১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৫৭. ঘটনা, রটনা ও গুজব

১৫৭. ঘটনা, রটনা ও গুজব 

বছরে রোজদিন তো গুজব-ছড়ানোর মত রটনা-ঘটনা থাকে না। কেউ ঢাকা ঘুরে এলে সেই গল্প দুই-চার হাট ধরে চলে। আর, কলকাতা ঘুরে এলে অন্তত দশ-বার হাট। বছর কয়েক হল—ভোটাভুটি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, নেতাগ আসা-যাওয়ায় একটু-আধটু খবরাখবর হচ্ছে। গান্ধী-জিন্নাও একটা খবর, বিশেষ করে, সিরাজগঞ্জে জিন্নাশাহেবের মিটিঙের পর। 

যুদ্ধ তো কখনো কেউ দেখেই নি। যুদ্ধ যেন নতুন জলের ব্যাঙ। ডাক আর থামে না। যুদ্ধের সময় যে-কোনো ঘটনা ঘটতে পারে, কোনো ঘটনা না ঘটলেও ঘটেছে বা ঘটেনি বলে রটনা হতে পারে, কোনো ঘটনা বা রটনার সঙ্গে বাঁধা না-হলেও গুজব ছড়ানো হতে পারে। আমাদের দেশের মত আড়েবহরে এমন ঐরাবতের মত দেশ আর ভালুকের লোমের মত গিজগিজে মানুষ যদি স্বাধীনতা চেয়ে রাস্তায় নামে—সে-ও যুদ্ধের মতই ব্যাপার। 

ঘটনা শোনার লোক তো সবাই। কিন্তু হাটপিছু দু-একজন লোক না-থাকলে কি চলে? তারা সব নতুন-নতুন খবর জানে। তারা সেটা বলতেও ভালবাসে। 

যুদ্ধ যেন এই কথোয়ালদের একেবারে মাঘের শেষে বৃষ্টির মত। চারা গাঁড়ার আগেই ধান বেরয় যেন। 

.

কিন্তু যুদ্ধ তখন সত্যি-সত্যিই এত জটিল ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে যে টাউনের কিছু শিক্ষিত মানুষ, যারা পড়তে পারে, তারা ছাড়া কেউ বুঝতেই পারছে না, কী হচ্ছে। 

১৯৪২-এর অক্টোবর-নভেম্বর মাস এমন ঘটনা ঘটানোর, এমন রটনা রটানোর ও এমন গুজব ছড়ানোর মাহেন্দ্রক্ষণ পড়েছিল। ইয়োরোপের সাম্রাজ্য দেশগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আমেরিকা ও জাপানও সে-যুদ্ধে জুটেছে। ভারতের স্বাধীনতা প্রাদেশিক স্বাধীনতা পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার একটা সরকার হবে না কী একটা সম্মিলনী হবে—এই নিয়ে, আর প্রতিরক্ষার কী হবে নিয়ে নেতাদের, পার্টিগুলোর, এক-এক প্রদেশের সংখ্যাপ্রধান লোকজনদের মতামত, ছুপাছুপি, সন্দেহ, চোরধরা এ-সব তো লেগে আছে সেই ৩৫-এর আইন পাশ থেকেই। দেশীয় রাজ্যগুলোরও একটা চাহিদা আছে। সুভাষচন্দ্র, শেষপর্যন্ত জাপানে পৌঁছে এক আজাদ হিন্দ সরকার ও এক আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কংগ্রেস ও লিগ যুদ্ধে ব্রিটেনকে সমর্থন করেছে কিন্তু সে-সমর্থন শর্তমুক্ত নয়। ব্রিটেন যুদ্ধে তখন হারছে। ভারত সেই যুদ্ধ চালনার প্রধান কেন্দ্র। 

সিঙ্গাপুর ও ব্রহ্মদেশে জাপানিদের কাছে ব্রিটিশ সৈন্য গো-হারান হেরে গেছে। পুরো পুব-দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে জাপান তার দখল কায়েম করেছে। ১০০ দিনে ১০০ যুদ্ধ জিতেছে জাপান। বাংলায় দক্ষিণ-পূব এশিয়া থেকে উদ্বাস্তুরা আসতে শুরু করেছে। আজাদ হিন্দ ফৌজ কোহিমা-পর্যন্ত এসে আবার ফিরে গিয়ে, জাপানের রণকৌশল অনুযায়ী বাঁ দিকের একটা নতুন জঙ্গল ধরে আবার কোহিমার দিকেই এগচ্ছে। আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে তাদের সর্বাধিনায়ক সুভাষচন্দ্র আছেন। একেবারে সাধারণ সৈনিকদের মতই তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে চলেছেন। তাঁর বক্তৃতা তখন প্রতিদিন প্রচারিত হচ্ছে। ভারতবাসীকে বলছেন, ‘আমি সুভাষ বলছি। আমরা বাইরে থেকে মুখোমুখি যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে হারিয়ে বার্মা রোড ও তার আশপাশের জঙ্গল ও পাহাড় দিয়ে ভারতের দিকে এগচ্ছি। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি এখন ভারতের পক্ষে কয়েকদিনের বা বড়জোর দু-এক মাসের ব্যাপার যদি আমাদের, আজাদ হিন্দ ফৌজের, এই আক্রমণের সঙ্গে-সঙ্গে ভারতের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ ঘটানো যায়। ভারতের স্থানগত ও মানবিক সাহায্য তার পক্ষে অপরিহার্য। তাই ঠিক এখনই তারা ক্রিপসকে ভারতে পাঠাল—যাতে ভবিষ্যৎ কোনো মতৈক্যের বিনিময়ে এখন সমর্থন পাওয়া যায়। 

ইতিমধ্যে যুদ্ধে পক্ষ বদল ঘটে গেছে। জার্মানি আক্রমণ করেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর জাপান আক্রমণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গুজব, ঘটনা, অঘটনা, রটনার এত উর্বর ক্ষেত্র ক্বচিৎ মেলে। এই দুই যুদ্ধ যদি মিলে যায়, তাহলে ব্রিটিশ শাসন থেকে আজাদি আমাদের মুঠোয় এসে যাবেই। ‘সমস্ত দেশপ্রেমিক ভারতবাসী ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ গড়ে তুলুন 

যুদ্ধের এমন পরিস্থিতিতে বাংলা ছেড়ে আরো পশ্চিমে পেছিয়ে যাওয়ার, পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে, ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে। এখন পর্যন্ত যে-সব কাগজপত্র পাওয়া, গেছে তার মধ্যে ব্রিটিশ সামরিক কোনো দলিল নেই (২০১০)। 

কিন্তু ব্রিটেনের যুদ্ধ-পরিচালনার পদ্ধতি, সংগঠন ও সিদ্ধান্ত-নেয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। ভোটে নির্বাচিত সরকারই একমাত্র সে-ক্ষমতার অধিকারী। যুদ্ধ যখন চলছে, তখন সমস্ত সামরিক সিদ্ধান্ত তো মন্ত্রিসভা ও পার্লামেন্টে প্রতিদিন আলোচনা করা যায় না ও হয় না। সেই কারণেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীই পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিসভার পক্ষে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খবর নেন ও তাঁদের খবর দেন। চার্চিলের সমস্ত কাগজপত্র এখনো (২০১০) তালিকা করে ওঠা যায়নি। এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে তাঁর কাগজপত্রে এমন কোনো দলিল আছে যাতে জানা যাবে বাংলা থেকে প্রয়োজনে পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত ভাবা হয়েছিল। যে-সব কাগজপত্র বেরিয়েছে ও বেরচ্ছে (২০১০) তাতে এমন একটা আন্দাজ তৈরি করা যায়। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পূর্ব রণাঙ্গণের সেনাপতি তখন (১৯৪২) জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ‘স্থিরীকৃত কর্মসূচি সেই পর্যায়ে এসে গেছে যখন উপকূল থেকে ২০ মাইলের মধ্যে সমস্ত নৌকো নষ্ট করতে হবে।’ এ দেশ থেকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের পাঠানো বার্তায় এই শব্দগুলি পাওয়া যাচ্ছে এপ্রিল মাস থেকেই—কলকাতা থেকে অপ্রয়োজনীয় লোক সরানো (‘অ্যাকসিলারেটিং দি ইভ্যাকুয়েশন অব ইনএফেকটিভস ফ্রম ক্যালকাটা’), নট নড়নচড়ন নীতি (‘স্টে পুট পলিসি’), সরকারি ব্যবস্থাদি একেবারে সম্ভাব্য শেষমুহূর্ত পর্যন্ত চালু রাখা, (‘টু মেইনটেইন দি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আনটিল দি লাস্ট পসিবল্ মোমেন্ট’), গভর্নর (বাংলা) সামরিক অভিযানে নাক গলাচ্ছেন (‘…ডিজায়ার্ড টু ইনটারফেয়ার ইন অপারেশন্যাল ম্যাটার্স’)। 

আর-একটু এগিয়ে, এই ব্যবহৃত শব্দগুলিকে যদি কালানুক্রমিক সাজানো যায় তাহলে এমন আভাসও পাওয়া যেতে পারে যে পূর্ব রণাঙ্গণে স্থলপথে ও আকাশপথে জাপান যতই এগচ্ছে, ততই ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চস্তরে মতান্তর ঘটছে, ভয় ঢুকছে ও রোজকার সরকারি কাজ শাহেবদের কাছ থেকে সরিয়ে বেসরকারি স্তরের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। 

ঘটনা ঘটানো, না-ঘটানো, রটনা আর গুজবের সর্বোত্তম উপলক্ষ ও সময় যুদ্ধ। যুদ্ধে অকল্পনীয় ঘটনাও তো অনবরত ঘটে। তাই ঘটনা ঘটানোর এমন স্বাধীনতা আর-কোনো সময় পাওয়া যায় না। জননেপথ্যে অভ্যাসে অভ্যাসে শৃঙ্খলিত কিছু মানুষকে নরহত্যার নানা অস্ত্রের অঙ্গাঙ্গী করে তোলা হয়। সেই মানুষটিকে নিজের বাহক করে অস্ত্র যুদ্ধে ঢোকে। 

শুধু রটিয়ে দিয়েই যুদ্ধে জেতা যায় ও হারা যায়। অশ্বত্থামার মারা যাওয়া এক গুজব—দ্রোণকে যুদ্ধ ছাড়াতে। শিখণ্ডীর হিজরেপনা এক গুজব—ভীষ্মকে যুদ্ধ ছাড়াতে। 

গোয়েলস্ দ্বিতীয় যুদ্ধে গুজব রটানোটাকে যুদ্ধের একটা আলাদা বাহিনীর সমতুল্য করে তোলে। তা সম্ভব হয়েছিল নতুন যন্ত্র, রেডিও ও রেডিওগ্রাম ব্যবহারের ফলে। আর জার্মান-সৈন্যদের যুদ্ধের স্টাইল সম্পর্কে চমক লাগানো খবর রটানো হচ্ছিল আরো নতুন এক যন্ত্র দিয়ে—মুভি ক্যামেরা। ব্লিৎসক্রিগ শব্দটা এত শুনিয়ে-চিনিয়ে দেয়া হল যে ‘ব্লিৎসক্রিগ’ শব্দটা শুনলেই একটা ছবি চলে আসত মনে। বোমারু বিমানের সারি আকাশপথে। তারা বোমা ফেলতে ফেলতে এগিয়ে যাচ্ছে। নীচে, গ্রাম-শহরকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে আর বোমাবর্ষণের ছবির পরই আসত স্বস্তিকা-আঁকা সৈন্যদের অস্ত্র কাঁধে দখল নিতে নিতে এগনো। মধ্য ইয়োরোপের সব দেশ জার্মানরা এসে-পড়ার আগেই তাদের সংবর্ধনা করছিল। এর আগে হলিউডে যেমন আফ্রিকানদের দেখাত, এইসব বিখ্যাত দেশগুলিকেও দেখাত তেমনই। নাৎসিদের কাছে ইয়োরোপের (বাদে গ্রেট ব্রিটেন) এই আত্মসমর্পণগুলো থেকেই ওয়াল্ট ডিজনির কমিক স্ট্রিপে নেংটি ইঁদুর ও কাবলি বিড়াল এসে গেল। 

আরাকানের আকিয়াবে দাঙ্গা বেঁধে গিয়েছিল— বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে মগ ও আরাকানিদের। মগ ও আরাকানিরা বহুকাল ধরে বাঙালি মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে আসছে। ওখানকার স্থানীয় ডেপুটি কমিশনারকে তার নিজের লোকরাই, আরাকানি, খুন করে। বাঙালি মুসলমানরা তখন একজোট হয়ে তাদের ধাওয়া করে, খুনটুনও হয়, লুটপাটও হয়। ওদের কক্সেস বাজার পর্যন্ত ধাওয়া করে বাঙালি মুসলমানরা ফিরে আসে। তারপর মিলিটারির একটা দল যায় ব্রহ্ম-সীমান্ত পর্যন্ত। তারা যুদ্ধপলাতক ১৩ জন রাজপুত ও জাঠ ব্রিটিশ সৈন্যকে ধরে। পলাতকরা কোনো আপত্তি না করেই আত্মসমর্পণ করে। এদিকে কক্সেস বাজারের এসডিও গ্রেপ্তার করে ফেলে মাউঙ্গদাও থেকে আসা ১৩ জন মগকে। 

এই দুই তেরতে মিলে গিয়ে চট্টগ্রামের সদরে যখন খবর পৌঁছল তখন কমিশনার আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে, সেনাকর্তাদের জানিয়ে দেন—উপকূল ও উপকূল-সংলগ্ন পাহাড়ে সশস্ত্র এই মগরা শত্রুপক্ষের আগাম চর হওয়ার আশঙ্কা আছে। মগদস্যুদের সমুদ্রপথ ও নদীপথ ব্যবহারের জ্ঞাত ইতিহাস অনুযায়ী এটা খুব সম্ভাব্য। 

বিভাগীয় কমিশনারের বার্তা তো আর হাটে-বাজারে রটার কথা নয়। কিন্তু কক্সেস বাজার থেকে যা রটল আর মিলিটারিরা যা বার্তা থেকে পড়ল তার মধ্যে অদ্ভুত মিল। মগ জাতের লোকজনরা জাপানিদের পক্ষে যোগ দিয়েছে। বা, মগদের ভিতর থেকে জাপানিরা চর জোগাড় করছে। বা, সে-চররা ইতিমধ্যেই অনেক ভিতরে চলে এসেছে। জাপানিদের জানা নেই উপকূলের পেছনের দেশটা কেমন। কোথায় বড় নদী বা দিঘি আছে। ফরেস্ট বা বড়গাছের জটলা কত বড় ও কত ঘন। 

একটা দেশের সঙ্গে আর-একটা দেশের যুদ্ধে—নানা মজা হতে পারে, ইয়োরোপে দেশগুলি তো ছোট-ছোট। লোকজনও কম। আর ওইটুকু সাইজে কত মজাই-বা ঘটতে পারে? সবই হয়তো হল—কিন্তু সবই স্যাম্পল। 

ভারত সমুদ্রে পড়তে না পড়তেই যুদ্ধের মজা শুরু। 

এই ১৯৪২-এ কলকাতায়, বাংলায়, যুদ্ধটা কেমন জমজমাট হয়ে উঠল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্যে? 

সিঙ্গাপুর—ব্রিটিশরাই যে সমুদ্রের শাসক তার দুর্গ। জাপানিরা এল উত্তর দিক দিয়ে লাব্রাডর-উপকূলে। এটা ব্রিটেনের হিশেবের মধ্যে ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনী তো প্রস্তুতই ছিল। ল্যাব্রাডর উপকূল না বলে বিচ বা সৈকত বলাই ভাল। বেশ ভাল বিচ। সেই বিচকে ঘিরে রেখেছে জঙ্গল। সেই জঙ্গলের জটলায় লুকিয়ে আছে পর্বতশ্রেণী—ঠিক হিমালয় গোত্রের নয়, মোটামুটি দাক্ষিণাত্যের ঘাট সাইজের। পাহাড়, টানা, জঙ্গল, টানা, সৈকত, টানা, সমুদ্র, টানা। তখন যে নতুন কামান চালু হয়েছিল সেগুলো ঘোরানো যেত। সেই জন্যই তো নাম হয়েছিল এম. জি বা মেশিন গান। ল্যাব্রাডরের পাহাড়গুলোর মাথায় সারি দিয়ে বসানো হল মেশিন গান। এখনো (২০১০) দুটো-চারটে আছে—পর্যটন ব্যবসায়ের কারণেই সযত্নে। কল্পনা করে নেয়া খুব সহজ, কল্পনার দরকারও নেই, চোখে প্রায় দেখাই যায় ছবি। এই শৈলশিরার ওপর লাইন বেঁধে আধুনিকতম মেশিন গান, যা একই জায়গায় স্থির থেকে ঘুরবে আর গুলি ছুঁড়বে, রোটেট অ্যান্ড ফায়ার। ওই শিরা থেকে তো দেখাই যাচ্ছে সৈকত ও সমুদ্র। ধরা যাক, সমুদ্র পথে জাপানিরা এল যুদ্ধজাহাজে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নামল, যুদ্ধ করতে, সাবেকি পুরনো কায়দায়, মহাকাব্যের স্টাইলে। এত বড় সৈকত। দুইদিকে দুই দল দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবে। জাপানিরা তো জানে না, পাহাড়ে লুকিয়ে দাঁড়ানো ‘রোটেট অ্যান্ড ফায়ার’। ব্যস। সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষা দুর্ভেদ্য। ব্রিটেনের নৌদুর্গ। কিন্তু জাপানিরা যুদ্ধ প্রথা ভেঙে যুদ্ধজাহাজে এল না, এল ডিঙি নৌকোয়, এই সমুদ্র পেরিয়ে। কত ডিঙি ডুবেছে, কত সৈন্য মরেছে—এসব হিশেবনিকেশ নেই। যুদ্ধের আগে ছিল, পরে নেই। কারণ, নৌযুদ্ধের সমস্ত এপিককে কলঙ্কিত করে জাপানিরা এল দক্ষিণ-এশিয়ায় সামুদ্রিক গ্রামে-গ্রামে প্রচলিত ডিঙিতে। এই ডিঙিগুলো লোকজনের রোজকার কাজে লাগে–বাজার করতে, বাজার দিতে, খবর দিতে, খবর নিতে। বরিশালের মত—এক ডিঙা দশ পা। দশ পায়ের সমান-গতিতে। পাঁচ মানুষের সমান-জোরে। সেই ডিঙিতে একটা গোটা সৈন্যবাহিনী আসতে পারে? এল তো! হয়তো রাতে-রাতে এসে অনেক রাত ধরে উত্তরের ওই জঙ্গলে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকত। আর, উত্তরের ওই পাহাড় তো কোনো হিশেবের মধ্যেই নেই। যখন হিশেবের মধ্যে আনতে হল ও ‘রোটেট অ্যান্ড ফায়ার’ এম-জি যখন ছুঁড়ল গুলি, তখন মালুম হল এম-জিগুলি ৬-ইঞ্চির বেশি রোটেট করে না। একটা অক্ষরেখার বাঁয়ে ৬ ইঞ্চি আর ডাইনে ছয় ইঞ্চি রোটেট করে ল্যাব্রাডরের শান্ত বিচে ব্রিটিশ গোলন্দাজবাহিনী শুধু সমুদ্রকে তাক করে গুলি ছুঁড়তে লাগল আর জাপানি বাহিনী উত্তরের শৈলশিরা ধরে, পুরনো কলকাতার বেরা ভাসানোর স্টাইলে শিস দিতে-দিতে, সং করতে করতে, এসে, এমন বিশ্ববন্দিত গোলন্দাজ বাহিনীকে পেছন থেকে ঘিরে ফেলল। 

১০০ দিনের চমৎকারী যুদ্ধে জাপান তো বার্মা সীমান্তে এসে গেল, তারপর একবার ফিরেও গেল। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া থেকে যুদ্ধ-শরণার্থীরা বাংলায় আসতে শুরু করে দিয়েছে, কলকাতায় ট্রেঞ্চ কাটা চলছে, কলকাতা থেকে জেলখানা, চিড়িয়াখানা খুলে দেয়ার ও সরিয়ে নেয়ার কথাও উঠছে। সকলেই ধরে নিয়েছে, জাপানি আক্রমণের নিশানা কলকাতা ও বাংলা। ৮মে বিকেলে ও ৯ মে সকালে চিটাগঙে বোমা পড়ল, সৌভাগ্যত, শহরের ৯ মাইল দূরে এয়ারপোর্টে। এয়ারপোর্টে তখন রাস্তা মেরামতির কাজ করছিল ৩০০-মত মজুর। বোমার সময় এরা এয়ারপোর্টে ছিল না। মৃতের আনুমানিক সংখ্যা ১০০ আর আহতের সংখ্যা ৭০ মত। এমন বোমা-আক্রমণের সময়ের পুরো ধাক্কা সামলাতে যে-ব্যবস্থা করা হয়েছিল, শাস্ত্র অনুযায়ী, সিভিক গার্ড, এ-আর-পি, স্থানীয় যুদ্ধ কমিটি—এসব কোনো কাজেই আসেনি। সকলেই চিটাগঙ ছেড়ে পালিয়েছে। যারা পালায়নি, তারা পারেনি বলেই পালায়নি। 

বাংলা ছেড়ে লোক-পালানোর কথা এতই রটেছে যে জওহরলাল নেহরু কলকাতায় এসে বুঝতে চাইলেন, লোকজন কি ফ্যাসিস্তদের মেনে নিয়েছে? মুখে বললেন পার্টির কাজে। পার্টির কাজ তো থাকতেই পারে। 

আসল কারণ ছিল—সারা ভারতের কোনো রাজ্য থেকে এক ফোঁটা সাহায্য আসেনি বাংলায়। এমন কী, জেলখানাগুলোও রাজি হয়নি কলকাতার বন্দীদের নিতে। এটা ভারতের যুদ্ধ নিশ্চয়ই। এ যুদ্ধে ভারতে কি এমন আক্রমণ ঘটত, যদি ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত না হত, বাংলা তো সেই ভারতেরই অংশ। কিন্তু জাপানি আক্রমণের ঠেলা সামলাতে হবে এক বাংলাকেই? ভারতের আর-কোনো প্রদেশে বোমা পড়বে না, আর কোনো প্রদেশে পঞ্চম বাহিনী ঢুকবে না, আর কোনো প্রদেশে একই সঙ্গে যুদ্ধ, মন্ত্রিসভা, ভারতরক্ষা আইন চালাতে হয় না, আর কোনো প্রদেশে পাট চাষ হয় না, আর কোনো প্রদেশ এমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতে ওলোটপালোট নয়, আর কোনো প্রদেশে বর্ণহিন্দুদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এতটা নয়। বাংলায় ভৌগোলিক কারণে ঘটছে ভারতের লড়াই। ভারত তাই সর্বার্থে বাংলাকে একঘরে করে দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু এসেছিলেন, এই খবর পেয়ে যে বাঙালিরা এত হতাশ হয়ে পড়েছে যে তাদের পক্ষে ফ্যাসিস্ত-বিরোধী যুদ্ধটুদ্ধে কিছু করা সম্ভবই নয়। জওহরলাল হয়তো বাঙালিকে জাগাতেই এসেছিলেন। কিন্তু ১৯৪২-এর জুনে পুব বাংলার গ্রামে-গ্রামে তখন কারো আর কোনো আয়ের উপায় নেই। নৌকো পোড়ানো হয়েছে—এক বাখরগঞ্জেই ১২০০০। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ তৈরি হচ্ছে—ওই জুন মাসতক ১১৪ লক্ষ মণ চাল কিনে সরানো হয়ে গেছে। ‘যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাড়তি চাল’ কেনার কন্ট্রাক্ট নিয়েও মন্ত্রিসভায় মারামারি, অর্ধ-শারীরিক অর্থে। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *