১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১৪৪. সুভাষ-যোগেন শেষ দেখাশোনা

১৪৪. সুভাষ-যোগেন শেষ দেখাশোনা 

সুভাষের সঙ্গে যোগেনের এই কথা হয় ২৫ জুন, ১৯৪০, এলগিন রোডের বাড়িতে। এরপর আর তিনদিন মাত্র তার সুভাষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। 

২৯ জুন কাগজে একটা আবেদন বেরল সুভাষচন্দ্রের নামে- হলওয়েল মনুমেন্ট নিয়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মিলনের সিদ্ধান্ত এখনই কার্যকর করতে হবে। বাংলার শেষ স্বাধীন রাজার স্মৃতিতে ৩ জুলাইকে সিরাজদৌল্লা দিবস হিশেবে পালন করা হবে। হলওয়েল মনুমেন্ট শুধু যে নবাবের স্মৃতিকে কলুষিত করছে, তা নয়। প্রায় দেড়শ বা তার বেশি কিছু বছর ধরে আমাদের দাসত্ব ও অপমানের চিহ্ন হয়ে শহরের মাঝখানে খাড়া আছে। এই মনুমেন্টকে অপসারিত করতে হবে।… আগামী ৩ জুলাই এই অভিযান শুরু হবে। এই লেখক স্বেচ্ছাসেবকদের প্রথম দলের নেতৃত্ব দেবেন। 

সুভাষচন্দ্র বসু 

.

এই আবেদনটি সুভাষ ডেকে যোগেনকে দিলেন কাগজগুলিতে বের করতে। সেটা ২৭ জুন। ইংরেজিতে লেখা আবেদনটি যোগেনই টাইপে অনেকগুলো কপি করে বিলি করতে বেরল। ‘ফরোয়ার্ড’ আর ‘হিন্দুস্থান স্ট্যাডার্ড’-এ বেরল ২৮ তারিখে। বাংলা কাগজগুলিতে পরদিন, ২৯ তারিখে। ‘দি স্টার অব ইনডিয়া’, আর ‘আজাদ’–লিগের কাগজগুলিতে প্রথম পৃষ্ঠাতে খবর হিশেবেই বেরল। ২৯ তারিখ বিকেলে শরৎ বোসের সঙ্গেই যোগেন বোসবাড়িতে ফিরল। সুভাষ বাড়িতেই ছিলেন। বললেন, ‘ফরোয়ার্ড ব্লক অফিস থেকে ফোন করেছিল। স্বেচ্ছাসেবকরা নাম লেখাতে আসছে। অফিস থেকে বলেছে, যেদিন যাবেন, সেদিন যাবেন, নাম লেখাতে হবে না। কিন্তু আরো লোকজন আসায় আমাকে জিজ্ঞাসা করল। আমি বললাম, যাঁরা নাম লেখাতে আসছেন, তাঁদের নাম-ঠিকানা লিখে নিন। তাঁদের নিরুৎসাহ করবেন না। বেশির ভাগই কলেজের ছাত্র, মুসলিম।’ 

যোগেন বলল, ‘আপনি কি আশা করছিলেন যে হিন্দু মহাসভা স্বেচ্ছাসেবক পাঠাবে?’

‘কংগ্রেসের ছেলেরা? তারা তো আমাকেই নেতা মানে। আপনাদের লোকজন?’

‘কংগ্রেসের ছেলে মানে তো হিন্দু ছেলে। তারা ঠিক তাগ রাজনীতির সঙ্গে সিরাজদৌল্লাকে ম্যালানো শিখে নাই। এটা তো জাইনতে হয়। কংগ্রেস তো কোনোদিন সিরাজদৌল্লারে নিয়া কিছু করে নাই। আর আমাগ জাতের ছাওয়ালরা এইসবে কোনোদিনই নাই। আমরাও তো ছিলাম না। আমাগ তো নিষেধ ছিল। অ্যাহন যদি তাগ এই মিছিলে-জমায়েতে ডাইকতে হয়, তার আগে তাগ একডু শিখাইতে-পড়াইতে হব।’ 

যোগেন পরদিন আর আসেনি। ১ জুলাইও দুপুরে একটা ফোন করে সুভাষের কাছে জেনে নিয়েছে, তার কিছু করণীয় আছে কী না। সুভাষ একটু হেসে বলেছেন, ‘হ্যাঁ। ৩ তারিখে সত্যাগ্ৰহই বলুন আর হলওয়েল মনুমেন্ট অভিযানই বলুন, আপনি যেন স্বেচ্ছাসেবক হয়ে বসবেন না। এটা কিন্তু খুব দরকারি কথা। পার্ট অব মাই প্রোগ্রাম। কেউ আপনাকে বললেও আপনি যাবেন না। আমি যে আপনাকে নিষেধ করেছি, সেটাও বলবেন না। বড়জোর যেখানে সবাই জড়ো হবে, সেইখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন।’ 

‘আমার তো অভ্যাসও নাই স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার। আমি তো শূদ্র, বাই বার্থ পরেচ্ছাসেবক।’

২ জুলাই ভোরে মানে বাংলা অভ্যাসে ১ জুলাই রাত ১২টার পর, পুলিশ এল স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চ থেকে ও সুভাষকে ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া আইনেই প্রতিরোধ-সূচক, প্রিত্রমটিভ, গ্রেপ্তার করে প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে গেল। 

নানা কিছুর মধ্য দিয়ে, নোটিশ দিয়ে হাঙ্গার স্ট্রাইক করে ভগ্নস্বাস্থ্য ও অসুস্থ সুভাষ ছাড়া পেল শয্যাশায়ী হয়ে–৫ ডিসেম্বর, ১৯৪০। এই মুক্তিকে সরকারি নথিপত্রে এক-এক জায়গায় এক-একরকম বলা হয়েছে—’জামিন’, ‘বেকসুর খালাশ’, ‘প্যারোল’, ‘নজরবন্দী’, ‘গৃহবন্দী’, ‘অন্তরীণ’, ‘নিয়ন্ত্রিত চলাফেরা’, ‘কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে মত দেয়ার বা আন্দোলন করার ওপর বা সংবাদপত্রে বিবৃতি ও সাক্ষাৎকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা’, ‘মুক্ত সুভাষের সঙ্গে যাঁরা দেখা করতে আসবেন, তাদের পুলিশের অনুমতি নিতে হবে।’ 

সুভাষের ঘোষিত সত্যাগ্রহের আগেই সরকার একটি অর্ডিন্যান্স করে হলওয়েল মনুমেন্ট ও সুভাষ সংক্রান্ত সব সংবাদ প্রকাশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। ফলে, সুভাষের গ্রেপ্তারের খবরও কাগজে বেরয়নি, তার মুক্তির খবরও না। জুলাই থেকে ডিসেম্বর তার জেলখাটার কোনো খবরও কাগজে বেরয়নি। যা একটু-আধটু বেরিয়েছে সেটা আইনসভায় সুভাষ প্রসঙ্গ নিয়ে। 

ডিসেম্বর (৪০)-এর শুরুতেই যোগেনকে আইনসভাতেই শরৎ বোস বললেন, ‘সুভাষকে তো পরশু ছেড়ে দিয়েছে।’ 

যোগেন উদ্দীপ্ত হয়ে বলে উঠল, ‘প র শু উ দিন? আর আপনে আমারে আজ কইলেন? অ্যাসেম্বলিতে সরকার স্টেটমেন্ট করে নাই ক্যান?’ 

‘সরকার কি স্টেটমেন্ট করেছে যে ওকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে?’ 

ওঁরা কথা বলছিলেন আইনসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে। ওঁদের কথা বলতে দেখে কিরণশঙ্কর রায় চেয়ার থেকে উঠে এসে, দাঁড়ান। এঁরা দু-জন কিরণশঙ্করের দিকে তাকালে কিরণশঙ্কর শরৎ বোসের কোটের কনুইটা টানলেন একটু সরিয়ে নিতে। শরৎ বোস সরলেন না। তিনি কিরণশঙ্করের দিকে তাকালেন। কিরণশঙ্কর যতটা সম্ভব, তাঁর কানে কানেই কিছু বললেন। শরৎ বোস সেই গোপনতা ভেঙে দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ। ঠিকই শুনেছেন, ছেড়েছে সুভাষকে, তার মৃত্যুর দায় কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলতে। 

শরৎ বোস থেমে যান। কিরণশঙ্কর সরে গিয়ে তাঁর চেয়ারে বসেন। 

শরৎ বোস আবার যোগেনকে বলতে থাকেন, ‘তার ওপর যা কনডিশনের বহর, তাতে মনে হয়, সরকার চায়, সে তার নিজের বাড়িতেই মারা যাক। কারোর সঙ্গে দেখা করতে পারবে না, কথা বলতে পারবে না। আর যা হাল দাঁড়িয়েছে তাতে ওই নিষেধাজ্ঞা না-থাকলেও সুভাষ কিছু করতে পারত না। ফ্যামিলি মেম্বারদের লিস্ট চেয়েছে, ওর চিকিৎসা ও যত্নআত্তির ব্যাপারে ১২ জনের লিস্ট। সেটা আমরা এখন তৈরি করছি। প্রথম লিস্টটা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। জিগগেস করছে—সুভাষ বোসের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আমার সুভাষের সঙ্গে সবসময় কথা বলার দরকার কী? আমি চেষ্টা করব—একটা কোনো ফন্দি করে আপনার দেখার ব্যবস্থা করার। আপনাকে দেখে হঠাৎ মনে এল—আপনি তো সুভাষকে চিকিৎসা করেছিলেন, আপনাদের শাস্ত্র-অনুযায়ী একটা তেল বানিয়ে কয়েকবার দিয়েছিলেন। তাতে সুভাষের উন্নতি হয়েছিল। ত্রিপুরী থেকে ফেরার পর সুভাষকে নিয়ে যখন আমরা জামরিগেরিতে ছিলাম ওকে বিশ্রাম দিতে, তখন সুভাষের ইচ্ছেতেই আপনাকে খবর পাঠানো হয়েছিল ও আপনি সেখানে গিয়ে সুভাষকে পরীক্ষা করে কিছু ওষুধ দেন। তাহলে কনসালট্যান্টদের নামের লিস্টে আপনাকে ঢুকিয়ে দি’। 

‘ওরা সেডায় রাজি হব কেন?’ 

‘নাহলে অরাজি হবে। স্ট্যাটাস কুয়ো অ্যানটি। আপনার কোনো অসুবিধে নেই তো?’

‘ওরা জানে না নাকি যে আমি এমএলএ। আর আমার ডাক্তারি করার লাইসেন্সই তো নাই। পুলিশ কি চাঁদসি গ্রাহ্য করে?’ 

‘সেটা নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন? নাম-ঠিকানা দিয়ে দেব এই চিকিৎসা যাঁরা করে থাকেন, বংশপরম্পরায়।’ 

‘তা তো দেয়াই যায়—’ 

‘আপনি যাঁদের কাছে শিখেছেন—’ 

‘হ্যাঁ। তাও দেয়া যায়। 

‘তাঁরা আবার কেউ অস্বীকার করে বসবেন না তো?’ 

‘ওনাদের অস্বীকারের সুযোগ কোথায়? বড়জোর কইবেন, হ্যাঁ, শিখছিল তো কিছুদিন, তারপরে তো ও লাইন চেঞ্জ করছে। সেডাও কেউ কইব বল্যা তো মনে হয় না। এটা তো আমাগ সমাজের একটা গর্বের ব্যাপার।’ 

‘আপনি তাহলে আমাকে তিনটি নোট লিখে দিন। ডিটেইলস অ্যাভয়েড করবেন। যদি কোনো বিশ্বাস বা ধারণা থেকে পদ্ধতিটা তৈরি হয়ে থাকে, সেটা দেবেন, অ্যালপ্যাথি টার্ম ব্যবহার না করে, বরং একটু মিস্টিফাই করে। এটা প্রথম। দ্বিতীয়টা সুভাষের অসুখ নিয়ে আপনার মত। আর তৃতীয়টা ওই নামের লিস্টি। আজই। বিফোর আই লিভ 

‘এডু তো ভাবার টাইম দিবেন?’ 

‘লাইব্রেরিতে চলে যান, এখানে হবে না।’ 

যোগেন লাইব্রেরিতে পৌঁছুতে-পৌঁছুতে শরৎ বোস কী বলতে চাইলেন সেটা নিজের কাছে পরিষ্কার করে নিতে পারল। মনে-মনে শরৎ বোসের ওকালতির ক্ষমতায় আরো একবার অভিভূত হল। দুটি-তিনটি শব্দে কীভাবে উনি কী চাইছেন তা জানিয়ে দিতে পারলেন। এই লোকের সঙ্গে এই সব লাটশাহেব আর সেক্রেটারিরা পারে না কী। যোগেনের নোট যদি ঠিকঠাক হয় তাহলে হোম ডিপার্টমেন্ট নাড়া খাবে। ভারতীয় চিকিৎসা বিদ্যাকে অস্বীকার করার কৈফিয়ত দিতে হবে সরকারকে, হয়ত আইনসভায়। কিন্তু নোটটা হতে হবে খুব শাদাসিধে ও ভারী। 

লাইব্রেরিতে যোগেন সোজা গিয়ে টাইপরাইটারে বসল। প্রথমেই ঠিক করে নিল। যতটা পারে নির্দিষ্ট কথা বলবে, হাওয়ায় ওড়ানো কথা নয়—শক্ত কথা। প্রথম লাইনটা যোগেন টাইপ করে ফেলে, একবার পড়ে, টাইপরাইটার আর থামায় না। তার যুক্তির ধরনটা হল যে অসুখ-বিসুখ, অস্বাভাবিকতা থেকে মুক্তি পেতে সব দেশের মানুষই তার অভিজ্ঞতা ও পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান ব্যবহার করে আসছে, সেটাকে হাতুড়ে বলা ভুল ও তার পেছনে যথাযথ গবেষণা নেই বলা আরো বড় ভুল। ইন্ডিয়ান ফারমোকোপাইয়া সংকলিত না হলে চিকিৎসার এই পুরাতন বিজ্ঞানের রহস্য আমাদের কাছে উদ্‌ঘাটিত হবে না। 

চাঁদসি চিকিৎসা একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ভিতর থেকে একটি বিশেষ অঞ্চলে কতকগুলি বিশেষ ব্যাধির নিরাময়ের জন্য আবিষ্কৃত ও ব্যবহৃত হয় ও এখন ভারতের নানা জায়গায় এই চিকিৎসা ছড়িয়ে পড়েছে। অর্শ, ভগন্দর, ফিশ্চুলা, মলদ্বার-ব্রণ, মলদ্বারে স্থায়ী বিস্ফোটক, নালী ঘা, নাক দিয়ে রক্তপাত, গলা দিয়ে রক্তপাত, বমি—এই রোগগুলিকেই এই চিকিৎসার লক্ষবিন্দু বলা যায়। শরীরের ভিতরের অদৃশ্য কোনো একটি ক্ষত যদি তার পরিণতি নিয়ে শরীরের বাইরে চলে আসে, তাহলে সেই বহিরাংশটিতে রক্তসংবহন বন্ধ করে রেখে শুকিয়ে দেয়া হয়। সেই রক্তাভাবে শুষ্ক বহিরঙ্গ আর ভিতরের অদৃশ্য ক্ষতের পয়ঃনালী হিশাবে কাজ করতে না-পারায়, ভিতরের মূল ক্ষত আর কার্যকর থাকতে পারে না। চামড়ার ওপরের কোনো ক্ষতে এ চিকিৎসা ফল দেয় না। যদিও এটা শরীরের বিকৃত অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে তবু এ-চিকিৎসাকে অশল্যবিদ্যা বলা হয়। শল্যচিকিৎসা নয়—এটাই এ চিকিৎসার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। আবার, ঔষধসেবন অপরিহার্য নয়—এটাই এ চিকিৎসার তুলনায় আর-একটি বৈশিষ্ট্য। যদিও আধুনিককালে এমন একটা মতও স্বীকৃতি হচ্ছে—স্পর্শ, অঙ্গুলি ও হাত দিয়ে সম্পন্ন এ চিকিৎসাকে নিরস্ত্র সার্জারি বলাই উচিত। 

যোগেন নিজের খাড়া পড়ে নিজেই অবাক হয়ে যায়। সে চাঁদসিতে শিক্ষানবিশ করেছে, কখনো-সখনো প্র্যাকটিসও করেছে, কলকাতায় পড়ার সময় চাঁদসি করে-করে আয় করতে হয়েছে ও এখনো কখনো-সখনো প্যারী সরকারের মত আপনজন ডাক্তার কোনো রোগীর বিশেষ সমস্যা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন—এই সমস্তটাই এমন একটা ধারণা তৈরি করে তুলেছে তার মনে ও মাথায় তা সে নিজেই জানত না। জানার দরকারও পড়ত না যদি সুভাষ বোসের সঙ্গে দেখা করার একটি প্রক্রিয়া হিশেবে শরৎ বোস এই নোটটা তৈরি করতে না বলতেন। 

পুলিশের কাছ থেকে যোগেনের ছাড়পত্র এল বেশ তাড়াতাড়ি। যোগেন ব্যাখ্যা দিল, ‘ওই অফিসারের নিশ্চয়ই এই অসুখগুলার একডা আছে। অথবা, সুভাষবাবুর চিকিৎসায় মাথা ঠিক রাখা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনার তেলডা চাই ওই অফিসারের বা অফিসারের বউয়ের। 

সুভাষবাবুর সঙ্গে যোগেনের শেষ দেখা ৫ জানুয়ারি, ১৯৪১। যোগেন জানত না, সেটাই শেষ দেখা। সুভাষবাবু জানতেন কীনা তা কে বলবে। সুভাষবাবু তাঁর বাবার খাটে শুয়ে আছেন, সেই তাঁর ধুতি-পাঞ্জাবিতে। মুখে দাড়ি। বেশ কিছুদিন কাটেননি। সুভাষবাবুকে বড় বেশি রোগা দেখাচ্ছে কিন্তু আরো সুন্দরও লাগছে। সুভাষবাবুর সঙ্গ থেকে যে-স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে, সেটা যোগেন পাচ্ছিল না আর তার জন্য নিজেকেই দোষী করছিল—কেন সে এঘরে ঢুকেই এমন ভেবাচেকা খেয়ে গেল। যোগেন তাড়াতাড়ি অবস্থাটা পালটাতে চেয়ে বলল—’এতদিনে আমার জ্ঞান হইল, সুভাষবাবু, ক্যান আমি ন্যাশনাল লিডার কোনোদিনই হবার পারব না। যদিও একটু বিলম্ব হইল নিজের বোধোদয়ে, তবু আরো সর্বনাশের আগেই যে হইল সেডা অন্তত রক্ষা।’ 

সুভাষবাবুর পুরো মুখটা হাসিতে ভরে গেল। যোগেন খুশি হল। সুভাষবাবু বললেন, ‘আপনি তো অলরেডি ন্যাশনাল লিডার। হবেন আবার কী? ক-জন আমাদের ন্যাশন্যাল নেতার আপনার মত মাটিতে পা গাঁথা আছে? চোখের সামনে নিজের কাজ দেখতে পায় ক-জন? কিন্তু আপনি কী কারণ খুঁজে পেলেন, সেটা তো জানতেই হবে।’ 

সুভাষের প্রত্যাশাভরা শায়িত মুখটার দিকে তাকিয়ে যোগেন বলে, ‘একটু জটিল হবে না, এতডা শোনা, একডা আহাম্মকের বোধোদয়ের গল্প? আচ্ছা, আমি সংক্ষেপেই কই। কওয়াও দরকার। পুলিশ আপনার লগে যে ব্যবস্থা কইরছে, তাতে আপনারে তো অ্যাহন অহর্নিশ ভাবব্যার লাগব। আমার সমাধানডা নিয়্যাও এডডু ভাবলেন না-হয়।’ 

‘বলছেন কোথায়? ওরা জানে তো আপনি এসছেন। চা দিচ্ছে না তো।’ 

‘সেটা আমি প্রথমে জাইন্যা নিয়্যা আপনার ঘরে ঢুকছি। পুলিশের নিয়ম হইছে, আপনার ঘরে কোনো তরল পদার্থ ঢোকার পূর্বে পুলিশকে ডিশে কইর‍্যা তার স্বাদ বুঝাইতে হব। তাই চা আইসতে এডডু দেরি হবে।’ 

‘সত্যি? না, না। এটা আপনি বানালেন।’ 

‘সে আপনে পরে চেক কইর‍্যা নিবেন। আমাদের মূল কথায় ফিরি। প্রথম কারণ—আমি নমশূদ্র লিডার। ভারতে সর্বত্র তো নমশূদ্র নাই। তাইলে?’ 

‘আপনাকে বরিশালে বললাম-না, নমশূদ্র না থাকতে পারে। শূদ্র তো আছে। আপনাদের সারা ভারতের রাজনীতির সঙ্গে থাকতে হবে।’ 

‘আপনে তো বইল্যা খালাশ। নমশূদ্রই থাইকব্যার পারি না, তা আবার অল ইন্ডিয়া শুদ্দুর হইব? যত নমশূদ্রগ স্কুল বানাই, কইলকাতায় হস্টেল বানাই, সব ট্যার পাওয়ার আগেই কায়েত হইয়্যা যায়। সেনসাসে দ্যাখবেন।’ 

‘এটা তো পরিস্থিতি। আপনার কারণ কেন হবে?’ 

‘শুধু আমারই বেলা পরিস্থিতি। আচ্ছা জেনারেল সিটে শিডিউল প্রার্থী—সারা ভারতে একমাত্র আদি ও অকৃত্রিম যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। এডা তো পরিস্থিতি। তাইলে কী হওয়া উচিত ছিল। আমি বিনয় দেখাইয়া কইব, ‘কী যে কন। আমি শুদ্দুর। ভোটে জিত্যাও শুদ্দুর’ আর বাবুরা কইবেন, ‘তুমি তো আমাগ প্রতিনিধি। শুদ্দুর হইব্যা ক্যা?’ তা না কইয়্যা বাবুরা বাহবা দিয়া কইল, ‘সেডা তো ঠিক কথাই, তুই শুদ্দুর তো বটেই। তাই তোর জিতাডা য্যান ভূমিকম্প।’ 

সুভাষ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠেন। 

‘কিন্তু এহো বাহ্য, আগে কহ আর। সব্বার থিক্যা বড় ও শক্ত কারণ হইতেছে, ন্যাশন্যাল লিডার হইতে গেলে হাঙ্গার স্ট্রাইক করা প্র্যাকটিস লাগবই, এমনকী সুভাষ বোসকেও। ওই ডা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি না-খাইয়্যা থাইকতে পারব না। কী কইর‍্যা পারব হাঙ্গার স্ট্রাইক। আমাগ তো চৌদ্দ পুরুষের ক্ষুধা। খাইল্যাম কবে যে না-খায়্যা থাকব?’ 

সুভাষ হাসতে-হাসতে উঠে বসলেন। হাসি আর থামে না। একবার বুকে হাত দেন, একবার পেটে হাত দেন। তারপর একটু জিরিয়ে বলেন, ‘আমি তো হাঙ্গার স্ট্রাইক করিনি। আমি তো গবর্মেন্টকে লিখেছিলাম, আমার নিজের মৃত্যু ঘটানোর অধিকার আমার নিশ্চয় আছে; আমি সেই অধিকার প্রয়োগ করব। জেলের মধ্যে আর কী করে মরব? না খেয়ে। আপনার তো মরার কোনো সমস্যা নেই, শূদ্র হিশেবে আপনার সমস্যা তো বাঁচা। তাহলে আপনি হাঙ্গার স্ট্রাইক করবেন কেন?’

এটা ৫ জানুয়ারি ৪১-এর ঘটনা। এরপর যোগেন আর সুভাষের সঙ্গে দেখা করার ও কথা বলার সুযোগ পায়নি। 

২৩ জানুয়ারি পুলিশ তাঁর ঘরে ঢুকে দেখে, সুভাষ নেই। সুভাষের এক ভাইপো সুভাষের হাতে লেখা চিঠিটা পড়ে পুলিশকে শোনালেন, ‘মহত্তর জীবনের সন্ধান করতে আমি গৃহত্যাগ করছি।’ উনি কয়েকদিন তাঁর ঘরে কাউকেই ঢুকতে দিতে নিষেধ করেছিল। রান্নার ঠাকুরকেও না। সে খাবার দিত দরজার তলা দিয়ে। পরিবারের সবার ধারণা তিনি সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। এ-খবরটা ছোট করে বেরিয়েছিল। যোগেন সেটা পড়েই জানল। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *