১১
১২
১৩
১৪
১৫
3 of 4

১৩৬. ধাঙড় ধর্মঘট

১৩৬. ধাঙড় ধর্মঘট 

বরিশাল থেকে ফিরেই সুভাষকে যেতে হয় নাগপুর ‘আপোশ-বিরোধী’ দ্বিতীয় সম্মিলন করতে। সুভাষ ভেবেছিলেন লেফট কনসোলিডেশনের নামে ডাকা এই সম্মিলনগুলিতে কংগ্রেসের সেই নেতা ও কর্মীরাও যোগ দিতে পারবেন, যাঁরা কংগ্রেসের ওপর দক্ষিণপন্থী নেতাদের একচেটিয়া দখল স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে ক্ষতিকর ভাবছেন। এঁদেরকে গান্ধীবিরোধী বলা যাবে না। বরং, এঁরা প্যাটেলবিরোধী। প্যাটেল সাংগঠনিক ব্যাপারে গান্ধীজিকে না-জানিয়েই অনেক কিছু করছেন। বম্বে ও সেন্ট্রাল প্রভিন্সে প্রাদেশিক কমিটির যেহেতু প্যাটেলের মনোনীত প্রার্থীরা প্রার্থী হতে পারেনি, সেই কারণে প্রাদেশিক কমিটির ওপর খাপ্পা হয়ে এই দুটি প্রদেশেরই কংগ্রেস-নেতাদের শাস্তি দিয়েছেন প্যাটেল। প্রদেশ-সভাপতির পদে যথাক্রমে নরিম্যান ও এন বি খারে-কে বাতিল করে তাঁর নিজের লোক মি. জি খারে ও আর এস শুক্লাকে বসিয়ে দিলেন। নাগপুরের সম্মিলনে তাই সুভাষের আশা আঞ্চলিক নেতারা আসতে পারেন। যদি তাঁরা আসেন, তাহলে স্বাভাবিক জীবনে কংগ্রেস কোনো প্রভাব ফেলছে কী না, যদি ফেলেও থাকে, তাতে যদি সুভাষের লাভও হয়, তাতেও সুভাষের বর্তমান ক্ষতি উশুল হবে না কারণ কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির পুরনো শরিকদের সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে ‘লেফ্‌ফ্ট’, ‘কনসোলিডেশন’ আসলে কমিউনিস্টরাই। রামমনোহর লোহিয়া নামে এক নেতার নামে একটা কাগজে চিঠিও বেরিয়েছে। ওঁদের স্বাদেশিকতাতে লাগছে। সুভাষ যদি একদিন আগেও নাগপুর পৌঁছয় তাহলে কথাবার্তার সুযোগ পাওয়া যাবে। 

যোগেনকে সুভাষ কলকাতায় নেমেই বলেছিলেন—‘আমি নাগপুর থেকে ফিরলে কথা হবে।’

‘নাগপুর আবার কবে সাব্যস্ত হইল!’ 

‘ওখানে তো অ্যান্টি সারেনডারের সেকেন্ড সম্মিলন।’

‘সেই হানে তো বরিশালের আমাগ সমস্যা আপনার মাথায় থাকব না?’ 

‘থাকবে কী করে। এখানে কি নাগপুরের কথাও কিছু বলেছি?’ 

‘এই বিদ্যাডা আপনার নিকট বা আপনাগ নাগাল উচ্চবর্ণের সর্বভারতীয় নেতাগর নিকট শিক্ষা নিব্যার লাগব—মাথার খুলির এই খোপগুল্যা ক্যামনে বানাইলেন। নাগপুর, বরিশাল, ধাঙড় স্ট্রাইক, ব্রিটিশ সরকার। অপারেশন কইরব্যার লাগব? নাকী বামুন হইবার লাগব? কিন্তু আপনে বা গান্ধীজি একজনও তো বামুন না? তয়?’ 

‘আর আপনি যে জয় বরিশাল করে আজ কর্পোরেশনে স্ক্যাভেঞ্জার স্টাইক করবেন? তাহলে আপনি আপনার মেথডে আমাদের সর্বভারতীয় বলে শিডিউল টাঙাবেন কেন? আর আমাদেরই বা কুলীনের লিস্টে ঢোকাবেন কেন?’ 

‘কী যে কন, সুভাষবাবু, ভাগ্যি কাছাকাছি গাছপালা নাই, তাই হাইসল না। কইতেছি গান্ধী-সুভাষের কথা, কোত্থিক্যা আইনলেন যোগেন মণ্ডলের কথা! 

‘আপনি কিন্তু সাকিনার সঙ্গে আজই দেখা করবেন, ঐ যে কর্পোরেশনের স্ট্রাইক।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার মনে আছে, কিন্তু সাক্ষাৎ কইরতে হইব কী? আমার কথাবার্তা বুইঝব্যার পারব তো? না কী দোভাষী নিয়া যাব? 

‘বরিশালে আপনি যেমন ছিলেন—। আমার নাম বলবেন কেন? আপনাদের সংগঠনের নাম বলবেন। তাছাড়া, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। আপনি যে কত বিখ্যাত, সবাই যে আপনাকে কত চেনে, আপনি তা নিজে জানেন?’

কর্পোরেশনে যোগেন খুব বেশি আসেনি। এত প্রকাণ্ড দুই লালবাড়িতে কর্পোরেশন ইলেকশনের পর একদিন এসেছিল বোর্ড মিটিং করতে—সেদিন কিছুই হল না, শুধু গালাগালি-মারামারি ছাড়া। কর্পোরেশনের মিটিঙের মারামারিটা যোগেনের খুব ভাল লাগে। একজন মেম্বার উঠে বেশ কয়েকটা লাইন পেরিয়ে গিয়ে আর-এক মেম্বার, যিনি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছিলেন, পেছন থেকে তাঁর ঘেঁটি ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে আবার অতটা হেঁটে নিজের আসনে এসে বসলেন। ওঁরা দু-জনই হিন্দু মহাসভার। যিনি হেঁটে গিয়ে ঘেঁটি ধরে আর-এক মেম্বারকে বসিয়ে দিলেন, তিনি কর্পোরেশনে হিন্দু মহাসভা দলের হুইপ। হুইপ দেয়ার এমন কার্যকর ব্যবস্থায় যোগেন আরো আনন্দ পেল। 

আইনসভার হাওয়াটাই খুব কড়া। মেম্বারদের ওপর কড়া, তা নয়। মেম্বাররা যাতে কাজ করতে পারেন ও কাজে কোনো বাধা না ঘটে, সেই ব্যবস্থাটা কড়া। অনেকটা হাইকোর্টের কোর্টগুলির মত। তার একটা কারণ বোধহয়, যোগেনের মনে তখনই এসেছিল, আইনসভাতে স্পিকার আছেন ও কোর্টে জজশাহেব আছেন। এখানেও তো মেয়র আছেন। তাঁর ক্ষমতা তো আরো বেশি। যোগেন তার কর্পোরেশন-অভিজ্ঞতাকে একটু সাজিয়ে নিতে এরপরও ভেবে নিয়েছিল, সেখানেই বোধহয় গোলমাল। আইনসভার আইন যদি হত, প্রধানমন্ত্রীই স্পিকার হবেন, মানে হকশাহেব, তাহলে তো নরক গুলজার। 

প্রথম দিনের মিটিঙে কোনো কাজ হল না বলে যোগেন দ্বিতীয় দিনের মিটিং করতে যায়। সেদিন সকলে বেশ শান্তভাবেই মিটিংটা করলেন। মিটিঙের বিষয়গুলি নিয়ে আগেই কংগ্রেস-লিগ-মহাসভার নেতাদের বোঝাবুঝি হয়েছিল। তাহলে আর গোলমাল হবে কোত্থেকে? 

সে দুদিনই তো যোগেন এসেছে কাউনসিলার হিশেবে। ফলে তাকে কিছু খুঁজতে হয়নি। দরজাতেই লোকজন হাজির ছিল। তেমনি কর্পোরেশনের বাড়িঘর কিছু দেখাই হয়নি, চেনা তো দূরস্থান। যোগেনের এমএলএ আর কাউন্সিলার হওয়ার মাঝখানে বছর তিনেকের ফারাক। কর্পোরেশনে যাঁরা নির্বাচিত হয়ে আসেন তাঁদের একটা আলাদা সম্মান থাকে মানুষের মধ্যে। যাঁরাই বাংলার নামজাদা লোক, তাঁরাই কর্পোরেশনের সঙ্গে যুক্ত। সি আর দাশ, জে এম সেনগুপ্ত, বিধান রায়, নলিনী সরকার, ফজলুল হক, ইস্পাহানি ছোট, জে সি গুপ্ত, শরৎ বোস, সিদ্দিকি, সারওয়ারদি, সুভাষ-কে না? এমন একটি সংস্থায় নির্বাচিত হওয়ায় যোগেন নিশ্চয়ই খুশি। কিন্তু সে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, নমশূদ্রদের জন্য এখানে কী কাজ সে করতে পারে। যোগেন মনে-মনে নমশূদ্রই ভাবে, ভেবে ফেলে নিজেকে শুধরোয়, ‘তপশিলি জাতি’। 

আজ তো যোগেন এসেছে ধর্মঘটী ধাঙড়দের দেখতে ও তাদের নেত্রী সাকিনা বেগম-কে দেখা দিতে। আজ তো কেউ তাকে ‘রিসিভ’ করতে দরজা দেখিয়ে দেবে না। তাকেই খুঁজে বের করতে হবে। 

এমন খোঁজাখুঁজি যেমন ধীরেসুস্থে হয়, যোগেনও সেরকমই এগচ্ছিল। হঠাৎ যেন তার কানে আসে—খুব চড়া গলায় কেউ কিছু বলছে। যে-কেউ চড়া গলায় কিছু বললেই তো গলাটা সরু হয়ে যায়। তবে, এ গলাটা কোনো মেয়েরও হতে পারে। কিন্তু এত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না, যাতে শনাক্ত করা যায়। হাততালির একটা ঝোড়ো আওয়াজ উঠতেই যোগেন প্রায় দৌড়ে তালতলা রোডের ওয়াই-এম-সি-এর উলটো ফুটে গিয়ে সামনে তাকায়—হাজার-হাজার মানুষ বসে আছে মাটির ওপর, মাথাটা একটু উঁচু করে সামনের কিছু দেখতে। দুই লালবাড়ির মাঝখানে জায়গাটিতে। যোগেন দেখছে সমাবেশটাকে পেছন থেকে। তাই সে বুঝতে পারে—সমাবেশের পেছনে যারা তারাই ঘাড় উঁচিয়ে আছে। কারো কারো মাথায় ফেট্টি বাঁধা, সকলের না। যদ্দূর দেখা যায়—প্রায় পুরো সমাবেশটারই খালি উর্ধাঙ্গ প্রায় নেংটিমত কিছু পরা। ফলে, এতগুলো উদোম উদ্দাম মানুষের ঘাড়-পিঠ-হাঁটু-ঊরু মিলে যেন একটা নদী বয়ে যাচ্ছে। 

যোগেনের চমৎকৃত মনে নদী ছাড়া উপমা জুটবে কোত্থেকে? আবার নদী ছাড়া সে-উপমা সংশোধনই-বা হবে কী করে? যেন একটা নদী বয়ে যাচ্ছে—ভাবনা শেষ না-হতেই তার মনে এসে যায়—পাথরের নদী। নদী পাথরের হয়ে গেল—অদৃষ্টপূর্বতার ধাক্কায়? নাকী কোনো বিস্মৃত উপমার টানে? 

যোগেন সেই উপবিষ্ট সমাবেশে পেছন থেকে ঢোকে ও একটু-একটু করে এগতে থাকে, কোথাও এগনোর পথ বেশ খোলাই। কোথাও কারো কাঁধে হাত দিতে হয়। কোথাও নিচু স্বরে ‘ভাই’ ডাকতে হয়। এমনকী দু-একটা ঘন ভিড়ে ‘সুভাষ বোস’ও তাকে বলতে হয়েছে, কোনো বাধা পেরতে নয়, পথ-পাওয়ার সুযোগ বানাতে। একটু অবাক যে সে হচ্ছে না। এতটা ঘন, চাপা, বসা ভিড়ে এতটা দূর সে একা শুধু হেঁটে এল অথচ একটাও চেনা গলার ডাক শুনল না। পেটগরমের অনিদ্রার স্বপ্ন ছাড়া কোথাও কি নিজেকে এত নিঃসঙ্গ লাগে? যোগেন একটু হোঁচট খেয়ে দেখে, ঐ সমবেশটাকে আড়াআড়ি চিরে একটা বাঁধানো রাস্তা দুই লালবাড়ির ভিতরে ঢুকে গেছে। তখন সে-রাস্তাটা তার কাছে প্রাসঙ্গিক ছিল না। সে শুধু একবার মাথা ঘুরিয়ে দেখল, ও আধাআধি কি পৌঁছেছে? বুঝতে পারল না। তাহলে হতে পারে, সে উলটো দিক থেকে ঢুকছে। উলটো দিক থেকেই তো! তাহলে সম্মুখ কোথায়? যে বক্তৃতা করছে, এত বড় সমাবেশে সে একাই কথা বলছে। এই সমাবেশ সেই কথাগুলি সারা শরীর দিয়ে শুনছে সেটা, যোগেন সেই পাথরের নদী উজোতে-উজোতে টের পায় কখনো হাসির আওয়াজে, কখনো হাততালিতে। 

যোগেন আচমকা চোট খেয়ে বসে পড়ল। আচমকাই হঠাৎ তার মনে এল–সে এত মানুষের এমন শান্ত সমাবেশ উজিয়ে সামনে যাচ্ছে কেন? মনে আসতেই সে আচমকাই, বসে পড়ল। তার পাশের মানুষটি সরে গিয়ে তাকে জায়গা দিল, মুখ না-ফিরিয়েই। যোগেন বসে পড়ার পর দেখতে পায় অনেক দূরে একজন কেউ বলছে, তার হাতটা, একটা হাত, তুলে। মাঝে-মাঝে সেই হাতটার একটা আঙুল দিয়ে যেন কিছু দেখাচ্ছে। কোনো মাইক নেই। যে বলছে, তার গলার আওয়াজটাই শুনতে হচ্ছে। সমাবেশে তাই অন্য কোনো ধ্বনি তৈরি হতে দেয়া হচ্ছে না। যোগেন তার শরীরটাকে এই সমাবেশের অন্য শরীরগুলির মত টানটান ও সোজা করে ফেলেছে—যা সে শুনছে, সেটা শুনতে। 

সে এগুলো জানে না। 

কলকাতা কর্পোরেশনে যে ধাঙড়-মেথরই আছে বিশ হাজার যোগেন জানত না। এই বিশ হাজার ধাঙড়-মেথরই ধর্মঘট করছে। মালিক চেষ্টা করেছিল, ভাঙতে, ভাগাতে। একজনকেও পায়নি। এক আদমিও সরেনি। উলটে, কর্পোরেশনের বাবুরা আজ নোটিশ দিয়েছেন, কাল থেকে তাঁরাও ধর্মঘট করছেন। যোগেন জানত না। 

তার মানে বিশ হাজার ধাঙড়-মেথরের সঙ্গে দশ হাজার বাবু সামিল হলেন, তা নয়। ভাগ্যি, ধাঙড়-মেথররা গুনতে জানে না। যদি জানত তাহলে ঐ বিশ-দশ যোগ করে ভাবত, তারা তাহলে তিরিশ হাজারি হরতাল করছে। এ হিশাব বিলকুল ভুল। এখন লড়াই শুরু হয়ে গেছে। লড়াই শুরু হয়ে যাওয়ার পর নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে ভাবা ঠিক না। তাহলে ক্ষতি হয়ে যাবে। কেন? 

যোগেন জানে না। 

বাবুদের হরতাল বাবুদেরই হরতাল। বাবুদের জোর আর দিমাক, আমাদের জোর আর দিমাক আলাদা। আমরা আমাদের জোর আর দিমাক দিয়ে হরতাল শুরু করেছি। সেই হিশাব নিয়েই শেষ করব। বাবুদেরও সেই আজাদি থাকবে। শুনছি কর্পোরেশন স্কুলগুলিতে যত মাস্টারলোক আছে, তারাও হরতালে নামবে। সেখানেও হাজার দশ। আপনারা সেটা যোগ করে ভাববেন না, আমরা তাহলে ৪০ হাজারের তাকত নিয়ে লড়ছি। বিলকুল ভুল হিশাব। গদ্দর। এটাই তো আমাদের তাকতের সাবুদ যে আমরা ধর্মঘট জারি করাতেই বাবুরা, মাস্টারসাবরা, টাইমটা মেলাতে পারলেন, যাতে কর্পোরেশনের ওপর ৪০ হাজারেরই শ্বাস পড়ে। আপনারা এটা খেয়াল রাখবেন পুরা, এখন তো কাজে যাচ্ছি না, তাহলে একটু আরাম করি, আরামটা একটু বাড়াই। আপনারাই ভাল জানেন, আরাম কী করে বাড়াতে হয়। লেকিন খেয়াল রাখবেন, চাকরির শিফটে টাইম বাঁধা, লেকিন হরতালের শিফট বগেড়া চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি। চব্বিশ ঘণ্টা ইউনিয়ন অফিসের কাছাকাছি থাকবেন। না-হয় তো কর্পোরেশনের আশপাশে থাকবেন। না-হয় তো মাতাজির কোঠির কাছাকাছি থাকবেন। কেন? আজ হরতালের তিন রাত পোহাবে। আপনারা যে-কাজ করেন, সে-কাজ বন্ধ হলে মহামারী হবে। তাই মালেকলোগ আপনাদের তিন রাত কিছু বলে নাই। কিন্তু এবার তো তারা বলবে। তাদের পুলিশকে দিয়ে বলাবে, মিলিটারিকে দিয়ে বলাবে। তার ওপর এখন যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের সময় হরতাল-জুলুশ বেআইনি করা যায়। মালেকরা এবার করবে। তাই, যখনই মালেকরা জুলুম করে হরতাল ভাঙতে আসবে, তখনই একটা হুইসল শুনলে, বা একটা বাচ্চার মুখে খবর পেলে চোখের পাতা দশবার পড়ার আগেই এই আজ যেমন জমায়েত, তেমন জমায়েত তৈরি হয়ে যায়। সে দুপুর দেড়টায় হোক বা রাত দেড়টায় হোক বা সকাল দেড়টায় হোক বা বিকেল দেড়টায় হোক। খবর পাওয়ার পর দশবার আঁখের পাত বন্ধ হওয়ার আগেই জমায়েত হতে হবে। মালেকরা যাদের পাঠাবে, তারা এসে দেখবে, সব ফাঁকা। তারা আনন্দে ভাববে তাদের দালালির তাকত কত! তারা আসছে শুনেই হরতাল ভেঙে গেছে। তারপরই চোখের পাতা দশবার বন্ধ হওয়ার আগেই তারা বুঝবে, তাদের বিলকুল ভুল হয়েছিল। চাঁদের রাতে বা রোদের দুপুরে মানুষ ভিড়মি খায়, ভুল দেখে। তারপর চোট পেয়ে বোঝে ভুল দেখেছিল। মালেকরা ফাঁকা জমি দেখে ভেবেছিল হরতাল তুড়ে গেছে, এ তো নদীর মত ফাঁকা, শুধু জল আর হাওয়া আর ঢেউ। চোখের পাতা দশবার বন্ধ হওয়ার আগেই মালেকরা দেখবে, হাঁ, ঠিকই নদী, কিন্তু পাথরের নদী। পাথরের নদী কী করে হবে যদি আপনারা চব্বিশ ঘণ্টা হাজির না থাকেন। চব্বিশ ঘণ্টা। হয় এই অফিসের আশপাশে, নয় মাতাজির কোঠিতে, নয় কর্পোরেশনের ফুটপাথে। পাথরের নদী। সে নদীতে জল নেই, স্রোত নেই, হাওয়া নেই। লেকিন নদীর মাফিক গতি আছে, ইস্পিড, আর আগুন জ্বালাবার চকমকি আছে, আর আগুন আছে। আজকের এই জমায়েত আপনারা করলেন কেন? যেহেতু কাল থেকে মালেক জাগবে। তাই আজকের এই জমায়েত থেকে বুঝে নিতে হবে—আজ রাত থেকে এমন কোনো ঘুম ঘুমানো চলবে না, যেটা থেকে জাগতে দশের বেশি বার চোখের পাতা বন্ধ করতে হয়। আজ রাত থেকে এমন দূরে যাওয়া চলবে না, একটা বাচ্চার আওয়াজ যে-দূর ডিঙাতে পারে না। আজ রাত থেকে এমন নদী খোয়াবেও দেখা চলবে না, যে-নদী পাথরের নদী হয়ে খোয়াব ভাঙাতে পারে না। আমি আপনাদের মত হরতালি না। আমাকে মালেক হরতাল দিয়ে দিয়েছে জীবনভর। আমিও বলেছি, ‘ঠিক আছে। এটাই আমার নিজের চাকরি। যে-মজুর লড়াইয়ে নেমে গেছে, তাকে পায়ে-পায়ে বাঁচানো।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *