১৩৯. একদিনের জন্য প্রোগ্রাম স্থগিত
সিদ্দিকিশাহেবের বাড়ি থেকে শাকিনার বাড়ি আসা তো ট্রামে কটা স্টপ, বসার জায়গা থাকলেও বসার দরকার হয় না। মৌলালিতে নেমে মিড্ল্ রোড পর্যন্ত হাঁটা।
কিন্তু ঐ টুকু দূরত্বেই যোগেন একটু বুঝে নিতে চাইল–ঘটনাটার সঙ্গে তার লিপ্ততা কতটা? ধাঙড়দের হরতালে সুভাষবাবু তাকে যেতে বলেছিলেন, সে গেছে। সে খবর রাখত না, তেমন। ঐ একদিন গিয়ে যা বুঝেছে, তাতেই তার মনে হল, এত বড় একটা ঐতিহাসিক ঘটনা, না, ‘ঐতিহাসিক’ কথাটা সে ব্যবহার করতে চায়নি, অভ্যাসে এসে গেছে, কিন্তু, এত পেছিয়ে থাকা মানুষের এক হওয়াটার মত বড় ব্যাপার, এটা অবিশ্যি এই কমিউনিস্টমার্কা কংগ্রেসিদের সঙ্গগুণ। না-হলে যোগেন মানুষের সমাবেশের ছোটবড় দোষগুণ এ-নিয়ে খুব মাথা ঘামাত না, জানতও না কিছু। এখন, যোগেনের মনে হচ্ছে, কংগ্রেসের গান্ধীজির সত্যাগ্রহে কয়েকজন ধুতিপাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক ‘অহিংস অসহযোগিতা’র ‘সত্যাগ্রহ’তে অসহযোগিতাও বোঝা যায় না, অহিংসা বোঝানোর মত কোনো ভঙ্গি তো আর নেই, কিন্তু এই ধরনের জমায়েতের জোর আলাদা।
যোগেন কি একটু আগ বাড়িয়ে ভাবছে। একদিনের আলাপে ওরা বলল, একটা ব্যবস্থার চেষ্টা করতে আর সে আজ সকালেই সিদ্দিকিশাহেবের সঙ্গে দেখা করে, কথা বলে সব ঠিক করে ফেলল। সিদ্দিকিশাহেব নিজেই আসবেন ওয়ার্কারদের কাছে বলতে, কী কী ব্যবস্থা তিনি নিতে পারবেন?
এতটা আত্মবিশ্বাস যোগেনের জমবে কোথ্ থেকে যে তার উদ্যোগেই সব হল এমন ভাববে? বরং, তার বংশগত ও জাতগত স্বভাবে সে একটু সন্দিহানই হয়ে পড়ে, কারো প্যাচে পড়ল না কী! এ পর্যন্তও সে মনে-মনে ভেবে নিতে পারে যে শাকিনা বেগমের মত নেত্রী ও নারী তার ইতিপূর্বে দেখা নেই, এত কাছে থেকেও দেখা নেই। সেখানেই কি তার এই তৎপরতার শিকড়? তার রাজনীতির এই এক অন্য শিকড়ের আন্দাজ থেকে বা হয়ত ইচ্ছে থেকেই, যোগেন তার চেনাজানা ও অভ্যস্ত শিকড়টাকে স্পষ্টভাষায় চিনে নিতে পারে। আগেও এটা শুনেছে, নিজেও বুঝেছে কিন্তু ধারণাটাকে স্পষ্ট করতে চায়নি যে তার সবসময়ই এক অদৃশ্য প্রতিযোগী থাকে, বর্ণহিন্দু। সে প্রতিযোগী কোনো একটা লোক নয়, সেটা বর্ণহিন্দুত্ব, বর্ণহিন্দু কালচার। যোগেন কুকুরের মত ঘ্রাণশক্তিতে বুঝতে পারে, তার কোন্ কাজটায় এই বিস্ময় চমকে ওঠে ভদ্রলোকদের চোখে—বাঃ, এতটা ভেবেছে, বা, সত্যি, ওর মত কত শক্তিমান লোকজন অন্ত্যজ বা তপশিলি সমাজে ছড়িয়ে আছে। মল্লিক ভাইরা বা উপেন বর্মণ বা প্রেমাহরি বর্মণ এমন চমকে দিতে পারে না। ওঁরা চেহারায়, শিক্ষাদীক্ষায়, সব দিক থেকেই, উচ্চবর্ণ হিন্দু, শুধু জন্মসূত্রে শূদ্র। হেম নস্কর মশাইও তাই। তাঁর আভিজাত্য, ভদ্রতা ও আপ্যায়নের ভিতর থেকে বামুন জমিদারের মত ব্যবহার যেন উপছে পড়ছে। গায়ের রং টকটকে ফরসা নয়, কিন্তু এমন যে দেখলেই বোঝা যায়, রোদজল-খাওয়া চামড়া না আর-এক পুরুষেরও না। ফিনলে মিলের একেবারে ভেজা কাপড়ের মত বুনটের ধুতি আর গলাখোলা নেটের গেঞ্জি। যোগেনের চেহারাতেও সেসব আছে—যে কেউ দেখলেই বোঝে জন্মত শূদ্র কেবল নয়, যোগেন কালচারে শূদ্র। যোগেনের সচেতন প্রতিটি মুহূর্তই এই কালচারের দ্বন্দ্বে আতত হয়ে আছে। সে তাই কলকাতার ভাষায় কথা বলে না। সে তাই বরিশালি ভাষায় ইংরেজি বলে না আবার শাহেবদের নকল করেও না। সে আশু স্যারের মত করে ইংরেজি বলে—তাকে বোঝানো ও শেখানোর জন্য আশু স্যার শব্দের সিলেবল জোর দিয়ে যেমন ভাঙতেন আর যতিচিহ্নগুলো যেমন অতিকৃত করতেন প্রশ্ন, বিস্ময় এসব নির্ভুল জানাতে—সেই দুটো, যোগেন খুব খেয়াল করে বাদ দিয়েছে। সে বর্ণহিন্দুর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তো বর্ণহিন্দুকে হারিয়ে বর্ণহিন্দুরও নেতা হতে চায়। সেখানেই তার রাজনীতির শিকড়। সে আজও মুগ্ধ হয়ে স্মরণ করে ‘মেবারপতন’ অভিনয়ের পর গ্রিনরুমের ভিতর দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে নিম্নস্বরে শিশিরবাবুর গলায় ম্যাকবেথ ইফ ইট অয়্যার ডান ইট ওয়্যার বেস্ট দ্যাট…
যোগেন আজও শিশিরভাদুড়ির গলা মনে করল কিন্তু শাকিনার প্রাসাদে ঢোকার আগে সে বুঝে ফেলতে চেয়ে জিজ্ঞাসা করে, এই কি তাহলে তার রাজনীতির নতুন শিকড়? সে-শিকড় শোনায় মাটির তলের জলে ডোবা মেয়ের স্বর, সে-শিকড় লতিয়ে দেয় শাকিনার খাড়া কনুই থেকে তার কপালের আঙুল পর্যন্ত ওঠার গতি। হ্যাঁ, সেই অদৃশ্য প্রতিযোগীর শেষ পরাজয় ঘটিয়ে যোগেন স্বাধিকারে, স্বনির্বাচনে, স্বেচ্ছায় তার দ্বিতীয় শিকড়ে স্ফুট ও নন্দিত হতে চায়।
যেখানে বসে শাকিনা সেখানেই বসেছিল। অনেক হরতালি তাকে ঘিরে বসেছিল, ঠিক ঘিরে নয়, একটু সরে দুই ধাপ সিঁড়িতে বসেছিল কয়েকজন, দোতলায় ওঠার সিঁড়িতেও।
যোগেনকে ঢুকতে দেখে এরা কেউ সরে গেল না, একটুও না। যোগেনকে জায়গা করে নিতে হল পা ফেলে ভিতরের সেই আধা চৌকিতে গিয়ে বসার। শাকিনা যোগেনকে তার বসার জায়গা থেকে আদাব দিল। যোগেন নমস্কার করল। যোগেন যেন ভেবেছিল নীহারেন্দু বা ওরকম কেউও থাকবে। এদের মধ্যে যে-কথা হচ্ছিল, সে-কথাই চলছিল। যোগেন বোঝার মত করে শোনেওনি। মনে হচ্ছিল, ওরা সবাই দরকারি কথা বলছে। আবার, এও মনে হচ্ছিল, তেমন দরকারি নয়ও হয়ত। হলে কি আর চুল বাছাবাছি হত বা পুরুষদের একজন মেঝের ওপর দেয়াল ঘেঁষে অমন ঘুমুত। নিশ্চয়ই মদ খায়নি। খেলেই বা কী? ওরা হরতাল করছে, পুজো তো করছে না।
কাদির শেখ ঢুকে দরজা থেকেই চেঁচিয়ে বলে, ‘শাকিনা, তোমার এত বড় হরতালে সব পার্টিকে জমা করেছ, শুধু তোমার নিজের পার্টিটাকে ভুলে থাকলে?’
‘কাদিরভাই, বসুন। কিন্তু আমার পার্টি কোটা?’
কাদিরভাই রাজনীতিতে চেনা মানুষ। যোগেনকে একটা ছোট আদাব দিয়ে সে যোগেনের পাশেই বসে। এই সময়টা জুড়ে শাকিনা তার নিজের জিজ্ঞাসার, আমার পার্টি কোন্টা, আনুষঙ্গিক ভঙ্গি করছিল ভিড়ের মানুষজনদের দিকে আলাদা-আলাদা করে তাকিয়ে আর নিজের হাতের পাতাদুটো ঘোরাতে-ঘোরাতে। একটা মেয়ে গলায় কোনো প্রশ্ন ছিল, শুনে সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল, যোগেন বোঝে প্রশ্নটা ছিল—মাতাজির কী হারাল, এত তালাস!
কাদিরভাই যেন এতক্ষণে যোগেনকে দেখতে পায়, ‘এই তো, আর-একজনও হাজির। সব আসামি এক হাজতে? নিজের পার্টিটাকে ভুলে থাকলেন?’ এইসব কথাই যোগেনকে বলা যোগেনও হাসল। তারপর যোগ করল, ‘আপনেই তো দেহি এক বেবাগের মনেরও হিশাব রাখেন, আইন-অমান্যেরও হিশাব রাখেন। একটু কয়্যা দ্যান—’
‘এই-যে আপনারা দুইজনই রিজার্ভ সিটে জিতে কর্পোরেশনে এলেন, সেইডা কীসের রিজার্ভ?’
‘খাইছে। আপনে কি ইমপস্টারের মামলা আনবেন না কী?’
‘এইটা কি কোনো প্রশ্ন হল কাদিরভাই। আমি যার রিজার্ভ হতে পারি আইন-মুতাবেক, তার রিজার্ভ। কেউ যদি অন্যকিছুর রিজার্ভ মনে করে ভোট দিয়ে থাকে, সেটা তো আমার ওপর বর্তাবে?’
‘সেসব কথা না। কিন্তু আইন তো আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে, আপনি যে শিডিউল্ড কাস্ট বা মুসলিম বলে এতসব সুযোগসুবিধে পাচ্ছেন, তাহলে আপনে যে শিডিউল্ড বা মুসলমান তার প্রমাণ কী?’
‘কোর্টের তো যা খুশি প্রশ্নের অধিকার আছে। আসামির কি যে-কোনো জবাবের প্রভিশন নেই?’
‘আমি তো উকিল না—আমি কী করে বলব?’
‘আসামির আছে—কোন প্রশ্নের জবাব না দেয়ার অধিকার’—যোগেন বলে আবার যোগ করে—’আগে তো বামুনগ বার্থ-সার্টিফিকেট দেখতে হবে। তার কত পরে আমরা শূদ্ররা মুসলমানরা। কোনো বামুন কি প্রমাণ দিচ্ছে—সে যে বামুন তার প্রমাণ?’ বলে যোগেন কাদিরভাইয়ের দিকে তাকায়, নিজের যুক্তি বিষয়ে নিশ্চিত।
কাদিরভাই হেসে আপাতত পরাজয় মেনে নেয় যেন। সেটা সবাইই মেনে নিল এমন একটা হাওয়া তৈরি হতে-না-হতেই কাদিরভাই বলে,
‘বামুনরা কি বাউন হওয়ার ফলে কোনো অ্যাডভানটেজ পায়? ধরেন, কোটার সিট, ইলেকশনের বা কলেজে ভর্তির বা চাকরির। তো আপনি একটা অ্যাডভানটেজ নেবেন। আপনাকে তো জানান দিতে হবে যে আপনার অ্যাডভানটেজ পাওয়ার রাইট আছে কী না আছে।’
‘এটা তো উলটেও দেয়া যায় কাদিরভাই। বামুনরা যেসব প্রিভিলেজ এতদিন প্রমাণ না দিয়্যা পায়েছে সেইগুলো কাইড্যা বিলি করা হচ্ছে যাদের মধ্যে, তাদের কী দায় পড়েছে প্রমাণ দেয়ার। ধরেন, কোনো জমিদার, বড় মানুষ, বড় জাত তাঁর মাতৃশ্রাদ্ধে ব্রাহ্মণভোজন করাচ্ছেন, ঢাকঢোল সহরৎ সেটা প্রচার করা হইছে, তা এ কথা তো সকলেই জানে বামুনদের পেট শুরু হয় বুকের উপুর থিক্যা। সুতরাং এমন নিমন্ত্রণে লোকাভাবের কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু তাদের কাছে কি প্রমাণ চাওয়া হয়? প্রমাণ চাওয়া কি সম্ভব? সুতরাং ব্রাহ্মণদের ভিড়ে কিছু-কিছু অব্রাহ্মণ তো মিশে থাকতেই পারে। উলটাটা ধরেন, কাদিরভাই। ঐরকমই আর-এক বামুন ঐ মাতৃশ্রাদ্ধেই, না’ না এরা দুইজন এক মায়ের পোলা না, যে যার মায়ের পোলা, এই দুই নম্বর পোলা সাব্যস্ত কইরল যে মাতৃশ্রাদ্ধে স্যায় কাঙালি ভোজন করাইব। সেহানেও লোকাভাবের কোনো কারণ নাই। বামুন আর কাঙালদের মইধ্যে খুব একটা রূপের কমব্যাশ নাই। অ্যাহন, সেই কাঙালগ ভিড়ে দুই-চারজন বামুন মিশ্যা যাবার পারে। তারা যে বামুনও বটে, শুধুই কাঙাল নয়, এটা প্রমাণের দায় কি বামুনদের? আগের ব্রাহ্মণ ভোজনের কেসে ব্রাহ্মণস ওয়্যার ইনভাইটেড। বাট ইট ডাজ নট এক্সক্লুড দি নন ব্রাহ্মিণস। সিমিলারলি ইন দি কেস কাঙালি ভোজন, ব্রাহ্মিণস হু আর কাংগাল টুউউ, আর নট এক্সক্লুডেড। সুতরাং আপনি যে-অভিযোগই করেন, তার দ্বারা আমরা অ্যাফেকটেড না।’
কাদিরভাই বলেন—’উকিলের কথা, হাতির গোবর আর গঙ্গাজলের কল একবার খুললে আর বন্ধ হয় না। বলছিলাম—ভোটে দাঁড়ালেন না-হয় মুসলিম লেডিজ আরবান বলে। কিন্তু জিতে কোন্ পার্টি হলেন?’
‘যে পার্টি ছিলাম! মুসলিম লেডিজ আরবান।’
‘আরে, এডা তো শাকিন সিটটার নাম। এরপর তোমার পার্টির নামটা তো চাই। সেটা কী?’
‘সে একটা কিছু বের করে দেন। আমি রাজি।’
‘লেখাই আছে, দিদি, এখানে, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইনডিয়া’।
‘ও-কে।’
‘আপনি যদি সিপিআই হন, তাহলে আপনার ইউনিয়নের দায়দায়িত্বও তো সিপিআইয়ের। অথচ, আপনি তো সিপিআইকে ডাকেনওনি, কী করা হবে সেসব নিয়ে সিপিআয়ের সঙ্গে কথাও বলেন না।’
‘কাদিরভাই, আপনে তো সিপিআই?’
‘হ্যাঁ, তা ধরতে পারেন—’
‘কাল আপনে সামের জুলুশে আসেননি?’
‘না। কাল তো আসিনি।’
‘ইসমাইলভাই-এর বক্তৃতায় তো পুরা জুলুশের আঁখ ভিজে গেল। কী বললেন ইসমাইল ভাই? বললেন, এই জুলুশ দরিয়ার মত, কিন্তু সে-দরিয়ায় জল নেই। শুধুই পথথর্। পথথরকে দরিয়া। ওঃ। ইট ওয়াজ সো নোবল। আমি বাড়িতে ফিরে মনে আনার চেষ্টা করলাম। ফলে, ঘুমের বারোটা বাজল। কাদিরভাই—ইসমাইলভাই তো কমিউনিস্ট। তা, বলছেন কেন, আমি কমিউনিস্টদের ডাক করছি না। কিন্তু আমিই তো বুঝতে পারছি না, আমি কেন, কমিউনিস্ট, মণ্ডলজিরও কি এক কেস।’
‘কেস একই—তবে উনি তো কংগ্রেসসমর্থিত নির্দল। এদিকে বিপিসিসি তো কিছুই জানে না। জানতে চায়।’
যোগেন ঠিক করতে পারে না, সকালে সিদ্দিকিশাহেবের সঙ্গে যে-কথা হয়েছে তা কাদিরভাইয়ের সামনেই শাকিনাকে জানিয়ে দেবে কী না। শাকিনার এখানে গোপনতা কিছু আছে বলে তো ঠাহর করতে পারেনি যোগেন। সব কথাই সবার সামনে হয়, সবাইই সব কথায় একই অধিকারে কথা বলে। কথা বলতে-বলতে উঠেও যায় আবার আগের কথার কিছু না জেনেও এসে কথায় বসে যায়। যোগেনও হয়ত এসেই বলে দিত, যদি সে নিজে যুক্ত না হত ব্যাপারটির সঙ্গে। কাদিরভাইয়ের কথাতে অবিশ্যি বোঝা যাচ্ছে—কিছু ঘোঁট ও গোপনতা কোথাও-না-কোথাও আছে। আবার, এটাও বোঝা যাচ্ছে, তেমন একটা কিছু কোথাও আছে এমন মানতে চায় না শাকিনা, এমন প্রশ্রয়ও দিতে চায় না। যোগেন ঠিক করে ফেলে, সেই কথাটা বলবে, সিদ্দিকির কথা।
ফোনটা বেজে উঠল, স্কুলের ছুটির বেলের মত। একজন ধরেছিল। সে কী বলে দেয় শাকিনাকে। শাকিনা একটা আধবলা কথা আধখানা রেখেই বাঁ হাতের মুঠোয় ফোনটা চেপে ধরে বলে, ‘শাকিনা বলছি’।
একটু চুপ করে শুনে, সেই শূন্যতাটা তার ব্যক্তিগত হাসিতে ভরে দিয়ে, শাকিনা কপালে ভাঁজ ফেলে বলে ওঠে, ‘হায় রাম, এ তো খুদ শোভানাল্লা কী আওয়াজ!’ বলে সে হাসিটা ধরেই থাকল রিসিভারের কালো ছোট শূন্যতায়, যেন, সে জলে তার মুখের ছায়া দেখছে। এই মুহূর্তটি ও এই দৃশ্য যোগেনের চোখে ও মনে সেঁটে যায়, সে এতটাই নিষ্ক্রিয় ওতপ্রোত দর্শক। শাকিনা মাথা নাড়াচ্ছিল আর ছোট-ছোট আওয়াজ তুলছিল ‘জি জি জি’ বলে, ভুরু দুটোতে ও ভুরু দুটো যেখানে মিলেছে সেই বিন্দুটাতে ও কপালেও কিছু কিছু রেখা ফুটছিল আর ভাঙছিল আর ফুটছিল। শাকিনা ফোনটা ডানমুঠোতে নেয়ায় পূর্ব ভঙ্গিটা স্মৃতি হয়ে গেল। যোগেন আন্দাজের চেষ্টাই করেনি কে ফোন করেছে বা সিদ্দিকিশাহেবের ফোন কী না। তেমন কোনো আন্দাজের জন্য দরকার জ্ঞানই তার নেই এদের সম্পর্কে। তেমনি যোগেনের হয়ত পেশাগত আপত্তিই তৈরি হয়েছে, অন্যের কথা শুনে ফেলার বা চিঠি দেখে ফেলার।
ফোনটা হাতে নিয়েই শাকিনা উঠে দাঁড়ানোয় মালুম হয়, সে কতটাই লম্বা আর তার খুবই লম্বা চুল বেণী বাঁধা। সেই বেণীটাও স্বাভাবিকতই অতটা লম্বা। সে দাঁড়িয়ে ফোনটা কোনো একদিকে বাড়িয়ে ধরায় তারে টান পড়ে, তখন, শাকিনা আবার তার পুরনো জায়গায় প্রথমে দাঁড়িয়ে, পরে বসে পড়ে বলে, ‘হাঁ, হাঁ, হিয়াঁই হ্যায়, লেকিন পারফেক্ট জেন্টলম্যান হ্যায়-না, কই আদমিকো ওভারটেক করনেবালা নাহি।’ শাকিনা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাসে, গৌরনদীর খালের ধারে জোয়ারের ধাক্কায় থরথরানো এক ফুলন্ত বকুলের মত, এতটা কাঁপলে দুটো-চারটি শাদা ফুল তো জোয়ারের স্রোতের ওপরে ঝরে পড়তেই পারে, দেখতে মনে হতেও পারে—জোয়ারস্রোত থেকে ফেনা উলটো গতিতে বকুলগাছটার পাতায় গিয়ে পড়ছে।
শাকিনা ফোনটা যোগেনকেই দিতে চাইছে, সেটা যোগেন বুঝতে পারেনি, শাকিনাও তার কম পড়ে যাওয়ায় বিব্রত হয়ে, তারপর দাঁড়িয়ে থেকেই বলে, ‘মণ্ডলজি, আপনার ফোন, সিদ্দিকিজি করেছেন, এখানে এসে কথা বলুন।’ যোগেন উঠে শাকিনার আসনের দিকে যায়, শাকিনা নেমে এসে ফোনটা তার হাতে দিয়ে সামনে বসে, ফোনের কথা শুনতে। ‘যোগেনবাবু, শাকিনাকে তো এখনো বলতেই পারেননি, বুঝলাম। ভালই হয়েছে। পরে, ব্যাপারটা নিয়ে একটু এগতেই বুঝলাম—ঐ গ্র্যাফটের ব্যাপারে, তোলার ব্যাপারে একেবারে ন্যাশন্যাল ইউনিটি। সব রাজনীতির, সব দলের, সব মতের বাবুর একমত, নানা ভাষায়, যে ধাঙড়রা কনট্রাকটারের লোক, কর্পোরেশন সেধে কেন তাদের দায়িত্ব ঘাড়ে নেবে। কথাটার মধ্যে তো অ্যাপারেন্ট একটা যুক্তি আছে। কারণ এর পালটা কথাটা ধাঙড়রাই বলেনি, আমরা তো কোন্ ছার। আমার মনে হচ্ছে—একটু পজিশন পলিটিক্যালি স্ট্রেংদেন করে প্রসিড করব। আজ না করে, কাল করুন। খুব অসুবিধে হবে না তো। শাকিনাকে জিজ্ঞাসা করে নিন।
রিসিভারটা মুখ থেকে সরিয়ে কানে চেপে রেখে যোগেন শাকিনাকে বলে, ‘সকালে ঠিক হইছিল, আইজ সন্ধ্যায়ই সিদ্দিকিশাহেব নিজেই ঘোষণা করা দিবেন হরতাল মিটানোর শর্তগুল্যা। এহন উনি জিগান, সেই ঘোষণা আজ না কইর্যা কাল কইরলে আপনার কোনো অসুবিধা হবে কী না। আপনিই কথা বলেন,’ যোগেন উলটোদিকে ফোনটা বাড়িয়ে ধরে। শাকিনা ফোনটা নিয়েই বলতে শুরু করে, ‘নরম্যালি কোনো অসুবিধের আভাসও নেই। কিন্তু চারদিন হয়ে গেল তো। ওদের টাকাপয়সার যা অবস্থা, তাতে সংসার চালাবে কী করে? তখন দু-একজন হয়ত লুকিয়ে কাজও করবে, স্ট্রাইকও চালাবে। আর, ঐরকম শুরু হলেই তো ব্লাডসাকাররা চারপাশে এসে চেপে ধরবে। এছাড়া কিছু না। আমার ভয়টার কোনো মানে নেই। কিন্তু এরা যে এক হয়েছে, সেই একাইটায় কোনো আঁচড় কাটতে না দিয়ে যদি হরতালটাকে বাঁচাতে পারি নাথিং লাইক ইট। কাল বিকেলে আপনার সুবিধে হলে কালই ভাল। আমরা একটু ক্যাম্পেনও করতে পারব যে আপনি কাল আসবেন।
‘ঐ গ্র্যাফ্ট-তোলা এসব শুনলে মাথা ঠিক থাকে না। এরা তো আপনার-আমার ঘরেরই ছেলে। কাজও করে কর্পোরেশনে। একটা তো অবলিগেশন থাকবে। ঠিক আছে। কালই হবে। আমি সাড়ে পাঁচটায় পৌঁছে যাব। একটু যোগেনবাবুকে দেবেন?
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, নমস্তেজি—’
যোগেন সাড়া দিতেই সিদ্দিকি বলেন, ‘যেটা করতে হবে সেটা দেখুন। অ্যাসেম্বলির পার্টিগুলোর কাছ থেকে দুটো-চারটে প্রস্তাব বা তাদের সেক্রেটারি-প্রেসিডেন্টদের চিঠি পেলেই হল যে এরকম একটা এমার্জেন্সি কাজ এমন আটকে আছে, কদিন হল স্ট্রাইক চলছে, শেষে তো ল অ্যান অর্ডার প্রবলেম হতে পারে। চাইলে ওয়ার ইফোর্টসের কথাও লিখতে পারে। ব্যস। এনাফ। কারো কিছু বলার থাকবে না। তাই তো?’
‘হ্যাঁ। সে তো ভালই। ধরেন অ্যাহন তো অ্যাসেম্বলির কংগ্রেসের দুই নেতা। শরৎবাবুকে বলতে আর অসুবিদা কী? ওনারডা পাইলেন। কেএস রায় একা-একা কি কিছু করব? তার তো আবার পাঁচকান করা লাগবে। বিদ্রোহী কৃষকপ্রজা পাবেন। মুসলিম লিগডা পাওন জরুরি। সারওয়ারদি আপনারে একডা চিঠি দিলে তো একঢিলে তিন পক্ষী নিহত—গবর্মেন্ট, লিগ আর ট্রেড ইউনিয়ন—’
‘সারওয়ারদি না কী এই স্ট্রাইকটা নিয়ে গা-ছাড়া?’
‘তার গায়ের খবর আমি পাব কই? আপনারও তো তারে বলার সুবিধা নাই। এইসব মালিকের লোক নেতা হইলে তাগ সঙ্গে কাজ করা যায় না। তাগ মালিক কী সে সুবিধা পাবে—সেডা আগে জাইনবার চায়। আমি একডা কাম করতে পারি। নীহারেন্দুবাবুকে বলতে পারি। সারওয়ারদি এমন একটা ব্যাপারে নীহারেন্দুবাবুকে না করতে পারব না। আর-এক হয়—লিগরে বাদ দেন—সরকারও না, পার্টিও না। ইস্পাহানিকে বলা যায়, ওর তো একটা পাবলিক ফেস আছে, তাছাড়া লিগের সেন্ট্রাল এক্সিকিউটিভে আছে তো!’
‘আর, আপনাদের শিডিউল্ড ক্লাশের কিছু হবে না? আমার তো ওটাই প্রধান কথা। শিডিউল্ড ক্লাসের মত ডিপ্রেসড পিল পাঁচদিন স্ট্রাইক করে আছে। আমার পক্ষে ইনডিফারেন্ট থাকা সম্ভব নয়।’
‘সে একডা কিছু হবে নে। সবই তো চাই কাইল বিকালে?’
