১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৭৫. বায়ুযুদ্ধ

১৭৫. বায়ুযুদ্ধ 

১৯৪৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ছিল শনিবার। রেসের দিন। মধ্য কলকাতা থেকেই ট্র্যাফিক দক্ষিণমুখী। যুদ্ধের জন্য ক-দিন বন্ধ ছিল রেস খেলা? যে-বার্মিজ সৈন্যদের প্রতি সহানুভূতিতে রেসখেলা কবে যেন বন্ধ হয়েছিল, তাদেরই চাহিদায় রেসখেলা আবার শুরু হল। সপ্তাহের শেষে একদিন শাহেবসুবো ও বাবুরা মিলে একটু মহোচ্ছব না করলে কি শরীরের আড় ভাঙে? 

ইতিমধ্যে কলকাতার লোকজনের, মানে, যারা কলকাতাতে থেকেই গেছে, তাদের, সামান্য হলেও কিছু যুদ্ধ-অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। ব্ল্যাক-আউট, রেশনের চাল, ফুড কনট্রোল, কিউ, এ-আর-পি, সাইরেন, আন্ডার গ্রাউন্ড সেলটার, অল ক্লিয়ার, প্লেনের আওয়াজগুলোও, চেনা হয়ে গেছে। এমন একটা হিশেবও কারা বাজারে ছেড়েছে যে শুক্লপক্ষের শনিবার যদি ত্রয়োদশী থাকে, তা হলে জাপানী বোমারু আসবেই। ওই রাত নটা-দশটা পর্যন্ত। বোমা কি পাঁজি দেখে ফেলা হয়? এও রটেছে, দু-এক দিন নাকী মিলেও ছিল। ফলে এখন, উত্তর কলকাতার কোনো-কোনো পাড়ায় স্যাটারডে পিকনিক নিয়মিত হয়ে আসছে। আর, তার প্রস্তুতি চলে সকাল থেকেই। সন্ধ্যা নাগাদ কলেজ স্ট্রিটের মোড় থেকে শ্যামবাজারে ঘোষ কাজিনের মোড় পর্যন্ত খিচুড়ি ও মাংসের গন্ধে বাতাস বেশ ভারী থাকে। 

লোকজন কলকাতায় এত কমে গেছে যে রাস্তাঘাট ফাঁকা ঠেকে। ভিড় বেড়েছে সৈন্যদের আর বেশ্যাদের। তা নিয়ে নানা গল্পগুজবও আছে। বার্মাপতনের পর ওখানকার পেশাদারি মেয়েরাও নাকী কলকাতায় এসেছে। বাংলা কাগজে সে-সব নিয়ে নানারকম আদিরসের নীতিকথাও লেখা হচ্ছে। মিলিটারি খদ্দের পাকড়াতে এ-পাড়া ও-পাড়ার মেয়েদের মারামারিও হত। চাঁদনির উলটোদিকে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের স্কার্টপরা মেয়েরা নাকী একদিন ব্ল্যাক-আউটের আগেই এতদূর বিডন পার্কে মিলিটারি ধরতে এসেছিল। বিডন রোডের মেয়েরা ছাতি লাঠি ঝাঁটা হাতে তাদের ধাওয়া করে। ওয়ার্ডের হোমগার্ডের লিডার পার্কের শেডে রাখা বেঞ্চে লুকিয়ে শুয়ে দীর্ঘ দিবানিদ্রা দিচ্ছিল, হাফপ্যান্টের ফুল পকেটে হুইসল নিয়ে। সবাই ধরেই নিয়েছিল—একই কাণ্ড, ঘটছে। টমিদের কোনো দল এসে মেয়েদের কিছু করে ফেলেছে ও মেয়েগুলো কিছু গোলমাল পাকিয়েছে। তাই, সাইরেন বাজিয়ে দিলেই দশদিক ঠান্ডা হয়ে যাবে। সাইরেনের চাবি যার কাছে, তাকে ডাকতে-ডাকতেই আকাশে সত্যি-সত্যি জাপানী প্লেন, বেঁটে, ছোট, আর ফস্ গোঁত্তায় মনে হয়, বোধহয় ভেঙে পড়ছে। এ তো আর ফ্রি স্কুল স্ট্রিট আর প্যারাবাগানের মেয়েদের ব্যাপার না, এ যে সত্যি-সত্যি জাপানি বোমারু, ‘এই মোতে রে–এ, মোতে-এ।’ 

মোতের ঘুম কীসে ভেঙেছিল সেটা আর-কেউ জানার টাইমই পায়নি। কিন্তু ঘুম তার ভেঙেছিল। সে চোখ খোলেনি। তার পরই জাপানি প্লেনের ফিরতি গোঁত্তা যেন পাইলিঙের হ্যামারের মত এসে পড়ে মোতের মাথায়। এ তো মিলে যাচ্ছে গ, শনিবারের বারবেলা। আজ তো হপ্তাবাবুদের মাগ মারতে আসারই কথা। 

কিন্তু মোতের স্বভাব চড়ুই পাখির মত ফুড়ুৎ-ফুড়ুৎ নয়। কোনো একটা আওয়াজ পেলেই ওর বসার বা শোয়ার জায়গা থেকে পালাবে এমন নয়। টিকটিকি যেমন নিঃশব্দে খাড়া দেয়ালে লেপটে যায়, মোতেও সে-রকম আওয়াজের রকম না বুঝে লেজটা পর্যন্ত নাড়ায় না। যে-মুহূর্তে সে বোঝে, সে একটা পালাবার ফাঁক পেয়েছে, সেই মুহূর্তে, সেদিনও সে পার্কের হেলানিটা গড়িয়ে শুয়ে-শুয়ে মাটিতে পড়ে গেল আর তারপর উটকো বসে ব্যাঙের মত লাফে, যে-গাছটার ছায়ায় সে এমন গভীর সময় পর্যন্ত ঘুমিয়েই ছিল, তার গোড়ার শিকড়গুলির ওপর বসে, দাঁড়িয়ে, হেঁটে বাঁ দিকের কোণে গিয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মোতে ও সময় লাগে বলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে পিচ কেটে থুতু ফেলে, প্যান্টের বোতাম লাগাতে-লাগাতে নিজের ই ভেজানো রেলিং গেট টপকে গলিতে পড়ে। 

মোতেও লাফিয়ে রাস্তায় পড়েছে আর আর-এ-এফ-এর পালটা আক্রমণের আওয়াজ বর্শার মতো হাওড়া ব্রিজের ওপর থেকে জাপানী প্লেনকে তাড়া করে। 

আরে, এয়ার ফাইটিং কখন শুরু হল? তার ঘুমের মধ্যে? এমন ঘুমিয়েছে সে? 

এয়ার ফোর্সের প্লেনগুলির সমবেত আওয়াজে প্যারাবাগানের, মানে এ-পাড়ার মেয়েরা, ‘ওরে, মা-রে, বাবা-রে’ বলে বস্তির দিকে ছুটতে লাগল। মুহূর্তে মোতে এক লাফে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে তাদের ধমকে ওঠে, ‘এ–ই, দৌড়চ্ছ কোথায়, দাঁড়াও’, মেয়েদের মধ্যে হাঁফাতে-হাঁফাতে কেউ বলে, ‘সাইরেন বাজায় নিকো, এ-সব বেপাড়ার আবাগিগুলোর কাজ।’

মোতে জোরে ধমকে ওঠে, ‘শেলটারে ঢোকো, শেলটারে, শেলটারে। নো রান, নোরান। স্নো স্লো। 

শেলটার মানে উল্টোদিকের দেশী ভাটিখানার বাজারমুখো তিন সিঁড়ি নিচু অন্ধকারটা। যারা খুচরো খায় মাটির ভাঁড়ে তাদের বসা ও গড়ানোর জায়গা। এয়ার-রেইডের সময় শেলটার।

শেলটারে একসঙ্গে এতজন ঢোকায় যিনি বলে উঠলেন, ‘মোতে, এই সময় এদের নিয়ে তুমি ওপেন স্পেস দিয়ে মুভ করলে?’ 

‘মুভ না করে কি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বোমা খাব?’ 

‘সাইরেন বাজাওনি কেন?’ 

বাইরে দুই ধরণের প্লেনের আওয়াজের তীব্রতায় এদের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কে একজন হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে বলে, ‘আরে, এয়ার ফাইটিং হচ্ছে—।’ 

‘অ্যাঁ? এয়ার ফাইটিং? তুই দেখলি? এ না দেখলে জীবনবৃথা—’, মোতে হামাগুড়ি মেরে বেরিয়ে যায়। বাইরে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে কিছু দেখা যাচ্ছে না। মোতে এবার গুঁড়ি মেরে আর-একটু আগে সে যে-পার্কটাতে শুয়েছিল, তার সামনের ফাঁকা রাস্তাটার ওপরের আকাশটায় দেখে, একটা জাপানী প্লেন ধোঁয়ায় আকাশটা কাল করে গঙ্গার দিক থেকে দমদমের দিকে উড়ে গেল—কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই কাল ধোঁয়ার তলা দিয়ে এয়ার ফোর্সের একটা প্লেন যেন ছাতগুলোর ওপর দিয়ে আগের প্লেনটাকে ধাওয়া করল। উল্টে দমদমের আকাশ থেকেও একটা এয়ার ফোর্সের প্লেন সেই কাল ধোঁয়ার পাঁজার ওপর দিয়ে গঙ্গার দিকে চলে গেল। আর-কিছু ঘটছে না। চারদিকে কোনো আওয়াজ নেই। একেবারে এত চুপ যে কানে তালা লাগে। 

মোতে ঘুরে শেল্টারের দিকে ঘুরতে-ঘুরতে ভাবল—তার চাকরিটা আজকেই যাবে। পকেটে সাইরেনের চাবি নিয়ে সে পার্কের বেঞ্চে এমন ঘুমুচ্ছিল যে এয়ার ফাইটের আওয়াজেও তার ঘুম ভাঙল না? এখন কি সে সাইরেনে গিয়ে অল ক্লিয়ার দেয়ার জন্য অপেক্ষা করবে? 

আর-একটা উপায় আছে। 

সে পকেট থেকে চাবিটা ফেলে দিয়ে বলতে পারে যে তার কাছে চাবি ছিলই না।

তা হলে, কার কাছে ছিল? 

সে তা জানবে কী করে? 

বাঃ! চাবি তো থাকতে পারে এক তোমার কাছে আর ইমানুলের কাছে। 

মোতে বুঝতে পারে, তার ওজরটা বিশ্বাস্য হচ্ছে না। চাকরিটা তার যাবেই। কিন্তু যে-ফাইটিং দেখল, তাতে তার জন্ম সার্থক। যুদ্ধ…যুদ্ধ…যুদ্ধ। দেখে তো কিছু শাহেব সোলজারের মুখ আর পাঞ্জাবি শিখের মুখ। এতদিনে তাও একটু যুদ্ধ দেখা গেল। 

মোতে আর শেলটারে ঢোকে না—গুঁড়ি মেরে সাইরেন-ঘরের দিকে যায়। তার চাকরি-রাখাটা কঠিন। কিন্তু অল ক্লিয়ার না-দেয়াটা অসম্ভব। সে তখন না-হয় ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু জেগে থেকেও অল ক্লিয়ার না-দেয়াটা আরো বড় অপরাধ। 

মোতে শুনতে পায়, অন্য কোথাও অল ক্লিয়ার বাজছে। 

সে তালা খুলে সাইরেনের ঘরে ঢুকে দেখে—তারও অল ক্লিয়ারের নির্দেশ এসে গেছে। মোতের বাজানো অল ক্লিয়ারটা এই প্রথম তার কাছে অল ক্লিয়ারই শোনাল। সে তো এয়ার ফাইট দেখে এসে বাজাল! যেন ফাইটটা করে এসে সবাইকে জানাল–অ-ল-ক্লি-য়া-র। 

কিন্তু এয়ার ফাইটটা কলকাতার আকাশে এমন বিরল ঘটনা, যে এমন গোলমাল শুরু হল কেউ জিগগেসই করল না—সাইরেন বাজেনি কেন? সাইরেন যে বাজেনি সেটা কেউ বুঝতেই পারেনি। প্লেনগুলোই তো সাইরেন বাজিয়েছে। প্লেনের ওই আওয়াজের পর কি কেউ শেলটার থেকে বেরত, অল ক্লিয়ার না পেলে। 

মোতের চাকরিটা বেঁচে গেল কী না সে সম্পর্কে নিশ্চিত না-হয়েই সে এয়ার ফাইটটা যা দেখেছে তার গল্প করতে লাগল—’আরে, দেখি প্যারিবাগানের মেয়েগুলো সব ফাঁকা রাস্তা দিয়ে দৌড়চ্ছে—হাতে লাঠি-ঝাঁটা। চলাফেরা করলেই তো পাইলট বুঝতে পারবে এটা টারগেট। আমি ওদের ঠেলে ভাটিখানার শেলটারে ঢুকিয়ে দিয়ে গুঁড়ি মেরে বাইরে গিয়ে দেখি একটা জাপানী প্লেন ঘন কাল মেঘ বানাতে-বানাতে ছুটছে—’ 

একজন বলে ওঠে, ‘আমি তো আগে দেখে শেলটারে গিয়ে বললাম, না হলে তুই দেখতে পেতি?’ 

রেসের মাঠে প্লেনের ওই আওয়াজে ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে ছুটে গিয়ে ওই সবুজ মাঠের মধ্যে এলোমেলো দৌড়ে পালাতে চাইছিল, কোনো-কোনো ঘোড়া পেছনের দুই পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে হ্রেষারব তোলে। যাদের হাত থেকে ঘোড়াগুলো আচমকা ছুটে বেরিয়ে গেছে, সেই অ্যাটেনডেন্টরা নিজেদের ঘোড়াগুলোকে ফিরিয়ে আনতে ছুটে মাঠে ঢুকতে গেলেই মাইক্রোফোনে ধমকে ওঠেন মিলিটারির এক খুব বড় অফিসার—পরের দিন কোনো কাগজ লিখেছে জি ও সি ইন সি, কেউ লিখেছে মেজর জেনারেল, কেউ লিখেছে ব্রিগেডিয়ার ওসমান, কেউ লিখেছে হাউসম্যান—’এড্‌রিওয়ান অন নীজ, হেডস ডাউন, নো মুভমেন্ট।’ মাঠে অনেক ফৌজি ছিল। সাইরেন বাজতেই তারা যে যেখানে ছিল সেখানেই হাঁটু গেড়ে বসে বুকের ওপর মাথা নামিয়ে আনে। তাদের দেখাদেখি আরো যারা ছিল, তারাও একই রকম বসে পড়ে। আকাশ, নীল আকাশ থেকে বিদ্যুতের মত তীব্রতায় প্লেনগুলি থেকে শিসধ্বনি আকাশ-মাটির শূন্যতা চিরে নেমে আসছিল, মিলিয়ে যাচ্ছিল, ফিরে আসছিল। হঠাৎ তৈরি হওয়া এক ঘন কাল মেঘের ছায়া বাঁ-দিকের গঙ্গা থেকে ডান-দিকের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়্যালের ওপর পর্যন্ত গড়িয়ে যাচ্ছিল রেসের মাঠের সবুজ জুড়ে ও ছাড়িয়ে। সেই ছায়া রোদে বাদামি, শাদা আর কালরঙের গতিময় বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে সেই ঘোড়াগুলো পরিত্রাণ চেয়ে ছুটছিল। কখনো এক-একটা গুচ্ছের দিকে—যেন গুচ্ছতেই পরিত্রাণ, কখনো এমন গুচ্ছ থেকে নিজেদের ছিঁড়ে নিচ্ছিল—যেন একা-একাই বাঁচা যাবে। কয়েকটি গোড়া ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের দিক থেকে হঠাৎ ঘাড় সোজা করে সোজা তাকিয়ে হয়তো ট্র্যাকগুলি ও উইনিং পোস্টগুলো চিনে ফেলে ও সেই দিকেই ছুটতে থাকে। কিন্তু ভয় তাদের এতই অস্থির করে তুলছিল যে ট্র্যাক চিনেও, পোস্ট চিনেও তারা মনে রাখতে পারছিল না আর ট্র্যাকের মাঝখানে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ছিল, বা ঘাসে মুখ দিয়ে ফেলছিল, বা বাঁয়ের বেড়াটায় গিয়ে দুই পা উঁচু করে তুলছিল। তিন দিকের নানা লেভেলে সারি দিয়ে মানুষের মাথাগুলি দেখে মিরাকলে বিশ্বাসীদের প্রার্থনা মনে হচ্ছিল অথবা তারা শুধুই মৃত্যুবিশ্বাসী ও তারা মৃত্যুপ্রস্তুত। সেখানে, সেই গড়ানো আকাশে-প্রান্তরে কয়েকটি ছুটন্ত প্রাণী ও ছুটন্ত বিমান এই নির্মোহ বাস্তবকে সত্য করছিল—এটা যুদ্ধ আর যুদ্ধই, আর যুদ্ধে একমাত্র প্রাসঙ্গিক বিষয় মৃত্যু। আর কিছু নয়। হয় হত্যা করা, না-হয় নিহত হওয়া। এই দুয়ের মধ্যে কোনো উপমা নেই, কোনো সাধর্ম্য নেই। 

১৫ জানুয়ারি, ১৯৪৪, শনিবার কলকাতার আকাশে এই বায়ুযুদ্ধ দেখে তখন বাংলার গভর্নর রাদারফোর্ড তখন ভারতের ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলের কাছে, ১৮ তারিখে এক চিঠিতে লেখেন, মাত্র দু-দিন আগে ‘রয়্যাল এয়ার ফোর্স একগাদা শত্রুবিমানকে যেভাবে তাড়া করল, যেভাবে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়ল ও তাদের ধ্বংস করল—সেটা সত্যিই একটা বেশ সুন্দর কাজ’ (এ ফাইন পিস অব ওয়ার্ক)। 

১৯৪৪-এর জানুয়ারির ১৫। যুদ্ধ বদলে গেছে। ইয়োরোপের পূর্ব রণাঙ্গনে জার্মানি পারেনি সোভিয়েত ইউনিয়নের স্তালিনগ্রাদের অবরোধ ভাঙতে। জার্মানরা একটু পেছিয়ে এসে আবার একটা আক্রমণের উদ্দেশ্যে সৈন্যবাহিনীকে বদলে সাজাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নও, সেনাবাহিনীকে গুছিয়ে নিচ্ছে জার্মানদের এবার আক্রমণ করে আরো পেছিয়ে দিতে। এর আগে, সাত মাস আগে উত্তর আফ্রিকায় তিউনিসিয়ার যুদ্ধে জার্মানির সেনাপতি রোমেল হারলেন। মধ্য ইয়োরোপে অবস্থানের সুযোগে হিটলার যে এতগুলো ফ্রন্টে- যুদ্ধ শুরু করেছিলেন—আতলান্তিক মহাসাগরে, ইংল্যান্ডে, উত্তর আফ্রিকায়,–যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে তার চমৎকারিত্ব অনস্বীকার্য, আজও। মধ্য ইয়োরোপের দেশগুলি তো হিটলারের বাহিনী তাদের মাটিতে পা-রাখার আগেই আত্মসমর্পণ করেছিল। যুদ্ধের সবচেয়ে অদৃশ্য শক্তি হিউম্যান ফ্যাক্টর—জনউপাদান, তখন জার্মানির পক্ষে। অবিশ্বাস্য দ্রুততায়, অনভ্যস্ত কৌশলে, জনউপাদানকে অবলম্বন করে খুব কম দিনে যুদ্ধ শেষ করে দেয়ার কৌশল, ১৯৩৯-এ, ১৯৪১-এ, খুবই সময়োপযোগী ছিল। জনউপাদানকে কিছুতেই দানা বাঁধতে না-দেয়া, সব সময় সেই উপাদানগুলিকে ভেঙে গুঁড়ো করা ও অসম্ভব সব কীর্তি তৈরি করে যুদ্ধটাকে অবিশ্বাস্য এক দৈবী যুদ্ধে বদলে ফেলা হিটলারের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। এই পরিকল্পনা নিশ্চয়ই একটা যুদ্ধ কল্পনার ফলিত আকার। সেই কল্পনা ছিল একজনেরই—হিটলার। তার আকার তৈরি হয়েছে—জার্মান ও প্রুশিয়ান যোদ্ধাদের অভিজ্ঞতার তিহ্য থেকে। হিটলারের দিগ্বিজয় যে ঘটবেই তার অনুকূল উপাদানগুলিকে কি একটু-আধটুও দাগানো যায়? হ্যাঁ, যায়। 

১. জার্মানির ভৌগোলিক অবস্থান। 

২. দেশের ভিতরে সমস্ত রকমের রাজনৈতিক বিরোধিতা টুটি চিপে বন্ধ করা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইয়োরোপীয় ছকটা লাথি মেরে ফেলে দেয়া। 

৩. ফেলে দেয়া যেত না যদি দেশের মানুষের সংখ্যাধিকতম অংশ হিটলারকে সমর্থন না করত, নাৎসি জার্মানিতে হিটলার ছিলেন এক উৎসব। তাঁকে যাঁরা আদর্শ বা তত্ত্বের কারণে বা সংগঠনের কারণে মানতে পারতেন না—তাঁরা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ও পরে দেশ থেকে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদেরও কেউ প্রকাশ্যে হিটলারকে ব্যাখ্যাও করেননি, প্রতিবাদও করেননি। 

এই উপাদানগুলি এত বেশি এ ওর গায়ে ঠেস দিয়ে খাড়া, যে কোনো একটি ঠেস নড়বড়ে হয়ে গেলে পুরো কাঠামোটাই ধসে যায়। ৪৩-৪৪-এ সেই ধস ঘটে গেল—সোভিয়েত সীমান্তে ও ইজিপ্ট সীমান্তে। রোমেলকে যে ঠেকানো যায় না আর রোমেল যে ফ্যানটম বা স্পাইডারম্যানের মত অতিপ্রাকৃতিক—এই বিশ্বাস ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে এমনই ছড়িয়েছিল যে ব্রিটিশ সৈন্যরা নিজেদের পকেটে তার ছবি রাখতেন ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রধানকে একটা লিখিত ওয়ারেন্ট ছড়াতে হয়েছিল এইটুকু বলতে যে রোমেল একজন সাধারণ মানুষ 

হিটলারের রণকৌশল ছিল গতি নিয়ন্ত্রিত। কোনো ঘটনা দু-মিনিট আগে হতে পারে। কিন্তু পরে হতে পারে না। সোভিয়েত ফ্রন্টে সেই গতির হিশেব চোট খেল আর মরুভূমির ফ্রন্টে রোমেল পড়ল মুখ থুবড়ে। পেট্রল নেই। রাশিয়ার পেট্রল তো দখল করা যায়নি—যাচ্ছে না। তা হলে পেট্রল আসবে কি ছপ্পর ফাঁড়কে? 

সেই ৩৯ সালের পুজো থেকে বাংলার গভর্নর শুধু হিশেব দিয়ে যাচ্ছেন কলকাতা থেকে কত লোক সরানো গেল। কলকাতায় লোক বেশি থাকার অর্থ—বেশি পেট, বোমায় বেশি জখম, বেশি হাসপাতাল, বেশি অ্যান্টি-এয়ার গান, আটটা নতুন এয়ারপোর্ট বানানো হয়েছে—আরো দশটা বানানোর হুকুম। তার চাইতে লোক যদি কমানো যায়, সবাইকে যদি কলকাতার বাইরে পাঠানো যায়, তা হলে বোমায় আর রিস্ক থাকবে না, রেশনেও কোনো রিস্ক থাকবে না। ১৯৪২-এর ২১ এপ্রিল ছোটলাট হার্বার্ট নালিশ করছেন বড়লাট লিনলিথগকে, ‘কলকাতায় যাদের দরকার নেই তাদের শহর ছেড়ে চলে যেতে বলে আমরা একটা হ্যান্ডবিল ছাড়ব ভেবেছিলাম। দিল্লি সেটা আটকে দিল এই বলে যে এর চাইতে একটা এয়ার রেইড করে লোক-তাড়ানো ভাল ও সোজা। আমরা হ্যান্ডবিল ছাড়িনি। এখন দেখছি দিল্লিই একটা হ্যান্ডবিল ছেড়েছে যে সামরিক বাহিনী জানিয়েছে পূর্ব-বিহার থেকে লোক সরানোর ব্যবস্থা নেয়া হোক। যাঁরা নিজেরাই সরে যেতে পারেন, তাঁরা দিন দশ-পনেরর মধ্যে সরে গিয়ে আমাদের জানালে আমরা ব্যবস্থা করব। এই হ্যান্ডবিলের পর আমার অবস্থাটা ভেবে দেখুন। 

আর ১৯৪৪-এর ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলার গভর্নর আর-জি কেসি বড়লাট লর্ড ওয়াভেলকে একান্ত গোপনীয় ব্যক্তিগত এই চিঠিতে জরুরি খবর জানাচ্ছেন—অস্ট্রেলিয়া (কেসি-র দেশ) থেকে ব্যক্তিগত সূত্রে তিনি জানতে পেরেছেন যে ভারতের সৈন্যবাহিনীর আহারে মাংসের অভাব দূর করতে অস্ট্রেলিয়া থেকে ধেড়ে ইঁদুর আমদানি করা হবে। ‘আমার যে-বন্ধুরা জানিয়েছেন, তাঁরা পশুপালন, রেশমচাষ ও এই ধরণের চাষের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা বলেছেন–ধেড়ে ইঁদুর অস্ট্রেলিয়াতেও আমদানি করা হয়েছিল এককালে, কোনো সমতুল্য প্রয়োজনে। কিন্তু তারপর সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষির মহাশত্রু আর বছরে কয়েক হাজার ডলার খরচ হয় ইঁদুর মারতে। ইঁদুরের মাংস নিশ্চয়ই সৈন্যদের সুস্বাদু লাগবে ও তাদের খাদ্যমূল্যও শুনেছি বেশ উঁচু ডিগ্রির। কিন্তু যুদ্ধের পর শান্তির সময় তারা আবার দায় হয়ে না-ওঠে। ধেড়ে ইঁদুরের সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে উচ্চতম ব্রিটিশ ভারতীয় প্রশাসনের ব্যস্ততার পর একমাস না-কাটতেই কেসি-কে আবার লিখতে হয়—মাউন্টব্যাটেন সমস্যা নিয়ে। সমস্যা হচ্ছে মাউন্টব্যাটেন বার্মাযুদ্ধের সুপ্রিম কম্যান্ডার নিযুক্ত হয়ে দিল্লি এসেছেন ও প্রাক্তন এক সর্বাধিনায়ক ওয়াভেল ও বর্তমান এক সর্বাধিনায়ক অকিনলেক-এর কাছাকাছি একই শহরে থাকা তাঁর পক্ষে অস্বস্তিকর হতে পারে। তাঁর জন্য একটা ভাল বাড়ির বন্দবস্ত করতে পারলে তিনি কলকাতা পছন্দ করতেন। সেটা যে আদৌ সম্ভব নয় আর কলকাতার সমস্যা এখন অফিসার ও কর্মচারীদের জন্য বাড়ি জোগাড় করা এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে কেসি জানান। কলকাতাও বদলে গেছে? ১৯৪৪–এই? ওই বছর সেপ্টেম্বরে জিন্না-গান্ধী চিঠি লেখালেখি চলছে। নতুন কোনো মতামত দিয়ে চিঠিচাপাটি নয়। প্রতিষ্ঠিত মতগুলির লিখিত প্রমাণ হিশেবে চিঠিচাপাটি। আরো ঠিক কথা হল—জিন্না আজ যা বলেন, কাল তা গেলেন ও পরশু তা ওগরান। সেই ওগরানোতে আর দু-রাত আগের কথার কোনো চিহ্ন থাকে না—এমন একটা প্রচলিত অপবাদের কারণেই এই চিঠিপত্রে গান্ধী-জিন্না সাক্ষাতের মিনিট রাখা। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *