১৪৫. সুভাষ প্রহেলিকা
সুভাষ জেলের বাইরে থেকে একের পর এক প্রহেলিকা তৈরি করছিল। সকলের পক্ষেই নানা অপ্রস্তুত।
১. ৩৭-এর ভোটের পর জওহরলাল বেশ চড়া গলায় বলেছিলেন—ভোটে প্রমাণ হয়ে গেছে যে ভারতের রাজনীতিতে মাত্র দুটি পক্ষই আছে—কংগ্রেস আর ব্রিটেন। কোনো তৃতীয় পক্ষ নেই।
এর চাইতে বেশি ক্ষতি ভারতের আর-কোনো নেতার কোনো মন্তব্যে হয়নি—পাকিস্তান থেকে খালিস্তান পর্যন্ত নানারকম উগ্র বিচ্ছিন্নতার আন্দোলনের কোনো নেতার গ্রাম্য মন্তব্যেও নয়। জওহরলাল দেশ ও দলকে এক করে ফেলার যে-ইতিহাসসূত্রকে রাজনীতিতে ব্যবহার করলেন, সেই একই ইতিহাসসূত্র নানা সমীকরণে পাকিস্তানে বিভিন্ন প্রাদেশিকতাকে, ভারতে বিভিন্ন আঞ্চলিকতাকে ও বাংলাদেশে ইসলামি ও অনিসলামি বিভিন্ন রাজনীতিকে আজ পর্যন্ত মর্যাদা দিয়ে চলেছে।
২. সুভাষের ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল—কংগ্রেস জাতীয় মঞ্চ হওয়া দূরের কথা, একটা রাজনৈতিক পার্টিই নয়। সেটা একটা চক্র বা অলিগার্কি। প্রকাশ্য ভোটে জয়ী প্রার্থীকে সে-অলিগার্কি বা চক্র দল থেকে বের করে দেয়। সুভাষ এই চক্র বা অলিগার্কির একটা নামও দিয়েছিলেন, ‘দক্ষিণপন্থী’।
৩. সুভাষের বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করতেই দেয়া হল না সেই কংগ্রেসে, যে-কংগ্রেস ও ভারত নাকি সমার্থক। কোনোদিনই কি ছিল, আগে কিংবা পরে? ১৮৮০ সালের পর শাহেবরা হিশেব করে দেখল, মেকলের সন্ততিরা সারা ভারতে অত্যন্ত তাড়াতাড়ি বংশবিস্তার করেছে। ইংরেজি শিক্ষার পর এবার ভারতীয়দের একটা পরামর্শ সভার অভিজ্ঞতা দরকার, ইংরেজি শিক্ষার গুণে সেই আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হয়েছে। হল কংগ্রেস। কিন্তু বছর পনেরোর মধ্যেই সে-সম্মিলন নিজের যোগ্যতা ও স্বাতন্ত্র্য প্রমাণ করল, বিশ বছরের মধ্যে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সেই সম্মিলন ‘স্বদেশী’ হয়ে উঠল, সমাবেশ ও আন্দোলনের নানা আকার রপ্ত করে ফেলল—একই সঙ্গে বয়কট ও রাখিবন্ধন, বয়কট কার্যকর করতে ‘স্বদেশী ডাকাতি ও কর্মসূচিতে এসে গেল ও তা থেকে ব্যক্তিগত বা যৌথ সশস্ত্র বিপ্লবী সক্রিয়তা ১৯৩৭ পর্যন্ত ধারাবাহিক থাকল। কিন্তু কলোনিস্থাপকদের শিক্ষায় যে-সম্মিলন রাজনীতি করতে শুরু করল, সে-সম্মিলন তো তাদের কাছেই শিখবে—তাই অকল্পনীয়, দীর্ঘ, ব্যাপ্ত, স্বাধীনতা আন্দোলন সত্ত্বেও ভারতের কোনো মৌলিক দ্বন্দ্বের মীমাংসা হল না—হিন্দুসমাজের ভিতরের, বাইরের সঙ্গে হিন্দুসমাজের শিখ বা সমতুল্য আঞ্চলিক ধর্মের সঙ্গে হিন্দুধর্মের, ইসলামের সঙ্গে হিন্দুধর্মের অসংখ্য দ্বন্দ্ব সংঘাতের কোনো সমাধান সংকেতিতও হল না গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে আসার পরও প্রায় দেড় দশক। গান্ধীজির সমাবেশ ক্ষমতা ও ভারতীয়তা যখন স্বীকৃত হল, ঠিক তখনই এল সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ও তার পরই পেল ক্ষমতার প্রথম স্বাদ—কংগ্রেসই প্রধানত আর চারটি প্রদেশে প্রধানত মুসলিমদের পার্টি। কিন্তু লিগ নয়। জওহরলাল যখন বলেন, ভারতের ব্যাপারে দুটিই মাত্র পক্ষ, কংগ্রেস আর ব্রিটেন, তৃতীয় কোনো পক্ষ নেই, তখন ভারতীয় মুসলমানদের মনে কংগ্রেসের নিহিত হিন্দুয়ানি ও মুসলিম বিদ্বেষ আরো সংগঠিত ও কেলাসিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় না?
৪. প্রাদেশিক ক্ষমতায় এসে কংগ্রেসকে বম্বের শিল্পশ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইন পাশ করতে হল আর সুভাষ ও কমিউনিস্টদের সামলাতে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি নিষিদ্ধ করে দিল—কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা কোনো শ্রমিক-সংগঠন তৈরি করা, অনুমতি ছাড়া কোনো আন্দোলন করা, সত্যাগ্রহ করা, কৃষক সমিতি করা।
৫. এত কঠিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কংগ্রেসে কোনো তর্কই হয়নি। এই নিষেধাজ্ঞার জোরেই সুভাষের আন্দোলন ও মতের দায় কংগ্রেসের ওপর বর্তাল না। সুভাষ নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়ে কংগ্রেসকে জাতীয় মঞ্চের পালটা দাবিদারের ঝামেলা থেকে রেহাই দিল। বরং; সুভাষ নিজেকে বধ্যভূমিতে একলা করে নিল তার সমবেত হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে। বরং রাষ্ট্রপতি ভোটে তাঁর প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়া হেরে যাওয়ায় গান্ধীজির বিকৃত ব্যাখ্যা, ‘আরে সুভাষবাবু তো আর দেশের শত্রু নন’, আরো এক স্বস্তিকর বিকার হয়ে উঠল, সুভাষের অন্তর্ধানের কিছু পরে, ‘আরে, সুভাষবাবু তো আর স্বদেশপ্রেমিক নন’। তাহলে সুভাষবাবু গান্ধীজিকেও তাঁর দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি দিলেন।
৬. মুসলিম লিগের সঙ্গে সুভাষের সম্পর্কটা ছিল—খোলামেলা ও বন্ধুত্বের। বাংলায় তাঁদের কোনো নেতার পক্ষেই সুভাষের ব্যক্তিগত শত্রুতা করা সম্ভব নয়। সেই সুভাষ যখন কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত, তিনি জিন্নার সঙ্গে দেখা করেছিলেন লিগের সঙ্গে নতুন একটা বোঝাপড়ার উদ্দেশ্যে। অনেক গুজব রটল এই নিয়ে। পরে জানা গিয়েছিল—সুভাষের সঙ্গে জিন্না দেখাই করেননি, সুভাষ ‘কংগ্রেসের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন’, এই কারণে। অন্যদিকে আবার ফজলুল হকের সঙ্গে সিট-ভাগাভাগি করে সুভাষ, কংগ্রেস-রাষ্ট্রপতিপদ ছেড়ে দেয়ার এক বছরের মধ্যে, কর্পোরেশন দখল করলেন। এআইসিসি কোনো প্রার্থীই দেয়নি। তখন, জিন্নার সামনে কোনো পথ নেই। একটিমাত্র পথ খোলা—তিনটি লিগশাসিত প্রদেশের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণক্ষমতা সম্পূর্ণত ও নিশ্চিত জিন্নারই হাতে, এটা প্রমাণ করতেই হবে ভাইসরয়ের কাছে। ভাইসরয় লিনলিথগো যুদ্ধ বাধার সঙ্গে-সঙ্গেই জিন্নাকে এটা আশ্বস্ত করেছিলেন একেবারে সরাসরি। এই গল্পটা বা প্রমাণপত্র নতুন পাওয়া গেল। সে-গল্পের জন্য আলাদা জায়গা দরকার।
৭. জিন্না যুদ্ধের প্রয়োজনে ব্রিটেনকে লিগের সবরকম সমর্থন জানিয়েছেন আর এদিকে ৪০-এরই ১৫ জুন লিগকে দিয়ে একটা সার্কুলার জারি করলেন—কোনো মুসলিম কোনো ওয়ার-কমিটিতে যোগ দিতে রাজি হবে না। সেই মিটিঙেই এর পরে আর-একটি নীতি ঠিক করা হয় যে প্রেসিডেন্টের [জিন্নার] মত ছাড়া কোনো ওয়ার্কিং কমিটি মেম্বার কংগ্রেস বা অন্য কোনো দলের সঙ্গে এমন কোনো বিনিময়জ্ঞাপক কথা বলবেন না, যার ফলে কংগ্রেস ও লিগকে কোনো বোঝাবুঝির মধ্যে যেতে হয়।
এই দুটি ব্যাপারে জিন্নার সিদ্ধান্ত নিয়ে লিগের অনেক নেতাই আপত্তি করেছিলেন। একটি হল—কংগ্রেস সমস্ত প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাকে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিতে বলেছে। জিন্না এই নির্দেশকে সমাদর করে মুসলিমদের বলেন, ‘কংগ্রেসের অত্যাচার’ থেকে মুক্ত হওয়ার সুবাদে মুসলিম লিগ এই দিনটিকে ‘মুক্তি দিবস’ বলে পালন করবে। জিন্নার এই নির্দেশে লিগ ওয়ার্কিং কমিটি’র সদস্য, কলকাতার মেয়র, বাংলার এমএলএ এ আর সিদ্দিকি এই নির্দেশকে স্বাদেশিকতা-ও গণতন্ত্রবিরোধী মনে করে লিগ ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন।
দ্বিতীয় ব্যাপারটি হল—যুদ্ধ সংক্রান্ত কোনো কমিটিতে মুসলিম-প্রধান কোনো প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কেউ সভ্য হতে পারবেন না–প্রেসিডেন্টের অনুমতি ছাড়া। সারা ভারত থেকে মুসলিম নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা জিন্নাকে অনুরোধ করেছিলেন অন্তত ওই তিনটি প্রদেশকে—বাংলা, পাঞ্জাব ও আসাম—রেয়াত করতে। জিন্না তা করেননি। ফলে, জিন্না এমন একটি অবাস্তব ও স্ববিরোধী নীতি তৈরি করে ও সেই নীতি খাটিয়ে প্রাদেশিক লিগ সরকারের ওপর তাঁর ব্যক্তিগত দখল কায়েম করলেন। জিন্না একমুখে এই উলটো কথা বললেন—যুদ্ধে লিগ ব্রিটিশ সরকারকে সম্পূর্ণ সমর্থন করবে। যুদ্ধের জন্য তৈরি কোনো কমিটিতে লিগের কোনো প্রধানমন্ত্রী থাকবে না। এটা কী ধরনের সমর্থন বা এটা কী ধরনের অসহযোগিতা? এটা কী আর লেখা বা বলা যায় না—দুই প্রধানমন্ত্রী ও এই দুই প্রদেশের রাজনীতির ওপর জিন্নার দখল নেই—পাঞ্জাবের সিকান্দার হায়াৎ খান আর বাংলার ফজলুল হক। সে-দখল না-প্রমাণিত হলে তিনি কী করে প্রমাণিত হবেন লিগের একমাত্র মুখপাত্র বলে? এমন একমাত্র, যাঁর করজায় কোনো মুসলিম প্রধান প্রদেশ নেই। সুতরাং ফজলুল হককে সরতেই হবে—মাঝখানে এমন একটা ভাব আসা সত্ত্বেও যে আর-কোনো গোলমাল নেই।
৮. বাংলার ছোটলাট জে এ হার্বার্ট জুন ১৯৪০-এর প্রথম ১৫ দিনের রাজনৈতিক অবস্থা ভাইসরয়কে জানাচ্ছেন গোপন চিঠিতে। চিঠিটি লেখা হয়েছে ২৪ জুন। মানে, সুভাষকে গ্রেপ্তারের সপ্তাহখানেক আগে। এর আগের চিঠিতে আছে মে-মাসের শেষের পনের দিনের খবর। সেই চিঠিতে ছোটলাট লিখেছিলেন, ‘নাজিমুদ্দিন (বাংলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৯৪০), খুব জোর দিয়ে বলল লিগ যুদ্ধে পূর্ণ সমর্থন করবে অথচ ওয়ার কমিটিতে না-যাওয়া নিয়ে গোলমাল পাকিয়েছে, সেটা মিটিয়ে দিতে পারলেই সে সুভাষকে জেলে পুরবে ও সুভাষকে রাজনীতি থেকে মুছে দেবে।’ আমার কিন্তু ধারণা পার্টির (লিগের) ভিতরের চক্রের একটা লোভ আছে—সুভাষকে ছেড়ে রাখার। ভবিষ্যতে তাকে কাজে লাগতে পারে- পাটসংক্রান্ত তাদের নীতির কারণে বামপন্থী কংগ্রেসি ও বামপন্থী প্রজামেম্বরদের ওপর ইউরোপিয়ান ব্লক এমন চটে আছে যে দক্ষিণপন্থী কংগ্রেসিদের সঙ্গে নিয়ে সামনের অধিবেশনে তারা সরকার ফেলে দিতে পারে। সেটা হলে বামপন্থীদের এই সরকারের পক্ষে জড়ো করতে সুভাষকে কাজে লাগবে।’
পরের চিঠিতে এর পরের ১৫ দিনের কথা—
‘প্রধানমন্ত্রী লিগের ওই হুকুমকে কোনো পাত্তাই দিচ্ছেন না। লিগের সঙ্গে গোলমাল বাধলে বিপরীত কোন্ জোটের দিকে তাঁর নজর, তা একমাত্র তিনিই জানেন, বা তিনিও জানেন না। ইতিমধ্যে উনি একটা রগরগে বিবৃতি দিয়েছেন যে তার সঙ্গে সুভাষের একটা রাজনৈতিক চুক্তি হয়েছে। আসলে হয়ত এমন কোনো চুক্তির অস্তিত্বই নেই। নাজিমুদ্দিন বলেছে—পাটের ব্যাপারটা যদি মিটে যেত তাহলে সুভাষকে পুরো যুদ্ধটা ফাটক খাটাত। সারওয়ারদিরও একই মত।’
এরপর, সুভাষকে গ্রেপ্তারের পরের খবর—জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনের রিপোর্টে।
‘সুভাষের গ্রেপ্তার নিয়ে একটা মুলতুবি প্রস্তাব ১৫ তারিখে ১১৯ ও ৭৮ ভোট বেশ আরামসে হেরে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় হঠাৎ একটা মন্তব্য করায় কিছু কিচিরমিচির হয়েছে। বলেছিলেন, ‘সুভাষকে জেলের বাইরে দেখলে ও দেশের রাজনীতিতে তার যোগ্য জায়গা নিতে দেখলে আমার অতুলনীয় আনন্দ হবে।’ এমনও দুশ্চিন্তা ছিল যে মন্ত্রিসভা সুভাষের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করবে না। করলেও তুলে নেবে।… পুলিশ কমিশনার সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স অফিসারকে বলেছেন, দিল্লি থেকে একটা ওয়ারেন্ট আনিয়ে রাখতে। মন্ত্রীসভা ছেড়ে দিলেও সুভাষকে যাতে গেটেই আবার গ্রেপ্তার করা য়ায়।…আপনি তো জানেন, সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে ফজলুল হক ও নিজামুদ্দিন সুভাষের সমর্থন চায়।’
