১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৫৪. ঢাকায় সেনসাসের দাঙ্গা

১৫৪. ঢাকায় সেনসাসের দাঙ্গা 

মার্চ (৪১) থেকেই খবর আসছিল লোকের মুখে-মুখে যে ঢাকার এক-এক জায়গায় দাঙ্গা বাঁধছে। কাগজ পড়ে তো বোঝার উপায় নেই। হিন্দু কাগজ পড়লে মনে হয়, কোথাও-ই কোনো হিন্দুকে আর বেঁচে থাকতে দিচ্ছে না মুসলমানরা। আর মুসলিম কাগজ পড়লে মনে হয় হিন্দুরা মুসলমান মেরেই বাংলায় সংখ্যাগুরু হবে। 

ঢাকা শহর যোগেনের চেনা, বরিশালের মতই। ওই যারা ঢাকা থেকে আসছে তাদের কাছ থেকে শুনে-শুনে আর হিন্দু-মুসলমান কাগজ পড়ে-পড়ে যোগেন একটা ধারণা করে নিয়েছিল—চকবাজার আর দক্ষিণ মৈসুন্দি এলাকায় তো দাঙ্গা লেগেই থাকে, নবাবপুর রোড আর জনসন রোডের মধ্যে পুব-পশ্চিমের রাস্তা ও অলিগলিতে হিন্দু-মুসলিম দুই জাতেরই বাস। সেই পাড়াগুলিতেই দাঙ্গাহাঙ্গামা হচ্ছে। ওই জায়গাগুলিকে বলা যায় দাঙ্গাএলাকা, যেমন শহরের কোনো-কোনো জায়গায় বলে ভাসাএলাকা। এমন দিন কমই কাটে যেদিন ২৪ ঘণ্টায় একটাও মারামারি হয়নি। যে-কোনো মারামারিই তো এখন দাঙ্গা হয়ে যায়। আর, দাঙ্গা মানেই হিন্দু-মুসলমান। 

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা থেকে মঞ্জু মাস্টার এসে ১৫ নম্বরে একেবারে ম্যাপ এঁকে বোঝাল, নারানগঞ্জের রায়পুর-শিবপুর-নরসিংদিতে হিন্দুদের দোকানপাট লুট হচ্ছে। রায়পুর থানার আদিয়াবাজবাজার থেকেই লুটপাট শুরু। দাঙ্গা আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের দিকে। 

মঞ্জু মাস্টারের কাছেই প্রথম শোনা গেল যে এ-দাঙ্গা সেনসাস-ঘটিত। ১৯৪২ সালে আইনসভার ভোট। সে ভোটারলিস্ট তৈরি হবে এই ৪১-এর লোকগণনা দিয়ে। সংরক্ষিত আসনও ধার্য হবে কোন জাতের লোক কোথায় কত বেশি সেই পার্থক্য দেখে। সব জাতের লোকই চায় নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে। কংগ্রেস তো বরাবরই বলে আসছে ৩১-এর লোকগনতিতে সাম্প্রদায়িক অনুপাতের ইচ্ছাকৃত গণ্ডগোলের ফলেই হিন্দু প্রার্থীরা এত বেশি হেরেছে। এবার তারা ছেড়ে কথা বলবে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক জনসভায় ও পাড়ায় পাড়ায় সভায় বক্তৃতা করেছেন—হিন্দুরা তো মিথ্যে কথা রটিয়ে চেঁচাচ্ছে যে তাদের জনসংখ্যা বেশি। উকিল, ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার, প্রফেসর, ব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণ আর হিন্দুদের কোটি-কোটি জাতের আরো কোটি-কোটি সব ভাগাভাগির মানুষজন সবাই মিলে মিথ্যা রটাচ্ছে যে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি। সারাজীবন শিক্ষকতা করে যে-লোক ছাত্রছাত্রীদের মানুষ করেছেন সেই লোক জালিয়াতি, মিথ্যাসাক্ষী, নকলপ্রমাণ নিয়ে একটা ডরপোকের মত মুসলমানদের সংখ্যা কমাতে চাইছে। অতীতেও বাংলায় এমন অসৎকর্ম করে হিন্দুরা জিতেছে। এবারও যদি জেতে আর তাদের জেতার কারণ হিশেবে যদি এই লোকগণনার জালি হিশেব পেশ করা হয়, তাহলে আমি নিশ্চিত পাকিস্তানের পক্ষে। তখন আমার বন্ধুরা দেখবেন, আমি জিতি না হারি। 

