১৩০. কর্পোরেশন ভোটে যোগেনের স্ট্র্যাটেজি
সেদিন শেষ পর্যন্ত এটাই ঠিক হয়েছিল যে কে কাছা ধরে টানছে আর কে কোঁচা খুলে দিচ্ছে—এসব খোঁজা এখন যোগেনের কাজ নয়। যোগেন যেমন বোঝে তেমন ভোট করে যাবে। রহমানশাহেব আর দিন পাঁচেক পরে রাজাবাজারের উত্তরে, বড়তলায় তাঁর এক ভাই বেটার বাড়িতে গিয়ে উঠবেন, ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকবেন আর যোগেনের পৃষ্ঠদেশ রক্ষা করবেন। যোগেন উত্তর কলিকাতা জিলা কমিটির সঙ্গে ও তার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে প্রোগ্রাম করে যাবেন। যোগেন একবার বলেছিল, ‘কিন্তু আপনারও তো ভোট।’ তাতে রহমানশাহেব বলেছিলেন, ‘আরে, আমি তো চার জেনারেশনের বাঙালি মুসলমান আর আপনি তো মনুসংহিতা থেকে বাঙালি শূদ্র। আমার ভোট দেখাশোনার লোক আছে। আমরা না-দেখলে আপনার তো লোক নেই। আবার, আপনার পেছনে লাগার লোকও তো জুটিয়েছেন।
রহমানশাহেব যোগেনের পক্ষে কাজটা অনেক গুছিয়ে দিলেন। তাঁর সঙ্গে যোগেনের যে রোজই দেখা হত, তা নয়। আবার, জিলা অফিসে রাত নটা নাগাদ দেখা হয়েও যেত। জিলা অফিসের একজন, অর্ধেন্দুদা, ছিলেন যোগেনের দায়িত্বে। তিনিই ঠিক করে দিতেন—কোন্ পাড়ায় বা বস্তিতে যেতে হবে, সেখানকার প্রধান সমস্যাও বলে দিতেন—বৃষ্টি হলে হাইড্রান্টের জল ওপরে উঠে আসে, বা ট্রামের একটা স্টপ দরকার, বা শ্রীমানী মার্কেটে রাতে মাছের ট্রাক থেকে যে-দুর্গন্ধ বেরয়, তাতে রাত আড়াইটে-তিনটের পর ঘুময় কার সাধ্যি বা শ্যামপুকুরের খাটালটার জন্য কি শেষে নর্থ ক্যালক্যাটায় মশারি টাঙিয়ে শুতে হবে? কোন্ কথার কী জবাব দিতে হবে, তাও অর্ধেন্দুদা বলে দিয়েছিলেন, ‘হাইড্রান্টের জল যদি মাটির নীচে না গিয়ে ওপরে উঠে আসে বা শ্রীমানী মার্কেটের আঁশটে গন্ধ যদি শেষ রাতে ছড়ায় তার আপনি কী করবেন? আপনার মোক্ষম অস্ত্র হবে—’আমি তো নতুন। আপনারা আমাকে যেমন চালাবেন, তেমন চলব। আপনার সঙ্গে সবসময়ই রাজীব থাকবে তাছাড়া, পাড়ার ছেলেরাও থাকবে, ওরাই ক্ষেত্রে কর্ম বিধীয়তে করে দেবে। আর-একটা কথা–আপনার ওয়ার্ড কিন্তু সাবেক কলকাতা, সেই সাবেককালে ওড়িশ্যা, বিহার সব জায়গা থেকে আর গঙ্গার দুই পার থেকে নানা জাতের লোক এসে এখানে বিরাট-বিরাট বাড়ি তৈরি করে নতুন সব কুলপঞ্জিকা বানিয়ে কায়েত হয়েছে। তিলিরাই বেশি। দেবরাও কম না। এসব নিয়ে একেবারে মাথা ঘামাবেন না। এদের সব বাড়িতেই বাইরে বা ভেতরে মন্দির আছে। আপনি ভেতরে ঢুকতে যাবেন না, এদের আবার শুচিবায়ু খুব। ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারও বেশি। আপনি বাইরের দেয়ালে মাথা লাগিয়ে প্রণাম সেরে দেবেন।
অর্ধেন্দুর পরামর্শ যোগেন অক্ষরে-অক্ষরে মেনেছে, বরং বলা উচিত, অর্ধেন্দুর পরামর্শ আর রাজীবের নেতৃত্ব। সামনের একটা বাড়ির সঙ্গে ডাইনে-বাঁয়ে লাগিয়েবাড়িয়ে কতগুলি যে বাড়ি বা ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে, কত বাড়ির সিলিঙের নীচে ফলস্ সিলিং ফিট করে ছোট-ছোট সব গোডাউন আছে, এইসব চাক্ষুষ করা গেল। কিন্তু তার চাইতে অনেক বেশি দেখা ও জানা হল—বিশাল-বিশাল বস্তি। এইসব বস্তির মালিকরা খুব নামডাকওয়ালা লোকজন—সব জাতের, সব প্রদেশের। বেশিরভাগই যে নানা পেশার লোকজনদের মধ্যে ভাগ করা সেটা যোগেনকে বুঝতে হল বেশ দু-একটি দেখে। যোগেন জানেই না, শহরে বা কলকাতায় পেশা এত। এই বস্তিগুলি দেখেও যে তার মনে থাকল, তাও নয়। কিছু মনে থেকে গেল, আলাদা-আলাদা কারণে। ঝালাই বস্তির ভিতরে আবার রংঝালাই, রাংঝালাই, লোহাঝালাই, পিতলঝালাই, তামাঝালাই, এমন কী, সোনাঝালাই-রুপোঝালাইয়ের—দোকান না, মিস্তিরিরা এখানে থাকে। আর-একটা ছোট বস্তিতে শুধুই কশাইরা থাকে, তাদের বেশিরভাগই অবাঙালি মুসলমান। কথাটা কাউকে জিজ্ঞাসা করেনি যোগেন কিন্তু কথাটা তার মগজ থেকে বেরিয়েও যায়নি—কশাইবাগানের এত কশাইয়ের ও তাদের বাড়িঘরের মানুষদের ক্ষিদে মেটাতে যে মাথার দরকার, তা আসে কোত্থেকে?
সবচেয়ে বেশি বোধহয় মিস্তিরি বস্তি–কতরকম যে মিস্তিরি, গুনে শেষ করা যায় না। ইট বসানোর মিস্ত্রি, জোগানি মিস্ত্রি, তাদের মধ্যে কেউ-কেউ আবার ছোটখাটো কাজও করে, জলের মিস্ত্রি, কলের মিস্ত্রি, জল মানে গঙ্গাজলের পাইপ আর কল মানে টালার জল, ফেরুল মিস্ত্রি, সেলাইকল মিস্ত্রি, সাইকেল মিস্ত্রি, টায়ার মিস্ত্রি—রিসোলিং, দরজা মিস্ত্রি ছুতোর নয়, তৈরি ও বসানো দরজার, তালা মিস্ত্রি. চাবি মিস্ত্রি, কাচ মিস্ত্রি, জানলা মিস্ত্রি—চিকের জানলা মেরামতির—যোগেনের এই মনে আছে। মনে আছে আরো এমন সব মিস্ত্রিগিরি যার মানেই সে জানে না, প্রয়োগ তো জানেই না, দু-একবার জিগগেস করেছে—তারপর নিজেই চুপ করে গেছে, এর আর শেষ নেই বুঝে। কাঁকড়া, বাবড়ি, হোগলা, গির্জা, পাথথর, শাবল, খন্তা, জরদা, মশলা, গুণ্ডি, হাতকো, হেরিকেন, সুচ, গেঁড়ি, শামুক, পাখি, দাঁড়া, পাখা, ডেনটিস, প্যানটি—আরো যে কত। এর কিছু-কিছু মজার ব্যাপার মজার বলেই যোগেনের মনে থেকে গিয়েছে। চিনে ডাক্তাররা দাঁত বাঁধায় কিন্তু সে-দাঁত অনেক সময়ই মাঝামাঝি ভেঙে যায়। হয়তো হাত থেকে পড়ে বা মুখ থেকেও পড়ে। আর-একবার দাঁত করানোর তো খরচা অনেক। ‘ডেনটিস’রা ভাঙা পুরনো দাঁত জোড়া লাগায়। শাবল মিস্ত্রিরা কিছু খোঁড়ে না। খন্তা মিস্ত্রিরা খোঁড়ে—কুয়োও। আজকাল কেন, অনেককাল হলই গম্বুজবাড়ি ওঠে খুব—বরং আজকাল কমে এসেছে। খরচা বেশি, মেরামতি খরচা বেশি। গম্বুজ যত তাক ছাড়া হয়, ও যত লম্বা হয়, তত বাহাদুরি। এক গিরজা-মিস্তিরিরাই পারে সেই গম্বুজগুলির ওপর ছোটখাটো সব মেরামতি করতে বা গম্বুজের গায়ে গজানো অশথ বা বটের, পাতা গজানো চারা উপড়ে, সেখানে অ্যাসিড ঢালতে বা গম্বুজের ঐ চোখা অংশটি রং করতে। কাঁকড়া মিস্ত্রিদের কাজ শুনে একেবারে হাঁ হয়ে গিয়েছিল যোগেন। এরা, একমাত্র এরাই, জাহাজ ও বড়-বড় চটকলের চিমনি রং করে। এরা প্রায় সকলেই বালাসোয়ের লোক—বংশানুক্রমে এই কাজই করে যাচ্ছে। বড়-বড় জাহাজের পাহাড়ের মতো উঁচু গা বেয়ে ও আকাশফোঁড়া চিমনির গা বেয়ে এরা কাঁকড়ার মত ওঠানামা করে—সেই জন্যেই এদের নাম কাঁকড়া। দড়ির গিঁঠে-গিঁঠে তারা কী করে সেই ভাঁজহীন উচ্চতায় চলাফেরা করে তা যোগেন বুঝে উঠতেই পারেনি। কাঁকড়া নামটা থেকে ছবিটা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল।
জিলা কংগ্রেসের যারা যোগেনকে নিয়ে ভদ্রলোকদের পাড়ায় ঘোরে তারা কিন্তু যোগেনকে নিয়ে বস্তিগুলোতে ঘোরে না। বস্তির নেতারা আলাদা। দু-দিনেই যোগেন বুঝে ফেলে, বস্তিরনেতা বলে কোনো একটা দল নেই। প্রত্যেকটা বস্তির আলাদা নেতা বা নেতৃদল আছে। তারা সকলেই হয়তো কংগ্রেসি, এখন কংগ্রেসে যখন ভাঙাভাঙি চলছে তখন কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের বানানো অ্যাড হক কমিটিও চেষ্টা করছে বস্তির নেতাদের ধরে বস্তির দখল নেয়ার। বা, হয়তো কলকাতার বস্তিগুলোতে সুভাষ বোসের একচেটিয়া দখল, তবু, কংগ্রেস দু-টুকরো হওয়ায় বস্তির নেতাদের কাছেও একটা বিকল্প এসে গেল। ব্যক্তিগত হিংসে-হিংসি থেকে কেউ-কেউ হয়তো অ্যাডহক বা হিন্দুমহাসভা হওয়ার ভয় দেখাত। বড় নেতারা বস্তির লোকদের দলে রাখতে দরকারে বস্তিনেতাদের অনেক দোষ ইচ্ছে করে দেখে না। এতটা একজায়গায় এই হাজার মানুষ আর কোথায় পাওয়া যাবে? তাতে যদি একজন আর-একজনের ঘর দখল করে নেয় বা বৌ লুঠ করে—তাহলে বড় নেতারা সহজে সেসব ঝামেলায় জড়াতে চান না। সেইসব বিষয়ই আসলে বস্তির নিজেদের নেতাদের হাতের মুঠোয়। আর একই বস্তিতে একাধিক লাইননেতা এক-একটা উপলক্ষে তৈরি হয়ে যায়।
একদিক থেকে যোগেন তো কলকাতারই ছেলে—সেই ১৯২৮ নাগাদ ল-কলেজের সুবাদে আর থাকেও সে বরাবরই প্যারি সরকারের বাড়িতে। সে টিউশন বা প্রুফ দেখার বাড়তি কাজও জুটিয়ে নিত এই পাড়ারই মধ্যে, অথচ এই বড়তলাটা তার দশ বছরে দেখা হয়নি—একটুও না। তার রোজকার যাতায়াতের বিঘৎখানেকের মধ্যে যে এই এত কিছু, তা কারো কাছে শোনেনি পর্যন্ত, দেখা তো দূরস্থান। কোনো কারণ খুঁজে পায় না যোগেন, খোঁজার মতো কোনো কারণ নেইও। কলকাতাতেও তো যোগেন, তার নিজেরই জীবনের দরকারে এসেছিল। সে-দরকার কলকাতাই এক মেটাতে পারে। তাই যদি হয়, তাহলে, যোগেন তো কলকাতাতে ঢুকেছে বাইরে থেকে—অথচ সে কলকাতাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করল না। এই যেসব বস্তিতে যারা থাকে, তাদের ছাড়া তো কলকাতা একটা দিনও চলবে না। তাও যে এসবের ঠিকঠিকানা কখনো জেনে উঠতে হয়নি, সে কী শুধু এই কারণে যে—যোগেনের তেমন কোনো দরকারই ঘটত না আর কলকাতারও তাকে তেমন দরকার হত না। যোগেন কলকাতায় সুযোগসন্ধান আগন্তুকমাত্র।
মনের এমন একটা দশায় যোগেন এই বস্তিগুলিতে ঘোরে। সেই ঘোরাঘুরিতে তার কাছে কলকাতার একটা জলছবি যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভোটের কথা যোগেনের মনেও থাকে না–সে তো নেতারা সামলায়। বা, সামলাতে পারে না। যোগেন শুধু পাক খায় বস্তি থেকে বস্তি, বস্তি থেকে বস্তি। পালকি লাগে এখনো বিয়েশাদিতে, সেই পালকি-বেহারাদের ঘর থেকে পশ্চিমা বামুনদের কয়েক ঘরের টানা লাইন পর্যন্ত। শোনে এদের কথা—নিজে বুঝে নিতে চায় কলকাতার সঙ্গে এদের পারস্পরিক নির্ভরতা। কলকাতায় যে-হিন্দুরা এসে বড়লোক হয়েছে, তাদের কলকাতা-বাসটা হয়ে উঠেছে তাদের সদ্য অর্জিত বর্ণ-উচ্চতা ও টাকাপয়সার সঙ্গে বাঁধা। সুতরাং দেশে থাকলে বিয়ের যে-কনে হেঁটে বা গরুর গাড়িতে পতিগৃহে যেত, সে এখন সাজানো পালকি চাইতেই পারে আর তেমন বড় ব্যাপারে টাউনজোড়া নারদের নেমন্তন্নে রান্না, পরিবেশন, এঁটো পরিষ্কার ইত্যাদির জন্য পশ্চিমা বামুনদের ওপর নির্ভর ছাড়া অন্য কোনো উপায়ই নেই। ঠিক কনট্যাক্ট দেয়া নয় আবার নয়ই-বা কেন? ক্ষত্রিয়দের মধ্যে নাকী কোনো-কোনো গোত্রের লোক হাতির পিঠে না-এলে বরকে বরণ করাই হয় না। কলাবাগান বস্তিতে শুধু এই কাজের জন্যই নাকী একজন একটা ‘হাতি’ পোষে। সারা বছরে সে যে-বায়না পায় তাতে এর দুই সংসারের, একটি ওড়িশার গোপালপুরে, আর-একটা কলকাতার এই কলাবাগানে, দিব্যি চলে যায়, তার ছোট মুণ্ডুতে একটা জরির পাগড়ি বাঁধার খরচা সমেত। ‘হাতি’র বদলে ঘোড়া চরে বর-আসাটা নাকী বেশি চালু। কিন্তু ঘোড়া বস্তিতে পাওয়া যায় না, ঘোড়ার খিদমদ্গারও না। রেসের মাঠের লম্বাচওড়া বাতিল ঘোড়া থেকে বরযাত্রীর ঘোড়া জোগাড় হয়। রেসের মাঠের আস্তাবলের মাস্টাররা এ কারবার করে।
কর্পোরেশনের ভোটে দাঁড়াতে বাধ্য না হলে যোগেন এমন একটা কলকাতার কথা জানতেই পারত না, দেখা তো অনেক দূরের ব্যাপার।
আসনটা যে-কেন তপশিলিদের জন্য রিজার্ভ রাখা হল, সেটা নিয়ে যোগেন ভাবেনি। সেনসাস রিপোর্ট, বিভিন্ন ধরনের অধিবাসীর আনুপাতিক সংখ্যা এই সব নানা প্রমাণ দিয়ে এসব হয়। যদি ভুল হত, সেটা নিয়ে চেঁচামেচির লোক কম নেই। বস্তিগুলিতে ঘুরতে-ঘুরতে তার মনে হয়েছে, পরে সে চিনে নিতেও পেরেছে, যদিও সেখানে সব মানুষ দলা পাকিয়ে আছে, তারমধ্যেই বর্ণভেদ বেশ স্পষ্ট অন্তত তার কাছে যে এই ভেদচিহ্নগুলি চেনে। হঠাৎ একটা খাটো দরজার মাথায় লালরঙে লেখা : ওঁ গুরবে নমঃ। ওঁ কথাটি বেশ পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে বড় করে লেখা। ঐ ওঁ আর সংস্কৃত জানিয়ে দেয় এটা একটা বামুন বাড়ি। ওঁ যতটা, সংস্কৃত ততটা নয়।
এইভাবেই একদিন বেশ সাতসকালে যোগেনকে নিয়ে যাওয়া হল কেশব সেনের বাড়ির পেছনের এক চামার বস্তিতে। বেশ একটা লম্বা পেঁচালো গলি দিয়ে যেতে হল। গলিটা চাপাও বটে। উলটোদিক থেকে সাইকেলে কেউ এলে বিপরীতমুখী লোকদের কারণে এগতে পারবে না, নামতে হবে। নামার পরও যে সাইকেল যাওয়ার মতো ফাঁক পাবে, তা নয়। সম্ভবত এ-গলি দিয়ে চেনাজানা লোকরাই যাতায়াত করে। সাইকেলওয়ালা সাইকেলটা ছেড়ে দিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ডান হাত বাড়িয়ে সাইকেলের হ্যানডেলের মাঝখানটা ধরে নিজের পাশে নিয়ে এসে সাইকেলে উঠে বসে। যেখানে আটকেছিল সেখানে বিপরীতমুখী যাত্রীদের কেউ সাইকেলটা ধরে দাঁড়িয়েছিল।
গলিটা শেষ হয় বেশ লম্বা ও গভীর একটা বানানো চৌবাচ্চায়—প্রথমে মনে হয় একটা, পরে, যখন সেই চৌবাচ্চাটা পেরতে হয় বাঁয়ে কেতরে, তখন দিনের আলোতে দেখা যায়—চৌবাচ্চা একটা নয়, দুটো আর দুটো চৌবাচ্চা থেকে চামড়া পচানো দুর্গন্ধ বাতাস ভারী করছে। দুর্গন্ধ এতটাই ব্যাপক, যেন কোনো মৃতদেহ পচেই যাচ্ছে এক ঋতুকাল ধরে।
যোগেন গলির শেষ-হওয়ার মুখটায় একটু সাবধান হয়েই বাঁয়ে কেরে বেরতে-বেরতে বলে, ‘রাত্তিরবেলায় তো অচেনা লোক গলি দিয়ে ঢুকে অবধারিত চৌবাচ্চায় পড়বে। আলোও তো নাই!’
‘রাত্তিরবেলা গলিটা কেউ চিনতে পারে না, অচেনা কোনো লোক। কোনো অচেনা লোক রাত্রিবেলা চিনতে পারে না। ফলে, অন্যরকম বিপদ হয় অবিশ্যি।’
‘বিপদের আবার রকমফের! কীরকম?’
‘পুরনো চোর ট্রামরাস্তা থেকে বড়সড় একটা দাঁও মেরে দৌড়ে এই গলিটা দিয়ে পালায়। আর নতুন যারা তাদের ধাওয়া করে তারা চোর-ধরা দৌড়ে গলিটা পেরিয়ে ধপাস ধপাস করে চৌবাচ্চাগুলিতে পড়তে থাকে। চৌবাচ্চার গায়ে লেগে হাঁটু ভেঙে যায় অনেকেরই, তারপর কোথায় পড়ল—জল না কী যা দুর্গন্ধ, তার ওপর বড় বড় চামড়ার শিটগুলো গায়ের ওপর উঠে এলে মনে হয়—জলে জ্যান্ত পশ হাঙরটাঙর বুঝি—’
‘এমন একটা বিপদ রাখার হেতু কী?’
‘হেতু বোধহয়—এমন একটা চৌবাচ্চা থাকলে পাড়ায় বিপদের ভয় কমে—’
‘বিপদ দিয়ে বিপদ ঠেকানো। বিপদডা কী?’
‘অচেনা কোনো উৎপাত পাড়ায় ঢুকতে পারবে না।’
‘বাঃ! বললেন যে, চোরদের পালানোর রাস্তা।’
‘সে তো চেনাচোরদের—’
যোগেন খুব একচোট হেসে উঠে বলে, ‘বাঃ, এটা কিন্তু শেয়ানা বুদ্ধি! চেনা বিপদ দিয়ে অচেনা বিপদ ঠেকানো! আপনারা ঐ মুখে একটা নোটিশ লাগাইতে পারেন তো—’শুধুমাত্র নিরাপদদের জন্য’?’
‘নিরাপদরা তো জানেই বিপদটা। বরং নোটিশ দেন,
‘বিপদদের বিপদ।’ মানে, যাদের বিপদে পড়ার অভ্যেস …’
তার চাইতে লেখা ভাল, ‘নিজ দায়িত্বে নিজের বিপদ-সাপন সামলান। কোং দায়ি নহে’।
চৌবাচ্চাগুলো পেরিয়ে এলে জায়গাটা বেশ ভালোই লাগে। যোগেনরা যেদিকে হাঁটছে তার বাঁয়ে বেশ প্রাসাদের মতো বাড়িঘর, সামনে গাছাপালায় সবুজ একটা পার্ক—এখন তো ফাল্গুনের শেষ, কিছু গাছে বেশ রঙিন ফুল ফুটেছে। কলকাতায় এসে যোগেনের গাছ-ভালবাসা তৈরি হয়েছে, মাঠ-ভালবাসাও। আইনসভার বারান্দা থেকে সেই প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতাল পর্যন্ত খোলা ময়দান দেখা।
‘ব্যাপার কী? এইরকম অট্টালিকায় আসার পথ এইরকম গলিপথে চৌবাচ্চায় ডুব দিয়্যা? যোগেনের বিস্ময়ের জবাবে কেউ বলেন, ‘সময় বাঁচাতে গেলে রাস্তা তো খারাপ হবেই। এটা তো খিড়কিদুয়ার। সিংহদ্বার দিয়ে আনলে তো আপনাকে তো সার্কুলার রোড দিয়ে মাইল তিন ঘুরে আসতে হবে।
‘তাই বলেন, ঐ গলি আর চৌবাচ্চা হইল এই এলাকার শেষ?
‘শেষ বা শুরু যাই বলেন। যে-রাস্তা দিয়ে ঐ গলিতে ঢুকলেন বা ঐ গলিটা কিন্তু আপনার তিন নম্বর ওয়ার্ডে পড়ে না। এখান থেকে আপনার ওয়ার্ড, এটা চামারবস্তি, যোগেন শোনে।
মনে-মনে ছকে নিয়ে যোগেন বলে, ‘গলিপথ তো উভয়দিকেই ঘন ও উচ্চ প্রাকারে ঘেরা। ওয়ার্ডে তো মনুষ্যবসতি দরকার, মানে, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন মশায় আমার ভোটার নন—’ একটু হেসে সকলে মজাটায় সায় দিল। তারপরেই বাঁ-হাতি একটা অট্টালিকার দিকে ঘুরল।
‘তবে-যে বললেন, চামারবস্তি?’
‘হ্যাঁ, আপনাকে বলে দেয়া হয়নি। এই বিশাল-বিশাল বাড়িগুলি কিন্তু কলকাতার আদিকালের, অন্তত শ-দেড়েক বছরের তো বটেই—’
‘শ-দেড়েক তো দাঁড়াইবে গিয়্যা, ধরেন, এইটিনথ সেনচুরি, মানে সেভেনটি নাইনটি –’
‘হ্যাঁ, ঐরকমই হবে। এক মুসলমান মহাজন এসে এখানে একটা বিশাল চামড়া-ফ্যাক্টরি খোলেন। তারপর, নাকী সেই চামড়া দিয়ে তৈরি নানারকমের জিনিসও বানাতে লাগলেন। সব জাহাজ ভরে বিদেশে পাঠাতেন। সেই কাজে শয়ে শয়ে চামার আনতে লাগলেন, কোত্থেকে কে জানে, একেবারে ফ্যামিলি শুদ্ধু। সে একটা চামারকলোনিই হয়ে গেল। তখন তো আর এদিকে বাড়িঘর ছিল না। মনের সুখে যে পারে সে যত পারে তত বাড়ি বানাত। কিন্তু ঠনঠনের কালীবাড়ি তো পাড়ার মধ্যে। প্রথম-প্রথম কোনো গোলমাল হয়নি। পরে যখন চামাররাই, শয়ে শয়ে চামারই এখানকার বেশিরভাগ লোক হয়ে গেল, তখন নাকী এ-পাড়ার বসাক-তিনি এই নতুন বড়লোকরা এই নিয়ে খুব গোলমাল শুরু করে। তারা বলে—চামাররা তো অচ্ছুত আর এই চামারদের গায়ে গা না লাগিয়ে তো রাস্তাঘাটে চলাফেরা করা যাচ্ছে না, কে চামার, কে চামার না তা চেনাও যায় না, হিন্দুধর্মের সর্বনাশ হল, সুতরাং চামড়া কারখানা সরাও, যদি সরাতে না পার, তাহলে চামারদের অন্য কোথাও কলোনি বাজিয়ে দাও। মালিক নাকী রাজি হয়েছিলেন। বলেছিলেন, তিনি কয়েকদিনের জন্য পশ্চিমে যাচ্ছেন, ফিরে এসে সকলে যা বলছে, সেই অনুযায়ী চামারদের বাইরে কলোনি করে দেবেন আর কারখানাটা এখানে থাকবে। সেই-যে তিনি কয়েকদিনের জন্য পশ্চিমে গেলেন, আর ফিরলেন না। ফিরলেন না তো ফিরলেনই না। একেবারেই ফিরলেন না। তখন সবাই অপেক্ষা করতে লাগল—এত বড় ব্যবসায়ীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী তো কেউ আসবেই। আসবে, আসবে, আসবে। তখনই নাকী জানা যায়, কারখানার মালিক ছিলেন ‘বোনার’ বংশের পাঠান, রাজপুতানার টঙ্ক রাজ্যের কেউ, ঐ টঙ্ক-রাজ্যের বোনার-পাঠান আমির শাহ বলে একজন পিণ্ডারিদের সঙ্গে নিয়ে শাহেবদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তখন শাহেবরা টঙ্ক-জায়গাটিকে একটা রাজ্য করে দিয়ে ঐ আমির শাহকে তার নবাব বানিয়ে তাকে ঠান্ডা করে। এই চামড়া-ব্যবসাচী বা মালিকের নাম তখনই জানা গেল, তাল খাঁ। আরো অনেক কথাই রটনা আছে। আমার সবই শোনা কথা। আমি কিছুই জানি না। আপনি যদি আরো জানতে চান তাহলে আপনাকে আমি রাধাকান্ত দেবের ফ্যামিলির একজনের কাছে নিয়ে যেতে পারি। তিনি এই অঞ্চলের প্রাচীন কলকাতার অনেক খবর জোগাড় করেছেন।’
‘রাধাকান্ত দেব কে?’
‘রাজা নবকৃষ্ণ দেবের ফ্যামিলির—
‘রাজা? তিনি কে?
‘উনি তো খুব নামজাদা লোক ছিলেন।’
‘এই বললেন রাজা আর এই বললেন লোক?’
‘ঐ হল আর কী! রাজাও তো লোক। উনি তো শাহেবদের খুব সাহায্য করেছিলেন নাকী সেইজন্য শাহেবরা তাঁকে রাজা-টায়টেল দেন। ওঁদের প্যালেস তো ট্রামরাস্তার ওপর, এখনো, আপনি যাবেন?’
‘উনি রাজা ছিলেন, মানে রাজা টাইটেল পাইছিলেন কবে?
‘আমি তো হিস্ট্রি জানি না। কিন্তু অনেকদিন আগে, ঐ পলাশির যুদ্ধটুদ্ধের সময় হবে হয়ত।’
‘আর ঐ চামারদের কী হল? এইটিনথ সেঞ্চুরির শেষে তো বললেন চামড়া-কারখানা! সেই চামারদের?’
‘তারাই তো বংশানুক্রমে আপনার ভোটার হয়ে গেল। আর তাদের সুবাদেই তো এই সিটটা আপনাদের জন্য রিজার্ভ হয়ে গেল। আপনি তাদের সঙ্গেই কথা বলতে যাচ্ছেন—’
‘বা বা—এই শ-দেড়েক বছর ধরে চামারদের এখানে থাকতে দিল হিন্দুরা?’
‘কেন? চামাররা হিন্দু না?’
‘আপনিই তো বললেন, বসাক-তিলি-শুঁড়ি, সব গোঁড়া হিন্দুরা ওদের উচ্ছেদ কইরতে চাইছিল অগ—’
‘হ্যাঁ-আ। সেটা তো হিন্দুধর্মের ভিতরের ব্যাপার।’
‘এখন তো সাহা-শুঁড়িরাও চামারদের সঙ্গে এক লিস্টে তপশিলি।’
‘তখন তো তপশিলি ছিল না। চামাররা তো অচ্ছুত।
‘তারা এখানেই শিকড় গেড়ে ফেলেছে। মালিক আজ আসবে কাল আসবে ছেলে বা নাতি কেউ আসবে বলে কাটল আরো বছর তিরিশ। তাতেই তো বিধবাবিবাহ আইন পাশ হয়ে গেল, হিন্দুরা ব্রাহ্ম হয়ে আবার হিন্দু হয়ে গেল আর চামারদের দেশ থেকে আরো গ্রামকে গ্রাম উঠে এল এখানে, এখন যা সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তাতে এরাই তো হিন্দুপাড়ার বলভরসা, প্রোটেকশন।’
যোগেন ঠিক আন্দাজ পায় না, এখানকার কংগ্রেসের যে-ভদ্রলোক কথা বলছেন তিনি যোগেনকে খোঁচাতে চাইছেন, নাকী, যোগেনই তাঁকে খুঁচিয়ে ফেলেছে। যাই হোক, কথাটা বদলানো দরকার। যোগেন খুব একটু হেসে বলে, ‘আপনে তো আমারে সেঞ্চুরিবন্দি কইর্যা ফেললেন। এইটিনথ সেঞ্চুরির শেষ চামারবস্তি, এইটিনথ সেনচুরির মধ্যিখানে নবকেষ্ট, নাইনটিনথ পার হইয়্যা নাইনটিন থার্টি ফাইভের কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড মোতাবেক ১৯৪০-এর মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট, ব্র্যাকেটে অ্যামেন্ডমেন্ট আইনের প্রথম কর্পোরেশন ইলেকশনের শিডিউল ক্যানডিডেটকে নিয়্যা যাইতেছেন তার দেড়শ বছরের পূর্বপুরুষ ভোটারের কাছে।’
