১৫৯. হকশাহেবের স্টাইল : যুদ্ধে ও শান্তিতে
এ কথা কারো জানতে বাকি ছিল না যে শাহেবরা হকশাহেবকে সহ্য করতেই পারে না। না রাইটার্সের শাহেবরা, না ক্লাইভ স্ট্রিটের শাহেবরা। তার কারণ নানা রকম ভাবা যায়। কিন্তু শাহেবরা যে হকশাহেবের বাতাস পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না তেমন অপছন্দের কোনো কারণ থাকতে পারে না। সতিনকে যেমন সহ্য করতে পারে না আর-এক সতিন, শাহেবদের ছিল তেমনি। তারা নিজেদের মধ্যে হকশাহেবকে বলত, ‘লিজার্ড’। শাহেবরা, সব রকম শাহেবরা, পছন্দ করত খাজাকে, সারওয়ারদিকে, চিফ হুইপ সাহাবুদ্দিকে। এরা ক্লাব করতে পারে, ইঙ্গিত বুঝতে পারে, কোনো সময় ভোলে না যে শাহেবরা রাজার জাত। হকশাহেব যে টাকা খান না, তা না। তাঁর যে অসামাজিকতা নেই, তাও নয়। কিন্তু কখনো আন্দাজ দেবেন না। তাঁর নিজের স্বার্থ ছাড়া এক পাও যাবেন না। কথা যখন বাংলায় বলেন, তখন বরিশাইল্যা আর যখন ইংরেজিতে বলেন, তখন আই-সি-এস সেক্রেটারিরাও অবাক না হয়ে পারেন না। শাহেবদের পক্ষে হকশাহেব ডিফিকাল্ট। অথচ তাঁর কড়ে আঙুল মাপের কোনো দ্বিতীয় জননেতা নেই বাংলায়। হকশাহেবের স্টাইলটাই হকশাহেব। কোনো-কোনো আই.সি.এস বা লাটশাহেবকে এতটা মেজাজি মানা যায়। যেমন লর্ড কার্জনের গল্প শোনা যায়। তাই বলে হকশাহেব? সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ করেন এমন অবহেলায় যেন সরকারটা তাঁর সেরেস্তা। সমস্ত দিক থেকে আইনমাফিক প্রস্তাব ঝাঁকিয়ে ফেলে দেন। হকশাহেব যেন নিজেকে ইচ্ছে করে দুষ্পাচ্য ও সুপাচ্য করতে পারেন। এদিকে তো হাউসের মেজরিটি কী করে রাখবেন, সেই চিন্তায় কাঁটা হয়ে থাকেন। এতটাই অপছন্দ একটা লোককে ভোট দিয়ে তো টিকিয়ে রাখল ইয়োরোপিয়ান ব্লক। কেন, সেটা আগে থেকে বোঝেন হকশাহেব।
হকশাহেব ১৯৪১-এর ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে, শপথ গ্রহণের দিন ছয় পরে আইনসভায় নতুন মন্ত্রীদের নিয়ে বসলেন। একটা হাততালিও বাজল। হকশাহেব স্পিকারের অনুমতি নিয়ে হাউসকে জানালেন, ‘দি কিং ইজ ডেড, লং লিভ দি কিং। আমি ও আমার পূর্বতন মন্ত্রিসভার সদস্যরা মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলাম। তার ফলে, লিগমন্ত্রিসভা আর বেঁচে নেই। নতুন প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স পার্টির মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। আমাদের যে মহাযুদ্ধের সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, বিশেষ করে সেই কারণেই এখন প্রয়োজন জাতির সমস্ত রকম রাজনৈতিক মত ও সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করে এমন সব পার্টিকে নিয়েই সরকার তৈরি করা। সেই ঔচিত্যবোধ থেকেই আমরা এই ‘প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি’ গঠন করেছি। এই পার্টিতে আছে কৃষকপ্রজা পার্টি, হিন্দু মহাসভা, ফরোয়ার্ড ব্লক—যাদের বাংলার কংগ্রেস বলেই সবাই জানে, প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি, তপশিলি। আমি কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের জন্যও দরজা খোলা রেখেছি ও আশা করছি জাতির এই সংকটে তাঁদের শুভবুদ্ধি উদয় হবে। আমি মন্ত্রীদের আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আমি মৌলবি এ.কে. ফজলুল হক, প্রধানমন্ত্রী, প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি ও মুসলিম কোয়ালিশন পার্টির নেতা। প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশনের বাকি মন্ত্রীরা হচ্ছেন খাজা নবাব হবিবুল্লা বাহাদুর—কৃষি ও শিল্প, খানবাহাদুর আবদুল করিম—শিক্ষা ও অস্থায়ীভাবে বাণিজ্য ও শ্রমিক, খান বাহাদুর হাশেম আলি খান—সমবায় ও গ্রামীণ ঋণ, কৃষক-প্রজা পার্টির সামসুদ্দিন আমেদ– যোগাযোগ ও সরকারি কাজ, হিন্দু মহাসভার ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়—অর্থ, ফরোয়ার্ড ব্লকের সন্তোষকুমার বসু—জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসন, প্রমথনাথ ব্যানার্জি–রাজস্ব, বিচার-ব্যবস্থা ও আইনসভা, তপশিলি—উপেন্দ্রনাথ বর্মণ—ফরেস্ট ও আবগারি।’ ফজলুল হককে থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ বিরোধী কংগ্রেস থেকে নলিনাক্ষ সান্যাল দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘মিস্টার স্পিকার, আজ আমাদের এক মহা পবিত্র দিন। শাস্ত্রে দশ অবতারের কথা পড়েছি। নিজেদের চর্মচক্ষুতে দশ-অবতার দর্শন হল। কেশব ধৃত হকশাহেব রূপং জয় জগদীশ হরে। কত মন্ত্রিসভা আসে যায়, হকশাহেবের তাতে কী আসে যায়?’
ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা, বা প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার ১৬ মাস খুব শান্তিতে কাটছিল বাংলায়। যুদ্ধ বেশ ঘোরালো হয়ে উঠেছে—বাংলার পূর্বোত্তরে। ইংরেজরা সিঙ্গাপুর-বার্মা থেকে পালিয়ে কুলুতে পারছে না। ছোটলাটশাহেব শুধুই যুদ্ধ সামলাচ্ছেন—যুদ্ধের ঊনকোটি কাজ। প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন আইন স্থগিত হলেও প্রাদেশিক সরকারের একটা কাকতাড়ুয়া খাড়া আছে দুনিয়াকে দেখাতে যে বাংলা রণাঙ্গনে ভারতের বাঙালিরাই ব্রিটিশদের পক্ষে কেমন লড়ছে। আইনসভার দলগুলির বিশেষ কাজ না-থাকায় একটা বেশ উদাস-উদাস হাওয়া বইছিল। টিকে থাকার জন্য সরকার ইয়োরোপিয়ান ব্লকের ২৫ জনের ভোটের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। হকশাহেবের লিগ-অবতারের মন্ত্রিসভার সে নির্ভরতা ছিল এতই, যে হকের সেই প্রথম মন্ত্রিসভাকে বলা হত ‘ছোটলাট হার্বার্ট-এর লিগ’—মন্ত্রিসভা। ইয়োরোপিয়ান ব্লকের ২৫ জন ছাড়াও আরো জনা ২৫ ছিল—যারা কেউ-কেউ কখনো-সখনো সরকারকে সমর্থন করত, কেউ-কেউ কখনো-সখনো বিরোধীপক্ষকে সমর্থন করত। আর আদি কংগ্রেসের বা ওয়াকিং কমিটির অ্যাডহক—কংগ্রেসের ছিল ২৫ জন, তাদের ঘোষিত নীতি ছিল দায়িত্ববান সমর্থনের। তাছাড়াও, তাদের আর-কোনো রাজনৈতিক উৎসাহও ছিল না। ওয়ার্কিং কমিটি কোনো ব্যাপারেই বাংলার আহক কংগ্রেসকেও কোনো স্বাধীনতা দিতে রাজি ছিল না।
এই প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা মানুষজনের সমর্থনও পেয়েছিল। এতজন বর্ণহিন্দু থাকায় হিন্দুদের ভয় একটু কমেছিল আর মুসলিম মন্ত্রীদের মধ্যেও অনেকেই ছিলেন বাঙালি মুসলমান ও সমাজে শ্রদ্ধেয়। এই সব কারণে, মন্ত্রিসভা আছে কী নেই—এই নিয়ে উদ্বেগ-উত্তেজনা, হাউসে কে বিরোধী পক্ষে চলে গেল তা নিয়ে খোঁজখবর, নাজিমুদ্দিনের প্রধানমন্ত্রীশোভন কাজকর্ম ও কথাবার্তা, সারওয়ারদিকে নিয়ে নানা গুজব—এইসব রোজকার অশান্তি ছিল না। ছিল না বলেই এই মন্ত্রিসভাকে ব্যঙ্গ করে মুসলিম লিগ ‘শ্যামাহক মন্ত্রিসভা’ বললেও ও হকশাহেবকে খাটো করতে ‘শ্যামাপ্রসাদই সরকার চালাচ্ছেন’, লিগের এই রটনা সত্ত্বেও, এই মন্ত্রিসভা বেশ শান্তিতে ১৫-১৬ মাস কাজ করেছে। তাতে গভর্নর হার্বার্ট-এর সঙ্গে বিবাদে যেতে হয়েছে ও হকশাহেব সেসব বিবাদে বেশিরভাগ সময়ই নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখাতে পেরেছেন। তার ওপর—মুসলিম রাজনীতির একটা জট জটই থাকল বটে কিন্তু তা থেকে তখনো আরো জট তৈরি হয়নি—জিন্না চাইছিলেন বাংলায় দাঁড়াবার জায়গা আর হকশাহেব চাইছিলেন ভারতের রাজনীতিতে দাঁড়াবার জায়গা। তফাৎ ছিল একটা। জিন্নার কাছে রাজনীতিটা টাকা-পয়সা আয়ের উপায় ছিল না। হক-শাহেবের ছিল। কোথাও কিছু ঘটছে না বলে, আলস্যবশত যা কিছু ঘটছে, তা সবই হয় আন্তর্জাতিক নয় আন্তর্জাতীয়। সেখানে বাংলার রাজনীতির কিছু করার ছিল না। এক কমিউনিস্টরা মনে করত যুদ্ধের একটা ফ্রন্ট বাংলাও। তাই মাঝেমধ্যে ছোটখাটো মিছিল করত, পোস্টারও দিত। ‘জাপানকে রুখতে হবে’, ‘পাটের দর বাঁধতে হবে’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই।’ জওহরলাল ছিলেন ভারতে স্বনিযুক্ত কম্যান্ডার—অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ত কম্যান্ডের। কংগ্রেস আর লিগ আলাদা-আলাদা করে, কিন্তু ফলত এক হয়ে, তাদের যুদ্ধসমর্থন শর্তহীন না শর্তাধীন এই একটা বাঁকানো শিকে খোলা তন্দুরের ওপর গেঁথে লিনলিথগ সরকারকে আগুনে ঝলসাচ্ছিল।
হকশাহেবকে কেউই বিশ্বাস করত না, আবার কেউই তাঁর কথা ফেলতে পারত না। সেলস ট্যাক্স বিল সিলেক্ট কমিটি হয়ে আইনসভায় আসার পর সেটা পাস করে দেয়া ছাড়া আইনসভার তো আর-কিছু করার ছিল না। হঠাৎ সরকার পক্ষের কিছু মেম্বার সই করে এক দরখাস্ত দিলেন স্পিকারের কাছে। দরখাস্তের বক্তব্য—সেলস ট্যাক্সের বাবদ নতুন আইনে যে-টাকা আসবে তা প্রদেশের উন্নতিতে খাটাতে হবে, এই শর্ত যদি না মানা হয় তবে তাঁরা দলের হুইপ অনুযায়ী ভোট দেবেন না। মন্ত্রিসভায় এই দরখাস্ত নিয়ে কথা বলার সময় হকশাহেব বললেন, ঠিক আছে, আমি ওদের সঙ্গে কথা বলি, ওরা তাহলে আর আপত্তি করবে না।
যারা সব কাজেরই রহস্যভেদ করতে চায় বা কোনো কাজকেই গোপন-উদ্দেশ্যমুক্ত ভাবতে পারে না, তারা ঠিক খুঁজে-খুঁজে বের করল যে হকশাহেবই ওদের বলেছেন স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে। এ নিয়ে গোলমাল বেঁধে যাবে। তখন তিনি বললে ওরা দরখাস্ত উইড্র করবে। এই গোলমালের ফাঁকে হকশাহেব তাঁর এক আত্মীয়কে রেজিস্ট্রার অব কো-অপারেটিভ সোসাইটিজ পদে নিয়োগ করে ফেলবেন।
আইনসভায় একেবারে প্রায় প্রথম প্রস্তাব উঠল মুলতুবি প্রস্তাব, শরৎ বোসের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে। বিরোধী পক্ষের নেতা নাজিমুদ্দিন বলে উঠলেন, ‘শরৎ বোস জাপানের গুপ্তচর। দেশদ্রোহী। তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য সরকারকে অভিনন্দন।’
যোগেনই একমাত্র বিধিসংক্রান্ত আপত্তি জানাল, ‘এই আইনসভার একজন সদস্যকে, যিনি ছিলেন বিরোধী পক্ষের নেতা, দিন দশেক আগেও ও গভর্নর সাহেব নতুন মন্ত্রিসভা গঠনে অকারণ দেরি না করলে যাকে হয়তো বর্তমান সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী হিশেবে আমরা দেখতাম—তাকে কি দেশদ্রোহী ও গুপ্তচর বলা যায়? বললে কি সেই অনুপস্থিত সদস্যের অধিকার ভঙ্গ হয় না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিশেবে তাঁরই জবাব দেয়ার কথা। সেই জবাব শুনেই স্পিকার এই বিধিসংক্রান্ত আপত্তি মেনে নেবেন বা অগ্রাহ্য করবেন। স্পিকার ডাকলেনও— সরকার পক্ষের কোনো মত আছে?
বঙ্কিম মুখার্জি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আইনসভার সদস্য হয়েও আমি জানি না, আমার দল সরকারে আছে না বিরোধী পক্ষে আছে। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগও নেয়া যায়। এটা নিশ্চয়ই এ-সরকারের অধিকারের মধ্যে পড়ে না যে কোনো রাজনৈতিক বা ট্রেড ইউনিয়ন নেতাকে কোনো কারণ না দেখিয়ে তাঁর স্বাভাবিক বাসস্থান বা কাজের জায়গা থেকে বের করে দেয়া হবে ও তাঁর পুনপ্রবেশ নিষিদ্ধ হবে। মাত্র কিছুদিন আগে সাতজন শ্রমিক নেতাকে কলকাতা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কারের আদেশ দিয়েছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমানের বিরোধী পক্ষের নেতা, একই সঙ্গে খাজা এবং স্যার নাজিমুদ্দিন। সেই সাতজন বহিষ্কৃত শ্রমিক নেতাদের একজন আমি। আরো দু-জন এই সভার মেম্বার। আমরা বহিষ্কার আদেশ স্বেচ্ছায় অমান্য করে এই সভায় এসেছি এইটি পরীক্ষা করতে স্পিকার মহাশয় আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারেন কী না।’
পরে গভর্নর হার্বার্ট ও হকশাহেব মধ্যে ইংরেজিতে কথা হচ্ছিল—আপনি কি কাকের এই অভ্যাসের কথা জানেন?
হকশাহেব—আপনি কোন কাকের কোন স্বভাবের কথা বলছেন সেটা না জানলে কী করে বলব। বিলাতের কাক তো দেড়-দুই হাত লম্বা। আমাদের দেশের কাক তো ফাজিল কাক। বিলাতি কাকের পক্ষে ইচ্ছে করলেও ফাজিল কাকের তৎপরতা ও ছোঁচাবৃত্তি আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। কাক নিয়ে বোধহয় সব দেশেই অনেক গল্প আছে।
গভর্নর-আপনার প্রস্তুত জবাব শুনে মনে হয়, এ প্রশ্নটা আপনার প্রত্যাশিত ছিল। হকশাহেব—এটা আমার নিয়তি। আমি যথেষ্ট অপ্রস্তুত হলেও সেটা আমাকে দেখে বোঝা যায় না। তাতে ক্ষতি যা হওয়ার আমারই হয়।
গভর্নর—আমি জানতে চাইছিলাম—শরৎ বোসের গ্রেপ্তার নিয়ে ও মুক্তি দাবি করে যে-মুলতুবি প্রস্তাব আইনসভায় উঠল তাতে আপনি কোনো মন্তব্য করেননি। আপনি তো প্রধানমন্ত্রী। এ-রকম একটা গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিকভাবে কী মনে করেন সেটা পরিষ্কার করে জানানো আপনার কর্তব্য, জানা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু আইনসভায় আপনার নীরবতার অর্থ নানারকম হতে পারে। আপনি যেন ইঙ্গিত দিলেন এই গ্রেপ্তারে আপনার ভূমিকা ছিল। তাতে যাঁরা শরৎ বোসকে সন্দেহ করেন, তাঁরা খুশি হবেন। আবার, আপনি এমন ইঙ্গিতও দিলেন যে আপনি শরৎ বোসকে দেশদ্রোহী ও গুপ্তচর মনে করেন না। তাতে তাঁরা খুশি হবেন যাঁরা শরৎ বোসকে বিশ্বাস করেন।
হকশাহেব—যার কোনো আক্কেল আছে সে তো তারিখ মিলিয়ে দেখবে যে মিস্টার বোসের গ্রেপ্তারের দিন ও সময় আমি কোনোভাবেই ক্ষমতায় ছিলাম না। সুতরাং আমি কোনোভাবেই এ-ব্যাপারে জড়িত থাকতে পারি না। যাদের এটুকু আক্কেল নেই, তাদের এসব কথার দাম কী?
গভর্নর—ভারত রক্ষা আইনে ভাইসরয়ের নির্দেশে যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা নিয়ে আইনসভায় আলোচনা ঠিক নয়।
হকশাহেব—সেটা তো স্পিকারের ব্যাপার। ট্রেজারি থেকে তো কিছু বলা হয় নি। আপনার মন্তব্য কি আমি আইনসভাকে জানাব?
কিন্তু এ তো অবতার পর্বের ঘটনা না। বরাবরই তো এ-রকম।
১৯৪০-এর ২ জুলাই সুভাষ বোস গ্রেপ্তার হলেন। সে-গ্রেপ্তারে নাজিমুদ্দিন এমন লাফঝাঁপ করল যে মনে হল সিরাজদৌল্লা নাটকে মহম্মদি বেগের পার্ট করছে। হকশাহেব চাইছিলেন না। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আইন-লঙ্ঘনকে তো স্বীকার করা যায় না। তা ছাড়া সুভাষের গ্রেপ্তার চাইছিলেন ভাইসরয় স্বয়ং। মানে, ওয়ার-ক্যাবিনেট।
সুভাষ গ্রেপ্তারের কয়েকদিন পর থেকেই, সুভাষ যখন জেলেই, আর কংগ্রেস যখন তাদের বের করেই দিয়েছে আর শরৎ বোস বম্বে গিয়ে গান্ধীজিকে যখন দয়া পরবশ হতে রাজি করাতে পারেনি—তাহলে দুই ভাইয়ের একজনকে মন্ত্রিসভায় আনা হচ্ছে না কেন—এরকম প্রশ্ন হকশাহেব করছেন কিরণশঙ্করকে, কিরণশঙ্কর করছেন সামসুদ্দিনকে, সামসুদ্দিন করছেন হকশাহেবকে। হকশাহেব আর কাকে জিগগেস করবেন, তাই জেলে গিয়ে সুভাষকেই প্রশ্ন করেন, ‘তুমি যদি কংগ্রেসেরই বাহিরে থাইকল্যা তালি জেলে পচো ক্যা? বরং মন্ত্রিসভায় আইস্যা আসন ন্যাও’। সুভাষ রাজি হয়ে বুদ্ধিও দিয়েছে, মাধ্যমিক শিক্ষা সংক্রান্ত বিলটা পাস করিয়ে নেয়ার আগে যেন তাকে ছাড়া না-হয়। কর্পোরেশনে সুভাষপন্থীরা লিগের লোকজনকে কোনো কাজ করতে দিচ্ছে না। খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে ছোট ইস্পাহানি সুভাষকে ছাড়তে বলেন। তাহলে সে তার দলবল সামলাবে নিজেরই স্বার্থে। নাজিমুদ্দিন ছোট-ইস্পাহানিকে ভাগিয়ে দেন। ছোট-ইস্পাহানি তখন এই একই কথা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হকশাহেবের সঙ্গে দেখা করেন। হকশাহেব তাকে বলেন, ‘এটা খুব ভাল বুদ্ধি, উকিলগ সঙ্গে কথা কইয়্যা আইনের ফাঁক গুইল্যা জাইন্যা আমারে কও। আমি জেলে যাইয়্যা সুভাষরে রাজি করাইব। আইনরক্ষার জন্য কিছু তো শর্তমর্ত দিতেই হব। নাহলে তো আর গভর্নমেন্ট হয় না।’
ঐ ৪০ সালেই কালীগঞ্জ মসজিদে গুলি চলল। হকশাহেবের ওপর খাজা ছড়ি ঘোরাতে গেল।
কালীগঞ্জ তো মুর্শিদাবাদে।
মুর্শিদাবাদে তো আওয়াজ অনুযায়ী মশজিদ। থানার সীমানাও মশজিদের আজান যদ্দূর শোনা যায়, তাই দিয়ে মাপা হয়। কালীগঞ্জ সে-রকমই একটা থানা বা মশজিদ বা গ্রাম। যুদ্ধ যদি বেঁধে থাকে মাস পাঁচ আগে, তাহলে ৪০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই কালীগঞ্জে পুলিশ গুলি চালায় আর তার পরে, পুলিশ-আইন মোতাবেক জিলা-ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করে রায় দেন—পুলিশ ঠিকই করেছে। এই জিলা-ম্যাজিস্ট্রেট মুসলমান। একই নিয়ম-মোতাবেক কমিশনারও একটা তদন্ত করেন ও জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের রায় বহাল রাখেন। ব্যাপারটা মিটেই গেল। তার বেশ অনেকদিন পর, নাজিমুদ্দিন ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। তিনি ইনস্পেকটর জেনারেল অব পুলিশকে বলেন, তিনি যেন কোনো এক ডিআইজি (সিআইডি)-কে দিয়ে আর-একটা তদন্ত করান শুধু এইটুকু গোপন কথা জানতে যে এই ঘটনার সময় অকুস্থলে যে একজন হিন্দু এসডিও আর দু-জন হিন্দু পুলিশ অফিসার ছিলেন, তাঁরা এই ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কী না। সেই গোপন তদন্তের রিপোর্ট পেয়ে নাজিমুদ্দিন ওই হিন্দু এসডিও আর দুই হিন্দু পুলিশ অফিসারদের চার্জশিট করেন যে ঘটনার আগেই তাঁরা মুসলিমবিরোধী উশকানি দিয়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ করে ফেলেন। আর-একটি ঘটনা ঠিক এর উলটো। হিন্দুদের একটা মিছিল থামাতে হল। মুসলমানদের একটা দলের আক্রমণ থেকে তাদের বাঁচাতে। তাতে মিছিলের হিন্দুরা চটে যায় ও পুলিশকে পালটা আক্রমণ করে। বেশ কিছু জখম হওয়ার পর হিন্দু মিছিলটার ওপর গুলি চালানো ছাড়া পুলিশের কোনো উপায় ছিল না। হিন্দুদের মত রক্ত গরম করা লেখা আর কে লিখবে। কলকাতার হিন্দু কাগজগুলো খেপে উঠে আওয়াজ ছড়াল—গুলিচালনার বিশেষ ট্রাইবুন্যাল তদন্ত করা হোক। হিন্দুদের উকিল-ব্যারিস্টার বেশি আর হিন্দুদের তোলা কোনো দাবির বিরোধিতা করার মত মনের জোর কোনো হিন্দুনেতার ছিল না। খুব বেশি হলে কমিউনিস্টরা বা ওয়ার্কার্স পার্টিরা মুসলমানদের কোনো স্থানীয় দাবিকে সমর্থন দিয়ে দিত।
মুসলিম লিগ বিরোধী পক্ষ হওয়ার পর তারা ফজলুল হক-শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রিসভাকে সহ্য করতে পারছে না। তারা একটা উদ্ভট বুদ্ধি বা কৌশল বের করেছে। কলকাতার বাইরে সব জায়গায় হকশাহেবের নামে সত্য-মিথ্যা নানা কথা রটাবে যাতে সাধারণ মুসলমানদের মনে হকশাহেবকে নিয়ে আর-কোনো মোহ না থাকে। কিন্তু আইনসভায় তারা ব্রিটিশবিরোধী নানারকম প্রস্তাব তুলে হিন্দুদের সমর্থন আদায় করবে। হিন্দু মানেই স্বদেশী আর মুসলমান মানেই হকশাহেব—এমন একটা ধারণা তো চালু আছে। সেই ধারণার ফলে হিন্দুদের কোনো পার্টি বা কোনো হিন্দুর পক্ষে ইংরেজের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব সমর্থন না-করা সম্ভব নয়। সে-প্রস্তাবে গোপন বা প্রকাশ্য মুসলিম নিন্দা না থাকলেও। সব প্যাঁচপয়জারির ব্যাপার। কংগ্রেসে হিন্দুরা হিন্দু মারল—গান্ধীরা সুভাষদের। আর লিগে মুসলিমরা মুসলিম মারল—জিন্নারা হকশাহেবদের। দমকলে কাজ করতে লোক আসছে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। কলকাতায় বোমা পড়তে শুরু করলে বাড়িঘর পুড়বে যেন বুড়ির ঘর পুড়ছে। আর এখানকার দমকলের আছে বলতে আছে এক দমকলের ঘণ্টা। ১০টা ট্রেইলার পাম্পও নেই। সাউথ আফ্রিকা থেকে আগুন নেবাবার লোকজন আসা পর্যন্ত যে-করেই হোক আগুন জ্বলন্ত রাখতে হবে।
সেই কারণে হিন্দুরা মুসলমান মারার সময় পাচ্ছে না। বা মুসলমানরা হিন্দুমারার সুযোগ পাচ্ছে না। হকশাহেবের মনে কখনোই ‘পারলাম না’—কথাটি আসে না। যেন, পারা না-পারাটা হকশাহেবের কোনো ব্যাপারই নয়। আজকাল, তাঁর মনে হতে শুরু করছে—যার যা মতলব বলে মনে হচ্ছে—তার বাইরেও বেশ কিছু মতলব উড়ে বেড়ায়।
রাজারা কী চান? চান সোনার পাথর বাটি। মানে, কলকাতা চলবে কলকাতারই মত। সীমান্ত থেকে যদি যুদ্ধ আসে, তাহলে তখন হবে যুদ্ধের মত। এটা যদি কারো মাথায় থাকে তাহলে কি সে আর যুদ্ধ ঠেকাতে পারে? তাহলে কি রাজারা কলকাতা ছেড়ে যেতে চাইছে? লাটশাহেব দিনের মধ্যে বায়াত্তর বার হকশায়েবকে জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছেন—কলকাতা থেকে বেদরকারি লোকদের সরানোর কী হল?
হকশাহেব তার কী করবেন?
তিন-চারটি প্রদেশ একই জিওসির অধীনে। আবার, অন্যদিকে, প্রত্যেক প্রদেশেরই নিজের-নিজের গবর্মেন্ট আছে। তাহলে এই চারটি প্রদেশের চার রকম মত মেলাবে কে?
এখনো নাকী ফয়শালাই হয়নি—আসামকে ইস্টার্ন কম্যান্ডের বাইরে নেয়া হবে কী হবে না। তাহলে, ধরো প্রাইম মিনিস্টারকে?
সাইগন থেকে ‘ফ্রি ইনডিয়া রেডিও’ নাকী রোজ প্রচার করছে, ‘হু ডাজ নট লাইক টু বি ফ্রি? ফ্রি ইনডিয়া।’ লাটশাহেব বলেছেন, প্রধান মন্ত্রীকে ব্যবস্থা করতে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সেক্রেটারির ওপর খেপে গিয়ে বললেন, আমি কি আপনাদের শত্রুপক্ষ? আমি তাহলে কী করে জানব কে কেন কী চায়? সেক্রেটারি চেয়ারে হেলে নোটটা পড়ে বলেন, ‘স্যার, আপনি যা বলছেন, তা না। এইচ-ই বলতে চেয়েছেন এই সাইগনি প্রচারটাকে কাজে লাগিয়ে পালটা প্রচারে নামতে। এ-রকম বলতে—’ভারতের স্বাধীনতা চাই। এ-কথা কারা বলে? দেশের শত্রুরা।’
হকশাহেব হেসে বলেন, ‘এইচ-ইকে বুঝান, সব ইংরাজির কাউন্টার হয় না। উল্টা শুনায়—’দেশের স্বাধীনতা কারা চায়? দেশের শত্রুরা। এই প্রপাগাণ্ডা হইলে আর দেইখতে হব না।’
একদিকে লাটশাহেবের কাউন্টার-প্রোপ্যাগাণ্ডা-বাংলাকথার অর্থ হয় কথার অর্থ দিয়ে না, কথা-বলার স্বরে, সেটা যে হকশাহেবের মত জানে না, সে ক্যামব্রিজের বি.এ আর সংস্কৃতের মহামহোপাধ্যায় হলেও কি বুঝতে পারত প্রোপাগাণ্ডার কাউন্টার কেমন রি-কাউন্টার হয়।
হকশাহেব খুব আরামে নেই। তাঁর ভাল লাগছে না। কী তাঁর কাজ তাই জানেন না। সারওয়ারদি আর খাজারা সারা বাংলার কোনো মজাপুকুরের কাদা আর বাকি রাখেনি। তাঁকে রাতদিন এমন দশমাটা করছে যে হকশাহেব নিজেকেই চিনতে পারছেন না। শের-ই-বাংলা এখন শিয়াল-ই-বাংলা। ওদের লক্ষ হকশাহেবের নাম মুসলমানদের মন থেকে মুছে ফেলা। হিন্দুদের মন থেকেও মুছে ফেলা।
আর, চারদিকে যেন ঘিরে ধরেছে আরশোলা, টিকটিকি, কেন্নো, উকুন, কৃমি। এগুলো সব রাতের অন্ধকারের পোকামাকড়। এদের গলায় কোনো আওয়াজ নেই, শুধু আছে হাজার-হাজার শুঁড় আর পা। প্রভুর মনের ইচ্ছে প্রভুর মনে আসার আগেই এরা পূর্ণ করে দেয়। বাঙালি নবাব-জমিদারদের সেবায়েত বংশেই এরা বেশি থাকে। শাহেব-কোম্পানিতেও এমন বড়বাবু লাগে। কর্তার আদেশ পালন-এদের বাঁচার একমাত্র ও অদ্বিতীয় অবলম্বন। সে আদেশ-পালন এমন শারীরিক বাধ্যতা কর্তা আদেশ উচ্চারণের আগেই কর্তার ইচ্ছে এদের জানা হয়ে যায়। কর্তার সঙ্গে তাদের জৈবপ্রক্রিয়া এমনই এক যে এরা নিজের শরীরের ভিতর থেকে নির্ভুল ইশারা পায় কর্তার এখন ইচ্ছেটা কী? তৎক্ষণাৎ তারা সেই ইচ্ছা মেটাতে লেগে যায়। এমন ইচ্ছেও তো হতে পারে যেটা কর্তা নিজের কাজেও মানতে চান না। তেমন ঘটনায় এরা হয়তো কয়েকদিনের জন্য নিজেকে আড়ালে রাখে। এমন আনুগত্য যে নিজের ভালমন্দ বা সামাজিক ভালমন্দের কোনো নীতি এদের ওপর কাজ করে না। এমন কী ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থবোধও কাজ করে না। তখনও তো জাতিশুদ্ধির দরকাবে হিটলারের ইহুদিনিধনের কোনো কথা—জার্মানির লোকরাও জানে না। অথচ একই সময়ে ইংরেজের অধীনস্থ বাংলা প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী শিউরে শিউরে উঠছিলেন—ব্যক্তিহীন আনুগত্যের ভয়ঙ্কর শীতে।
রেঙ্গুন থেকে টেলিগ্রাম এসেছে, দুই জাহাজ উদ্বাস্তু আসছে। মিলিটারি জানতে চেয়েছে, জাহাজদুটো কোন ঘাটে ভিড়বে। বাবু এসে নোটশিট ফেলে দিল হকশাহেবের সামনে—সইয়ের জন্য। একটা প্রিন্সেপ ঘাটে, আর-একটা ব্যান্ডেলের ঘাটে।
‘ক্যা? আইসতেছে ইভ্যাকুয়ি। মিয়া নামব প্রিন্সেপে আর বিবি নামব ব্যান্ডেলে? কেউ কাউরে খুঁইজ্যা না পাইলে তুমি গিয়া কাজি হইব্যা? রহস্যডা কী, খুইল্যা কও।’
‘না স্যার, একটাতে তো শুধু শাহেবরা, তাই সেটাকে প্রিন্সেপে দিয়েছি। সে-রকমই চায় মিলিটারি।’
‘মিলিটারি চাউক না-চাউক, তুমি অন্তত তাই চাও? শাহেবগ আর কালা আদমিগ একঘাটে নামান যায়? মহাভারত অশুদ্ধ হইয়্যা যাবে না? শোনো বাবা, এই যুদ্ধে ইংরাজপক্ষ জিতুক এডা বুঝি তোমার থিক্যা আমি বেশিই চাই। তার সঙ্গে এইডা চাই না—বাংলাডা ভাইস্যা যাক আর বাঙালি জাইতডা মইর্যা যাক। নিজেগ এত মাইরো না বাবু। কবরে চিরাগ দিতেও তো দুই-একজনরে বাঁচাইয়্যা রাখা দরকার।’