মঞ্জু মাস্টার হকশাহেবের নকল করে বসে-বসেই বক্তৃতাটি বলল। কংগ্রেস থেকে সঙ্গে-সঙ্গে পালটা প্রচার শুরু হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী সেনসাসের কাজে বাধা দিয়ে আইন অমান্য করেছেন। 

আসল কারণটা হচ্ছে—৩৫ সালের আইনেই ভোটে মুসলমানরা প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে। হিন্দুরা তাও কোনোরকমে সামলেছিল—রাজনীতিতে বা আইনসভায় যাই হোক, নিজেদের গ্রামে বা শহরে তো হিন্দু ভদ্রলোকদের কদর কিছু কমছে না। কিন্তু লিগ সরকার যখন আইন করে সরকারি চাকরিতে মুসলিম আর তপশিলিদের সংখ্যা বাড়াতে শুরু করল, তখন, জেলা ও মহকুমার হিন্দুরা ভয় পেল। হিন্দুদের খবরের কাগজ আর হিন্দু নেতারা, রটাতে লাগল, হিন্দু-অফিসারদের বদলি করা হচ্ছে আর মুসলমান ছাড়া কোনো নতুন অফিসার হচ্ছে না। সেই নতুন অফিসাররা আবার ভাবছে—তাদের এই নতুন চাকরি দেয়াই হচ্ছে হিন্দুদের শায়েস্তা করতে। তারা যদি বে-আইনি কাজও করে, তাতে কোনো শাস্তি হবে না। আইনের মতলব নিয়ে সরকারের মতলব নিয়ে, হিন্দু আর মুসলমানদের মতলব নিয়ে গোলমালের আর শেষ, নেই। এসডিও বা ডিএম শাহেব হল তার সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত। 

যোগেন একটু হেসে, মাথাটা একটু নিচু করে বলে ওঠে, মনে-মনে কথা-বলার স্বরে—’সত্যি, কত জন্ম কাটাইলাম কিন্তু এই বামুন-বইদ্য-কায়েতের বদবুদ্ধির কোনো কূল পাইল্যাম না। আইন না-হয় পাশ হইছে ওই তপশিলি-কোটার। কোথাও তাগ চাকরি দ্যায়? মুসলমানগ চাকরি দ্যায়? একডা ইস্কুল মাস্টারির হকদার মুসলমানকে, কমিটির রায়বাহাদুররা ঠেকাব্যার আর-কোনো উপায় না পাইয়া কয়—চাকরি তো দেয়াই যায় তবে হস্টেল তো দেয়া যায় না, হস্টেল তো হিন্দু হস্টেল! খুলনায় হইছে। জানি বইল্যা কইল্যাম। আর নমশূদ্রগ কোটা? সেডা তো কইব্যারও লজ্জা করে। এদিকে কয়, শূদ্ররা তো হিন্দু। হিন্দুই যদি হইব, তাইলে তোর জাতভাই লাগে তো। তার একডা চাকরি হইলে তো একডা হিন্দুরই চাকরি হইল। না। তার বেলায় শূদ্ররা হিন্দু না। কব কী? কওয়ার ভাষা নাই।’ 

‘যোগেন, একটু থাম বাবা। তোর এই অশোকবনে সীতা তো রোজই শুইনতে হয়। মঞ্জুর কাছে আর-এডডু শুইনব্যার দে। ও তো দাঙ্গার খবর নিয়্যা আইসছে। ওর কী দরকার, জিগ্যা, ব্যাবস্থা কর, কও মঞ্জু, তার পর?’ 

‘আমাগ বড় নেতা কারো যাওয়া দরকার। অ্যাহন যা অবস্থা তাতে মুসলমানরাও আমাগ হিন্দু বইল্যা গ্রাম থিক্যা তাড়ায়্যা দিচ্ছে। একেবারে মিলিটারির মত দল পাকাইয়া আসে, হাতে লিস্টি, তারপর বাড়ির মালিককে বলে, গ্রাম ছাইড়া চইল্যা যাও। চইল্যা গেলে আমরা বাড়িডা পুড়াব, যাতে ফিরৎ আইসতে না পারো। শুমারিতে তো নিজেরে হিন্দু কইবেন। সে হয়তো কইল, হিন্দুবাবুরা তো আমারে হিন্দু মানে না, তাইলে আমি হিন্দু হইল্যাম কার লগে। অমনি দঙ্গল থিক্যা কেউ ড্যাগার নিয়্যা আগাইয়া আসে; ‘পুরা হিন্দু না বইল্যাই এহনো প্যাট ফাঁসাই নাই। এইবার ফাঁসাইব।’ 

‘আক্রোশডা আমাগ দিকে আইল কি প্রথম থিক্যাই?’ জিগগেস করলেন অমূল্য রায়।

‘অত হিশাবপত্তর কি করা হইছে? লিগের নেতারা, মন্ত্রীরা গিয়্যা মিটিং কইরা কইছে, মুসলমান ছাড়া কুনো জাতের নাম লিখানো চইলবে না। ভৈরব বাজারের মিটিঙে নাজিমুদ্দিন-সারওয়ারদি জোড়ায় আইস্যা কইল, যেহানে মুসলমান বেশি, সেহানে তো পাকিস্তানই হব। হিন্দুরা তাগ জায়গা বাইছ্যা নিক। আবার শ্যামাপ্রসাদ মিটিং কইরল দাঙ্গাবাঁধার মাসটেক আগে। সভায় কয়, ভারতে না থাইক্যা যদি মিয়াগ পাকিস্তানে হাউস হইয়্যা যাহে, তো যাউক না সব বাক্সপ্যাঁটরা বাইন্ধ্যা যেহানে হয় সেখানে। বেবাক তো কয় শ্যামাপ্রসাদই দাঙ্গা বাধাইছে। কথা তো মিথ্যা না। ১১ই মাঘ ছিল শ্যামাপ্রসাদের ভাষণ আর দোল পইড়ল গিয়্যা ১৪ই ফাল্গুন। সেদিনই তো শুরু।’ 

‘তুমি আইল্যা ক্যা? না? তোমারে পাঠাইল?’ যোগেন জিগগেস করে। 

‘ঐ রকম আগুন আর খুনের মইধ্যে পালাইবার সুযোগ থাইকলে কেউ ছাইড়ে? ধরা ন্যান, আমিই আমারে পাঠাইছি আবার উহানকার মানুষ, মানে জাতের মানুষরাও পাঠাইছে, কইছে, অ্যাহন তত্ত্বের কাইজ্যা লাইগছে, অ্যাহন আমাগ বুদ্ধিতে কুলাইব না। কইলকাতায় যাও, যোগেন মণ্ডলরে ল্যাও। না তো যাও শ্রীধাম খেজুরতলা, সেহান থিক্যা পাগলচাদরে নিয়্যা আইসো। অ্যাহন আপনারা কেউ না গেলে আমরা বিপদে—আমরা হিন্দু কি মুসলমান সেইডা কেডা সাব্যস্ত কইরবে?’ 

‘মঞ্জু, তোমরা কি আন্দাজ পাইছ, আমাগ সমাজের কেউ মারা গিছে, মইরলে কয় জন, মরছে?’ রসিকলাল জিজ্ঞাসা করেন। 

একটু ভেবে মঞ্জু মাস্টার বলে, ‘এ হিশাবড়া আমার কওয়া ঠিক না। কোনোডাই তো কেউ মাপামাপি করে নাই। যে যা শুনে তাই কয়। কেউই নিজের জাইতের মরা কিছু কম দেহে না। তবে, মফস্বলেরডা কইব্যার পারি। সেহানে আমাগ জাইতের উপর বামুন-কায়েত গুলার ভরসা। আবার মফস্বলে আমাগ জাইতের উপর মুসলমানগ রাগ বেশি—তারা আমাগ তাড়াইবারই চায়। সেইডা ঠেকানোর খ্যামতা আমাগ উপর নাই। আপনাগ যাব্যার লাইগব।’ 

‘মিটিং কি ডাকা আছে না এহান থিক্যা গিয়্যা ডাইকব্যা’? যোগেন বলে মঞ্জুকে।

‘পারেন বটে। কার সঙ্গে কার বিয়্যা তার পার্টিপত্তর না জাইন্যা কন্যাদানের শুভক্ষণ ঠিক করব? চলেন আপনারা, দেহেন, তারপর ঠিক করেন।’ 

.

পরদিন সকালেই ঢাকা মেলে মঞ্জু, রসিকলাল ও যোগেন রওনা হয়। আগের সন্ধ্যায় কথা হচ্ছিল পি. আর আর যোগেন দুজনে আসবে। কিন্তু কলকাতায় তো একজনকে থাকতে হয়, নাহলে মন্ত্রীদের ঘরে ছোটাছুটি কে করবে? তখন রসিকলালই সমাধান দেন, মণ্ডলরে একা পাঠান ঠিক না, অর উপর হিন্দুগ রাগ দিনে-দিনে বাইড়ব্যার ধইরছে। আর, তোমাগ একজনের তো এহানে অবস্থান লাগে। তোমাগ আপত্ত না থাইকলে আমি মণ্ডলের লগে যাই।’ 

মঞ্জু মাস্টার তার এক আত্মীয়-বাড়িতে যেতে চাওয়ায় রসিকলাল বলেন, ‘এহন আর কুটুম্বিতায় কাম নাই, তুমি বরং আমার ওহানেই রাইতটা কাটাও। মণ্ডল সকালে আইস্যা ডাক পাড়লেই দুইজনে আইস্যা ট্রেনে উঠব।’ 

গোয়ালন্দে পৌঁছুতে দুপুর দেড়টা হয়ে গেল। গোয়ালন্দের ঘাট দেখে রসিকলাল বলেন, ‘তোরা পাটনায় গেছিস কেউ?’ যোগেন-মঞ্জু দুজনের কেউই যায়নি। ‘পাটনায় আমারে অগ একডা বিখ্যাত দালান দেইখবার নিয়্যা গেল, গিয়্যা দেহি একডা গোলবাড়ি, গুদামের নাগাল। পরে শুনল্যাম, সত্যিই গুদাম। আমি কইল্যাম, আরে আমি তো বাংলা থিক্যা আইছি, আমারে দালান দেখাইব্যার আনছ মাঠে? আর আমি তহন থিক্যা ভাইবতেছি, ভগবান বুদ্ধের থান, সম্রাট অশোকের রাজধানী, তাইলে বোধহয় বৌদ্ধ চৈত্য বা স্তূপমুপ কিছু একডা হইব। পাটনায় এমন একডা স্তূপগোছের আছে, তা জানি না বইল্যা লজ্জাও হইছে একডু।’ 

‘তার সঙ্গে গোয়ালন্দের মিল পাইলেন কোথায়। গোল, চ্যাপটা, চাইল, বেঁকা-সিধা কোনো একডা দালানও তো নাই।’ 

‘এইডা ভাল একটা বচন কইছিস যোগেন। বাঙালরে হাইকোর্ট দেখাও–না কইয়্যা অ্যাহন থিক্যা এডাও কওয়া চলে, গোয়ালন্দে গোলঘর দেখাও?’ রসিকলাল হাঁটতে-হাঁটতেই হাসেন। যোগেনও হাসে। 

মঞ্জু হঠাৎ বলে, ‘কী কইর‍্যা কবেন? যারে কবেন স্যায় যদি গোয়ালন্দ আর গোলঘর কিছুই না জানে?’ 

যোগেন খুব একচোট হেসে বলে, ‘মঞ্জুর বুদ্ধি বেশ পাইক্যা উইঠছে না কাহা?’ 

‘হ্যাঁ। এডডু-আধডু গন্ধ যা পাই, তাতে পছন্দ দেয় নাই—কাঁঠাল কী না। বামুনগ গুঁতা খাইয়্যা না মিয়াগ গুঁতা খাইয়া অকালে এমন পাকলি রে মঞ্জু?’ 

‘মঞ্জু, তুমি কইলকাতার হাইকোর্ট দেখছ নি?’ 

‘দেহি নাই, তবে শুনছি যে আছে।’ 

‘তাইলে বাঙালরে হাইকোর্ট দেখান বচনডা বোঝো?’ 

‘বুঝব না ক্যা? বাঙালডা চিনি তো!’ 

‘সেডা অবিশ্যি ঠিক। ঢাকার পোলা আর বাঙাল না চিন্যা থাহে কী প্রকারে?’ 

‘কাহা, মঞ্জু তো বচনরেও ছাড়ায়্যা গেল! 

‘ক্যা? অর কথায় ভুলডা কোথায়? ও বাঙাল। হাইকোর্টও দ্যাখে নাই। ন্যায্য সাক্ষী।’

‘সাক্ষী তো ন্যায্য। উত্তরডা শুনেন নাই? কইল হাইকোর্ট দ্যাখে নাই কিন্তু শুইনছে। মঞ্জু, হাইকোর্টরে শুনা যায় কী প্রকারে, মঞ্জু।’ 

‘যোগেনদাদা, তোমার নাগাল নামডাকের উকিল সাক্ষী শুইনতে এমন ভুল কইরল্যা? তুমি জিগাইল্যা, দেখছ। আমি কইছি, শুনছি, দেহি নাই। বচনডার মইধ্যে তো এই কথাডাও লুকান্ আছে-আমারে হাইকোর্ট দেখায়ো না।’ 

যোগেন আর রসিকলাল দু-জনেই খুব বাহবার হাসি হাসে। 

‘কিন্তু তোরা আমারে কইতে দিলি না যে গোয়ালন্দে আইস্যা ক্যান পাটনার গোলঘরের কথা মনে উদয় হইল? 

‘আপনে যদি না কন, আমরা ক্যামনে কওয়াব?’ যোগেন বলে। 

‘শোন্। তোরা ভুইল্যা গেলেও আমি তো জেলখাটা কংগ্রেস। তহন সি. আর. দাশের মৃত্যুহীন প্রাণের মরা সাঙ্গ। সুভাষ জেলে। সেনগুপ্ত শাহেবই নেতা। আমি কর্পোরেশন স্কুলের মাস্টার। হঠাৎ একদিন আমার স্কুলে এক শাহেব আইস্যা হাজির। শাহেব তো কখনো কোনো সৎকর্মে আইসতে পারে না। তাই প্রবেশমাত্র সারা স্কুল তটস্থ। করবটা কী? শাহেব আইস্যা, আমারে হাত বাড়াইয়া দিল। আমি হাত বাড়াইল্যাম না। সেও গুটাইয়্যা নিয়্যা জিগাইল, আমি কি মিস্টার রসিকলাল বিশ্বাসের সঙ্গে কথা কওয়ার সৌভাগ্যে আছি?’ 

মঞ্জু বলে, ‘মানে বোঝার মত কইর‍্যাই কইল? শাহেবরা তো তেমন কয়না।’ 

‘আরে, আমি স্কটিশ চার্চের ছাত্র। আমারে শাহেব দেখাস না। ইংরাজগ চিটাগঙিও আমার কাছে নস্যি। শাহেবরে বইসতে বইল্যা আমি কইল্যাম, তোমার কী কামে আমি লাইগব্যার পারি, বাপ!’ শাহেব তহন তার পকেট থিক্যা এডডা খাম বাইর কইরে আমারে দেয়। আমি দেহি, কর্পোরেশনের খাম। উপরে আমারই নাম লেখা। ছিঁড়া দেহি, সেনগুপ্তের চিঠি, সেডাও ইংরাজিতে, আমারে লিখছেন—এই ছেলেটির বাবা বিলাতে আমার নিকট বন্ধু ছিলেন। আমাকে তাদের বাড়িতেও কিছুদিন থাকতে হয়েছিল। এ এখন গবেষণার কাজ করছে—হল্যান্ডের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক নিয়ে। আপনে যদি এরে সাহায্য কইরতে পারেন, আমি বিশেষ বাধিত হব। চিঠি পইড়্যা আমার চক্ষু তো চড়কগাছ। কিন্তু নমশূদ্র হওয়ার এইডাই তো সুবিদা। আত্মরক্ষার। উচ্চবর্ণের সম্মুখে চক্ষু চড়কগাছের মত কপালে উঠব্যার চাইলেও উঠব্যার দিবা না। শুধু মা বসুমতীর কন্যা সীতারে স্মরণ কইর‍্যা মাটির দিকে তাকাইয়্যা থাকবা। শাহেব যদিও বামুন না, তবু প্রভু তো বটেই। কিন্তু মা সীতারে স্মরণ কইর‍্যাও আমি তো কিনারা পাই না–সেনগুপ্ত, হল্যান্ড ও আমার মধ্যে কোনো সম্বন্ধ পাই না। নিষ্ক্রমণের কোনো বুদ্ধিও মাথায় খেলে না। স্কুলের ছেলেরা ও অন্য মাস্টারমশায়রা দরজা ও জানলায় পাক দিয়ে যাচ্ছেন আমার শাহেব-মোলাকাত দেইখতে। শেষে চোখ তুইল্যা কইয়্যা ফেললাম, আপনে কি প্রশ্নপত্র বানাইছেন? সে সঙ্গে-সঙ্গে খাড়াইয়্যা তার গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগ খুইল্যা একডা চিড় বাইর কইরে দিল। আমি সেইডা হাতে নিয়া ভাঁজ কইরে পকেটে ফেলল্যাম একবারও না দেইখ্যা। কারণ, দেখা-না-দেখা আমার কাছে তখন একই কথা। আমি খাড়ায়্যা উইঠ্যা শাহেবরে কইল্যাম, আমার এখন ক্লাশ আছে, আপনে কাল আইসবেন।’ 

‘তার পরদিন কামাই দিলেন?’ যোগেন হেসে বলে। 

‘তোরে আবারও কই যোগা আমি, পুরানা গান্ধীবাদী কংগ্রেস। বিবেকড়া আমার কাছে সব থিক্যা বড়। শাহেব তো আমার সমস্যা না। কইলেই হইল কোথাও এডডা ভুল হইছে, আমি এডা নিয়্যা কিছু জানি না। আমার সমস্যা সেনগুপ্ত শাহেবরে নিয়্যা। বিকালে প্রদেশে গিয়্যা তারে ধইর‍্যা চিঠি দেখাইয়া কইল্যাম, আপনে কি আর-কারো সঙ্গে আমারে গুল্যাইয়া ফেলছেন? সেনগুপ্ত শাহেব বললেন, সে কী, আমাকে তো নেলি নিজের মুখে কইছে, রসিকলাল বাবু লোক্যাল হিস্ট্রি এত ভাল জানেন যা সচরাচর দেখা যায় না। আমি কইল্যাম, লোক্যাল হিস্ট্রি? সেনগুপ্ত বললেন, হ্যাঁ। আপনে নেলিকে চিটাগং সম্পর্কে কত কথা বলেছেন, আমার জন্মস্থান হওয়া সত্ত্বেও আমি যার অনেকটাই জানি না। স্যরি। আপনার কোনো অসুবিধে থাকলে ওকে কারো কাছে পাঠান যে জানে। আমার তহন মনে পইড়তে শুরু কইরছে, বছরখানেক কি বছর দুই আগে একডা মিটিঙের সুবাদে সেনগুপ্ত মশায়ের বাড়ি গেছিলাম। গিয়্যা দেখি আমি ছাড়া কেউ নাই। তাঁর স্ত্রী আমারে কইলেন, মিটিংডা দুই ঘণ্টা পিছাইছে। আমি কইল্যাম, আমি তাইলে ঘুইরা আসি। উনি কইলেন, আপনে তো মিটিং কইরব্যারই আসছিলেন, তাইলে অ্যাহন আর কোথায় ঘুরা বেড়াবেন? এই হানেই বসেন। বইসল্যাম। কী কথা কই? আমি জিগাইল্যাম, আপনে তো নিশ্চয়ই চট্টগ্রামের সব জায়গা দেইখছেন? এত সুন্দর জায়গা! উনি তখন বললেন, জানেন, চিটাগঙ আমাকে হোমসিক হইতে দ্যায় না, এতই আমাদের দ্যাশের মতন। তহন আমি কইল্যাম—জানেন তো পির বদরের গল্প। এই পির শাহেব রাজার কাছে এক চাটি জায়গা চান। চাটি বইলতে বুঝায়, একডামাত্র প্রদীপের আলোতে যতটুক্ আলো হয় তটুক্ জায়গা। রাজা মঞ্জুর কইরলে তিনি একড়া পাহাড়ের মাথায় ওই প্রদীপড়া বসান। তাতে যদ্দুর আলো হইল সেই জায়গার নাম হইল চাটিগাঁ। উনি কইলেন, আমি তো চেরাগি পাহাড়ে গিছি কিন্তু আমারে এই সুন্দর গল্পডা তো কেউ কয় নাই। তহন আমি কইল্যাম, আর-একডা সুন্দর গল্প আছে। আরাকানের বৌদ্ধ রাজা চট্টগ্রামের যুদ্ধে নবাবের হাত থিক্যা জায়গাডা জয় কইর‍্যা আরাকানি ভাষায় বইল্যা ওঠেন—চিৎ-তা-গঙ। তার মানে—যুদ্ধ করা অন্যায়। সেই থিক্যা ওই জায়গাডার ওই নাম হইল। চিটাগঙ। সেই আমার কাল হইল। বউয়ের মুখে এই গল্প শুইন্যা সেনগুপ্ত শাহেব আমারে লোক্যাল হিস্টরির স্পেশ্যালিস্ট ভাইব্যা শাহেব পাঠাইছেন।’

