হয়ে গেল। এনলাইটেনমেন্ট তো একটু সাবেকি ব্যাপার। হালের আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক, তত্ত্ব যদিও অর্থনীতির পুঁজি-সংগ্রহ ও উদ্বৃত্ত শ্রম-তছরুপের প্রতিষ্ঠিত যুক্তি অগ্রাহ্য না করেও, ঘটনাগুলির নতুন নামকরণ মাত্র। 

সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, শ্রমিক, উদ্বৃত্ত শ্রম–এইসব শব্দ যেন বড় বেশি পুরনো। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় সর্বাধিক্রম অনুসন্ধান ও আলোচনার বিষয় একটিই—দাঙ্গাটা শুরু করল কোন পক্ষ নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক জিজ্ঞাসাতেও এইটুকু আক্কেল কেউই দেখায় না যে বলবে, দাঙ্গা ঘটার আগেই দাঙ্গা শুরু না-হলে দাঙ্গা ঘটে না। দাঙ্গা একটা উপায় বলে মেনে নেয়ার হাওয়া থেকেই দাঙ্গা শুরু হয়। সেই উপায়, বিচিত্র সব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারে—পরম নিঃস্বার্থ ও নৈর্ব্যক্তিক উদ্দেশ্য, যেমন একটা মশজিদ বা মন্দির বানানো, যেমন একটা ফুটবল টিমকে আই এফএর লিগ থেকে বাদ দেয়া, যেমন কয়েকটি দাড়ি-না-গজানো হিন্দু ছেলে মুসলমান মেয়ে সেজে, হিন্দুপাড়ায় গিয়ে হিন্দু ছেলেদের উশকোয়, তাদের পেছনে লাগতে। এমন সব ঘটনা থেকে দাঙ্গা বেঁধেছে, নামকরা সব দাঙ্গা। দাঙ্গা যদি উপায় হিশেবে গ্রাহ্য হয়, তাহলে তার লক্ষ তো কত বিচিত্র হতে পারে। একটি হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করার জন্য একটা দাঙ্গা বাধানো হতে পারে। সে-দাঙ্গায় মেয়েলুটের ঘটনা দাঙ্গা বিষয়ক বিবেচনায় একটা স্তরান্তর ঘটায়। সত্যিকারের মেয়ে লুটের ঘটনা এবার ঘটলে, বা রটলেও, ছেলেটি ও মেয়েটির যুগল-সম্মতিতেও এমন ছলনাময় দাঙ্গা ঘটতে পারে। খুব বিখ্যাত উর্দু গল্প আছে। পাঞ্জাবে মেয়েলুটের অভিযোগ মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমন গরম করে তুলেছিল হাওয়া যে নবগঠিত দুই রাষ্ট্র ভারতীয় ইউনিয়ন ও পাকিস্তানের দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে চুক্তি হয় সামরিক বাহিনী গ্রামে-গ্রামে গিয়ে এই লুণ্ঠিত মেয়েদের উদ্ধার করবে ও তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনবে। একটি গল্পে এমন একটি লুণ্ঠিত মেয়ে উদ্ধার-বাহিনী আসা সত্ত্বেও ফিরল না তার নিজের বাড়িতে, থেকে গেল সেই লুঠেরা পরিবারেই। গল্পটির যাদু আছে এইখানে—লুঠ হওয়া আর উদ্ধারের মাঝখানে যে সময়টা রাষ্ট্রের আওতা থেকে খসে পড়েছে দুটি মানুষের মধ্যে, তখন তো আর কেউ লুঠেরাও নয়, লুঠের মালও নয়। আর-একটি গল্পে এমন এক বহুকে সামরিক বাহিনী উদ্ধার করে পৌঁছে দিল তার স্বামীগৃহে আর তারপর শুরু হল সেই দম্পতির নতুন করে তাকানো, নতুন করে ছোঁয়া। 

প্রশ্নটা যদি হত—দাঙ্গা থামে কেন ও কখন, তাহলে এই গল্পগুলিতে হয়তো একটা সংকেত খোঁজা যেত। কিন্তু দাঙ্গা ঘটে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে একটা বিস্ময়ের নেশাতুর ঘোর আমাদের পেরতে হয়। যারা দাঙ্গা করছে, তাদের কোনো ধর্মেই তো দাঙ্গার অনুমোদন নেই। বা দাঙ্গার সময় সেই অনুমোদন খুঁজে বের করা হয় শাস্ত্র থেকে—ন্যায়যুদ্ধ ও জেহাদ। ধর্ম কথাটাকে সবচেয়ে সোজা করে নিলে তো দাঁড়ায় একটি বিশ্বাস ও সেই বিশ্বাসের সঙ্গে বাঁধা কিছু ব্যবহার। বিশ্বাস না-থাকলে কোনো তত্ত্ব দানা বাঁধে না। দাঙ্গা বাঁধে কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরখোঁজার সর্বোত্তম শর্টকাট ধর্মের ওই তত্ত্বটিতে পৌঁছনো। ওই যে-বিশ্বাস তত্ত্ব তৈরি করেছিল তাতে তো এটাই স্পষ্ট হওয়ার কথা—বিশ্বাসের ফলে কী কী করা সম্ভব ও কেমন করে করা সম্ভব? সম্ভবপর আর ইচ্ছাপূরণকে দৈনন্দিনের আচরণে মেলানো যায় না, যখন, তখনই দাঙ্গা ন্যায্য বলে মনে হয়। 

মেলানো হয়তো যায়, যদি দুঃসাধ্য আত্মনিগ্রহের ভিতর যেতে হয় আর যদি ঈষ্ট হয় প্রমাণাতীত কিছু। গাপমুক্তি ও তার জন্য প্রাপ্য শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য পৃথিবীর সব ধর্মেই দুঃসাধ্য সব ব্রতের প্রায়শ্চিত্ত আছে। দণ্ডী কেটে-কেটে তীর্থদেবতার কাছে যাওয়া। নিরক্ষীয় রৌদ্রে নিরম্বু রোজাপালন। লেট-এর উপোস। শিবরাত্রির উপোস। নমাজ আদায়। তিন আহ্নিক বা সন্ধ্যা। ইচ্ছামৃত্যু। অহিংসা। 

শেষ পর্যন্ত—বিশ্বাসের জন্য কী কী করা সম্ভব ও কেমন করে করা সম্ভব—সম্ভাবনা আর সম্ভব করে তোলা—পরস্পর থেকে আলাদাই হয়ে যায়। এই দুইয়ের কোনো অভিন্নতা থেকে ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মাচরণ তৈরি হয় না। 

এনলাইটেনমেন্টের আধুনিকতার যে-ঘের থেকে আমরা বেরতে চাই সেই ঘেরের ফাঁকফোঁকর খুঁজতে-খুঁজতে আমরা ভেবেই ফেলি—জাতীয়তা নিয়ে সম্মতি তৈরির জন্য সব সাক্ষ্যপ্রমাণ জড়ো করা হয়েছে ও সেগুলোকে সাজানো হয়েছে কোনো নিয়মে, কোনো কাঠামোতে, কোনো গুণাগুণ বিচার করে। যেন, তেমন কোনো পরীক্ষা সম্ভব! যেন, এমন কোনো পরীক্ষার ফলে আমরা জানতে পারব সম্ভাবনার কতটা সম্ভব ছিল বা আছে। সেই সম্ভব জানা গেল কী করে ও সেই সম্ভবকে সম্ভব করে তোলার কর্মসূচির নৈতিকতা প্রমাণের জন্য কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে কী না এটাও কি আমাদের পক্ষে পরীক্ষণ সম্ভব? জাতীয়তাবাদ আধুনিক হতে চায়। সেই কারণে এই আধুনিকতার যে-সর্বমান্যতা তৈরি হয়েছে, সেটা মানা ছাড়া তার গতি নেই সে-আধুনিকের জ্ঞানের কাঠামো তৈরি হয়েছে এনলাইটেনমেন্ট-উত্তর যুক্তিবাদ ও ধনতন্ত্রের সুতিকাগৃহে। তাই তার আধুনিকে নিজেরই বিরুদ্ধপক্ষ হয়ে যাচ্ছে। 

গান্ধীজি এই সম্ভবের একটা ঠিকানা দিয়েছিলেন : রামরাজ্য। সেখানে পৌঁছুবার একটা পথও বাৎলেছিলেন : শত্রুর প্রতি অহিংসা ও শত্রুর হিংসার পরোক্ষ প্রতিরোধ। 

ফলে, তিনি তাঁর এক বিরুদ্ধপক্ষ তৈরি করেছিলেন : জিন্না। জিন্নাও এই সম্ভবেরর একটা ঠিকানা দিয়েছিলেন। পাকিস্তান। সেখানে পৌঁছুবার একটা পথও বালেছিলেন! প্রত্যক্ষ সংগ্রাম, ডাইরেক্ট অ্যাকশন 

সেই সম্ভবকে গান্ধিজির অনুচেতনা দিয়ে জানতে দক্ষিণ আফ্রিকায় কঠিন আত্মনিগ্রহের মধ্যে তাঁকে যেতে হয়েছিল। সেই কঠিন আত্মনিগ্রহে সবাই দেখল গান্ধীজির সারাটা শরীর নরকের আগুনে ঝলসে গেছে। তাই তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বাস। 

জিন্নাও তাঁর জীবনে আত্মনিগ্রহের গোপন আক্রমণ সইতে সইতে আরো আত্মনিগ্রহের দিকে যাচ্ছিলেন। জিন্নার এই আত্মনিগ্রহে ছিল তাঁর একার। কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না তাঁর। স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন। স্ত্রীর অকাল মরণের কোনো প্রতিকার তাঁর হাতেও ছিল না, মাথাতেও না। একমাত্র মেয়ে তাঁকে একলা ফেলে বিয়ে করল। এরও কোনো প্রতিকার তাঁর মাথাতেও ছিল না, হাতেও ছিল না। রাজনীতি করতেন, গান্ধীজি সে রাজনীতিকে করে দিলেন শিকড়হীন, অবান্তর ও বাতিল। এরও কোনো প্রতিকার তাঁর হাতেও ছিল না, মাথাতেও ছিল না। টাকা-পয়সা ছিল তাঁর ইচ্ছাধীন, তাঁর বৃত্তিসাফল্যের গুণে। সে-সাফল্য ছিল এতই সহজে পাওয়া যে তাতে তাঁর আত্মনিগ্রহের কোনো নিরাময় ছিল না। পরন্তু, তাঁর শরীরের ভিতরের ব্যাধি যে তাঁকে প্রতিটি দিন মৃত্যুর দিকে ঠেলে ও টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সেটা জেনেও, তাঁকে ব্যবহার করতে হত বিপরীত—তিনি মৃত্যুরোগাক্রান্ত এটা বাইরের লোক জানলে কেউ আর তাঁকে বিশ্বাস করবে না। সেখানে গান্ধীজি বারবার অনশনে নিজের মৃত্যুকে করে তুলেছেন চরম। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *