১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৭৪. নৌযুদ্ধ

১৭৪. নৌযুদ্ধ 

গোপালগঞ্জে সভার ব্যাপার বা হিন্দুমহাসভার ঘোষিত সভা নিয়ে কিছু ভাবার আগেই যোগেন অফিসারদের সঙ্গে মিটিঙে ফেঁসে গেল। মিটিঙের পর তার মনে হয়—তার এখানে আসল উদ্দেশ্য ছিল এই মিটিংটাই। গোপালগঞ্জের জন্য যে সে একটা বেশ জঙ্গি সমাবেশের কথা ভেবেছিল সেটা হয়তো হবে—কিন্তু ঐ তাত্ত্বিক আলোচনাকে রাজনীতির ভাষা করে তোলা যাবে না। তার জন্য অন্য সভা করতে হবে। নদীর ওপর বেশ দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল, গোপালগঞ্জের স্টিমার ঘাটায় কিছু একটা ঘটছে যেন। অনেক সময় লঞ্চের ছাদ থেকে পাড়ের এই ঝড়-তাণ্ডব দেখা যায়। 

কিন্তু গোপালগঞ্জের কাছাকাছি এলে বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়—গাছপালার ঝড় নয়, মানুষের ভিড়। যোগেন বুঝে উঠতে পারে না—হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস তো এই সভার জন্য তৈরি হচ্ছে অনেকদিন। সে যে আজ আসবে এখানে, তা কি তেমন করে সবাই জানে? তাহলে এই সমাবেশ তো ওদেরই অভ্যর্থনা করতে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। নদীর মাঝখানে লঞ্চটাকে থামিয়ে রেখে যোগেন সারেঙের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। সারেঙের কাছে অনেক সময় টেলিস্কোপ থাকে। 

যোগেন সারেঙের কাচে মোড়া দিগন্ত ঘেরা ঘরটায় ঢুকলে সারেঙ টেলিস্কোপটা নামিয়ে বলে, ‘আ, একটা লঞ্চ যেন দেখা যায়—’ 

‘আর একটা? দেখি?’ 

টেলিস্কোপটা লাগিয়ে যোগেন দেখে, হ্যাঁ, আর-একটা লঞ্চ পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। পাড়ের সঙ্গে ঐ লঞ্চের মাথা সমান হয়ে যাওয়ায় দূর থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। যোগেন আর একটু ঘুরিয়ে দেখে—লঞ্চের মাথায় একটা ঝান্ডা উড়ছে। যোগেন টেলিস্কোপ থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলে—’একডা ঝান্ডা য্যান! দ্যাহেন তো কার—’, যোগেন চোখদুটো রগড়ে ফেলে। সারেঙ বলে, ‘অ ত হিন্দুবাবুগ ফ্ল্যাগ, আপনাগ না। লিগেরও না।’ যোগেন টেলিস্কোপের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সারেঙ তার ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নামতে ঘুরলে যোগেন টেলিস্কোপটা একটু হেলিয়ে নদীপাড় বনবাদাড় ও মানুষজনসহ আকশে তুলে দিয়ে ও নামিয়ে চিৎকার করে সারেঙকে বলে, আপাতত পেছন থেকে, বস্তুত সামনে থেকে, ‘নাও, নড়াইয়ো না। খাড়াইয়্যা রও।’ 

জলযুদ্ধের সেনাধ্যক্ষের আদেশ সারেঙ শুনেছিল কী না তা নিয়ে কোনো তদন্ত দরকার হয়নি। যোগেনের সঙ্গে লঞ্চে ছিলেন ডিভিশন্যাল কমিশনার আর বরিশালের এস পি। শাহেবরা সশরীর উপস্থিত থাকতে সারেঙের পক্ষে সেনাপতি হিশেবে যোগেনকেই একমাত্র মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। তার ওপর ইতিমধ্যে গোপালগঞ্জের পাড় থেকে একটা ছোট ছিপ মেঘনার আকাশ থেকে তারা খসার মতো ছিপের পেছনে এক আন্দোলিত ফেনরেখা মোছার আগেই এই জাহাজের তলায় এসে পড়ে। নামিয়ে দেয়া দড়ির মইতে ইঁদুরের মত উঠে যায় নেংটি পরা জলের রাখাল, দোতলায় ও যোগেনের অনুপস্থিতিতে আক্রমণ করে—’করেন কী, আগে আইছে বর্ধমান, তার বাদে শ্যামপ্রসাদ, তারও বাদে এক লঞ্চ। আপনারা নাও খাড়াইয়া ক্যা? শ্যাষে উরা যদি নামাইয়া পড়ে, এ–ই, নাও ছাড়ো নাও ছাড়ো।’ হয়তো স্বরে কোথাও স্বাভাবিক এমন নেতৃত্ব ছিল যে লঞ্চের ইঞ্জিন থরথরিয়ে জল ভাঙতে শুরু করে ও গতি পায়। সারেঙের ঘরে এক কাচঘেরা দীর্ঘ দিগন্ত যোগেনের টেলিস্কোপের লেন্সে নিকটতর হতে-হতে, হতে-হতে পুরো লেন্সটাকে যখন নানা রঙিন অসংখ্য বিন্দুতে ভরে দেয়—যোগেন সারেঙের ঘর থেকে বেরিয়ে লঞ্চের মাথায় বুকের ওপর আড়াআড়ি হাতে শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। 

সরকারি সেই লঞ্চের ফ্ল্যাগপোস্টে যোগেনের মাথার ওপরের আকাশটুকুতে ইউনিয়ন জ্যাকের মোটা-মোটা রেখাগুলি মেঘনার সামুদ্রিক হাওয়ায় ভেঙে ভেঙে গড়িয়ে আবার জুড়ে যাচ্ছিল, আবার ভাঙছিল। সেই নিশানের ও নদী-উৎক্ষিপ্ত এই হাওয়ার লাস্যময় শৃঙ্গার থেকে যে ‘পাওয়ার’ উৎপন্ন হচ্ছিল তারই জোরে লঞ্চের বাঁশি বেজে ওঠে গম্ভীর লম্বিত—সামনের লঞ্চটিকে সরে যেতে, ও যোগেন্দ্রনাথের লঞ্চটিকে ঘাটায় ভিড়বার পথ করে দিতে, বলে।

সারেঙের শূন্য ঘরের সামনে যোগেন্দ্রনাথ বুকের ওপর হাত আড়াআড়ি রেখে দাঁড়িয়েই ছিল। 

বর্ধমানের মহারাজা, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, আশুতোষ লাহিড়ী ও হিন্দু মহাসভার আরো নেতাদের নিয়ে যে লঞ্চটি দাঁড়িয়ে ছিল অথচ নোঙর ফেলতে পারেনি, সেটি ততক্ষণে প্রশস্ততর জলের দিকে মুখ ঘুরিয়েছে। ঘাটায় জড়ো মানুষজনের গলা থেকে আওয়াজ বেরয়, ‘জয়, জয় যোগেনো মণ্ডল’। 

হিন্দু মহাধর্ম মহাসম্মিলন বেশ কয়েকমাস ধরেই তৈরি হচ্ছিল। স্থানীয় অনেক নেতাই সেই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় মনে হচ্ছিল—সম্মিলন তো হবেই, যতটা ভাবা গিয়েছিল তার চাইতে বড় তো হবেই, ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ থেকে বরিশালের নাজিরপুরের ‘লড়া’ গ্রাম পর্যন্ত নদীতীরের অনেকগুলি জায়গাতেই দিনের বেলা সম্মিলন হতে-হতে আসবে। ‘লড়া’ গ্রামটি সমুদ্র থেকে তিরিশ মাইলের বাইরে। এই হিন্দু সম্মিলনের মূল কর্মসূচি ছিল—১. তপশিলিদের হিন্দু ধর্মের অন্তর্গত করে নেয়া, ২. শুদ্ধি-সংক্রান্ত কিছু অনুষ্ঠানে তপশিলিদের অস্পৃশ্যতা দূর করা ও পাওয়া গেলে দু-একজন মুসলমানকে হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনা, ৩. নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় মুসলমান, তপশিলি ও নমশূদ্রদের বাংলার রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে ওঠায় যোগেনের নেতৃত্বের বিরোধিতা। 

বরং একটু দেরি করেই যোগেন সিদ্ধান্ত নেয় যে এ সম্মিলন করতে দেয়া হবে না। ডিনায়্যাল পলিসির ফলে নিষিদ্ধ এলাকায় এই রকম সম্মিলন করে নমশূদ্র মানুষদের যুদ্ধের বলি করা হচ্ছে—এই যুক্তিতে। অবস্থা ক্রমেই বদলাতে থাকে ও তপশিলিদের মধ্যে মতপার্থক্য ঘটে। কেউ-কেউ কংগ্রেসকে, কেউ বা হিন্দু মহাসভাকে সমর্থন করার পক্ষে যায়। ফলে এই হিন্দু সম্মিলনের উদ্দেশ্যও বদলে যায়। যোগেনের মনে হয়—প্রকাশ্য বিরোধিতা ছাড়া তপশিলিদের ও নমশূদ্রদের হিন্দু, কংগ্রেস ও মহাসভা-নির্ভরতা থেকে বের করে আনা সম্ভব নয়। 

ঠিক যে-রুটে হিন্দু সম্মিলন হওয়ার কথা ছিল, সেই রুট ধরেই যোগেন লড়া গ্রামে পৌঁছুল। অজস্র মিটিং করল। একটিও জনসভা নয়—মুসলমান পাড়ায়, নমশূদ্র পাড়ায়, খালের এ-পারে ও-পারে, জোলাপাড়ায়, নুইন্যা পাড়ায়, কোনো কোনো স্কুলে, মাঝিপাড়ায়, শেষপর্যন্ত গৌরনদীতে; আরো শেষ পর্যন্ত মৈস্তারকান্দিতে। শ্বশুর বাড়িতেও এক পাক। হ্যাঁ। লঞ্চেই। অফিসারদের বরিশাল সার্কিট হাউসে জমা রেখে। তার দপ্তরের দুজন অফিসারকে লঞ্চেই রেখে। হ্যাঁ। লঞ্চে ইউনিয়ন জ্যাকটা কখনো নেতিয়ে ছিল, কখনো আবার উচ্ছ্বসিতও। 

যোগেন ডেকে ওঠে, ‘উদ্‌দুর রে, তোর মায়ের বাপের দ্যাশ দ্যাখ রে।’ ডাকে আপত্তি করার মত কেউ কাছে না-থাকায় উদ্‌দুরও ডেকে ওঠে ‘মা-মা-আ।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *