১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৭৮. তারিক-ই-যোগেন

১৭৮. তারিক-ই-যোগেন 

আইনসভার ভোটের ডাক আকস্মিক ঠেকলেও, আকস্মিক নয়। এই ভোট হওয়ার কথা ছিল ১৯৪২-এ। সেইজন্যই ১৯৪১-এর সেনসাসে এত মারামারি-তপশিলিরা তপশিলি-না- হিন্দু। ৪২-এর ভোট স্থগিত রাখা হল যুদ্ধের কারণে। একই সঙ্গে একটা দেশকে পুড়িয়ে ছাই করে, লোকজন সরিয়ে, বেকবুল করা যায় আবার তার সঙ্গে ভোটও করা যায়। 

১৯৪৬-এ তো করাই যায়। সারা ভারতের আরো সব প্রদেশের সঙ্গে। করাই যায় বলে করা নয়। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। যুদ্ধে ব্রিটেন-আমেরিকা-সোভিয়েত জিতেছে। ইয়োরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ দু-টুকরো হয়েছে। ইংরেজদের পক্ষে ভারত হয়ে গেছে গলার ঢেঁকি। গেলার চেষ্টা করে লাভ নেই, ওগরাতে পারলে বেঁচে যায়। কিন্তু কারো হাতে তো ‘পাওয়ার টা জমা দিতে হবে। যে হোক, সে হোক। গান্ধীজি বারতিনেক ওয়ার্নিং দিয়েছেন—তোমরা চলে যাও, দেশের যা হবে, হবে, আমাদের দেশ, আমরা দেখব। 

তাতেই শাহেবদের ভয় ধরে গেছে। তারা না-হয় ভারত ছেড়ে চলে গেল, বস্তুত গিয়েওছিল তাই, সঙ্গে যদি ‘পাওয়ার-টাও’ তাদের সঙ্গে ভারত ছেড়ে লন্ডনে চলে যায়। গ্রেট ব্রিটেনের পক্ষে ভারত সাম্রাজ্য তখন দিন-আনি-দিন-খাইয়ের ব্যাপার। ভারতের কাছে ঋণ প্রতিদিন বাড়ছে। ব্রিটিশ ফৌজ ও অফিসারদের মাইনে দেয়ার টাকা পর্যন্ত নেই। যে কারণে ১৭৫৭তে কলোনি বানাতে হয়েছিল, তার উল্টো কারণে ১৯৪৬-এ কলোনি ছাড়তে হয়েছিল। সাম্রাজ্যবিস্তার, কলোনিবিস্তার, বিভাজনবিস্তার, আধুনিকতা বিস্তার, উত্তর-আধুনিকতা বিস্তার, উত্তর-কলোনি বিস্তার—এ-সব নিয়ে খুব জোর তর্ক-বিতর্ক চলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে, গবেষণাগারগুলিতে। ইংরেজরা ১৯৪৬-এ জেনে ফেলেছে, হিশেবের চাইতে ঠিকঠাক আর কীসে জানবে–১৭৫৭-তে মুর্শিদাবাদের সোনাভরা কলসীগুলি লন্ডনে পাঠাতে একটা জাহাজে কুলোয় নি, তাই গেছে। সেগুলো থেকে ১৯৪৬-এ সেই ততদিনে ফাঁকা ও ফাঁপা কলসীগুলো, ফাঁপা ও শূন্য কলসীগুলি ভারতে ফেরৎ পাঠানোর জন্য ভাড়াশোধের পয়সাও তার নেই। সুতরাং যুদ্ধের শেষে বিউগল বাজার আগেই ব্রিটেন তিন-তিনজন মন্ত্রী এসে পড়লেন। তাঁরা দিলেন এক ক্যাবিনেট প্ল্যান। 

কিন্তু ১৭৫৭-ই হোক আর ১৯৪৬-ই হোক ভারতের প্রায় দশ কোটি শিডিউল্ড কাস্টের অন্তর্গত একটি লোকও ঐ পঞ্জিকার কোনো নির্ঘণ্টের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিল না। 

১৯৪৫-৪৬-এ ইতিহাসের নির্ঘন্ট (সচেতন বা অচেতন) ও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল নামের একটা লোকের ‘ব্যক্তিগত কোষ্ঠী (সচেতন বা অচেতন)’ পরস্পরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। সেই দুটো ঘটনার তারিখগুলি যদি পরপর সাজানো যায়, তা হলে হয়তো আভাস পাওয়া যায়—এ ওর শরীরের বা জীবনযাপনের ভিতর ঢুকে পড়ার প্রক্রিয়াটা ছিল কতই স্বাভাবিক, অসম্ভব, ধর্মাশ্রিত, অধর্মাশ্রিত, পরিণত, অপরিণত, বানানো, ও সংগত। 

১৯৪৬ 

২৪ মার্চ – গবর্নর্স প্লেস-এর দরবার কক্ষে সারাওয়ারর্দি মন্ত্রিসভার শপথ। যোগেনসহ। 

২৬ মার্চ – ব্রিটিশ ক্যাবিনেট জানাল যে তারা ১৯৪৮ সালের জুনে ভারতের শাসনক্ষমতা ছেড়ে দেবে। তিনজনের এক প্রতিনিধি দল প্রস্তাব নিয়ে দিল্লি এলেন। তিনজনই ভারতের সঙ্গে পুরনো সম্বন্ধে বাঁধা—ক্রিপস, আলেকজান্ডার ও প্যাথিক লরেন্স। এঁদের হাতে ছিল ক্রিপস সাহেবের তৈরি করা সেই পুরনো ম্যাপ-ভারতের প্রদেশগুলিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা। 

৫ মে – ভারতের বড়লাট লর্ড ওয়াভেল ভারতীয় নেতাদের সিমলায় ডাকলেন, ক্যাবিনেট মিশন নিয়ে আলোচনা করতে। 

১২ মে – ঘোষণা—সিমলা বৈঠক ব্যর্থ। বাংলার কোনো প্রতিনিধি সিমলায় ছিল না। 

৬ জুন – লিগ জানাল, তারা ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাবে রাজি। 

২৪ জুন – কংগ্রেস জানাল, সংবিধান রচনার জন্য গণপরিষদে রাজি। কিন্তু কোনো অন্তর্বর্তী সরকারে রাজি নয়। ৬-৭ জুন মহারাষ্ট্রের আইনসভা আম্বেদকরকে গণপরিষদে পাঠায় নি। আম্বেদকর হেরে গিয়েছিলেন। যোগেন তাঁকে কলকাতায় আসতে বলল। ডক্টর আম্বেদকর যে হিন্দুদের কতটা অসহ্য ছিলেন তার ইতিহাস কী সম্পূর্ণ লুপ্ত? এরা হিন্দু মহাসভার হিন্দু নন। এঁরা ‘জাতীয় হিন্দু’। তাঁকে ভাবা হত, ব্রিটিশের চর। আম্বেদকরের এখনকার স্বীকৃতি (১০১০) তাঁর আমৃত্যু অপমানের জীবনকে মিথ্যা করে দেয় না। সর্দার প্যাটেল ঘোষণা করেছিলেন, আম্বেদকরকে গণপরিষদে ঢুকতে না দেয়ার ব্যবস্থা পাকা। যোগেন তাঁকে বাংলায় ডেকে এনে প্রয়োজনের চাইতেও বেশি ভোটে তাঁকে জিতিয়ে তুলনাহীন সংগঠনজ্ঞান, রাজনৈতিক কৌশল ও পার্লামেন্টারি দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। 

২৫ জুন – লিগ জানাল, তারা অন্তর্বর্তী সরকারে আসবে। 

৬ জুলাই – কংগ্রেস বম্বে অধিবেশনে মিশন-প্রস্তাবে রাজি হল। (লিগের সম্মতির একমাস পর)। 

২৭ জুলাই – কংগ্রেসের মিশনপ্রত্যাখ্যানের মাসখানেক পর লিগ জানাল, তার ওয়ার্কিং কমিটির বম্বে অধিবেশনের পর, যে তারা আর রাজি নয়। তাদের সম্মতি-অসম্মতির কোনো মূল্য দেয়া হচ্ছে না, তাদের দাবিও মানা হচ্ছে না, তাই তারা ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু করবে।

১০ আগস্ট – কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি জানাল-তারা মিশনপ্রস্তাব সম্পূর্ণ মেনে নিচ্ছে, কোনো শর্ত ছাড়া। 

১২ আগস্ট – গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কংগ্রেসের নেতা হিশেবে জওহরলাল নেহরুকে ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল আমন্ত্রণ জানালেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে। 

১৬ আগস্ট – কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। উপলক্ষ লিগের ঘোষিত প্ৰত্যক্ষ সংগ্রাম। 

২২ আগস্ট – জওহরলাল ভাইসরয়কে জানালেন তিনি কোয়ালিশন সরকার তৈরি করতে রাজি। কিন্তু লিগের কাছে মাথা নোয়াবেন না ও এ-ব্যাপারে তাদের মতামতও মানবেন না। 

৪ সেপ্টেম্বর – ভাইসরয় প্রাসাদে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম অধিবেশন-লিগ ছাড়াই। লিগের জন্য কয়েকটি মন্ত্রক খালি রাখা হল।

১১ সেপ্টেম্বর – জিন্না বললেন, গৃহযুদ্ধ আসন্ন। 

৬ অক্টোবর – জিন্না জানালেন, লিগ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেবে। সন্ধে নাগাদ বাংলার প্রধানমন্ত্রী সারওয়ার্দি জিন্নার কাছ থেকে ফোন পেলেন— যোগেন মণ্ডল অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী হতে সম্মত কী না, জানতে ও জানাতে। গোপনতা রক্ষা করতে। রাত নটার খবরে দিল্লি থেকে সংবাদ প্রচারিত হল—অন্তর্বর্তী সরকারে লিগের পাঁচ মন্ত্রীর নাম। 

জিন্না অন্তর্বর্তী সরকারে তাঁর প্রতিনিধিদের নাম ঘোষণা করলেন। তার চারটি নামই সবার জানা ও তাঁদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত। লিগের মন্ত্রিতালিকা কংগ্রেসের মন্ত্রিতালিকা থেকে অধিকতর সম্ভ্রান্ত ছিল। লিয়াকৎ আলি খান, আই-আই চুন্দ্রিগড়, আবদুর রব নিস্তার, গাজনফর আলি খান। পঞ্চম নামটি ছিল, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। 

পঞ্চম এই নামটি নিয়ে প্রায় বিশ্বব্যাপী আলোড়ন দেখা দিল—অন্তত ইংল্যান্ডে, আমেরিকায় ও ভারতে। কংগ্রেসে। ভাইসরয় ও ইন্ডিয়া অফিসে। ইয়োরোপিয়ান ব্লকে। লিগে। কাগজপত্রে। এতদিনের পুরনো স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের নামধাম তো সকলের মোটামুটি জানা। এমন কী কে কোন উপদলে, তাও তো সবার জানা। এ-নামটি কারো চেনা নয়। 

লিগ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দিচ্ছে—এই সিদ্ধান্তের পর খাজা নাজিমুদ্দিন তো নিশ্চিতই ছিলেন যে বাংলার প্রতিনিধিত্ব তাঁকেই করতে হবে। পটুয়াখালির ভোটে (১৯৩৭) হকশাহেবের কাছে সেই শ্বাসরোধী হার হেরে খাজা ভোটাতঙ্কে ভুগতেন। ৪৬-এর ভোটে তিনি দাঁড়াননি। কেন্দ্রীয় সরকারে তাঁর তো না-গেলেই নয়। তিনি কলকাতায় না-ফিরে খবর পাঠালেন তাঁর খাশ-বেয়ারা নোন্তাকে দিয়ে একটা ক্যাবিনসুটকেসে তাঁর লিস্টি অনুযায়ী পোশাক-আশাক ও ওষুধপত্র ভরে যেন পাঠানো হয়। সফিকুল যেন আপাতত ছ-মাসের ছুটি নেয়, উইদাউট পে। যখন দিল্লি আসব। 

সফিকুল তাঁর এক ভগ্নীপতির ছেলে, মানে ভাগ্নে। বিলেতে পড়াশুনো শেষ করে এসেছে। একটা ব্রিটিশ ফার্মে কাজ শুরু করেছে, সেটার মালিক হওয়ার গোপন ইচ্ছায়। সফিকুলকে নাজিমউদ্দিন তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি করবেন। 

নাজিমুদ্দিনকে জিন্না মন্ত্রী বানালেন না। বানালেন যোগেন মণ্ডলকে? একে হিন্দু তায় নিচু জাত? নাজিমুদ্দিন বলেও ফেললেন, ‘এ-রকম মনোনয়ন অর্থহীন’। 

গান্ধীজি বলে ফেললেন, ‘নতুন কেন্দ্রীয় সরকারে আরো একজন হরিজন মন্ত্রী হলেন, এতে তো আমার খুশি হওয়ারই কথা। কিন্তু সত্যি খুশি জানালে তো নিজেকে ও জিন্নাশাহেবকে ঠকানো হবে। কারণ, জিন্নাশাহেব তো বলেন হিন্দু আর মুসলমানরা দুটো আলাদা জাতি। আর লিগ হচ্ছে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন। তাই যদি, তবে তিনি একজন হরিজনকে কেন তাঁর প্রতিনিধি করেন?’ 

মৌলানা আবুল কালাম আজাদ পরে লিখেছেন, ‘(মিঃ জিন্না) যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে মনোনীত করলেন। এমন মনোনয়নে সবাই মজাও পেয়েছিল, রেগেও গিয়েছিল। মিঃ সারওয়ার্দি যখন তাঁকে তাঁর মন্ত্রিসভার একমাত্র হিন্দু সদস্য বলে মনোনীত করেছিলেন, তখন তিনি বাংলায় প্রায় অপরিচিত ও সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর কিছু করার ছিল না। তাঁকে একটা দপ্তর দিতে হবে বলেই তাঁকে আইনমন্ত্রী করে দেয়া হয়। তখন ভারত সরকারের বেশির ভাগ সেক্রেটারিই ছিলেন ব্রিটিশ। তাঁরা প্রায় রোজই নালিশ করতেন মিঃ মণ্ডলের মত মেম্বারের সঙ্গে কাজ করা বড় মুশকিল। 

সম্রাট ষষ্ঠ জর্জকে বড়লাট লর্ড ওয়াডেল ১৯৪৭-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি জানালেন, ‘লিগের তপশিলি প্রতিনিধি মণ্ডল হয়েছেন আইনমন্ত্রী। তিনি গ্রামে-গ্রামে তপশিলিদের রাজনৈতিক মিটিং করে বেড়ান।’ 

সম্ভাব্য পাকিস্তানের নিশ্চিত প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান ও তাঁর অনুগামী লিগনেতারা জিন্নার এই মনোনয়নে বিরক্ত হয়েছিলেন ও যোগেনকে পাকিস্তানের গণপরিষদের অস্থায়ী সভাপতি করতে চান না। জিন্নাশাহেবের আদেশে মানতে বাধ্য হন। 

যোগেন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাংলার উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতারা, এমন কোনো নোংরা কথা নেই যা বলেননি। উচ্চবর্ণের এই হিন্দু নেতারা শুধুই কংগ্রেসের বা হিন্দু মহাসভার সমর্থক নন, এমনকী বামপন্থী হিন্দু নেতারাও তাঁর সম্পর্কে ঘৃণা প্রচার করেছেন। এখনো করেন। 

তার একটিই মাত্র কারণ। 

১৯৩৭-এর ভোটে মুসলিম-মন্ত্রিসভার শাসনে বসবাস বাঙালি উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কাছে ছিল ধিক্কারময় এক বন্দীজীবন—যুদ্ধে দখল-হওয়া শহরের বা দেশের অধিবাসীদের যেমন হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১৯৪৭-এ বাংলা ভাগের পক্ষে আন্দোলনের সময় সর্বত্র এই কথা প্রচার করেন যে—দীর্ঘ মুসলমান শাসনে বাংলার হিন্দুদের সমস্ত সম্পদ লুট হয়ে গেছে, হিন্দু সংস্কৃতি ও ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে পরাজিতের সংস্কৃতি ও ধর্ম, মুসলমানদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রেখে বাঙালি হিন্দু বাঁচতে চায়, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গকে নিয়ে আমরা হিন্দুপ্রধান একটি প্রদেশ চাই, সে-প্রদেশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। 

শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু সব সময়ই উচ্চবর্ণ হিন্দু। ফজলুল হকের দুই মন্ত্রিসভা, নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভা ও সারওয়ার্দির মন্ত্রিসভায় হিন্দু মন্ত্রীরা উচ্চবর্ণ হিন্দুদের যথাযথ প্রতিনিধি বলে স্বীকৃতই হননি—সে নলিনী সরকার, স্যার বিজয়, তুলসী গোস্বামী যেই হন না কেন। বাঙালি সমাজে এদের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তি সত্ত্বেও উচ্চবর্ণ হিন্দুদের কাছে তপশিলিদের হিন্দু-প্রতিনিধিত্বই ছিল সবচেয়ে আপত্তিকর। মহারাজা শ্রীশ নন্দীই হন আর রাজা প্রসন্নদেবই হন—এদেরকেও বাঙালি হিন্দুরা ডাকতেন, লোকাস্ট। 

উচ্চবর্ণ বাঙালি হিন্দু যে কাকে হিন্দু বলে মানতে চাইতেন, তার হদিশ করাই মুশকিল। মনে হয়, বাঙালি হিন্দুদের উচ্চবর্ণের এই জাতপাত বোধ গোপন ও বংশানুক্রমিক রক্তব্যাধির মত হয়ে গেছে ও এই মনোভাব লালন-পালন করতেন অশিক্ষিত, হতদরিদ্র, ভিক্ষাজীবী, দাননির্ভর পুরোহিতরা। যে-কোনো মাঝারি আয়ের বাড়িতেও বাঁধা পুরোহিতের সিদ্ধান্ত চরম ছিল যে-কোনো অবৈষয়িক ব্যাপারে। কখনো-কখনো বৈষয়িক মামলা-মোকদ্দমাতেও। যজমানের স্বার্থ ও ইচ্ছা বুঝে নিয়ে এঁরা হত্যা ও ধর্ষণসহ যে-কোনো বিধান দিয়ে দিতেন। এই প্রতিপত্তি ও অধিকার ব্রাহ্মণ ছাড়া কারো ছিল না। বাংলায় হিন্দু রক্ষণশীলতার এই ব্রাহ্মণ-নির্ভরতার সংক্রমণ সমাজে ব্যাপক ছিল। বাঙালি হিন্দু কাকে, সৎ হিন্দুর মর্যাদা দেবে তার কোনো সূত্ৰ নেই। তুলসী গোস্বামী তো গোঁসাই-বামুন, জমিদার। তাঁকেও যে হিন্দুরা হিন্দুপ্রতিনিধি মানতে চাইত না, তার হয়তো একটা কারণ, তুলসী গোঁসাইয়ের আধুনিকতা। মুর্শিদাবাদের নওদী জমিদারদের দানে যারা জীবনধারণ করত, তারা তাঁদের বা কাউকেই ভুলতে দিত না যে ওঁরা তিলি। শোভাবাজার রাজবাড়ির কৃপা ছাড়া যাদের চলত না, সেই বামুনরা তাদেরই বিরুদ্ধে প্রকাশ্য মত দিত, ‘দেব আবার কায়স্থ হল কবে?’ প্রসন্ন দেব রায়তদের তো ভারতের আদিবাসী ভাবতেন এঁরা।*

[১. ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর ‘অন্তর মহল’-সিনেমায় বর্ণহিন্দুদের শাহেব-আনুগত্য ও ব্রাহ্মণ-আনুগত্যের বীভৎসতা অতুলনীয় যাথার্থে দেখিয়েছেন।]

আর-কোনো প্রদেশে বা জনগোষ্ঠীতে ব্রাহ্মণদের বিচার বা ব্রাহ্মণোচিত বিচার জাতপাতের প্রধান নিয়ামক নয়। অব্রাহ্মণ বর্ণহিন্দুও ব্রাহ্মণদের মত পারিবারিক রীতিনীতি মেনে চলতে চান ও সমাজে যদি তাঁর প্রতিষ্ঠা থাকে, তা হলে তিনি বামুনদের মতই বিধান দেন। 

সেই হিন্দু গৌরববোধ থেকেই বাংলার উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতারা—কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার, আর তার বাইরের নেতারাও, তাঁদের সমস্ত শক্তি ও চাতুর্য ব্যবহার করে বাংলা বিভাজনে কেন্দ্রীয় কংগ্রেসকে রাজি করান। বাংলা বিভাজন কোনো পক্ষেরই রাজনৈতিক লক্ষ ছিল না। জিন্না তো এমন কী ‘স্বাধীন বাংলার হুজুগ শুনে বলেছিলেন, ‘ভালই তো। ওরা আলাদা হলে ভাল থাকবে একসঙ্গে।’ যুদ্ধের পর ব্রিটেন সত্যি করেই বিপদে পড়েছিল। যুদ্ধের সময় ভারত থেকে লোহা-সিমেন্টের মত দরকারি জিনিস ও বোমা-তৈরির একটা বিশেষ উপকরণ এত বেশি নিয়েছে যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার কাছে ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের ধার হয়ে গেছে লক্ষ-লক্ষ পাউন্ড। সেই কারণে যুদ্ধের একেবারে শেষ সময় থেকেই ব্রিটিশ সেনাপতি, প্রধানমন্ত্রী এটলি ও ভাইসরয়দের এমন প্রাণান্তিক চেষ্টা ভারতকে ঘাড় থেকে নামাতে। ব্রিটেনের তখন একমাত্র উদ্দেশ্য, ভারতশাসনের দৈনিক খরচা কমানো। পাউন্ড বাঁচানো। সেই খরচার অনেকটাই ব্রিটিশ সৈন্যদের ও অফিসারদের মাইনে দেয়ার খরচা। ভাঁড়ে মা ভবানী নিয়ে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা জানে না আগামীকাল বাজার হবে কী না। ব্রিটেন যাকে বলে ক্ষমতা হস্তান্তর, ভারতীয়রা যাকে বলে স্বাধীনতা, পাকিস্তান যাকে বলে পার্টিশন—সেই ঘটনা ঘটল ১৪-১৫ আগস্ট, ১৯৪৭। তার আগেই ব্রিটিশ সৈন্যদের দেশে ফেরত পাঠানো শুরু হয়ে গেছে। এমন কী, প্রাদেশিক গভর্নররাও জানতেন না। এটা যেন সামরিক সিদ্ধান্ত। পাঞ্জাবের গভর্নর যখন লাহোরের গৃহযুদ্ধ থামাবার জন্য ও বাংলার গভর্নর যখন কলকাতার দাঙ্গা থামাতে মিলিটারি তলব করছে, তখন প্রায় কোনো ব্রিটিশ ট্রুপই নেই দিল্লিতে বা ফোর্ট উইলিয়ামে। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা—স্বাধীনতার আগে ও পরে—পাঞ্জাবে বাংলায় বিহারে ঘটেছিল ব্রিটিশ ইনডিয়া থেকে ব্রিটিশ সৈন্য দেশে পাঠিয়ে দেয়ার ফলে অনিবার্য প্রশাসনিক শূন্যতায়। সেই শূন্যতা সম্পর্কে গোপনতায়। ও প্রকাশ্য মিথ্যাচারে। মাউন্টব্যাটেন তো যখন-তখন লন্ডন যেতেন শলাপরামর্শ করতে। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা তাঁর দ্রুততায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রস্তাব পর্যন্ত নেয়। সে-রকমই এক আলোচনায় ক্রিপসই বোধহয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন—এই অবিশ্রান্ত দাঙ্গা থামানোর জন্য কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন। মাউন্টব্যাটেন তাঁর ইতিমধ্যে বিখ্যাত জনচিত্তহারিতা দিয়ে পুরো ব্রিটিশ মন্ত্রিসভাকে এই মিথ্যা বললেন যে আমি হুকুম দিয়েছি এয়ারফোর্সকে নিচু থেকে ফ্লাইটে, যেখানেই গোলমাল দেখবে, সেখানেই বম্বিং করবে। অকপট এই মিথ্যা মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ মন্ত্রিসভাকে বললেন, যখন পাঞ্জাব থেকে বা পাঞ্জাবের দিকে, ট্রেন যাতায়াত করছে শুধু মৃতদেহ নিয়ে ও ভারত সরকারের রেলদপ্তর রেলযাত্রাকে বিপদসঙ্কুল ঘোষণা করেছেন। প্রোটোকলচালিত ব্রিটিশ প্রশাসনের মাথায় যে-মন্ত্রিসভা তাঁদের কারো কাছ থেকে এই প্রশ্নটি এল না যে এয়ারফোর্সকে কী করে ভাইসরয় ‘হুকুম’ করতে পারেন, সেটা তো সি-ইন-সির বিষয়। 

কিন্তু ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা তখন মিথ্যাই শুনতে চায়। 

ভারত ভাগ করেও যে ভারত ছাড়তে হবে এমন একটা নীতি তৈরি করতে ও ‘ক্ষমতা হস্তান্তর’-এর জন্য একটা সময়সীমা দিয়ে মহারানি ভিক্টোরিয়ার পুতি আর সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের ভাগ্নে মাউন্টব্যাটেনকে নতুন নীতির নতুন রূপকার বানিয়ে দুনিয়া-ভর ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের’ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ব্রিটিশ সূর্য এখন, যেখানে পারে সেখানেই ডুববে। ১৯৪৭-এর ৫ জানুয়ারি সেই বিতর্ক শুরু হল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। ৬ জানুয়ারি চার্চিল বিরোধী পক্ষের নেতা হিশেবে গবর্মেন্টকে তুলোধোনা করলেন, ‘পার্টিশনে আর কুলবে না, এখন খণ্ড-খণ্ড করতে হবে। লাস্ট ডেট দিয়ে দেয়া হচ্ছে ১৪ মাসের। এ তো গিলোটিনের ব্যবস্থা। এই সময়ের মধ্যে কোনো দরকারি কথাই বলা হবে না। নেহরুকে দিয়ে ‘অন্তবর্তী’ এক সরকার খাড়া করাই হয়েছে সর্বনাশা ভুল। সেই ‘অর্ন্তবর্তী’ ক্ষমতার চার মাসে দাঙ্গায় যা খুন হয়েছে, তার আগের ৯০-বছরে তেমন হয়নি।’ 

প্রধানমন্ত্রী এটলি তোতলাতে তোতলাতে উত্তর দিলেন, ‘ভারতে তো অর্থের বৈষম্য আছেই। কিন্তু সে তো আমাদের পুরো রাজত্বকাল জুড়েই আছে। অপদার্থ জমিদারগুলোকে খেদিয়ে আমরা কোনো সমাজবিপ্লব ঘটাতে চাইনি। সুদখোর মহাজনদের ঠেকানোর জন্য কিছু চেষ্টা হয়েছে বটে কিন্তু সেও তো কিচ্ছু নয়। আমরা তো ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা মেনে নিয়েই ওখানে আছি। এখন, যখন আমরা চলে আসতে চাই তখন বলা হচ্ছে, আমাদের দায়িত্ব পালন করে আসতে হবে। কিন্তু দায়িত্বটা আমাদের ওপর এল কখন? 

তখনো ভাইসরয় ওয়াভেলকে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন, ব্রিটেনের সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্সের ডিরেক্টার স্যার নরম্যান পি. এ. স্মিথ—এক তেতো বিষাদে এমন নিষ্ঠুর সত্য এত সহজ স্বরে আর কোনো ব্রিটিশ অফিসার বলেননি। ‘খেলা তো জমে উঠেছে। কংগ্রেস আর লিগকে একটা কেন্দ্রীয় সরকারে ঢোকানো গেছে। ফলে ভারতীয় রাজনীতিকে তার সাম্প্রদায়িকতা খেলার জন্য একটা সাইজমত কোণে গুঁজে দেয়া গেছে। এখন আমাদের শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে [ভারত] ছেড়ে চলে আসার সুযোগ এল। …হাঁফ ছাড়ার জন্য যেটুকু সময় পাওয়া গেছে তার পুরো সদ্বব্যবহার করতে হবে।…যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেক্রেটারি অব স্টেটকে বেসরকারি অফিসিয়ালদের দায়দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়া উচিত। এতে অফিসারদের মঙ্গল হবে। আর, এমন একটা ব্যবস্থার রাজনৈতিক সুবিধেও আছে। সমস্যাটাকে ঠিকঠাক সাম্প্রদায়িক স্তরে আটকানো যাবে। যত বড় দাঙ্গাই হোক, তাতে যেন আমরা কোনোভাবেই জড়িয়ে না পড়ি। জড়িয়ে পড়লেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়ে যাবে।… সাম্প্রদায়িকতা যত ভয়ংকরই হোক, ভারতের সমস্যা সমাধানের সম্ভাব্য উপায়ও তো বটেই। 

যুদ্ধে সর্বাধিকতম পাপ ঘটে যুদ্ধবিরতির পর 

তখন সত্য ও মিথ্যার ভিতর আর কোনো বাফার দেয়ালও থাকে না। 

তখন জাপানের হার ঘটে যাওয়ার পর আত্মসমর্পণটুকু যখন বাকি তখন অ্যাটম বোমার ধ্বংসক্ষমতা হাতেকলমে পরীক্ষা করতে হিরোসিমাতে অ্যাটম বোমা ফেলা হয়। 

তখন মাউন্টব্যাটেন ভারতভাগের নকশা তাঁর প্রাইভেটতম লকারে তালাচাবি দিয়ে আটকে রেখে ভারতের নেতাদের সঙ্গে মিটিং-য়ের পর মিটিং করে যান—সংবিধান পরিষদ নিয়ে, কংগ্রেসকে ও লিগকে দেশভাগে রাজি করাতে, কংগ্রেসকে পাকিস্তান মানাতে, লিগকে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগে রাজি করাতে, সীমান্ত কমিশন তৈরি করতে, একাধিক কমিশনের জায়গায় একজনকেই দুই কমিশনের চেয়ারম্যান বানিয়ে বহুত্ব রক্ষা করতে। 

ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব মেনে নিতে ও গণপরিষদে যেতে কংগ্রেস রাজি হওয়ায় ১২ মার্চ (৪৭) বম্বের সাংবাদিক সম্মিলনে জিন্না জানালেন—’আমরা পাকিস্তান কোনোদিনই চাইনি। ঐ নামটি আমাদের শত্রুপক্ষ কংগ্রেস আমাদের উপহার দিয়েছে. ইনশা আল্লা, আমরা পাকিস্তানই পাব।’ কংগ্রেস তখনো বলছে—পাকিস্তান মানছি না, কয়েকটি মুসলমান-প্রধান জেলামাত্র ছেড়ে দিতে পারি। 

২ মার্চ ৪৭-এর মধ্যরাতে মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে ঠিক হল, জিন্না দেখা করে বললেন, পরের দিন সকালে নেতৃ সম্মিলনে মাউন্টব্যাটেন তাঁর যে-প্ল্যান ঘোষণা করবেন, তাতে পূর্ণ সম্মতি জিন্না দিতে পারছেন না। অ্যালান কেম্বল জনসনের ডায়ারি অনুযায়ী মাউন্টব্যাটেন নাকী ধমকে ওঠেন যে এত পরিশ্রমের ফলে যে সমাধান বেরিয়ে এসেছে তা একা জিন্নাকে নষ্ট করতে দেবেন না। পরদিন সকালে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা ও প্রাদেশিক গভর্নরদের সামনে মাউন্টব্যাটেন তাঁর প্ল্যান ব্যাখ্যায় বলবেন, যে ‘মিঃ জিন্না আমাকে এমন আশ্বাস দিয়েছেন যে আমি সেই আশ্বাসকে তাঁর সম্মতি ধরে নিতে পারি, ও জিন্নার দিকে তাকাবেন, জিন্না তখন যেন সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়েন, জিন্নাকে পাঞ্জাব-বাংলা ভাগে সম্মত হতে বাধ্য করার জন্য মাউন্টব্যাটেন নিজে লন্ডনে গিয়ে অসুস্থ চার্চিলের সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছ থেকে তাঁর (চার্চিলের) নিজের হাতে লেখা এক হাত চিঠি নিয়ে আসেন, তাতে চার্চিল লিখেছিলেন, ‘যা পাচ্ছ নিয়ে নাও, এরপর তাও পাবে না।’ এই হাতচিঠিই ছিল মাউন্টব্যাটেনের শেষ অস্ত্র। 

নিজের এই মিথ্যাচারণকে প্রায় সত্যের মত দেখাতে মাউন্টব্যাটেন শর্ত করেছিলেন, দেশভাগের নীতিতে রাজনৈতিক নেতারা একমত হলে, ১৫ আগস্ট ক্ষমতা হস্তান্তর হবে ও তার পরে সীমান্ত কমিশনের রিপোর্ট খোলা হবে—কোথায় হিন্দুস্তান আর কোথায় পাকিস্তান জানতে। মাউন্টব্যাটেন চান না, স্বাধীনতা-উৎসবে কোনো মালিন্য লাগে। 

নতুন দুটো স্বাধীন দেশ বানাতে তাঁকে যে-সময় দেয়া হয়েছিল—সেই সময়ের আগেই র‍্যাডক্লিফ তাঁর কাজ শেষ করে, রিপোর্ট জমা দিয়ে লন্ডনে ফিরে যান। 

সেই পুরনো ম্যাপটি ছিল। প্রদেশগুলিকে গুচ্ছ করে ব্রিটিশ, ক্যাবিনেটের ভারত-পাকিস্তানের ম্যাপ—প্রথমে স্যার স্ট্যাফোর্ড-এর হাত দিয়ে, তারপর ক্যাবিনেট মিশনের হাত দিয়ে। র‍্যাডক্লিফের কিছু করারই ছিল না। 

যে-দেশে তিনি কখনো আসেনই নি, সেই দেশ ভেঙে ম্যাপ তৈরি হয়ে ছিল ছ-বছর আগে। ছ-বছর ধরে। আলোচনা তো হচ্ছিল—নাম নিয়ে। একটা হিশেবই মাউন্টব্যাটেনের মেলে নি। তিনি মুখ ফুটে চেয়েছিলেন—দু দেশেরই গভর্নর-জেনারেল ও কম্যান্ডার-ইন-চিফ ও থাকতে তা হলে ইতিহাসে একটা নামটাম পাকা হত। নেহরুকে বলতে হয় নি, নেহরু ও প্যাটেলই তাঁকে ধরাধরি করে রাজি করান। তিনি নিম-রাজি হওয়ার ভানটুকু রাখতে পারলেন। 

কিন্তু ইতিহাসের অমরতা বাংলায় পুকুরের জলের ভিতরের গর্তের মহাশোল মাছের মত পিচ্ছিল। শুদ্দুরের হাত ছাড়া আর কোনো রাজদণ্ড মাছের গতির চাইতেও তীব্রতর গতিতে গর্তে ঢুকে মহাশোলের গলা মোক্ষম মুঠোতে ধরে বের করতে আনতে পারে না। 

মাউন্টব্যাটেন মাস চারেকে যুদ্ধোত্তর সাম্রাজ্যের পাট গোটালেন। শেষ পর্যন্ত জিন্নাকে আলাদা করে বলতে হল। বলার জন্য ভাবতে হল। প্রথমে কম্যান্ডার-ইন-চিফ হতে চাইলেন। পাকিস্তানেরও। জিন্না বললেন, ‘সে কী করে হবে? দুনিয়ার লোক ভাববে আসলে পাকিস্তান হয়ই নি। যা ছিল তাই আছে। বড়জোর কোর্ট অব ওয়ার্ডস হয়েছে। 

মাউন্টব্যাটেনের তখন আর লাজলজ্জা নেই। জিন্নার কথায় ব্যারিস্টারি প্যাঁচটা কাটাতে না পেরে বলে বসলেন-’তা হলে আমাকে টিটুলার হেড করুন। গভর্নর-জেনারেল উইথ অনলি অ্যাডভাইসারি পাওয়ার।’ 

জিন্নার একটা মুদ্রা ছিল—আঙুল খেলাতেন। সে-রকম খেলিয়ে বলতেন, ‘তা হলে আমি কী হব? দেশটা তো আমার? না কী?’

‘আমি না হলে পেতেন আপনার পাকিস্তান? আর আমাকে বছর খানেকের জন্য গভর্নর জেনারেল করার ভদ্রতা নেই?’ 

‘আমি নিতে রাজি না হলে আপনার পাকিস্তান নিত কে? তেমন হলে বলুন, আমি আপনার সম্মানরক্ষার জন্য পাকিস্তান রিফিউজ করতে পারি।’ 

‘দোহাই, এই উপকারটুকু স্থগিত রাখুন।’ 

সীমান্ত কমিশনের কাজে ভাইসরয় কোনোভাবেই নাক গলাবেন না—এই প্রতিশ্রুতি যে তিনি রক্ষা করেছেন তার প্রমাণ হিশেবে র‍্যাডক্লিফ যেদিন রিপোর্ট জমা দিলেন সেদিন মাউন্টব্যাটেন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে কোথায় গিয়েছিলেন। পাছে এটা কারো নজর এড়িয়ে 

যায় মাউন্টব্যাটেন সাংবাদিকদের কাছে সন্ধ্যায় বলেন, ‘আমি তো ঠিক জানি না। আমি বাড়ি ছিলাম না। কমিশন কী করেছেন তার বিন্দুবিসর্গও আমি জানি না।’ যিনি বলছেন তাঁর নিজের ব্যক্তিগত লকারে তৈরি ভারত-পাকিস্তানের মানচিত্র ছিল। হিন্দু মহাসভার নেতা এন সি চ্যাটার্জি ছিলেন ব্যারিস্টারিতে র‍্যাডক্লিফ-এর সহপাঠী। একজন ফার্স্ট হয়েছিলেন, একজন সেকেন্ড। খুব সম্ভবত তিনি পুরনো বন্ধুর কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশটি উপহার হিশেবে চেয়ে এনেছিলেন। 

[এই গল্পটা কিন্তু সত্যি। ]

একটা অদ্ভুত ও কৌতুককর মিল। 

সিরাজদৌল্লার সঙ্গে ইংরেজেরা যুদ্ধে যাবে কী যাবে না, তা নিয়ে ক্লাইভ ও তার সমতুল্য আর-এক সেনাপতির মধ্যে তুমুল মত পার্থক্য ঘটে আগের রাতে। তারপর ক্লাইভ একটা সই জাল করে দেখান যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যুদ্ধ করতে বলেছেন। পরদিন সকালে ক্লাইভ চললেন জালি যুদ্ধ জিততে। 

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবসানও হল এই জালিতে ও মিথ্যায়। মাউন্টব্যাটেন ভাইসরয় হতে রাজি হচ্ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ফার্স্ট অ্যাডমিরাল হতে চান। সেই পোস্টটা খালি হবে ৪৮ সালের জুন নাগাদ। তাই এটলি ঘোষণা করলেন ৪৮ সালের জুনের মধ্যে ক্ষমতা-হস্তান্তর হবে। মাউন্টব্যাটেন একই সঙ্গে দুই চাকরির ব্যবস্থা করলেন। 

মাউন্টব্যাটেন কখনো মিথ্যা ছাড়া সত্য বলেননি। 

১. ব্রিটিশ সৈন্য অপসারণ শুরু হয়ে গেছে গভর্নরদের জানাননি। 

২. গভর্নরদের নির্দেশ দিয়েছেন—কোনো ভাবেই দাঙ্গার দায়িত্ব যেন ব্রিটিশ সৈন্যের ওপর না চাপে। 

৩. ভারতের নেতাদের বোঝান—দেশভাগে সম্মত হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অধিকার। কোনটা হিন্দুস্থান, কোনটা পাকিস্তান সেটা ঠিক করবে স্বাধীন দুটি সীমান্ত কমিশন। যদিও দেশভাগের ম্যাপ তাঁর ড্রয়ারে। 

৪. দাঙ্গা দেখে ভয় পেয়ে নেহরু ও প্যাটেল দুজনে মাউন্টব্যাটেনকে অনুরোধ করলেন—স্বাধীনতার তারিখ এগিয়ে দিন। মাউন্ট ব্যাটেন এগিয়ে দিলেন— ১৪/১৫ আগস্ট ১৯৪৭। 

মাউন্ট ব্যাটেন কি পূর্বজন্মের লর্ড ক্লাইভ? 

এই এত বড় আন্তর্জাতিক বিনিময়ে এই শূদ্রসন্তান কোত্থেকে এল?
কোত্থেকে আসে? 

কে ও? 
কে চেনে ওকে? 

ও কি মুসলমান হয়ে গিয়েছিল? 
বাংলার সব মুসলমানই তো প্রাক্তন শূদ্র—যোগেন মণ্ডলেরও হতে ক্ষতি কী? 

ও তাহলে মোল্লা না-হয়ে মণ্ডল থাকছে কেন? 
যোগেন মোল্লা নাম তো খারাপ নয়? 

যোগেন মোল্লা বললে লোকজন অন্তত বুঝতে পারত যে জিন্নাশাহেবের অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো হিন্দুকে পাঠিয়ে লিগের সর্বজাতীয়তা প্রমাণ করতে চাননি? 
তিনি একজন গুপ্ত মুসলমানকেই পাঠিয়েছিলেন? 

তাও ঠিক না? 
কেন? 

মুসলমানদের মধ্যে মণ্ডল হয় না? 
হয়তো? 

তাহলে? 
একটা চাঁড়াল গিয়ে বসল রাজসিংহাসনে? 

বরিশালের বাইরে ওকে চেনে কে? 
বরিশালই-বা কেন? বরিশালে কি নেতার খুব অভাব পড়েছে? 

ঐ গৌরনদী থানার বাইরে, যেখানে ওর বাড়ি? 
বাড়ি আছে? 

চাঁড়ালের আবার বাড়ি? 
থাকত গ্রামে, প্র্যাকটিস সবে শুরু করেছিল বরিশালে, কলকাতায় এমএলএ হয়ে এসে হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করল কী করে? 

শরৎ বোসের জুনিয়ার হয়ে? 
শরৎ বোস কি যাকে-তাকে জুনিয়ার নিতেন? 

ঐ হয়তো কোর্টে শরৎ বোসের সেরেস্তা বইত, তাতে কিছু বকশিস পেত? 
কিন্তু যোগেন মণ্ডলের দোষটা কী? 

ও কি টুপাইস করে নিয়েছে—কলকাতার, ইস্পাহানিদের মত?
প্রকিওরমেন্টের এজেন্সি পেয়ে? 

ও কি দালাল—প্রাসাদ বিক্রি করে ১০০-২০০ শতাংশ লাভ করেছে—ভারত স্বাধীন হচ্ছে রটে যাওয়ার পর বিদেশিদের কাছে প্রাসাদের দর খুব বেড়ে গেছে, সব দেশের রাষ্ট্রদূতাবাসের জন্য? জিন্নাশাহেব তো তাই করেছেন? 

যোগেনও হয়তো তাই করত, যদি তার প্রাসাদ থাকত? 
মৈস্তারকান্দি ওর বাড়ি যেখানে, সেই খালের দ্বীপে এখনো পৌঁছুতে হয় এক কোমর কাদা ও এক বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে। 

দেশে গেলে থাকতে হত শ্বশুরবাড়ি। 
বাড়িতে ঘর নেই। 

বরিশালে থাকত এক মোক্তার বন্ধুর সঙ্গে। 
কলকাতায় নিজের আত্মীয়দের বাড়ি। 

তাহলে? ভারত ভাগের আন্দোলনে তার ইন্টারেস্ট কী? 
কিছু না। 

অপরাধ কী? 
শুদ্দুর হয়ে জন্মানো। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *