১৩১. ভোটে গোঁজ
ভোটের আর দিন পনের বাকি। যোগেনকে জিলা কংগ্রেসের অফিসে ডেকে পাঠালেন, হেমন্ত বোস। সন্ধ্যায় সেই অফিসে গিয়ে দেখে, রহমানশাহেবও বসে আছেন। যোগেন বসতে-বসতে বলে, ‘এ তো দেখি অষ্ট্র বজ্র সম্মিলন। ডাক্তারশাহেব আর আমাকে অপরাধী করবেন না। এদিকে যা হওয়ার হবে। আপনে একটু নিজের ওয়ার্ডে বসেন। দরকার না-থাকলেও বসেন। না হলে তো আমারে দোষী করব লোকে। হেমন্তদা—’
‘উনি পুরনো মেম্বার। আপনি নতুন। আমরা সাহায্য না করলে কী করে হবে? এদিকে আপনার বন্ধু রাধানাথ দাস কী রটিয়ে বেড়াচ্ছে আপনার নামে, দেখুন। না কী আপনি ইতিমধ্যে দেখেছেন?’
হেমন্তবাবু একটা ছাপানো কাগজ এগিয়ে দিলেন।
যোগেন পড়তে থাকে—’তিন নং ওয়ার্ডের করদাতাগণ জানেন কি?’ তারপর কিছু তথ্য-উৎস উল্লেখ করে জানানো হয়েছে যে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ৩৭ সালে এমএলএ হওয়ার পর বরাবরই হক মন্ত্রিসভার সমর্থক। কোনো সময়ই তিনি কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধীপক্ষে বসেননি। তারপর একটা লিস্টি দেয়া আছে—কোন্ কোন্ বিষয়ে ও বিলে যোগেন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে হক মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করেছেন।
পড়া শেষ করে যোগেন কাগজটি রেখে বলে, ‘রাধানাথ দা তো ভালোমানুষ। চিরদিন কংগ্রেস করেন। এখনো করেন।
‘ওঁর কাছে তো কংগ্রেস মানেই ওয়ার্কিং কমিটি,’ হেমন্তবাবু বলেন, ‘উনি তো অ্যাড হকের শিডিউল। সুভাষবাবুকে ভোটটা পর্যন্ত দেননি।
‘শিডিউলদের আর অ্যাড হকই-বা কী আর প্রদেশ কংগ্রেসই-বা কী? গান্ধীজির কথায় পি আর ঠাকুরের সঙ্গে ওঁকেই তো কংগ্রেস পাঠিয়েছিল— কংগ্রেসশাসিত প্রদেশগুলিতে তপশিলিরা কেন আছে দেখে আসতে’, যোগেন মনে করিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলে, ‘কংগ্রেস ওঁকে ডেপুটি হুইপ বানাইয়া প্রথম শিডিউলগ মান দিচ্ছে’।
‘সে তো সব ত্রিপুরীর আগে। ত্রিপুরীর পর তো আর সে-কংগ্রেস নেই। একই কংগ্রেসের তো আর দু-জন প্রার্থী হতে পারেন না। রাধানাথ দাস আপনার ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও এরকম একটা ইস্তাহার বের করলেন?’ রহমানশাহেব জিজ্ঞাসা করেন।’
‘বের তো করছে ত্রিগুণা গুপ্ত বলে কে, ডায়মন্ড প্রিন্টিং হাউস, ২৬ নং ফড়িয়াপুকুর স্ট্রিট’, যোগেন কাগজটি দেখে বলে।
‘ওসব খবর নেয়া হয়ে গেছে। এর মধ্যে একটা কথাই সত্য। ডায়মন্ট প্রিন্টিং হাউস বলে একটা প্রেস ওখানে আছে। কিন্তু তারা এই লিফলেট ছাপায়নি। ফড়েপুকুরের ২৬ নম্বরে ত্রিগুণা গুপ্ত বলে কেউ থাকে না। এটা তো জালিয়াতি কেস, আমরা কোর্টে মামলা করতে পারি, ডায়মন্ড মামলা করতে পারে, ২৬ নম্বর মামলা করতে পারে, আপনি মামলা করতে পারেন। সেটা জেনেশুনেই রাধানাথবাবু নিজের নাম দেননি যাতে কোর্টে বলতে পারেন যে তিনি এ-ব্যাপারের কিছুই জানেন না।’ হেমন্ত বোস বলেন।
রহমানশাহেবও যোগ করেন, ‘আপনাকে প্রার্থী করার বিরোধিতার ঘটনাটাও জানা গেছে। আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি বলে জানানো হয়নি। হেমন্তদাকে জানিয়ে গেছি।’
‘কী জানিয়েছেন? আমাকে?’
‘ঐ যে কারা গিয়ে সাহা-বসাকদের দিয়ে যোগেনবাবুর প্রার্থীপদে আপত্তি করিয়েছিলেন। রাধানাথবাবু নিজেই তো গিয়েছিলেন। সাহাদের এক ফ্যামিলিতেই ১২৩টা ভোট। এক ভাই নাকী বলেছিল, কথায় কথায় বলেছিল, ‘আমরা থাকতে আবার বড়তলায় নতুন তপশিলি কে?’ সেই কথাই বহরে বাড়িয়ে ওঁদের সমবেত মত বলে রটানো হয়েছে। হেমন্তদা নিজে গিয়ে ভাইদের সঙ্গে কথা বলে এসেছন,’ রহমানশাহেব জানান।
‘হেমন্তদা তো আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাননি।’
‘আপনাকে সঙ্গে নেব কেন? আমাদের প্রার্থীর সম্মান নেই না কী? আপনি তো আর নিজে- নিজেকে প্রার্থী করেননি। আপনি কংগ্রেসের প্রার্থী। তাহলে কংগ্রেসেরই দায়িত্ব আপনার সম্মানরক্ষা করা। আপনি এর মধ্যে প্রচারে যে-বেগ এনেছেন, তাতে ওসব ভেসে গেছে। চামারবস্তির একজায়গায় ৩০০ ভোট, মেয়েদেরও ভোট আছে ওদের। আপনি ওদের কী বলেছেন জানি না। ওরা বলছে, আমাদের জাতভাই থাকতে আমরা কেন অচেনাদের ভোট দিতে যাব? সাহারাও বলল, সুভাষবাবু ছাড়া আমরা কোনো কংগ্রেস মানি না।’
‘এসবই তো সুসংবাদ। তাহলে আমাকে তলব কেন?’
‘লিফলেটটা আজও বিলি করেনি। মানে, ওরা ভয় পেয়ে থাকতে পারে এতটা জালিয়াতি করতে। মামলার ভয়ও পেয়ে থাকতে পারে। কালকের দিনটা দেখা যাক। তারপরে বিলি করুক চাই না-করুক জিলা কংগ্রেস থেকে সুরেশবাবু আর হেমন্তদার নামে একটা পালটা লিফলেট ছাড়া হোক। আর, আপনি যদি মনে করেন, মামলার মেরিট আছে—তাহলে আপনি মামলা দায়ের করুন।’
‘দিন পনের পরে ভোট। মামলার তো ডেটই পাবেন না। যদি হাইর্যা যাই তাইলে তখন ভাবা যাবে।’
‘তাহলে হেমন্তদা—লিফলেটের ব্যাপারটা আপনি দেখুন। যোগেনবাবু যেরকম জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন তাতে উনি তো ওঁর রাশিয়ান বন্ধুদের দিয়ে একটা মিছিল ওয়ার্ডে ঘোরাতে পারেন। এখানকার লোকজনও থাকল। আর, যোগেনবাবুর চামারবস্তিও থাকল, সাহারাও থাকল।’
হেমন্তবাবু নীরবে কিন্তু মুখটা পুরো খুলে হাসতেই থাকলেন। ওঁর নিকেলের চশমার কাচদুটোতে যেন কুয়াশার ছোপ লেগে আছে। হাসিটা শেষ হলে বললেন, ‘সাহারা আসবে মিছিলে? এ-সাহা সে-সাহা না। জব চার্নকের আমলের সাহা। তবে যদি চেপে ধরা যায়, তাহলে ওদের ঠাকুরচাকরদের পাঠিয়ে দেবে। হ্যাঁ। মিছিলটা কিন্তু করা দরকার। লিফলেটের ব্যাপারটা আমার ওপর থাকল।’
‘তাহলে হেমন্তদা আমি কি আমার জিলা কমিটিতে হাজিরা দিতে পারি?’ রহমানশাহেব আর যোগেন একসঙ্গেই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ান। হেমন্তদা রহমানশাহেবকে বলেন, ‘দেখুন, যদি তারা নেয়। না নিলে চলে আসবেন।
ভোটের দিনসাতেক বাকি থাকতে তিন নম্বরে যেন মিছিল, মিটিঙ, লিফলেট, পোস্টারের বান ডাকল।
যোগেনের একটা আবেদন বাড়ি-বাড়ি দেয়া হল।
৩ নং পল্লীবাসীর প্রতি সবিনয় নিবেদন
শ্রদ্ধেয় করদাতৃবৃন্দ,
আপনারা অবগত আছেন যে আগামী ২৮ মার্চ কর্পোরেশনের কাউন্সিলার নির্বাচন হইবে। ৩ নং ওয়ার্ড হইতে একজন বর্ণহিন্দু এবং একজন তপশিলভুক্ত শ্রেণীর সভ্য নির্বাচিত হইবেন। তপশিল শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত আসনে কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থীরূপে আমি আপনাদের সহানুভূতি কামনা করি।
দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে একজন সৈনিকরূপে আমি সাধ্যানুসারে দেশের ও দশের সেবা করিয়া আসিতেছি। জনসাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণে যে-কোনো ত্যাগ স্বীকার করিতে কষ্ট ও কুণ্ঠা বোধ করি নাই। বর্ণহিন্দু ও তপশিল হিন্দুর মধ্যে ভেদবৈষম্য দূর করত : শক্তিশালী অখণ্ড হিন্দুসমাজ গঠনে আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছি বরং ইহাই আমার জীবনের অন্যতম সাধনা।
আমারই ঐকান্তিক চেষ্টায় বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদে ‘স্বতন্ত্র তপশিলি দল’ গঠিত হইয়াছে। উক্ত দল দেশের ও দশের স্বার্থ রক্ষার্থে পরিষদের বিরোধী দলের সহিত একযোগে কার্য করিতেছে। হক্ মন্ত্রীমণ্ডলীর উপর অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনকারীদের মধ্যে আমি অন্যতম। বর্তমান মিউনিসিপ্যাল সংশোধন বিলে হিন্দু ও মুসলমানের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রথা প্রবর্তনের আমি ঘোর বিরোধী ছিলাম। তপশিল জাতির জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রবর্তনের চেষ্টা হইয়াছিল কিন্তু আমার তীব্র প্রতিবাদ ও বিরোধিতার ফলে উহা পরিত্যক্ত হইয়া, বর্ণহিন্দু ও তপশিল হিন্দুর জন্য যুক্ত নির্বাচন প্রবর্তিত হইয়াছে। বর্ণহিন্দু হইতে অনুন্নত হিন্দুকে (তপশিলভুক্ত সম্প্রদায়) পৃথক করার যেসব প্রচেষ্টা ব্যবস্থা পরিষদে যখনই হইয়াছে, আমি তাহার তীব্র প্রতিবাদ করিয়াছি।
আমি আপনাদের ওয়ার্ডেরই স্থায়ী অধিবাসী। সুতরাং আমার পক্ষে আপনাদের সেবায় সর্বদা আত্মনিয়োগ করিবার বিশেষ সুযোগসুবিধা হইবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আপনাদের অনুগ্রহে আমি কাউন্সিলার নির্বাচিত হইতে পারিলে ৩ নং ওয়ার্ডের শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি সর্বপ্রকার জনহিতকর কার্যের উন্নতির জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিব। পল্লীবাসীদের সর্ববিধ সুখসুবিধার প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখিব। পল্লীর প্রত্যেক জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের উন্নতিসাধনে যত্নবান থাকিব।
পরিশেষে, করদাতৃবৃন্দের প্রতি সবিনয় নিবেদন এই, আগামী নির্বাচনে অনুগ্রহপূর্বক আমাকে সমর্থন করিয়া আমাকে আপনাদের সেবা করিবার সুযোগপ্রদান করিয়া বাধিত করিবেন।
আপনাদের অনুগ্রহপ্রার্থী বিনীত সেবক—
শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, বিএল; এমএলএ।
কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী।
এই লিফলেট যোগেনের হাতে এল দেরিতে। জিলা অফিস যাকে দিয়ে শ-খানেক লিফলেট যোগেনকে পাঠিয়েছিল, সে সেইগুলি নিয়েই নাকী বাগেরহাট গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে সে যোগেনের কাছে গিয়ে প্যাকেটটা দেয়। যোগেন ইস্তাহারটা পড়ে একটু অবাক হয়। সে এটার বিন্দুবিসর্গও জানে না। প্যাকেট বাঁধা হয়ে গেছে যখন-তখন নিশ্চিয়ই প্রুফ দেখতে পাঠায়নি—ছাপা হয়ে বেরিয়ে গেছে। বেরিয়ে গেলেও যোগেনের হাতে বা চোখে পড়েনি, সেটাই আশ্চর্যের। যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘এগুল্যা আপনাকে কে দিল?’
‘দিল কংগ্রেসের সুধন্যদা। বলল, এগুলো আপনার এখানে দিয়ে যেতে।’
‘মানে, এগুলো সুধন্যরই দেয়ার কথা ছিল?’
‘সে আমি জানি না। কিন্তু হওয়াটাই স্বাভাবিক।’
‘কেন? স্বাভাবিক কেন?’
‘আমাকে যে পাবেন, তা তো সুধন্যদার জানা ছিল না।’
‘আপনাকে পেয়ে আপনার হাতে গছিয়ে দিল?’
‘গছিয়ে বলাটা ঠিক হবে না। আমাকে পেলেন, আমাকে দিলেন। আমাকে না পেলে আর-কাউকে দিতেন। ওঁকে হয়তো কাউকে দিয়ে পাঠানোর কথাই বলা হয়েছিল।’
‘কে বলেছিল?’
‘যারা বলে, তারা কেউ।’
‘আপনার কি জিলা অফিসে কাজ ছিল?’
‘জিলা অফিসে না। সুধন্যদার কাছে। ভাবলাম—সুধন্যদাকে বলে যাই—’
‘কোথায় যাবেন? যাচ্ছিলেন?’
‘বাগেরহাট। সেটা তো প্রথমেই বলেছি। তার ওপর যখন প্যাকেটটা দিলেন, তখনো বললাম, আমি তো বাগেরহাট যাচ্ছি। সুধন্যদা রেগে বললেন, বাগেরহাটে যেতে-যেতে এগুলো কি যোগেনবাবুকে দিয়ে যাওয়া যায় না?’
‘এ প্রশ্নের তো হ্যাঁ-বিনা কোনো উত্তর হয় না। আমিও বললাম হ্যাঁ, হ্যাঁ, বাগেরহাট থেকে ফিরতে-ফিরতেও দেয়া যায়। সুধন্যদাও বললেন, ‘তাই দিয়ো, ফিরতে-ফিরতে? এখন আমার মনে হচ্ছে—সুধন্যদার কথাতে কি ঠাট্টা ছিল!’ আসলে হয়তো উনি চাইছিলেন, তখনই ওটা পৌঁছে দি। আমি ওঁর চাওয়াটা আন্দাজ করিনি কিন্তু আমার পারাটা আন্দাজ করলাম শুধু নিজের কথা ভেবে। সেটা খুবই অন্যায় হয়ে গেল। না?’
‘মানে, ভোটের মুখোমুখি দিন-দুই-তিনে তো বুঝতে হয় কে কোথায় দাঁড়ায়। আমারই লিফলেট, আমিই জানি না। ছাপার আগেও না। পরেও না।’
‘ছাপার আগেও কি সুধন্যদা –?’
যোগেন একটু হেসে বলে, ‘ছাপার আগেও কি বাগেরহাট?’
যোগেন লিফলেটটা নিয়ে স্বস্তি পাচ্ছিল না। চেষ্টা করছিল—একটু আনমনা হয়ে যেতে। কিন্তু অস্বস্তিটা যাচ্ছিল না। শেষে সে এলগিন রোডেই গেল, সকালে। সুভাষবাবু ওপরে ছিলেন, তাঁকে নীচে নামতে বলল না, যোগেনকেই ওপরে যেতে বলল-এ-বাড়ির বা এই দুই বাড়ির সকলেই যোগেনকে চেনে জানে।
সুভাষবাবু বসেছিলেন, সিঁড়ির বাঁ-হাতি ঘরে। এ-বাড়িতে ওখানেই বসেন। যোগেনকে হেসে বললেন, ‘ভোটের আগেই ভোটে জিতে এলেন না কী। সবাই তো বলছে তাই’।
লিফলেটের কথা যোগেন খুব সাবধানে তোলে। সুভাষবাবু না ভেবে বসেন, সে নালিশ জানাচ্ছে। সুভাষবাবু সেই ভুলটাই করলেন, ‘আরে, যে-পুজোয় যে-মন্ত্র লাগে। ভোটের সময় প্রার্থীর একটা আবেদন ছড়ানো হয়। কারো হয়তো খেয়াল হয়েছে—আপনারটা করা হয়নি। করে দিয়েছে। ভালোই তো করেছে, ড্রাফট, কাউকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে। ভালোই—’
যোগেন হেসে ফেলে বলে, ‘একটু বেশি ভাল না? আমার পক্ষে? মানায় না য্যান—’
‘যোগেনবাবু, এর মধ্যে মানানো অমানানোর কী আছে? এগুলোকে এত সিরিয়াসলি নেবেন না। আপনার আপত্তি আছে কোনো কথা? নাকী কোনো কথা দেয়া হয়নি। সেসব ঠিক করে আর-এক লট ছেপে নিলেই হয়।’
‘আর-এক লট ছেপে নিলেই যদি ভ্রম-সংশোধন হইত তাইলে তো সেই সামান্য ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা কইব্যার আইসত্যাম না। আমি তো রাজনীতিই করি। আপনারে যে নেতা মান্য করি সেও তো আপনে সাবেক কংগ্রেসি থাকেন নাই বইল্যা। শিডিউল কাস্ট মুভমেন্টে তো একটা আলাদা কথা আছে—পুরনোদের থিকেও আর নতুনদের থিকেও আলাদা। এখনো হয়ত সবাই খেয়াল করে নাই। কিন্তু সকলের খেয়ালে আনার জন্য আমিও তো তৈরি হচ্ছি। এই লিফলেটটায় আমার সেই আলাদা ধারণাটা লেখা হয় নাই। সেটা লেখা সম্ভবও নয়। কিছু না লিখলেই হত। অখণ্ড হিন্দুসমাজ তো বিষয় না। ফলে, আমার বিরোধী ধারণাটাই লেখা হয়েছে।’
সুভাষ হেসে ফেললেন, ‘এখানে কি আপনি পলিটিক্যাল কনসেপ্ট খুঁজছেন? যাকে দিয়ে লেখানো, সে কি আপনার কনসেপ্ট জানে? যা বললে ভালো শোনায়, তাই বলেছে’।
‘আমাকে একবার দেখ্যায়া নিলেই হত।’
‘ক্যানডিডেটকে স্পেয়ার করতে চেয়েছে। আচ্ছা, আমাকে বলবেন আপনার কোন্ কনসেপ্টগুলি নিয়ে খুঁতখুঁত লাগছে? আমারও তো খুব স্পষ্ট করে জানা নেই। আমরা তো একটা লিফলেট দেব। তখন যদি কিছু করা যায়,’ সুভাষ হাত বাড়িয়ে একটা পেন্সিল নিয়ে লিফলেটটার ওপর রাখলেন।
‘যোগেনও লিফলেটটা পড়তে-পড়তে বলে, ‘মুখে বলতে গেলে এত পেটি শুনায়! তবু, ধরেন ‘দেশের স্বাধীনতার জন্য ‘দেশের ও দশের সেবা’ করার কোনো ‘সাধ্যই আমার ‘সাধ্যানুসারে’ নয়। আমার কোনো ‘ত্যাগস্বীকারও নাই। আমার আছেটা কী যে ত্যাগ করব?’
‘যোগেনবাবু, আপনি যে-সমাজ থেকে নিজের চেষ্টায় উঠে এসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেটা কি দেশের কাজ না?’
‘ও তো আপনি সাজায়্যা বলছেন। যাক, ছাড়া দেন। কিন্তু আমি তো কখনো ‘শক্তিশালী অখণ্ড হিন্দুসমাজ’ গঠনের চেষ্টা করি নাই। আমি তো অখণ্ড কংগ্রেসকেও হিন্দু-কমিউন্যাল সংগঠন মনে করি। ঐ বাড়িতে বছর দুই আগে গান্ধীজির সঙ্গে আমাদের মিটিঙে আমি তো গান্ধীজিকেই বলছিলাম। আমি তো মনে করি, তপশলিদেরে নিজেদের পার্টি তৈরি করতে হবে যা কংগ্রেস থিকে আলাদা তপশিলিদের নিজেদের ধর্ম তৈরি করতে হবে, যা হিন্দুধর্ম’ থিকে আলাদা। আবার বলা হয়েছে, ‘বর্ণহিন্দু হইতে অনুন্নত হিন্দুকে (তপশিলভুক্ত সম্প্রদায়) পৃথক করার যেসব প্রচেষ্টা ব্যবস্থা-পরিষদে যখনই হইয়াছে, আমি তাহার তীব্র প্রতিবাদ করিয়াছি’—বরং উলটাটা ঠিক, ‘এক করার যেসব প্রচেষ্টা হইয়াছে, আমি তাহার তীব্র প্রতিবাদ করিয়াছি। অ্যাসেম্বলি রেকর্ডসে তো সেসব আছে। প্রতিপক্ষ যদি সেসব তুল্যা লিফলেট ছাড়ে
সুভাষ চুপ করে থেকে তাঁর পেন্সিলটা ঠোঁটের ওপর বোলাল। একটু চুপচাপের পর সুভাষ যোগেনের দিকে না তাকিয়ে, বাঁ-চোখটা একটু কোনাকুনি ফেলে বলেন, ‘আপনার এই রাজনৈতিক মত কি কোথাও প্রকাশ করেছেন?’
‘একেবারে এই পয়েন্টটাই অ্যাডড্রেস করি নাই হয়ত। কিন্তু এইডা তো আমার নিজের অভিজ্ঞতায় অর্জিত বিশ্বাস –’
‘নিজের অভিজ্ঞতায়, মানে বিয়িং এ শূদ্র?’
‘তাছাড়া আমার অভিজ্ঞতা কী হবে?’
‘তা হবে না কেন? ধরুন, একজন মানুষ হিন্দুও নন, মুসলিমও নন—কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের সমস্যা নিয়ে তাঁর তো একটা নিরপেক্ষ ভাবনা থাকতে পারে। বর্ণহিন্দু বা শূদ্রহিন্দু না হয়েও তো এদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কারো একটা মত থাকতে পারে। বেশিরভাগ অ্যাকাডেমিশিয়ানেরই মত সেই নিউট্রালিটি থেকে তৈরি।’
‘বা, অনেকেই সেই নিউট্রালিটির আড়ালে নিজের মতটাই প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের স্বজাতের মধ্যেই বেশি।’
‘কিন্তু আপনার মতটায়, আপনি বলছেন, আপনি পৌঁছেছেন গ্লু ইয়োর বিলংগিং টু দিজ ইয়ারমার্কড আনটাচেব্ল কাস্টম। এটা কোনো মত নাও হতে পারে। এটা শুধু একটা অনুভূতিও হতে পারে। অনুভূতি থেকে ধারণা তৈরি হতেও পারে, নাও পারে। ধারণা থেকে মত তৈরি হতেও পারে, নাও পারে। মত থেকে অ্যাকশন তৈরি হতেও পারে, নাও পারে। কিন্তু আপনি যে বিলংগিং টু দ্যাট কাস্টকেই রাইট টু অ্যাক্ট বলে জাহির করেননি, সেটাই আমার কাছে দরকারি। আর সেটা এটাও প্রমাণ করে আপনি হঠকারিতা করতে চান না। এটা আমার কাছে খুব বড় কথা। যাতে, যখন অ্যাক্ট করার সময়, তখন দ্বিধা না আসে। আমার তো মনে হয় আম্বেদকার অ্যাক্ট করছে উইদাউট এক্সপিরিয়েন্সিং, ফিলিং, কনসিভিং, পলিটিক্যালাইজিং। এসব ছাড়াই অ্যাকশনে নেমে পড়েছে। ফলে, ওকে সবসময়ই সাহায্যের হাতের জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে রাখতে হয়। সে ইংরেজের হাতই হোক আর কমিউন্যাল হিন্দু-মুসলিম লিডারদের হাতই হোক।’
‘মনে হয়, আপনি ঠিকই বলছেন. তবু, যেহেতু কথাটা মনে চইড়্যা ফেরে, তাই কোথাও এইডা কয়্যা থাকতেই পারি। বিশেষ কইর্যা যশোর দাঙ্গার উপর অ্যাসেম্বলিতে।’
সুভাষ একটু হেসে বলেন, ‘এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলবেন না। মেজদার কাছে তো আপনার আর্গুমেন্টের কথা শুনেছি। আপনি যা বলতে চান না, সেটাই বলে ফেললেন, এটা হতে পারে না।’
‘তখন মন-মাথা দুইটাই বিগড়াইছিল। আমি বলছিলাম, রায়ট যশোরে হচ্ছে না, হচ্ছে কলকাতার খবরের কাগজে। তপশিলিরা আর উচ্চবর্ণের হিন্দুদের জীবনরক্ষার দায়িত্ব নেবে না।’
‘এর মানে তো এও হতে পারে যে আপনি উচ্চবর্ণ হিন্দুদের স্বাবলম্বী হতে বলছেন। সে তো বলতেই পারেন। আপনি আপনার পোলিটিক্যাল লাইনটা স্পষ্ট করেননি কেন? আপনার কমিউনিটির কাছেই।’
‘করি নাই যে তার প্রধান কারণ আমার পক্ষে সুবিধার সময় পাই নাই। দ্বিতীয় কারণ, আগে তো আমার কমিউনিটির বিশ্বাস তৈরি করতে হবে। এখনো তো নমশূদ্র নেতা বলতে মল্লিক ব্রাদার্স, রায়চৌধুরীরা, ঢাকার মোহিনী দাশ, বিরাট মণ্ডল, রসিকলাল! পি আর ঠাকুরকে মানা শুরু হইছে—সে তো হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের বংশের লোক, তদুপরি বিলেতফেরতা। আমি যে কর্পোরেশনে খাড়াইতে রাজি হইল্যাম, সেটা আপনার ও প্রোফেসরসাহার কথাতেই নিশ্চয়, তবে, আমার একটু যাচাই করার ছিল যে আমার নামটাই অটোমেটিক্যালি উঠে আসে কী না—‘তাই তো হল। একজনও তো অন্য কোনো নাম বলেননি সেদিন। যাকে বলে সর্বসম্মত।’
‘আপনারাই তো আমার নাম কইর্যা দিলেন। আপনারা কইলে কেউ ‘না’ কইতে পারে?’
‘তাহলে এটুকু তো প্রমাণ হল যে কেউ বলে দিলে আপনার নামে কেউ আপত্তি করবে না।’
‘সে ভবিষ্যতে দেখা যাবে। কিন্তু এখন আমার লক্ষ, কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলার ভোটে জেতা আমাদের সমাজে আমার বরিশাল জেতার থিক্যা উচ্চতর জেতা মনে হবে। আমার পলিটিক্যাল লাইন প্রতিষ্ঠার দিকে আমি আর-এক ধাপ আগাব। কিন্তু যার জন্য এত, সেই পলিটিক্যাল লাইনটাই তো এই লিফলেট উলট্যাইয়া দিল। তখন তো লোকে বলবে, তুমিই-না বলেছিলে অখণ্ড হিন্দুত্বের কথা।’
‘হ্যাঁ। বলেছিলাম। হিন্দুরা যদি অখণ্ড না থাকতে চায়, আপনি কী করে অখণ্ড রাখবেন? তখন কত অখণ্ড স্টেজে আসবে। সিচুয়েশন কত দ্রুত বদলায়, দেখছেন তো? এখনকার অবস্থায় যদি এই ইলেকশনে তপশিলিরা হিন্দুদের থেকে আলাদা বলতেন, তাহলে কাস্ট হিন্দু ভোট পেতেন? তবে, নিশ্চয়ই না-দিলেও চলত হয়ত।’
যোগেন চুপ করে গেল। ওর যেমন অভ্যেস, একটু হাসি ঠোঁটে লাগিয়ে রেখে হাঁটু দোলাতে লাগল। তারপর হঠাৎ একটু জোরেই বলল, ‘এ-বাড়িতে কি শুধুই পলিটিকস হয়? অতিয়-আপ্যায়ন কি উইঠ্যা গেল? তাইলে ঐ বাড়িতেই যাই।’
সুভাষ তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠতে গেলেন, ‘সে কী? সত্যিই তো!’
কিন্তু যোগেন তাঁকে উঠতে বাধা দিয়ে বলল, ‘এর মধ্যে আপনার তো কোনো পার্ট নাই। কেউ কি জানে যে আমি আসছি।’ এ-বাড়ি তো দুর্গের মতন। দ্যাখেন, ঠিকই আহার্য আইস্যা যাবে।’
সুভাষের এক ভাইঝি, গীতা, সে ছুটে এসে যোগেনকে দেখে জিভ কেটে উলটো দৌড় দেয়। দৌড়তে-দৌড়তেই চেঁচায়, ‘চা দিচ্ছি’।
যোগেন তার সেই নিজস্ব হাস্যরেখার সঙ্গে নিজেরই পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনে একবার বরিশাল চলেন। কাউকে খবর না দিয়ে গেলে আরো ভাল। তবে আপনার চেহারা তো! বেশিক্ষণ লুকায়া রাখা যাবে না। তবু যদি একটু পারা যায়।’
‘কেন? লুকিয়ে যেতে হবে কেন?’
‘শুধু এইটুক চোখে দেইখতে যে আমাগ দ্যাশের মানুষ কতটা কষ্ট মুখ বুজে কাটায়। তার উপর এই উচ্চবর্ণের অত্যাচার। মানুষজন কী কইর্যা বাঁইচ্যা থাকে—এটাই যেন রহস্য’।
‘দেশ বলতে কি আপনি বরিশালই বোঝাচ্ছেন’।
‘বলছি যখন, তখন হয়ত মনের অভ্যাসে তাই ভাবছিল্যাম কিন্তু বলতে-বলতে মাথার নতুন অভ্যাসে ভাইব্যা ফেললাম—আমাগ পুরা দ্যাশটার কথাই। এডা আপনার সঙ্গগুণ। সব জায়গাতেই তো এক কষ্ট। বরিশালই-বা কী আর আম্বাবাদই-বা কী?’
