১২৯. রহমানের ঠাকুরদাদার মুসলমানি
যোগেন বলে, ‘নাস্তা তো না-হয় করা যায়। কিন্তু জানব ক্যামনে কে আপকানট্রি, কে ডাউনকানট্রি—’
‘আপনাদের তো পূজাআর্চায় চোদ্দ পুরুষের নাম লাগে। আমি তো বোধহয় চারের বেশি পুরুষের নাম বলেছি। কয়জন পারবে?’
‘অন্তত আমার মতন শুদ্দুররা যে পারবে না, তা নিশ্চিত। আমরা শুদ্দুররা নিজের বাপের নামই জানি না, তার ওপর আবার চোদ্দপুরুষ?’
‘আমার ঠাকুরদাদার বাবা ছিলেন পুরা হিন্দু আর পুরা আপকানট্রি। ঠাকুরদাদা ছিলেন বিশ-পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত আপকানট্রি হিন্দু, বাকি জীবন বাঙালি মুসলমান। বিহার ছাড়িয়ে বেথিয়া বলে কোথাও আমরা থাকতাম বেথিয়াবাজের রাজ্যে। কী রাজ্য, কেমন রাজ্য, কার রাজ্য—সেসব জানি না। ঘোড়ায় চড়া সৈন্যরা এসে মাঝেমধ্যেই চড়াও হত। গাঁও পুড়িয়ে দিত। লোকজনকে বেঁধে নিয়ে যেত। কখনো শোনা যেত এরা সব রাজার লোক, কখনো শোনা যেত রাজের লোক। কিন্তু যার লোকই হোক—তারা হিন্দুমুসলমান ভেদ করত না, সব বাড়িই পোড়াত, সবাইকেই মারত বা বেঁধে নিয়ে যেত। যাদের বেঁধে নিয়ে যেত তারা কেউ ফিরে আসত, কেউ ফিরে আসত না। কোলের বাচ্চাদের ছিঁড়ে নিয়ে যেত—কেউ বলত, রাজের লোকজন যাতে ফলন বাড়াতে তাদের বলি দেয়া না হয়। কেউ বলত, রাজার লোকজন, চাষের আগে মাঠে বলি দিতে। আমাদের ওখানে মেয়েদের বড় হওয়া হত না। মা-বাবাই তাদের জলে ডুবিয়ে মারত। কেউ বলত, রাজের লোকজন বাচ্চাগুলিকে বাঁচিয়ে দিত। কেউ বলে, রাজার লোকজন শিশুবলি দিত। সবসময় হাঙ্গামা-হুজ্জতি, ধরাপড়া ও পালানোর মধ্যে ছুটোছুটি করতে হত বলে আমাদের গ্রামে হিন্দু-মুসলমান ভাগ ছিল না, খুব একটা। হিন্দুঘরের পাশে বা সামনেই হয়তো মুসলমান ঘর। আর বাচ্চারা পুরো গাঁয়েরই সম্পত্তি। যে পারে সে-ই বাঁচাত বাচ্চাদের। পুরুষ-বাচ্চাদের তো বটেই—মেয়ে-বাচ্চাদেরও তাদের মা-বাবার হাত থেকে বাঁচাতে কেউ হয়তো লুকিয়ে রাখত। তারা বেশিরভাগই মুসলমান মেয়ে, যারা হিন্দু নবজাতদের রক্ষা করত। আমাদের গ্রামে এমন ডাকাডাকি খুবই ছিল—সীতাপ্যারি লেড়কি, আয়েশা কী লেড়কীকো যশোদা মাইই। আর, আমাদের গ্রামে সবসময়ই ছিল একটা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। আর, আমাদের গ্রামে সবসময়ই ছিল একটা ভয়—এই বুঝি এল ডাকুয়ারা, রাজের বা রাজার। আমাদের হিন্দু মেয়েদের স্বামীর চিতায় বেঁধে মারা হত। ফলে মেয়েরাও পালাত, বুড়ি মেয়েরাও, যাদের স্বামীদের টান উঠেছে। বা, রাতারাতি মুসলমান হয়ে কোনো মুসলমান ঘরে লুকোত। এমনই একটা লুটপাট লুকানো পালানোর সময় আমার ঠাকুরদাদার বাবা প্রাণ বাঁচাতে সারারাত ধরে পালিয়ে এক রেলস্টেশন থেকে হাওড়ার ট্রেনে চেপে, এই, এইখানে, এই বাড়িটাতে চলে আসে। কেন? তাদের, মানে আমার ঠাকুরদাদার বাবাদের ঘরের সামনে, থাকত, আর-একটা ঘরে ফতেমা আর বুলবুল-আমার ঠাকুরদাদার বাবা তাদের ঘরেই থাকত—গাঁয়ের লোকরা কেউ-কেউ ফতেমাকে ও বুলবুলকে আমার ঠাকুরদার বাবার সম্বন্ধে গোবর্ধন কো মাই আর বলরামকো বাপ ডাকতে শুরু করেছিল, যখন তারা গাঁও পালিয়ে খিদিরপুরে চলে আসে। খিদিরপুরে তখন ডক তৈরি হচ্ছে, দেশবিদেশের জাহাজ ভাসছে, কামাইয়ের শেষ নেই। খিদিরপুর, কলকাতা, হাওড়া—এইসব নাম শোনা ছিল বলেই আমার ঠাকুরদাদার বাবা দশ বছর বয়সে গোবর্ধন কা মায়ীর কাছে পৌঁছে গেল, আরো বছর দশ কাটিয়ে দিল। গোবর্ধনের মা ফতেমা তার ছেলেকে বলল, ‘বিয়ে কর’ আর গোবর্ধন বলল, ‘মেয়ে দেখ’। সাততাড়াতাড়ি যে মেয়েটিকে পাওয়া গেল, তার কথা শুনে গোবর্ধন বলল, ‘ও তো হিন্দু’। ফতেমা বলল, ‘তুইও তো হিন্দু।’ গোবর্ধন বলল, ‘মুসলমান মায়ের হিন্দু ছেলে হয়? আমাকে মুসলমান করে নে।’ আমার ঠাকুরদার বাবার মুসলমানি হল, তার, গোবর্ধনের একুশ-বাইশ বছর বয়সে। হাজামের ক্ষুর একপাক ঘুরতে-না-ঘুরতেই কোরবানির মোষের গলায় গোবর্ধন নাকী কেঁদে উঠেছিল, ‘আমাকে হিন্দু করে দে মা’ আর গোবর্ধনের মা তার মাথায় হাত বুলোতে-বুলোতে কাঁদতে-কাঁদতে বলেছিল, ‘কত বললাম, তোর মুসলমান হওয়ার কাম নেই।’
খুব একটা হাসাহাসির মধ্যে রহমানশাহেব বলেন, ‘আমার সেই ঠাকুরদাদাকে নিয়ে অনেক গল্প চাউড় আছে। ঠাকুরদাদা তো মুসলমান হয়ে মুসলমান লেড়কি বিয়ে করলেন কিন্তু বেশ কয়েকদিন পর বোঝা গেল— ঠাকুরদাদা নানা ছুতো দেখিয়ে বৌয়ের সঙ্গে ঘুমনোটা এড়িয়ে যাচ্ছেন। এটা সবার বুঝতে সময় লাগল কারণ দাদির ফূর্তি এত বেড়ে গেল যে সবাই বুঝেই ফেলল, সাদির পানি না, সাদির ফ্লাড ঢুকেছে দাদির শরীরে! মাস ছয় নাকী লেগেছিল আমার ঠাকুরদাদার মায়ের এটা বুঝতে যে ছেলে আর ছেলেবৌয়ের কোনো সুহাগ রাত হয়নি। কেন হয়নি—সেটা আন্দাজ করাই কঠিন, জানা তো অসম্ভবই। দোষ আছে মেয়ের? বা বেটার? চেষ্টা করেও হয়নি। আমার ঠাকুরদাদার মা, ঠাকুরদাদাকেই প্রথম ধরলেন। কী রে কী ব্যাপার? আমার ওসব ভাল লাগে না। ভাল্ লাগাতে চেয়েছিস? সবই তো ভাল আছে—আবার ওসব কী? আরে উল্লু, ঐটাই তো বিয়ের আসল কাজ। ঐ কাজটা যদি পণ্ড হয়, তাহলে সবই পণ্ড। তোমার বেটার বৌকে দেখে কি তাই মনে হয় যে ওর সব পণ্ড? চুপ কর তো! ঐ মেয়েটার তো এখনো জোয়ানিই আসেনি। ও তো তোর কাছ থেকেই জোয়ানি শিখবে। এতদিন খালাত-ফুফাত দিদিদের কাছে তো শুধু শুনে এসেছে—মরদরা রাত্রে কেমন দুষমন হয়ে ওঠে। তেমন কিছু যে ওর ঘটে না তাতেই ওর ফূর্তি। তাহলে, আমার ফূর্তিতে তোমার নারাজ কেন? নারাজ হব না? মরদ যদি মরদ না হয় আর জেনানা যদি জেনানা না হয় তবে নারাজ হব না? তোর কেন ইচ্ছে হয় না বৌয়ের পাশে শুতে? ইচ্ছে কি আর হয় না, মা? কিন্তু ইচ্ছে হলেই যে ভয়ে কুঁচকে যাই। কেন, তোর ভয়ের কারণটা কী? সেই মুসলমানির দিনের কথা মনে আসে। যেন, ঐ জায়গাটায় হাত দিলেই বা ঐ জায়গায় কিছু করতে গেলেই সেদিনের মতো, সেই মুসলমানির দিনের মতো, মাথা থেকে পা কেটে ফালা হয়ে যাবে। আর হাজাম ঠাকুরের হাতে ধরা ক্ষুর থেকে ঝুলছে আমার মাংসের আগা।
‘মজার গল্প তো আর কোথাও শেষ হয় না। যে যার মতো মজা বাড়াতেই থাকে। তারপর আমার ঠাকুরদাদার মা ওখানকার বড় হেকিমজিকে ডেকে তাঁর ছেলের ভয়ের কথা কোনোরকমে জানান। কী করে জানালেন, সেটা একটা মজা। তারপর বড় হেকিমজি আমার ঠাকুরদাদার সঙ্গে ঠাকুরদাদার হোটেলে বসে গল্প করতে বসতেন। এতদিন ধরে এত গল্প করলেন যে ততদিনে আমার ঠাকুরদাদার বৌয়ের অন্তত তিন-তিন বাচ্চা পয়দা হওয়ার কথা। কোথায় কী? কথায় কি আর বাচ্চা হয়? সেই ঠাকুরদাদার সঙ্গে বড় হেকিমজির এতদিন কার, প্রায় পৌনে তিন বছরের কথাবার্তা তো আর-এক আলেফ লায়লার গল্পের মজা। তারপর, কী করে আমার বাবা জন্মালেন সে-ও তো আর-এক মজা।
‘আমাদের বংশ আপকান্ট্রি হিন্দু থেকে বাঙালি মুসলমান হয়ে যাওয়ার এই গল্প শুনেই তো আপনি বুঝতে পারছেন—হিন্দুদের স্বদেশী করার রাইট আমার আছে, তেমনি আছে ‘বঙ্গভঙ্গ বাতিল করা চলবে না’ এই মুসলমানি স্লোগ্যান তোলার রাইটও আমার আছে। আবার, খিলাফতের জন্য কোনো শোকদুঃখ আমার না-থাকতে পারে। কিন্তু সে-কারণে ৩২-এর আইন অমান্যে জেলখাটা আটকায় না। আবার মুসলিম লিগের নতুন আইনে রিজার্ভড সিটের বাইরে কাউন্সিলর ভোটে দাঁড়ানোও আটকায় না। আপনাদের, শিডিউলদের, এমন কোনো মজার গল্প নেই—তপশিলি হওয়ার? বরিশালের তপশিলি কেন কলকাতারও তপশিলি—সেসব নিয়ে মজার গল্প নেই কোনো?’
‘সেখানেই তো আমার গেরো রহমানজি। বরিশালে তো আমি তপশিলি সিটে দাঁড়াই নাই। খোলা সিটে খাড়ায়্যা জিতছি। তাই তো উলট্যা রটানো ধইরছে, শিডিউল হইলে কেউ জেনারেল সিটে যায়?’
‘তাই তো মজার গল্পের কথা বললাম—’!
‘আপনে তো কইলেন আপনার ঠাকুরদাদার গল্প, বড়জোর শ-খানেক বছরের গল্প, হাওড়া-কইলকাত্তার গল্প, চটকল আর খিদিরপুরের ডকের গল্প, যে-বাড়িতে গল্পগুল্যা ঘটছে সেই গল্প সেই বাড়িতে বইস্যা-বইস্যা শোনাইলেন। হিন্দুগ জাইতে ঠাকুরদাদা হয় না, আপকানটি হয় না, বাঙালিও হয় না। শুধু স্বর্গ হয়। আর সেই স্বর্গে থাকে ব্রহ্মাঠাকুর, বিষ্ণুঠাকুর ও শিবঠাকুর। এই দেবত্তাগ কারো মুখ থিক্যা, কারো পা থিক্যা, কারো পাছা থিক্যা একেকডা জাইত বারাইছে। আমি ক্যামনে ঠাকুরদাদার গল্প কইয়্যা আপনার নাগার নেতা হইব? সেইড়া হয় না। আমি আপনার আন্দাজডা শুইনব্যার লাইগ্যা আসছি—কাউরে কিছু না কয়্যা। এডার রহস্য কী, সেইডার একডু ইশারা যদি ভাইঙ্গতেন, রহমান সা’ব’
‘আমার তো শুনেই মনে হল—কংগ্রেসের ভিতরের কেউ যোগেনবাবুকে তাদের উন্নতির পথে কাঁটা ভাবছে। তারা নিজেরা দাঁড়াতে চায়। দেশ তো স্বাধীন হয়েই গেল—দেশী মন্ত্রী, দেশী অ্যাসেম্বলি, দেশী আইন—স্বাধীনতার আর বাকি থাকল কী? এখন যে যার ঘর না-গুছিয়ে নিলে সত্যি যখন ইংরেজরা চলে যাবে, তখন, আমাদের হাতে থাকবে কী? দেখেন না, এত যুদ্ধটুদ্ধ চলছে, কিছু বোঝা যায়? যেন ওসব অন্যদের কাজ, আমাদের কাজ শুধু স্বাধীন হওয়া।
‘তাহলে আমি করবডা কী? মারামারি?’
‘এক সন্ধ্যার মারামারিতে যদি মিটত তাহলে তাই করতে বলতাম। কিন্তু ভোটের তারিখ তো এসে গেল। এখন পালটা-মারামারিতে আপনাকে ফাঁসিয়ে দিতে পারে। তার চাইতে ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের ধরে খুব বড় সাইজের একটা মিছিল লাগান। একটু জঙ্গি। একটু জঙ্গি মিছিল। ওঁদের, নীহারেন্দু বাবু-ভূপেন বাবু-বঙ্কিমবাবু-শিবদাস বাবু, ওঁদের ধরুন। মিছিল একটা হলে মাপ একটা পাওয়া যায়। মানে, আপনারা ওসব খেয়াল না করে ভোটের হাওয়া তুলুন।’
‘হাওয়া তো ওরাই তুলল—’
‘ওটা তো কানাকানি হাওয়া। আপনারা তুলুন ঝড়ের আওয়াজ, তাতে কি আর কানাকানি শোনা যায়?’
‘ঝড়ের হাওয়া?’ সেটা কী বুঝতে যোগেন হঠাৎ হাঁ করে। আর, হাঁ করেই থাকে। বেশ অনেকক্ষণ সেই হাঁয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে রহমানশাহেবকে বুঝতে হয়, হাঁ-টা নিজেনিজেই খুলেছে বটে, কিন্তু নিজে-নিজে বন্ধ হবে না। বন্ধ করিয়ে দিতে হবে।
রহমানশাহেব জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনার কি আমাদের ঘরের মিষ্টি চলবে? এতক্ষণ তো জলও দিতে পারিনি সাহস করে?’
যোগেনের হাঁ বন্ধ হয়ে যায়, চোখদুটো পাকিয়ে ওঠে। যেন তাতেই তার মুখের ভাষা শুনতে পাওয়া উচিত, এমন একটা সময় পেরিয়ে যোগেন বলতে পারে, ‘আপনি কি আমারে জিগান, জলমিষ্টির কথা?’
‘কাকে আর বলব। আপনি এতক্ষণ এসেছেন, কিন্তু চা বা জল কিছুই দিতে পারিনি। হিন্দুদের ব্যাপার তো—আপনি খাবেন কি খাবেন না?’
‘আমি? খাব কি খাব না? আপনার ছোঁয়া? জল মিষ্টি? আমি তো শুদ্দুর রহমান সাব। কারো উচ্ছিষ্টও আমার ‘না’ করা নিষেধ। আর, আমার ছোঁয়া কারো খাওয়া নিষেধ। ছোঁয়াছুঁয়ি তো জাতের উচানিচার ব্যাপার। আমার থিক্যা তো নিচা নাই কেউ।’
‘সে তো আপনাদের হিন্দুসমাজের ব্যাপার—’
‘না, রহমান সাব, মানবজাতের ব্যাপার। মানবজাতের কোথাওই, কুথথাও, শূদ্র-চাড়ালের নীচে কোনো তাক নেই। ছোঁয়া? উচ্ছিষ্ট নয় এমন কিছু তার খাওয়াই নিষেধ।’
রহমানশাহেব স্বীকারোক্তির ধরণে এমন কথায় একটু বিচলিতই হয়ে পড়েন, যেন এমন কথা এর আগে কখনো তাঁকে শুনতে হয়নি। তিনি দাঁড়িয়ে উঠে বলেন, ‘তাহলে আপনি দুটো ভাত খান—’
‘খাইতে পারি, দুইডা না, চাইরডা যদি দেন’।
রহমানশাহেব লাফ দিয়ে বাড়ির ভিতরে যান, প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বেরিয়ে আসেন, পেছনে একটা ছোট ছেলে—কলাই-করা বগি থালা হাতে ছুটে তাঁকে ডিঙিয়ে চলে যায়। যোগেন আন্দাজ করে, মাছ বা মাংস আনতে।
