১৭০. লৌকিক কিছু প্রতিকার
যোগেন যেন একটা মিছিল দেখছিল, কাল ফাঁকা লম্বা রাস্তায়, রাস্তার দুদিকের গড়ান বেয়ে মিছিলটার তৈরি হয়ে ওঠাও যেন দেখছে। এমন দেখা যায়—ধু ধু জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে। লোকে বলে তরাস খাইছে।
এ মিছিলের আলাদা লোকজন যোগেনের চেনাই শুধু নয়, যোগেনের গাঁয়ের, নদীপারের, হাটের, আলের, খালের। যোগেনের গাঁয়ের, পাড়ার, ঘরের। যোগেনের সাহসই নেই এই মিছিলের মুখগুলি যাচাইয়ের। কে জানে সে তার যোগামা বা তার বৌয়ের মুখটা দেখে ফেলবে কী না। না দেখার তো কোনো কারণ নেই। তারা তো উচ্ছেদ হয়ে গেছে। তাদের বাড়িঘরগুলো তো এতদিনে ধুলো হয়ে গেছে। তাদের জমির দাঁড়ানো ধান তো ছাই করে আকাশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের গোলার চাল তো প্রকিওরমেন্ট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের নৌকোগুলো তো জলে ভাসা থেকে জলে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বিএ, বিএল, এমএলএ, এখন তো আবার পরন্তু মন্ত্রী কি তাদের বাঁচাতে পারত না? পারত, পারত। কোনো মন্ত্রী বা মেম্বারের কেউ কি আর দুর্ভিক্ষে মারা গেছে? তাহলে যোগেনের মা-কাকিরা- খুড়া-ভাইয়ের ব্যাটারা কেন মারা যাবে? তাদের ধান-চাল নেই, তাই। তাদের ধান-চাল-কেনার টাকা নেই তাই। এখন নৌকো গড়ার ও ভাসাবার দিন না, এখন নৌকো ডোবাবার দিন। বাড়িতে ধান-চাল নেই, ধান-চাল কেনার পয়সাও নেই, হাঁটাচলার নৌকো নেই, তোমার গ্রাম হয়ে গেছে বেকবুল, তাহলে তাদের আর বাঁচা কেন?
যোগেন তরাস খেয়েছে।
লঙ্গরখানা যে খুলতেই হবে সেটা যোগেন বোঝাতে পারল সিভিল সাপ্লাই মিনিস্টার সারওয়ারদিকে। সারওয়ারদি সত্যি সত্যি রাতদিন খাটছে। খাটতে পারে সারওয়ারদি। আলসে নয়। বুদ্ধি ও কৌশলও যথেষ্ট। সারওয়ারদিকে ভেড়াতে না পারলে লাটশাহেবকে রাজি করানো যেত না। হার্বার্টের সমস্ত বাহাদুরি তো কলকাতা ও শিল্পাঞ্চলে যুদ্ধ-সংক্রান্ত উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সমস্ত শ্রমিকের রেশন নিশ্চিত করা। সেনসারের ফলে খাদ্যাভাব সংক্রান্ত খবর কাগজে বেরচ্ছে না—বেরচ্ছে দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির খবর। মফস্বল বাংলার খবর ব্ল্যাক-আউট হার্বার্টকে সুযোগ দিয়েছে—কলকাতা ও শিল্পাঞ্চলের খাদ্যব্যবস্থা বহাল রাখতে। এখন যদি কলকাতার রাস্তাতেই দুর্ভিক্ষ উঠে আসে, তা হলে আর থাকল কী? বড়লাটকে বেশ রাগত স্বরেই হার্বার্ট তাঁর রিপোর্টে জানিয়েছেন—’কলকাতার পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে যদি সপ্তাহ দু-তিনের মধ্যে চাল-আটা না আসে ও সেগুলো যথাযথ বিলি করা না হয়।’ ছোটলাট এও লিখে ফেলেছিলেন, ‘বাংলাকে খাদ্যশস্যে উদ্বৃত্ত ধরে নিয়ে ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে এক দানা সাহায্যও পাওয়া যাচ্ছে না। গভর্নররা রাজি, কমিশনাররা রাজি কিন্তু স্থানীয় অফিসাররা রাজি নয়।’ এও স্বীকার করে ফেলেছেন, ‘মফস্বলে অনাহার বেড়ে যাচ্ছে। একটা বড় মুশকিল বাধছে যে হাজার-হাজার ভিখারি বিনি পয়সায় ট্রেনে উঠে, খাবার পাওয়া যেতে পারে এমন জায়গা খুঁজছে। এতে মহামারী লাগতেই পারে, তার চাইতেও বেশি, যুদ্ধের নিরাপত্তা ধ্বংস হতে পারে। চিটাগঙের মতো ফৌজ-সমাবেশের জায়গায় ভিখিরিরা বেশি করে আসছে। ওখানকার এরিয়া কম্যান্ডার রেলওয়েকে ধমকাচ্ছেন টিকিট ছাড়া প্যাসেঞ্জার বহনের অপরাধে।’
সারওয়ারদি যোগেনকে সঙ্গে নিয়ে হার্বার্টের কাছে যান ও হার্বার্টকে ভজান যে ভিখিরিদের কলকাতার ফুটপাতে মরতে না দিতে হলে, তাদের তো মরার একটা জায়গা করে দিতে হবে-কলকাতার বাইরে। সেখানে তারা যাবে কেন? যাবে, যদি লঙ্গরখানা খোলা যায়। একহাতা লপসি ২৪ ঘণ্টায় একবার পেলে ওরা চাঙা হয়ে উঠবে। কয়েকদিনের মধ্যেই কিছু লোককে হয়তো গ্রামে ফেরত পাঠানো যাবে।
হার্বার্ট শাহেবের কী একটা অপারেশন হবে, ওঁর শরীরটা ভাল ছিল না, ছুটিতে যাওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। যোগেন একটু আপত্তি জানায়, ‘এরা কিন্তু ভিখিরি নয়, এরা কৃষিকাজ করে।’
লাটশাহেব সারওয়ারদিকে বললেন, ‘আপনার যদি সাপ্লাই থাকে—তাহলে করুন। পিনেলকে স্পেশ্যাল অফিসার রিলিফ করে একটা অর্ডার বেরবে। তা হলে কাজটা হতে পারে।’
পিনেল শাহেব হচ্ছেন সরকারের ফায়ার ব্রিগেড। যেখানে ঝামেলা, সেখানেই পিনেল। নানান ছোটখাটো ঘটনা তো যুদ্ধের সময় ঘটতেই পারে। স্থানীয় ভাবেই মিটে যায়। এমন কী সদর পর্যন্তও যায় না। কিন্তু ফেনির একটা ঘটনা বেশ গোলমেলে হয়ে উঠল। আইনসভায় স্থানীয় মেম্বার কথাটা তুলল। সে খুব ভাল বক্তা না কিন্তু ওই গ্রামে তার ছেলের বিয়ে হয়েছে। মিলিটারিরা বাড়ির মেয়েদের অপমান করছে। এতে তাঁর পারিবারিক সম্মানে চোট লেগেছে। তার ওপর মুসলমানদের গ্রাম। এমন একটা হৈ হৈ বেধে গেল যে মন্ত্রিসভার পাশ কাটানোর কোনো উপায় থাকল না। এই সব ঝামেলায় হকশাহেবের প্রত্যুৎপন্নতা খুব কাজে আসে। উনি হাউসকে বললেন, এ-বিষয়ে সরকার, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, হাইকোর্টের কোনো বিচারপতিকে দিয়ে বিচারবিভাগীয় তদন্ত করাবে ও সেই তদন্তের পর সিদ্ধান্ত মেবে। হকশাহেব এর সঙ্গেই যোগ করে দেন, বিষয়টি মিলিটারি-ঘটিত ও যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত। এর আগে ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তাঁর পদত্যাগ সংক্রান্ত ভাষণে কাঁথির সাইক্লোন আক্রান্ত মানুষজনের সঙ্গে ফৌজের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ এই ঘটনা নিয়ে আইনসভায় আলাপ-আলোচনা করবেন না ও কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সভা-সমিতিতে এ নিয়ে কিছু বলবেন না।
হকশাহেবের অনুরোধ সকলেই মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনায় এত গিঁঠ পড়ল যে ভাইসরয় জানতে চাইলেন বাংলার গভর্নর হার্বার্ট-এর কাছ থেকে—ঘটনাটি কী?
হার্বার্ট-এর সঙ্গে হকশাহেবের সম্বন্ধ বিড়াল-ইঁদুরের মত। হার্বার্ট সব সময়ই বিড়াল হতে চান কিন্তু কোনো বারই হকশাহেবের গায়ে থাবা বসাতে পারেন না। তিনি হকশাহেবকে ডেকে বলেন, ভারত রক্ষা আইনে যখন দেশশাসন চলছে, তখন, মিলিটারি ও যুদ্ধ প্রস্তুতি সংক্রান্ত কোনো তদন্ত করার অধিকার প্রাদেশিক সরকারের থাকে না—এটা হকশাহেবের জানা নেই, এটা ছোটলাট মানতে পারছেন না। আইনসভায় হকশাহেব ওই তদন্ত কমিশনের সুপারিশ তুলে নেবেন—এটাই ছোটলাটের নির্দেশ।
ছোটলাট-হকশাহেবের এই দেখাশোনা নিয়ে নানারকম গল্প রটেছে।
হকশাহেব তাঁর অত বড় মুখে শিশুর মতো হাঁ করে লাটশাহেবকে জিজ্ঞাসা করেন—উনি তো মনে করতে পারছেন না এমন কোনো তদন্তের কথা তিনি ঘোষণা করেছেন।
ছোটলাট বিরক্ত হয়ে বলেন, আপনার স্মৃতিশক্তির দশা তো খুব ভাল নয়। আমি ফেনির ঘটনার কথা বলছি।
হকশাহেবের উত্তর তাঁর মুখের ভাষাতে অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘কন কী স্যার। নারীপুরুষের মিলনরে অবিশ্যি রমণযুদ্ধ কওয়া হয় সংস্কৃতে, কিন্তু সেডা তো অলঙ্কারমাত্র। ওই এনকোয়ারি কমিশন তো ওই গ্রামের একাধিক মহিলার অভিযোগ বিচারের লগে। অভিযোগ—তাগ মইধ্যে কাউকে-কাউকে ধর্ষণ করা হইছে। কমিশন তো সেডাই দ্যাখব। এর মইধ্যে আপনে মিছামিছি মিলিটারি ঢুকান ক্যান? এ অভিযোগে তো মিলিটারির নামগন্ধও নাই। আমার স্মৃতিশক্তি স্যার বয়সের ভারে দুর্বল হইবারই পারে, কিন্তু আপনার বয়সের তুলনায়, আপনার শ্রবণশক্তির অবস্থা তো খুব সুবিধার দেখি না।’
ছোটলাটকে হজম করতে হল। ভাইসরয় তাঁকে ছাড়লেন না। অগত্যা, হার্বার্ট-শাহেবকে যুদ্ধপ্রস্তুতির কাজে সিভিল-মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল তৈরি করতে হল। পিনেল-শাহেব ঘুরেফিরে দেখে পরামর্শ দিলেন, ফৌজিরা কোনো গ্রাম-বসতে যাওয়ার সময় সঙ্গে একজন স্থানীয় ভাষা বলতে পারে এমন লোককে সঙ্গে নেবে। আর, ‘সিভিল’ বলতে যেন শুধুই ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’কে বোঝায় না। তৃতীয় সুপারিশটা করার আগেই হকশাহেবের বরখাস্ত, লাটশাহেবের শাসন ও কলকাতার রাস্তায় না-খাওয়া মানুষের মরে পড়ে থাকার দৃশ্য রোজকার হয়ে যায়।
দুর্ভিক্ষ কলকাতার রাস্তায় চলে আসায় হার্বার্ট একেবারে অপ্রস্তুত। কলকাতায় যাতে দুর্ভিক্ষ না এসে পড়ে তার জন্য ব্রিটিশ সরকার, ভাইসরয়ের সরকার ও ছোটলাটদের প্রদেশ সরকার—চারদিকে চৌকি বসিয়েছিল।
তার ওপর কলকাতা তো যুদ্ধের ফ্রন্ট। যুদ্ধে যে কী দরকার হয় না, সেটা বুঝতে-বুঝতেই ছোটবড় সব কারখানার মালিকদের বছরখানেক লাগল। তার মধ্যে যুদ্ধ আর কদিন হল? ব্রিটিশ বাহিনী, ব্রিটিশ ভারতীয় বাহিনী, নানা জাতের রেজিমেন্ট, নানা রকমের রাইফেলস, নানা রকমের উপবাহিনী—সব মিলে তো সমুদ্র টমুদ্র পেরিয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে পশ্চাদপসরণের এপিক তৈরিতে ব্যস্ত।
এখনো পর্যন্ত পালটা কোনো নথি পাওয়া যায়নি যাতে আন্দাজ করা যায় যে ব্রিটেনের কোনো হিশেব বা আমেরিকার কোনো ধারণা ছিল যে ভারত মহাসাগরে জাপান যুদ্ধ টেনে আনলে ব্রিটেন ও আমেরিকা কী করবে। জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণে আমেরিকা যে হাঁ হয়ে গিয়েছিল, সেই হাঁ বন্ধ হতে আরো বছর খানেক লেগেছিল।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাসে ঘটনাচক্রে বাংলা হয়ে উঠল পূর্ব রণাঙ্গণ আর কলকাতা হয়ে উঠল এমন উলটো যুদ্ধের প্রধান বা একমাত্র–লক্ষ, উপলক্ষ, যুদ্ধের জন্য দৈনিক সাপ্লাই লাইন পুরোপুরি খুলে রাখার ও সাপ্লাই অব্যাহত রাখার প্রধান জায়গা, আবার, একই সঙ্গে, বা তার ফলেই, কলকাতা থেকে অপ্রয়োজনীয় লোকজনকে সরিয়ে দেয়া হয়ে উঠল, সামরিক নির্দেশে ভাইসরয়ের ইনডিয়ার প্রধান কর্মসূচি।
যুদ্ধের এমন একটা হিশেবে এমন গড়মিল হলে, বইপত্র ঘেঁটে সাতকেলেনে বিধি-বিধান খুঁজে ব্যবহার করা হয় ও সেই বিধানগুলির ভিতর এমন গোলমাল বাঁধে যে যুদ্ধটা বিপর্যস্ত হয়ে যায়। জাপান যুদ্ধে নামার ফলে ব্রিটিশ পক্ষের তেমনই নাজেহাল দশা ঘটে যাচ্ছিল। কেন তেমনটা পুরো ঘটল না, বা ঘটতে-ঘটতেও ঘটল না—সেটার কারণ আলাদা। কিন্তু যুদ্ধের একেবারে উলটোপালটা সব ব্যবস্থা একটু খতিয়ে দেখা এই নভেলের সঙ্গে জড়ানো। সেগুলিকে সাজিয়ে নিলে এ-রকম একটা অব্যবস্থা দেখা যাবে।
১. সিঙ্গাপুর, মালয়, ব্রহ্মদেশ, পূর্ব-ভারতীয় দ্বীপগুলিতে ব্রিটিশ পক্ষ হেরে যাওয়ায় তারা জাপান-সম্পর্কিত নতুন ধারণা অর্জন করে মিলিয়ে ফেলল–পরবর্তী লক্ষ নিশ্চয়ই কলকাতা। জাপান কলকাতায় দুটো-একটা ‘নুইসেন্স’ (ছোটলাট হার্বার্টের ভাষায়) বোমা ফেলে কলকাতা–আক্রমণের আন্দাজটাকে গরম রাখল। কলকাতা-রক্ষা মানে–কলকাতা থেকে অপ্রয়োজনীয় লোক সরাও। ছোটলাট রোজ রাতে হাওড়া-শিয়ালদা-র চিফ টিকিট ইনস্পেক্টারের কাছ থেকে হিশেব নিতে লাগলেন, কোন ট্রেনে কত লোক কলকাতা ছাড়ল। আর, ভাইসরয়কে চিঠি লিখতে লাগলেন—অন্ধবধির বিদ্যালয়, অনাথ আশ্রমগুলি ও বৃদ্ধাবাসগুলি বিধি-মোতাবেক সরানো হবে কী না?
২. ‘কলকাতাকে রক্ষা করো’র সঙ্গে-সঙ্গেই সমুদ্র থেকে তিরিশ মাইলের ভিতর পর্যন্ত বসবাসী সমস্ত মানব-বসতির চিহ্ন লোপাট করো, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও, ক্ষেতের দাঁড়ানো ধান জ্বালিয়ে দাও (ডিন্যায়াল পলিসি)। কোন তিরিশমাইল। মিলিটারি ম্যাপ পাঠিয়ে দিল। সেই ম্যাপ দেখে ছোটলাট বড়লাটকে লিখলেন—মিলিটারির তিরিশ মাইলে কোনো প্ৰমাণ নেই যে তারা জায়গাটা চেনে, যেখান দিয়ে ইচ্ছে, সেখান দিয়ে লাইন টেনে দিয়েছে। ফলে, জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত, সব নৌকো পোড়ানো হয়ে গেছে। তাই ছোটলাট একটু রদবদল করে দিয়েছেন। কিন্তু সরিয়ে দিলে লোকজনের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কী হবে?’
৩. ছোটলাট নিজেই তার উত্তরে নিজেকে হুকুম দিলেন, ‘ক্ষতিপূরণ’ দাও, বাড়িপিছু, নৌকা পিছু। নগদে। যুদ্ধের ফলে নগদ টাকার যে এমন হরির লুট পড়বে, কেউ ভেবেছে কোনোদিন? বড় হোক, মেজ হোক, ছোট হোক—কোনো লাট-বেলাটের ক্ষমতা আছে ঘর-পোড়ানো আর নৌকো-পোড়ানোর ক্ষতিপূরণ পাবে, কে সে-জট খোলার? বাড়ি বা নৌকো তৈরি হয়েছে যে-জমিতে বা যে-জমির গাছ কেটে, সেটার মালিক তো জমিদার। ‘বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্ট’ তো এখন কোথায় কী অবস্থায় তা জানা ও খোঁজা কারো পক্ষে সম্ভবই নয়। তা হলে, ক্ষতিপূরণ তো জমিদার পাবে। কিন্তু যে-সব অঞ্চলে তহশিলদার বা চুকানিদার হিশেবে বড় জোতদার নিজেই রায়ত, তাহলে, সে যেমন জমিদারের তশিল-বরাবর সম্পত্তির হকদার, তেমনি নৌকারও হকদার। ক্ষতিপূরণ পাবে দখলি রায়ত। কিন্তু যদিও এ-কথা ঠিক যে ঋণসালিশি বোর্ডে বসে সালিশির জোরে মহাজনী ঋণ ফয়সালা হয়েছে বেশ কিছু, তাতে তো মহাজন নিজেই নিজের টাকার ধারদার হয় না। দখলি রায়তের দখলি চাষীকে মহাজন টাকা না দিলে সে নৌকো বানানোর খরচ পেত কোথায়? তা হলে মহাজনও এক হকদার।
এক নৌকোর যদি এমন পাঁচ মালিক দেখা দেয় তা হলে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে কাকে? ছোটলাট হুকুম দিলেন, যে-কজন দাবিদার তাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করে ক্ষতিপূরণের টাকা তাদের মধ্যে ভাগ করে দাও। মানে, এসে গেল, সিভিল আইন। সিভিল আইন বিচার করতে পারে সাবডেপুটি, কমপক্ষে। তা ছাড়া নগদ টাকা ভাগ করার জন্যও সাবডেপুটি চাই।
সাব-ডেপুটি এসে গেলে তো বাবুরাও আসবেন। বাবুরা এসে পড়লে কাজে কর্মে একটা শৃঙ্খলা তৈরি হয়ে যায়। যেমন, ঠিক হয়ে গেল, এক ছিপ-নৌকোর ক্ষতিপূরণে বাবুদের পাওনা ১৬-আনায় দেড় পয়সা। এতে মাঝিদের কোনো আপত্তি ছিল না। এত কাগজ লিখতে হয়। বাবুদের খাটনি হয় না? একটা চারমানুষি ডিঙা, ছই ছাড়া, যদি কাঠের হয়, তা হলে ৩০০ টাকা ক্ষতিপূরণে বাবুরা ১০ টাকা না নিলে ধর্ম থাকে? এটাই তো রাজাপ্রজার সম্পর্ক। সম্পর্ক ভাল থাকলে বাবুরা লেখার সময় তালডোঙাকেও কাঠের ডোঙা বানিয়ে দেন। যাতে দুইজন মাঝি পাশাপাশি বসে ডাইনে-বাঁয়ে হাতবৈঠ্যা চালায়, তাকে বাবুরা চারজনার ডিঙি করে দেন। নমশূদ্র আর মুসলমানদের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় বদনামি জায়গায় বাড়ি-পোড়ানো আর নৌকো-পোড়ানোর মতো ঘটনায় কোনো হাওয়া গরম হল না।
ভালো-লাগার রহস্য একটু ছিল বই কী। বাবুদের সঙ্গে শাহেবদের আগেই বোঝাপড়া থাকত যে মালিকদের নৌকোর সংখ্যা সাব্যস্ত হত বাবুদের কথায়। কারো হয়তো পাঁচটি নৌকোর জায়গায় লেখা হল ১০টি নৌকো। বাকি পাঁচটি থেকে বাবুর শাহেবও ভাগ পান। দু-এক জায়গায় মুসলমান মাতবররা নালিশ তৈরি করছিল যে ডেপুটি শাহেব হিন্দু বলে মুসলমানদের নিগ্রহ করছেন কিন্তু আরো বড় মাতবররা এসে তাদের নিবৃত্ত করেছে। সে সবই হল কিন্তু তাতে মোট নৌকার সংখ্যা যা দাঁড়ায়, বাংলার জনসংখ্যার চাইতে নৌকোর সংখ্যা অনেক বেশি হল। আর নৌকায় কত লোক উঠত, তার হিশেব নিলে হয়তো বেরবে বাংলায় জনসংখ্যার চাইতে নৌকাবাহিত জনসংখ্যা আরো বেশি। কিন্তু এগুলো তো আর প্রাদেশিক সরকারের নিয়ম-অনুযায়ী সরকারি অডিট হয়নি। সবই যুদ্ধকালীন খরচ হিশেবে ধরা হয়েছে।
৪. যুদ্ধে যে এত টাকা তৈরি হয় সেটা বাংলার বা বিশেষ করে কলকাতার ও গঙ্গাপারের জিলাগুলির মগজে ঢুকতে একটু সময় লেগেছে আর আজও এটার নিষ্পত্তি হয়নি যে ভারত মহাসাগর থেকে ব্রিটিশ বাহিনীর পশ্চাদপসরণ না ঘটলে বাংলার এই টাকা-বিস্ফোরণ ঘটত কী না। যুদ্ধে কী লাগে আর কী লাগে না। কর্কের তৈরি বোতলের ছিপি। নানা সাইজের সেলাই না-করা হেসিয়ান, পাতলা বুনটের। পাটের বস্তা—সেলাই-করা ও মোটা বুনটের। নানা ধরণের স্পিরিট। সার্জিক্যাল টেপ—মাইল-মাইল। কাল রঙের কাচ নানা সাইজের। বাঁশ—কোটি-কোটি মণ, জাহাজ-জাহাজ। কাঠের নল। পাউডার মানে গুঁড়ো, যে-কিছরই হোক। ড্রাম—টিনের, সেখানে শ-দুই মানুষকে সেদ্ধ করা যায়। ফিলামেন্ট। তার। মণ মণ, জাহাজ-জাহাজ। কয়্যার, নারকেলের দড়ি, অন্তত দশ প্লাইয়ের। অত নারকেলের দড়ি বাংলায় তৈরি হয় না, অর্ডার চলে গেল ত্রিবাঙ্কুর-কোচিনে। নানা রকম মোটা মার্কিন কাপড়, কোঁড়া গজ ফিতে—কয়েক জাহাজ। ফুটবল বা সাইকেলের পামপার। ছোট-ছোট চাকতি—রবারের।
বেশ গোলমাল বাঁধত কোন জিনিসটা কী কাজে লাগবে সে-বিষয়ে কিছুই বলা থাকত না বলে। তার ছবি তো নয়ই, কারণও নয়। সেটা যুদ্ধের গোপনতা ভাঙা হবে। কিন্তু যে-জিনিশ চাওয়া হত, তার সমস্ত মাপ থাকত পরিষ্কার। এমন কী হোমিয়োপ্যাথি ওষুধের শিশির কাচের বেধ পর্যন্ত। যদিও দু-চারটে কারখানা পাওয়া গেল কিন্তু তাদের কাছে কাচের বেধ মাপার যন্ত্র ছিল না।
এর ফলে মিলিটারি সাপ্লাইয়ে খুব গুলবাজ ও চালিয়াৎ কিছু লোক গজিয়ে উঠেছিল ধীরে-ধীরে। তাদের ভাবসাব এমন হয়ে গেল, যেন কয়েক পুরুষ ধরে যুদ্ধই করছে। একজন হয়তো জিগগেস করল, ‘ভাই, এই উইথ-হোল আর উইদাউট-হোল ব্যাপারটা তো আন্দাজ করতে পারছি না।’ উত্তর পেল—’বাংলাতেই তো লিখেছে, দেখে নাও। তুমিও যাকে বলো, শাহেবও তাকেই বলে’। যার দরকার সে হয়তো কিছুক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আপনি যা বলছেন তার বানান কি ডবলিউ দিয়ে?’
‘আরে ওটা উল্টে দিলে তো ডবলিউয়ের মতই দেখায়।’
কিন্তু এই ধরণের স্মার্ট ফিচলেমিই নয়, কোনো-কোনো অজ্ঞানতা বড় রকমের কেলেংকারিও ঘটাচ্ছিল। অর্ডার ছিল নাকী গ্লাভস। গ্লাভস বলতে সাপ্লায়ার তো জানে এক বক্সিং গ্লাভস আর না-হয় তো ফুটবলের গোলকিপারের গ্লাভস। আসলে না কী চাওয়া হয়েছিল সার্জিক্যাল গ্লাভস। তেমন বিশিষ্ট কোনো গ্লাভস কারো জানা ছিল না। কোথাও কোনো সন্দেহও ছিল। মাস তিন-চার পর ইনভেনটরি থেকে চিঠি এল—এক জাহাজ গ্লাভস পাঠানো হয়েছে, এমন কিছু যদি ইনডেন্ট করা থাকে, তাহলে তার ফটো কপি যেন এক্ষুনি পাঠানো হয়। ‘ফটো কপি’ কাকে বলে তাও কলকাতায় জানা ছিল না। তবু ‘ফটো’-কথাটি থেকে কিছু আন্দাজ করা যায়। এই ঘটনাটা খুব রটেছিল। মিটল কী করে তা নিয়ে নানা গুজব আছে। তার মধ্যে একটি গুজব ছিল। এই বিভ্রাটের ফলেই নাকী ইস্টার্ন কম্যান্ডে বিশেষজ্ঞ-সাপ্লাইয়ের আলাদা এজেন্সি খোলা হয়। আর-একটা গুজব হচ্ছে—জিওসি ইস্টার্ন কম্যান্ড নাকী অ্যাকশন অর্ডার দিয়েছিলেন, গ্লাভসের জাহাজ ফেরৎ না পাঠাতে। বলেছিলেন, স্টকে রাখতে বা ডিসপোজ করে দিতে। কলকাতার সাপ্লায়াররা যুদ্ধের এই অভাবিতপূর্ব সংকটে তাঁদের প্রোডাকশন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও মার্কেটিঙের যুদ্ধকালীন কোনো অভিজ্ঞতা না-থাকা সত্ত্বেও সাপ্লাই-লাইন খোলা রাখতে ও যুদ্ধের জন্য দরকারি সমস্ত বিচিত্ৰ মাল সরবরাহ করতে যে অব্যর্থ চমৎকারিতা দেখিয়েছেন, তাতে, এত বড় একটা সাপ্লাই রিফিউজ করলে তাঁদের মনোবল ভেঙে যাবে ও যুদ্ধে তার প্রতিক্রিয়া পড়বে। যে-গ্লাভস পাঠানো হয়, মিলিটারি অ্যাকাউন্টস যেন আগের সাপ্লাইয়ের সঙ্গে নতুন সাপ্লাইয়ের দাম বোঝাপড়া করে নেন।
এতে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় ১৯৩৯-এর যুদ্ধ ঘোষণার পূর্বমুহূর্তে পূর্ব রণাঙ্গনে কলকাতার ভূমিকা নিয়ে কোনো রকম সামরিক চিন্তাই ছিল না। গঙ্গার দুই পারের ফরেস্টের মতো ঘন-সন্নিবিষ্ট নানা ধরণের কারখানা চালু রাখা ও তাদের সবচেয়ে কম দামে খাদ্য-সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কাজ।
কলকাতার বাইবের বাংলা ছিল শুধুই রেঙ্গুন-উদ্বাস্তুদের ক্যাম্প, আহত ভারতীয় জোয়ানদের চিকিৎসার জায়গা ও ধীরে-ধীরে নিম্ন বাংলার চারটি জিলাকে বেকবুল করে দেয়া, গ্রাম তুলে দেয়া, নৌকো পুড়িয়ে দেয়া ও চাল প্রকিওর করে কলকাতায় নিয়ে আসা। হার্বার্টের মত ছোটলাটের পক্ষে এ নিয়ে দুর্ভাবনারও কোনো ক্ষমতা ছিল না যে নৌকো আর বাড়িঘরের ক্ষতিপূরণের টাকা আর সরকারের কাছে একটু বেশি দরে চালবিক্রির টাকায় ফূর্তি, পরের আউশ পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া সম্ভবই নয়।
হার্বার্ট তখন কলকাতা ও দার্জিলিং থেকে বড়লাট লর্ড লিনলিথগকে প্রতি পনের দিনে একটা করে গোপন ও প্রাইভেট রিপোর্ট পাঠাতেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ১৯৪০-এর ১৭ জানুয়ারি মজা করে জানিয়েছিলেন যে বম্বেতে কম-মাইনের সরকারি কর্মচারীদের ওয়ার-টাইম অ্যালাওয়েন্সের খবর পড়ে তাঁর পিলে চমকে গেছে, এখানেও তো তাহলে সেই দাবি উঠবে—সর্বভারতীয় একটা নীতি করলে হয় না?
