১৪৮. উডবার্নের বাড়িতে
ওরা এলগিন রোডের মোড়ে নেমে, আবার একটু পেছিয়ে উডবার্নের রাস্তা ধরল। ঐ রাস্তাটা সোজা গিয়ে উডবার্ন পার্কে শরৎ বোসের বাড়ির গেটে ধাক্কা খেয়েছে।
মনিরুজ্জমান জিজ্ঞাসা করে, ‘বাড়ির সবাই হয় তো এই বাড়িতেই আছে।’
‘নাও থাইকতে পারে। এতদিন তো অপেক্ষায় ছিল কবে পুলিশ আইস্যা শরৎ বোসকে ধরব। পুলিশও আইসছে ধইরছেও ওকে-তাকে। এলগিন রোডের ঠাকুরটাকে নাকি খুব পিটাইছে। কিন্তু শরৎ বোসরে ধরে নাই। সেটা চুইক্যা গিছে। অ্যাহন তো যে যার বাড়ি ফেরার কোনো বাধা থাইকল না।’
লোহার ছোট গেটটা খোলা ছিল, ওরা ঢুকতে দেখেন দারোয়ানও টুলের ওপর বসে। ওদের দেখেই সে ভিতরে ছুটল কাউকে খবর দিতে। মনিরুজ্জমান ও যোগেন, বাড়ির সকলেরই চেনা। দারোগা-মতন একটা লোক বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ারে বসেছিল। সে যোগেনদের বলল, ‘আপনাদের নাম-ঠিকানাটা লিখে যাবেন।’ বলে, যুদ্ধের সময়কার একটা ছাই-ছাই রঙের বালিকাগজের সুতো দিয়ে সেলাই-করা খাতা এগিয়ে দিল। কিন্তু চেয়ার ছেড়ে উঠল না। মনিরুজ্জমান খাতাটা নিয়েছিল, ‘দু-জনেরটাই লিখব?’
‘না। যে যারটা লিখবেন।’
‘আপনি কি স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চ থিক্যা? যোগেনের প্রশ্নের জবাব দারোগা দিল না। ইচ্ছে করেই যে দেয়নি, সেটা বোঝাতে ঘাড়টা বাঁ-দিকে ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকে। মনিরুজ্জমান বলে, ‘পারপাজ অব ভিজিটও লিখতে হবে আবার, টু মিট হুমও লিখতে হবে। কি লিখব?’
দারোগা ঘাড় ঘোরায় না। যোগেন বলল,—টু ডিসকাস পলিটিকস উইথ শরৎ বোস, আর শরৎ বোস—লিখে দ্যান না। যেমন প্রশ্ন, তেমন জবাব।’
মনিরুজ্জমান একটু হেসে খাতা-কলম রেখে দিয়ে বলল, ‘ও আপনি লিখে দেন, আমি পারব না।’
যোগেন খাতাটা নিয়ে খসখস করে লিখতে শুরু করে। দারোগা তখনো ঘাড় ফেরায়নি।
যোগেনের লেখা শেষ হওয়ার আগেই ভিতর থেকে শরৎ বোসের সেজোছেলে অমিয় বেরিয়ে এসে ডাকে, ‘আপনারা আসুন। দে আর পার্ট অব আওয়ার ফ্যামিলি।’ যোগেন লেখাটা শেষ না করেই খাতাটা ফেলে রাখার ভঙ্গিতে পেনটা বন্ধ করে পকেটে গোঁজে।
‘ব্রজ খবর দিতেই মা বললেন, ওপরে নিয়ে যেতে। কিন্তু আমি দৌড়ে নেমেও তো পুলিশের অসভ্যতা থেকে আপনাদের বাঁচাতে পারলাম না।’
ভিতরে যেতে-যেতে যোগেন বলে ওঠে, ‘চলেন, চলেন। আমাগ কী করব ও? ওর খাতা আছে, আমাগ কলম নাই?’ যোগেন যে ঘরটিতে সুভাষের সঙ্গে কথাবার্তা বলত, সেই ঘরটির মধ্য দিয়ে ভিতরে ঢুকে বাঁ দিকে দোতলায় ওঠার চওড়া সিঁড়িতে পা রাখে।
মনিরুজ্জমান একটু হাসি মিলিয়ে অমিয়কে বলে, ‘যোগেনবাবু ওরা খাতায় যা লিখে দিয়ে এসছেন, তা যদি বুঝতে পারে, তাহলে তো এতক্ষণে তের নম্বরে ফোন করেছে।’
‘কী, কী লিখেছেন, যোগেনকাকু?’ অমিয় যেন একটু মজার আন্দাজ পায়।’
‘পারপাজ অব ভিজিট লিখেছে—শরৎ বোসের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে। আর কার সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ের জবাবে লিখেছে, শরৎ বোস।’
অমিয় খুব মজা পেয়ে ঝন ঝনিয়ে হেসে ওঠে, ‘বেশ হয়েছে, জব্দ হয়েছে, ঠিক হয়েছে। অমিয় লাফিয়ে-লাফিয়ে দুটো সিঁড়ি একসঙ্গে ভেঙে উঠে যায়, সম্ভবত মা-কে এই মজার খবরটা আগে জানাতে।
যোগেনরা ভিতরে ঢুকতেই বিভাবতী উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বলেন, ‘কী? কতক্ষণ বসিয়ে রেখেছিল পুলিশ, আপনাদের? নীচে?’
ওরা নিজের-নিজের আসনে বলতে-বসতে, যোগেন বলে, ‘বসাইবে কোথায়। কী একডা লিখতে খাতা আগাইল, সে-কাগজে তো কালি শুকায় না, শোষে। মনিভাই কী য্যান লিখছিলেন। ব্যস, স্যালুট কইরা ছাইড়্যা দিল।’
অমিয় একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলে, ‘আপনি যে লিখেছেন, টু টেক পলিটিক্স উইথ শরৎচন্দ্র বসু-–’
‘সরকারের খাতায় কি মিথ্যা কথা লেখা যায়? তাইলে তো ‘অবস্ট্রাকশন অব গভর্নমেন্ট অ্যাকটিভিটিজের মামলা দিবে। আর অ্যাহন তো যুদ্ধের টাইম, তাইলে তো যা করব্যা সবই অবস্ট্রাকশন টু ওয়ার ইফর্টসে দিবে দশ বছর ঠুইক্যা। নো জামিন নো কোর্ট। তাই সত্য ছাড়িয়ে মিথ্যা কই নাই—।’ যোগেনের কথায় ঘরের সবাই হেসে ওঠেন।
বিভাবতী বলেন, ‘উনি সব সময় বলতেন, যোগেনের মতো গল্প বলার পাওয়ার দুর্লভ। আর সুভাষকে একদিন কী গল্প বলেছিলেন, হাসতে-হাসতে সুভাষের কলিক পেন শুরু হয়ে গেল,’ বিভাবতী হাসি-হাসি মুখেই বলেন।
‘আপনারা তো স্যাটকেস-হোল্ড অল অব বাইন্ধ্যা-বুইন্ধ্যা রেডি হইয়াই প্ল্যাটফর্মে বইস্যাছিলেন–না?
‘সে আর বলবেন না। সুভাষ চলে গেছে ও আর ফিরবে কী না বোঝাই যাচ্ছে না। উনি আমাকে বললেন, স্যুটকেস-বেডিং গুছিয়ে রাখতে। আমি আবার বোকার মতো জানতে চাইলাম—তোমার কি কোথাও যাওয়ার কথা আছে?’ বিভা আঁচল চাপা দিয়ে হাসলেন। ‘উনি বললেন—বাঃ, আমার ভাই গেল নিরুদ্দেশে, তো ব্রিটিশ সরকার আমাকে ঘানি ঘোরাতে পোষ্যপুত্র রাখবে না? যে-কোনো দিন, পুলিশ আসবে। জানুয়ারি মাস তো—কোথায় না কোথায় রাখবে, আমি আবার একটা বিলেতি রাগ নিয়ে এলাম ডাক্তার দাদার কাছ থেকে। উনি তো কোর্টে বেরচ্ছেন, চেম্বার করছেন, অ্যাসেম্বলিতে যাচ্ছেন, বাড়িতে অন্য পার্টির নেতারাও আসছেন। দিনের পর দিন কাটছে। মাসও কাটে। পুলিশও আসে না। ওঁর ভাবসাব দেখে মনে হল, জেলে যাবার কথা ওঁর আর মনে নেই।’ বিভা আবার আঁচলে হাসি চাপা দিলেন। ‘আমিই-বা সেধে মনে করাতে যাই কেন। শুধু স্যুটকেসটা আবার নতুন করে সাজালাম—গরমের সময়ের জামাকাপড় দিয়ে। পুজো এল গেল। এবার কোথাও যাবার কথা কেউ মুখেও আনল না। আবার শীত পড়তে চলল। আবার স্যুটকেস গোছানোর কথা ভাবছি। দিন দশ-বার আগে একদিন বললেন, ‘যাক, বাংলাটাকে তো এআইসিসি গোবিন্দায় নমঃ করে দিয়েছে। একটু বোধহয় বাঁচানোর চেষ্টা করা যাবে। নতুন পার্টি হল। প্রগ্রেসভি কোয়ালিশন পার্টি। একটা ন্যাশন্যাল গবমেন্টের মতো—লিগ টু মহাসভা। হকশাহেবই লিডার হবেন। আমাকে ডেপুটি হতে হবে আর হোম মিনিস্টার। এই গভর্নর-ছোকরার আবার কী বুদ্ধি আছে, কে জানে। প্রায় ১০ দিন কেটে গেল। কিছুতেই ডাকছে না, হকশাহেবকে। অবশেষে বেস্পতিবার সকালে পুলিশ এল।
যোগেন বলে, ‘মানে কাল সকালে?’
বিভা একটু থমকে গেলেন, ‘কালই বেস্পতিবার ছিল?’
‘না, না, আজ সকালে আজই তো বেস্পতিবার’—মনিরুজ্জমান শুধরে দেন।
বেস্পতিবার, তো ১১-ই ছিল। ওঁকে নিয়ে গেল—ইন্ডিয়া গবমেন্টের হুকুমে, এখানকার গবমেন্টের কিছু করার ছিল না। প্রেসিডেন্সি জেলে রেখেছে। একটু আগে ফোন করেছিলেন। আজ তো শপথ ছিল, মন্ত্রিসভার, নতুন মন্ত্রিসভার। উনি বললেন, নতুন মন্ত্রিরা সবাই জেলে গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন।
বিভা যে ঘটনা বললেন, শহরের গুজব তার চাইতে আলাদা কিন্তু সে-গুজবগুলোর মধ্যে মিল নেই। শরৎবাবু অপেক্ষা করছিলেন কি পুলিশের লাইগ্যা না গভর্নরের লাইগ্যা? যোগেন একটু মজা করতে বলে, ‘দেখুন, দেখুন পুলিশ কেন আসছে না। গভর্নর কেন ডাকছে না—সেই সময়ে যেন ঘুম নেই। যোগেন ও মনিরুজ্জমান এটুকু দেখে আশ্বস্ত হল যে শরৎ বোসের গ্রেপ্তারের ফলে অন্তত তাঁর বাড়িতে কারো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েনি। সেই জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে প্রায় এই এক বছর ধরে বাড়িতে একটা প্রস্তুতি তৈরি হয়েছে। সেই প্রস্তুতির ফলেই দারোগার খাতায় যোগেন কী লিখেছে—সেটাই এতটা প্রধান কৌতূহল হতে পারে।
ওঠার পরে দু-জন আলাদা করেই বিভাকে অনুরোধ করল, ছোট বড় যে-কোনো দরকারে বিভা যেন তাদের খবর দেন।
বিভা উলটে বললেন, ‘আপনারা নিয়মিত খবর নেবেন। আমি কোনো খবর না দিলেও ফোন করবেন।’