‘এত বড় একডা কথা বুনলেন, তার মইদ্যে তো গোলঘর বা গোয়ালন্দ কিছুই নাই। শাহেবের কী হইল?’ 

‘শাহেবের কাছে তো ঘাড় হেঁট করা যায় না। কয়দিন ইমপিরিয়্যাল লাইব্রেরিতে গিয়্যা বাইর কইরল্যাম আমাগ ভাষার মইধ্যে ওলন্দাজ শব্দ কী কী। হল্যান্ডকে তো তহন বাংলায় ওলন্দাজই কইত।’ 

‘কন কী কাহা? গোয়ালন্দ তাইলে আমাগ গোয়ালন্দ হোটেল না, এককেবারে ওলন্দাজ। সোজা কথা?’ যোগেন বলে। 

‘আমরা দুপুরের ভাত কনে খাব?’ মঞ্জু জিজ্ঞাসা করে। 

‘সেডা কি একটা জিগগাসার কথা। যেহানে খিদ্যা, সেহানে ভাত—’ যোগেন জবাব দেয়।

‘না—কইতেছিল্যাম, পাড়ের হোটেলে না জাহাজে? মঞ্জু জিজ্ঞাসা করে। 

‘তফাড়া কী? তোগো দ্যাশ, তোরাই ক— 

‘ক্যান? আপনার না ক্যান?’ মঞ্জু জানতে চায়। 

‘আরে, আমি তো পদ্মাপারের না। আমি তো যশুরা।’ 

‘মঞ্জু হঠাৎ স্টিমারে খাওয়ার কথা কইল ক্যান। ইস্টিমারে ফাউলকারির লগে?’ যোগেন মঞ্জুকেই জিজ্ঞাসা করে। 

‘ঠিক ধইরছ যোগেনদাদা। ঐডার সাধ আলাদা। খাইবা? এইডাই তো সুযোগ। কেডাই-বা দ্যাখতেছে?’ 

‘আরে ফাউল কারির ফাউল কি কারো বউ না কী? তারে বোরখা পরায়্যা নিয়্যা ভাগতেছি না কী। চ-ল্, ফাউলই খাব। কিন্তু মাছভাজা নিস একখান কইর‍্যা। খাওয়ার পর মাছের ঢেকুর না উইঠলে ক্যামন নিরামিষ খাইছি পছন্দ হয়।’ 

‘শোনো মঞ্জু, আমি যে কই, আমরা, শূদ্ররা, হিন্দু না। হিন্দু তো নাই-ই, এমন কি গুপ্ত হিন্দুও না। কেন? না, বামুনের সব থিক্যা বড় জোর কীসে?’ যোগেন প্রশ্ন করে আর রসিকলাল সঙ্গে-সঙ্গে বলে, ‘প্রাচিত্তির করানো’। 

‘কিন্তু নমশূদ্র হওয়ার সুবিধা যে আমাগ অভিশাপ দিলেও সেটা অফলা। ক্যা? না, আমাগ তো পতন নাই যে শাপ দিয়া পতিত্ কইরবে! আমরা তো পতিত্‌’!’ যোগেন ব্যাখ্যা দেয়। 

ওরা তিনজন আস্তে-আস্তেই হাঁটছিল। প্ল্যাটফর্ম শেষ হওয়ার পর রেললাইন আর লোহার বেড়ার মাঝখানে নানা মনোহারী জিনিশের মেলা। ঝোলানো আছে শাড়ি আর বোরখা। বোরখার তো আর কাল ছাড়া রং হয় না। একটা দোকানে ‘জাপানি কল, জাপানি কল’ বলে চেঁচাচ্ছে। খেলনা একটা—টিনের। ওপর দিয়ে দুটি শাদা ছোট বল ফেললে, সেটা আর-একটা মুখ দিয়ে তিনটে হয়ে বেরয়। 

এই দোকানগুলো শেষ হতেই প্যাসেঞ্জারদের লাইনের ওপর দিয়ে, উলটো দিকের লাইনও পার হতে হয়—তারপরই যে-আওয়াজটাকে এখন পর্যন্ত হাওয়ার বা নদীর মনে হচ্ছিল, সেটার মনুষ্যরূপ দেখা যায়। কিছু-কিছু টিনের সাইনবোর্ড একটু কেতরে ‘পবিত্র হিন্দু হোটেল’, ‘শুদ্ধ হিন্দু হোটেল,’ ‘হাজির হোটেল,’ ‘নারায়ণগঞ্জ হোটেল,’ ‘খাওয়ার শেষে মিষ্টান্নর ব্যবস্থা আছে,’ ‘শুধুমাত্র হিন্দু বিধবা ও ব্রাহ্মণদের ষোল আনা নিরামিষ ভোজনালয়—জাত ভাঁড়াইবার চেষ্টা করিবেন না,’ ‘সিলেট হোটেল’। সাইনবোর্ড ছাড়াও আছে অনেক হোটেল। দুটি-একটি মুসলমান হোটেলে হাই বেঞ্চ ও বসার বেঞ্চ আছে। অন্যসব হোটেলেই মাটিতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা। মাটিতে মাটি সর্বত্র আছে, এমন নয়। শুধুই বালি এমনও আছে। বালির মধ্যে বসে বালির ওপর কলাপাতা পেতে খেতে হয়। সেজন্য এই হোটেলগুলির দর প্রায় অর্ধেক। পদ্মার বিপুল ও তীব্র হাওয়া সত্ত্বেও ইলিশ মাছের গন্ধে ও মশলার ঝাঁঝে নাক জ্বালা করে। 

যত প্যাসেঞ্জার নামছে ও হাঁটছে, তাদের অন্তত দ্বিগুণ লোক একসঙ্গে চেঁচাচ্ছে নিজেদের হোটেলের নাম বলে। কোনো-কোনো অল্পবয়েসি আবার দোকান ছেড়ে ভিড় ঠেলে এসে কোনো যাত্রীকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। সেই আক্রমী খাদ্যভিড় ছাড়িয়ে ওরা তিনজন ফাউল কারি খাওয়ার লোভে স্টিমারে উঠছে। হোটেলগুলোতে, পাড়ে, যে-দামে খাওয়া যেত, স্টিমারের রেস্তোরান্টে দাম তার পাঁচ গুণ। তবু ফাউলকারি তো! সত্যিকারের ফাউলকারি। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *