১৭৬. বাংলার তপশিলিদের পার্টিশন
৪৬-এর আইনসভা ভোটের পর যেহেতু যোগেনই ছিলেন ফেডারেশনের একমাত্র জয়ী প্ৰাৰ্থী, তাঁকেই মন্ত্রিসভায় নিলেন প্রধানমন্ত্রী সারওয়ারদি। তার আগের বছর তিনেকের কিছু কম সময় নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভা থেকেই এটা সকলের কাছেই প্রকাশ্য হয়ে পড়ছিল যে যোগেন তাঁর ২১জন সমর্থক নিয়ে আইনসভার নিয়ামক নেতা হয়ে উঠেছেন। তপশিলি সম্প্রদায়ের মধ্যে যাঁরা এর আগে নেতৃত্বের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন হয়তো অর্থের জোরে বা খ্যাতির জোরে বা প্রতিষ্ঠার জোরে, তাঁরা যোগেনের নেতা হয়ে ওঠায় ও বাংলা আইনসভায় সরকার রাখা না-রাখার কর্তা হয়ে ওঠায় প্রথমে অখুশি হলেন, তারপর বিরক্ত হলেন, তারপর ঈর্ষা করতে লাগলেন ও শেষে তাঁরা বিরোধিতায় সক্রিয় হয়ে উঠলেন। মূলত যা ব্যক্তিগত হিংসা তা থেকে বিরোধী হয়ে ওঠার কোনো উপলক্ষ দরকার হয় না। উপলক্ষ তৈরি করতে হয় বিশেষ করে তাদের জন্য যারা যোগেনকে সমর্থন করেন ও বিশ্বাস করেন। সেই উপলক্ষটাই এসে গেল ৪৬-এর নির্বাচনে যোগেন ফেডারেশনের প্রার্থী হওয়ায় ও সারওয়ারদি মন্ত্রিসভায় বিচার, আইন ও পূর্তবিভাগের মন্ত্রী হিশেবে যোগ দেয়ায়। মহারাষ্ট্রের দলিত নেতা আম্বেদকরের নেতৃত্ব মেনে নেয়ার ফলে যোগেনের বিরুদ্ধে বাংলার নমশূদ্র নেতাদের এক পক্ষের অভিযোগ শক্ত হয়ে ওঠে। পি. আর ঠাকুর, মুকুন্দবিহারী মল্লিক, উপেন এদ্বার, এঁরা ১৫ নম্বর হ্যারিসন রোডের অফিসে একটি সভা ডাকেন ও নমশূদ্রদের মান্যগণ্য সবাইকে ও অন্যান্য তপশিলি নেতাদের কাউকে-কাউকে ডাকেন। আলোচ্য বিষয় হিশেবে বলা হয়েছিল—’তপশিলি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ।
মুখে-মুখে এটা রটে গিয়েছিল যে যোগেনের বিরুদ্ধেই এই সভা ডাকা হয়েছে ও যোগেনের নেতৃত্ব থেকে তপশিলি আন্দোলনকে মুক্ত করা হবে। সেই মুক্তির একটা উপায় নিশ্চয়ই হতে পারে—সংগঠন থেকে যোগেনকে বের করে দেয়া।
সাধারণত, এই ধরণের সংগঠনের এমন চরম সিদ্ধান্তের আগে অনেকগুলি স্তর থাকে। তপশিলিদের তেমন কোনো শক্তপোক্ত সংগঠন ছিল না বাংলায়। আইনসভায় ৩০-জন সদস্যের একটা গ্রুপের শক্তি যথেষ্ট। কোনো-কোনো সময় তা প্রমাণিতও হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন তপশিলি গোষ্ঠীর নিজস্ব জাতি-সংগঠন থাকায় ও বিশিষ্ট তপশিলি নেতারা তাঁদের পছন্দমত পার্টিতে থাকার ফলে, তপশিলিরা একটি রাজনৈতিক গ্রুপ হিশেবে প্রাধান্য পায়নি, প্রচারিতও হয়নি। যোগেনকে তেমন একটি রাজনৈতিক বিষয় হিশেবে উত্থাপন করার ইচ্ছেও হয়তো উদ্যোক্তাদের ছিল।
১৫-নম্বরে এত বড় সভা আগে কখনো হয়নি—এমন বলার কোনো অর্থ নেই। ঘরটি যথেষ্ট বড় বটে কিন্তু বেমাপি। উত্তরদিকটা বেশি চওড়া। দক্ষিণদিকে সিঁড়ি বলে, জায়গাটা কোনাচে। দক্ষিণ দিকের জায়গাটি আবার পশ্চিম দিকে কিছু গড়িয়ে গেছে বলে সে-জায়গাটা কাজেই লাগে না। ওখানে বসলে বা দাঁড়ালে উত্তরদিকের যে-জায়গাটিকে সভাস্থল বলা যায়, সেই সভাস্থল চোখে পড়ে না।
ওই পশ্চিমের টুকরোটা ছাড়া ঘরটা ভর্তিই ছিল। অনেক কমবয়েসি ছেলেমেয়েরা এসেছে—কলেজে পড়ে হয়তো। উদ্দুর খুব ব্যস্ত। সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে দু-চারজন বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছে বটে কিন্তু নতুন কেউ এলেই সে খুঁটিয়ে দেখছে, কে এল। হয়তো তারও কিছু লোক আসার কথা।
যোগেন বরাবর যেখানে বসে, সেখানেই বসেছে, রসিক কাকার পাশে, হাইবেঞ্চে পা তুলে। বিরাট কাকা সস্ত্রীক। জেঠিমা বয়স যত বেশি দেখানো যায় তেমন দেখিয়ে মেয়েদের জায়গায় বসেন। বিরাট জ্যাঠা এসে উলটো দিকের চেয়ারে বসেন। যোগেন খুব চাপা গলায় রসিকলালকে বলে, ‘কাহা, এ তো কাইজ্যার মিটিং। সারা রাইতেও শেষ হব না। এডডু তাড়াতাড়ি শুরু করাইয়া দেন-না।’
রসিকলালের কথা বলার ঠোঁটচাপা এক বিশেষ ভঙ্গি আছে, মনে হয় ঠাট্টা করছেন। বলেন, ‘আমি যশুরা হব্যার পারি কিন্তু তুই বরিশাইল্যা বইলে অ্যাডভ্যানটিজ পাবি না। আমি অত বোকা না রে।’
‘ওডারে কি অ্যাডভ্যানটিজ কয়? এ আছে না?’
‘তুই হাগতে বইস্যা প্র্যাকটিস কর। তবে অ্যাডভ্যানটিজ কইতে বুকের পাটা লাগব। সেডা তোর আছে খানিকড়া। কিন্তু বরিশালি জিভ তো! মোটা আর ময়লা। তাতে কি ওই সূক্ষ্ম কাজ আসে? তোগ চাঁদসীতে জিভ কাটা যায় না, খাড়াখাড়ি?’
যোগেন তার স্বাভাবিক হাসি হেসে ফেলে, সবগুলো দাঁত বের করে আর দুলে উঠে। কিন্তু হাসির আওয়াজ উঠতে দেয় না। তাতেই মনে হয়—হাসিটা স্বাভাবিক।
বিরাট জ্যাঠা উলটো দিক থেকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ক্যারে যোগেন, তোর দেহি ফূর্তি উথাল দিছে।’ যোগেন আঙুল তুলে রসিককে দেখিয়ে বলে, ‘কুকথায় পঞ্চমুখ—
‘তুই তো বাইছ্যা বসলি রসিকলালের লগে। তো রসের কথা শুনবি না? আয়, আমার লগে, দ্যাখ, অখণ্ডমণ্ডলাকারং বিরাট রে—’
রসিক তার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে কিছু একটা বলে, যোগেন আবার হেসে ফেলে, ‘এই দ্যাহেন জ্যাঠা, আপনারে নিয়্যা, কয় যে আপনার লগে নাকি সিট খালি নাই, হাউস ফুল।’
অগ্নি মণ্ডল সভাপতির চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমি প্রস্তাব করি আজিকার সভায় প্রবীণ তপশিলি নেতা বিরাট চন্দ্র মণ্ডল সভাপতির আসন গ্রহণ করিবেন।
এদবার ছিলেন পাশে, বলে দিলেন, ‘আমি এই প্রস্তাব সমর্থন করি।’
বিরাট মণ্ডল সভাপতির চেয়ারে বসে তাঁর সামনে যে-কাগজটা রাখা, দেখে বললেন, ‘আইজকার সভা কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে তো ডাকা হয় নাই। কয়েকজন আমাদের বন্ধুরা ডাইকছেন। তাগ মইধ্যে নিশ্চয়ই কথা হইছে, না হইলে মিটিং ডাকা কেন। তাদের মইধ্যে কেউ একজন যদি বলেন এই সভার প্রয়োজন এঁরা কয়েকজন বোধ কইরলেন কেন। শুধু এই কথাডা। বিষয় নিয়া কিছু কইব্যার কই না। শুধু সভাডা নিয়্যা। তারপর আমরা যদি সাব্যস্ত করি, এই সভাটা হওয়াই উচিত, তাইলে আর-একজন কেউ বিষয়ডা বিস্তার কইররেন।’
মিটিংটা ডেকেছিলেন যাঁরা, তাঁরা প্রত্যেকেই অনেক দিনের নেতা। বিরাট মণ্ডলকেই যে সভাপতি করা হবে, তাও ঠিক হয়নি, উপস্থিতদের মধ্য থেকে যেমন করা হয় তেমনি করা হয়েছে। বিরাট মণ্ডল যে-ভাবে শুরু করলেন, মনে হয়, তিনি শুরুতে এই কথাটি বলবেন বলে ভেবে এসেছেন। যদি তাই এসে থাকেন তাহলে কি ধরে নেয়া যায় যে যোগেন মণ্ডলরা প্রস্তুত হয়েই এসেছেন।
বিরাট মণ্ডল বলে ওঠেন, ‘আহ্বায়কদের নামগুল্যা পড়ার কি দরকার আছে। প্রফেসার মল্লিক যদি আইস্যা যাইতেন, তাইলে আমিও চেয়ার পাইত্যাম না আর উদ্যোক্তারাও কথা কইতে বাধ্য হইতেন না। যেমন হইলে ভাল হইত, তেমনডা তো সর্বদা হয় না। শুধু দশজনের একজন কইরলে তো উনি সাধারণত আসেন না। উনি তো একাই দশ। এই কাগজডাতেই উনাকে সভাপতি বইল্যা উল্লেখ কইরলে ভাল হইত। মধুর অভাবে গুড় তো গ্রাহ্য। কেউ একজন বলেন। প্রমথ, তুমিই কও। তোমারে কেউ গুড় ভাইবব না।’
পি আর ঠাকুর সভাপতির পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সভাপতি মশায়ের আদেশে বলছি, যারা এই সভা আহ্বান করেছি, তাদের মধ্যে যে খুব কিছু আলোচনা হয়েছে তা না। এইটুকু কথা হয়েছে যে আমাদের তপশিলিদের নিয়ে নানারকম কথা রটছে। আমরা সবাই সব জানি না। সবাইকে ডেকে একবার নিজেদের জানাজানিটা ঠিক করে নিলে ভাল। এর বেশি কিছু না।’
‘আমাগ তো দুই-তিনডা প্রতিষ্ঠান আছে অলবেঙ্গল শিডিউল্ড কাস্ট বইল্যা, অ্যাসোসিয়িশেন না কী কমিটি বইল্যা। সব গুল্যাতেই তো তোমরাই আছো। সেই গুল্যার একডা থিক্যা ডাইকলে হইত না?’
‘হ্যাঁ। নিশ্চয়ই হত। আমরা আবার ভাবলাম অল বেঙ্গল সিডিউল্ড সংগঠন তো একাধিক। একাধিক হওয়ার কারণ আছে বলেই একাধিক। তাদের ঘাড়ে চাপানো ঠিক হবে না। তাই আমরাই ডাকলাম, যে-কজনের মধ্যে কথা হয়েছে। সে-অধিকার তো সবারই আছে। কথা বলার জন্য সভা ডাকার অধিকার। যেমন আসা না আসার অধিকারও সবার আছে।’
‘তুমি কৈফিয়ৎ দ্যাও ক্যান? একডা সভা ডাকা ঠিকমত হইছে কী না সেডা জানা বোঝা তো সভাপতির কর্তব্য, যদি তিনি আহ্বায়ক না হন। ধরো, তোমরা যদি আইজ সিদ্ধান্ত ন্যাও সবাই মিল্যা ব্রিটিশ সরকাররে ডুবাইব্যা—তাইলে সিডিশনের দায়ে শেষ রাত্তিরে আমারে থানায় নিয়্যা যাবে। সভাপতির ওইটুকুই দায়। শ্যাষ রাতে হাজতবাস।’
‘না। আপনাকে হাজতখাটানোর জন্য মিটিং ডাকা হয়নি।
‘মানে যারা মিটিংডা ডাইকছ তারা ইচ্ছাপূর্বক কাউকে বাদ দ্যাও নাই। আবার ইচ্ছাপূর্বক কাউরে আনা করো নাই। তাইলে বিষয়ডা তুমিই উত্থাপন করো।
‘এটা কি ন্যায্য কাজ হল জ্যাঠা? আমাকে আদেশ করলেন মিটিং এরা কেন ডেকেছে। তার উত্তর আমি দিয়েছি। মনে হচ্ছে সে উত্তর আপনি গ্রহণ করেছেন। তাহলে বিষয়-উত্থাপনও আমাকেই করতে হবে কেন। আমরা ঠিক করে রেখেছি উপেনবাবু বলবেন।’
‘সেইডা কইব্যা তো। আইসো। উপেন। আইসো।’
এবার একটু পেছনে বসেছিল। সে উঠে সভাপতির কাছে চলে আসতে, যারা বসে আছে চেয়ারে, বেঞ্চে বা শতরঞ্চিতে তাদের পেরতে হল। এদ্বার লম্বা চেহারার শক্ত মানুষ। তাকে নিজের জন্য পথ করতে হল না—যারা বসেছিল তারাই এদিক-ওদিক কাত হয়ে বা সরে এদবারকে পথ করে দিল। এদ্বার ঘাড় নিচু করে বা এমন কী চোখ দিয়েও দেখল না—সে তিন-চারবার পা ফেলে সভাপতির চেয়ারের সামনে পৌঁছে গেল, সভাপতিকে আড়াল করে। ঠিকঠাক দাঁড়াতে না-দাঁড়াতেই এদ্বার তার কথা বলতে শুরু করে দেয়।
‘আমাদের এই রকম একটা মিটিং ডাকার দরকার বোধ হইছে নিজেদের কাছে কতকগুলি কথা সাফ করতে। কথাডা খুব সোজা—আমরা তো তপশিলভুক্ত জাইত। তার আগেও আমাগ অন্য সব নাম কওয়া হইত—ডিপ্রেসড, ব্যাকওয়ার্ড, অনুন্নত। সেডা খুব সুবিধার ছিল না। আমাগর ভাল লাগে নাই। আমরা নিজেগ নাম বলত্যাম নানা রকম—ক্ষত্রিয়, গুপ্তক্ষত্রিয়, নমস্য ব্রাহ্মণ এই সব। গবর্মেন্ট একডা আইন বানাইয়্যা আমাগ জন্য আইনসভায় কতকগুলি আসন সংরক্ষণ করে। তার বাদে সেই রক্ষণ কাদের লাইগ্যা তাগ সম্প্রদায়ের একডা লিস্টি বানাইয়্যা ট্যাক কইরা দিছে সেই আইনের লগে। আমরা যা ছিল্যাম তাই আছি। তার পর নতুন হইল যে আমরা কয়েকটা আসন পাইল্যাম। সেখানে ঐ লিস্টের বাইরের কেউ খাড়াইব্যার পারব না। ভাল। কিন্তু এই যে জাইতের লিস্টি—তাগ সবাইরে নিয়্যা কুনো নাম নাই। সেই কারণে কাগজপত্রে ছাপায় কথায় আমাগ লিস্টের জাইতগুল্যারে মিলাইয়্যা নাম হইল সিডিউল্ডকাস্ট। সরকার যদি চাহিতেন অন্য যে-কোনো নামও হইব্যার পাইরত। অ্যাহনো পারে। ধরো কেউ যদি ডাইকব্যার ধইরত, সংরক্ষিত জাইত, রিজার্ভ কাস্ট, তাইলে সেডাই চাইলব্যার ধইরত রিজার্ভ কাস্ট। আমরা নিজেরাই তো আমাগ কত পরিচয় দেই।
এদ্বার গুছিয়ে বলতে পারে না। পারে হয়তো, কিন্তু চায় না হয়তো। বিশেষ করে যে-কথাগুলো সে জানে বোঝে কিন্তু তার শ্রোতাদের মনে করিয়ে দিতে তাকে বলতে হচ্ছে, সেই বাধ্যতাটা হয়তো তাকে বিরক্ত করে। অথচ সে-সব না বলে তার বলার কথাতে আসা যায় না। তাই তার কথাগুলোতে একটু অন্যমনস্কতা থাকে, একটু তাড়াও থাকে। বলতে-বলতেই হয়তো তার নিজেরই মনে হয়—এত প্যাঁচাল পাড়ি ক্যা, বেবাকই তো জানে। এই সব মিলিয়ে তার কথাগুলো জট পাকিয়ে যায়, অনেক কথা শেষ হয় না, অনেক কথার সঙ্গে অনেক কথাগুলিয়েও যায়। এদ্বার সে-সব গ্রাহ্য করে না।
‘সে সব দিয়্যা তো সিভিল কোর্টে মামলা হবে না। সিডিউলকাস্ট স্বাধীন জাইত—এডা কি আমাগ নেতারা কোনোদিন শিখাইছে? অনগ্রসর আর অহিন্দু তো এক কথা না। তাইলে এডা তো ভোটাভুটিতে ঠিক হওয়ার না যে আমরা হিন্দু কি হিন্দু না। আমরা হিন্দু ব্রাহ্মণা যে-সব বিধিবিধান আমাগ নিয়্যা আছে, অস্পৃশ্যতা এই সব, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া এই সব, পূজা-আর্চায় ঢোকাঢুকি এই সব থিক্যা মুক্তি চাই। সেইখানে অ্যাহন এমন একডা কথা ক্যান উঠে শিডিউল-লিগ ঐক্য। নাজিমুদ্দিন শাহেবরে প্রধান মন্ত্রী খাড়া কইরব্যার লগে আমাগ ২১ জন এম.এল.এ হাত তুললেন। তহন থিক্যাই এই আওয়াজডা। তাগ হাত তারা তুইলছেন তোলেন। কিন্তু লোকজন তো তাগ-আমাগ মিল্যাইয়্যাই এক কইরা দ্যাহে। সুরাবর্দি শাহেবের মন্ত্রিসভা নিয়্যাও তো লিগ-তপশিল রটব্যার ধইরছে। এইডা তো নিরাপদ ঠেকে না। ছিল্যাম নিচুতলার মানুষ। তাও হিন্দু। অ্যাহন তো দেহি, উঁচু তলায় উঠার সিঁড়িড়া মশজিদে গিয়্যা ঠেকে। হিন্দু থাকা যায় না। এই কথাডা সাফ কইরব্যার দরকার। তপশিলির ধর্মত হিন্দু। এমন কোনো কাজ শোভন হয় না যে তাই নিয়্যা নিজেগ মন্দ হয়। এই কথাডা জানাইয়্যা দেয়া কাম—সিডিউলরা হিন্দু।’
এদ্বার থেমে যায়। তাকে পাশের বেঞ্চে জায়গা করে দেয় সবাই ঠেসেঠুসে। বিরাট মণ্ডল বলে ওঠেন, ‘এদ্বারের বক্তৃতার এডা মজা। কহন যে শ্যাষ বুঝা যায় না। কিন্তু আমি যেটা বুইঝল্যাম না, সেইডা একডু বোঝার লাগে। আমারে কে বাধা দিছে নিজেরে হিন্দু কইতে? আগ বাড়াইয়্যা নিজেগ হিন্দু প্রমাণের লগে নাম-সংকীর্তনের দল বাইর কইরব্যার লাগব না কী? এইডা যদি এবার বুঝায়, বুঝাক। আর-কেউ যদি বলে, বলুক। কিন্তু আমি হিন্দু কী হিন্দু না, এডা কী খবরের কাগজ ঠিক কইরা দিবে? এইডা তো আমার মাথায় ঢুকতেছে না। খবরের কাগজ বিধান-দেয়ার পুরুত হইল কবে থিক্যা?’
সভার ভিতর থেকে কেউ বলে ওঠে, ‘আগে তো কখনো এই কথা ওঠে নাই। এখন ওঠে কেন?’
‘সেটা কি এই সভা ঠিক কইরব্যার পারে? আগে যারা কইত না তা গ জিগাব্যার লাগে—আগে তো কহনো এমন ডাকে ডাকেন নাই, লিগ-তপশিল। ক্যান ডাকেন নাই? আর ডাকেন যহন নাই, তাইলে অ্যাহন ডাকেন ক্যা?’
অগ্নি মণ্ডল দাঁড়িয়ে বলেন, ‘জ্যাঠা, আমারে এডডু অনুমতি দ্যান।’
বিরাট মণ্ডল বলে ওঠেন, ‘তোমার তো কারো অনুমতি দরকার হয় না, অগ্নিদেব। এই দ্যাহেন—আমারে সেদিন আমার পরিবার জিগ্যাইল, আপনারে সবাই জ্যাঠা কয় ক্যা?’
সভায় একটা হাসি তৈরি হল।
বিরাট মণ্ডল হাসিটা শেষ হতে দিলেন। তারপর বললেন, ‘সেডার জব আমি দেই ক্যামনে? যারা ডাকে তাগ জিগ্যাও। অ্যাহন আমারে যদি কেউ জিগ্যায়—দুনিয়ার সব স্বামী-স্ত্রী যদি তুমি-তুমি কইর্যা কথা কয় তাইলে তুমি আমাকে আপনে কও ক্যামনে—সে-কথার জবাব আমি দেই ক্যামনে?’
বিরাট মণ্ডলের স্ত্রী উঠে দাঁড়ান ও বিরাট মণ্ডল ছাড়া পুরো সভাটার ওপর চোখ বোলান। সবাই চুপ করে যায়, এ-রকম ঘটনা সাধারণ ঘটনার মধ্যে পড়ে না। উনি বলেন, ‘মাননীয় সভাপতি মশায় আমার একটি কথা বললেন না। তাঁকে সবাই ‘জ্যাঠা’ বলায় আমি আপত্তি করার কে? কিন্তু সেই সুবাদে আমাকে কেন সকলের জেঠিমা হতে হবে? এমন কী তাঁদেরও, যাঁদের আমি কন্যাতুল্যা।’ হাততালি দিয়ে সবাই হৈ হৈ করে উঠল। অগ্নি মণ্ডল দাঁড়িয়েই ছিলেন। তাঁকে ডাকলেন সভাপতি।
‘তোমার বক্তৃতা তো শোনার যেমন, দেখারও তেমন। তুমি যেইহানে আছো হান থিক্যাই বলো, তাইলে বেবাক মানুষের চক্ষুকর্ণ তৃপ্ত হবে নে।’
‘কথাটা কিন্তু শুধু ডাকাডাকির না। আইনসভার গত ভোটে প্রার্থী হইয়্যা আমি এই প্রশ্নডাই সব থিক্যা বেশি শুনছি—আপনারা লিগের সঙ্গে গেলেন ক্যা? আপনাদের কারো কারো কাজের ফলেই তো কথাটা লোকের মনে ঢুইকছে? তার দায় আমরা ক্যান বহন করব?’
যোগেন তার আসন থেকেই জিজ্ঞাসা করে, ‘যারা জিগ্যাইল, তারা কি হিন্দু না মুসলমান?’
‘আমারে আর মুসলমান ভোটার জিগাইব ক্যামনে? তারা আমার ভোটার—তপশিলি। তারা আমারে গোঁড়া হিন্দু বইল্যা জানে কারণেই আমারে জিগাইল। আমি কথাটাকে রাস্তায় খাড়া করি। তপশিলিরা লিগের প্রতি সমর্থনের কারণে এবারের ভোটে খুবই বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হইছে। এটার প্রতিকার না হইলে অদূর ভবিষ্যতে বিপদ আরো বাড়িবে। এখনই গৃহস্থের সাবধান হওয়ার সময়।’
কেউ একজন পেছন থেকে বলে, ‘এ-সব হাওয়ার কথা দিয়ে তো নিষ্পত্তি হবে না। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সোজাসুজি বলুন।’
‘এর আগেও নাজিমুদ্দিন কি মন্ত্রিসভা করতে পারতেন যদি আমাদের ২১ জন তাঁহাকে সমর্থন না দিতেন? যারা মন্ত্রী হয়েছিলেন, তাঁদেরই-বা মন্ত্রী হওয়ার অনুমতি দিলেন কে? ‘সে তো তাঁরা বুঝবেন আর তাঁদের পার্টি বুঝবে। আমরা কী করে তাদের অনুমতি দেব। সিডিউল্ড কাস্ট তো শুধু বাংলায় নয়, সারা ভারতে আছে। যাঁরা কংগ্রেস থেকে বা মহাসভা থেকে প্রার্থী হয়েছে, তারাও কি এই সভা থেকে অনুমতি নিয়েছে?’
‘এর আগে তো অল ইনডিয়া সিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশনের নামে কখনো কোনো প্রার্থী দেয়া হয় নি। এবার দেয়া হয়েছে ছ-সাতজন। একজন মাত্র জিতেছেন। এঁরা কারা? এঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী?’
‘এটা তো মহারাষ্ট্রের দলিত নেতা ডঃ ভীমরাও আম্বেদকারের পার্টি। ডঃ আম্বেদকর তো ঘোর হিন্দুবিরোধী। আমরা যদি তাঁর পার্টির পক্ষ থেকে দাঁড়াই তা হলে আমাদের সম্পর্ক আরো মারাত্মক কথা উঠবে। ডঃ আম্বেদকরকে বহুদিন ধরে ব্রিটিশের গুপ্তচর ভাবা হয়। শেষ গোলটেবিলে তিনি জিন্নাকে সমর্থন করেছেন। তাঁকে রক্ষার দায় আমরা নিলাম কবে? কখন? কেন? আমাদের কে দেখে তার ঠিক নেই। আমরা আবার শঙ্করাকে ডাকছি?’
পেছন থেকে কেউ গলা তুলে বলে, ‘এত সব কথা ওঠে কোত্থেকে? এর আগে কোনোদিন কোনো সরকার কি তপশিলিদের কথামত হয়েছে? নাজিমুদ্দিনের আগে?’
আরো একজন বলে ওঠে, ‘তপশিলিরা তো প্রেসার গ্রুপ হিশেবেও আইনসভায় কোনো পাত্তা করতে পারে নি। যোগেন মণ্ডলের সময়ে তপশিলিদের প্রেসার গ্রুপ তৈরি হল। ইট ওয়াজ এ মাস্টারস স্ট্রোক।’
কারা এই সব তর্ক-বিতর্ক করছে দেখতে, সভাপতিকে ঘিরে পুরনো নেতারা যাঁরা ছিলেন তাঁরা, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছিলেন। কেউ-কেউ দাঁড়িয়ে ঘুরে দেখছিলেন। খুব একটা চিনতে পারলেন না। সব নতুন ছেলে, দুটি মেয়েও আছে। এরা কবে ১৫-নম্বরের লোক হল? কথা ও পাল্টা-কথায় এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হল যে কারো কারো সন্দেহ হল—তপশিলিদের মিটিং আগেকার দিনে যেমন মারামারিতে গিয়ে শেষ হত এখানেও তাই ঘটছে। একবার তো দুই পক্ষের লড়াইতে যোগেনের দল সভাপতির চেয়ার নিয়ে সভাত্যাগ করে পাশে কার বারান্দায় চেয়ার পেতে সভা করে প্রস্তাব পাশ করেছিল। সুভাষ বোসের সময়।
বিরাট মণ্ডল দাঁড়িয়ে চোখ কুঁচকে একটু তাকিয়ে বুঝতে চাইলেন—মিটিংটা ভাঙবে না চলবে। তার পর সেই গোলমালের দিকে তাকিয়ে খুব জোরে ধমকে উঠলেন, ‘সা-ই-লে-ন্স’। এত জোরে যে ধমক উঠতে পারে কেউ সেটা কারো জানা ছিল না। ভড়কে গিয়ে সবাই একেবারে চুপ করে গেল। ঐ ফাঁকটুকুতেই বিরাট মণ্ডল বলে উঠলেন, ‘আমি এই সভার সভাপতি। সবাই চুপ কইর্যা নিজেদের জায়গায় না বসলে আমি মিটিং বন্ধ কইর্যা দিব। নো সেকেন্ড চান্স। যাঁরা পূর্ববর্তী বক্তার কথায় আপত্তি করছেন, তাঁদের কাউকে আমি এখানে আইস্যা তাঁর কথা জানাইব্যার আহ্বান করি।’
একটি বিশ-বাইশের যুবক পেছন থেকে সভাপতির দিকে এগিয়ে আসে—মাঝখানের ফাঁকগুলি লাফিয়ে পার হয়ে।
সে বিরাট মণ্ডলের পাশ থেকে বলে উঠল, ‘আমরা আপনাদের একটা কথা বিবেচনা করতে অনুরোধ করছি। তপশিলি আন্দোলনকে একটা কাস্টিস্ট-রেসিস্ট আন্দোলনে আটকে রাখবেন না। আমরা যারা এই আন্দোলনের সীমান্ত থেকে বাইরে, তারা কিন্তু এই আন্দোলনে যোগ দিতে চাই। এর আগে কখনো এমন সুযোগ আসে নি যে মনুসংহিতার বামুন-পণ্ডিতরা আর আন্তর্জাদিক ক্যাপিটালিজম আপোশ করে তপশিলিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ক্যাপিট্যালিস্টরা মুসলমানদের ওপর আর নির্ভর করতে পারছে না। জিন্না সম্পর্কে তাঁরা আশ্বস্ত নন। তাই এখন তাঁরা চাইছেন—তপশিলিদের ওপর ভরসা করতে। এমন হতে পারে যে ডক্টর আম্বেদকর এই ডিলে যথেষ্ট এগিয়ে যাবেন। তাঁর বিরোধিতা করা ভুল হবে। মারাত্মক ভুল হবে। আপনারা তো নিজেরাই নেতাগিরি করেন। আর নিজেরা নিজেদের ছাড়া কাউকে দেখতেই পান না। আপনারা শুধু হিশেব কষেন এই চার জেলায়—ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর—কত নমশূদ্র এই সব গোনাগনতিতে কিছ হবে না। ওয়ার্ল্ড পার্সপেকটিভ দরকার। তা যদি না পান তা হলে অন্তত ন্যাশন্যাল পার্সপেকটিভ তৈরি করুন ও তাতে ডক্টর আম্বেদকারকে আপনাদের দরকার। যদি কোনো ভাবে মুসলিম লিগ ও সিডিউল্ড কাস্টের মধ্যে একটা বোঝাপড়া সম্ভব হয়, তা হলে ভারতের রাজনীতি বদলে যাবে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’
ছেলেটি শুধু তাঁর বক্তব্য বলার দাপটে এই কথাগুলি শুনতে বাধ্য করে মিটিংটাকে মিটিঙে ফিরিয়ে আনল।
পি আর ঠাকুর সভাপতিকে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই বলতে শুরু করেন, ‘এই যুবকটিই সবচেয়ে পরিষ্কার করে দিল, আজকের এই মিটিং কেন আমরা ডাকতে বাধ্য হয়েছি। ইতিমধ্যেই লিগ-তপশিলি-আম্বেদকার ঐক্য দেশের রাজনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে! ও এই যুবকের মত আরো অনেক যুবককে আলোড়িত করছে, যে এটা বোধহয় একটা আরো বড় ও সম্ভাবনাপূর্ণ শক্তি তৈরি করতে পারে। আমরা এটাকে ভুল মনে করি। সেই আলোড়নকে আমরা তপশিলি আন্দোলনের সহায়ক মনে করি না। সহায়ক তো নয়ই, বরং উল্টো। আমাদের পক্ষে সর্বনাশা। মিস্টার জিন্নার পাকিস্তান প্রস্তাব পাঁচ-ছ বছরের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠেছে—’ যোগেন হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে পি-আর-কে জিজ্ঞাসা করে, ‘কোন দেশ? কার বিপদ? পি-আর একটু হকচকিয়ে যায়। বলে ফেলে, ‘অ্যাঁ?’
‘আপনে কোন দেশের বিপদের কথা বলতে চান?
‘আমাদের আন্দোলন কখনো আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের বাইরে যায় নি।’
‘তাইলে গান্ধী-আন্দোলনে যোগ দিতে না করছিলেন কেন গুরু গুরুচান্দ?’
‘তখন তো লিগ শক্তিশালী ছিল না। তখন তো পাকিস্তান ছিল না। লিগ-তপশিলি-আম্বেদকর যুক্ত ছিল না। আমাদের এত শত্রু ছিল না।
পি-আর তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি ফিরে পায়। খুব ঠাট্টা করে বলে উঠতে পারে—’আপনার আর আমাদের দেশের মধ্যে তফাৎ কি এত বড় হয়ে গেছে যে আপনি দেশ চিনতে পারছেন না। এখন আমাদের জাতীয় মূলধারা—হিন্দু-মসলমান-তপশিলি জাতীয় ঐক্য বদলে আর-এক ঐতিহ্য বানালেন ও আমাদের সেইটা মানতে বাধ্য করছেন।’
‘ও-সব কথা রাখেন। ঐ বাসি পচা সব হিন্দু ছলনা দিয়া একডা দ্যাশ বানাইয়া একডা ধর্ম বানাইয়া মুসলমানগ একটা শত্রু খাড়া কইর্যা শুদ্দুরগ সর্বনাশ আর কইরবেন না। মিস্টার জিন্না-র পাকিস্তান যদি আপনার দ্যাশের বিপদ হয়, তাইলে মিস্টার গান্ধীর হরিজনও আমার দ্যাশের পক্ষে আরো বড় বিপদ।’
‘সেটা আপনার মত হতে পারে। সেটা যে তপশিল জাতির মত নয় সেটাও তো জানানো দরকার, পি-আর চেষ্টা করেন গলা তুলতে।
‘হ্যাঁ জানান। আপনাগ মতডাও যে তপশিলি জাতির মত না, সেডাও তো জানাবার লাগব। সে তো পনের নম্বরের মিটিঙের প্রস্তাব কইর্যা হব না। ৩৭ থিক্যা এই ৪৬ নয়-দশ বছর জুইড়া পায়ের তলায় চামড়ায় ফোস্কা ফ্যালাইয়্যা ছাওয়াল-পাওয়ালগ লাইগ্যা দুইডা একডা হস্টেল আর তাগ বাবাগ লাইগ্যা নিম্নপ্রকারের চাকরির সামান্য শতাংশ রিজার্ভ কইরতে মাত্র পারা গিছে। আপনেও আমাগ লগে ছিলেন। অস্বীকার যাব না। আপনার নেতৃত্বের মূল্য আমাগ ভিতরে সর্বাধিক। কিন্তু এত কইর্যাও সেও তো কাগজের আইন। আমি আপনারে কই—কোথাও কুনো হিন্দু উচ্চবর্ণের কেউ থাইকলে মেথরের কাজও দিবে না শুদ্দুরগ। তার বদলে পচ্চিমামেথর আনব। সেইডা দ্যাশের বিপদ না?’
পি-আর বলেন, ‘আপনি রাজনীতিতে এই জট পাকিয়ে দিয়েছেন। তপশিলিদের অ্যান্টি হিন্দু পরিচয়কে প্রধান করেছেন।’
‘লুকায়্যা করি নাই। কইছি, শুদ্দুরের পাশের আইলের মানুষড়াই শুদ্দুরের সব থিক্যা নিকট বন্ধু। আপনার বামুনদের কন, জমি হালাইতে—’
‘আপনি নিজেই তো দাঙ্গায় প্ররোচনা ও নেতৃত্ব দিলেন গোপালগঞ্জে। হিন্দুদের মহাসম্মিলন করতেও দেন নি।’
‘অ্যাহন কি তপশিলগ সম্মিলন কইর্যা হিন্দুধর্ম জয় জয়, আমাগ শুদ্দুর রাইখছে জয় জয়, কীর্তন গাইব্যার লাইগব! যা কইছি লুকায়্যা কই নাই। কইছি, আমাগ তো মনু বানাইছে চাঁড়াল। মনুসংহিতায় রায়ট নাই। তাইলে, রায়ট লাইগলে বামুনগ বাঁচাইবার লগে মুসলমানগ লগে রায়ট বান্ধাটাও শূদ্রের কাজ না। এত রায়টে একডাও বামুন তো মরে না। শুদ্দুরের প্রাণের কুনো দাম নাই?’
‘আমাদের একটা সেন্স অব কমিউনিটি না থাকলে থাকবেটা কী আমাদের?’
‘সমান। স্বাধীনতা। আপনার ঠাকুরদা যা শিখাইছিলেন। শূদ্র মুসলমান/পাশের আইলের সম্মান। সেন্স অব অনার।’
সারা ভারতে কংগ্রেস, হিন্দুসভা, সেবাশ্রম ইত্যাদি মিলে মুসলমানদের কিছু বলতে বাকি রাখে নি। হিন্দুদের মধ্যে লেখাপড়া বেশি। তাঁদের পক্ষে শাস্ত্র আর ইতিহাস বানিয়ে মুসলমানদের নরকের কীট প্রমাণ করা ছিল সহজ। জিন্নার নেতৃত্বে মুসলিম রাজনীতির প্রচারে হিন্দুদের নিন্দা করার চাইতে বেশি করা হত মুসলমান হওয়ার গৌরব ও হিন্দু-কংগ্রেসের জাতিদ্বেষ। জিন্নার ছিল জাতিগঠনের কর্মসূচি। কংগ্রেস-সহ হিন্দুদের ছিল জাতির আত্মরক্ষার কর্মসূচি।
