১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৮১. ও স্বদেশযাত্রা

১৮১. ও স্বদেশযাত্রা 

যোগেনকে ৫ আগস্ট ৪৭ সিন্ধু এক্সপ্রেসে করাচি রওনা হতে হল। যোগেন পাকিস্তানে আইনমন্ত্রীর পদে আমন্ত্রণ পেয়ে যাচ্ছে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে। 

 এতই শেষ মুহূর্তে খবর এসেছে যে সে কাউকে জানাতেও পারেনি। পুরোনো দিল্লি দিয়ে দিল্লি স্টেশনে পৌঁছুবে। তার গাড়ির আগে একটি পাইলট, তার আগে সার্জেন্ট, পেছনে এসকর্ট। কয়েকদিন ধরে নানা জায়গা থেকে হত্যার হুমকি আসছে। জিন্নাশাহেবের ওপর দু-বার শারীরিক আক্রমণ হয়ে গেছে। তিনি এখন মুসলিম ন্যাশন্যাল গার্ডের পাহারাও নেন। আম্বেদকরশাহেবকে নিয়েও গুজব রটেছিল। পাঞ্জাবের নেতা স্বর্ণ সিং-কে আক্রমণ ঘটে গেছে। তবে, বোঝা যাচ্ছে না, সেটা ভিড়ের ভিতর থেকে হঠাৎ ঘটেছে কী না। যোগেন করাচি থেকে ফোন পেয়ে বাড়ি এসে রওনা দেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে যখন, তখন তার পি এ ফোনে জানতে চাইল, ‘মুসলিম ন্যাশন্যাল গার্ডের এসকর্ট তাঁর লাগবে কী না।’ যোগেন একটুও অপেক্ষা না করে, ‘না’ বলে নিজেকে ঠাট্টা করে মুচকি হাসলেন—যে-হাসি যোগেনের জন্মচিহ্ন। কপালে একটু ভাঁজও খেলল। এটা জন্মচিহ্ন নয়। যোগেন বলল মনে-মনে, নিজেকে, উকিল হিশেবে বলল, ন্যায়শাস্ত্র অনুযায়ী বলল, অন্তবর্তী সরকারের আইনমন্ত্রি হিশেবে বলল ও আইন-শাসনের প্রতি তার আনুগত্য থেকে বলল——এটাই হচ্ছে নৈরাজ্য। যখন মানুষের ব্যক্তি পরিচয় থিক্যা তার গোত্র পরিচয়, গোষ্ঠীপরিচয়, জাতিপরিচয় সবার উপরে উঠে।’ 

যোগেনের চোখে পড়ল, চোখ এড়ানো উপায় নেই বলেই চোখে পড়ল—দাঙ্গা-উদ্বাস্তুদের রিলিফ ক্যাম্প। চাঁদনিতে, লালকেল্লার মাঠে। তাঁবু আছে কিছু, আর যুদ্ধের পর প্লাস্টিক বলে যে কেমিক্যাল চাদর এসেছে, তাও আছে। কিন্তু বেশির ভাগটাই খালি ও খোলা। এরা কি হিন্দু? পাঞ্জাব থেকে এসেছে? তাহলে চাঁদনিতে কেন? এখানে তো চারদিকেই মুসলমান। তারা এদের মারছে না? তাহলে, এরাও কি মুসলমান, পাঞ্জাবের? যোগেন দুই-একজন আর্মড পুলিশ দেখে। 

যোগেন বন্দুক দেখে আর্মড পুলিশ চিনতে পারল? ওরা তো মুসলিম ন্যাশন্যাল গার্ডও হতে পারে। বা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। পরশুদিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে গজনফর আলি বলেছিলেন—আর এস এসের ভলান্টিয়ার ফোর্সের ভয়ে তো রাস্তায় বেরনো যাচ্ছে না। তারা অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ঘিরে ধরে প্রমাণ চাইছে সে হিন্দু কী না। তারপর তাকে মেরেধরে ছেনতাই করে। এদের তো অ্যান্টি সোস্যাল হিশেবেই অ্যারেস্ট করা দরকার। তাতে স্বরাষ্টমন্ত্রী সর্দার প্যাটেল এত রেগে যান যে গজনফর থতমত খেয়ে যান। সর্দার বলেন, ‘আমরা এখানে গবর্মেন্ট চালাতে এসেছি। এটা বাই পার্টি টকের জায়গা নয়। আর এস এস স্বেচ্ছাসেবকরা মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড আর শিখ যুব সংস্থার মতোই তাদের সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দেয়ার কাজ করছে। আমাদের তো উচিত তাদের অভিনন্দন জানানো, নাহলে শুধু হিন্দু ডেডবডিতেই দিল্লির সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যেত। ততক্ষণে গজনফরও রেগে গিয়ে বলল—গবর্মেন্ট কীভাবে চলে এ বিষয়ে আপনার যদি সামান্য অভিজ্ঞতাও থাকত, তাহলে আপনার ক্যাবিনেট কলিগকে সম্বোধনের ভাষাও আপনার জানা থাকত। 

এ-ঘটনাটা মনে পড়ায় যোগেন অপ্রস্তুত বোধ করে নিজের কাছেই। এই জাতিদাঙ্গায় প্রত্যেক জাতির লোকই তো বেঁচে আছে তাদের জাতের নিজস্ব বাহিনীর দৌলতে। 

সে লালকেল্লার ঐ রিলিফ ক্যাম্পটা শিখদের না হিন্দুদের না মুসলমানদের সেটা একঝলকে বুঝতে পারল না? ভুলে গেল শিখদের দাড়ি-পাগড়ি চিহ্ন? 

যোগেন একটা সান্ত্বনা খুঁজল—সে তো এদিকে কখনো আসেনি, তাই সে চট করে চিনে উঠতে পারছে না। 

এই সান্ত্বনাটা পুরো ভাবার পর যোগেনের ঠোটে সেই জন্মচিহ্নের হাসিটা ফুটে উঠল, হয়তো একপ্রান্ত একটু ঝুলেও গেল। যোগেনের জন্মচিহ্নে কি ছলনা এসে গেল? 

এর চাইতে কি সহজ ছিল না স্বীকার করা যে সে এখনো বুঝছে না—কাদের ঐ রিলিফ ক্যাম্প? বাইরের জাতিচিহ্ন ছিল উচ্চবর্ণদের। বামুনের তিলক-টিকি-পৈতে থেকে নাপিতদের কাঠের বাক্স। আর উচ্চবর্ণের গৌরববৃদ্ধির জন্য নিম্নবর্ণকেও নিজের জাতিচিহ্ন পরতে হয়। তাদের সমাজে তুলসীকাঠের মালা। মাদ্রাজে তাদের মতো শূদ্রদের পেছনে ঝাঁটা বেঁধে দেয়া হয় যাতে যে রাস্তাটাকে সে অপবিত্র করছে হেঁটে, সে রাস্তাটাকে সে নিজেই মুছে দিয়ে যাচ্ছে। আঃ আঃ। যোগেন ভারত সরকারের মন্ত্রি হওয়ার সুবাদে সামনে-পিছনে পাহারা নিয়ে নিজে একা একটা গাড়িতে সেই নিভৃতি পায়, যে-নিভৃতি ছাড়া তার চোখ এমন ছলছলিয়ে উঠত না। যোগেন মনে মনে একটা আর্তনাদে মুচড়ে ওঠে। পাছে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরয়, সে গলাখাঁকারি দিয়ে সেই ঝোঁকটা সামলায়। আজ সব জাতই আত্মরক্ষার জন্য আক্রমণ করছে, জাতের জন্য মরছে, জাতের জন্য মারছে, জাতের জন্য নিজের দেশকে জাতের গ্রাম বানাচ্ছে। কেউ একবারের জন্য তাকিয়ে দেখছেও না, ভাবছেনও না, এই আক্রমণ ও মৃত্যু কত যুগ ধরে আমরা শূদ্ররা সয়ে আছি। রায়ট কি ভারতে এই প্রথম? শূদ্রদের ওপর শারীরিক পেষণ তাহলে রায়ট ছিল না। সেটা ছিল উঁচু জাতের ধর্মপালন। ধর্মপালনের জন্য বেশ্যাবাড়ির মাটি তার শূদ্রের রক্ত লাগে। 

স্টেশন এসে গেলেও যোগেনকে নামতে দেয়া হয় না। সিকিওরিটির লোকটি এসে তার মালপত্র নিয়ে তাকে বলে যায়, আমি সব ঠিক করে আপনাকে নিয়ে যাব। 

যোগেন গাড়ির ভিতর বসেই দেখে—তাকে নিয়ে আসা পাইলট ও সিকিয়োরিটির জোয়ানরা গাড়ি ঘিরে রেখেছে, একটু বড় বৃত্তের পরিধি জুড়ে দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে নানা রকম বন্দুক, সেগুলোর নিশ্চয়ই আলাদা-আলাদা নাম আছে। যোগেন জানে না। এমন পাহারায় থাকতে থাকতে জেনে যাওয়া হয়ে যাবে কোনো একদিন। 

যোগেন, আবার এই সশস্ত্র নিরাপত্তা বলয়ের ভিতরে, গাড়ির নিভৃতিতে, তার ঠোঁটে লেপে থাকা হাসিটাকে জন্মচিহ্নের মতোই সরল করে তুলতে পারে। আত্মছলনায় বিদ্রূপের কোনো আড়াল না নিয়ে। সেটা তো দরকার হয় উচ্চবর্ণের সামনে। নিজেকে ‘শুদ্দুর শব্দুর’ বলে, নিজেকে ‘চাল’ বলে, ‘চোদ্দ পুরুষের চাঁড়াল’ বলে। এখানে তো সে একা ও ব্রিটিশ ভারতের সম্রাট, সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ কর্তৃক মনোনীত এক মন্ত্রি, তার সেই নিয়োগপত্র আছে তার গোর্টফোলিয়োতে, পোর্টফোলিয়ো আছে সুটকেসের মধ্যে। এতবার দেখেছে যোগেন যে তার মুখস্থ হয়ে গেছে। একবার দেখলেও মুখস্থ হয়ে যেত। 

GEORGE R. I 

George The Sixth by the grace a God of Great Britain, Irelard and the Britis Dominions beyond the Seas King defender of the Faith Emperor of India.

To our Trusty and well beloved the honourable Jogendra Nath Mondal.

GREETING 

(i) We de by this our warrant under our Sign Mannal appoint you the said Jogendra Nath Mordal to be during our pleasure a Member of the Excutive council of our Governor General of India. 

(ii) And do hereby appoint that so soon as you Shall have entired pon the cuties of your office this our Warrant shall have effect. 

GIVEN at our Corrt at St. James ‘s this Twenty first day of October 1946 and in the tenth year of our Reign.* 

[* বানান ও বাক্য সবই মূল নিয়োগপত্রের অনুযায়ী।]

যতবার পড়ে ততবারই হাসে যোগেন। আশু স্যার কিছুতেই ঠিকঠাক উদাহরণ দিতে পারতেন না ইংরেজি প্রোনাউন পড়াতে গিয়ে ‘রয়্যাল উই’-এর। পারতেন কিন্তু সে সবই শেক্সপিয়ারের নাটক থেকে, যোগেন বুঝবে কী করে। আশুবাবুকে এটা দেখিয়ে যদি বলতে পারত, ‘স্যার, এই যে পাইছি royal we-এর একডা কারেক্ট এক্সাম্পল।’ 

যোগেন তার ঘড়িটা একবার দেখে, সময় দেখে না, পেনটাও ছোঁয় একবার। 

স্যার, এই যে পাইছি royal we-এর সবথিক্যা অথেনটিক প্রমাণ। কাল কী পরশু আর একটা পাঁব, সেভার বোধ We থাকব না। কায়েদে আজম মোহম্মদ আলি জিন্না তো এমপেয়র না, গভর্নর জেনারেল অব দি ডোমিনিয়ন অব পাকিস্তান। গভর্নর জেনারেলও কি royal we ব্যবহার করতে পারে, স্যার? 

সিকিয়ে।রিটির সেই অফিসার এসে অ্যাটেনশন হয়ে স্যালুট করে। যোগেন আইনসভা থেকেই অভ্যেস করে ফেলেছে, তাকে যদি কেউ পদমর্যাদার কারণে স্যালুট বা নমস্কার করে, যোগেনও তাকে প্রতিনমস্কার করে। 

অফিসার বলে, ‘সবই তৈরি স্যার। আপনার সেলুন লাগানো হয়েছে। গার্ড পোস্টেড হয়েছে। আর পনের মিনিট পরে স্যার আপনি বোর্ড করবেন। আপনার সিটে আপনি আরাম করে বসার পর আপনার এসকর্ট গার্ডকে হুইসল দেবে গাড়ি ছাড়তে। তখনই গাড়ি ছাড়বে। ইয়েস স্যার’, অফিসারটি আবার স্যালুট করে গাড়ির দরজা বন্ধ করল। যোগেনের প্রতিনমস্কার সে খেয়াল করেনি। 

যোগেন ঘড়িতে সময়টা দেখে! পনের মিনিট পরে ছাড়বে? যেন শুনোইল, গাড়িটা আগেই ছাড়ে। তবে পশ্চিমের ট্রেন ব্যবস্থা বলে কিছু আর নেই। পাঞ্জাবের দিকে কোনো ট্রেন যাচ্ছে না। পাঞ্জাব থেকে কোনো ট্রেন আসছে না। কয়েক দিন আগেই আপ-ডাউন দুই ট্রেনেই শ-পাঁচেক যাত্রীর ভিতর আপে ১৭৫ জন আর ডাউনে ২১৩ জন খুন হয়ে তাঁদের কামরাতেই বসেছিলেন, গন্তব্যে পৌঁছুতে। এই ঘটনার পর কোনো ট্রেনই আর চলেনি। বোধহয় সেই কারণেই তাকে অন্য পথে করাচি যেতে হচ্ছে—রাজপুতানা দিয়ে। এই রুটে এখনো কোনো হাঙ্গামা নেই। সে এদিককার ভূগোল কিছুই জানে না। সে কিছু-কিছু নাম শুনেছে মাত্র। বেশি শুনেছে কেন্ত্রীয় মন্ত্রিসভার মিটিঙে। মন্ত্রীরা সকলেই সব জানে। আর যোগেন জানে শুধু পাঞ্জাব, বিপাশা-ইরাবতী, রানা কুম্ভ, অমৃতসর, স্বর্ণমন্দির, লাহোর, নানকানা শাহি (এটা এখানে কাগজ পড়ে জেনেছে), লুধিয়ানা, জলন্ধর। ব্যস। 

যোগেন বাইরে তাকিয়ে দেখে—তাকে ঘিরে থাকা নিরাপত্তা বলয়ে জোয়ানদের হাতে বিচিত্র সব বন্দুক, একেবারে তাক করে ধরা। মনে হচ্ছে, কারো যেন চোখের পাতা পড়ছে না! 

তাকে এত করে পাহারা দেয়া হচ্ছে কেন? সে কে? কেন্দ্রীয় মন্ত্রী? সব কেন্দ্ৰীয় মন্ত্রীই এই পাহারা পাওয়ার অধিকারী। তাই? কিন্তু পাহারা পাওয়া যায় বলেই নেয়া যায়? নেয়ার তো একটা কারণ থাকবে? 

তাকে চেনে কে? সে বাংলার পুবে বরিশাল বলে একটা সদরের গৌরনদী বলে একটি থানার মৈস্তারকান্দি বলে একটি গ্রামের এক নমশূদ্র বাড়ির ছেলে। তাদের গ্রামটার কোনো মৌজাও নাই, সেনসাসে টেনান্সি নাম্বারও নেই। ঐ জায়গাটা দুর্গম বলেই নমশূদ্ররা কোনো এক পলায়নে ওখানে আত্মগোপন করেছিল। সেই পল্লি এখনো তার আত্মগোপনতা শেষ করেনি… 

দরজায় একটা শব্দ করে অফিসার খুলে দিয়ে স্যালুট করল। যোগেনের প্রতি নমস্কারের পর সে হাত দেখিয়ে যোগেনকে নামার ও প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার ইশারা দেয়। যোগেন নামতেই সমবেত অ্যাটেনশনের আওয়াজ। 

সেই মৈস্তারকান্দির খাল-বিল-ক্ষেতে সমুদ্রের জোয়ারের জল তাদের ঘাটের মাটির ধাপের কখনো তিন তাক, কখনো চার তাক, ডুবিয়ে দেয়। প্রতিদিন ব্বিশ ঘণ্টা তাদের সঙ্গে সমুদ্রের বিনিময়। 

নানা আকারের বন্দুক ধরা জোয়ানদের মুখোমুখি দুই সারির মাঝখান দিয়ে যোগেন হেঁটে প্ল্যাটফর্মে ঢোকার প্রথম সিঁড়িটিতে পা দেয়। তার সামনে দুজন, আর, পেছনে দুজন বন্দুক উঁচিয়ে তাকে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢোকে। 

আমার মৃত্যু কবে থেকে এত গুরুত্বের হল? আমাদের মারতেও তো আমাদের স্পর্শ করতে হয় না, আমি এতদূর পর্যন্ত অস্পৃশ্য শূদ্র। আমাকে মারতে এত আয়োজন কার? আমাকে বাঁচাতে এত আয়োজন কার? আমাকে কে মারবে? 

যোগেন তার আসনে বসে, হুইসল বাজে, হুইসল বাজে, একটু দোল দিয়ে ট্রেন ছাড়ে। তার জানলাগুলিতে দুটি করে কপাট-একটা জালের আর একটা কাচের। বাহির দেখা যায় কিছু অদৃশ্যতাসহ। দিল্লি, হস্তিনাপুর থেকে সে, যোগেন, চলেছে সিন্ধুপ্রদেশের দিকে। 

আমাকে খুন করতে পারে বর্ণহিন্দুরা। আমি শূদ্র। আমি তাদের উচ্চতা অস্বীকার করতে আমার জন্মের নীচতা স্বীকার করেছি। আমি শূদ্র। আমি হিন্দু নই। শূদ্রের এই স্বাধিকার আমি ব্যবহার করেছি। শূদ্র হিন্দু নয়। সে স্বতন্ত্র। তাকে হিন্দু বলতে পারে—গান্ধীজি থেকে সেনসাস শ-খানেক বছর হয়নি এখনো, আমাদের পূর্বপুরুষদের কেউ কেউ পৈতে পরে, টিকি রেখে আর তিলক কেটে বামুন হতে চেয়েছিল। চাইলেই কি আর বামুন হওয়া যায়? বামুন হয়ে জন্মাতে হয়। তেমনি গান্ধীজি আর সেনসাস চাইলেই কি শূদ্র হয়ে যায় হিন্দু? শূদ্র হয়ে জন্মাতে হয়। একমাত্র তাহলেই পাওয়া যায় শূদ্রের এই স্বাধীনতা। আমি স্বাধীন শূদ্র। 

ট্রেনটা হুইসল দিল টানা, গতি কমিয়ে দিল, একটু পরে আবার একটা ছোট হুইসল দিল, তারপর একটা আওয়াজ তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভিতর থেকেই বোঝা যায় বিলম্বিত বিকেলে একটা ছোট স্টেশন। কোথায় এল? কোথায়? যোগেন সে-সব তো জানে না, কিন্তু এটুকু জানে, সে আর্যাবর্তের শেষ-পশ্চিমে। এই পথেই তো আর্যরা এসেছিল। তাদের সঙ্গে কোনো শূদ্র ছিল না। তারপর দুই হাজার মাইল হেঁটে হেঁটে তারা শূদ্র পেতে থাকে ও শেষে মৈস্তারকান্দি, যোগেনের পূর্বপুরুষকে শূদ্র বানাতে। যোগেন এখন সেই আর্যবর্তের পশ্চিম ধরে আর্যদের মুখোমুখি হতে চলেছে। যোগেন নিঃসংশয় জানে মুসলিম লিগও আর্য, তারও শূদ্র দরকার। 

যোগেন একটু অস্থিরতা নিয়েই দরজার সামনে গিয়ে দরজাটা খুলতে চায়। পারে না। তার এসকর্ট হাত বাড়িয়ে খুলে দেয়। যোগেন একবার চাক্ষুষ করতে চায়—সেই পথ, তার বিদ্রোহের, আর্য প্রবেশের ও এখন স্বতন্ত্র স্বাধীনতার। 

যোগেন নিজেকে দেখতে চায়, ভারতবর্ষ নামে হাজার-হাজার বছরের ধ্যানের একমাত্র প্রতিনিধি সে, এক শূদ্র। চলেছে পাকিস্তানে। সেই ধ্যানের স্বদেশকে সত্য রাখতে। 

শূদ্র ছাড়া সে-দায় আর কে নেবে? 

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *