১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৫৮. শ্যামাপ্রসাদের রণনীতি ও গান্ধীজির আখেরি লড়াই

১৫৮. শ্যামাপ্রসাদের রণনীতি ও গান্ধীজির আখেরি লড়াই 

এপ্রিলের শেষদিকে বাড়তি চাল কেনার ব্যবস্থার জন্য শাহেবরা ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠল। 

চাল ‘বাড়তি’ কী না কী করে মাপা হবে? বাড়ির খাওয়ার চালটুকু রেখে বাকি চালকে ‘বাড়তি’ ধরা হবে। বাড়ির খাওয়ার মাপ হবে কী দিয়ে? বাড়ির লোক বলে চাষী যদি পাড়ার লোককে জুটিয়ে আনে, তবে, তাদের চিনবে কেমন করে কনট্রাকটারের লোক? 

কিন্তু শত্রু যদি এসে পড়ে, তাহলে তাকে ফিরে যেতে বাধ্য করার প্রধানতম ব্যবস্থা হচ্ছে—যেখান দিয়ে শত্রুসৈন্যের আক্রমণ ঘটবে বলে আন্দাজ, সেই পথে বা জায়গায় শত্রুসৈন্য যেন এক দানা খাবারও না পায়; একফোটা জলও না পায়। জল বিষিয়ে দিতে বিষের প্যাকেট এখনই গ্রামের একটু মুরুব্বি লোকের হাতে দিয়ে আসা হচ্ছে, চাল প্রকিওরমেন্টের সঙ্গে-সঙ্গে। ‘বাড়তি’ চাল মানে বাড়ির সব চাল। কবে শত্রু আসবে তার জন্য অপেক্ষার কাল জুড়ে ‘বাড়ির লোকদের’ খাওয়ার নামে চাল মজুত রাখা হবে না কী? 

মন্ত্রীদের মধ্যে আবার এ-নিয়ে বোঝাবুঝির গোলমাল। এমন কী অর্থমন্ত্রী ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ছোটলাট হার্বার্টের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ‘আপনাদের এই ডিনায়্যাল পলিসিতে গ্রামের মানুষের কষ্ট বেশি হচ্ছে। তার মধ্যে হিন্দুদের কষ্ট আরো বেশি। হিন্দুদের ব্রাহ্মণ ও বিধবাদের আতপ চাল খেতে হয়। যাদের ঘরে ইষ্টদেবতা আছেন, তাদের নিত্যভোগ দিতে হয়। এঁটোকাঁটার খুঁতখুঁত হিন্দু বামুন বাড়িতে এত বেশি ও এত কঠোর যে শুধু এঁটোর কারণে একজন বিধবা দশবার স্নান করে। এখন বামুনদের দেখাদেখি কায়েত-বৈদ্যদের মধ্যেও এঁটোকাঁটার কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। তাতে দেশ গাঁয়ে সুনাম হয় আর বাড়ির পরিবেশেও গোবরের গন্ধের সঙ্গে আতপ চালের গন্ধ মিশে একটা উঁচু জাতের হাওয়া বয়। এই সব সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারে সরকারের হাত দেয়া উচিত নয়। আমার মনে হয় ডিনায়াল পলিসির চাইতে স্কচড আর্থ পলিসি অনেক ভাল হত। গ্রাম-ছাড়ার আগে পুড়িয়ে দিত।’ 

লাটশাহেব শ্যামাপ্রসাদকে কী করে বলবেন, দুটোরই অর্থ এক। ‘স্কর্চড আর্থ’ কথাটা শত্রুরা ব্যবহার করে, নিজেরা তো ‘ডিনায়্যাল’ই বলে। বড়লাটকে তাঁদের গোপনতম পত্র বিনিময়ে ছোটলাট এটা জানান, যদি তাঁর কোনো পরামর্শ থাকে। সে-পরামর্শ এলেও কাজে লাগত না। বাংলা পত্র-পত্রিকা ভাল একটা বাংলা চালু করেছে, পোড়ামাটি নীতি। শ্যামাপ্রসাদ লাটশাহেবকে যুদ্ধ সম্পর্কে আরো কিছু-কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। ১. বাঙালি রেজিমেন্ট চাই। ২. বাঙালি ভদ্রলোকদের নিয়ে একটা ব্যাটালিয়ন চাই। ‘ভদ্রলোক’ মানে হিন্দুবাবুরা। এই ব্যাটালিয়নের যাবতীয় খরচ ভদ্রলোকরাই দেবেন। ৩. হিন্দুদের নিয়ে একটা ‘ন্যাশনাল গার্ড’ বাহিনী তৈরি করা হোক। শুধু হিন্দুদের জন্য বাহিনী গড়লে সেটা ‘ন্যাশনাল’ হবে কী করে, লাটশাহেব জানতে চাইলে শ্যামাপ্রসাদ ব্যাখ্যা দেন, ‘ন্যাশন্যালটা বলতেই হবে এটা সরকারের ব্যাপার বোঝাতে। আর ‘হিন্দুটাও বলতে হবে মুসলমানদের বাইরে রাখতে। ৪. শ্যামাপ্রসাদ বলেন যে সরকার থেকে এখন গেরিলা যুদ্ধ চালু করা দরকার, অবিলম্বে। শ্যামাপ্রসাদ ছোটলাটকে যুদ্ধনীতি বাংলেই থামেননি, তাঁর লেখা একটি প্রস্তাবই ‘কাউন্সিল অব মিনিস্টার্স’ থেকে একটা মেমোরান্ডাম হিশেবে পাঠিয়েছেন। সেখানে ন্যাশন্যাল আর্মির কথাটা আরো বিস্তারে বলা হয়েছে। সামরিক কর্তৃপক্ষকে রাজি হতে হবে যে এই ‘ন্যাশনাল আর্মি’ মিলিটারি দ্বারা চালিত হবে না, এটা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অধীনে কাজ করবে। এই বাহিনী আইনশৃঙ্খলা বিভাগের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণেও থাকবে না। পরন্তু, চিন্তাভাবনার কোনো গোলমালে ভারত সরকার যে ‘ডিনায়্যাল পলিসি’ ঘোষণা করেছেন সেটা অবিলম্বে বদলানো দরকার। মিলিটারি ‘পোড়ামাটি নীতি’ চায়। 

ডিন্যায়াল পলিসির সুবাদে চারটি উপকূলবর্তী জিলার সব চাল কিনে ফেলার কাজ দেয়া হয় ইস্পাহানিকে। সরবরাহ মন্ত্রীর সঙ্গে ছোটলাটের কথা হওয়ার পরই একটা কনট্রাক্ট দেয়া হয়। ভারত সরকার এই বাবদ দেড় কোটি টাকা আগাম দিচ্ছেন জানার পর হকশাহেব মন্ত্রিসভায় রাগে একেবারে ফেটে পড়েন, ‘ও আমরা মরব খাইট্যা আর লাভের গুড় খাইব ইস্পাহানি? এত বড় অর্ডার—আমি কিছু জানল্যাম না, কেবিনেট কিছু জাইনল না, শুধু এক ডিপার্টমেন্টের কেরানির সইয়েই অর্ডার পাস? ক্যানসেল করে অর্ডার। হকশাহেবের কথায় আর-সব মন্ত্রীরাও সায় দেয়ায় শেষপর্যন্ত লাটশাহেবের কাছে গেল মামলা। হকশাহেব বলতে শুরু করেছেন, গজনবিরে অর্ডার দ্যান। তারপর দেখা গেল প্রত্যেক মন্ত্রীরই একজন করে গজনবি আছেন। সেই গজনবিরা মন্ত্রিসভাকে টাকার বন্যায় ডুবিয়ে রাখল আর লাটশাহেব চারজিলার দুই জিলায় রাখলেন ইস্পাহানিকেই, আর দুই জিলা ভাগ করে দিলেন চারজনের মধ্যে। ১৯৪২-এর মাঝামাঝি ছাড়া এ-ঘটনা ঘটতে পারত? 

১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। হকসাহেবের মন্ত্রিসভা সবচেয়ে স্বীকৃত মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভায় হকশাহেব, শ্যামাপ্রসাদ, ফরোয়ার্ড ব্লক আছে, সরকারি কংগ্রেসও একরকম করে আছে। বিরোধী পক্ষ শধু মুসলিম লিগ, বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান সে-মন্ত্রিসভাকে মেনে নিয়েছে। সেই মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে ঘুষ খেয়ে মিলিটারি অর্ডারের কনট্রাক্ট বিলি করতে লাগল। কোনো বামপন্থী, দক্ষিণপন্থী প্রতিবাদও করল না? ফ্যাসিস্তবিরোধী যুদ্ধের ভিতর ঘুষ-খাওয়ার অগ্রাধিকার যে কে ঠিক করল? এমন কী গভর্নর সব জেনেবুঝেও কিছু করলেন না। ইচ্ছে করেই করলেন না। ভাইসরয়ও না। তাঁদের তখন একমাত্র দায় যুদ্ধের জন্য সিভিল সাপ্লাই লাইন চালু রাখা। যখন কোনো সরকার যুদ্ধে, নিশ্চিত পরাজয়ে ধ্বংস-হওয়া থেকে দু-চারদিন মাত্র দূরে, যখন শত্রু আক্রমণ করে নিজের শক্তিক্ষয় পর্যন্ত করছে না, তাদের কাছে তো কাজটা তখন লুটেপুটে খাওয়া। কিন্তু ভারতের প্রশাসনিক বা ব্যবসায়ী ইংরেজরা সেই চরম বিপদেও ঘুষ খায়নি। ঘুষ খেয়েছে বাঙালি কেরানি ও মন্ত্রী। শাহেবরা মাথা ঘামায়নি। সাপ্লাই লাইন যদি ঘুষ খেয়ে খোলা রাখে, খাক ঘুষ 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একমাত্র নেতা তখন শেষ লড়াইয়ের জন্য সারা দেশের মানুষের প্রস্তুতি অনুভব করে ফেলেছেন, সুভাষ বোস যেমন অনুভব করেছিলেন মাত্র বছর তিন আগে। কিন্তু সেবার যেমন কংগ্রেসের কোনো নেতাই সেই প্রস্তুতি অনুভব করেননি, এবারও কেউ করলেন না। অনুভবের এমন সময়-ভাগাভাগি হয়তো সম্ভবও নয়। ১৯৪২-এর এপ্রিল থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত গান্ধীজি ব্যাখ্যা করে চলেছেন—তিনি এক বিশাল আন্দোলন করবেন বলে ভাবছেন। বলছেন—ইংরেজরা যে লজ্জাকর দণ্ডী কাটছে, তা দেখে বোঝা যায় ওরা কোনো দেশও নয়, জাতিও নয়। ‘আমি ফ্যাসিস্ত ও নাৎসি ও মিত্রশক্তির ভিতরে কোনো পার্থক্য দেখছি না।’ তারই সঙ্গে গান্ধীজি খোলাখুলি বলছেন, ‘যার সঙ্গে দেখা হয়, সেই যেন বাঁচতে-বাঁচতে হাঁফাচ্ছে। সমস্ত দিকে অনাস্থা আর জালজোচ্চুরি। জীবন আর বাঁচার মত কোনো কাজ নয় যদি-না সর্বশক্তি দিয়ে রোখা যায়।’ কী রোখার কথা উঠছে? জীবনে অবিশ্বাস ও পচনের মহামারী? কাদের? যারা যুদ্ধ করছে আর ভারতের। ভারতের কোনো যুদ্ধ নেই অথচ ভারতের ওই এক ১৯৩৫-এর মন্ত্রিসভাগুলো নাচছে নিজেদেরই শবদেহ ঘিরে। ব্রিটেনের শত্রু যাতে ভারতে ঢুকে একদিন বাঁচার মতও, আশ্রয়, প্রশ্রয় বা আহার, জলও, না পায়, সেজন্য নৌকো পোড়ানো, ঘর পোড়ানো, বাড়ির ধানচাল সরকারকে দিয়ে দেয়া। তাতে ক-জন জাপানিকে ঠেকানো যেত? নিশ্চয়ই পনের লক্ষ নয়। কিন্তু এই চাল কিনে নেয়া ও প্রক্রিয়োর করাটা ও সমুদ্রে ফেলে দেয়াটাই পৃথিবীর মানবশাস্ত্রের সবচেয়ে নৈতিক কাজ। আর এই চালের অভাবে এক বছরের কম সময়ের মধ্যে অন্তত দেড় কোটি বাঙালির না-খেয়ে মরে যাওয়াটা কোনো অনৈতিক কাজ নয়—কারণ ওই দেড় কোটির মরে যাওয়া, সত্য হলেও সে-মৃত্যুর কোনো হত্যাকারী নেই। যুদ্ধ, যুদ্ধই হচ্ছে সেই কুয়াশামোড়া দিগন্তের ঘের, যে-ঘেরের মধ্যে মৃত্যু ও হত্যা একমাত্র-বিধান। মৃত্যু আর হত্যা বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। বেঁচে থাকা, সবসময়ই একক। একা বেঁচে থাকতে কোনো যুক্তির দরকার নেই। চারদিকে খাড়া চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকতে হবে—কোথাও কি কোনো সুযোগে ‘আমি’-ছাড়া আর-কেউ বেশি বেঁচে গেল কনট্রাক্ট পেয়ে, ঘুষ পেয়ে? 

লিগের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে যে-মন্ত্রিসভা হকশাহেব পেলেন, তার ১৫-১৬ মাসের স্থায়িত্বের মধ্যে হকশাহেব ছোটলাট শাহেবের কাছে জানিয়ে দিচ্ছেন-তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেবেন যদি ভাইসরয়ের একজিকিউটিভ কাউন্সিলে আকবর হায়দারির শূন্যপদে হকশাহেবকে নেয়া হয়। সেটা বেশি এগল না দেখে আবার জানান—হাসান সারওয়ারদি আপাতত লন্ডনে ফিরছেন না, কলকাতায় থাকছেন, তাহলে হকের জায়গায় তিনিই তো প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন আর হককে শাহেবরা জুটিয়ে দিতে পারেন তাঁর পক্ষে সম্মানজনক ও আর-একটু বেশি পয়সার একটি চাকরি। 

সে-সব খবর জেনে ফেলে হকেরই মন্ত্রিসভার অন্য সব মেম্বার। তাদের কেউ-কেউ গোপনে দেখা করে নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে। নাজিমুদ্দিন জানিয়ে দেয়—সে প্রধানমন্ত্রী হতে রাজি আছে যদি হক তার মন্ত্রিসভায় না থাকে। সে-খবর ঠিকঠাক লাটশাহেব ও হকশাহেবের কাছে পৌঁছে যায়। হকশাহেব লাটশাহেবকে গোপনে জানান—তাঁকে যদি একটু বেশি মাইনে দিয়ে স্পিকার করা হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিতে রাজি আছেন। এটা হকশাহেবের টোপ লাটশাহেবকে। হকশাহেবের চাইতে আর কেউ কি এটা বেশি জানে যে তাঁকে কেউই চায় না—না লাটশাহেব না কোম্পানির শাহেবরা, না লিগ, না কোনো কংগ্রেস, না কোনো কৃষক প্রজা। কিন্তু হকশাহেব কি কারো চাইতে এটাও কম জানেন যে মেম্বারদের সমর্থনের যোগফল সব সময়ই তাঁর বেশি থাকছে। নাহলে খাজার জন্য এতটা সময় যে দিলেন লাটশাহেব সেও কি পারল তাকে আরো সময় দিতে? নাজিমুদ্দিন তো কিরণশঙ্করের সঙ্গেও কথা বলেছে, তাতেও তো এগল না। হকশাহেব তো ইয়োরোপিয়ান ব্লকের মেম্বারদের কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন যে ব্লক ন্যাশনাল গবর্নমেন্টের প্রস্তাব তুললে হকশাহেব সমর্থন করবেন। প্রস্তাব উঠল যথাসময়ে—ঠিক ওই সময় হকশাহেবকে খুঁজে পাওয়া গেল না। কেন? হকশাহেব তো তাঁর এই প্রগ্রেসিভ মন্ত্রিসভার ঠিক চার মাসের মাথায় লাহোর থেকে দিল্লি পৌঁছে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি জাতীয় সরকার চান? আবার, হকশাহেব তো তার একমাস আগেই সিন্ধুপ্রদেশের প্রধানমন্ত্রী আল্লা বক্সের নেতৃত্বে দিল্লিতে আজাদ মুসলিম সম্মিলনে হাজির ছিলেন? 

সে তো ছিলেনই। কিন্তু তাঁর সঙ্গে তো ‘ন্যাশন্যাল গভর্নমেন্ট’ নিয়ে শাহেবরা কোনো দরাদরিতেই নামল না। হকশাহেবকে নিয়ে বা অন্তত হকশাহেবের সম্মতি ছাড়া কোনো ‘ন্যাশন্যাল গভর্নমেন্ট’ তৈরি করা সম্ভব? তাহলে ইয়োরোপিয়ান ব্লকের লেজে যখন আগুন লেগেছে ও তাদের কলকাতা থেকে সরে যাওয়ার নোটিশ আসতে পারে যে-কোনোদিন, তখন ব্লক ন্যাশন্যাল গভর্নমেন্টের কথা তুলতেই হকশাহেব রাজি হবেন? এর মধ্যে তো হকশাহেবের পার্টি ছ-ছটা বাই ইলেকশনে হেরে বসে আছে। তারপর, গান্ধী যখন এআইসিসিকে ৪২-এর মে মাস থেকে ‘ভারত ছাড়ো’ বোঝাতে শুরু করেছেন ও রাজাগোপালাচারি ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন কংগ্রেস পাকিস্তানে রাজি হচ্ছে না বলে, তখনই কলকাতার টাউন হলে বাংলার সমস্ত শ্রদ্ধেয় ও দায়িত্বশীল হিন্দু-মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের সম্মিলনে হকশাহেব যোগ দিলেন ও তাঁর সমর্থন নিয়েই ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সমিতি’ গঠিত হল, ২০ জুন, ওই ৪২-এই। এরপর সপ্তাহ দু-এক কাটতে-না-কাটতেই ওয়ার্ধায় বসল কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির টানা ন-দিনের বৈঠক। গান্ধী প্রস্তাবিত দেশব্যাপী আন্দোলনের পক্ষে ওয়ার্কিং কমিটির একজন মেম্বারও ছিলেন না। একজনও না। কেউ চারদিক দেখে বলতে পারছিলেন না—এত বড় আন্দোলনের পক্ষে এটাই সবচেয়ে ভাল সময় কী না। তাঁরা নিজেরা কেউ বুঝতেই পারছিলেন না—যুদ্ধের এই বিশেষ সময়ে ব্রিটিশ-বিরোধী এত বড় আন্দোলন, নীতির দিক থেকে ক্ষতিকর কী না। কংগ্রেসে প্রাদেশিক নেতাদের কথা থেকে এই ভয়ও গোপনে ছড়িয়েছিল যে এই আন্দোলনের ফলে মহাত্মার নেতৃত্ব ও কংগ্রেসের প্রাধান্য নষ্ট হবে। 

একের পর এক সাংবাদিকরা এসে গান্ধীজিকে ছেঁকে ধরছেন। তাঁদের বিশ্বজোড়া নাম। তাঁদের অনেকের ব্যক্তিগত সংযোগ আছে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা ও আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। তাঁদের নিজেদেরও রাজনৈতিক মত আছে। তাঁরা কেউ মনে করছেন, ফ্যাসিস্তদের জয় অনিবার্য করে তুলছেন গান্ধীজি। বার্মা থেকে উদ্বাস্তুরা আসছে যখন, তখন, কোথায় গান্ধীজি ফ্যাসিস্ত বিরোধী যুদ্ধের সৈন্য রিক্রুট করবেন, তা না, তিনি বলছেন—’ফ্যাসিস্ত, নাৎসি আর মিত্রশক্তির ভিতর আমি তো কোনো পার্থক্য করতে পারছি না।’ ব্রিটেনের ইতিহাসে এর চাইতে বড় কোনো দুঃসময় অতীতে আসেনি। তখন, ভারতের ভারতীয়দের সমর্থন ব্রিটেনের পক্ষে দরকারই শুধু নয়, অপরিহার্য। জিন্না, সাভারকর, লিব্যারালস, সিকান্দার হায়াত, রাজাগোপালাচারিয়া ও সিপিআই, আরো কত আঞ্চলিক নেতারা প্রতিদিন বিবৃতি দিচ্ছেন—লিগের পাকিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে কিন্তু কংগ্রেসের শেষ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের পক্ষে অন্য কোনো পার্টি বা সামাজিক সংগঠন একটি অর্ধস্পষ্ট কথাও উচ্চারণ করেনি। 

এমন বিপন্নতার মধ্যে যখন ব্রিটেন, তখনো ছোটলাটের অনুরোধে, পরে পরোক্ষত বড়লাটের অনুরোধেও শেষে হুমকি সত্ত্বেও, হকশাহেব, গান্ধী-পরিকল্পিত আন্দোলনের বিরুদ্ধে, বা রাজনৈতিক নেতা হিশেবে মহাত্মা গান্ধীর বিরুদ্ধে, বা কংগ্রেসের আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোনো বিবৃতি দেননি, যুদ্ধ সংক্রান্ত কোনো মিটিঙে একটিও শব্দ বলেননি ইংরেজের বিরুদ্ধে, ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর কাজ নির্বিঘ্ন করেছেন। 

এটা ওঁর কোনো পরিকল্পনা থেকে করা নয়। হকশাহেব পরিকল্পনা ছকারই মানুষ আবার জনমানুষেরও নেতা। বাংলার রাজনীতিতে দল পাকানো, ঘোঁট পাকানো ও ছলচাতুরি, পদ্ধতি হিশেবে স্বীকৃত বরাবরই। তারা নানা কারণই থাকতে পারে। একটা কারণ কংগ্রেসে, বা রাজনীতিতেই, জমিদারদের প্রাধান্য, ও কলকাতার কায়েতদের প্রাধান্য। সম্পত্তি রাখতে ও বাড়াতে, কোম্পানি বানিয়ে অন্যদের ঠকানো, নিজেদের তৈরি নানা প্রতিষ্ঠানে যা নিজেদের দখল রাখতে যে-সমস্ত প্যাঁচপঁয়জার এঁদের পুরুষানুক্রমিকভাবে রপ্ত ছিল, রাজনীতিতেও এঁরা সেটাই ব্যবহার করতেন। বিড়ালের বিয়ে, বুলবুল পাখির লড়াই, ঘুড়ি কাটাকাটি, নিজের কবিদল পোষা, নিজের কাগজ পোষা, নিজের মেয়েমানুষ রাখা—প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির আগে এসব সামাজিক আচার-আচরণ একজন ক্ষমতাবানের চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেত ও বাইরের সব লোকজনের সেই ক্ষমতাবান সম্পর্কে ধারণার প্রধান উপাদান হয়ে উঠত। ব্রাহ্মসমাজের দু-একজন নেতার মতামত ও কাজকর্ম স্বতন্ত্র ছিল আর তাদের সমাজ-সম্বন্ধীয় ধ্যানধারণাও আধুনিকতর ছিল বা হিন্দুদের মধ্যেও তো বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্ৰ ছিলেন—এমন একটা ধারণা-বিভ্রাট ‘বাংলার জাগরণ’কে একটু হয়তো রঙিন করেছে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলিতে ও তাঁর কিছু উপন্যাসে কত-যে বিচিত্র লোকজন বাঙালি সমাজের টাইপ হয়ে আছে আর সেই টাইপগুলো একসঙ্গে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, বিলেতফেরত, বামুন, ব্যারিস্টার, পোস্টমাস্টার, ডেপুটি, হিন্দুনেতা, ব্রাহ্মনেতা, স্কুল মাস্টার, স্কুলপণ্ডিত, আত্মধিক্কার শেখা ও প্রেম-করা শেখা যুবক, ব্রাহ্ম সমাজকর্মী বাঙালির চালচিত্র হয়ে আছে। সেই মানবদলিলের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস রচনার শৃঙ্খলার বিরোধ না বেধেই পারে না। ‘জাতীয়তাবাদী’, ‘ব্রাহ্মভাবাপন্ন’, ‘ভদ্রলোক’, ‘বিষয়ীলোক’ এইসব ক্যাটিগরি দিয়ে বা ‘শিক্ষিত’, ‘মুক্তমনা’, ‘ভূস্বামী’ এইসব বিশেষণ দিয়েও সেই সমাজের হকশাহেব-মার্কা ব্যক্তিদের চিনে নেয়া যায় না। হকশাহেব তো মৌলবি ও গোঁড়া মুসলমান ছিলেন। পাঁচ-সাত বার নামাজ পড়তেন না হয়তো কিন্তু দু-চারবার যে পড়তেন তা নিয়ে মজার গল্প ছড়ানো আছে। একবার তিনি বাংলার বাইরে কোথায় এক জনসভায় এমন কথাও বলেছিলেন যে বাংলার বাইরের মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হলে বাংলার হিন্দুদের ওপর তিনি তার প্রতিশোধ নেবেন। তবু এখন ভাবলে যেন মনে হয়—মুসলমানির ওপর তাঁর বিদ্যাবুদ্ধি ও ব্যক্তিত্বের নির্ভরতা ছিল, যেমন, তেমনি তাঁর আবেগ, চতুরতা, উপস্থিত বুদ্ধি, কথাখেলাপ, চকিত সাহস, বড়মানুষি, স্বার্থবুদ্ধি, বোকামো ও আত্মবিশ্বাসে বাঙালি মধ্যবিত্তের জমিদারি ব্যারিস্টারি টাইপটাকেই চেনা যায় বেশি। একবার যুদ্ধের মধ্যে সুভাষ বোসের ভাইপো দ্বিজেন বোসের কী একটা কাজে বাড়িতে উপস্থিতি দরকার। দ্বিজেন বোস জেলে আছেন নিরাপত্তা-বন্দী হিশেবে। হকশাহেব তাঁকে গোপনে চারদিনের ছুটি দিলেন জেল থেকে বাড়িতে যেতে। হকশাহেরের মন্ত্রিসভার লোকজনই লাটশাহেবকে জানিয়ে দিলেন। ছোট লাট তাঁকে চেপে ধরলে তিনি বললেন, ‘না। কখনোই না।’ তাঁর প্রতিপক্ষের লোকজন মূল অর্ডার বের করে এনে যখন দেখায় তখন হকশাহেব তাকিয়েও দেখেন না। 

কিন্তু লাটশাহেব একটু বেশিই চটেছিলেন। বললেন, ‘এও সম্ভব? তাও যুদ্ধের সময়? ডিফেন্স অব ইন্ডিয়ার আসামির জেল থেকে চারদিনের ছুটি? আমার মুশকিল কী জানেন? আমি সারা দুনিয়ায় কাউকে বিশ্বাস করাতে পারব না যে এটা সত্যি-সত্যি ঘটেছে। দিল্লিতেও না। লন্ডনেও না। 

চোখ বন্ধ করে হকশাহেব বলেন, ‘সেডা হইব্যারও পারে। এহন তো সব জোয়ান বয়সেই লাটবেলাট হচ্ছে। বুড়া বলতে তো এক চার্চিল। তাও আমার জুনিয়ার। তাছাড়া চার্চিলের তো এক্সপিরিয়েন্স নাই ইন্ডিয়ার। আমি আপনারে কই। চেনাজানা ফ্যামিলি। ছেলেডারে আটকাইছে ক্যান কে জানে। ওর ফ্যামিলি থিক্যা একেবারে মোস্ট প্রাইভেটলি আমারে কইল, ওর য্যান কী-একটা কাজ, আটকা পইড়্যা আছে। চারটা দিনের জন্য যদি খালাশ দেয়া যায় তাইলে ও সব কাজ শেষ কইর‍্যা অন ফিফথ ডে উইল রিপোর্ট টু দি জেইলার। এত ঘনিষ্ঠ একডা ফ্যামিলিরে এইটুক সাহায্য যদি কইরতে না-পারি তাইলে আমার প্রধানমন্ত্রী থাকার কামডা কী? রোজ-রোজ ওই খাজার গুঁতা খাওয়ার লগে? দিল্যাম ছাওয়ালডারে ছুটি—ফিরাও গিছে ছ্যামরা। অ্যাহন এই নিয়্যা লাগালাগির কারণডা কী?’ 

ছোটলাট বললেন, ‘আপনি তো বললেন আপনি এমন অর্ডার দেননি- 

‘দ্যাহেন, ইয়োর এক্সেলেন্সি, আমারে দিনে নরম্যালি কতগুলা অর্ডার সই কইরব্যার লাগে? অ্যাহন তো যুদ্ধের টাইম। অ্যাবনরম্যাল। আপনাগ পলিসি হচ্ছে টু লুক নরম্যাল। তাই যত সইসাবুদ আমারে দিয়্যা করান। আমি মনে রাইখব ক্যামনে যে কোন ছ্যামরারে কয়দিনের ছুটি দিছি?’ 

‘অসুবিধেটা হচ্ছে দোজ ইন সার্ভিস তারা এটা জেনে গেলে আমাদের তো সাবোতাজও করতে পারে।’ 

‘স্যার, একটা গল্প শুনেন। আমার বাপজানের কাছে শোনা। আমার আব্বা খুব নামকরা উকিল ছিলেন। গবর্মেন্ট প্লিডার। সত্য ঘটনা। আপনে তো জানেন আমাগ এই বড়-বড় নেটিভ স্টেটে তাদের কারো-কারো নিজেগ সুপ্রিম কোর্ট আছে। মাঝামাঝি যারা তারাও চেষ্টা করে। কিন্তু পাইর্যা ওঠে না। আবার, বড়গর মইধ্যেও কেউ-কেউ এসব আইন-আদালতের হাঙ্গামায় যাইব্যার চায় না। ওইসব দেশীয় রাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের জাস্টিসরা অনেক সময় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার জুডিসিয়ারিতে আসে। ফ্যামিলি রিজনস থাকে। মেয়েগ বিয়া আর ছাওয়ালগ চাকরির ব্যাপার থাকে। এহানে তাগ বড়জোর ডেপুটি থিক্যা শুরু কইরব্যার লাগে। তেমনি এক মুন্সেফ কোর্টে বাপজান এক কেসে গিয়্যা দ্যাখে, তার মক্কেলের আসামি হইছেন, এমন-একটা এক্স-জাস্টিস অব সাচ অ্যান্ড সাচ স্টেট। কোর্ট তারে এডডু রাইগ্যাই জিগ্যাস কইরছে, ‘আপনে জুডিসিয়ারির লোক হইয়া কী কইর‍্যা এডডা জামিন না-পাওয়া আসামিকে আপনার বাড়িতে পাঠাইতে কন কাজের লোক কইর‍্যা।’ তহন সেই এক্স-জাস্টিস আসামি হাত জোড় কইর‍্যা কয়, স্যার, বুঝি নাই, আমি যহন স্টেটে ছিলাম তহন তো চাষের সময় এক গাদা কয়েদিরে ছাইড়্যা দিতাম, আমার গ্রামের জোতের চাষ কইরব্যার লগে। ধান তুইল্যা তারা আবার জেলে ফিরত। বুঝি নাই, স্যার। আমি তো লোকডারে জেল-কাস্টডি থিক্যা আমার বাড়ির কাজ কইরব্যার কইছি। এডা যে অপরাধ, বুঝি নাই, স্যার।’ 

.

ভোলা থেকে দুধু মিয়ার হাতচিঠি নিয়ে লোক এসেছিল যোগেনের কাছে। কাউকে দিয়ে লিখিয়েছেন। সেই বাঁধা-চিঠিনবিশের গুণে চিঠি পড়ে উদ্ধার কঠিন যে ঘটনাটা কী। ‘বহুদিন আপনার সংবাদাদি কিছু পাই নাই’ দিয়ে শুরু আর ‘অধিক কী লিখিব’ দিয়ে শেষ। যোগেনকে এককালে এমন কত চিঠি লিখতে হয়েছে। একটা পোস্টকার্ড এনে বাপ-বয়েসি কেউ বলতেন, ‘একটা চিঠি লিখ্যা দে বড়জামাইরে।’ ঐ শেষের খবরটিই সবচেয়ে দরকরি—কাকে লেখা হচ্ছে। দুই পিঠে ভর্তি করে লিখে যোগেন আবার ‘পু’ দিয়ে পুনশ্চও লিখত। যাঁর চিঠি তিনি একটিও কথা বলতেন না। 

পেশাদারি অভিজ্ঞতায় যোগেনের সন্দেহ হয়েছিল—প্রোকিওরমেন্ট নিয়ে কিছু গোলমাল হয়েছে হয়তো—’অত্র নতুন বিপদ ধান-চাল-অপহরণ। ঐ সব বেচাই যাহাদের ব্যাবসা তারা এখন কী বেচে?’ 

বাটাজোড় থেকে প্রমথ দাশগুপ্তের একটি চিঠি পেয়ে, ডাকে, যোগেন নিশ্চিত হয় যে প্রোকিওরমেন্ট করা হচ্ছে পরিবারের খাদ্য অতিরিক্ত সব ফলন। প্রোকিওরমেন্টের সঙ্গে পোড়ামাটি নীতি জুড়ে দিয়ে স্থানীয় সরকার হয়তো এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছে। নদীতীর বা উপকূল থেকে তিরিশ মাইল ভিতরে যাওয়াটা বরিশালের লোকের বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি—বড় বান, সাইক্লোন, ঘূর্ণির খবর পেলে তো তারা নিজেরাই পাড় ছেড়ে ভিতরে যায়। কিন্তু সেটা তো সরতে হয় যেমন প্রাণে বাঁচতে তেমনি প্রাণের পক্ষে অপরিহার্য চাল-ডাল ও বাঁচাতে। কিন্তু দাশগুপ্ত মশায়ের চিঠি পড়ে সন্দেহ হয়—প্রোকিয়োরমেন্টকেও পোড়ামাটিরই অংশ ধরে নেয়া হয়েছে। বরিশালে তো খাদ্য শস্যের পাইকারি একটা মধ্যবিত্ত ব্যবসায়। সারা বছরের খরচের ব্যাপার। কিন্তু দাশগুপ্ত মশায় স্পষ্ট করেই লিখেছেন যে সরকার পক্ষের কথাবার্তা এ-রকম যে আপনারা যখন বেচতেনই, সরকারের কাছে বেচেন। ‘মনে হয়, কল্পনার সহিত বাস্তব ঘটনার মিল নাই।’ 

যোগেন খুঁজে পায় না কার কাছে গেলে সে কী ঘটছে, তার একটা আন্দাজ পাবে। এটুকু বুঝতে পারে, অ্যাসেম্বলির বাইরে যে-দেশ সেখানে কী ঘটছে আর কী ঘটছে না—তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা তো নেইই, এমনকি কিছু-কিছু সহানুভূতি ও দুশ্চিন্তা তো দেখাতেও হয়—কারো মারা যাওয়ার খবর পেয়ে তার বাড়িতে তো কেউ দুর্গা পূজার বোধনের ঢাক পিটিয়ে যায় না, সেটুকু আক্কেলও নেই। 

যারা খবরের কাগজ পড়ে তাদের তো না জেনে উপায় নেই যে কলকাতার শিয়রে শমন, জাপানের যুদ্ধ-পরিকল্পনায় এখন একমাত্র লক্ষ হতে পারে ফল অব ক্যালক্যাটা। জাপান তো সমুদ্র দিয়েও আসতে পারে। যোগেন শিউরে ওঠে ভাবতে যে সমুদ্র দিয়ে একটা পুরো জাপানি-বাহিনী বরিশাল, নোয়াখালি, চট্টগ্রামে এসে গেলে বা বার্মা থেকে আরাকান দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নেমে যুদ্ধজাহাজে কলকাতা রওনা দিলে, তাদের কে ঠেকাবে, কোথায় ঠেকাবে, কী দিয়ে ঠেকাবে। কলকাতা হাইকোর্টে এক জজশাহেব সরকার-বাদী এক মামলার রায় দিতে গিয়ে বলেছেন—’শাহেবদের কাছ থেকে আমরা বিজয়ীর গলায় মালা দিতে শিখেছি। সেই শিক্ষাই এখন কাজ লাগানো হচ্ছে—এ-যুদ্ধে জিতছে কারা তা স্থির করতে।’ 

যোগেন স্থির জানে না—সে কি ইংরেজ বা মিত্রশক্তির জয় চায়, সে কি জাপানের জয় চায়, সে কি ভারতের স্বাধীনতা চায়। 

প্রত্যেকটিই তার চাওয়ার কারণ আছে। নীহারেন্দু-বঙ্কিমের কাছে সে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে পাঠ নিয়েছে। ওঁরা, নীহারেন্দু-বঙ্কিমবাবুরা সোভিয়েতের জয়ের জন্য যেমন উদ্বেগে থাকেন, যেমন চরম কিছু করতে চান, তার তাপে, যোগেন যে কখন থেকে সোভিয়েতের জয় চাইছে, তা নিজেই টের পায়নি। তাহলে তো ইংল্যান্ডেরও জয় চাওয়া হয়। 

যোগেন ভেবে দেখে, স্বাধীনতা বা স্বরাজ কখনোই তার কাছে প্রধান বিষয় হয়ে ওঠেনি। তার কাছে প্রধান বিষয় স্বাধীনতা উচ্চবর্ণের দাসত্ব থেকে। এই শূদ্র-স্বাধীনতা ছাড়া কোনো স্বাধীনতাই তার কাছে বড় ছিল না। একদিন তো বঙ্কিমবাবু তাকে অনেকক্ষণ ধরে বোঝাতে পেরেছিলেন—বৌবাজারের ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে। বেলা একটা থেকে নামল আকাশভাঙা বৃষ্টি। নামল তো নামল—একইরকম বেগে ঝরতে লাগল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে, কেউ কোথাও যেতে পারছে না। টি-ইউ অফিসেও নতুন কেউ এল না। বাড়ি ফেরাটা বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে কোনো দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। যোগেনের তো নয়ই। জল তো জল। যদি বালি হত, কাদা হত, তাহলেও, যোগেনকে রাস্তা দিতে রাস্তা তো বাধ্য। বঙ্কিমবাবুর তো কথা বলতেই আনন্দ আর যোগেনের প্রশ্নে তো বটেই। এমন শোনে ক-জন। এমন জিজ্ঞাসাই-বা থাকে ক-জনের? 

বঙ্কিমবাবু বলেন, ‘আপনাদের রাজনীতি নিয়ে এই একটা গোলমাল কিন্তু আছে। হিন্দু জাতের উঁচুনিচুর লড়াই। যে-রাজনীতিতে হিন্দু নেই, বামুন নেই, ছোট জাত নেই, সে-রাজনীতিতে আপনারা কোনো টান পান না। পাবেনই-বা কেন? কে পায়? আমাদের ইউনিয়নের একটা সম্মিলন হল পার্বতীপুরে। প্ল্যাটফর্মে লাইন করে সবাই খেতে বসেছে। সারাদিন ধরে রেলগুদামে সবাই গাদাগাদি করে কথা বলেছে—যুদ্ধটা জিততে হবেই, সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাঁচাতে, শ্রমিকদের বাঁচাতে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এখন ভেক নিয়ে বিড়াল সেজে একাদশী করছে। ও একাদশী আমরা চিনি। ঐ বিড়ালের ভেক থেকে এমন কথা যেন না-বেরয় যে মজুররা চটের থলি সাপ্লাই দেয়নি বলে বালির বস্তা সাজিয়ে যুদ্ধ করা যায়নি। বা, লসকররা যুদ্ধজাহাজে নতুন করে তেল ঢালতে দু-দিন দেরি করেছে বলে টাইম মত কার্তুজ পৌঁছায়নি। এটা বোঝা মজুরদের পক্ষে বেশ কঠিন। যদি-বা তারা শ্রমিক শ্রেণীটাকে ধরতে পেরে থাকে কিছুটা, এই সিধে অঙ্কে, যে-আদায় সব লেবারের জন্য নয়, সে-আদায় একামজুরের জন্যও নয়; কিন্তু সারা জীবন শুনল-জানল মালিক দুশমন, শাহেব দুশমন, এখন তাকে জানতে-মানতে হবে—তার মালিকের দুশমন-যে, এই শাহেবের দুশমন যে সে আমারও দুশমন। জানেন, যোগেনবাবু, মজুর যে তার শ্রমের কত রকমের তুলনা তৈরি করতে পারে—ভাবা যায় না। কিন্তু একটা অঙ্ক তো তার ‘পার্মেন্ট’ হতে হবে। সব অঙ্কই ‘কেজুল’ হলে অঙ্ক দাঁড়াবে না। গ্রেট ব্রিটেন আমার শত্রু। জার্মানি ব্রিটেনের শত্রু। তাহলে গ্রেট ব্রিটেনের শত্রু তো আমার বন্ধুই হয়। এটা তো কমনসেন্সের হিশেব। এর কোনো কাটান নেই। নানা মিটিং-টিটিঙের মধ্য দিয়ে একটা গল্প বেরল। কী গল্প? না, আমি একটা অধবা-বিধবা। আমার শ্বশুরও নেই, দেওরও নেই। আমার গ্রামের এক জোতদার আমার চাষের জমিটা দখল করল। দখলদারকে মেনে নেয়া ছাড়া আমি করবটা কী? দখলদারকে বেদখল করতে আমি তো রোজ গুড়জল খাচ্ছি আবার বছরে দু-তিনবার গিয়ে ভাগও নিয়ে আসছি। এখন, যদি ঐ জোতদারের বাড়িতে ডাকাত পড়ে এক রাতে, তাহলে কি আমি ডাকাত তাড়াতে যাব—না-হলে ডাকাতরা আমার জমির খাড়া ফসলে আমার ভাগও কেটে নিয়ে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। অন্তত সেই রাতটা তো জোতদারের সঙ্গে আমার ভাগের লড়াই মুলতুবি রেখে ডাকাত তাড়াতে হবে। মনে হয়, এই গল্পটা মজুরদের কমনসেন্সে ধরবে।’ 

‘হ্যাঁ—আ। আমার চেনাজানা বন্ধুর শত্তুর তো আমারও শত্রুর, এটা একটা সোজা অঙ্ক—’

‘অঙ্ক তো সোজা। হলটা কী দেখেন। কনফারেন্সের পর পার্বতীপুরের লম্বা প্ল্যাটফর্মে লাইন বেঁধে সব খেতে বসেছি। খিচুড়ি, কী একটা ভাজা আর কাঁচালঙ্কা-পেঁয়াজ। বিরাট লাইন—চা-বাগান, রেল সব শ্রমিক আছে তো, নেপালি, মদেশিয়া, রাজবংশীও কিছু, রাজবংশী ওয়ার্কার তো কম, হো, মুণ্ডা, সাঁওতাল। এত রকমের মানুষ লালঝান্ডার নীচে? বুকটা কেমন করে ওঠে। উত্তেজনায় একটু বেশি খেয়ে ফেলি। আমি তো লম্বা লোক, খেতে-খেতে বাঁয়ে-ডাইনে-সামনে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। নাম ধরে ডাকছি একে তাকে। এত উৎসাহের ফলেই, সবার মাথার ওপর দিয়ে তাকাতে তাকাতে ডাকাডাকি করতে-করতে হঠাৎ যেন মনে হয়—ওয়ার্কাররা একসঙ্গে কনফারেন্স করল, একসঙ্গে থাকল, একসঙ্গে খাচ্ছে সবই ঠিক, কয়েক ঘণ্টা ধরে তর্ক-আলোচনার পর, একই যুদ্ধ ‘না এক পাই—না এক ভাই’ থেকে ‘জনযুদ্ধ’ ও ‘জাপানকে রুখতে হবে’র যুদ্ধে বদলে গেল, সেটার প্রক্রিয়াটা বোঝার জন্য শ্রমিকশ্রেণী নিজের শ্রেণীগত তুলনা খুঁজতে পারছে, আর, এখন সবাই বসে একসঙ্গে খাওয়ার সময় কেমন জাতপাত মেনে আলাদা-আলাদা বসেছে, রাজবংশী হিন্দুরা রাজবংশী মুসলমানের ছোঁয়া বাঁচিয়ে, নেপালি শ্রমিকদের ক্ষত্রিয়-শূদ্র ভাগ আছে, মুণ্ডারা হো থেকে আলাদা। চোখে দেখে ফেলার পর নিজেকে ঠাট্টা করলাম, দুনিয়ার মজুর এক হও, খাওয়ার সময় ছোঁয়া বাঁচাও। কিন্তু তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে চাইলাম দেখাটা। নইলে তো নিজেই বিপদে পড়ব। আমার মনে হয় আপনি সেই বিপদে পড়ে গেছেন। এ-যুদ্ধে তো বর্ণভেদ নেই, বামুন নেই, শুদ্দুরও নেই, তাই এ-যুদ্ধটাতে নিজেকে জুড়তে পারছেন না। অথচ আপনার মত শিক্ষিত মানুষ রোজ দেশী-বিদেশী এক ডজন খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন পড়ে-পড়ে আপনি তো না-জেনেও পারেন না—এ যুদ্ধে না-জিতলে কী সর্বনাশ হতে যাচ্ছে। জিতলেও দুনিয়াটা আর আগের মত থাকবে না।’ 

‘হয়তো আপনার কথাটা ঠিক। আমি তো একডা ভোটে জেতা এমএলএ। এত বিপদের যুদ্ধে আমারে কী কইরতে লাগব, সেডা তো আমারে কেউ জানাবে। গভর্নর আর সরকার এমন ভাব করছে যেন কিছুই হয়নি। য্যান ইংরাজরা শখ কইর‍্যা হংকং, সিঙ্গাপুর, মালয়, বার্মা, জাপানিগ ঐ জায়গাগুল্যা প্রেজেন্টেশন দিয়া আইসছে। ইচ্ছাপূর্বক আত্মসমর্পণ। এখানে তো সবই এক আছে—রেস্টুর‍্যান্ট-হোটেল খোলা, খদ্দের বাড়ছে—গোরা সৈন্যরা আছে। আইনসভাও বসছে। মন্ত্রীরাও আছে। লাটশাহেবের ট্যুরও আছে। শুধু আলোর ওপর ঠোঙা আর এ-আর-পির প্যারাড।’ 

‘মানে, আপনি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা গভর্নরের কাছ থেকে জানতে পারছেন না—কলকাতায় কী যুদ্ধ কোথায় হচ্ছে। গভর্নমেন্ট কী চায়—সেটা ঝেড়ে কাশছে না কেন। 

‘ঝেইড়্যা কাশা বা না-ঝেইড়্যা কাশা না। দ্যাশ থিক্যা দুইডা চিঠি পাইছি। একডা ভোলা থিক্যা আর-একটা আমাগ থানার একজন মান্যগণ্য মানষের। মনে হয় য্যান সেহানে বিপদ-আপদ হচ্ছে। আমি যাব তো। যাওয়ার আগে তো এডডু জাইনতে হব।’ 

‘মানে আপনি যুদ্ধ-পলিটিকসে যোগ দিতে চান? তপশিল পলিটিক্স ছেড়ে? আপনার অন্য কলিগরা রাজি হবেন তো?’ 

‘আপনাগ নাগাল পার্টির লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা-কাজকম্মের এই একডা বিপদ। একডা ঘোর জঙ্গলে একডা মেয়ে যদি ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ’ জিগ্যায়, আপনারা পালটা জিগ্যাবেন, তা দিয়্যা তোমার কী প্রয়োজন? আরে, আমার আইসছে দেশ থিক্যা চিঠি। য্যান, একডা কিছু বিপদের ঘটনা ঘটছে। বিপদ বলতে তো অ্যাদ্দিন ছিল হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। অ্যাহন তো সেডাও নাই। কোথায় কী ঘটে, কে কী আইন দ্যায়, কে কী করে, কিছুই তো কেউ ট্যার পায় না। কিন্তু কইলকাতায় তো মনে হয়, লোকের ফূর্তি য্যান ব্ল্যাক-আউটে আরো বাইড়ব্যার ধরছে আর বাতাসে য্যান টাকার গন্ধ। আমি একডা নিশানা না নিয়্যা দ্যাশে যাই ক্যামনে? আর, আপনে জিগ্যাব্যার ধইরছেন, আপনার নিশানা আমাগ অন্য নেতারা মানব কী না। আপনারা যদি সিডিউলগ দুঃখ-বঞ্চনা বুইঝতেন, গান্ধীজিও যদি বুঝতেন, তাইলে কি যোগেন মণ্ডলরে সিডিউল-সিডিউল কইরা চেঁচাবার লাগে?’ 

বঙ্কিম মুখার্জি দরাজ গলায় হেসে ওঠেন। তারপর বলেন, ‘শুনুন। একমাত্র আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব বশত একটি গোপন খবর আপনাকে দিচ্ছি যদিও পার্টি-শৃঙ্খলায় বাধছে। কিন্তু পার্টি শৃঙ্খলা তো আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থে। সেই স্বার্থেই আপনাকে জানাচ্ছি। বার্মায় আমাদের পার্টি খুব শক্তিশালী—’  

‘আপনাদের পার্টি, মানে কংগ্রেস?’ 

‘এটা প্রশ্ন করার কোনো মানে হয়? আমাদের পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইনডিয়া, কংগ্রেস তো আমাদের বের করে দিয়েছে।’ 

‘বাইর কইর‍্যা না-হয় দিছে, আপনারা কি পাকাপাকি বাইরিয়্যা আইসছেন? আপনারা তো অ্যাহনো কংগ্রেসের এমএলএ। বুঝছি, কন। একডা আপনাগ অ্যাসেম্বলি পার্টি। আর-একডা কনফিডেনশিয়াল পার্টি। ক—ন।’ 

‘বার্মাতে আমাদের পার্টি খুব স্ট্রং। মাসবেস ভাল। মিলিটারির মধ্যেও আছে। ফরেস্ট ওয়ার্কারদের ইউনিয়ন না কী একচেটিয়া। উইমেন্স মুভমেন্টও খুব স্ট্রং।’ 

‘আপনাগ পার্টি যদি স্ট্রং হয় তাইলে যুদ্ধে এমন গো-হারান হারল ক্যা?’ 

‘স্ট্রং বলেছি। তার মানে কি পাওয়ারে আছি? পাওয়ারে আছে তো ব্রিটিশরাই। বার্মিজ ইভ্যাকুদের মধ্যে আমাদের বার্মা পার্টির কিছু নেতা আছেন, সাধারণ মেম্বারও আছেন অনেকে। এই নেতাদের সঙ্গে আমাদের একটা মিটিং ছিল। তাতে এই নেতারা বার্মার পতনের আসল কারণগুলি বলেন। সিঙ্গাপুর ফলের সঙ্গে-সঙ্গেই নাকী ব্রিটিশ ক্যাবিনেট বার্মা-ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ও প্রথমে দফায় দফায় ব্রিটিশ আর্মিকে রিট্রিট করায়। তারপর নন-ব্রিটিশ আর্মি। জাপান বার্মাতে যখন ঢোকে তখন সাউথ বার্মাতে মিলিটারি বলতে কিছু সিভিক গার্ড। এমন কী আর্মড পুলিশও না। থানা-পোস্টাপিসও তুলে নিয়েছে। যা হোক, আমাদের পার্টি বলছে—সিঙ্গাপুরের সামনের সমুদ্রে ব্রিটেনের প্রধানতম যুদ্ধজাহাজকে জাপানিরা ডুবিয়ে দেয়ার পর ব্রিটেনের প্রায় কোনো যুদ্ধজাহাজই ছিল না। সেই কারণে ওয়ার-ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত নেয়—জাপানকে সমুদ্রযুদ্ধ ও জঙ্গল যুদ্ধের সুযোগ দেয়া হবে না। গ্রেট ব্রিটেনের বল-ভরসা ছিল রয়্যাল এয়ারফোর্স আর ভারতীয় ইনফ্যানট্রি। ওয়ার-ক্যাবিনেট নির্দেশ দেয়—কুকুরী যেমন শ্রাবণ-ভাদ্রে কুকুরকে নিজের পেছনে আসতে বাধ্য করে, সেইভাবে জাপানী সৈন্যদের গাঙ্গেয় সমতলে নামাও। এটাও মিলিটারি অপারেশন কিন্তু মিলিটারির ভাষায় এটাকে বলা হয় রিকনোয়সাঁস। আমাদের পার্টি নেতারা বলেছেন, বার্মায় ব্রিটেন বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তাঁরা এও বলেছেন, ‘কালকাতাসহ পূর্বভারতকে আমরা রেঙ্গুন করতে দেব না।’ তাঁরা বেশ কিছু দলিলও দেখিয়েছেন। আমি পার্টি-শৃঙ্খলা আরো ভাঙব না। শেষ কথাটা এই যে ডরম্যান-স্মিথ নামে এক শাহেব, খুবই উচ্চপদস্থ, সিবিল সার্ভিসের বা মিলিটারির, তিনি বার্মাপতনে ক্ষিপ্ত হয়ে যান। বার্মার সেনাবাহিনীতে আমাদের লোকদের তিনি জানান, বেসামরিক ও সামরিক ব্যবস্থার এতটা বিচ্ছিন্নতা ইচ্ছাকৃত বলে সন্দেহ হতে পারে। যুদ্ধের একটা কৌশল এমন করে ব্যবহার করা হল—যেন লেজ গুটিয়ে শেয়াল পালানো। এই ডরম্যান-স্মিথকে ঠান্ডা করতে তাঁকে কলকাতাকে কেন্দ্র করে বেসামরিক-সামরিক সংযোগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আপনি এর পাত্তা লাগিয়ে এর সঙ্গে দেখা করুন।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *