১৬
১৭
১৮
১৯
২০
4 of 4

১৮০. যোগেনের নভেল ত্যাগ

১৮০. যোগেনের নভেল ত্যাগ 

না, কোনো আঁতুড়ঘরের কাঠকয়লার ধোঁয়ার গন্ধ আর আমাকে এমন মায়া দিতে পারবে না যেন ঐ ধোঁয়ার গন্ধের ভিতর আমার মায়ের বুকের দুধের গন্ধ আছে। না। নেই। কবে যে আমাদের কে হিন্দু বলেছিল—জানি না। সেই কবেটা কত দিন আগে? কয়েক শ বছর? নাকী কয়েক হাজার? সেই কয়েকশ বা কয়েক হাজারই হোক—এত বছর ধরে শুধু তো গন্ধই পেয়ে যাই আমরা, শূদ্ররা—আঁতুড়ঘরের পোড়া কাঠকয়লার, ঠাকুরঘরের ধূপ-ধুনো-ফুল-চন্দনের, মা ঠাকরুনদের শাড়ির, কর্তাঠাকুরদের পৈতের, পৈতে না-থাকলে গায়ের, কিন্তু কোনো গন্ধই তো আমাকে এই এত বিশাল সময়ের কোনো ভিতরঘরই দেখাতে পারল না। না মায়ের বুকের ঘর, না ঠাকুরের পুজো নেয়ার ঘর, না প্রতিমার মত ঠাকরুনদের মনের ঘর, না আকাশে আশ্বিন মাসের মেঘের মত মিশ্রদল। 

না, আমাকে, আমাদের যদি বাঁচতেই হয়, বাঁচার ইচ্ছে থেকে বাঁচতে হয়, পোকামাকড়-গাইকুকুরের মত জন্মেছি বলে বেঁচে যাচ্ছি—তেমন নয়, মরতে জানি না বলে বেঁচে আছি—তেমনও নয়, ফুল বা ফল হয়ে গাছে-লতায় ফুটে আছি, ঝুলে আছি বলে ঝরে পড়ব—তেমনও নয়, তেমন কত-যে মৃত্যু প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বুকের হাওয়ায় আমাদের শরীরের ছোঁয়ায় আলগোছে ভাসিয়ে দিতে হয়, ছুঁয়ে যেতে হয় তেমন কোনো চণ্ডালের মত বাঁচা নয়, আমি শূদ্র, এখন তোমরা বলছ আমি হিন্দুও, যদি আমি হিন্দু হতাম, বামুনদের মত ভাবতে পারতাম, বামুনদের মত বলতে পারতাম, সেই ভাবা আর বলাকে আর-সব-জাতের কাছে নিষিদ্ধ রাখতে পারতাম, আমার ভাষাকে কখনো দেবতাদের ভাষা বলা হত, আমি শূদ্র, আমার নিশিদিন দিননিশি কাটে পশুর সঙ্গে, শুয়োর-কুকুর-গরুর সঙ্গে, মড়ার সঙ্গে, মানুষের শরীরের নোংরার সঙ্গে, সেই সারা জীবনের সঙ্গ আমাদের মুখের ভাষাকে করে জিভকাটা, ঠোঁটকাটা, পশুর জিভ ঠোঁট থাকে, সে তার ভাষায় সেগুলো ব্যবহার করতে জানে না, পশু জানে শুধু জিভ দিয়ে চাটতে, জিভ ঠোঁট দিয়ে লেহন করতে, দাঁত দিয়ে কামড়াতে, গলার আওয়াজে তার জিভ বা ঠোঁট বা দাঁত কোনো কাজে লাগে না, আমি শূদ্র, আমার ভাষায় তো চুম্বন হয় না, আমার মুখের ভিতর তো লালা নেই, তাই ভেজা নয়, সেই মুখের ভিতরের মরুভূমির তুল্য পুরুষ কোন নারী ভাসিয়ে দেবে তার জিহ্বার জন্যে। আমার ভাষায় তো বিলাস নেই, আমার ভাষায় তো হাসি হয় না, হাসি—যা ঠোঁট ঢাকা থাকে, ঢাকা খুলতেই ডালিমের বিচিদানার মত ছড়িয়ে পড়ে, আমার ভাষা তো নিষিদ্ধ, নিষিদ্ধ মানে—আমার ভাষা তো শুধু আমারই ভাষা, আর-কেউ কি থাকে যে নিজে শূদ্র না কিন্তু শুদ্রের ভাষা ছাড়া কথা বলে না, ধু—উ—য়, সে হবে কী করে, আমার ভাষা তো আর-কারো পক্ষে নিষিদ্ধ, হিন্দু বামুনদের বা হিন্দু বর্ণের অন্য উঁচু জাতের বাবুদের পক্ষে নিষিদ্ধ, ওদের মুখের ভিতরে জিভ আছে, দাঁত আছে, গাল আছে, গলা আছে, ওরা কি আমাদের ভাষা বলতে পারে, তাহলে তো তোমাদের মনে এ-ডাকটা উঠতই না, তোরা হিন্দু হ বা ওরা তো হিন্দুই, তাহলে বাঙালি মুসলমানকেও শুদ্ধি করে হিন্দু বানানো যেত না কী, তাহলে এই গর্বটা কোথায় যে যেত—আর-সব ধর্ম গ্রহণ করা যায়, হিন্দুধর্ম গ্রহণ করা যায় না, হিন্দু হতে হলে হিন্দু হয়ে জন্মাতে হয়, কী করে শূদ্র না হয়ে হিন্দু জন্ম নেয়া যায়, নাকি শূদ্র হবি কী করে হিন্দু না হয়ে, তুই হিন্দু বলেই তো শূদ্র, কিন্তু এতদিনে এই একটা ব্যবস্থা করা গেল না, এতদিনে পণ্ডিতদের দিয়ে একটা নতুন স্মৃতি শাস্ত্র লেখানো গেল না, কোনো ধর্মে কেউ অচ্ছুৎ থাকতে পারবে না, অনেক ধর্মে তো নেইও, অস্পৃশ্যতা তো নিষিদ্ধ হয়েই গেছে, মন্দিরে তো তারা ঢুকতে পারছে, যে-কোনো একটা বদলের জন্য তো একটু সময় দিতেই হয়, সে তো যাবচ্চন্দ্রদিবাকর : সময় আমাদের পেছনেও আছে, সামনেও থাকবে, গান্ধীজির চাইতে প্রিয়তর কেউ হরিজনদের থাকবে কেন—এটা প্ৰমাণ করতে তিনি বললেন, আমি হিন্দু, আমি চতুর্বর্ণ মানি, অস্পৃশ্যতা মানি না। 

এই গল্পটির আগাগোড়া, ওসার-বহর, এপিঠ-ওপিঠ, তেলো-চেটো, খাদ-খাড়াই, সব, সবটাই বানানো, যেমন কোথাও বেড়াতে গেলে আমাদের দেখাশোনা বানানো, যেমন কোথাও বংশানুক্রমিক বসবাসেও আমাদের চেনাজানা বানানো। গল্পটাতে একটা ঘটনাকাল বদলানো যদি নাই যায় অন্যভাবে গুলনো যায়। তারিখ ধরে-ধরে মাপা আছে। 

কেউ পরীক্ষা করলে দেখবে—দুটো-একটা ছাড়া সে-সব ঠিকঠাকই আছে। কারণ এগুলো ঠিকঠিকই ঘটেছিল, বদলানো যায় না। 

প্রতিদিনের আশপাশ বা চিরকালের শিলীভূত ইতিহাসের সঙ্গে কোনোরকম মিলের কোনো হদিশ যাতে না থাকে, বা থাকলেও সে-হদিশ নিশ্চিত ভুল নিশানা যেন দেয়। ১৯৩৭ থেকে ৪৭ যেন এক অলীক দশক হয়ে যায়। সে অলীক এখন আর আমাদের জীবন নয় যেন। বা তখনো আমাদের জীবন ছিল না। সে অলীক এখনো ইতিহাসের অজৈব নয় যেন। সেই অলীক, দশকের নায়ক খলনায়কের সম্পর্কে মন্তব্যের অপরাধে ঘটনার ৬২ বছর পরে এখনকার বড় নেতারও চাকরি যায়। 

যেহেতু বানানোটা এ-খেলার নিয়ম হয়ে আছে, এই গল্প-বলার বা হিস্ট্রি-হিস্ট্রি খেলার। সেই নিয়ম মেনেই এই আজগুবি সন-তারিখের বহু রকম প্রমাণ মজুত। চন্দ্রদ্বীপের পাঁজি, নদীয়ার পাঁজি, ইসলামি পাঁজি, তুরুক পাঁজি, বিষ্ণুপুরের পাঁজি, আরবী পাঁজি, এই সব। 

কিছু ঘটনা যে জানাশোনা ঠেকে ও কিছু লোকজনকেও যে চেনা-চেনা ঠেকে? 

সে সবই এক বানানো অসত্যের অছিলা। বানানো হলেও তো হিস্ট্রি। প্রমাণের কোনো অভাব নেই। বানানোরও কোনো প্রমাণ নেই। 

এত ছড়ানো একটা জালি একা-একা ছড়ানো যায় না। 

কত যে সঙ্গীত, কত যে যাতায়াত, কত যে পাট-শ্রীপাট-কাঠি-খালি-চর-হাট বলে ডাকা জনপদ, কত যে খাল-বিল-জলা-হাওর-নদীর ভঙ্গিল জলপথ, কত যে চ্যাপ্টা, গোল, ছিপছিপে, একতলা, দু-তলা জলযান ও আকাশযান, কত যে মুচমুচে হয়ে যাওয়া কাগজ, কত যে শহরের সিপিয়া-রঙের স্মৃতি, কত যে দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধ, কত যে অমিলন, চাপা শ্বাস, ঘামের হঠাৎ ফুটে ওঠা বিন্দু, স্থানাঙ্ক, একই দিনে সময়ের বদল, তরলতা, স্থায়ী সিদ্ধান্তের লেবেল, পর্যটন, পুনরুদ্ধার, গোলকধাঁধাঁ এই গল্পের সঙ্গে মিশে গেল, গল্পটাকে অসত্য করে তুলতে ও অসত্য করেই রাখতে। সেই সব সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা নেই কোনো। 

যোগেন মণ্ডল মানুষটি এ গল্পে সত্যের সবচেয়ে বড় অছিলা। ১৯০৪ সালে জন্ম। বি.এল তাই, এই নভেল থেকে এখানেই আমি বের হয়ে যাচ্ছি। আমি ঢুকেছি কখন তা আমি বুঝিনি। ঢুকব কোথায়? নভেল তো একটা খেলা পরিসর। সেখানে ঢোকার কোনো পথ থাকে? আমন্ত্রণপত্রও অন্তত দেখাতে হয় না। তারপর বেরিয়েও আসা যায়, যখন ইচ্ছে তখন? প্ৰবেশ ও প্রস্থান অবাধ? অবাধ মানে কী? তার চাইতে ‘স্বাধীন’ ও ‘ইচ্ছাধীন’ শব্দদুটির একটি ভাল হত না? 

যদি আমি এতটা পর্যন্ত নভেলটার ভিতরেই থেকে যেতে পারি, তাহলে, বাকি সময়টুকুও থেকে গেলে ক্ষতি হত কী? নভেলে নায়কের উপস্থিতির বাধ্যতাসূচক কোনো আইন তো নেই তাই যদি না থাকে, তাহলে নিষ্ক্রান্ত হওয়ারই-বা নিয়ম কী বা আইন কী। 

না, ওরকম কোনো আইনানুগ ব্যাপার নয়, বরং একটু আলগা কথাই। একেবারেই আলগা। কোনোভাবেই স্ক্রু বা পেরেক মেরে অন্য কিছুর সঙ্গে আঁটা নয়। বা, কেমিক্যাল গ্লু দিয়ে সাঁটা নয়। 

এতটা সময় তো দিলাম হাজিরা, নভেলে। আর না-হয় না-দিলাম। না-হয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলির কাছ থেকে ক্যাজুয়াল ছুটি নিয়েই সরে পড়লাম। না-হয় আর ফিরলাম না, নভেলে বা পাকিস্তানে। আমি শূদ্র। এখন নায়ক বা যজমান ডাকলেও তো আর ফেরা যায় না। কারণ আমি না কী হিন্দুও বটে। হিন্দুস্থানে তো বটেই, পাকিস্তানেও। আমি কী করে হিন্দু হই? আমি তো দ্বিজ নই। আমি শাহেবদের দরবারে শাহেবদের সার্কুলারে হিন্দু। তেমন দোআঁশলা হিন্দু হয় নাকী, শিখণ্ডীর মত? চলি এখন। 

১৯৩৭-এ নতুন আইনে একটা কোটা হয়েছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন কায়েম করতে। তখন যুদ্ধটুদ্ধ ছিল না। কিন্তু পরে দেখেছি, ৩৭ সালে ইয়োরোপে যুদ্ধের আবহাওয়া এতটাই ভারী যে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস খুব স্বাভাবিক ছিল না। ১৯৩৬ সালের এপ্রিলের গোড়াতে তখন ব্রিটিশ সরকারের বিরোধী নেতা উইনস্টন চার্চিল ওখানকার কাগজে লিখে দিয়েছিলেন, ‘হের হিটলার (ইয়োরোপের) কয়েকটি দেশকে কী বলেছেন বা গ্রেট ব্রিটেন আর ফ্রান্স বা বেলজিয়ামের মধ্যে কী কথাবার্তা হবে, তার ওপর সামনে একটা ইয়োরোপীয় যুদ্ধ বা সম্ভবত বিশ্বযুদ্ধ এড়ানো যাবে কী যাবে না ভাবা ভুল।’ ভারতের অন্তত দু-জন নেতা, জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু ইয়োরোপে বেশ কিছুদিন থেকে ও ঘুরেফিরে এসে এর চাইতেও স্পষ্ট করে এই যুদ্ধের কথা বলেছিলেন। এখন হয়তো এই সব কথা কালানুক্রমে ও বিষয়ানুক্রমে সাজানো যায়। 

বাংলার ভোট হয় ৩৭ সালের পৌষমাসে আর ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা তৈরি হয় ১ এপ্রিল। তখনো কংগ্রেস যে-সব প্রদেশে জিতেছে সেখানে সরকার তৈরি করবে কী করবে না তাই নিয়ে ভাইসরয়ের সঙ্গে দরাদরি চালাচ্ছে। ১৬ এপ্রিল তারিখে চার্চিল লিখেছিলেন, ‘তারা (কংগ্রেস) এখন যখন ইচ্ছে তখন ভারতের বেশির ভাগ জায়গা শাসন করতে পারে। তারা চাইলেই বিচারব্যবস্থা ও পুলিশ তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে। ইয়োরোপের বড়বড় দেশগুলির সমান আকারের আধ-ডজন প্রদেশের রাজস্ব, তাদের খুশিমত খরচা করতে পারে। কোটির অঙ্কে গুণতে হয় এমন বিরাট সংখ্যক জনসাধারণকে তারা বাঁচাতেও পারে, মারতেও পারে এবং তাদেরই জন্য যে আইন বানানো হল তা তারা রক্ষাও করতে পারে, ভাঙতেও পারে।’ 

এই সব কথাবার্তা মেলালে মনে হয় প্রদেশিক স্বায়ত্ত শাসন—গভর্নরের বিশেষ ক্ষমতাসহ যে ভারতে চালু করা হয়েছিল, তাও, আসন্ন মহাযুদ্ধের কথা ভেবেই। সে-ভাবনাতে কেন্দ্রীয় সরকারকে ভাইসরয়ের সরকারই করে রাখা হল—যুদ্ধ প্রস্তুতিতেই। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থ জড়িত। 

আমি ভোটে দাঁড়িয়েছিলাম অথচ তার আগে রাজনীতির কোনা-কানছিও আমি কখনো মাড়াইনি। দাঁড়িয়েছিলাম—ল-পাশ করে প্র্যাকটিস করছি আর নমশূদ্রদের জন্য আসন আলাদা রাখা হয়েছে। ঘটনাচক্রে আমাকে দাঁড়াতে হল সকলের জন্য খোলা আসনে। জেতার পর দেখা গেল—সারা ভারতে আমিই একমাত্র প্রার্থী যে শিডিউলভুক্ত জাতের লোক হয়েও সকলের-জন্য-খোলা-আসনে জিতেছি। এটা নাকী মহাকীর্তি। সারা দেশ থেকে সবাই অভিনন্দন জানালেন। মহাত্মা গান্ধীও। আমার দর বেড়ে গেল। দশের কাছে। আমার কাছেও।

আমি লোকটাই আলগা। 

আমার পক্ষে সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল কংগ্রেসে ঢুকে পড়া। কংগ্রেসেরও দরকার ছিল। আমিও নিরাপদ থাকতাম। 

অথবা হকশাহেবও বরিশালের, আমিও বরিশালের। সেই সুবাদে লেগে থাকলে মন্ত্রী যদি নাও হই, তাহলেও, পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি একটা হতে পারতাম। হকশাহেবের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল গৃহশত্রু। ওঁর গৃহের বাইরের একটা লোক, আমার মত, ওঁর শত্রু হওয়ার ভয় যার নেই, ওঁর দরকারও ছিল। কিন্তু আমিও ওদিকে ঘেঁষলাম না আর খাজা-গাজাদের দাপটে হকশাহেবও দিশেহারা। 

এখন মনে হয়—আমার কংগ্রেসে না-যাওয়া আর হকেও না-যাওয়া অত নিরীহ ব্যাপার ছিল না। কংগ্রেস শুনলেই মনে হত বামুন-কায়েত-বৈদ্যদের বাড়ি। তাদের বাড়ির বারান্দাতেও আমরা উঠতাম না। অথচ বরিশালে কোর্টে আমার সব সিনিয়ার ছিলেন কাস্ট হিন্দু। তাঁরা ভালবেসেই আমাকে ওকালতি শেখাতেন। সেখানে তো একসঙ্গেই বসতাম। যদিও জলের গ্লাস আলাদা ছিল। সেটাও তো আমার মনে হতে পারত—বর্ণহিন্দু হলেই কংগ্রেসি হয় না। মানুষ সম্মান পেলে ভাবে আমার প্রাপ্য। অসম্মান পেলে পরজন্মেও ভোলে না। আইনসভায় অতগুলি, আমাকে ধরে ৩১ জন নিচু জাতের এমএলএকে দেখে মনের ভিতরে একটা জোর এসে গিয়েছিল। এদের এক করা, এক রাখা আর আইনসভার সবচেয়ে নাম-করা মেম্বারদের সমান যোগ্যতা প্রমাণ করা—এটাই আমার কাজ হয়ে উঠল যেন স্বাভাবিক নিয়মে। সেটা ঘটেও গেল যেন স্বাভাবিকভাবেই। তার কারণও খুব সোজা। আমাদের নিচুজাতের যারা দু-একজন বড় নেতা ছিলেন তাদের নিজেদের আরো নানারকম কাজ ছিল। সেগুলোও বড় কাজ। সেগুলো থেকে তাঁদের আয়ও হত। দু-একজন ছিলেন ধনীলোক। তাঁদের কাছে আইনসভা ছিল আরো দু-চারটে শখের ব্যাপার। আমার মত লোক তো অন্য পার্টিতেও খুব ছিল না—কমিউনিস্ট ছিল দু-একজন। তারা তো বিলাত ফেরৎ। আমার মত সর্বঘটে বিল্বপত্রের মত হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় আর কাজ ঢুকে গেলে কোনো দায় নেই, ছাগলে খেয়ে নেবে—এমন তো আর কেউ ছিল না। আমি ছিলাম আইনসভা সর্বস্ব। আমার স্বার্থ ছিল উচ্চাশা। খুব কম দিনেই সেটা হয়ে গেল। আমার আর-এক স্বার্থ ছিল ছোটজাতের সম্মান বাড়ানো। 

সেই সব কারণেই আমি এখন এই নভেলটা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। আমি অত বেহিশেবি না। ১৯৪৩ সালে হার্বাট, হকশাহেবকে রাত্রিবেলা ডেকে পাঠিয়ে টাইপ-করা পদত্যাগপত্রে সই করালেন। খুবই দুর্নাম হয়েছিল। বড়লাট খুব রেগেও গিয়েছিলেন। হকশাহেবেরও দোষ ছিল কিন্তু ছোটলাট তাঁকে টোপ দিলেন—সাংবিধানিক কারণে এটা করতে হচ্ছে, যেহেতু আইনসভায় অর্থসংক্রান্ত একটি প্রস্তাবে সরকার হেরে গেছে। ছোটলাট এবার হকশাহেবকেই ডাকবেন একটা ন্যাশনাল গবর্নমেন্ট তৈরি করার জন্য সব দল মিলিয়ে। হকশাহেবই প্রধানমন্ত্রী হবেন। পদত্যাগ করে পাশ। নমশূদ্র। বরিশালের নানা জেলা বোর্ড ইউনিয়ন বোর্ডের কাজ করে ৩৭ সালে হয়ে গেল এম.এল.এ। ‘সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ’-এ তপশিলিদের জন্য সংরক্ষিত আসনে নয়। সারা ভারতের একমাত্র তপশিলি প্রার্থী যে খোলা আসনে জিতেছিল। ১৯৪৩-এ মুসলিম লিগের নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে দর কষাকষিতে তপশিলিদের জন্য মন্ত্রিসভায় বেশি জায়গা আদায় করে। নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা ও সারওয়ার্দি মন্ত্রিসভায় ছিল। মুসলিম লিগ তাকে ইনটেরিম বা অন্তর্বর্তী সরকারে (১৯৪৬) পাঠায়। পাকিস্তানের প্রথম মন্ত্রিসভার সে ছিল সদস্য। 

ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার চেষ্টার একেবারে শেষ দশকে সারা ভারতে সে একমাত্র নেতা যে পাকিস্তান-প্রস্তাব সমর্থন করেছিল, বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল, তপশিলি হলেও হিন্দু থাকে নি ও পাকিস্তান প্রস্তাব মানলেও যে শূদ্র মুসলিম হয় নি। ৫০ সালের দাঙ্গায় পূর্বপাকিস্তানে সংখ্যালঘু, প্রধানত নমশূদ্র, হত্যার প্রতিবাদ করেছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় মন্ত্ৰী হিশেবে, জিন্নাহীন পাকিস্তানের সামরিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নেতারা তাকে খুন করার ষড়যন্ত্র ফেঁদেছিল, সে তাদের ফাঁসিয়ে দিয়ে পালাতে পারে। 

এই প্রায় দশ বছরের রাজনীতিতে হিন্দুরা তাকে পার্টিশনের ভিলেন ও মুসলিম লিগের চর বানিয়ে যে-নিন্দা সারা বাংলায় রটিয়েছিল, তার প্রধান প্রচারক ছিল, তখন হিন্দু মহাসভাগ্ৰস্ত কংগ্রেস, তার প্রধান বাহক ছিল হিন্দু খবরের কাগজ ও পরে, তার প্রধান তাত্ত্বিক ছিল আমাদের জাতীয় হিস্ট্রির লেখকরা। এই জাতীয়-হিস্ট্রি রক্তের শ্বেতকণিকার মত এমন হিন্দুয়ানিতে সংক্রামিত যে শেষ পর্যন্ত সেই সংক্রামক ইতিহাস থেকেও তাকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিল। 

তার চাইতে অনেকানেক ছোট-বহরের নেতাকেও এমন করে মুছে দেয়া যায় নি, যেন তার জীবাশ্মটুকুও না থাকে। মুছে দেয়া যায় না কারণ তাদের বংশধর-অনুরাগী কেউ, দু-তিনশ বছর পরও হাজার-হাজার টুকরো হয়ে যাওয়া শরিকদের পক্ষ থেকে তিনশ-চারশ বছরের ইতিহাসের ওপর তাদের দাবিনামা এখনো জারি করছে। যেমন সাঁঝের আটচালার সাবর্ণ চৌধুরীদের কলকাতার প্রতিষ্ঠাতার দাবিনামা। তাঁরাই জমিদার হিশেবে জব চার্নককে সুতানুটি-গোবিন্দপুর- কলকাতা বেচেছিলেন। যোগেনের বেলায় তা হয় নি। কারণ যে-শূদ্রদের সে নেতা ছিল, সেই শূদ্রতা হয়ে গেল একাডেমিক পলিটিক্যাল বিষয়। 

কোনো রাজনৈতিক নেতাকে, সারা ভারতে এতটা অপমানিত হতে হয় নি, এতটা ঘৃণিত হতে হয় নি, এতটা তুচ্ছ হয়ে যেতে হয় নি। হিন্দুয়ানি যোগেন মণ্ডলের মত এক শূদ্রের এই স্বাধীনতা ও সাহস মেনে নিতে পারে নি, যে, নিজের শূদ্র-পরিচয়টাকেই একমাত্র পরিচয় করে তোলে ও হিন্দু পরিচয়কে অস্বীকার করে একেবারে ছলচাতুরিহীন সরলতায়। একলব্য ও শম্বুকের মত, এই শূদ্রের কোনো ব্রাহ্মণ অস্ত্রগুরু বা হিন্দু অবতারের দরকার হয়নি। হিন্দু সংস্কারে অস্পৃশ্য এই নমশূদ্র জাতীয় অস্পৃশ্য থেকে গিয়ে নিজের শূদ্র-আত্মপরিচয়ের মহাত্ম্য রচনা করেছে। 

যোগেন—ঘটনাটা ঘটল কী করে? 

ঘটনা যখন ঘটে, তখন উল্টোপাল্টাই ঘটে। পরে, চিন্তাভাবনা দিয়ে ঘটনার কার্যকারণ, ফলাফল এইসব জুড়ে দেয়া হয়। যে-অনশনে গান্ধী মৃত্যু পর্যন্ত চলে গিয়ে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ঠেকাতে চেয়েছিলেন, সেই অনশন শেষ হল কিন্তু আম্বেদকরের সঙ্গে হিন্দু-কংগ্রেসিদের দর কষাকষিতে। ৩৭ সালের ভোটের সময়ও তো কংগ্রেস ঠিক করে উঠতে পারেনি—ঐ রোয়েদাদ মেনে ভোট করবে কী না। তারপর থেকে গান্ধীজি হরিজন আন্দোলনকেই প্রধান আন্দোলন করে তুললেন, ‘হরিজন’–সাপ্তাহিক বের করলেন, জেল থেকেই। আর জেল খেটে বেরিয়ে নভেম্বর ১৯৩৩ থেকে আগস্ট ১৯৩৪-এর মধ্যে ১২,৫০০ মাইলের হরিজন-ট্যুর সারলেন। কংগ্রেসের হিন্দুরা জোট বাঁধছিল। গান্ধীজির হরিজন-সভার ওপর জসিডি, বক্সার আর আজমিড়ে হিন্দু গুণ্ডারা আক্রমণ করল। ঐ ৩৪-এর ২৫ জুন পুনাতে গান্ধীজির গাড়ির ওপরই বোমা পড়ল। 

তার ঠিক একমাস পরে, জুলাইয়ে, যোগেন মণ্ডল বি-এল পাশ করে বসল। ওকালতির লাইসেন্স পেতে কলকাতার স্মল জজেজ কোর্টে, পরের বছর ১৯৩৬, একই মাসে, ২৫ জুলাই, বরিশাল কোর্টে প্র্যাকটিশ শুরু করে দিল। তার পরের বছর বরিশাল সদরের লোকাল বোর্ডে, তার পরের বছর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে, তার পরের বছর ১৯৩৭-এ মেম্বার, বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি। 

যেদিক থেকে বলা যায়, ১৯৩২-এর অনশনের পর গান্ধীজি হরিজন-ছাড়া কিছু ভাবেননি। নতুন আইনে বাংলার ও পাঞ্জাবের হিন্দুদের যে মুসলমানদের তলায় নামানো হয়েছে, তা নিয়েও তিনি একটিও শব্দ উচ্চারণ করেননি, তাঁর ভক্ত অনুরাগীরা তাঁর ওপর খাপ্পা, হিন্দু গোঁড়ারা রেগে গিয়ে বলতে শুরু করল—হরিজনরাই বাপুকে খেল—ঠিক সেদিক থেকেই বলা যায়, যোগেনও এর পর শিডিউল কাস্ট ছাড়া কিছু ভাবেনি, প্রদেশের চাকরি-বাকরিতে শিডিউল কাস্টের সংরক্ষণ ছাড়া কিছু ভাবেনি, দূর-দূর জায়গা থেকে যে শিডিউল কাস্টরা কলকাতায় পড়তে আসত তাদের জন্য তপশিলি হস্টেল ছাড়া কিছু ভাবেনি। হরিজন গান্ধী যদি ম্যাকডোনাল্ড-এর সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের হরিজনি প্রোডাক্ট হন, যোগেন তাহলে ঐ রোয়েদাদেরই শিডিউল কাস্ট প্রোডাক্ট। ঐ রোয়েদাদে জাতপাতের শিডিউল একবার তৈরি হয়ে গেলে, গান্ধীরও শিডিউল ছাড়া গীত নেই, যোগেনেরও শিডিউল ছাড়া গীত নেই। গান্ধীজি ১৯৩৯-এ ভোটে জেতা সুভাষ বোসকে কংগ্রেস থেকে তাড়ালেন আর যোগেন সেই সুভাষের প্রার্থী হয়ে বড়তলা থেকে কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলার হলেন। 

এইভাবে একটা প্রতিন্যাস ঘটানো যায়—জাতির পিতার সঙ্গে জাতির শূদ্রের। একেবারে অসম্ভব এই প্রতিন্যাস তো ঘটে আছে জাতির হিস্ট্রিতে। প্রতিন্যাস বলে চিনলে কি আর থাকত, ঘটালেও? জাতির হিস্ট্রির ঘটনাগুলো ঘটার সময় তো ডি-এন-এ জানা ছিল না। জানা ছিল—লাশ গুম করে দিলেই কেস খতম। সেই জ্ঞানতত্ত্ব-অনুযায়ী যোগেন মণ্ডলকে জাতীয় হিস্ট্রিতে নিঃশেষে গিলে ফেলা হয়েছে ও সেই গেলার কোনো ভুক্তাবশিষ্ট পর্যন্ত রাখা হয়নি। কিন্তু এখন তো ডি-এন-এ জ্ঞানতত্ত্ব অনুযায়ী জেনেটিক কোড পর্যন্ত যাওয়ার উপায় আছে। বেদব্যাসও জানতেন, আছে, একটা জেনেটিক কোড। কিন্তু কোডটার পাঠোদ্ধারের টেকনিকটা জানতেন না। টেকনিকটা জানা না-থাকায় তাঁর এপিকের ভিতরে বে-এপিক ঘটে যায়। অমন যে পিতামহ ভীষ্ম, বাপের বিয়ের পণ দিল যে নিজের বংশ লোপ করে, সে কী না আরও এক পণ করে বসে-হিজড়ের সঙ্গে কখনো যুদ্ধ করবে না। এমন পণের মানে কী, প্রসঙ্গ কোথায়, হিজড়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে আসবে কী করে, আসবেই-বা কেন। ভীষ্মের একটু বাতিক ছিল—প্রতিজ্ঞা করার। সেটাকে একটু খোঁচা দিতে গিয়ে বেদব্যাস এটুকু বে-এপিক ঢুকিয়ে দিলেন। ভীষ্মের বিয়ে না করার প্রতিজ্ঞাটাকে তো ওভাবেও বলা যায়—আমি সারাজীবন হিজড়ে হয়ে থাকব। 

এপিকের ভিতরের এই বেএপিকটা পর্যন্ত না-গেলে দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞার কোনো মানে বোঝা যায়? আমি হিজড়ে হয়ে থাকব ও কখনো কোনো হিজড়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরব না। ব্যাস, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ট্র্যাফিক খুলে গেল। 

ভীষ্ম তো গঙ্গার ছেলে। গঙ্গা স্বর্গে শিবের বৌ। আর এখানে, মাটিতে, শান্তনু—তার সঙ্গে থেকেই তো গঙ্গার আট ছেলে, শেষ ভীষ্ম। তা হলে ভীষ্ম শিবের সৎ ছেলে, মানে বৌয়ের আগের পক্ষের ছেলে। এপিক হচ্ছে—গঙ্গার আট ছেলের জন্ম ও বিসর্জন। বেএপিক হচ্ছে ভীষ্ম শিবের দ্বিতীয় পক্ষের প্রথম স্বামীর ছেলে। এপিক হচ্ছে—সতীর মৃতদেহ নিয়ে নটরাজের প্রলয়নাচন। বে-এপিক হচ্ছে শিবের বলদে সতীর বাপের বাড়ি যাওয়া। 

শিবের বাহন তো বলদ। বাহন ছাড়া দেব-দেবতা অসম্পূর্ণ। বলদ ছাড়া শিবও তাই। কিন্তু সে-বলদে কি শিবের বউ সতীও চড়তে পারে? চড়তে আর পারবে না কেন? কিন্তু চড়লে দক্ষযজ্ঞ ঘটে। 

বাপ দক্ষ বিরাট যজ্ঞ করছে, দুনিয়ার সকলের নেমন্তন্ন, সতী আহ্লাদ করে শিবকে বলল, ‘অনুমতি দেহ হর। যাই বাপার ঘর।’ সতী ভুলে গেল তার বাবার সঙ্গে শিবের ঝগড়া। দক্ষ যে তাদের নেমন্তন্ন করে নি সে-দোষও যেন শিবেরই। সাত বৎসর হল বিয়ে হয়েছে, একবারের জন্যও বাপের বাড়ি যাই নি। ‘পুরহ আমার সাধ। মায়ের রন্ধনে খাব ভাত।’ 

শিব রাজি হয় না। 

চটেমটে সতী ‘চলিলা ভ্রুকুটি ভীমা। একাকিনী বাপের বসতি।’ শিবের ইঙ্গিতে, ‘পাছে নন্দী যায় ধায়্যা। বৃষবর করিয়া সাজন।’ সতী খুশি। ‘বৃষ যোগাইল নন্দী। চাপিয়া চলিল চণ্ডী।’ 

আঃ! এপিকের পাল্টা বে-এপিকের নীরবতার কী বাহার। বলদের ঘাঢ়টা তো একটা কুদ, প্রায় শিবলিঙ্গ। সতীকে যদি বলদের পিঠে উঠতে হয় ও বসতে হয় তাহলে, কিছু-না কিছু সেক্স আসবেই। যিনি এ এপিক লিখছেন, তার কোনোরকম সেক্সেই কোনো আপত্তি নাই। আপত্তি শুধু সেক্সের অসম্মানে। একটা মেয়ে রাগ করে বাপের বাড়ি যাচ্ছে, যা পেয়েছে তাতেই চড়েছে, সেই অনভ্যস্ত বাহনে তার সেক্স আসতেই পারে। একটা ছোট অরগ্যাজম হয়ে গেল। সে বুঝুক, যার বোঝার। যে নাবুঝ, সে চুপ থাকুক। শুনতে এসেছে এপিক, আর, যা বলা হল না তা শুনতেই পেল না? ঐ অসময়ে সেক্স এলে সতীর রাগ জল হয়ে যাবে না? অ্যাকশন তো রাখতে হবে, তাই, বাপের বাড়িতে পৌঁছেই ‘সত্বরে চলিলা চণ্ডী যজ্ঞের সদন’। সেখানে বাপ-বেটির মধ্যে দু-চারটি গরম কথা হতে না-হতেই সতী সুইসাইড করে বসলেন। কিন্তু আত্মহত্যার আগে ‘দৃঢ় করি মহাদেবী পরেন বসন’। 

সুইসাইডের আগে ভাল করে শাড়ি পরা? তাও আবার শিবের প্রলয়নাচনের সত্যিকারের এপিকের আগে? হ্যাঁ। সতী তো একটা জানা নাটক করছেন। তিনি তো জানেন শিবের কাঁধে ঝুলে তাঁকে কত পাক খেতে হবে। ডেডবডির কাপড়-চোপড় যেন এলোমেলো হয়ে না যায়। সতী তো জানে, তার ডেডবডি নিয়ে শিব আর অন্য দেবতারা কী কাণ্ড বাধাবে! 

‘দক্ষযজ্ঞনাশ’-এর সেই কাণ্ডটা শুরু হয়ে গেল। ‘প্রসরিল বীরভদ্র যজ্ঞ নাশিবারে।’ বামুন ছাড়া যজ্ঞ হয় না। ধর্ ধর্ বামুন ধর। আচমকা আক্রান্ত হলে আরশোলারা যেমন পালায়, বামুনরা তেমনি পালাচ্ছিল। ‘বামুনে ধরিয়া পুথি নিল কাড়িয়া—’ পুথি না-থাকলে আর বামুন কীসের? 

বামুনদের দ্বিতীয় চিহ্ন—পইতে। বামুনরাও জানে—পৈতে টেনে ব্রহ্মশাপ বামুনদের অস্ত্র। সবাই ভয় পায়। পালাতে পালাতে বামুনরা ‘পৈতে দেখায় কান্ধে’। ‘বামনের জিউ রাখো, বামনের জিউ রাখো’। 

বামুনদের তৃতীয় চিহ্ন দাড়ি। শিবের বাহিনী দাড়িওয়ালা বামুনের ‘তাইড়্যা ধরে তায়। পাড়িয়া দাড়ি উপড়ায়।’ 

চতুর্থ চিহ্ন টিকি। ‘শিবের বাহিনী যেন মরিচ উপড়ায়।’ 

কিন্তু যজ্ঞকুণ্ডে তো তখনো যজ্ঞাগ্নি জ্বলছে। যজ্ঞের আগুন নেবা, আগুন নেবা, মুতে দে, মুতে দে, ‘সঙ্গে দানা ঘটা। ধাইল ল্যাংটা। মুতয়ে যজ্ঞের কুণ্ডে। যজ্ঞকুণ্ডে মুতে যজ্ঞের আগুন নিবিয়ে শিব ধরে ফেলল সূর্যঠাকুরকে। সূর্য ঠাকুর সাত ঘোড়ার লাগাম ফেলে দিয়ে দুই হাত মাথার ওপর তুলে বলে ওঠে, ‘নাহি মার বামনের জিউ।’ সেই ফাঁকে তার সাত ঘোড়া ‘লাগাম ফেলাইয়া পালায় চৌদ্দ দিগন্তরে।’ 

আ হা হা হা রে! এমন পরম দৃশ্য কি কপালে না থাকলে দেখা যেত। মুতে দিয়ে যজ্ঞের আগুন নেবানো। আর সূর্যের সাত ঘোড়াকে চৌদ্দ দিগন্ত খুঁজতে খেদানো। এর চাইতে বড় নাশকতা আর কী হয়। দক্ষের ডাকা বামুনদের এমন ব্রহ্মাণ্ড জ্বালানো যজ্ঞের তেজ যে শিবের এক মুতেই নিবে যায়। এমনই সপ্তাশ্ববাহিত রথারূঢ় সূর্যের তেজ, যে সাত ঘোড়া চৌদ্দ দিকে ছোটে। 

নাশকতা ছাড়া কেউ পারে দু-পাঁচশ খাড়া দেয়াল টিকটিকির মত উঠতে? পারে কোনো গল্প নাশকতা ছাড়া, নিজের জামাকাপড় খুলে ফেলে কুড়কুড়ে ভাজা তুল্য নিজের পেশিগুলিকে নাচাতে? 

নাশকতার নেশাই আলাদা। 

নাশকতা ছাড়া নেশা হয়? 

সব কেমন সাজানো-গোছানো, ফিটফাট, হাড়িকাঠ, পৈতে-তিলক, সপ্তমীর চাঁদের আকারে চেয়ারপত্র সাজানো, সবাই সবাইকে দেখতে পাচ্ছে, এর নাম যজ্ঞস্থল, অ্যাসেম্বলি, কোনো পোয়াতি নারী হঠাৎ এখানে এসে পড়লে এই সব দেখেশুনে তার নির্ঘাৎ গর্ভপাত।—দে ছেড়ে এই স্টেজে বলদে চড়া সতীকে। অন্তত শিবভক্ত যোগেনকে। মুতে দে, মুতে দে, যজ্ঞকুণ্ডে। মুতে দে। যজ্ঞ দেখলেই যাজ্ঞসেনী? আরে আগুন থাকলে তো—? এপিক হয়, বে-এপিক ছাড়া? 

এপিকের খাসমহল বাড়াতে ও বে-এপিকের জবরদখল কমাতে, জন্মান্তর-অভিশাপ-পুনর্জন্ম – পুনরুদ্ধারের গল্পে তাপি বাড়তেই লাগল। তাপি সেঁটে কি আর বে-এপিককে ঠেকানো যায়? লাভের মধ্যে এপিকের তাপ্পিতে এপিকের রাজপোশাকই গেল হারিয়ে। 

ইন্দ্র তো স্বর্গের রাজা। তার এক ছেলে নীলাম্বর। সে নাকী একটা অভিশাপে নরজন্ম নেবে। সে নরজন্মের জন্য বাছা হয়েছে ব্যাধিনী নিদয়ার পেট। ধর্মকেতু আর নিদয়া, মানে, আজকালকার ফরেস্ট ভিলেজার। এমন জন্ম-জন্মান্তরের শূদ্র ছাড়া গর্ভ-ভাড়িনী সারোগেট মাদার পাওয়া যাবে কোথায়? পেটে পূর্বজন্মে-ইন্দ্রপুত্র নিয়ে নিদয়া তার স্বামীকে বলে কী কী খেতে ইচ্ছে। সাধ। ধানবাছা খৈ, ভয়সা দইয়ে মাখা। টোপা কুল আর করঞ্জা। পাকা চালতের ঝোল। মিঠা ঘোল। আমসির আচার। হলুদবাটা দিয়ে কাঁচকি আর পাঁকালমাছ। ‘আমার সাধের সীমা। হেলেঞ্চ কলমি গিমা।’ ‘পুঁইডগা মুখিকচু। ফুলবড়ি তাহে কিছু। তাতে দিবে মরিচের ঝাল।’ 

পেটে মানবজন্মের ইন্দ্রপুত্র থাকলেও শূদ্র শূদ্রই থাকে। মানবজন্ম নিতে ইন্দ্রপুত্রও যদি পেটে ঢোকে তাহলে শূদ্রাণী শূদ্রাণীই থাকে। যে-গর্ভভাড়িনী তার নিজের সাধের এই ফর্দ বানিয়ে বলে, ‘আমার সাধের সীমা’, তার পেট থেকে শূদ্র ছাড়া কিছু জন্মাতে পারে? পারে না। জন্মের সময় কেউই শাপভ্রষ্ট দেবতা নয়, অবতারও নয়। শাপমুক্তি-টুক্তি অবতার-টবতার, সে সব মৃত্যুর সময়ের ব্যাপার। 

একমাত্র যোগেন মণ্ডলই তো বলেছিল, ‘আমি শিডিউলও না, হরিজনও না। বামুন যদি তার জন্মপরিচয়ে বামুন হয়, আমিও তা হলে আমার জন্ম পরিচয়ে চাঁড়াল। চাঁড়াল হিন্দু নয়। হিন্দুকে রক্ষা করাও তার দায়িত্ব নয়।’ আঃ রে, আহা রে, আহা। কী মনোহর নাশকতা। কী চিরঞ্জীব নাশকতা। মুতে দে, মুতে দে। যজ্ঞের আগুনে মুতে দিয়ে আগুন নেবা 

যোগেন একেবারে হিন্দুধর্মটাকেই রসাতলে পাঠাল। শূদ্র ও অতিশূদ্র না থাকলে বর্ণাশ্রমের বাকি তিন বর্ণ কোথায় থাকে? চাঁড়াল কেন হিন্দু হবে বা হিন্দুদের বাঁচাবে? চাঁড়ালের তো অন্তত চাঁড়াল হওয়ার স্বাধীনতা আছে। 

নাশকতা! নাশকতা!! 

হ্যাঁ—এই গল্পটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন চারদিক থেকে নাশকতার সচিত্র সংবাদ আসছিল।

সেই সচিত্র নাশকতার সংবাদ-আসাটা তো রোজকার ব্যাপার। রাতে খাওয়ার সময় এগুলো মিশে গেছে। এটা আপাতত বিসদৃশ যে মৃত মানবশরীরগুলির বৈচিত্র্য রোজকার খাদ্যের উপকরণ হয়। শ্রীলঙ্কার তামিল, আফগানিস্তানের তালিবান, ইরাকের আত্মঘাতীরা, অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয়রা…. দীর্ঘ দীর্ঘ দৈনন্দিন তালিকা। সংবাদ সংবাদের সময়ই আসছিল। কেন যে তখন যোগেনের গল্পটা তৈরি হতে শুরু করে? এখনকার পক্ষে নিরর্থক, বাসি, বাতিল একটি গল্প? কে যোগেন মণ্ডল? তাকে নিয়ে হাজার পাতা? 

নাশকতার সামনে বেঁচে থাকাটাই একমাত্র ভঙ্গি। টিভি স্ক্রিনের আড়ালে লক্ষ মাইলের নিরাপদ দূরত্ব সত্ত্বেও, নাশকতার সামনে পালানোর প্রাথমিক প্রতিবর্ত কখনো এসে যায়। 

একটু তো অন্যমনস্কতা ঘটে থাকতে পারে। চোখে ঘটমান সংবাদের ছবি আর মাথায় একটু যোগেন। এত নাশকতা দেখলে-শুনলে সেটুকু অন্যমনস্কতা কি এখনো স্বাভাবিক? মনের মধ্যে খেলা করছিল আত্মরক্ষা। দরজার কপাটটা তাই খোলাই ছিল। আর, এমন একটা জালি গল্প ঘটে যাচ্ছে খোলা দরজার চৌকাঠটার ওপারেই—! 

খোলা কপাটের ফাঁক দিয়ে গলে, যোগেন ঢুকে গেল গল্পে। ঢুকল, যেন তার স্বাধিকারে। হিস্ট্রি নিয়ে জালি আর তাতে যোগেন নেই–এ কখনো হতে পারে? 

যোগেন যেন এ-গল্পের খাপে খাপে সেঁটে গেল। আর, তার তো এসেন্সিয়াল ও ডিজায়্যারেল–অপরিহার্য ও আকাঙ্ক্ষিত সব গুণই আছে। 

সে ছিল কিন্তু নেই। সে হিস্ট্রিখেলায় ছিল কিন্তু এখন সে নেই। ঐ খেলা যখন ছিল, ৩৭ সাল থেকে ৪৭ সাল, যোগেন ছিল। তারপর ঐ সময়টাও অলীক হয়ে গেল, যোগেনও তার সময়ের মতই অলীক হয়ে গেল। যোগেন যদি পাখি হত, তাহলে হত উটপাখি, সে উড়তে পারে না। যদি মাছ হত, তাহলে হত শুটকি মাছ—যা জলে বাঁচতে পারে না। যদি গাছ হত তাহলে হত গড়ান গাছ—বা শিকড় গাড়ে না। যোগেন ছাড়া চলে? বানাউটি, জালি, দুনম্বরি এই গল্পের ভরশূন্যতায় যোগেন খেলবে ভাল। খেলবে দারুণ!! 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *